সরাসরিবাজারদর
আটা (প্যাকেটজাত)৫৮—আদা - আমদানিকৃত১৬৭—আদা - দেশী১৫৪—আমন চাল - মাঝারি৫৬—আমন চাল - মোটা৪৮—আমন চাল - সরু৭২—আয়োডিনযুক্ত লবণ (প্যাকেটজাত)৩২—কাঁচা মরিচ২১৮—খামারের মুরগী১৬২—খাসী৯০০—চিনি (দেশী)১৩২—ছোলা - গোটা৮৫—ডিম ফার্ম - লাল৪৭—পেঁয়াজ - দেশী৬০—বোরো চাল - মাঝারি৫৫—বোরো চাল - মোটা৪৭—বোরো চাল - সরু৬৬—মাংসঃ– গরু৭২৯—মুগ ডাল১২২—রসুন - আমদানিকৃত১৯২—রসুন - দেশী১৭৩—সয়াবিন তেল১৬৩—
হালনাগাদ ১৬ অক্টোবর ২০২৬
ঢাকা২৬°পরিষ্কার আকাশআর্দ্রতা ৭৪%বাতাস ৩ কিমি/ঘ

চুয়াডাঙ্গায় কেরুর প্রেসমাড থেকে তৈরি জৈব সার ‘সোনার দানা’ জনপ্রিয়

দর্শনায় কেরু অ্যান্ড কোম্পানির চিনিকলের প্রেসমাড থেকে তৈরি জৈব সার ‘সোনার দানা’ কৃষকদের মধ্যে জনপ্রিয় হয়েছে বলে ২০২৬ সালের মার্চে জাগো নিউজ জানায়। প্রতিষ্ঠানের হিসাবে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ১,৬৩০ টন সার উৎপাদিত হয়; কৃষকেরা বলছেন, এতে তাঁদের ফলন বেড়েছে।

চুয়াডাঙ্গায় কেরুর প্রেসমাড থেকে তৈরি জৈব সার ‘সোনার দানা’ জনপ্রিয়
এগ্রোবিজ

চুয়াডাঙ্গার দর্শনায় রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান কেরু অ্যান্ড কোম্পানি (বাংলাদেশ) লিমিটেডের উৎপাদিত জৈব সার ‘সোনার দানা’ ২০২৬ সালের মার্চের মধ্যে কৃষকদের মধ্যে জনপ্রিয়তা পেয়েছিল বলে ১৬ মার্চ ২০২৬ তারিখে জাগো নিউজ জানায়। কৃষকেরা পত্রিকাটিকে বলেন, এই সার ব্যবহার শুরুর পর তাঁদের ধান, আখ, পেঁপে, বিভিন্ন সবজি, পান ও ফুলের ফলন বেড়েছে; আর প্রতিষ্ঠানটি জানায়, এর চাহিদা দিন দিন বাড়ছে। সারটি তৈরি হয় প্রেসমাড থেকে, অর্থাৎ কেরুর চিনিকলে আখের রস পরিষ্কার করার সময় যে কাদা বা গাদ জমে থাকে, তা দিয়ে।

প্রতিষ্ঠান সূত্রে জানা যায়, ২০১২ সালে দর্শনার চিনিকলে ‘সোনার দানা’ উৎপাদন শুরু হয়। কর্মকর্তারা জানান, উৎপাদন ও বিক্রি দুটোই বেড়েছে, পণ্যটি দর্শনার গণ্ডি পেরিয়ে অন্য জেলার কৃষকদের কাছেও পৌঁছেছে এবং প্রতিষ্ঠানটি উৎপাদন আরও বাড়াতে চায়। ফলন বৃদ্ধির দাবিগুলো প্রতিষ্ঠান ও পত্রিকার সঙ্গে কথা বলা কৃষকদের; প্রতিবেদনে পণ্যটির কোনো মাঠ-পরীক্ষার ফল উল্লেখ করা হয়নি।

২০২৬ সালের মার্চে চিনিকল ও কৃষকেরা যা বলেছিলেন


কেরু চিনিকলের উৎপাদন ও প্ল্যান্ট ম্যানেজার জাকির হোসেন জাগো নিউজকে জানান, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে চিনিকলে মোট ১,৬৩০ মেট্রিক টন জৈব সার উৎপাদিত হয় এবং তা থেকে প্রায় ৭৮ লাখ টাকা লাভ হয়। তিনি বলেন, তখন প্রতি মাসে গড়ে ১৩৬ মেট্রিক টন হারে সার উৎপাদন হচ্ছিল, আর লক্ষ্য হলো চাহিদা অনুযায়ী উৎপাদন বাড়ানো এবং কৃষকদের সুবিধা নিশ্চিত করা।

