সরাসরিবাজারদর
আটা (প্যাকেটজাত)৫৮—আদা - আমদানিকৃত১৬৭—আদা - দেশী১৫৪—আমন চাল - মাঝারি৫৬—আমন চাল - মোটা৪৮—আমন চাল - সরু৭২—আয়োডিনযুক্ত লবণ (প্যাকেটজাত)৩২—কাঁচা মরিচ২১৮—খামারের মুরগী১৬২—খাসী৯০০—চিনি (দেশী)১৩২—ছোলা - গোটা৮৫—ডিম ফার্ম - লাল৪৭—পেঁয়াজ - দেশী৬০—বোরো চাল - মাঝারি৫৫—বোরো চাল - মোটা৪৭—বোরো চাল - সরু৬৬—মাংসঃ– গরু৭২৯—মুগ ডাল১২২—রসুন - আমদানিকৃত১৯২—রসুন - দেশী১৭৩—সয়াবিন তেল১৬৩—
হালনাগাদ ১৬ অক্টোবর ২০২৬
ঢাকা২৮°পরিষ্কার আকাশআর্দ্রতা ৬২%বাতাস ৫ কিমি/ঘ

ছাদবাগান থেকে শুরু, চাঁদপুরে এখন ৮৫ জাতের আঙুরের বাণিজ্যিক বাগান

চাঁদপুর সদর উপজেলার তরুণ উদ্যোক্তা কামরুজ্জামান প্রধানিয়া করোনার সময়ে ছাদে শখের বশে আঙুর চাষ শুরু করেন। ২০২৬ সালের এপ্রিলে তাঁর তিনটি বাগানে, তাঁর ভাষায়, ১৮টি দেশের প্রায় ৮৫ জাতের আঙুরগাছ ছিল।

ছাদবাগান থেকে শুরু, চাঁদপুরে এখন ৮৫ জাতের আঙুরের বাণিজ্যিক বাগান
ছাদকৃষি

২০২৬ সালের এপ্রিলে চাঁদপুরের তরুণ উদ্যোক্তা কামরুজ্জামান প্রধানিয়া এমন এক আঙুরবাগান থেকে ফল তুলছিলেন, যার শুরু হয়েছিল বাড়ির ছাদে, শখের বশে। তাঁর বাগান 'প্রধানিয়া এগ্রো' চাঁদপুর সদর উপজেলার চাঁদপুর-মতলব পেন্নাই সড়কের কালিভাংতি এলাকায়। ১৮ এপ্রিল ২০২৬ জাগো নিউজ যখন তাঁর গল্প প্রকাশ করে, তখন বাঁশের মাচার ওপর সারি সারি লতায় থোকায় থোকায় ঝুলছিল সবুজ আঙুর। তিনি জানান, তাঁর সংগ্রহে তখন বিশ্বের ১৮টি দেশের প্রায় ৮৫ জাতের আঙুরগাছ। প্রতিদিন চাঁদপুর ও আশপাশের জেলা থেকে মানুষ বাগান দেখতে আসছিলেন; কেউ শখে, কেউ শিখতে, কেউবা নিজের বাগান গড়ার স্বপ্ন নিয়ে।

চাঁদপুরের মাটিতে আঙুর চাষ একসময় কল্পনার মতো মনে হতো। দেশের আবহাওয়ায় এই ফল সফল হবে কি না, তা নিয়েই ছিল প্রশ্ন। কামরুজ্জামান বলেন, অনেকেই তাঁকে বলেছিলেন, বাংলাদেশে আঙুর হবে না, এটা শুধু বিদেশেই সম্ভব। তবে এসব কথাকে তিনি থেমে যাওয়ার কারণ না বানিয়ে এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণা হিসেবে নিয়েছেন।

ছাদের শখ থেকে তিনটি বাগান


শুরুর কথা বলতে গিয়ে কামরুজ্জামান বলেন, "করোনার সময় অবসরে শখের বশে আঙুর চাষ শুরু করি। প্রথমে ছাদবাগান দিয়ে শুরু করি। দেখলাম ছাদবাগানে ভালো হচ্ছে, তাহলে মাঠে কেন আঙুর চাষ করব না। পরে ২০২৪ সালে প্রথম বাগান করি। পরে ২০২৫ সালে আরও দুটি জমি নিয়ে বাণিজ্যিকভাবে আঙুর চাষ শুরু করি।"

