২০২৫ সালের ১১ ডিসেম্বর, দেশে শীত নামার সময়, সংবাদমাধ্যম জাগো নিউজ শীতে গবাদিপশুর যত্ন নিয়ে একটি পরামর্শমূলক প্রতিবেদন প্রকাশ করে। পরামর্শ দেন ইন্টার্ন প্রাণী চিকিৎসক মো. রাজিবুল ইসলাম। তিনি জাগো নিউজকে বলেন, শীতকাল গবাদিপশুর জন্য সংবেদনশীল সময়: তাপমাত্রা কমে গেলে পশুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হতে পারে, খাদ্য ও পানির চাহিদা বদলে যায় এবং ঠান্ডাজনিত রোগের ঝুঁকি বাড়ে। প্রাপ্তবয়স্ক গরু, বাছুর এবং গর্ভবতী গাভি ও মহিষের জন্য কৃষকের কী করা উচিত, তা তিনি বিস্তারিত বলেন এবং অসুস্থ পশুকে অপ্রশিক্ষিত চিকিৎসকের কাছে না নিয়ে উপজেলা প্রাণিসম্পদ হাসপাতালে নেওয়ার আহ্বান জানান।
এই প্রতিবেদনে তার পরামর্শ রাখা হয়েছে এবং সেই তারিখ পর্যন্ত ভেটেরিনারি গ্রন্থ, সম্প্রসারণ সংস্থা, প্রকাশিত গবেষণা ও বাংলাদেশের আইন যা বলেছে, তা পাশাপাশি তুলে ধরা হয়েছে। মূল লেখার যে অংশ সংশোধন দরকার ছিল, তার ব্যাখ্যা লেখার মধ্যেই দেওয়া হয়েছে।
শীত ও দেশের গবাদিপশু
জাতীয় জ্ঞানকোষ বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী, বাংলাদেশে শীতল ও শুষ্ক মৌসুম নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। জানুয়ারি সবচেয়ে ঠান্ডা মাস। জানুয়ারিতে গড় তাপমাত্রা উত্তর-পশ্চিম ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলে প্রায় ১৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস থেকে উপকূলীয় এলাকায় ২০ থেকে ২১ ডিগ্রি পর্যন্ত থাকে। ডিসেম্বরের শেষ ও জানুয়ারির শুরুতে দেশের একেবারে উত্তর-পশ্চিম ও উত্তর-পূর্ব প্রান্তে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা হিমাঙ্কের ৪ থেকে ৭ ডিগ্রির মধ্যে নেমে আসে। এই ঠান্ডা বাতাস আসে উত্তর-পশ্চিম ভারতের ওপর তৈরি হওয়া উচ্চচাপ অঞ্চল থেকে, আর শীতে বাতাসের গতি থাকে কম, ঘণ্টায় ৩ থেকে ৬ কিলোমিটার।
এই মৌসুমের প্রভাব পড়ে বিপুলসংখ্যক পশুর ওপর। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের (ডিএলএস) প্রকাশনা ‘লাইভস্টক ইকোনমি অ্যাট এ গ্লান্স ২০২৩-২০২৪’ অনুযায়ী, যা বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য থেকে তৈরি, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে দেশে গরু ছিল ২৫০.১৩ লাখ, মহিষ ১৫.২৪ লাখ, ছাগল ২৭১.১৭ লাখ এবং ভেড়া ৩৯.০৩ লাখ। ওই বছর দুধ উৎপাদন হয় ১৫০.৪৪ লাখ টন, যেখানে আনুমানিক চাহিদা ছিল ১৫৮.৭৮ লাখ টন। একই প্রকাশনা অনুযায়ী স্থির মূল্যে মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) প্রাণিসম্পদের অংশ ১.৮০ শতাংশ এবং কৃষি জিডিপিতে ১৬.৩৩ শতাংশ; এ খাতে দেশের ২০ শতাংশ মানুষ সরাসরি এবং ৫০ শতাংশ আংশিকভাবে নিয়োজিত।