প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) রাব্বিক হাসান বলেন, ‘সোনার দানা ব্যবহার করে ধান, আখ, পেঁপে, বিভিন্ন সবজি এবং ফুলের উৎপাদন বৃদ্ধি পাচ্ছে। ধীরে ধীরে এই জৈব সার দর্শনার সীমা পেরিয়ে দেশের বিভিন্ন জেলার কৃষকের মধ্যেও জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। আমরা চাহিদা অনুযায়ী উৎপাদন বৃদ্ধি করে রাসায়নিক সারের ওপর নির্ভরতা কমাতে চাই। পাশাপাশি, এ উদ্যোগ এলাকার বেকার সমস্যা কমাতেও সাহায্য করবে।’

স্থানীয় কৃষক মো. হাবিবুর রহমান বলেন, ‘সোনার দানা ব্যবহার করলে ধান ও সবজির ফলন আগের চেয়ে অনেক বেশি হচ্ছে। এটি আমাদের আয়ের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলছে।’ প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে এ ধরনের জৈব সার টেকসই কৃষি এবং রাসায়নিক সারের ব্যবহার কমানোর ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। প্রতিবেদনে পণ্যটির দাম বা বিঘাপ্রতি কতটা প্রয়োগ করতে হয়, তা উল্লেখ ছিল না; মাত্রার জন্য কৃষকদের সরকারি সার সুপারিশ মেনে চলা এবং উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার পরামর্শ নেওয়া উচিত।

যেভাবে শুরু হয় জৈব সার কারখানা


রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা বাসসের যে প্রতিবেদন দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড ২০২০ সালের ৫ এপ্রিল প্রকাশ করে, তাতে বলা হয়, দর্শনার জৈব সার কারখানাটি ২০১২ সালে স্থাপন করে বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশন (বিএসএফআইসি), যে সংস্থা দেশের রাষ্ট্রায়ত্ত চিনিকলগুলো পরিচালনা করে। সে সময় শিল্প মন্ত্রণালয় কেরুকে বড় পরিসরে ‘সোনার দানা’ উৎপাদনের নির্দেশ দেয়, যাতে কৃষকেরা কম দামে মানসম্পন্ন জৈব সার পান। কেরুর তখনকার ব্যবস্থাপনা পরিচালক জাহিদ আলী আনসারী বলেছিলেন, বাজারের নিম্নমানের জৈব সারের কারণে কৃষকেরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন, আর ‘সোনার দানা’ ফসলের উৎপাদনশীলতা ও মান দুটোই বাড়াবে বলে আশা করা হচ্ছে। একই দিনে জাগো নিউজও ‘হ্যান্ড স্যানিটাইজারের পর জৈব সার আনছে কেরু’ শিরোনামে পরিকল্পনাটির খবর দেয়।

২০২৫ সালের অক্টোবরে কেরুর ২০২৪-২৫ অর্থবছরের ফলাফল নিয়ে দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড লেখে, সে বছর প্রতিষ্ঠানটির খামার, জৈব সার ও ওষুধ ইউনিট সবগুলোই ইতিহাসের সর্বোচ্চ মুনাফা করেছে, যদিও সার ইউনিটের আলাদা অঙ্ক দেওয়া হয়নি। একই প্রতিবেদন অনুযায়ী, চিনি ইউনিটের ৬২ কোটি টাকা লোকসান সমন্বয়ের পর ওই বছর প্রতিষ্ঠানের সমন্বিত নিট মুনাফা ছিল ১২৮ কোটি টাকা, আগের বছরের চেয়ে ৫২ শতাংশ বেশি; চিনি ইউনিটের পুঞ্জীভূত লোকসান তখন ৯৩১ কোটি টাকা ছাড়িয়েছিল। মুনাফার বড় অংশ আসে ডিস্টিলারি থেকে।