তিনি যে করোনাকালের কথা বলছেন, বাংলাদেশে তার শুরু ২০২০ সালের ৮ মার্চ, যেদিন প্রথম তিনজন করোনা রোগী শনাক্তের খবর নিশ্চিত হয়। ২০২০ সালের ২৬ মার্চ দেশজুড়ে 'সাধারণ ছুটি' শুরু হয়, কয়েক দফা বাড়িয়ে তা আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ হয় ৩০ মে। এরপর ২০২১ সালের ৫ এপ্রিল সরকার আবার দেশব্যাপী লকডাউনের ঘোষণা দেয়, আর ২০২১ সালের ১ জুলাই শুরু হয় আরেকটি লকডাউন।

মাঠে তাঁর প্রথম চাষ ছিল পরীক্ষামূলক, মাত্র ২০ শতক জমিতে। শতক বা শতাংশ বাংলাদেশ ও ভারতে প্রচলিত জমির একক; এক শতক এক একরের একশ ভাগের এক ভাগ, প্রায় ৪০.৪৭ বর্গমিটার। শুরুতে আবহাওয়া, মাটি, পরিচর্যা সবকিছুই ছিল চ্যালেঞ্জ। জাগো নিউজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ধৈর্য, পরিশ্রম আর নিয়মিত পরীক্ষা-নিরীক্ষার মধ্য দিয়ে ধীরে ধীরে তিনি সাফল্যের মুখ দেখেন। বিদেশ থেকে আনা উন্নত জাতের চারা নিজের জমিতে মানিয়ে নেওয়ার কাজটাও ছিল কঠিন, কিন্তু তিনি হাল ছাড়েননি।

ছোট সেই উদ্যোগ ধীরে ধীরে বড় হয়েছে। ২০২৬ সালের এপ্রিলে প্রথম বাগানের পাশাপাশি আরও দুটি প্রকল্পে আঙুর চাষ চলছিল। তাঁর বর্ণনায়, সংগ্রহে ছিল ১৮টি দেশের প্রায় ৮৫ জাতের আঙুরগাছ, যা দেশে একজন চাষির জন্য ব্যতিক্রমী সংগ্রহ।

বাগান আর তার জেলা


প্রধানিয়া এগ্রোতে ঢুকলেই চোখে পড়ে বিদেশের আঙুরবাগানের মতো দৃশ্য: বাঁশের কাঠামোয় তোলা লম্বা সারির লতা, পাতার নিচে ঝুলছে সবুজ থোকা। বাগানটি চাঁদপুর সদর উপজেলায়, চাঁদপুর শহরের সঙ্গে মতলবের যোগাযোগের সড়কের পাশে।

চাঁদপুর সদর জেলার সদর উপজেলা। এর আয়তন ৩০৮.৭৭ বর্গকিলোমিটার; উপজেলাটি চাঁদপুর পৌরসভা ও ১৪টি ইউনিয়ন পরিষদে বিভক্ত, মৌজা ১০৭টি, গ্রাম ১১২টি। ২০২২ সালের জনশুমারিতে এখানে ৫ লাখ ৩৪ হাজার ৫৯৯ জন মানুষ গণনা করা হয়, ২০১১ সালে যা ছিল ৪ লাখ ৬৫ হাজার ৯১৯। মতলব উত্তর ও মতলব দক্ষিণ উপজেলার আয়তন যথাক্রমে ২৬০.২৯ ও ১২৯.৩২ বর্গকিলোমিটার।

চট্টগ্রাম বিভাগের চাঁদপুর জেলার আয়তন ১,৬৪৫.৩২ বর্গকিলোমিটার; এখানে আটটি উপজেলা, ৮৭টি ইউনিয়ন ও ১,২৩০টি গ্রাম। প্রধান নদী মেঘনা, ডাকাতিয়া, গোমতী ও ধনাগোদা; মেঘনা জেলার পশ্চিম সীমানার একাংশ গড়েছে। পদ্মা, মেঘনা ও ডাকাতিয়ার মিলনস্থলে শহরটির অবস্থান, আর জেলার বেশির ভাগ মেঘনার পলিতে গড়া সমতল ভূমি। ১৮৭৮ সালে ত্রিপুরা জেলার অধীনে চাঁদপুর মহকুমা গঠিত হয়, ১৯৮৪ সালে এটি জেলায় উন্নীত হয়। ২০২২ সালের জনশুমারিতে জেলার জনসংখ্যা ২৬ লাখ ৩৫ হাজার ৭৪৮।