ঠান্ডা পশুর শরীরে কী করে
প্রাণী চিকিৎসক রাজিবুল ইসলাম বলেন, শীতে গবাদিপশুর শরীরের তাপমাত্রা অনেক কমে যেতে পারে, যা হাইপোথার্মিয়া নামে পরিচিত। এতে বাছুর ও অন্যান্য কম বয়সী প্রাণী নিউমোনিয়া ও শ্বাসকষ্টে আক্রান্ত হয়। তার ভাষায়, ঠান্ডায় পশুর রক্তনালি সংকুচিত হয়, পানি পান কমে যায়, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায় এবং শরীর গরম রাখতে বেশি শক্তির দরকার হয়।
সম্প্রসারণ বিশেষজ্ঞরা একই সমস্যাকে তাপমাত্রার একটি সীমা দিয়ে ব্যাখ্যা করেন। যুক্তরাষ্ট্রের ওহাইও স্টেট ইউনিভার্সিটি এক্সটেনশনের শীতকালীন বাছুর ব্যবস্থাপনা বিষয়ক নিউজলেটারে বলা হয়েছে, বাছুর সবচেয়ে আরামে থাকে ৫০ থেকে ৬৮ ডিগ্রি ফারেনহাইটে, যাকে বলা হয় থার্মোনিউট্রাল জোন। ৫০ ডিগ্রি ফারেনহাইটের নিচে, অর্থাৎ নিম্ন সংকট তাপমাত্রার নিচে নামলে শুধু শরীর গরম রাখতেই বাছুরের বাড়তি শক্তি লাগে। নিউজলেটার অনুযায়ী, ওই সীমার নিচে প্রতি এক ডিগ্রি তাপমাত্রা কমলে শরীর চালু রাখার জন্য বাছুরের প্রায় এক শতাংশ বেশি শক্তি প্রয়োজন হয়। নবজাতক বাছুরের শরীরে তাপ তৈরির জন্য যে বাদামি চর্বি থাকে, তার মজুত মাত্র প্রায় ১৮ ঘণ্টার; ঠান্ডায় কাঁপতে থাকা বাছুর সেই মজুত আরও দ্রুত শেষ করে ফেলে। বাছুরের রুমেন বা পাকস্থলী যত বিকশিত হয় এবং নিজে তাপ তৈরি করতে শুরু করে, নিম্ন সংকট তাপমাত্রাও তত কমে আসে।
শ্বাসতন্ত্রের রোগও আসে একই পরিস্থিতি থেকে। এমএসডি ভেটেরিনারি ম্যানুয়াল জানায়, প্রাণী চিকিৎসক বাছুরের যে রোগের কথা বলেছেন, সেই বোভাইন রেসপিরেটরি ডিজিজ (বিআরডি) অনেকগুলো কারণ একসঙ্গে কাজ করে হয়। দুধ ছাড়ানো, পরিবহন, বিভিন্ন জায়গার পশু একসঙ্গে রাখা, গাদাগাদি, খারাপ আবহাওয়া, ধুলা ও বাতাস চলাচলের অভাব পশুর রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা দুর্বল করে; গাদাগাদি ও বায়ু চলাচলের অভাব জীবাণুকে এক পশু থেকে আরেক পশুতে ছড়াতেও সাহায্য করে। প্রায়ই প্রথমে কোনো ভাইরাস শ্বাসনালির ক্ষতি করে, তারপর ব্যাকটেরিয়া ফুসফুসে বাসা বাঁধার সুযোগ পায়।
শীতের সঙ্গে যুক্ত রোগগুলো
নিউমোনিয়া ও বিআরডি ছাড়াও প্রাণী চিকিৎসক বলেন, শীতে লাম্পি স্কিন ডিজিজ (এলএসডি) ও ক্ষুরারোগের (এফএমডি) মতো কিছু ভাইরাসজনিত রোগের প্রবণতা বাড়ে এবং কলিজাকৃমি বা লিভার ফ্লুক ও ফুট রটও বাড়ে। শীতে সাধারণত যে রোগগুলো বাড়ে, তার তালিকায় তিনি ওলান প্রদাহ বা ম্যাস্টাইটিসের কথাও বলেন। বাংলাদেশ নিয়ে প্রকাশিত গবেষণা অবশ্য মৌসুমের বিষয়ে কিছুটা ভিন্ন চিত্র দেয়, যা কৃষকের জানা দরকার।