দর্শনায় কেরু অ্যান্ড কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেডের ডিস্টিলারি। ছবি: Masum-al-hasan / উইকিমিডিয়া কমন্স (সিসি বাই-এসএ ৪.০)
দর্শনায় কেরু অ্যান্ড কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেডের ডিস্টিলারি। ছবি: Masum-al-hasan / উইকিমিডিয়া কমন্স (সিসি বাই-এসএ ৪.০)

কেরু অ্যান্ড কোম্পানি: দর্শনার চিনিকল, ডিস্টিলারি ও খামার


কেরু অ্যান্ড কোং (বাংলাদেশ) লিমিটেড চুয়াডাঙ্গার দামুড়হুদার কাছে অবস্থিত একটি শিল্প কমপ্লেক্স। জেলার জন্য সরকারের পর্যটন পোর্টাল একে চিনিকল, ডিস্টিলারি, বাণিজ্যিক খামার ও জৈব সার কারখানা নিয়ে গঠিত প্রতিষ্ঠান হিসেবে বর্ণনা করেছে, যার আয়তন ৩,৫৭২ একর; এর মধ্যে ২,৪৫০ একর কৃষিজমি। প্রধান পণ্য আখ থেকে তৈরি চিনি; উপজাত পণ্যের মধ্যে আছে মদ, ভিনেগার, স্পিরিট ও জৈব সার।

দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস ২০১০ সালের জুনে জানায়, ১৯৩৪ সালে ব্রিটিশ উদ্যোক্তা রবার্ট রাসেল কেরুকে দর্শনায় কারখানা স্থাপনের দায়িত্ব দেওয়া হয় এবং ১৯৩৮ সালে বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু হয়। দ্য ডেইলি স্টার ২০২২ সালের এপ্রিলে লেখে, কেরু ১৯৩৮ সালে চিনিশিল্প, ডিস্টিলারি ও বাণিজ্যিক খামারের সমন্বিত প্রতিষ্ঠান হিসেবে যাত্রা শুরু করে, স্বাধীনতার পর জাতীয়করণ হয়ে বিএসএফআইসির অধীনে চলছে, এবং এতে সরাসরি ১,২০০ জন ও পরোক্ষভাবে প্রায় ১৫,০০০ মানুষের কর্মসংস্থান হয়। এটি দেশের একমাত্র রাষ্ট্রায়ত্ত ডিস্টিলারি।

ডেইলি স্টারের একই প্রতিবেদনে চিনিকলের নিজস্ব আখখামারের বিবরণ ছিল: খামার এলাকা ৩,৩৩৫.৫৬ একর, যার ৩,০৫৫.৮৪ একরে বাণিজ্যিক চাষ হয়; আর দশটি কৃষি ও পরীক্ষামূলক খামারে সেই মৌসুমে কেরু ৯৮৯ একরে আখ চাষ করেছিল। ওই মাড়াই মৌসুমে চিনিকল ৫১ দিন চলে, ২০২২ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি শেষ হয়, এবং গড়ে ৫.৬২ শতাংশ আহরণ হারে ৩,০২৩ টন চিনি উৎপাদন করে। জেলায় আখের আবাদ ২০২০-২১ সালের ৮,৫৩২ একর থেকে কমে ৪,৬২৭ একরে নেমেছিল, আর চিনিকল ফটকে আখের দাম ছিল প্রতি মণ (৩৭ কেজি) ১৪০ টাকা।

কেরু অ্যান্ড কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেডের প্যাকেটজাত চিনি। ছবি: Masum-al-hasan / উইকিমিডিয়া কমন্স (সিসি বাই-এসএ ৪.০)
কেরু অ্যান্ড কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেডের প্যাকেটজাত চিনি। ছবি: Masum-al-hasan / উইকিমিডিয়া কমন্স (সিসি বাই-এসএ ৪.০)

প্রেসমাড কী: চিনিকলের গাদ থেকে সার


প্রেসমাড, যাকে ফিল্টার কেকও বলা হয়, চিনি তৈরির একটি উপজাত। ২০১৬ সালের জুনে ইন্টারন্যাশনাল জার্নাল অব রিসাইক্লিং অব অর্গানিক ওয়েস্ট ইন অ্যাগ্রিকালচারে প্রকাশিত এম. এল. দোতানিয়া ও সহকর্মীদের এক পর্যালোচনায় একে নরম, স্পঞ্জের মতো, গাঢ় বাদামি রঙের পদার্থ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। আখের রস পরিশোধনের সময় পরিষ্কার রস ওপরে আলাদা হয়ে যায় এবং কাদা নিচে জমে; সেটিই প্রেসমাড। সাধারণভাবে ১০০ টন আখ মাড়াই করলে প্রায় ৩ টন প্রেসমাড পাওয়া যায়। তাজা প্রেসমাডে ৫০ থেকে ৭০ শতাংশ আর্দ্রতা থাকে, আর চিনিকলের আশপাশে তা জমতে থাকলে মজুত ও দূষণের সমস্যা তৈরি করে।