চাঁদপুরের পরিচিতি মূলত মাছে। জেলাটি 'ইলিশের বাড়ি' নামে পরিচিত; দেশে ইলিশের সবচেয়ে বড় কেন্দ্র এটি, আর এর বন্দর ইলিশ বিতরণের প্রধান জায়গা। তবে পরিবারের জীবিকায় কৃষি এখনো কেন্দ্রীয়: বাংলাপিডিয়ার জেলা পরিচিতিতে ৪৪.৪২ শতাংশ পরিবারের আয়ের প্রধান উৎস কৃষি, ব্যবসা ১৬.১৭ শতাংশ আর চাকরি ১৩.২৪ শতাংশ। নদী আর ইলিশের জন্য পরিচিত এই জেলায় আঙুরবাগান তাই স্থানীয় মানুষের কাছে নতুন কিছু।

চাঁদপুর বড় স্টেশনের নদীতীর, পদ্মা, মেঘনা ও ডাকাতিয়ার মিলনস্থলের কাছে। ছবি: DelwarHossain / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
চাঁদপুর বড় স্টেশনের নদীতীর, পদ্মা, মেঘনা ও ডাকাতিয়ার মিলনস্থলের কাছে। ছবি: DelwarHossain / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)

ফলন, দাম আর চারা


ভালো ফলন হওয়ায় কামরুজ্জামান বাজারজাত শুরু করেছেন। প্রতিবেদন অনুযায়ী, তাঁর আঙুর স্থানীয় চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি দেশের অন্য প্রান্তেও যাচ্ছিল। নিচের সব হিসাব তাঁর নিজের দেওয়া, আর ২০২৬ মৌসুমের অংশটুকু তাঁর অনুমান।

তিনি জানান, ২০২৫ সালে প্রথম প্রকল্প থেকে ৭০ থেকে ৮০ কেজি আঙুর বিক্রি হয়েছিল। ২০২৬ সালে ফলন খুব ভালো হওয়ায় ওই বাগান থেকে বাণিজ্যিকভাবে প্রায় ৪০০ কেজি বিক্রির সম্ভাবনা দেখছিলেন তিনি, আর বাকি দুটি বাগান থেকে আরও ২০০ থেকে ৩০০ কেজি। তাঁর ভাষায়, "সব মিলিয়ে এই বছর ২০ মণের মতো আঙুর বাজারজাত করতে পারব।" বাংলাদেশে এক মণ ৪০ কেজি।

"গত বছর গাছ থেকে ৪০০ টাকা কেজি বিক্রি করেছি, এই বছরও তাই করব। আমরা এই বছর ২-৩ লাখ টাকার আঙুর বিক্রি করতে পারব," বলেন কামরুজ্জামান।

ব্যবসার দ্বিতীয় অংশ চারা। কামরুজ্জামান বলেন, অনেকেই তাঁর কাছ থেকে চারা নিয়ে আঙুর চাষ শুরু করেছেন। "আমরা চাই আঙুর চাষ দেশব্যাপী ছড়িয়ে দিতে। আমরা বাগান থেকে চারা তৈরি করি, আর সেই চারা দেশের বিভিন্ন জায়গায় বিক্রি করে থাকি," বলেন তিনি।

তাঁর পরিকল্পনা, প্রতিবছর প্রকল্প বাড়ানো, আঙুরের পাশাপাশি অন্যান্য ফল নিয়ে কাজ শুরু করা, আর সবচেয়ে বড় লক্ষ্য বাণিজ্যিক বাগানের সংখ্যা আরও বাড়ানো।

বেকার তরুণদের উদ্দেশেও তাঁর কথা ছিল। নতুন উদ্যোক্তারা তাঁর কাছ থেকে চারা নিয়ে শখে কিংবা বাণিজ্যিকভাবে চাষ শুরু করতে পারেন জানিয়ে তিনি বলেন, "বেকার না থেকে আপনারা কিছু হলেও করেন। প্রয়োজন হলে আমার কাছ থেকে পরামর্শ নিয়ে আঙুর চাষাবাদ শুরু করতে পারেন। আধুনিক চাষাবাদে সবার নজর দেওয়া উচিত।"

পোকা, বৃষ্টি আর পলিথিনের ছাউনি


কামরুজ্জামান সতর্ক করেন, নতুন করে যাঁরা আঙুর নিয়ে কাজ করতে চান, তাঁদের আগে আঙুরের রোগ আর ফলনের নিয়ম জানতে হবে। তাঁর অভিজ্ঞতায় মিষ্টি জাতের আঙুরের পাতায় পোকার আক্রমণ বেশি হয়, তাই নিয়মিত পরিচর্যা আর পোকার ওষুধ দিলে গাছ কিছুটা নিরাপদ থাকে। প্রতিবেদনে কোনো ওষুধের নাম বা মাত্রা নেই; কোন ওষুধ কতটা দিতে হবে, তা উপজেলা কৃষি অফিস থেকে জেনে নেওয়াই নিয়ম।

