২০২৫ সালের মে মাসের প্রথম সপ্তাহে ময়মনসিংহ জেলায় বোরো ধান কাটার মৌসুমে কৃষকেরা অভিযোগ করেন, কম্বাইন হারভেস্টারের মালিকেরা সরকার নির্ধারিত হারের প্রায় দ্বিগুণ ভাড়া চাইছেন। জাগো নিউজ ২৪ ৮ মে প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানায়, একদিকে যন্ত্র মিলছে না, অন্যদিকে শ্রমিক সংকট; ফলে অনেক কৃষক স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে নিজেরাই ধান কাটছেন।
ময়মনসিংহ সদর উপজেলার চর ঈশ্বরদিয়া ইউনিয়নের আলালপুর গ্রামের হাবিবুর রহমান ও নুরুন্নাহার দম্পতি তেমনই একটি পরিবার। হাবিবুরের নিজের জমি মাত্র ৩০ শতক; চাষাবাদের পাশাপাশি দিনমজুরি করে সংসার চালান। তাঁরা জানান, হারভেস্টার মালিকের কাছে গেলে বাড়তি টাকা চাওয়া হচ্ছে, আর সেই টাকা দিতে রাজি হলেও লম্বা সিরিয়ালে অপেক্ষা করতে হচ্ছে। দু-একজন শ্রমিক পাওয়া গেলেও তাঁরা দিনে হাজার টাকার কমে কাজ করতে রাজি নন। তাই রোদে পুড়ে নিজেরাই ধান কেটে বাড়িতে এনে মাড়াই করছেন এই দম্পতি।

নির্ধারিত হার ৫৪০ টাকা, দ্বিগুণ আদায়ের অভিযোগ
কম্বাইন হারভেস্টার এমন একটি যন্ত্র, যা ধান বা অন্য শস্য কাটা, মাড়াই ও ঝাড়াইয়ের আলাদা কাজগুলো একসঙ্গে করে।
কৃষকেরা জানান, এ বছর কীটনাশক, সার ও শ্রমিকের মজুরি বেশি দিয়ে ধান চাষ করতে হয়েছে, তাই খরচও বেড়েছে। বেশির ভাগ জমির বোরো ধান পেকে গেছে; হঠাৎ ঝড়বৃষ্টি হলে বড় ক্ষতির আশঙ্কা থাকায় দ্রুত ধান কাটা জরুরি হয়ে পড়েছে। কৃষকদের অভিযোগ, এ অবস্থায় প্রতি ১০ শতক জমির ধান কাটতে হারভেস্টার মালিকেরা ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা চাইছেন এবং এর কম দিতে চাইলে ধান কেটে দিচ্ছেন না।
আলালপুরের কৃষক হাবিবুর রহমান জাগো নিউজকে বলেন, 'জমির সব ধান পেকে গেছে। প্রতি ১০ শতক ধান কাটতে হারভেস্টার মেশিন মালিকরা ১০০০-১২০০ টাকা চাচ্ছেন। তাদের নির্ধারিত ওই টাকা দিতে রাজি হলেও সিরিয়াল পাওয়া যাচ্ছে না।'
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (ডিএই) ময়মনসিংহের উপপরিচালক ড. নাছরিন আক্তার বানু জাগো নিউজকে জানান, প্রতি ১০ শতক জমির ধান কাটার জন্য হারভেস্টার মালিকেরা ৫৪০ টাকার বেশি নিতে পারবেন না। সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে প্রতিবেদনে বলা হয়, এক একর (১০০ শতক) জমির ধান কাটার সর্বোচ্চ ভাড়া ৫ হাজার ৪০০ টাকা। উপপরিচালক বলেন, অতিরিক্ত টাকা আদায় করে কৃষকদের হয়রানির প্রমাণ মিললে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। প্রতিবেদনে অভিযোগের বিষয়ে হারভেস্টার মালিকদের কোনো বক্তব্য ছিল না।