পর্যালোচনাটি বলছে, প্রেসমাডে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে লোহা, ম্যাঙ্গানিজ, ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেশিয়াম, সিলিকন ও ফসফরাস থাকে; এক গবেষণায় এর জৈব কার্বন প্রায় ২১ শতাংশ পাওয়া গেছে। আখের জাত, মাটি এবং চিনিকলের প্রক্রিয়াভেদে এর গঠন বদলায়। এতে চিনি থাকায় মাটিতে এটি দ্রুত পচে, আর কম্পোস্ট তৈরির কাঁচামাল হিসেবে এর ব্যাপক ব্যবহার আছে। পর্যালোচনায় সংকলিত গবেষণাগুলো দেখিয়েছে, প্রেসমাড মাটির ভৌত অবস্থা উন্নত করতে পারে, মাটির ক্যাটায়ন বিনিময় ক্ষমতা (গাছের পুষ্টি ধরে রাখার সামর্থ্য) বাড়াতে পারে এবং পাঁচ থেকে ছয় বছর নিয়মিত প্রয়োগে মাটিতে জৈব কার্বন জমায় ও সালফার যোগ করে। লেখকেরা উল্লেখ করেছেন, ভারত ও পাকিস্তানে জমিতে প্রেসমাড প্রয়োগ সাধারণ কৃষিচর্চায় পরিণত হয়েছে, আর এটি রাসায়নিক সারের পুরোপুরি বিকল্প হিসেবে নয়, বরং তার সঙ্গে মিলিয়ে ব্যবহার করা যায়।

আখ নিজেও মাটি থেকে প্রচুর পুষ্টি টেনে নেয়। একই পর্যালোচনায় বাংলাদেশি গবেষক বোখতিয়ার ও সহকর্মীদের (২০০১) গবেষণা উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, এক হেক্টর জমির ১০০ টন আখ মাটি থেকে প্রায় ১৪০ কেজি নাইট্রোজেন, ৩৪ কেজি ফসফরাস ও ৩৩২ কেজি পটাশিয়াম তুলে নেয়। চিনিকলের নিজস্ব উপজাত আবার জমিতে ফিরিয়ে দেওয়ার প্রতি আগ্রহের এটি একটি কারণ।

পর্যালোচনায় অন্তর্ভুক্ত বৃহত্তম চিনি উৎপাদনকারী দেশ ভারতে বছরে ৮০ লাখ টনের বেশি প্রেসমাড, প্রায় ৭৫ লাখ টন চিটাগুড় (মোলাসেস) এবং ৪ কোটি ৩৮ লাখ টন ব্যাগাস (আখের ছোবড়া) উৎপন্ন হয় বলে হিসাব দেওয়া হয়েছে। পর্যালোচনা অনুযায়ী, ভারত সরকার চিটাগুড়ের সমস্যা সামলাতে চিনিকলগুলোকে ডিস্টিলারি স্থাপনে উৎসাহ দেয়, আর প্রেসমাডকে কম্পোস্ট তৈরির দিকে নেওয়া হয়। চিটাগুড় থেকে অ্যালকোহল তৈরির পর যে স্পেন্টওয়াশ থাকে, পরিশোধনের পর তা পটাশিয়ামে সমৃদ্ধ এবং প্রেসমাডের সঙ্গে মিশিয়ে কম্পোস্ট করে সমন্বিত পুষ্টি ব্যবস্থাপনার জন্য পুষ্টিসমৃদ্ধ জৈব পণ্য তৈরি করা যায় বলেও এতে বলা হয়েছে। দর্শনায় কেরুর কমপ্লেক্সে ঠিক এই দুটি ইউনিট, চিনিকল ও চিটাগুড়ভিত্তিক ডিস্টিলারি, একই জায়গায় রয়েছে।