তাঁর মতে, সবচেয়ে বড় সমস্যা আবহাওয়া। প্রাকৃতিক দুর্যোগে ফলন ক্ষতিগ্রস্ত হয়; অতিবৃষ্টিতে চারা পচে যায় কিংবা আঙুর নষ্ট হয়। এ থেকে রক্ষা পেতে পলিথিনের ছাউনি ব্যবহার করতে হবে বলে জানান তিনি।

বৃষ্টি এত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ বৃষ্টিই রোগ ছড়ায়। উষ্ণ ও আর্দ্র গ্রীষ্মে আঙুরগাছের সবচেয়ে ক্ষতিকর রোগ ডাউনি মিলডিউ, যার কারণ প্লাজমোপারা ভিটিকোলা (Plasmopara viticola) নামের এক জলজ ছত্রাকসদৃশ জীব, প্রকৃত ছত্রাক নয়। ১৮৩৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে রোগটি প্রথম শনাক্ত হয়, পরে তা ইউরোপে ছড়ায়। শুরুতে পাতায় হলুদ, তেলতেলে দাগ দেখা দেয়; উষ্ণ ও আর্দ্র রাতের পর পাতার নিচে সাদা তুলার মতো আস্তরণ পড়ে, ডগা, ফল ও থোকার বোঁটাও আক্রান্ত হতে পারে। বৃষ্টির ছিটায় জীবাণুর রেণু গাছের ওপরে ওঠে। প্রথম সংক্রমণের জন্য উদ্ভিদরোগবিদেরা '১০:১০:২৪' নামের একটি মোটা দাগের নিয়ম ব্যবহার করেন: ২৪ ঘণ্টায় অন্তত ১০ মিলিমিটার বৃষ্টি বা সেচ, সঙ্গে ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তার বেশি তাপমাত্রা।

রোগ ঠেকাতে চাষিরা উঁচু ও পানি নিষ্কাশনের ভালো ব্যবস্থার জায়গা বেছে নেন, যন্ত্রপাতি ও জুতা পরিষ্কার রাখেন যাতে আক্রান্ত অংশ এক জমি থেকে আরেক জমিতে না যায়, আর ডালপালা পাতলা করে দেন যাতে বাতাস চলে ও পাতা শুকায়। রাসায়নিক দমনের ইতিহাসও পুরোনো: ১৮৮২ সালে ফরাসি বিজ্ঞানী পিয়ের-মারি-আলেক্সিস মিলার্দে দেখেন, তুঁতে (কপার সালফেট) ও চুনের মিশ্রণ ছিটানো গাছ রোগমুক্ত থাকছে; ১৮৮৫ সালে তিনি তা প্রকাশ করেন, যা বোর্দো মিশ্রণ নামে পরিচিত হয়। কপার এখনো ব্যবহৃত হয়, তবে মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহারে মাটি ও ভূগর্ভস্থ পানির জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি হতে পারে। আরেকটি রোগ পাউডারি মিলডিউ, যার কারণ এরিসিফি নেকাটর (Erysiphe necator); এটি গাছের যেকোনো সবুজ অংশে সংক্রমণ ঘটাতে পারে।

গাছ ঢেকে রাখার প্রয়োজনের কথা দেশের অন্য চাষিদের ক্ষেত্রেও এসেছিল। ২০২৫ সালের মে মাসে ময়মনসিংহের ভালুকা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা নুসরাত জামান বলেছিলেন, সরকারি সহায়তায় পলিনেট হাউস দেওয়া গেলে সেখানকার এক তরুণ চাষি আঙুর চাষ আরও বাড়াতে পারবেন। সেই চাষি সুমন মিয়া তখন জানিয়েছিলেন, তাঁর বাগানে শুধু ছত্রাকনাশক লাগে, অন্য রাসায়নিকের দরকার হয় না।

ডাউনি মিলডিউয়ে (প্লাজমোপারা ভিটিকোলা) আক্রান্ত আঙুরপাতা, পোল্যান্ডে তোলা; রোগটি বোঝাতে প্রতীকী ছবি। ছবি: Jerzy Opioła / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
ডাউনি মিলডিউয়ে (প্লাজমোপারা ভিটিকোলা) আক্রান্ত আঙুরপাতা, পোল্যান্ডে তোলা; রোগটি বোঝাতে প্রতীকী ছবি। ছবি: Jerzy Opioła / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)

