২০২৬ সালের ২৮ মে, বৃহস্পতিবার, ঈদুল আজহার দিন সকালে রাজধানীর যাত্রাবাড়ীর কাজলা ও শনির আখড়া পশুর হাটে দেখা যায়, দেশের নানা জেলা থেকে আসা অনেক ব্যাপারী লোকসান দিয়েও সব গরু বিক্রি করতে পারেননি। অবিক্রীত গরু ট্রাকে তুলে তাঁরা আবার গ্রামের পথে রওনা হচ্ছিলেন। জাগো নিউজ ২৪ সেদিন হাট ঘুরে এই ব্যাপারীদের কথা তুলে ধরে।
দিনাজপুর থেকে ৮০টি গরু নিয়ে আসা ব্যাপারী মো. মামুন জানান, গরুপ্রতি দুই থেকে পাঁচ হাজার টাকা পর্যন্ত লোকসান দিয়ে চার-পাঁচ দিনে তিনি ৩২টি গরু বিক্রি করতে পেরেছেন। বাকি ৪৮টি বিক্রি হয়নি, ট্রাক ভাড়া করে সেগুলো আবার দিনাজপুরে নিয়ে যাবেন। ভোলা, কিশোরগঞ্জ ও মুন্সীগঞ্জের ব্যাপারীরাও একই রকম অভিজ্ঞতার কথা বলেন।
ঈদের সকালে ফাঁকা হাট
ঈদের দিন বেলা তখন পৌনে ১১টা। ফোনে সঙ্গীদের তাড়াতাড়ি খেয়ে ফিরে আসতে বলছিলেন মামুন, কারণ তাঁরা এলে তবেই তিনি খেতে যেতে পারবেন। তখন পর্যন্ত তাঁর পেটে কিছু পড়েনি, আগের রাতে ঘুমও হয়নি। মামুন জানান, একটু ভালো-মন্দ খেয়ে ঘুমাবেন, তারপর গরু নিয়ে বাড়ি ফিরবেন।
জাগো নিউজের প্রতিবেদক কাজলা ও শনির আখড়া হাট ঘুরে দেখেন, পুরো এলাকা প্রায় শূন্য। কয়েকজন পাইকার ও রাখাল রয়ে গেছেন; কেউ ঘুমাচ্ছেন, কেউ বসে বসে ঝিমুচ্ছেন। পাশে বস্তায় গরুর ভুসি, খড় ও ঘাস। গরুগুলোর কোনোটি শুয়ে, কোনোটি দাঁড়িয়ে। একজন ক্রেতা এলেও এক ব্যাপারী সেদিকে ফিরেও তাকাননি। তিনি বলেন, 'উনি গরু কিনবেন না, দাম কম বলবেন।'
হাটের ব্যাপারীরা জানান, বেশি দামে গরু কিনে লোকসানে বিক্রি করেও ক্রেতাদের মন পাওয়া যাচ্ছে না; ক্রেতারা পানির দরে গরু কিনতে চান। তাঁদের ভাষায়, মনে হচ্ছে যেন গরুর কোনো মূল্যই নেই। ক্রেতারা কেন এত কম দাম বলছেন, জানতে চাইলে তাঁরা বলেন, কারণ তাঁদের জানা নেই; তবে মনে হচ্ছে মানুষের হাতে টাকা কম, সবাই আগের মতো কোরবানি দিচ্ছেন না, তাই দাম কম হতে পারে।
কাজলা ও শনির আখড়া রাজধানীর যাত্রাবাড়ী থানা এলাকায়। বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী, ২০০৭ সালে গঠিত যাত্রাবাড়ী থানার আয়তন ১৩.১৯ বর্গকিলোমিটার; এর পশ্চিমে গেন্ডারিয়া ও সূত্রাপুর, দক্ষিণে কদমতলী ও শ্যামপুর এবং পূর্বে ডেমরা থানা। এলাকার বড় বাজার যাত্রাবাড়ী বাজার, আর সায়েদাবাদ বাস টার্মিনাল এখানকার বড় পরিবহন কেন্দ্র। দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড বাংলার ২১ মে ২০২৬ তারিখের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এ বছর ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ১১টি অস্থায়ী হাটের একটি বসেছিল কাজলা ব্রিজ থেকে মাতুয়াইল মৃধাবাড়ি পানির পাম্পসংলগ্ন রাস্তার অব্যবহৃত অংশে।

দিনাজপুরের ব্যাপারীর হিসাব