বাংলাদেশের মাটিতে জৈব পদার্থ কেন জরুরি


পচা উদ্ভিদ ও প্রাণীর অবশেষ থেকে মাটির যে অংশ তৈরি হয়, সেটিই জৈব পদার্থ। এটি পানি ও পুষ্টি ধরে রাখে এবং মাটির অণুজীবের খাদ্য জোগায়। ২০১৫ সালে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) গ্লোবাল সয়েল পার্টনারশিপে দেওয়া এক উপস্থাপনায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এস. এম. ইমামুল হক এবং মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের (এসআরডিআই) মো. নাজমুল হাসান মাটির জৈব পদার্থ কমে যাওয়াকে বাংলাদেশে অধিক ফসল উৎপাদনের পথে বড় বাধা বলে উল্লেখ করেন। তাঁদের হিসাবে, ৭ লাখ ৬০ হাজার হেক্টর জমিতে জৈব পদার্থ ১ শতাংশের নিচে এবং ২৮ লাখ ৭০ হাজার হেক্টর জমিতে ১ থেকে ১.৭ শতাংশের মধ্যে।

এর কারণ হিসেবে তাঁরা উল্লেখ করেন ফসলের নিবিড়তা বৃদ্ধি, গরম ও আর্দ্র আবহাওয়ায় জৈব পদার্থের দ্রুত পচন, কম পরিমাণে জৈব সার ব্যবহার, ফসলের অবশিষ্টাংশ প্রায় একেবারেই জমিতে ফেরত না দেওয়া এবং সবুজ সারের ব্যবহার খুব কম বা না থাকা। ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে দ্য ডেইলি স্টার এসআরডিআইয়ের ‘বাংলাদেশের মাটি ও জৈব কৃষি’ শীর্ষক এক সমীক্ষার খবর দেয়, যাতে দেখা যায় দেশের ৮৭ লাখ ৫২ হাজার হেক্টর কৃষিজমির প্রায় ৬১.৬ শতাংশে জৈব পদার্থ ১.৭৪ শতাংশের নিচে। প্রতিবেদনে বলা হয়, উর্বর মাটিতে প্রায় ৪৫ শতাংশ খনিজ, ২৫ শতাংশ পানি, ২৫ শতাংশ বাতাস এবং ৫ শতাংশ জৈব পদার্থ থাকে।

২০২২ সালের জুলাইয়ে প্লস ওয়ান সাময়িকীতে প্রকাশিত এম. এস. ইসলাম ও সহকর্মীদের এক গবেষণা, যা বাংলাদেশের খামার জরিপের ভিত্তিতে করা, দেখায় যে গবেষণা এলাকার ৮০ শতাংশ পর্যন্ত কৃষক অত্যন্ত ভারসাম্যহীনভাবে পুষ্টি প্রয়োগ করছিলেন, ১০ শতাংশেরও কম কৃষক মাটি পরীক্ষা করাতেন এবং ছোট খামারগুলো সরকারি সার সুপারিশ নির্দেশিকার (ফার্টিলাইজার রেকমেন্ডেশন গাইড) পরামর্শের চেয়ে অনেক কম জৈব সার দিতেন। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল প্রতি পাঁচ বছর পরপর এই নির্দেশিকা প্রকাশ করে। গবেষকেরা স্থানীয় বাজারে পর্যাপ্ত জৈব সারের জোগান নিশ্চিত করতে কর্মসূচি নেওয়ার আহ্বান জানান।

রাসায়নিক সারের ওপর দেশের নির্ভরতা কতটা, তা-ও একই গবেষণায় উঠে আসে। এতে বলা হয়, সরকার সারে ভর্তুকি বাবদ ৮২ কোটি ৩৫ লাখ মার্কিন ডলার ব্যয় করেছে, এবং দাম কমানোর পর ২০১৮-১৯ অর্থবছরে আগের বছরগুলোর তুলনায় ডিএপি ও এমওপি (মিউরিয়েট অব পটাশ) সারের ব্যবহার যথাক্রমে ১২০ শতাংশ ও ৩৯ শতাংশ বেড়েছে। চুয়াডাঙ্গাতেই ২০২২ সালের এপ্রিলে দ্য ডেইলি স্টার জানায়, কেরু চিনিকলে আখের সরবরাহ কমার প্রধান কারণ ছিল সারের ঘাটতি, আর আখচাষিরা সার, কীটনাশক বা সেচের জন্য কোনো ঋণ পাননি।