দর্শনার্থী আর কৃষি অফিসের কথা


দর্শনার্থীদের একজন নাজমুল ইসলাম। অনলাইনে বাগানের ভিডিও দেখে তিনি এসেছিলেন। তিনি বলেন, "ভিডিওতে আঙুর যা দেখেছি, বাস্তবে আরও চমৎকার। এখানে এসে আমি মুগ্ধ। এত চমৎকার বাগান আগে সরাসরি দেখিনি। আঙুর ধরে খেয়েছি। আমি অনুপ্রাণিত হয়ে আঙুরের ছাদবাগান করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। এখানে আরও কয়েকবার আসব এবং তাঁর কাছ থেকে বুদ্ধি-পরামর্শ নিয়ে আমিও চাষ শুরু করব।"

চাঁদপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক আবু তাহের অবশ্য সাবধানী। তিনি বলেন, "কামরুজ্জামানের মতো আঙুর চাষ করে সফল সবাই হতে পারে না। অনেকেরই আগ্রহ থাকে আঙুর চাষ করার, কিন্তু বিভিন্ন কারণে সেই আগ্রহ নষ্ট হয়ে যায়। যারা আঙুর চাষ করতে আগ্রহী, তাদের আগে আঙুরের জাত, ফলনের নিয়ম সম্পর্কে জানতে হবে। নতুন করে কেউ যদি আঙুর চাষে আগ্রহী থাকে, আমাদের কাছে আসলে আমরা অবশ্যই পরামর্শ দেব।"

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (ডিএই) বাংলাদেশে কৃষি সম্প্রসারণের দায়িত্বপ্রাপ্ত সরকারি দপ্তর। এটি কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীনে কাজ করে, সদর দপ্তর ঢাকায়। ১৯৮২ সালে উদ্যান উন্নয়ন বোর্ড ও পাট পরিদপ্তরসহ কয়েকটি সংস্থা একীভূত করে অধিদপ্তরটি গঠিত হয়। ১৯৯০ সাল পর্যন্ত এটি কৃষকদের জন্য 'প্রশিক্ষণ ও পরিদর্শন' কর্মসূচি চালায়, পরে দলগত প্রশিক্ষণে যায়; ১৯৯৬ সালে গৃহীত নতুন কৃষি সম্প্রসারণ নীতির আওতায় এর কাজের পরিকল্পনা হয়। আঙুরের মতো নতুন ফসলের পরামর্শের জন্য কৃষকেরা এর জেলা ও উপজেলা কার্যালয়েই যান।

অন্য জেলার কৃষি কর্মকর্তারাও কিছুদিন আগে একই ধরনের ব্যবহারিক পরামর্শ দিয়েছিলেন। ২০২৬ সালের ১০ এপ্রিল প্রথম আলোর গাজীপুরের প্রতিবেদনে গাজীপুর সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা হাসিবুল হাসান বলেন, আঙুর চাষে দোআঁশ ও লাল মাটি, জৈব সারসমৃদ্ধ কাঁকর মাটি কিংবা পাহাড়ি অঞ্চলের পাললিক মাটি সবচেয়ে উপযোগী। জমি অবশ্যই উঁচু হতে হবে, যাতে পানি জমে না থাকে; আর পর্যাপ্ত সূর্যের আলো আসে এমন জায়গা আঙুর চাষের জন্য আদর্শ।

ময়মনসিংহে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক নাছরিন আক্তার বানু ২০২৫ সালের মে মাসে বলেছিলেন, জেলায় বাণিজ্যিকভাবে আঙুর চাষের উদাহরণ নেই, আর অনেকের ধারণা এখানকার মাটিতে আঙুর টক হবে; এক স্থানীয় চাষির মিষ্টি ফলন সেই ধারণা ভুল প্রমাণ করেছে। শেরপুরের শ্রীবরদী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সাবরিনা আফরিন ২০২৫ সালের জুনে বলেছিলেন, বড় পরিসরে চাষের পরিকল্পনা করা এক তরুণ চাষিকে কৃষি কার্যালয় সার্বিক সহযোগিতা দেবে।

