সরকারি আমন ধান সংগ্রহে অনিয়ম ও দালালের দৌরাত্ম্য ঠেকাতে বাংলাদেশের খাদ্য বিভাগ ২০১৯ সালের আমন মৌসুমে বেশ কিছু জেলায় মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে ধান কেনার পদক্ষেপ নেয়। বিবিসি বাংলা ২০১৯ সালের ২৮ নভেম্বর জানায়, ‘কৃষকের অ্যাপ’ নামের এই অ্যাপটি তৈরি করেছে কম্পিউটার কাউন্সিল, আর খাদ্য অধিদপ্তর এবার ১৬টি জেলায় এটি ব্যবহারের পরিকল্পনা নিয়েছে।
সেবারের আমন ধান সংগ্রহ অভিযান শুরু হয় ২০১৯ সালের ২০ নভেম্বর, শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০২০ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি। এই মৌসুমে সরকার কৃষকদের কাছ থেকে কেজিপ্রতি ২৬ টাকা দরে ছয় লাখ টন ধান এবং মিল থেকে কেজিপ্রতি ৩৬ টাকা দরে সাড়ে তিন লাখ টন চাল কেনার সিদ্ধান্ত নেয়। সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী কোন জেলা থেকে কত ধান কেনা হবে, তার একটি তালিকাও করা হয়।
নিবন্ধন থেকে লটারি: অ্যাপে ধান বিক্রির ধাপ
খাদ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. মোছাম্মৎ নাজমানারা খানুম বিবিসিকে জানান, তখন মূলত কৃষকদের নাম নিবন্ধনের কাজ চলছিল। কৃষকেরা ৭ ডিসেম্বর পর্যন্ত নিজের নাম ও জাতীয় পরিচয়পত্রের নম্বর দিয়ে অ্যাপে নিবন্ধন করতে পারতেন। নিবন্ধন শেষে যাঁদের নাম অ্যাপে আসবে, তাঁরা ধান বিক্রির আবেদন করবেন এবং আবেদনে জানাবেন কোন জাতের ধান উৎপাদন করেছেন ও কতটা বিক্রি করতে চান।
এসব তথ্য বিশ্লেষণের পর সফটওয়্যারের মাধ্যমে লটারি করে চূড়ান্ত করা হবে কাদের কাছ থেকে ধান কেনা হবে। কৃষককে ডিজিটালি জানিয়ে দেওয়া হবে কোথায় ধান বিক্রি করতে হবে। সেখানেই দাম পরিশোধের জন্য তাঁকে একটি চেকের প্রিন্ট কপি দেওয়া হবে, যা ব্যাংকে দেখিয়ে তিনি টাকা তুলতে পারবেন। মহাপরিচালকের ভাষায়, “ফলে ধান ক্রয়ের সময় মধ্যসত্ত্বভোগী দালাল কিংবা কর্মকর্তাদের মধ্যেও যদি কোনো অসাধু ব্যক্তি থাকে তারা আর অনিয়মের সুযোগ পাবেনা।”
বিবিসির প্রতিবেদন অনুযায়ী অ্যাপটির মূল সুবিধাগুলো ছিল এমন:
- গুগল প্লে স্টোর থেকে যে কেউ অ্যাপটি ডাউনলোড করতে পারবেন।
- এটি ব্যবহার করে কৃষক তাঁর উৎপাদিত ধান ও চাল সরকারের কাছে বিক্রি করতে পারবেন।
- মিলমালিক ও কৃষক মোবাইলে বার্তার মাধ্যমে ধান-চালের চাহিদা ও সরবরাহের তারিখ জানতে পারবেন।
- ধান বিক্রির আবেদন ও আবেদনের অবস্থা দেখা যাবে।
- কেউ হয়রানির শিকার হলে অভিযোগ করতে পারবেন।

যাঁদের ফোন নেই, তাঁদের জন্য ব্যবস্থা
মহাপরিচালক জানান, যে ১৬টি জেলায় অ্যাপটি ব্যবহারের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে, সেখানকার কর্মকর্তা ও কৃষকদের সচেতন করতে ব্যাপক কার্যক্রম চালানো হয়েছে। খাদ্য বিভাগের জেলা ও থানা পর্যায়ের কর্মকর্তাদের পাশাপাশি ইউনিয়ন ডিজিটাল সেবাকেন্দ্রের সংশ্লিষ্টদেরও অ্যাপটি ব্যবহারের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। তিনি বলেন, “কারও কাছে ফোন না থাকলেও বেশ কয়েকটি জায়গায় গিয়ে তারা নাম নিবন্ধন ও আবেদন করতে পারবেন। আর নিবন্ধন একজনের জন্য একবারই চূড়ান্ত। ওই নিবন্ধন নাম্বার দিয়েই তিনি প্রতিবছর ধান বিক্রয়সহ বেশ কিছু কার্যক্রমে অংশ নিতে পারবেন।”
এর আগে ২১ নভেম্বর ঢাকায় এক অনুষ্ঠানে কৃষিমন্ত্রী আব্দুর রাজ্জাক বলেন, চলতি আমন মৌসুমে সরকার কৃষকদের কাছ থেকে সরাসরি ছয় লাখ টন ধান কিনবে, সুবিধাবঞ্চিত কৃষকেরা অগ্রাধিকার পাবেন এবং এ জন্য লটারি হবে। দ্য ডেইলি স্টার জানায়, মন্ত্রীর ভাষ্যমতে সরকারের সংগ্রহ ঘোষণার পর ধানের দাম মণপ্রতি ১০০ থেকে ২০০ টাকা বেড়েছিল।

আমন মৌসুম ও সরকারি সংগ্রহের পটভূমি
বাংলাদেশে ধান হয় তিন মৌসুমে: আউশ, আমন ও বোরো। কৃষি মন্ত্রণালয়ের কৃষি ডায়েরির শস্য পঞ্জিকা উদ্ধৃত করে যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগের (ইউএসডিএ) ২০১৯ সালের এপ্রিলের প্রতিবেদন জানায়, আমন ধান রোপণ হয় জুলাই-আগস্টে, কাটা হয় নভেম্বর-ডিসেম্বরে। ওই প্রতিবেদনের প্রাক্কলনে ২০১৮-১৯ বিপণন বছরে আমন আবাদ হয় ৫৮ লাখ ৭৩ হাজার হেক্টরে, চাল উৎপাদন ১ কোটি ৩৫ লাখ টন। একই প্রতিবেদন অনুযায়ী আগের মৌসুমে, ২০১৮ সালের ১ ডিসেম্বর থেকে ২০১৯ সালের ৩ মার্চ পর্যন্ত, খাদ্য মন্ত্রণালয় কেজিপ্রতি ৩৬ টাকা দরে ৭ লাখ ৯৯ হাজার ৯৬৬ টন আমন চাল সংগ্রহ করে।
ধান-চাল সংগ্রহের দায়িত্বে থাকা খাদ্য অধিদপ্তর খাদ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন সংস্থা, দেশের খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থাপনা তার মূল কাজ; এর সূচনা ১৯৪৩ সালের বাংলার দুর্ভিক্ষের পর গঠিত খাদ্য বিভাগ থেকে। অ্যাপটির নির্মাতা বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিল ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের অধীন প্রতিষ্ঠান।

ছবি: Balaram Mahalder / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0)
সূত্র: বিবিসি বাংলা, দ্য ডেইলি স্টার, যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগ (ইউএসডিএ ফরেন এগ্রিকালচারাল সার্ভিস), উইকিপিডিয়া




মন্তব্য
(০)