পবিত্র ঈদুল আজহা সামনে রেখে ২০২৬ সালের মে মাসে ঢাকাসহ দেশের বড় শহরগুলোর কোরবানির পশুর হাট জমে উঠতে শুরু করেছিল। গরু, মহিষ, ছাগল, ভেড়া, দুম্বা ও উট কিনতে প্রতিদিন হাজারো মানুষ হাটে ভিড় করছিলেন। এ সময় ২৩ মে জাগো নিউজে প্রকাশিত এক ফিচারে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) মাইক্রোবায়োলজি অ্যান্ড হাইজিন বিভাগের অধ্যাপক, ভেটেরিনারিয়ান ও ভেটেরিনারি পাবলিক হেলথ বিশেষজ্ঞ ড. মোছা. মিনারা খাতুন হাট থেকে সুস্থ পশু বেছে নেওয়া এবং কৃত্রিমভাবে মোটাতাজা পশু শনাক্ত করার পরামর্শ দেন। তাঁর মূল কথা ছিল, বাইরে থেকে বড় বা মোটাতাজা দেখালেই পশু সুস্থ, এমন ধারণা ঠিক নয়।
এবারের কোরবানির পশুর হিসাব
২০২৬ সালের ৩ মে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, সে বছর দেশে কোরবানিযোগ্য পশু ছিল ১ কোটি ২৩ লাখ ৩৩ হাজার, আর সম্ভাব্য চাহিদা ১ কোটি ১ লাখ ৬ হাজার ৩৩৪টি। এর মধ্যে গরু-মহিষ ৫৬ লাখ ৯৫ হাজার ৮৭৮টি, ছাগল-ভেড়া ৬৬ লাখ ৩২ হাজার ৩০৭টি এবং অন্যান্য প্রজাতির প্রাণী ৫ হাজার ৬৫৫টি। মন্ত্রণালয় জানায়, সারা দেশে ৩ হাজার ৬৭৮টি হাট বসবে এবং সেখানে ভেটেরিনারি সেবার দল থাকবে। ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের ২৭টি হাটে প্রাথমিক চিকিৎসার জন্য ২০টি ভেটেরিনারি মেডিকেল দল ও ২টি বিশেষজ্ঞ মেডিকেল দল রাখার কথাও জানানো হয়।

সুস্থ পশুর লক্ষণ
অধ্যাপক মিনারা খাতুনের পরামর্শ ছিল, পশু কেনার সময় প্রথমেই তার আচরণ ও শারীরিক অবস্থা ভালোভাবে দেখতে হবে। সুস্থ পশু কান ও লেজ নাড়ায়, তার চোখ উজ্জ্বল ও পরিষ্কার থাকে, নাক সামান্য ভেজা থাকে। লোম ও চামড়া মসৃণ থাকে, শরীরে ঘা, চুলকানি, ক্ষত বা পোকা থাকে না, নাক ও চোখ দিয়ে কোনো তরল বের হয় না। সুস্থ পশু স্বাভাবিকভাবে হাঁটে এবং খাবারে আগ্রহ দেখায়।
গরু, মহিষ, ছাগল ও ভেড়ার ক্ষেত্রে জাবর কাটা সুস্থতার বড় লক্ষণ। নিয়মিত জাবর কাটলে বোঝা যায় হজম স্বাভাবিক আছে; অসুস্থ পশু কম জাবর কাটে, বেশি অসুস্থ হলে একেবারেই কাটে না। তাই তিনি তাড়াহুড়ো না করে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে পশুর আচরণ দেখার পরামর্শ দেন। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) মাংস পরিদর্শন নির্দেশিকাতেও জবাইয়ের আগে পশুকে দুই পাশ থেকে, দাঁড়ানো ও চলন্ত অবস্থায় দেখার কথা বলা হয়েছে। সেখানে অস্বাভাবিক শ্বাসপ্রশ্বাস, অস্বাভাবিক চলন বা দাঁড়ানোর ভঙ্গি, শরীরে ফোলা, ফাঁপা পেট, নাক দিয়ে স্রাব ও মুখ দিয়ে অতিরিক্ত লালা পড়াকে অসুস্থতার লক্ষণ হিসেবে ধরা হয়েছে।