চাঁদপুরের আগে দেশের অন্যত্র আঙুর


বাংলাদেশে আঙুর বরাবরই ব্যতিক্রমী ফসল। বাংলাপিডিয়ার 'ফল' ভুক্তিতে বলা হয়েছে, দেশে নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চলের ফলের চাষ সফল হয়নি, কিছু জায়গায় আঙুর ছাড়া। সাধারণ আমদানি করা ফলের তালিকায় কমলা, আপেল, ডালিম, খেজুর ও ম্যান্ডারিনের সঙ্গে আঙুরের নাম আছে। দেশে ৯টি প্রধান ও ৪৮টি অপ্রধান ফল জন্মে, আর মোট ফলের প্রায় ৫৪ শতাংশ সংগ্রহ ও বাজারজাত হয় বৈশাখ থেকে শ্রাবণ, এই চার মাসে।

তবে ২০২৬ সালের বসন্তের মধ্যে বিভিন্ন জেলায় ছোট ছোট আঙুরবাগানের খবর আসছিল, যার কয়েকটির শুরু শখ থেকে; চাষিরা অনলাইন ভিডিও দেখে শিখেছেন, অন্য চাষির কাছ থেকে চারা কিনেছেন। চাঁদপুরের খবরের আগে প্রকাশিত তিনটি প্রতিবেদনে ছবিটা এমন:

  • গাজীপুর, এপ্রিল ২০২৬: প্রথম আলো ১০ এপ্রিল ২০২৬ জানায়, একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রকৌশলী মো. রোকনুজ্জামান (৬০) গাজীপুর মহানগরীর ২১ নম্বর ওয়ার্ডের বিপ্রবর্থা গ্রামে এক বিঘা জমিতে 'বাইকুনুর' জাতের আঙুর চাষ করছেন। সেখানে প্রায় পাঁচ একর ইজারা নেওয়া জমিতে তিনি আগেই মালটা, ড্রাগন ফল ও প্যাশন ফল চাষ করেছিলেন। প্রায় দুই শতাধিক গাছে ঝুলছিল সবুজ থোকা। বাগানের ব্যবস্থাপক শহিদুল ইসলাম জানান, এই জাতে ফেব্রুয়ারিতে ফুল আসে, চার মাসে আঙুর খাওয়ার উপযোগী হয়, আর অন্য ফসলের মতোই সার ও কীটনাশক দিতে হয়। করোনাকাল থেকে কৃষিতে ঝোঁকা রোকনুজ্জামানের হিসাবে জমি তৈরি, চারা রোপণ ও পরিচর্যায় প্রায় চার লাখ টাকা খরচ হয়েছে; ওই মৌসুমে দেড় থেকে দুই টন ফলন আর প্রথমবারেই প্রায় দুই লাখ টাকা লাভের আশা করছিলেন তিনি।
  • ময়মনসিংহ, মে ২০২৫: প্রথম আলো ২০ মে ২০২৫ জানায়, ভালুকা উপজেলার কৈয়াদী গ্রামের কলেজছাত্র সুমন মিয়া সাত শতাংশ জমিতে ১৩ জাতের আঙুর চাষ করছেন। ২০২২ সালে তিনি যশোর থেকে ভারতীয় জাতের ২৭টি চারা আনলেও প্রথম বছরের ফল মিষ্টি হয়নি; পরে নাটোর, রাজশাহী, ফরিদপুর, জামালপুরসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে ১৩ জাতের ৬০টি চারা সংগ্রহ করেন, যার মধ্যে বাইকুনর, ডিক্সন, ব্ল্যাক ম্যাজিক ও মাসকাট হোয়াইট আছে। ২৫টি গাছ নষ্ট হলেও বাকি ৩৫টিতে গাছপ্রতি ১৫ থেকে ২০ কেজি ফল ধরে; সবুজ আঙুর ৪০০ টাকা আর লাল-কালো আঙুর ৪৫০ টাকা কেজিতে বিক্রি করেন তিনি।
  • শেরপুর, জুন ২০২৫: প্রথম আলো ২৯ জুন ২০২৫ জানায়, শ্রীবরদী উপজেলার মেঘাদল গ্রামের মিজানুর রহমান ২০ শতাংশ জমিতে ৫০ জাতের আঙুর লাগিয়েছেন। তাঁর বাবা জলিল মিয়া ২০২২ সালে ভারত থেকে দুই জাতের ১০টি চারা এনেছিলেন, যাতে রোপণের ১০ মাস পর ফল আসে। ১৫০টি গাছের মধ্যে ৪০টিতে ফল এসেছিল; অল্প পরিমাণ সবুজ আঙুর তিনি কেজিপ্রতি ২৫০ থেকে ৩০০ টাকায় বিক্রি করেন, খরচ হয়েছিল আড়াই লাখ টাকা।