মামুন জাগো নিউজকে বলেন, 'গত ২১ মে ৮০টি গরু হাটে নিয়ে আসছিলাম। দেখাশোনার জন্যে সঙ্গে ১১ জন মানুষ এনেছি। খাওয়া-দাওয়া, গোসল, এমনকি টয়লেট করতেও টাকা লাগে। এখানে শুধু খরচই হচ্ছে, কোনো লাভ নেই। মঙ্গল, বুধ ও ঈদের দিন আজ সকাল পর্যন্ত কোনো গরু বিক্রি করতে পারিনি। এর আগে ৩২টি গরু বিক্রি করেছিলাম।'
গরু আনার খরচের কথাও জানান তিনি: 'চারটি ট্রাকে ২০টি করে গরু নিয়ে আসছিলাম। ট্রাকপ্রতি ভাড়া ২০ হাজার টাকা। এতদিনে গরু দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে ক্লান্ত। এখন ফিরার সময় শুইয়ে নিতে হবে। প্রতি ট্রাকে ১৬টি করে গরু উঠাতে হবে। তিনটা ট্রাক লাগবে। কিন্তু ঠিকঠাক মতো ট্রাক ভাড়া পাচ্ছি না।'
গরুর সারিতে শুয়ে থাকা কালো রঙের একটি ষাঁড় দেখিয়ে মামুন বলেন, 'এটা দিনাজপুরের বাজার থেকে কিনেছি এক লাখ ৪০ হাজার টাকায়। আর এখানে হাটে সর্বোচ্চ ৮০ হাজার টাকা দাম বলেছে। এতো কম দামে কিভাবে গরু বিক্রি করবো? তাই ক্ষতি হলেও গ্রামে ফিরিয়ে নিচ্ছি।'
মামুনের জেলা দিনাজপুর রংপুর বিভাগের অংশ। বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী, জেলাটির আয়তন ৩,৪৪৪.৩০ বর্গকিলোমিটার, এর পশ্চিমে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ এবং ভেতর দিয়ে উল্লেখযোগ্য নদীর মধ্যে আছে যমুনা, তুলসীগঙ্গা, পুনর্ভবা ও আত্রাই। ১৩টি উপজেলা নিয়ে গড়া এই জেলার মানুষের আয়ের প্রধান উৎস কৃষি, যার ভাগ ৬৩.৯০ শতাংশ; এরপর বাণিজ্য ১২.৮৯ শতাংশ।
ভোলা, কিশোরগঞ্জ ও মুন্সীগঞ্জের ব্যাপারীরা
মামুনের পাশেই ট্রাকে অবিক্রীত গরু তুলছিলেন মুন্সীগঞ্জের সানোয়ার। কুড়িগ্রাম থেকে পাইকারি দরে ১০টি গরু কিনে এনেছিলেন তিনি, কিন্তু একটিও বিক্রি হয়নি। তাই গরুগুলো মুন্সীগঞ্জে নিজের বাড়িতে নিয়ে যাচ্ছিলেন। সানোয়ার জাগো নিউজকে বলেন, 'ক্রেতারা গরুর দামই বলেনি। বিক্রি করতে না পেরে গরুগুলো আমাদের গ্রামের বাড়িতে নিয়ে যাচ্ছি।'
কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জ থেকে আসা এক ব্যাপারী জাগো নিউজকে বলেন, '১৯টি নিয়ে আসছিলাম, নয়টি বিক্রি হয়েছে। বাকি ১০টি বাড়িতে নিয়ে যাচ্ছি। এসব গরু এখনো দুই দাঁতের, আরও বড় হবে। বড় হলে দামও বেশি পাব। লস যা হওয়ার তা তো হয়েছেই। গরুপ্রতি ট্রাক ভাড়া দুই হাজার টাকা করে। এখন আবার নিতেও টাকা লাগবে।'
ভোলা থেকে ৩০টি গরু নিয়ে হাটে এসেছিলেন মো. হাসান। ১৯টি বিক্রি করতে পারলেও ১১টি পারেননি; সেই ১১টি গরু নিয়েই তিনি বাড়ি ফিরে যান। হাসান জাগো নিউজকে বলেন, 'আসার সময় ইলিশা ফেরিঘাটে চরম ভোগান্তি নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থেকে ফেরি পারাপার হতে হয়েছে। এরপর ঢাকায় এসে বৃষ্টির ভোগান্তি। নিজে ট্রাকে করে বালি এনে ভরাট করে গরু রাখার জায়গা করেছি। তিন হাজার টাকার বালু, ত্রিপল পাঁচ হাজার টাকা। আমরা রাখাল এসেছি চারজন, খাওয়া খরচ সব মিলিয়ে লস বেশি। গরু প্রতি তিন থেকে দশ হাজার টাকা লোকসান।'
