২০২৬ সালের ২৭ জুন, শনিবার সকালে রাজধানীর বাড্ডায় জাগো নিউজ কার্যালয়ে ‘ফল প্রক্রিয়াজাতকরণ: সমস্যা ও সম্ভাবনা’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে বছরব্যাপী ফল উৎপাদন প্রকল্পের সাবেক প্রকল্প পরিচালক ও ফল বিশেষজ্ঞ ড. মো. মেহেদী মাসুদ বলেন, দেশে ফল প্রক্রিয়াজাতকরণ এগিয়ে নিতে হলে সংরক্ষণ সুবিধা, প্রযুক্তি ও বছরব্যাপী উৎপাদনে জোর দিতে হবে। বৈঠকটি সঞ্চালনা করেন জাগো নিউজের সম্পাদক কে. এম. জিয়াউল হক।
চার মাসেই আসে ৬৫ শতাংশ ফল
ড. মেহেদী মাসুদ জানান, দেশে বছরে প্রায় ১ কোটি ৫২ লাখ মেট্রিক টন ফল উৎপাদন হয়, কিন্তু এর ৬৫ শতাংশই আসে মাত্র চার মাসে। ফলে বছরের বাকি সময়ে দেশি ফলের সংকট দেখা দেয়। তাঁর মতে, মৌসুমনির্ভর এই উৎপাদন ব্যবস্থার কারণেই ফল সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও রপ্তানিতে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি হচ্ছে।
২০২২ সালের ডিসেম্বরে দ্য ডেইলি স্টার এক প্রতিবেদনে লেখে, দেশে উৎপাদিত ফলের সরবরাহ কম থাকায় সেপ্টেম্বর থেকে জানুয়ারি পর্যন্ত বাজারে আমদানি করা ফলের বিক্রিই বেশি থাকে। একই বছরের সেপ্টেম্বরে দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড জানায়, প্রথাগতভাবে দেশের আমের বাজার চলে জুলাই পর্যন্ত; চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও রাজশাহীর মিষ্টি জাতের আমের মৌসুম ফুরোলে আগস্টে বাজারে পাওয়া যায় আশ্বিনা আম।
ক্ষতির অঙ্ক প্রতিবেদনের চেয়ে অনেক বেশি
ড. মেহেদী বলেন, একটি প্রতিবেদনে বছরে প্রায় দুই হাজার কোটি টাকার ফল নষ্ট হওয়ার কথা বলা হলেও বাস্তবে ক্ষতি আরও অনেক বেশি। তাঁর হিসাবে, প্রায় ৫০ লাখ মেট্রিক টন ফল নষ্ট হলে এবং প্রতি কেজির গড় দাম ৫০ টাকা ধরলে ক্ষতি দাঁড়ায় কমপক্ষে ২৫ হাজার কোটি টাকা; গড় দাম ১০০ টাকা ধরলে তা প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছায়।
তিনি মনে করেন, নতুন করে আরও ফলের বাগান করার চেয়ে প্রতিবছর নষ্ট হওয়া বিপুল পরিমাণ ফল সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাত করার উদ্যোগ নিলেই দেশের অর্থনীতিতে বড় পরিবর্তন আনা সম্ভব। ‘এজন্য ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের (এসএমই) ফল প্রক্রিয়াজাত শিল্পে এগিয়ে আসতে হবে এবং সরকারকে প্রয়োজনীয় সহায়তা দিতে হবে,’ বলেন তিনি।
উদ্যোক্তাদের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে তিনি কোল্ড স্টোরেজের অভাবের কথা উল্লেখ করেন। অনেক উদ্যোক্তা রপ্তানির আগে ফল রাখার পর্যাপ্ত সুবিধা পান না। সরকারিভাবে আধুনিক সংরক্ষণ সুবিধা নিশ্চিত করা গেলে উদ্যোক্তারা আরও বেশি ফল সংরক্ষণ ও রপ্তানি করতে পারবেন বলে তাঁর মত।
অফ সিজনে আম, লিচুর পরে রামবুটান ও লংগান
গত এক যুগ ধরে বছরব্যাপী ফল উৎপাদনের বিভিন্ন প্রকল্পে কাজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে ড. মেহেদী বলেন, প্রযুক্তি ও সঠিক ব্যবস্থাপনায় অফ সিজনেও অনেক ফল উৎপাদন সম্ভব। উদাহরণ হিসেবে তিনি কাটিমন আমের কথা বলেন, যা এখন সারা বছর উৎপাদন হচ্ছে। মৌসুমে যে আমের দাম কেজিপ্রতি ১০০ টাকা, অফ সিজনে সেটিই বিক্রি হয় ৫০০ টাকায়; এতে কৃষকের আয় কয়েক গুণ বেড়ে যায়। দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড ২০২২ সালেই লিখেছিল, কিছু বাগান বারি আম-১১ ও কাটিমন নিয়ে পরীক্ষা করছে, যেগুলো সারা বছর ফল দেয়; বারি আম-১১ বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বারি) অবমুক্ত করা একমাত্র বারোমাসি আম।