গুদামে রাখা প্যাকেটজাত জৈব সারের বস্তা, ২০১১ সালের মে মাসে কেনিয়ার নাকুরুতে তোলা; প্রসঙ্গ বোঝাতে দেওয়া হলো। ছবি: SuSanA Secretariat / উইকিমিডিয়া কমন্স (সিসি বাই ২.০)
গুদামে রাখা প্যাকেটজাত জৈব সারের বস্তা, ২০১১ সালের মে মাসে কেনিয়ার নাকুরুতে তোলা; প্রসঙ্গ বোঝাতে দেওয়া হলো। ছবি: SuSanA Secretariat / উইকিমিডিয়া কমন্স (সিসি বাই ২.০)

জৈব সার বিক্রির আইনি নিয়ম


বাংলাদেশে রাসায়নিক, জৈব বা জীবাণু, যেকোনো সার বিক্রির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য সার (ব্যবস্থাপনা) আইন, ২০০৬ (২০০৬ সালের ৬ নম্বর আইন), যা সর্বশেষ ২০১৮ সালে সংশোধিত হয়। আইনের ৮ ধারা অনুযায়ী নিবন্ধন কর্তৃপক্ষের নিবন্ধন ছাড়া কেউ কোনো ধরনের সার উৎপাদন, আমদানি, মজুত, বিতরণ, বাজারজাত, পরিবহন বা বিক্রি করতে পারবেন না। ৪ ধারায় জাতীয় সার মান নির্ধারণ কমিটি গঠনের কথা আছে, যা সরকারকে পরামর্শ দেয় এবং জৈব সারের মানদণ্ড সুপারিশ করে। আইনে লেবেল ও প্যাকেজিংয়ের শর্ত, পরিদর্শক নিয়োগ, পুষ্টি উপাদানে ঘাটতিযুক্ত সার বিক্রির শাস্তি এবং ভুল লেবেলযুক্ত বা ভেজাল সার বিক্রির নিষেধাজ্ঞাও রয়েছে।

মান নিয়ে উদ্বেগ বাস্তব। ২০১৯ সালের মে মাসে প্রথম আলোর এক সম্পাদকীয়তে বলা হয়, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের পাঠানো বহুল ব্যবহৃত জৈব সারের ৪৫টি নমুনা পরীক্ষা করে এসআরডিআই ৩৯টিতেই ভেজাল পায়। ২০২০ সালে কেরুর ব্যবস্থাপনা পরিচালকও একই কথা বলেছিলেন যে নিম্নমানের জৈব সারে কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন, আর ‘সোনার দানা’ সম্প্রসারণে মন্ত্রণালয়ের নির্দেশকে নির্ভরযোগ্য পণ্য সরবরাহের উপায় হিসেবে তুলে ধরা হয়েছিল।

আখ ও রাষ্ট্রায়ত্ত চিনিকল


বাংলায় বহু শতাব্দী ধরে আখ চাষ হয়ে আসছে। বাংলাপিডিয়া জানায়, ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান সৃষ্টির সময় পূর্ব পাকিস্তান হাতে গোনা কয়েকটি চিনিকল পায়, যার একটি তখনকার কুষ্টিয়া জেলার দর্শনায়; সবগুলোর মোট মাড়াই ক্ষমতা ছিল মাত্র ৪,৩৫০ টন। ২০১২ সালে দেশে বিএসএফআইসির অধীনে দর্শনাসহ ১৫টি চিনিকল ছিল। বাংলাপিডিয়ার তথ্যমতে, উৎপাদিত আখের প্রায় ৬০ শতাংশ চিনিকলে যায় এবং বাকিটা যায় গুড় উৎপাদনকারীদের কাছে; আখ কাটার মৌসুম অক্টোবর থেকে মার্চ। ঈশ্বরদীর ইক্ষু গবেষণা ও প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট, বর্তমানে বাংলাদেশ সুগারক্রপ গবেষণা ইনস্টিটিউট, প্রায় ৩০টি জাত উদ্ভাবন করেছে, যা চিনিকল এলাকার প্রায় ৯৫ শতাংশ আখের জমিতে চাষ হয়।

