বাগেরহাট সদর উপজেলার চপাতলা গ্রামের একটি মুরগির খামারে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির মধ্যে প্রায় ৮ হাজার ডিমপাড়া মুরগি মারা গেছে বলে ২০২৬ সালের মার্চের শুরুতে জাগো নিউজ ও দ্য ডেইলি স্টার বাংলা জানিয়েছে। খামারি সোহাগ শেখ ২০ বছর ধরে খামারটি গড়ে তুলেছেন; মৃত্যু শুরুর আগে সেখানে প্রায় ১১ হাজার মুরগি ছিল। তিনি সাংবাদিকদের বলেছেন, তাঁর সন্দেহ বার্ড ফ্লু। অন্যদিকে বাগেরহাট সদর উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে এবং গবেষণাগারের পরীক্ষার পরই মৃত্যুর সঠিক কারণ নিশ্চিত হওয়া যাবে। আয় বন্ধ হয়ে যাওয়ায় খামারি এখন ঋণের চাপে দিশাহারা; দ্য ডেইলি স্টার বাংলার হিসাবে তাঁর ঋণ ৫০ লাখ টাকা।
দুই দশকের পরিশ্রম, ডিসেম্বর থেকে মৃত্যু
দ্য ডেইলি স্টার বাংলা জানিয়েছে, সোহাগ শেখ তাঁর প্রতিষ্ঠানের নাম দিয়েছেন ‘সোহাগ এগ্রো ফার্ম’। ২০০৬ সালে মাত্র এক হাজার মুরগি নিয়ে তিনি খামারটি শুরু করেন। দুই দশকে খামারটি বড় হয়েছে, পত্রিকাটির ভাষায় সেখানে এক ডজন মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছিল। জাগো নিউজ লিখেছে, খামারটি তাঁর নিজের বাড়ির আঙিনায় তিনতলা একটি ভবনে; একসময় এর লেয়ার মুরগি থেকে প্রতিদিন হাজার হাজার ডিম উৎপাদন হতো।
দ্য ডেইলি স্টার বাংলার তথ্যমতে, খামারের মুরগিগুলো ‘হোয়াইট লেগহর্ন’ জাতের লেয়ার। সোহাগ শেখ জাগো নিউজকে বলেন, তিলে তিলে পুঁজি বাড়িয়ে তিনি ১১ হাজার মুরগি তুলেছিলেন; কিন্তু ২০২৫ সালের ডিসেম্বর থেকে হঠাৎ মুরগি মারা যেতে শুরু করে। প্রথমে তিনি একে সাধারণ রোগ ভেবে নানা ওষুধ ও টিকা দেন, কিন্তু মৃত্যু থামেনি। তাঁর হিসাবে ডিসেম্বর থেকে প্রায় ৮ হাজার মুরগি মারা গেছে, আর বাকি প্রায় ৩ হাজার মুরগিও মারা যাচ্ছে। দ্য ডেইলি স্টার বাংলা লিখেছে, টিকে থাকা ৩ হাজার মুরগির মধ্যেও অসুস্থতার লক্ষণ দেখা দিচ্ছে।
মরা মুরগি কী করা হচ্ছিল, তা দুই পত্রিকাতেই এসেছে। খামারি জাগো নিউজকে বলেন, প্রতিদিনই মুরগি মরে; বস্তা ভরে সেগুলো তিনি মাটিচাপা দেন অথবা নদীতে ফেলেন। দ্য ডেইলি স্টার বাংলা জানিয়েছে, খামারের কর্মীদের এখন ব্যস্ত থাকতে হচ্ছে ডিম পাড়ার অপেক্ষায় থাকা মুরগিগুলোর নিথর দেহ বস্তায় ভরে পাশের নদীতে ফেলার কাজে। সোহাগ পত্রিকাটিকে বলেন, ‘এই পাখিগুলোকে নিজ হাতে বস্তায় ভরে ফেলে দেওয়া যে কতটা কষ্টের, তা বোঝানো সম্ভব না। অনেক মুরগি ডিম দেওয়ার ঠিক আগ মুহূর্তে মারা যাচ্ছে।’
ঋণ, বেতন ও পাওনাদারদের চাপ
খামারটিই পরিবারের জীবিকা। সোহাগ শেখ জাগো নিউজকে বলেন, তাঁর পরিবার ও ছয়জন কর্মচারীর জীবিকা এই খামারের ওপর; প্রত্যেক কর্মচারীকে মাসে ১৬ হাজার টাকা করে বেতন দিতে হয়। খামারে তাঁর প্রায় অর্ধকোটি টাকার বিনিয়োগ ছিল। ‘সব শেষ হয়ে গেছে’, বলেন তিনি। দ্য ডেইলি স্টার বাংলাকে তিনি জানান, গত দুই মাস ধরে কর্মচারীদের বেতন দিতে পারছেন না।
দ্য ডেইলি স্টার বাংলা জানিয়েছে, ব্যবসার প্রয়োজনে বিভিন্ন সময়ে তিনি ব্যাংক ও মহাজনদের কাছ থেকে বড় অঙ্কের ঋণ নিয়েছিলেন; আয় বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এখন পাওনাদারদের চাপে দিশাহারা। পত্রিকাটিকে তিনি বলেন, ‘পাওনাদাররা টাকার জন্য চাপ দিচ্ছে, কেউ কেউ অতিরিক্ত টাকাও দাবি করছে। গত দুই মাস ধরে কর্মচারীদের বেতন দিতে পারছি না। ঋণের বোঝা আর লোকসানের চাপে আমার আর কোনো পথ খোলা নেই।’