ক্ষুরারোগ বাংলাদেশে স্থানীয়ভাবে স্থায়ী (এনডেমিক) রোগ। শংকর পি. মণ্ডল ও মাত ইয়ামাগের একটি গবেষণা ২০১৪ সালের আগস্টে পিএলওএস ওয়ান সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়; এটি ২০১০ সালের জানুয়ারি থেকে ২০১২ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের নিয়মিত রোগ প্রতিবেদনের ভিত্তিতে করা। তিন বছরে ক্ষুরারোগের ৩,০০,৩৩৩টি ঘটনা রিপোর্ট হয়, যার বেশির ভাগ গরুতে। ক্ষুরারোগের রিপোর্ট সবচেয়ে বেশি ছিল নভেম্বরে, মোটের ১২.৪ শতাংশ, এরপর জুনে; তবে মৌসুমভেদে ক্ষুরারোগের ঘটনায় উল্লেখযোগ্য পার্থক্য পাননি গবেষকেরা। তাদের গবেষণার পাঁচটি রোগ (অ্যানথ্রাক্স, ক্ষুরারোগ, হেমোরেজিক সেপ্টিসেমিয়া, পিপিআর ও জলাতঙ্ক) মিলিয়ে রিপোর্ট সবচেয়ে বেশি ছিল জুন থেকে সেপ্টেম্বরে এবং সবচেয়ে কম ডিসেম্বর থেকে এপ্রিলে। অর্থাৎ শীত এসব রোগের প্রধান মৌসুম নয়, তবে ক্ষুরারোগ যেকোনো মাসেই হতে পারে।
লাম্পি স্কিন ডিজিজ তুলনামূলক নতুন সমস্যা। ভেটেরিনারি মেডিসিন অ্যান্ড সায়েন্স সাময়িকীতে ২০২১ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় বলা হয়েছে, ২০১৯ সালের মাঝামাঝি চট্টগ্রাম বিভাগসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে গরুতে এ রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়। ক্যাপ্রিপক্স ভাইরাসজনিত এই রোগে জ্বর হয় এবং চামড়ায় গুটি ওঠে। গবেষকেরা ২০১৯ সালের আগস্ট থেকে ডিসেম্বরে চট্টগ্রাম জেলার ১৯টি বাণিজ্যিক খামারের ৩,৩২৭টি গরু পরীক্ষা করে ১০ শতাংশের মধ্যে রোগের লক্ষণ পান; সংকর জাতের ও স্ত্রী গরুতে হার বেশি ছিল। তারা উল্লেখ করেন, ধারণা করা হয় ভাইরাসটি প্রধানত মশা, মাছি ও আঁটুলির মতো রক্তচোষা পোকার মাধ্যমে ছড়ায় এবং বর্ষা মৌসুমে, যখন এসব বাহক বেশি থাকে, রোগটি বেশি দেখা যায়। খামারে নতুন পশু আনা ছিল তাদের পাওয়া সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকির কারণগুলোর একটি।
কলিজাকৃমি রোগের কারণ ফ্যাসিওলা জাইগান্টিকা, পরজীবীটির গ্রীষ্মমণ্ডলীয় প্রজাতি, যার লার্ভা লিমনেইডি গোত্রের পানির শামুকে বেড়ে ওঠে। সিলেটের ছাগল নিয়ে ২০২২ সালে জার্নাল অব প্যারাসিটোলজি রিসার্চে প্রকাশিত একটি গবেষণায় বলা হয়েছে, দেশের কৃষি-পরিবেশগত অবস্থা শামুক ও পরজীবীর অনুকূল হওয়ায় বাংলাদেশে ফ্যাসিওলোসিস বেশি ছড়ানো; ওই গবেষণায় সংক্রমণ সবচেয়ে বেশি ছিল বর্ষায়, তারপর শীতে, তারপর গ্রীষ্মে। পাস্তুরেলা মালটোসিডা ব্যাকটেরিয়াজনিত হেমোরেজিক সেপ্টিসেমিয়া (এইচএস) বা গলাফোলা গরু ও মহিষের অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ রোগ; ২০১৪ সালের পিএলওএস ওয়ান গবেষণাপত্রে উদ্ধৃত এক হিসাবে, গলাফোলা, অ্যানথ্রাক্স ও বাদলা (ব্ল্যাক কোয়ার্টার) মিলে বাংলাদেশের বছরে প্রায় ১৪৮.৬ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের ক্ষতি হয়।