চিনিকলগুলো কেন আখ পায় না, বাংলাপিডিয়ায় তারও ব্যাখ্যা আছে। ২০১১-১২ মাড়াই মৌসুমে প্রায় ১ লাখ ৬৯ হাজার একর জমিতে আখ চাষ হয় এবং উৎপাদন হয় প্রায় ৪০ লাখ টন। চিবিয়ে খাওয়া ও বীজের জন্য রাখা আখ বাদ দিলে প্রায় ৩০ লাখ টন চিনিকলে যাওয়ার কথা, কিন্তু সাধারণত উৎপাদিত আখের অর্ধেকেরও কম চিনিকলে পৌঁছায়। এর প্রধান কারণ বাজারে গুড়ের চড়া দাম এবং চিনিকলে আখ সরবরাহের পর দাম পেতে জটিলতা। বাংলাপিডিয়ার হিসাবে বাংলাদেশে একরপ্রতি আখের গড় ফলন মাত্র প্রায় ১৫ টন এবং আখ থেকে চিনি আহরণের হার ৭.৪ শতাংশ, যা বিশ্বে সর্বনিম্নগুলোর একটি।

রাষ্ট্রায়ত্ত চিনিকলগুলো দীর্ঘদিন ধরে লোকসানে চলছে। ২০১০ সালের জুনে দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস জানায়, বিএসএফআইসির ১৫টি চিনিকলের মধ্যে ডিস্টিলারির কল্যাণে একমাত্র কেরুই মুনাফা করে। লোকসান কমাতে সরকার ২০২০ সালের ১ ডিসেম্বর ছয়টি চিনিকলে, কুষ্টিয়া, পাবনা, পঞ্চগড়, শ্যামপুর, রংপুর ও সেতাবগঞ্জে, মাড়াই স্থগিত করে এবং ওই এলাকার কৃষকদের আখ কিনে বাকি নয়টি চিনিকলে মাড়াইয়ের জন্য ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখে বলে ২০২০ সালের ২১ ডিসেম্বর দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস জানায়। ২০২২ সালের এপ্রিলে কেরুর কর্মকর্তারা ডেইলি স্টারকে বলেন, এসব চিনিকল বন্ধের কারণে কৃষকেরা আখ চাষে আগ্রহ হারাচ্ছেন। দর্শনার চিনিকলে মাড়াই হওয়া প্রতিটি টন আখই ‘সোনার দানা’র কাঁচামাল প্রেসমাডের উৎস।

বাংলাদেশ সুগারক্রপ গবেষণা ইনস্টিটিউটে আখের খেত। ছবি: Plague / উইকিমিডিয়া কমন্স (সিসি বাই-এসএ ৪.০)
বাংলাদেশ সুগারক্রপ গবেষণা ইনস্টিটিউটে আখের খেত। ছবি: Plague / উইকিমিডিয়া কমন্স (সিসি বাই-এসএ ৪.০)

দামুড়হুদা ও চুয়াডাঙ্গা: চিনিকল ঘিরে কৃষি এলাকা


দর্শনা চুয়াডাঙ্গা জেলার দামুড়হুদা উপজেলার একটি পৌরসভা, যার সীমান্তের ওপারে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের নদিয়া জেলা। বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী দামুড়হুদার আয়তন ৩১১.৯১ বর্গকিলোমিটার, প্রধান নদী চিত্রা, ভৈরব ও মাথাভাঙ্গা, আর ৬৪.৫৩ শতাংশ পরিবারের প্রধান আয়ের উৎস কৃষি। এখানকার প্রধান ফসল আখ, ধান, গম, ডাল, আলু, যব, ভুট্টা, পাট, ছোলা, পান ও পেঁয়াজ; প্রধান ফল আম, কাঁঠাল, আনারস, পেঁপে ও কলা। প্রধান রপ্তানি পণ্যের তালিকায় আছে পান, কলা, আম, চিনি ও পেঁয়াজ। অর্থাৎ কৃষকেরা যেসব ফসলের কথা বলেছেন, ধান, আখ, পেঁপে, সবজি ও পান, সেগুলো এই এলাকারই প্রধান ফসল।

বাংলাপিডিয়ার তথ্যমতে দামুড়হুদার ৫৯.৮১ শতাংশ পরিবার জমির মালিক এবং ৪০.১৯ শতাংশ ভূমিহীন। এই এলাকায় কৃষক আন্দোলনের দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে: নীল প্রতিরোধ আন্দোলন ও কৃষক আন্দোলন এখানে ব্যাপকভাবে ছড়িয়েছিল, ১৮৬৯ ও ১৮৭৩ সালের খাজনা বন্ধ আন্দোলনে এখানকার কৃষকেরা অংশ নেন, আর ১৯২০ সালের এপ্রিলে বাংলার প্রথম কৃষক সম্মেলন এই উপজেলাতেই অনুষ্ঠিত হয়।