জাগো নিউজকেও তিনি একই অভিযোগ করেন। তাঁর ভাষ্য, ভালো সময়ে দোকানদার ও কিস্তির লোকেরা বাড়িতে এসে মালামাল ও ঋণ দিতে আগ্রহ দেখাতেন, খাবার ও ওষুধ পর্যন্ত বাড়িতে পৌঁছে দিতেন; এখন পরিস্থিতি খারাপ হওয়ায় তাঁরাই দ্বিগুণ টাকা দাবি করছেন, এক লাখ টাকার জায়গায় দুই লাখ, আর সময় চাইলে মামলার হুমকি দিচ্ছেন। এগুলো খামারির নিজের বক্তব্য; সংশ্লিষ্ট দোকানদার বা ঋণদাতাদের কোনো বক্তব্য প্রতিবেদনগুলোতে আসেনি।
সোহাগের স্ত্রী আকালিমা বেগম জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমাদের সব শেষ হয়ে গেছে। যারা টাকা পাবে তারা যদি এক বছর সময় দিত, আমরা আস্তে আস্তে শোধ করে দিতাম। এখন সবাই একসঙ্গে চাপ দিচ্ছে।’ দ্য ডেইলি স্টার বাংলা জানিয়েছে, ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য খামারি সরকারের কাছে আর্থিক সহায়তা বা স্বল্প সুদে ঋণের আবেদন জানিয়েছেন। তিনি মনে করেন, রাষ্ট্রীয় সহায়তা না পেলে অর্ধকোটি টাকার এই লোকসান কাটিয়ে ওঠা তাঁর পক্ষে অসম্ভব।
কারণ এখনো নিশ্চিত নয়: প্রাণিসম্পদ দপ্তরের বক্তব্য
কোনো পত্রিকাই নিশ্চিত রোগনির্ণয়ের খবর দেয়নি। দ্য ডেইলি স্টার বাংলা মৃত্যুর কারণকে ‘অজ্ঞাত রোগ’ বলেছে এবং লিখেছে, খামারির সন্দেহ বার্ড ফ্লু। জাগো নিউজের প্রতিবেদনে মুরগিগুলো বার্ড ফ্লুতে মারা গেছে বলে লেখা হলেও সেখানে উদ্ধৃত কর্মকর্তা বলেছেন, পরীক্ষা তখনো বাকি। তাই এই প্রতিবেদনে বার্ড ফ্লুকে খামারির সন্দেহ হিসেবেই রাখা হয়েছে, নিশ্চিত কারণ হিসেবে নয়।
জাগো নিউজকে বাগেরহাট সদর উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. পলাশ কুমার দাস বলেন, ‘আমরা খামার পরিদর্শনে যাচ্ছি। নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষা করা হবে। রিপোর্ট পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ দ্য ডেইলি স্টার বাংলার প্রতিবেদনে তিনি জানান, তাঁদের একটি দল খামারটি পরিদর্শন করেছে। তিনি বলেন, ‘আমরা পরীক্ষার জন্য নমুনা সংগ্রহ করেছি। ল্যাব পরীক্ষার ফলাফল পাওয়ার পর মৃত্যুর সঠিক কারণ নিশ্চিত হওয়া যাবে।’ তবে ক্ষতিগ্রস্ত খামারিকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার বিষয়ে তিনি তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মন্তব্য করেননি বলে পত্রিকাটি জানিয়েছে।
উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তর হলো প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের (ডিএলএস) মাঠপর্যায়ের কার্যালয়; এই সরকারি সংস্থা প্রাণিস্বাস্থ্য ও উৎপাদনের দায়িত্বে। অধিদপ্তরের নিজস্ব ইতিহাস অনুযায়ী, এর শিকড় ১৮৯৩ সালে কলকাতার রাইটার্স বিল্ডিংয়ে যাত্রা শুরু করা সিভিল ভেটেরিনারি ডিপার্টমেন্টে; ১৯৬০ সালে পুনর্গঠনের পর এর নাম হয় Directorate of Livestock Services, আর ২০১০ সালে পশুসম্পদ অধিদপ্তর ‘প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর’ নামে নতুন যাত্রা শুরু করে। অধিদপ্তরের একটি কেন্দ্রীয় রোগ অনুসন্ধান গবেষণাগার রয়েছে, যার তথ্য ব্যবস্থাপনা সিস্টেমের লিংক অধিদপ্তরের ওয়েবসাইটে দেওয়া আছে।

হোয়াইট লেগহর্ন: ডিমের জন্য পালিত জাত