শীতে খাদ্য ও পানি
শরীর গরম রাখতে পশুর বেশি শক্তি খরচ হয় বলে প্রাণী চিকিৎসক খাদ্যতালিকায় ভুষি, গম, খৈল ও গুড় রাখতে এবং খাবারের পরিমাণ স্বাভাবিকের চেয়ে ৫ থেকে ১০ শতাংশ বাড়াতে পরামর্শ দেন। পানির পরিমাণও বাড়াতে হবে এবং পানি দিতে হবে কুসুম গরম। তিনি ভিটামিন এ, ডি, ই, বি কমপ্লেক্স ও মিনারেল খাওয়ানোর কথাও বলেন; যেকোনো সম্পূরকের মতো এর ধরন ও পরিমাণ প্রাণী চিকিৎসকের সঙ্গে ঠিক করে নেওয়াই ভালো।
মূল লেখায় কুসুম গরম পানির তাপমাত্রা ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াস বলা হয়েছিল। ১০ ডিগ্রির পানি কুসুম গরম নয়, ঠান্ডা; তাই সংখ্যাটি ভুলবশত লেখা বলে মনে হয় এবং এখানে তা বাদ দেওয়া হয়েছে। মূল পরামর্শের পক্ষে অবশ্য গবেষণা আছে। ভারতীয় পশু চিকিৎসা গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইভিআরআই) মুক্তেশ্বর ক্যাম্পাসে শীতকালে করা এবং ২০১৪ সালের অক্টোবরে ইন্ডিয়ান জার্নাল অব অ্যানিমেল সায়েন্সেসে প্রকাশিত এক পরীক্ষায় দুধ দেওয়া ১৮টি সংকর গাভিকে ছয়টি করে তিনটি দলে ভাগ করা হয়। যে গাভিগুলোকে ৩৫ থেকে ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের পানি দেওয়া হয়, সেগুলো দিনে বেশি পানি পান করে (৪০.৬৬ লিটার; পরিবেশের তাপমাত্রার, অর্থাৎ প্রায় ১০ ডিগ্রির পানি পাওয়া গাভি পান করে ৩৮.৬৩ লিটার), বেশি শুকনা খাদ্য খায় এবং বেশি দুধ দেয়: দৈনিক গড়ে ৭.৫৬ লিটার, যেখানে পরিবেশের তাপমাত্রার পানিতে ৬.৯৫ লিটার এবং ১৫ থেকে ২০ ডিগ্রির পানিতে ৭.০৬ লিটার। ওহাইও স্টেটের নিউজলেটারও দুধ খাওয়ানোর ৩০ মিনিটের মধ্যে বাছুরকে গরম পানি দিতে বলেছে; সেখানে উল্লেখ আছে, পানি পান বাছুরের দানাদার খাদ্য (স্টার্টার) খাওয়া ৩১ শতাংশ বাড়ায়।
গর্ভবতী গাভির দৈনিক খাদ্যে কী থাকা উচিত, তার তালিকা দেন প্রাণী চিকিৎসক:
- ভালো মানের শুকনা খড়;
- লুসার্ন বা নেপিয়ারের মতো সবুজ ঘাস, দিনে ১০ থেকে ১৫ কেজি;
- গম ভাঙা, ভুষি ও খৈল, গাভির বয়স ও ওজন অনুযায়ী;
- খনিজ ও লবণ।
তিনি সতর্ক করেন, পশু ঠান্ডা পানি খেতে না চাইলে পানি পান কমে যায়, দুধ কমে, কোষ্ঠকাঠিন্য হয় এবং কিটোসিস দেখা দিতে পারে। তাই দিনে দুই থেকে তিনবার হালকা গরম পানি দেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।
উষ্ণ, শুকনা অথচ বাতাস চলাচলের গোয়ালঘর