কৃত্রিমভাবে মোটাতাজা পশু শনাক্তের উপায়
অধ্যাপক মিনারা খাতুন জানান, ঈদ এলেই বাড়তি লাভের আশায় কিছু অসাধু ব্যবসায়ী ও খামারি পশু মোটাতাজা করতে স্টেরয়েড বা হরমোনজাতীয় ওষুধ ব্যবহার করেন। তাঁর মতে, এমন পশুর শরীর সাধারণত অস্বাভাবিকভাবে ফোলা থাকে, হাঁটাচলায় দুর্বলতা বা হাঁপানো দেখা যায়, চামড়া অতিরিক্ত টানটান ও অস্বাভাবিক চকচকে দেখায়, পেট ফোলা থাকলেও মাংসপেশি স্বাভাবিকভাবে গঠিত হয় না। শরীরে ইনজেকশনের দাগও কৃত্রিমভাবে মোটাতাজা করার ইঙ্গিত হতে পারে। সম্ভব হলে হাটে একজন পশু চিকিৎসক বা অভিজ্ঞ পশুপালনকারীকে সঙ্গে নেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি; সন্দেহ হলে উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা বা হাটের ভেটেরিনারি দলের সাহায্য নেওয়া যায়।
বাংলাদেশে মৎস্যখাদ্য ও পশুখাদ্য আইন, ২০১০ অনুযায়ী পশুখাদ্যে অ্যান্টিবায়োটিক, গ্রোথ হরমোন, স্টেরয়েড বা অন্য ক্ষতিকর রাসায়নিক মেশানো নিষিদ্ধ; ঢাকা ট্রিবিউনের ২০১৯ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী এর সর্বোচ্চ শাস্তি এক বছরের কারাদণ্ড বা ৫০ হাজার টাকা জরিমানা অথবা দুটোই। ২০২৬ সালের ৩ মে সংবাদ সম্মেলনে মন্ত্রণালয় জানায়, গরু মোটাতাজাকরণের ইনজেকশন বা কোনো স্টেরয়েড আমদানির অনুমতি প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর দেয় না এবং অবৈধ ওষুধ ধ্বংসে অভিযান চালানো হবে।
হাটে পশুর যত্ন
অধ্যাপক মিনারা খাতুন সতর্ক করেন, হাটে দীর্ঘ সময় দাঁড় করিয়ে রাখলে পশু ক্লান্ত ও দুর্বল হয়ে পড়ে, পায়ে ব্যথা, শ্বাসকষ্ট ও খাবারে অনীহা দেখা দিতে পারে, আর অতিরিক্ত চাপে মাংসের মানও কমে যেতে পারে। এফএওর ছোট রোমন্থক প্রাণী জবাইয়ের নির্দেশিকাতেও বলা হয়েছে, জবাইয়ের আগে বিশ্রাম জরুরি, কারণ ক্লান্ত বা অতিরিক্ত খাটানো পশু থেকে নিম্নমানের মাংস পাওয়া যায়, এবং বিশ্রামের পুরো সময় পশুকে পরিষ্কার পানি দেওয়া যায়।
হাটে কোনো পশু হঠাৎ অসুস্থ হলে তাকে দ্রুত ভিড় ও রোদ থেকে সরিয়ে শান্ত জায়গায় রাখা, পরিষ্কার পানি দেওয়া এবং জ্বর, শ্বাসকষ্ট বা আঘাত আছে কি না খেয়াল করার পরামর্শ দেন তিনি। এরপর যত দ্রুত সম্ভব পশু চিকিৎসকের সাহায্য নিতে হবে; কোনো ওষুধ নিজে থেকে না দিয়ে হাটের ভেটেরিনারি দল বা উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরের পরামর্শ নেওয়াই নিরাপদ।

ছবি: Wasiul Bahar / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সংবাদ সম্মেলন (জাগো নিউজ ২৪ ও বণিক বার্তা), জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও), ঢাকা ট্রিবিউন, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়




মন্তব্য
(০)