চাঁদপুরের বাগানও এই ধারার: ছোট পরিসরে শুরু, বহু বিদেশি জাতের সংগ্রহ, আর ফলের পাশাপাশি চারা বিক্রি থেকেও আয়। তিন বাগানে প্রায় ৮৫ জাত নিয়ে এটি তখনকার প্রতিবেদনগুলোতে আসা বড় সংগ্রহগুলোর একটি।

বাংলাদেশের সদরঘাটের রাস্তার বাজারে বিক্রির জন্য রাখা আঙুর, ২০১৭। ছবি: Kritzolina / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
বাংলাদেশের সদরঘাটের রাস্তার বাজারে বিক্রির জন্য রাখা আঙুর, ২০১৭। ছবি: Kritzolina / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)

ফসল হিসেবে আঙুরলতা


উদ্ভিদবিজ্ঞানের ভাষায় আঙুর এক ধরনের রসালো ফল (বেরি), ভিটিস (Vitis) গণের পত্রঝরা কাষ্ঠল লতার ফল। চাষ করা আঙুরের বেশির ভাগ এসেছে ভিটিস ভিনিফেরা (Vitis vinifera) প্রজাতির জাত থেকে, যার আদি নিবাস ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চল ও মধ্য এশিয়া। সাধারণভাবে মধ্যপ্রাচ্যকে চাষের আঙুরের আদি ভূমি ধরা হয়, যেখানে প্রায় ছয় থেকে আট হাজার বছর আগে এর চাষ শুরু হয়।

জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) পরিসংখ্যান ভান্ডার ফাওস্ট্যাটের ২০২৩ সালের হিসাবে বিশ্বে আঙুর উৎপাদন ছিল ৭ কোটি ২৫ লাখ টন। শীর্ষে চীন, ১ কোটি ৩৫ লাখ টন, যা মোটের প্রায় ১৯ শতাংশ; এরপর ইতালি ৬৭ লাখ, ফ্রান্স ৬২ লাখ, যুক্তরাষ্ট্র ৫৪ লাখ, স্পেন ৪৮ লাখ, তুরস্ক ৩৪ লাখ আর চিলি ২৩ লাখ টন। বিশ্বের আঙুরের প্রায় ৭১ শতাংশ যায় ওয়াইন তৈরিতে, ২৭ শতাংশ বিক্রি হয় তাজা ফল হিসেবে, ২ শতাংশ শুকানো হয়। চাঁদপুরে যে ধরনের আঙুর হচ্ছে, সেই টেবিল আঙুর সাধারণত বড় ও পাতলা খোসার; টেবিল আঙুরের বেশির ভাগই বিচিহীন জাত, আর বাণিজ্যিক বিচিহীন আঙুরের প্রায় সবই এই গুণ পেয়েছে থম্পসন সিডলেস, রাশিয়ান সিডলেস বা ব্ল্যাক মনুক্কা জাত থেকে।

আঙুরলতা শুকনো, রোদেলা আবহাওয়ার গাছ। বাড়ন্ত মৌসুমে এর দরকার প্রায় ১,৩০০ থেকে ১,৫০০ ঘণ্টা রোদ, বছরে প্রায় ৬৯০ মিলিমিটার বৃষ্টি, আর গ্রীষ্মে গড়ে প্রায় ২২ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা আদর্শ। নাতিশীতোষ্ণ দেশে দৈনিক তাপমাত্রা ১০ ডিগ্রি ছাড়ালে বসন্তে কুঁড়ি জাগে, তার ৪০ থেকে ৮০ দিন পর ফুল আসে, প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই ফল ধরে, আর ফল ধরার ৪০ থেকে ৫০ দিন পর পাকা শুরু হয়; শীতে গাছ বিশ্রামে থাকে।

উষ্ণমণ্ডলে ফসলটি কেমন আচরণ করে, তা দেখা যায় প্রতিবেশী ভারতে। সেখানে বাড়ন্ত মৌসুম গরম, বর্ষা তাতে বিঘ্ন ঘটাতে পারে, সেচ অপরিহার্য; আর দেশের পূর্বাঞ্চলের প্রবল গরম ও আর্দ্রতা আঙুর চাষ সীমিত করে রাখে। উষ্ণমণ্ডলের আবহাওয়ায় লতা বেশি ফলন দেয়, তাই সারা বছর ঘন ঘন ছাঁটাই করতে হয়; তামিলনাড়ু, কর্ণাটক ও অন্ধ্রপ্রদেশের মতো খুব উষ্ণ রাজ্যে বছরে দুবার ফসল পাওয়া যায়। নাশিক ও পুনেসহ মহারাষ্ট্র এবং কর্ণাটকে বড় আঙুরক্ষেত্রগুলোর অবস্থান; ভারতের প্রায় ১ লাখ ৪৮ হাজার একর আঙুরক্ষেত্রের অর্ধেকের বেশি জুড়ে সুলতানা জাত। স্বাধীনতার পর সেখানকার সরকার আঙুরবাগানগুলোকে টেবিল আঙুর ও কিশমিশ উৎপাদনের দিকে যেতে উৎসাহ দেয়।