প্রাণী চিকিৎসক বলেন, শীতে গোয়ালঘর এমনভাবে সাজাতে হবে, যাতে শীতল বাতাস ঢুকতে না পারে, অথচ পর্যাপ্ত আলো আসে; আর ঘর সব সময় পরিষ্কার রাখতে হবে। বিশেষ করে গর্ভবতী পশুর জন্য তিনি খড় বা শুকনা বিছানা (স্ট্র বেড) ব্যবহার, বাতাস ঢোকে এমন খোলা দিক পলিথিন দিয়ে ঢেকে দেওয়া, বৃষ্টি ও কুয়াশা যাতে ঢুকতে না পারে তা নিশ্চিত করা এবং খুব ঠান্ডা রাতে বাড়তি বিছানা দেওয়ার পরামর্শ দেন। ঠান্ডাজনিত রোগ ঠেকাতে প্রয়োজনে শেডের আর্দ্রতা কমানোর কথাও বলেন তিনি।
বিশেষজ্ঞ সূত্র এখানে একটি সতর্কতা যোগ করে: ঠান্ডা বাতাস আটকাতে গিয়ে বিশুদ্ধ বাতাসও আটকে দেওয়া যাবে না। এমএসডি ভেটেরিনারি ম্যানুয়াল বায়ু চলাচলের অভাবকে বিআরডির প্রধান পরিবেশগত কারণগুলোর মধ্যে রেখেছে, আর ওহাইও স্টেটের নিউজলেটার সতর্ক করেছে, বাতাস চলাচল কম এমন ঘরে বাছুর ঠিকমতো শুকায় না এবং বাতাসের মান এতটা খারাপ হতে পারে যে নিউমোনিয়া হয়। তাই খোলা দিক ঢেকে দেওয়ার সময় ঘরে কিছু বায়ু চলাচলের ব্যবস্থা রাখাই ভালো। পুরু ও শুকনা খড়ের বিছানা আরেকভাবে সাহায্য করে: নিউজলেটার অনুযায়ী, যথেষ্ট পুরু খড়ে বাছুর শোয়ার সময় পা ঢেকে খড়ের মধ্যে বাসার মতো করে থাকতে পারে।

নবজাতক বাছুর: শালদুধ, শুকনা শরীর ও জ্যাকেট
বাছুরের ক্ষেত্রে প্রাণী চিকিৎসকের প্রথম কথা শালদুধ: জন্মের এক ঘণ্টার মধ্যে বাছুরকে মায়ের প্রথম দুধ খাওয়ানোর ব্যবস্থা করতে হবে। এ ছাড়া জ্যাকেট বা ভারী কাপড় দিয়ে বাছুরের শরীর ঢেকে রাখা, দুধ গরম করে খাওয়ানো এবং নিয়মিত টিকা ও কৃমিনাশক দেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।
শালদুধ কেন সবার আগে, তা ব্যাখ্যা করেছে আয়ারল্যান্ডের কৃষি ও খাদ্য উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ টিগাস্কের কাফ রিয়ারিং ম্যানুয়াল। বাছুর জন্মায় রোগ প্রতিরোধী অ্যান্টিবডি ছাড়া; নিজের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা কাজ শুরু না করা পর্যন্ত সে শালদুধের অ্যান্টিবডির ওপর নির্ভর করে। সাধারণ দুধের চেয়ে শালদুধে শক্তি, চর্বি, আমিষ, ভিটামিন ও খনিজও বেশি থাকে, আর দ্বিতীয়বার দোহনের সময় এর অ্যান্টিবডি প্রায় অর্ধেকে নেমে আসে। ম্যানুয়াল অনুযায়ী, প্রথমবার অন্তত তিন লিটার শালদুধ জন্মের প্রথম দুই ঘণ্টার মধ্যে খাওয়াতে হবে, অথবা বাছুরের জন্ম-ওজনের প্রায় ৮.৫ শতাংশ; সে হিসাবে ৩৫ কেজির বাছুরের লাগে তিন লিটার। ম্যানুয়ালে অ্যানিমেল হেলথ আয়ারল্যান্ডের ‘শালদুধ ১-২-৩’ নিয়মের কথা আছে: প্রথম দোহনের শালদুধ, জন্মের দুই ঘণ্টার মধ্যে, অন্তত তিন লিটার। ম্যানুয়ালে বলা হয়েছে, যে বাছুর শালদুধ পায় না, জীবনের প্রথম ২১ দিনে তার মৃত্যুর আশঙ্কা ৭৪ গুণ বেশি।