খুলনা বিভাগের চুয়াডাঙ্গা জেলার আয়তন ১,১৭৪.১০ বর্গকিলোমিটার; ১৯৮৪ সালে এটি জেলায় উন্নীত হয়। জেলার চারটি উপজেলা আলমডাঙ্গা, চুয়াডাঙ্গা সদর, জীবননগর ও দামুড়হুদা, আর নদী মাথাভাঙ্গা, ভৈরব, চিত্রা, নবগঙ্গা ও কুমার। ২০১১ সালের আদমশুমারিতে জেলার জনসংখ্যা ছিল ১১,২৯,০১৫, এবং বাংলাপিডিয়ার তথ্যমতে ৬৫.১৪ শতাংশ মানুষের প্রধান আয়ের উৎস কৃষি।

ছবি: Masum-al-hasan / উইকিমিডিয়া কমন্স (সিসি বাই-এসএ ৪.০)

সূত্র: জাগো নিউজ, দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড (বাসস), দ্য ডেইলি স্টার, দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস, ইন্টারন্যাশনাল জার্নাল অব রিসাইক্লিং অব অর্গানিক ওয়েস্ট ইন অ্যাগ্রিকালচার (দোতানিয়া ও অন্যান্য, ২০১৬), এফএও গ্লোবাল সয়েল পার্টনারশিপ (হক ও হাসান, ২০১৫), প্লস ওয়ান (ইসলাম ও অন্যান্য, ২০২২), প্রথম আলো, সার (ব্যবস্থাপনা) আইন, ২০০৬ (ইনফরমিয়া), বাংলাপিডিয়া, বাংলাদেশ সরকারের পর্যটন পোর্টাল

অনলাইন ডেস্কদা এগ্রো নিউজ

এগ্রোবিজ

সম্পর্কিত খবর

ফসল

ইংল্যান্ডে যবের ফলন ১৪ বছরে সর্বনিম্ন, গম সামান্য বেশি

যুক্তরাজ্যের কৃষি মন্ত্রণালয় ডেফরার প্রাথমিক হিসাবে ইংল্যান্ডে যব উৎপাদন ১১ শতাংশ কমে ৩৭ লাখ টন হয়েছে, গম ০ দশমিক ৮ শতাংশ বেড়ে ১ কোটি ৮ লাখ টন; গমের তুলনায় পশুখাদ্যের যব বিক্রি হচ্ছে অনেক কম দামে।

Farmers Weekly১৬ অক্টোবর ২০২৬২ মিনিটের পড়া
এগ্রোটেক

নিজস্ব কারখানা ছেড়ে চুক্তিভিত্তিক ও যৌথ কারখানায় ঝুঁকছে উদ্ভিজ্জ মাংস

চাহিদা অনিশ্চিত থাকায় উদ্ভিজ্জ মাংসের ব্র্যান্ডগুলো নিজস্ব কারখানার বদলে চুক্তিভিত্তিক উৎপাদন, যৌথ অবকাঠামো ও মাংস প্রক্রিয়াকরণের পুরোনো যন্ত্রপাতির দিকে ঝুঁকছে বলে জানিয়েছেন শিল্পসংশ্লিষ্টরা।

FoodNavigator১৬ অক্টোবর ২০২৬২ মিনিটের পড়া
এগ্রোবিজ

সারের দাম দেখার প্ল্যাটফর্ম ক্লিয়ারকস্টে বিনিয়োগ, সালফার সংকটে কমছে ফসফরাস

কৃষকদের সারের দাম ও চালান দেখার এবং সরবরাহ চুক্তির সুযোগ দেওয়া কানাডার স্টার্টআপ ক্লিয়ারকস্ট সিরিজ এ তহবিল পেয়েছে; ২০২৭ সালের শুরুতে উত্তর আমেরিকাজুড়ে নতুন প্ল্যাটফর্ম চালু করবে তারা।

AgNavigator১৬ অক্টোবর ২০২৬১ মিনিটের পড়া

মন্তব্য

(০)