হাসানের জেলা ভোলা বরিশাল বিভাগের অংশ। বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী, জেলার আয়তন ৩,৪০৩.৪৮ বর্গকিলোমিটার; এর দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর, পূর্বে মেঘনা নদী ও শাহবাজপুর চ্যানেল এবং পশ্চিমে তেঁতুলিয়া নদী। সাতটি উপজেলার এই জেলায় মানুষের আয়ের ৬৩.৬৪ শতাংশ আসে কৃষি থেকে। হাসান যে ইলিশা ফেরিঘাটের কথা বলেছেন, সেটি মেঘনার তীরে। ঢাকা ট্রিবিউনের ২০২৫ সালের ১৬ জুলাইয়ের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, মেঘনার পানি বিপৎসীমার ওপরে উঠলে ইলিশা ফেরিঘাটের নিম্ন পানির ল্যান্ডিং স্টেশন জোয়ারের সময় ডুবে যায়; তখন শুধু উঁচু র্যাম্প দিয়ে যানবাহন ওঠানামা করায় ফেরিতে গাড়ি তোলা ও নামানো ধীর হয়ে পড়ে।

ঈদের আগের দুই দিনে ঢাকার হাটে দরপতন
জাগো নিউজ লিখেছিল, এবার রাজধানীর পশুর হাটগুলোর প্রথম দিকে ব্যবসায়ীরা গরুর ভালো দাম পেলেও শেষ মুহূর্তের চিত্র বিক্রেতাদের জন্য চরম হতাশার ছিল। কাঙ্ক্ষিত দাম না পেয়ে অনেক ব্যবসায়ী ও খামারি লোকসান মাথায় নিয়েই পশু বিক্রি করেছেন, অনেকে অবিক্রীত পশু নিয়ে বাড়ি ফিরেছেন। অন্যদিকে শেষ সময়ের মন্দাভাব ও দরপতনের সুযোগে বেশ কম দামে পছন্দের পশু কিনতে পেরে খুশি হয়েছেন ক্রেতারা।
অন্য সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনেও ঈদের আগের দুই দিনের একই চিত্র উঠে এসেছিল। বাংলা ট্রিবিউন ২৭ মে, বুধবার, দুপুরে জানায়, ঈদ ঘনিয়ে এলেও প্রতিকূল আবহাওয়া ও টানা বৃষ্টিতে রাজধানীর পশুর হাটে ক্রেতা কম, ফলে লোকসানের শঙ্কায় ছিলেন ব্যবসায়ীরা। ধোলাইখাল হাটে সেদিন হাজার হাজার গরু উঠলেও ক্রেতার উপস্থিতি ছিল তুলনামূলক কম। বৃষ্টি থেকে বাঁচাতে অনেকে গরুর ওপর ত্রিপল টানিয়ে দিয়েছিলেন, কেউ কেউ সারা রাত জেগে পশু পাহারা দিয়েছেন। ফরিদপুর থেকে আসা এক ব্যাপারী পত্রিকাটিকে বলেন, আগের দিন যে গরুর যে দাম ছিল, সেদিন তা ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকা কমে বিক্রি করতে হচ্ছে। ব্যবসায়ীরা পরিবহন, খাদ্য ও শ্রমিক খরচ বেড়ে যাওয়ার কথাও বলেন।
দেশ রূপান্তর ২৭ মে রাতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানায়, ঈদের আগের দিন ঢাকার পশুর হাটে দাম পড়ে যায়; আগের দিনগুলোর তুলনায় ক্রেতা অনেক কম থাকায় বড় ও মাঝারি আকারের অনেক গরু অবিক্রীত থেকে যায়। হাজারীবাগ পশুর হাটের হাসিল আদায় কাউন্টারের তথ্য অনুযায়ী, ক্রেতারা আগের দিনের তুলনায় প্রায় ২০ শতাংশ কম দামে পশু কিনছিলেন। হাটের এক স্বেচ্ছাসেবক পত্রিকাটিকে জানান, মঙ্গলবার যে গরু প্রায় সোয়া দুই লাখ টাকায় বিক্রি হচ্ছিল, সেদিন তা এক লাখ ৭০ থেকে ৮০ হাজার টাকায় নেমে আসে। ব্যবসায়ীরা দরপতনের জন্য টানা দুই দিনের বৃষ্টি ও খারাপ আবহাওয়াকে দায়ী করেন।
