২০২৫ সালের আগস্টে ফরিদপুরের পাটচাষিরা জানান, নতুন জাতের তোষা পাট ‘সবুজ সোনা’ চাষ করে তারা লাভবান হয়েছেন। জাতটির আনুষ্ঠানিক নাম বিজেআরআই তোষা পাট-৯; এটি উদ্ভাবন করেছে বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিজেআরআই)। চাষিদের ভাষায়, গাছ বেশি লম্বা হওয়া, কম সময়ে কাটা যাওয়া এবং জলাবদ্ধতা সইতে পারার কারণে এ জাতের পাট লাভজনক। জাগো নিউজ ১২ আগস্ট ২০২৫ এ খবর প্রকাশ করে।
ফরিদপুরে পাট চাষের চিত্র
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের মৌসুমে ফরিদপুর জেলাজুড়ে ৮৬ হাজার ৫০০ হেক্টর জমিতে পাট চাষ হয়। জেলায় আবাদি জমির ৭৫ শতাংশের বেশিতে পাট চাষ হয় এবং এর সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে অন্তত ৫ লাখ কৃষক জড়িত। এর আগে ২ জুলাই ২০২৫ জাগো নিউজের আরেক প্রতিবেদনে ডিএই সূত্রে জানানো হয়, সে বছর লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে জেলায় ৮৬ হাজার ৫৩১ হেক্টর জমিতে পাট চাষ হয়েছে।
ফলন ভালো হলেও খরচ অনেক বেড়েছিল। জুলাইয়ের ওই প্রতিবেদনে চাষিরা বলেন, বীজ, সার, কীটনাশক ও শ্রমিকের মজুরি বাড়ায় উৎপাদন খরচ বেড়েছে। সালথা উপজেলার এক চাষি জানান, তার প্রতি বিঘা জমিতে কমপক্ষে ৩৫ থেকে ৪০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। খাল-বিলে পানি কম থাকায় পাট জাগ দেওয়া নিয়েও তখন চাষিরা দুশ্চিন্তায় ছিলেন।

‘সবুজ সোনা’ জাতটি কেমন
পাট বাংলাদেশের প্রধান আঁশ ফসল; রং ও অর্থনৈতিক গুরুত্বের কারণে একে ‘সোনালি আঁশ’ বলা হয়। চাষ হওয়া দুই প্রধান প্রজাতির একটি দেশি পাট (Corchorus capsularis), অন্যটি তোষা পাট (Corchorus olitorius)। সবুজ সোনা তোষা পাটের জাত।
বাংলা ট্রিবিউনের ২০২৪ সালের জুনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভারতীয় জাত জেআরও-৫২৪ এবং দেশীয় আগাম পরিপক্ব জার্মপ্লাজম (এক্সেশন-১৭৪৯) এর সংকরায়ণে জাতটি উদ্ভাবন করা হয়। বিজেআরআইয়ের পরিচালক নার্গীস আক্তার ২০০৪ সালে এ নিয়ে গবেষণা শুরু করেন; আঞ্চলিক কেন্দ্রগুলোতে ২০১৪ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত পরীক্ষার পর এটি জাত হিসেবে স্বীকৃতি পায়। বিজেআরআইয়ের বিজ্ঞানীদের হিসাবে সাধারণ পাটের জীবনকাল ১২০ দিন, আর এ জাতের জীবনকাল তার চেয়ে ১০ থেকে ২০ দিন কম। তখন বিজেআরআইয়ের মহাপরিচালক বলেছিলেন, দেশে উৎপাদিত বীজ হওয়ায় এতে আমদানিনির্ভরতা কমবে।
সমকাল ৪ আগস্ট ২০২৫ জানায়, দুই মৌসুম মাঠে পরীক্ষার পর ফরিদপুরে এক আঞ্চলিক কর্মশালায় কৃষি বিশেষজ্ঞরা জাতটিকে দেশের সেরা পাটের জাত বলে উল্লেখ করেন। জাগো নিউজকে ফরিদপুরের পাট গবেষণা কেন্দ্র জানায়, এ জাতের ফলন বেশি, রোগবালাই ও পোকামাকড়ের আক্রমণ কম এবং আঁশের মান ভালো।

চাষি ও কর্মকর্তারা যা বলেন
সালথা উপজেলার পাটচাষি বিধান চন্দ্র জাগো নিউজকে বলেন, ‘এবার কয়েক বিঘা জমিতে নতুন জাতের পাট আবাদ করে সবদিক দিয়ে বেশ লাভবান হয়েছি।’ সালথা পাট চাষি সমিতির সভাপতি মো. মোক্তার মোল্লা বলেন, এ জাতের গাছ অন্য জাতের চেয়ে লম্বা হয়, আবাদে ১০০ দিনের মতো লাগে, যা অন্য পাটের চেয়ে তিন থেকে চার সপ্তাহ কম, আর জলসহিষ্ণু হওয়ায় ক্ষেতে পানি জমলেও ক্ষতি হয় না।
ফরিদপুর আঞ্চলিক কেন্দ্রের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মো. মজিবর রহমান বলেন, এতদিন দেশে বোনা ভারতীয় জাতের বেশিরভাগ ছিল দুর্বল: কোনোটি পানি সইতে পারে না, কোনোটিতে বেশি সময় লাগে, কোনোটি লম্বা হলেও ভঙ্গুর ও আঁশ পাতলা। তার ভাষায়, ‘নতুন জাত ‘সবুজ সোনা’ এসব দুর্বলতা কাটাতে পেরেছে।’

ডিএই ফরিদপুর অঞ্চলের অতিরিক্ত পরিচালক মোহাম্মদ খায়ের উদ্দিন মোল্লা বলেন, ‘আমরা বাস্তবে মাঠে দেখেছি ‘সবুজ সোনা’ অন্য তোষা পাটের চেয়ে মান ও ফলনে ভালো। যদিও বীজের সংকট আছে। যে পরিমাণ চাহিদা আছে; সে পরিমাণ বীজের সংকুলান করা কষ্টসাধ্য।’ সমকালের প্রতিবেদনেও বীজের ঘাটতিকেই জাতটি ছড়িয়ে পড়ার প্রধান বাধা বলা হয়।
ফরিদপুর ডিএইর উপপরিচালক কৃষিবিদ মো. শাহাদুজ্জামান বলেন, পাট পচানোর (জাগ দেওয়ার) সময় অতি বৃষ্টি হওয়ায় সে বছর পাটের রং ভালো হবে এবং বাজারদর সন্তোষজনক হবে বলে তারা আশা করছেন। তার হিসাবে মৌসুমে ২ লাখের বেশি মেট্রিক টন পাট উৎপাদন হবে, যার বাজারমূল্যের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয় ২ হাজার কোটি টাকার বেশি।

ছবি: Afifa Afrin / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0)
সূত্র: জাগো নিউজ, সমকাল, বাংলা ট্রিবিউন, উইকিপিডিয়া



মন্তব্য
(০)