২০২৬ সালের ২২ জুন, সোমবার, ঢাকার ফার্মগেটে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের (বিএআরসি) মিলনায়তনে 'ইলিশ সম্পদ উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা (দ্বিতীয় সংশোধিত)' প্রকল্পের সমাপনী কর্মশালা হয়। প্রধান অতিথির বক্তব্যে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ বলেন, ইলিশ সম্পদ সংরক্ষণ, উৎপাদন বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক বাজার সম্প্রসারণে দীর্ঘমেয়াদি, টেকসই ও বিজ্ঞানভিত্তিক পরিকল্পনা নিতে হবে। তাঁর মতে, ইলিশকে কেবল দেশের চাহিদা মেটানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে রপ্তানিযোগ্য সম্পদ হিসেবে গড়ে তুলতে হবে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানির সক্ষমতা আরও বাড়াতে হবে।
বিএআরসি ১৯৭৩ সালে প্রতিষ্ঠিত সরকারি সংস্থা, যা দেশের জাতীয় কৃষি গবেষণা ব্যবস্থার দায়িত্বে রয়েছে। কর্মশালায় সভাপতিত্ব করেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের অধীন মৎস্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. মো. খালেদ কনক।

নদী, জাল ও জেলেদের নিয়ে মন্ত্রীর বক্তব্য
মন্ত্রী বলেন, ইলিশের নিরাপদ চলাচল ও প্রজননের জন্য নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ এবং পানির গুণগত মান নিশ্চিত করতে হবে। শিল্পবর্জ্য ও বিষাক্ত পদার্থ নদীতে ফেলা বন্ধ করতে সংশ্লিষ্ট সব মন্ত্রণালয় ও সংস্থাকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।
তিনি জানান, জাটকা নিধন, মা ইলিশ ধরা ও কারেন্ট জালের ব্যবহার বন্ধে সরকার কঠোর অবস্থানে রয়েছে। অবৈধ জাল বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে, কারণ এসব জাল ইলিশসহ দেশের নানা দেশীয় মাছের জন্য বড় হুমকি।
মন্ত্রীর ভাষ্য, অধিকাংশ জেলে দাদনের (আগাম ঋণ) ওপর নির্ভর করে জীবন চালান। তাই তাঁদের বিকল্প কর্মসংস্থান, প্রশিক্ষণ ও আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী করতে সরকার বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে, আর ভবিষ্যতেও নতুন উদ্যোগ নিতে হবে। তিনি আরও জানান, গবেষক, বিশেষজ্ঞ ও মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের নিয়ে ইলিশ সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনায় একটি বিশেষ উপদেষ্টা দল গঠনের বিষয়টি সরকার গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করছে; তাঁদের পরামর্শের ভিত্তিতে ভবিষ্যৎ নীতি ও কর্মপরিকল্পনা তৈরি হবে।

প্রতিমন্ত্রী: গবেষণা আর জেলেদের সহায়তা
বিশেষ অতিথি মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু বলেন, বাংলাদেশের খাদ্যতালিকায় ইলিশের অবস্থান সবার ওপরে। তাঁর হিসাবে বিশ্বের মোট ইলিশের প্রায় ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ বাংলাদেশে উৎপাদিত হয়, তাই প্রতিবেশী দেশসহ বিভিন্ন দেশের বাংলাদেশের ইলিশে বিশেষ আগ্রহ রয়েছে। ইলিশকে জাতীয় সম্পদ হিসেবে সংরক্ষণ ও টেকসই ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য রক্ষা করতে হবে বলে মত দেন তিনি।
গবেষণার ওপর জোর দিয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, জ্ঞান, উদ্ভাবন ও গবেষণায় বেশি বিনিয়োগ করতে হবে; ইলিশ সংরক্ষণ, উৎপাদন বৃদ্ধি ও টেকসই ব্যবস্থাপনায় গবেষণার বিকল্প নেই। তিনি জানান, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জেলেদের প্রায় ২৪ কোটি টাকার সহায়তা দেওয়া হয়েছে এবং এই সহায়তা বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। নিষেধাজ্ঞার সময় জেলেদের বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরিতেও সরকার কাজ করছে। মাঠপর্যায়ে অভিযানের পাশাপাশি জেলেদের সচেতনতা বাড়ানো জরুরি, কারণ মানুষের অংশগ্রহণ ছাড়া টেকসই সাফল্য সম্ভব নয়, বলেন তিনি।
কর্মশালায় সম্মানিত অতিথি ছিলেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. দেলোয়ার হোসেন এবং বিএআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. মো. আবদুছ ছালাম। স্বাগত বক্তব্য দেন প্রকল্প পরিচালক মোল্লা এমদাদুল্যাহ। মন্ত্রণালয় ও মৎস্য অধিদপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, গবেষক, বিশেষজ্ঞ ও মৎস্যজীবীরাও উপস্থিত ছিলেন।
ইলিশ খাতের প্রেক্ষাপট
ইলিশ (বৈজ্ঞানিক নাম Tenualosa ilisha) বাংলাদেশের জাতীয় মাছ। ২০১৭ সালের ৬ আগস্ট শিল্প মন্ত্রণালয়ের পেটেন্ট, শিল্প-নকশা ও ট্রেডমার্কস অধিদপ্তর ইলিশকে বাংলাদেশের ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্য ঘোষণা করে। মাছটি ডিম ছাড়তে সাগর থেকে নদীর উজানে যায়; দেশে মূলত মেঘনা, যমুনা ও বঙ্গোপসাগরসংলগ্ন মোহনায় এটি ধরা পড়ে।
২০২৬ সালের ৬ এপ্রিল মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশে ইলিশ উৎপাদন ৫ লাখ মেট্রিক টনে পৌঁছায়। দেশের মোট মাছ উৎপাদনে ইলিশের অবদান প্রায় ৯ দশমিক ৭৯ শতাংশ, আর জিডিপিতে প্রায় ১ শতাংশ। সে সময় মন্ত্রণালয়ের হিসাবে বিশ্বের ৮০ শতাংশের বেশি ইলিশ আসে বাংলাদেশের নদী, মোহনা ও সাগর থেকে। প্রায় ৬ লাখ মানুষ সরাসরি ইলিশ আহরণে যুক্ত, আর পরিবহন, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও রপ্তানির মতো কাজে যুক্ত আরও ২০ থেকে ২৫ লাখ মানুষ।
ইলিশ রক্ষায় সরকারের প্রধান ব্যবস্থাগুলো ছিল এমন:
- প্রতিবছর ১ নভেম্বর থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত জাটকা ধরা, পরিবহন ও বিক্রি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ
- প্রজনন মৌসুমে ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা, যাতে মা ইলিশ নিরাপদে ডিম ছাড়তে পারে
- বঙ্গোপসাগরে সব ধরনের মাছ ধরায় নিষেধাজ্ঞা; ২০২৬ সালে তা ছিল ১৫ এপ্রিল থেকে ১১ জুন পর্যন্ত ৫৮ দিন
- ৩ হাজার ১৮৮ বর্গকিলোমিটার সামুদ্রিক সংরক্ষিত এলাকা

ছবি: Fahad Faisal / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, ইউএনবি, ঢাকা ট্রিবিউন, উইকিপিডিয়া (ইলিশ, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল, মৎস্য অধিদপ্তর)





মন্তব্য
(০)