চাহিদার চেয়ে ২২ লাখ বেশি পশু: সরকারি হিসাব
ঈদের আগে, ২০২৬ সালের ৩ মে, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী জানান, এবার দেশে কোরবানিযোগ্য পশু আছে ১ কোটি ২৩ লাখ ৩৩ হাজার ৮৪০টি, আর সম্ভাব্য চাহিদা ১ কোটি ১ লাখ ৬ হাজার ৩৩৪টি। ফলে চাহিদার চেয়ে ২২ লাখ ২৭ হাজার ৫০৬টি পশু উদ্বৃত্ত থাকবে। প্রস্তুত পশুর মধ্যে গরু-মহিষ ৫৬ লাখ ৯৫ হাজার ৮৭৮টি, ছাগল-ভেড়া ৬৬ লাখ ৩২ হাজার ৩০৭টি এবং উট-দুম্বাসহ অন্যান্য পশু ৫ হাজার ৬৫৫টি। মন্ত্রী বলেন, এ বছর কোরবানির পশু নিয়ে কোনো সংকট তৈরি হওয়ার আশঙ্কা নেই।
দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড বাংলার প্রতিবেদন অনুযায়ী, সেদিন জানানো হয়, সারা দেশে তিন হাজার ৬০০টির বেশি পশুর হাট বসবে, ঢাকার হাটগুলোতে ২০টি ভেটেরিনারি মেডিকেল টিম সার্বক্ষণিক কাজ করবে, পশু পরিবহনে চাঁদাবাজি বন্ধ করা হবে এবং দেশীয় খামারিদের সুরক্ষায় সীমান্ত দিয়ে পশু আসা ঠেকাতে কড়া নজরদারি থাকবে। অনলাইনে পশু বিক্রিতে বাড়তি কোনো মাশুল না নেওয়ার কথাও বলা হয়। পরে ২১ মে প্রকাশিত দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের প্রতিবেদনে জানা যায়, ঢাকায় ঢাকা দক্ষিণ সিটির ১১টি ও উত্তর সিটির ১২টি অস্থায়ী হাট এবং গাবতলীর স্থায়ী হাট মিলিয়ে ২৪টি হাট বসছে, যা চলবে পাঁচ দিন।
গত বছরের অভিজ্ঞতাও ছিল একই রকম। বাংলা ট্রিবিউনের ৩ মে তারিখের প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৫ সালের ঈদুল আজহাতেও দেশে পশুর সরবরাহ চাহিদার চেয়ে বেশি ছিল; তখন প্রায় ৯১ লাখ ৩৬ হাজার ৭৩৪টি পশু কোরবানি হলেও প্রায় ৩৩ লাখের বেশি পশু অবিক্রীত থেকে যায়।

উত্তরাঞ্চলের উদ্বৃত্ত পশু আসে ঢাকায়
শনির আখড়ার হাটে আসা ব্যাপারীদের দুজনের গরু এসেছিল রংপুর বিভাগ থেকে: মামুনের দিনাজপুর থেকে, সানোয়ারের কুড়িগ্রাম থেকে। বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের ১৭ মে ২০২৬ তারিখের প্রতিবেদন অনুযায়ী, রংপুর বিভাগীয় প্রাণিসম্পদ দপ্তরের হিসাবে বিভাগের আট জেলায় এবার কোরবানির জন্য প্রায় ২০ লাখ ২৩ হাজার পশু প্রস্তুত ছিল। স্থানীয় চাহিদা মেটানোর পর পাঁচ লাখ ৫৬ হাজারের বেশি পশু উদ্বৃত্ত থাকার কথা বলা হয়েছিল।
একই হিসাবে দিনাজপুর জেলায় প্রস্তুত পশু ছিল ৪ লাখ ২৬ হাজার ৫২৩টি, চাহিদা ২ লাখ ৭৩ হাজার ২৬২টি এবং উদ্বৃত্ত ১ লাখ ৫৩ হাজার ২৬১টি। কুড়িগ্রামে প্রস্তুত ছিল ৩ লাখ ৩৬ হাজার ৯১৯টি, চাহিদা ২ লাখ ৬১ হাজার ২৪৬টি এবং উদ্বৃত্ত ৭৫ হাজার ৬৭৩টি। রংপুর জেলায় প্রস্তুত ছিল ৩ লাখ ৬৬ হাজার ৫৯১টি, উদ্বৃত্ত ১ লাখ ৩৯ হাজার ৫৯২টি। এই উদ্বৃত্ত পশুর বড় অংশ ব্যাপারীদের হাত ধরে ঢাকা ও অন্যান্য বড় শহরের হাটে আসে।