লিচুর উৎপাদনকাল বাড়ানোর উদ্যোগের কথাও তুলে ধরেন তিনি। তাঁর ভাষ্য, লিচুর মৌসুম শেষ হওয়ার পর একই গোত্রের রামবুটান ও লংগানের চাষ দেশে শুরু হয়েছে এবং বিভিন্ন অঞ্চলে এসব ফলের বাণিজ্যিক উৎপাদন লিচুজাতীয় ফলের সরবরাহ কয়েক মাস বাড়িয়েছে। লিচু, রামবুটান ও লংগান তিনটিই স্যাপিনডেসি বা সোপবেরি পরিবারের ফল।

কাঁঠালে সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা
ড. মেহেদীর মতে, দেশে বছরব্যাপী উৎপাদনের সবচেয়ে বেশি সম্ভাবনা কাঁঠালে। ভিয়েতনামের বারোমাসি জাতের কাঁঠাল দেশে সম্প্রসারণ করা গেলে সারা বছর কাঁঠাল রপ্তানি সম্ভব হবে। আন্তর্জাতিক বাজারে কাঁচা কাঁঠালেরও ব্যাপক চাহিদা আছে জানিয়ে তিনি বলেন, নিউইয়র্কের সুপারমার্কেটে বাংলাদেশি টাকায় প্রায় দেড় হাজার টাকা কেজি দরে কাঁচা কাঁঠাল বিক্রি হতে দেখা গেছে।
কাঁঠাল (Artocarpus heterophyllus) মোরাসি পরিবারের ফল এবং বাংলাদেশের জাতীয় ফল। দেশে কাঁচা কাঁঠাল ‘এঁচোড়’ নামে সবজি হিসেবে খাওয়া হয়, আর বিদেশে কাঁচা কাঁঠালের টিনজাত পণ্য মাংসের বিকল্প হিসেবে বাজারজাত হয়।

বৈঠকে আরও আলোচনা করেন ইউনিভার্সিটি অব গ্লোবাল ভিলেজের সাবেক উপাচার্য ও কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম খান, বারির পোস্ট হারভেস্ট টেকনোলজি বিভাগের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. গোলাম ফেরদৌস চৌধুরী, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের রপ্তানিযোগ্য আম উৎপাদন প্রকল্পের পরিচালক মোহাম্মদ আরিফুর রহমান, বিএসটিআইয়ের উপপরিচালক (খাদ্য ও কৃষি) এনামুল হক, প্রাণ গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইলিয়াছ মৃধা, হাসেম ফুডস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আবুল হাসেম, বাংলাদেশ অ্যাগ্রো-প্রসেসরস অ্যাসোসিয়েশনের (বাপা) সাবেক সাধারণ সম্পাদক মো. ইকতাদুল হক, ক্যাবের ভাইস প্রেসিডেন্ট এস এম নাজের হোসাইন, কাজু অ্যান্ড কফি অ্যাগ্রোর নির্বাহী পরিচালক মো. মাহাতাব আলী এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জের কৃষি উদ্যোক্তা ইসমাইল খান শামীম ও নওগাঁর কৃষি উদ্যোক্তা সোহেল রানা।
ছবি: Hasan Iqbal / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY 3.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, দ্য ডেইলি স্টার, দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, উইকিপিডিয়া





মন্তব্য
(০)