জেলায় বোরো আবাদ ও হারভেস্টারের হিসাব
বোরো বাংলাদেশের শুকনো মৌসুমের ধান। এর রোপণ শুরু হয় কার্তিক-অগ্রহায়ণে (অক্টোবর-নভেম্বর), কাটা চলে এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত; এ সময় বৃষ্টি কম থাকায় এই ধান অনেকটাই সেচের ওপর নির্ভরশীল।
স্থানীয় কৃষি অফিসের হিসাবে, আগের বছর ময়মনসিংহে ২ লাখ ৬৩ হাজার ৪৮৫ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়েছিল। ২০২৫ সালে লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২ লাখ ৬৩ হাজার ৭৩০ হেক্টর, আবাদ হয় ২ লাখ ৬৩ হাজার ৭৫২ হেক্টরে। প্রতিবেদন প্রকাশের সময় পর্যন্ত ৩৮ শতাংশ জমির ধান কাটা হয়েছিল। জেলায় হারভেস্টার ছিল ২৯৪টি, যার প্রায় ৩০টি নষ্ট। শুধু ময়মনসিংহ সদরে ১৬টি হারভেস্টার ছিল, সবগুলোই সচল।
ময়মনসিংহ জেলা ময়মনসিংহ বিভাগের অন্তর্গত; আয়তন ৪ হাজার ৩৬৩.৪৮ বর্গকিলোমিটার, উপজেলা ১৩টি। পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদ জেলা শহরের পাশ দিয়ে বয়ে গেছে।

ধান বিক্রিতে মণে বাড়তি ধান নেওয়ার অভিযোগ
কৃষকদের আরেকটি অভিযোগ ধান ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে। তাঁদের ভাষ্য, ব্যবসায়ীরা ন্যায্য দাম দিচ্ছেন না, উল্টো প্রতি মণে ২ থেকে ৩ কেজি ধান বেশি রেখে দিচ্ছেন। বাংলাদেশে এক মণ সমান ৪০ কেজি। চর ঈশ্বরদিয়া ইউনিয়নের খালপাড় এলাকার কৃষক আলমগীর হোসেন বলেন, ধান শুকনা হলেও এক মণের জন্য তিন কেজি ধান বেশি নেওয়া হচ্ছে, আর বাড়তি ধান না দিলে ব্যবসায়ীরা কেনেন না।
ময়মনসিংহ মহানগরীর শম্ভুগঞ্জ ধান ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি আব্দুল মান্নান বলেন, 'ব্যবসায়ীরা কৃষকদের বাধ্য করে বাড়তি ধান নিচ্ছেন। আমি মনে করি, কৃষকদের সঙ্গে এসব ব্যবসায়ীরা জুলুম করছেন। বাজারের সব ব্যবসায়ীদের বাড়তি ধান নিতে নিষেধ করা হয়েছে। কিন্তু তারা আমার কথা মানছেন না। কৃষকদের স্বার্থে ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান চালানো প্রয়োজন।'
ডিএইর উপপরিচালক বলেন, ব্যবসায়ীরা ধান বেশি রাখছেন কি না, তা তাঁর জানা নেই; বিষয়টি জেলা প্রশাসন বা জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের নজরে আনা হবে। ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের ময়মনসিংহ বিভাগের উপপরিচালক রিনা বেগম বলেন, বাড়তি ধান নিয়ে কৃষকদের ঠকানো যাবে না। তবে সে সময় তাঁদের কাছে ধান পরিমাপের যন্ত্র ছিল না; বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জানানো হবে এবং যন্ত্র পেলে বাজারে অভিযান চালানো হবে বলে তিনি জানান।
ছবি: Balaram Mahalder / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, উইকিপিডিয়া (ময়মনসিংহ জেলা, কম্বাইন হারভেস্টার, মণ, বোরো ধান)





মন্তব্য
(০)