প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছিল, পর্যাপ্ত পশু থাকলেও খামারিরা ক্রেতা নিয়ে চিন্তিত ছিলেন। তাঁরা আশা করছিলেন, ঈদের শেষ দিকে হাটে ক্রেতা বাড়বে এবং ন্যায্য দাম মিলবে। ভারত থেকে অবৈধ পথে গরু আসা নিয়েও তাঁদের উদ্বেগ ছিল; রংপুর ডেইরি ফার্মার্স অ্যাসোসিয়েশনের নেতারা গরু চোরাচালান বন্ধে সরকারের কঠোর ব্যবস্থা চেয়েছিলেন।
অন্য জেলাতেও ঈদের আগে উদ্বৃত্তের হিসাব দেওয়া হয়েছিল। বাসসের ১৭ মে তারিখের প্রতিবেদন অনুযায়ী, যশোরে চাহিদা ছিল ১ লাখ ৩ হাজার ১২৮টি পশু, প্রস্তুত ছিল ১ লাখ ১৭ হাজার ৯৯৭টি। সেখানকার জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা বলেছিলেন, সব খামারি একই সময়ে পশু হাটে নিয়ে এলে দাম পড়ে যায়। বাসসের ৫ মে তারিখের আরেক প্রতিবেদনে পটুয়াখালীতে ১ লাখ ২২ হাজার ৬৩৩টি পশুর চাহিদার বিপরীতে ১ লাখ ৩৭ হাজার ৯১৮টি পশু প্রস্তুত থাকার কথা বলা হয়।
কোরবানি কমছে, দাম বাড়ছে
হাটের ব্যাপারীরা ক্রেতাদের কম দাম বলার পেছনে মানুষের হাতে টাকা কম থাকার যে কথা বলেছিলেন, তার পটভূমি পাওয়া যায় ঈদের দিন সকালে প্রকাশিত প্রথম আলোর এক প্রতিবেদনে। সেখানে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের নয় বছরের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখানো হয়, রাজনৈতিক অস্থিরতা, অর্থনৈতিক সংকট বা মহামারির সময় কোরবানি কমে যায়। ২০১৯ সালে পশু কোরবানি সর্বোচ্চ এক কোটি ছয় লাখে পৌঁছেছিল; ২০২০ সালে করোনা মহামারির বছরে তা আগের বছরের চেয়ে ১১ লাখ ৬৪ হাজার কম হয়। ২০২৫ সালের ঈদুল আজহায় কোরবানির সংখ্যা নেমে আসে ৯১ লাখ ৩৬ হাজারে।
প্রথম আলো কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের তথ্য উদ্ধৃত করে জানায়, ২০১৪ সালে গরুর মাংসের গড় দাম ছিল কেজিপ্রতি ২৭৫ টাকা। ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) হিসাবে ঈদের আগে ঢাকার বাজারে গরুর মাংস বিক্রি হচ্ছিল কেজিপ্রতি ৭৮০ থেকে ৮৫০ টাকায়, আর খাসির মাংস এক হাজার ২০০ থেকে এক হাজার ৩০০ টাকায়। প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১৫ সালে ভারত সীমান্ত দিয়ে গরু আসা বন্ধ করার পর দেশে অসংখ্য খামার গড়ে উঠেছে, তবে দেশীয় উৎপাদন দাম স্থিতিশীল রাখতে যথেষ্ট হয়নি।
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) মো. শাহজামান খান প্রথম আলোকে বলেন, 'মানুষের অর্থনৈতিক অবস্থার ওপর কোরবানি নির্ভর করে।' প্রতিবেদনে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক অধ্যাপক সরকারি উদ্বৃত্তের হিসাব নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেন; তাঁর যুক্তি ছিল, সরবরাহ সত্যিই বেশি হলে দাম কমার কথা। তিনি এ-ও বলেন, উৎপাদন খরচ তুলতে না পারায় কিছু খামারি পশু বিক্রি করতে না পারার ঝুঁকিতে আছেন। বরিশালের উজিরপুরের এক কৃষক পরিবার পত্রিকাটিকে জানায়, তিন বছর ধরে তারা আর কোরবানি দেয় না, কারণ এক ভাগ কোরবানিতেই এখন প্রায় ২০ হাজার টাকা লাগে।