জ্যাকেটের বিষয়ে ওহাইও স্টেটের নিউজলেটারের পরামর্শ, তিন সপ্তাহ পর্যন্ত বয়সী বাছুরের ঘরের গড় তাপমাত্রা ৫০ ডিগ্রি ফারেনহাইটের নিচে নামলে এবং এর চেয়ে বড় বাছুরের ক্ষেত্রে ৪০ ডিগ্রি ফারেনহাইটের নিচে নামলে জ্যাকেট পরানো শুরু করা যায়। নিউজলেটারে উল্লেখ আছে, গবেষণায় জ্যাকেট পরা বাছুরের ওজন জ্যাকেট ছাড়া বাছুরের চেয়ে দিনে ০.২২ পাউন্ড বেশি বেড়েছে। জ্যাকেটের কাপড় হতে হবে বাতাস চলাচলের উপযোগী, ওপরের স্তর পানি-প্রতিরোধী; জ্যাকেট পরানোর আগে বাছুর পুরোপুরি শুকনা থাকতে হবে, আর গরম আবহাওয়ায় জ্যাকেট পরিয়ে রাখলে বাছুর ঘেমে যায় এবং রাতে ঠান্ডা লেগে যেতে পারে। উষ্ণ ও বাতাস চলাচলের ঘরে ভেজা নবজাতক বাছুর ঘণ্টা দুয়েকের মধ্যে শুকিয়ে যায়।

প্রসবের আগে গর্ভবতী গাভি ও মহিষ
প্রাণী চিকিৎসক বলেন, শীতে গর্ভবতী গাভি ও মহিষের যত্ন বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এ সময় ঠান্ডা, সংক্রমণ ও পুষ্টিহীনতার কারণে মা ও বাচ্চা দুজনই ঝুঁকিতে থাকে। গর্ভকালীন পুষ্টির ঘাটতি হলে মৃত বাচ্চা প্রসব, গর্ভফুল আটকে থাকা (রিটেইন্ড প্লাসেন্টা) ও দুর্বল বাচ্চার ঘটনা বাড়ে। গর্ভের শেষ দুই মাসে তার পরামর্শ:
- ভারী কাজ, টানাটানি, বেশি হাঁটানো বা দৌড়ানো নয়;
- পেটের ওপর চাপ পড়ে এমন পিচ্ছিল মেঝে এড়িয়ে চলা;
- হঠাৎ খাদ্য পরিবর্তন না করা;
- অষ্টম ও নবম মাসে যোনির ফোলা, দুধ ঝরা, পেট নেমে যাওয়ার মতো লক্ষণ প্রতিদিন পর্যবেক্ষণ করা।
প্রসবের প্রস্তুতি হিসেবে তিনি আলাদা ও পরিষ্কার একটি প্রসবঘর (ক্যালভিং পেন) তৈরি রাখা, এর বিছানা শুকনা ও উষ্ণ রাখা এবং প্রসবের সম্ভাব্য তারিখের এক সপ্তাহ আগে থেকে বাড়তি নজরদারি শুরু করার পরামর্শ দেন।
তিনি আরও বলেন, গর্ভের শেষ দুই মাসে ক্যালসিয়ামের ভারসাম্য বজায় রাখতে ভেটেরিনারি পরামর্শে ক্যালসিয়াম বা ম্যাগনেসিয়াম সম্পূরক দেওয়া যায়। এ বিষয়ে সাবধানতা দরকার। এমএসডি ভেটেরিনারি ম্যানুয়াল (২০২২ সালের জুলাইয়ে সংশোধিত) জানায়, দুগ্ধজ্বর বা মিল্ক ফিভার প্রাপ্তবয়স্ক দুধের গাভির রোগ, যাতে রক্তে ক্যালসিয়াম হঠাৎ কমে গিয়ে পক্ষাঘাত হয়, সাধারণত প্রসবের সময় বা তার পরপরই। ম্যানুয়ালে বলা হয়েছে, প্রচলিতভাবে এর প্রতিরোধে দুধ বন্ধ থাকার সময় (ড্রাই পিরিয়ড) কম ক্যালসিয়ামের খাদ্য দেওয়া হয়, কারণ প্রসবের আগে সামান্য ক্যালসিয়াম ঘাটতি থাকলে দুধ দেওয়া শুরু হলে গাভি নিজের মজুত থেকে ক্যালসিয়াম টানতে প্রস্তুত থাকে; আর সবচেয়ে বাস্তবসম্মত ও প্রমাণিত পদ্ধতি হলো প্রসবের প্রায় তিন সপ্তাহ আগে থেকে বিশেষভাবে ভারসাম্য করা অম্লধর্মী খাদ্য। ম্যানুয়াল প্রতিরোধের জন্য নিয়মিত শিরায় ক্যালসিয়াম দেওয়াকেও নিরুৎসাহিত করে। তাই প্রসবের আগে বাড়তি ক্যালসিয়াম দেওয়া সবার জন্য নিরাপদ নিয়ম নয়; নির্দিষ্ট গাভির কোনো সম্পূরক লাগবে কি না, তা ঠিক করবেন নিবন্ধিত প্রাণী চিকিৎসক বা উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা।