আঙুরগাছ বীজ থেকে নয়, মাতৃগাছ থেকেই বংশবিস্তার করা হয়, কারণ প্রতিটি বীজে দুই মাতৃ-পিতৃ জাতের জিনের নতুন মিশ্রণ থাকে, আর তা থেকে হওয়া গাছ দুটোর কোনোটির মতো হয় না। নার্সারিতে মাতৃগাছের ডাল কেটে লাগিয়ে শিকড় গজানো হয় (কাটিং), কিংবা পছন্দের জাতকে কলম করে অন্য গাছের শিকড়ে (রুটস্টক) জোড়া দেওয়া হয়; মাতৃগাছের পাশে একটি ডাল মাটিতে নুইয়ে শিকড় গজানো পর্যন্ত রেখে দেওয়ার পদ্ধতিও আছে, যাকে বলে দাবা কলম বা লেয়ারিং। এভাবেই কামরুজ্জামানের মতো চাষিরা নির্দিষ্ট জাতকে অবিকল রেখে তার চারা অন্যদের কাছে বিক্রি করতে পারেন।

ছবি: Savitr1915 / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)

সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, প্রথম আলো, বাংলাপিডিয়া (বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি), উইকিপিডিয়া (চাঁদপুর জেলা, চাঁদপুর সদর উপজেলা, বাংলাদেশে কোভিড-১৯ মহামারি, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, আঙুর, আঙুর চাষ, ভারতের ওয়াইন, প্লাজমোপারা ভিটিকোলা, আঙুরলতার বার্ষিক বৃদ্ধিচক্র, আঙুরলতার বংশবিস্তার, মণ, শতক), এফএও (ফাওস্ট্যাটের পরিসংখ্যান)

অনলাইন ডেস্কদা এগ্রো নিউজ

ছাদকৃষি

সম্পর্কিত খবর

ছাদকৃষি

ইউটিউব দেখে ছাদে আর আঙিনায় ড্রাগন, বছরে লাখ টাকা লাভ মতলবের বিদেশফেরত হানিফের

চাঁদপুরের মতলব দক্ষিণে বাড়ির ১,৪০০ বর্গফুট ছাদে ও সাড়ে ৬ শতক আঙিনায় ২০২৪ সালে ড্রাগন লাগিয়েছিলেন ৬২ বছরের আবু হানিফ; এখন বছরে লাখ টাকার বেশি লাভ করছেন, এবার ইজারা নিয়েছেন আরও ৬০ শতক জমি।

প্রথম আলো১২ অক্টোবর ২০২৬২ মিনিটের পড়া
ছাদকৃষি

ছাদের জলাধারে দুই হাজার ঝিনুকে মুক্তা চাষ, অভয়নগরের কলেজছাত্রের উদ্যোগ

যশোরের অভয়নগরের কলেজছাত্র আব্দুর রহমান ২০২১ সালে ফেসবুক দেখে মুক্তা চাষ শুরু করেন; এখন ছাদের কৃত্রিম জলাধারে দুই হাজার আর বোনের বাড়ির পুকুরে সাড়ে তিন হাজার ঝিনুক আছে তাঁর।

কৃষি সময়১২ অক্টোবর ২০২৬২ মিনিটের পড়া
ছাদকৃষি

প্রবাস থেকে ফিরে মুন্সিগঞ্জে ছাদকৃষি গড়লেন এক উদ্যোক্তা

প্রবাসজীবন শেষ করে দেশে ফিরে মুন্সিগঞ্জের এক উদ্যোক্তা নিজের ভবনের ছাদে গড়ে তুলেছেন ফল-ফসলের বাগান; তাঁকে নিয়ে শাইখ সিরাজের ভিডিও প্রতিবেদন।

শাইখ সিরাজ৯ অক্টোবর ২০২৬১ মিনিটের ভিডিও

মন্তব্য

(০)