দেশের গবাদিপশু খাত এক নজরে
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের (ডিএলএস) পরিকল্পনা শাখার 'লাইভস্টক ইকোনমি অ্যাট আ গ্লান্স (২০২৩-২০২৪)' অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে দেশে গরু ছিল ২৫০.১৩ লাখ, মহিষ ১৫.২৪ লাখ, ছাগল ২৭১.১৭ লাখ এবং ভেড়া ৩৯.০৩ লাখ। সব মিলিয়ে রোমন্থক পশু ছিল ৫৭৫.৫৭ লাখ। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে গরুর সংখ্যা ছিল ২৩৬.৩৬ লাখ।
একই হিসাবে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে দেশে মাংস উৎপাদন হয় ৯২.২৫ লাখ মেট্রিক টন, যেখানে দৈনিক মাথাপিছু ১২০ গ্রাম ধরে চাহিদা ছিল ৭৬.২১ লাখ মেট্রিক টন। স্থির মূল্যে দেশের মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) প্রাণিসম্পদ খাতের অবদান ছিল ১.৮০ শতাংশ এবং কৃষি জিডিপিতে ১৬.৩৩ শতাংশ। অধিদপ্তরের হিসাবে প্রত্যক্ষ কর্মসংস্থানে এই খাতের ভাগ ২০ শতাংশ এবং আংশিক কর্মসংস্থানে ৫০ শতাংশ।

'দুই দাঁতের' গরু ও কোরবানির বয়স
করিমগঞ্জের ব্যাপারী অবিক্রীত গরুগুলোকে 'দুই দাঁতের' বলে উল্লেখ করেছিলেন। দেশের হাটে গরুর বয়স বোঝাতে এই কথাটি প্রচলিত। বাংলা ট্রিবিউনের ২৫ মে ২০২৬ তারিখের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ইসলামি বিধান অনুযায়ী কোরবানির গরু ও মহিষের বয়স কমপক্ষে দুই বছর, ছাগল ও ভেড়ার এক বছর এবং উটের পাঁচ বছর হতে হয়।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, পশুর সামনের নিচের দাঁত দেখে বয়স সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। গরুর বয়স প্রায় দুই বছর হলে সামনের মাঝখানের দুটি দুধদাঁত পড়ে সেখানে দুটি স্থায়ী দাঁত ওঠে; আড়াই থেকে তিন বছর বয়সে স্থায়ী দাঁত হয় চারটি। এ কারণেই হাটে 'দুই দাঁতের' গরু বলতে কোরবানির ন্যূনতম বয়সে পৌঁছানো তরুণ গরু বোঝায়। ব্যাপারীর আশা ছিল, এসব গরু আরও বড় হলে পরে বেশি দাম মিলবে।
ক্রেতাদের জন্য প্রতিবেদনটিতে দাঁতের পাশাপাশি পশুর শরীর সুস্থ ও সক্রিয় কি না, চোখ উজ্জ্বল কি না, চামড়ায় রোগ বা ক্ষত আছে কি না এবং পশু খুঁড়িয়ে হাঁটে কি না, তা দেখার কথা বলা হয়। সন্দেহ হলে অনেক হাটে থাকা প্রাণিসম্পদ বিভাগের মেডিকেল টিমের সাহায্য নেওয়ার পরামর্শও দেওয়া হয়েছিল।
ছবি: Wasiul Bahar / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, প্রথম আলো, বাংলা ট্রিবিউন, দেশ রূপান্তর, দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড বাংলা, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম, বাসস, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর (লাইভস্টক ইকোনমি অ্যাট আ গ্লান্স ২০২৩-২০২৪), বাংলাপিডিয়া, ঢাকা ট্রিবিউন




মন্তব্য
(০)