প্রতিদিনের পর্যবেক্ষণে আগেভাগে রোগ ধরা
শীতে প্রতিদিন পশু পরীক্ষা করার পরামর্শ দেন প্রাণী চিকিৎসক। তার তালিকা:
- শরীরের তাপমাত্রা, নাড়ির গতি (পালস রেট) ও শ্বাস-প্রশ্বাসের হার মাপা;
- মল-মূত্রের পরিমাণ ও গন্ধ দেখা;
- দুধ উৎপাদন এবং ওলান প্রদাহের (ম্যাস্টাইটিস) দিকে নজর রাখা;
- চোখ, নাক ও মুখ দেখা;
- খাওয়ায় অনীহা আছে কি না এবং আচরণ স্বাভাবিক কি না লক্ষ করা;
- জ্বর, কাশি, নাক-চোখ দিয়ে পানি পড়া, পেট ফাঁপা, ডায়রিয়া, অতিরিক্ত শ্বাসকষ্ট বা খোঁড়া ভাব আছে কি না দেখা;
- রোগাক্রান্ত পশুকে আলাদা ঘরে রাখা।
তিনি বলেন, গর্ভবতী পশুর পেটের বাচ্চার নড়াচড়া কম মনে হলে সঙ্গে সঙ্গে প্রাণী চিকিৎসক ডাকতে হবে। লাম্পি স্কিন ডিজিজের গবেষণা এর সঙ্গে একটি বিষয় যোগ করে: চট্টগ্রামের খামারগুলোতে নতুন পশু আনা যেহেতু এলএসডির সবচেয়ে শক্তিশালী ঝুঁকির কারণগুলোর একটি ছিল, তাই নতুন কেনা গরু পালে মেশানোর আগে কিছুদিন কাছ থেকে পর্যবেক্ষণ করাই ভালো।
টিকা, কৃমিনাশক ও কে চিকিৎসা করবেন
শীতের আগেই ভেটেরিনারি নির্দেশনা অনুযায়ী ক্ষুরারোগ, বাদলা (ব্ল্যাক কোয়ার্টার) ও গলাফোলার (এইচএস) টিকা দেওয়া এবং কৃমিনাশক দিয়ে পরজীবী নিয়ন্ত্রণের পরামর্শ দেন প্রাণী চিকিৎসক। মূল তালিকায় ‘বিএসই’-র নামও ছিল। বিশ্ব প্রাণিস্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউওএএইচ) বোভাইন স্পঞ্জিফর্ম এনসেফালোপ্যাথিকে (বিএসই) বর্ণনা করে গরুর স্নায়ুতন্ত্রের একটি প্রাণঘাতী রোগ হিসেবে, যা প্রিয়ন নামের অস্বাভাবিক প্রোটিন জমে হয়। ২০১৪ সালের পিএলওএস ওয়ান গবেষণাপত্র অনুযায়ী বাংলাদেশের নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচির রোগগুলো হলো অ্যানথ্রাক্স, ক্ষুরারোগ, গলাফোলা ও পিপিআর; বিএসই এর মধ্যে নেই। তাই এখানে টিকার তালিকা থেকে এটি বাদ দেওয়া হয়েছে। একই গবেষণায় দেখা যায়, ২০১০ থেকে ২০১২ সালে ঝুঁকিতে থাকা পশুর মধ্যে টিকা পেয়েছে ক্ষুরারোগে মাত্র ০.৬১ শতাংশ, গলাফোলায় ০.৮৪ শতাংশ এবং অ্যানথ্রাক্সে ৭.৩১ শতাংশ; অর্থাৎ টিকাদানের আওতা ছিল খুবই কম। টিকার সময়সূচি, ধরন ও মাত্রা টিকাভেদে এবং পশুর বয়সভেদে আলাদা; কৃষকের উচিত উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তর থেকে তা জেনে নেওয়া।
এই দপ্তরই প্রথম যোগাযোগের জায়গা। ২০১৪ সালের গবেষণাপত্রে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে সরকারি অর্থায়নে পরিচালিত ভেটেরিনারি সেবার নেটওয়ার্ক উপজেলা পর্যন্ত বিস্তৃত, যেখানে এর প্রধান উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা এবং উপজেলা ভেটেরিনারি হাসপাতালে সরকারি প্রাণী চিকিৎসকদের চিকিৎসা দেওয়া সব ঘটনার রেকর্ড রাখা হয়।
প্রাণী চিকিৎসকের শেষ কথা ছিল অসুস্থ পশুর চিকিৎসা কে করবেন, তা নিয়ে। তিনি বলেন, কোনো রোগ হলে তিন মাসের প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কৃত্রিম প্রজনন (এআই) কর্মী বা হাতুড়ে চিকিৎসককে না দেখিয়ে উপজেলা প্রাণিসম্পদ হাসপাতালের কর্মকর্তার পরামর্শ ও চিকিৎসা নিতে হবে; এতে খরচও কমবে এবং প্রাণীও সুস্থ থাকবে। তিনি আরও বলেন, হাতুড়ে চিকিৎসকের বিরুদ্ধে সরকারিভাবে ব্যবস্থা নিতে হবে এবং কৃষক ও খামারিদের সচেতনতা বাড়াতে হবে।
আইনে এই সীমারেখা আগে থেকেই টানা আছে। বাংলাদেশ ভেটেরিনারি কাউন্সিল আইন, ২০১৯ (২০১৯ সনের ১৩ নং আইন, ১০ জুলাই ২০১৯) এর ১৭ ধারায় বলা হয়েছে, এই আইনের অধীন নিবন্ধন ও সনদ ছাড়া কোনো ব্যক্তি ভেটেরিনারি প্র্যাকটিস করতে বা নিজেকে ভেটেরিনারি চিকিৎসক বা ভেটেরিনারি প্র্যাকটিশনার হিসেবে পরিচয় দিতে পারবেন না। ৩৫ ধারা অনুযায়ী এটি অপরাধ, যার শাস্তি সর্বোচ্চ তিন বছরের কারাদণ্ড বা সর্বোচ্চ দুই লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড। আইনে প্যারাভেট বলতে বোঝানো হয়েছে এমন ব্যক্তিকে, যিনি জীববিদ্যাসহ বিজ্ঞান বিভাগে এসএসসি পাস করে সরকার স্বীকৃত প্রতিষ্ঠান থেকে অন্তত তিন বছর মেয়াদি ভেটেরিনারি কোর্স সম্পন্ন করেছেন; আর ২৬ ধারায় নিবন্ধিত প্যারাভেটদের প্রাথমিক চিকিৎসা, টিকা প্রদান, কৃত্রিম প্রজনন, বার্ডিজ দিয়ে খোজাকরণ ও ড্রেসিংয়ের অনুমতি দেওয়া হয়েছে, তবে শুধু নিবন্ধিত ভেটেরিনারি প্র্যাকটিশনারের তত্ত্বাবধান ও নির্দেশনায়।
ছবি: ক্রিটজোলিনা / উইকিমিডিয়া কমন্স (সিসি বাই-এসএ ৪.০)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪ (১১ ডিসেম্বর ২০২৫), প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর (লাইভস্টক ইকোনমি অ্যাট এ গ্লান্স ২০২৩-২০২৪), বাংলাপিডিয়া (জলবায়ু), এমএসডি ভেটেরিনারি ম্যানুয়াল (বোভাইন রেসপিরেটরি ডিজিজ কমপ্লেক্স; গাভির দুগ্ধজ্বর), ওহাইও স্টেট ইউনিভার্সিটি এক্সটেনশন (বাকআই ডেইরি নিউজ, শীতকালীন বাছুর ব্যবস্থাপনা), টিগাস্ক (কাফ রিয়ারিং ম্যানুয়াল: শালদুধ), ইন্ডিয়ান জার্নাল অব অ্যানিমেল সায়েন্সেস (অক্টোবর ২০১৪), পিএলওএস ওয়ান (মণ্ডল ও ইয়ামাগে, আগস্ট ২০১৪), ভেটেরিনারি মেডিসিন অ্যান্ড সায়েন্স (২০২১), জার্নাল অব প্যারাসিটোলজি রিসার্চ (২০২২), বিশ্ব প্রাণিস্বাস্থ্য সংস্থা (বোভাইন স্পঞ্জিফর্ম এনসেফালোপ্যাথি), বাংলাদেশ ভেটেরিনারি কাউন্সিল আইন, ২০১৯ (বিডিলজ)




মন্তব্য
(০)