হোয়াইট লেগহর্ন হলো লেগহর্ন জাতের মুরগির একটি ধরন। জাতটির উৎপত্তি মধ্য ইতালির তোসকানা (টাসকানি) অঞ্চলে। প্রায় ১৮২৮ সালে বন্দরনগরী লিভোর্নো থেকে এই মুরগি উত্তর আমেরিকায় রপ্তানি হয়, আর ১৮৭০ সালে যুক্তরাষ্ট্র থেকে জাতটি ব্রিটেনে পৌঁছায়। বাণিজ্যিক খামারে পালিত বেশি ডিম দেওয়া সংকর মুরগি তৈরিতে হোয়াইট লেগহর্ন ব্যাপকভাবে ব্যবহার করা হয়েছে।
লেগহর্ন মুরগি সাদা খোসার ডিম ভালো দেয়; বছরে গড়ে প্রায় ২৮০টি, কখনো ৩০০ থেকে ৩২০টি পর্যন্ত। এরা হালকা ওজনের মুরগি: মুরগির ওজন প্রায় ২.০ থেকে ২.৫ কেজি, মোরগের প্রায় ২.৪ থেকে ৩.৪ কেজি। মাংসের জন্য নয়, ডিমের জন্যই এদের পালন করা হয়।
বার্ড ফ্লু কী: বিশ্ব প্রাণিস্বাস্থ্য সংস্থা ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ব্যাখ্যা
বিশ্ব প্রাণিস্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউওএএইচ) বলছে, এভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জা বা বার্ড ফ্লু অত্যন্ত ছোঁয়াচে একটি ভাইরাসজনিত রোগ, যা গৃহপালিত ও বন্য দুই ধরনের পাখিকেই আক্রান্ত করে। এর উচ্চ রোগসৃষ্টিকারী ধরন (এইচপিএআই) মারাত্মক উপসর্গ ও উচ্চ মৃত্যুহার ঘটাতে পারে; সংস্থাটির ভাষায়, খামারিরা তাঁদের ঝাঁকে প্রায়ই ৫০ শতাংশের কাছাকাছি মৃত্যু দেখতে পারেন। আক্রান্ত পাখির নিঃসরণের সরাসরি সংস্পর্শে ভাইরাসটি ছড়ায়, আর খামারের যন্ত্রপাতির মাধ্যমে এক খামার থেকে আরেক খামারে সহজেই পৌঁছে যেতে পারে।
ডব্লিউওএএইচের নির্দেশনা হলো, এভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জা শনাক্ত বা সন্দেহ হওয়ামাত্র ভেটেরিনারি কর্তৃপক্ষকে জানাতে হবে। সংস্থাটি কঠোর জৈবনিরাপত্তা ও পরিচ্ছন্নতার পরামর্শ দেয়, যার মধ্যে আছে হাঁস-মুরগিকে বন্য পাখির সংস্পর্শ থেকে দূরে রাখা এবং বিষ্ঠা, লিটার ও মৃত প্রাণী যথাযথভাবে অপসারণ করা। গৃহপালিত পাখিতে প্রাদুর্ভাব হলে সাধারণত আক্রান্ত ও ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শে থাকা পাখি মেরে ফেলার নীতি নেওয়া হয়, এবং মেরে ফেলা প্রাণী মানুষের খাদ্য বা পশুখাদ্যের শৃঙ্খলে ঢুকতে দেওয়া যাবে না বলে সংস্থাটি জানায়।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) ২০২৬ সালের ২১ জানুয়ারি তারিখের তথ্যপত্র অনুযায়ী, বেশির ভাগ ইনফ্লুয়েঞ্জা এ উপধরনের প্রধান প্রাকৃতিক আধার বন্য জলচর পাখি। কম ও উচ্চ রোগসৃষ্টিকারী ধরনের পার্থক্যটি মুরগির রোগের সঙ্গে সম্পর্কিত, মানুষের রোগের সঙ্গে নয়। মানুষের সংক্রমণের প্রধান ঝুঁকি হলো জীবিত বা মৃত আক্রান্ত প্রাণীর সংস্পর্শ, কিংবা জীবিত পাখির বাজারের মতো দূষিত পরিবেশ। মানুষের ক্ষেত্রে সংক্রমণ হালকা ফ্লুর মতো উপসর্গ বা চোখের প্রদাহ থেকে শুরু করে মারাত্মক শ্বাসতন্ত্রের রোগ ও মৃত্যু পর্যন্ত গড়াতে পারে।
জনসাধারণের জন্য ডব্লিউএইচওর পরামর্শ হলো, বন্য পাখিসহ অসুস্থ বা মৃত প্রাণীর সংস্পর্শ কঠোরভাবে এড়িয়ে চলা এবং বারবার হাত ধোয়া, বিশেষ করে প্রাণী ও তাদের পরিবেশের সংস্পর্শের আগে ও পরে। সংস্থাটি আরও বলছে, সঠিকভাবে প্রস্তুত ও রান্না করা মুরগির মাংস বা ডিমের মাধ্যমে এভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাস মানুষের শরীরে ছড়ানোর কোনো প্রমাণ নেই; ডিম, মাংস ও অন্যান্য প্রাণিজ খাদ্য সঠিকভাবে নাড়াচাড়া, সংরক্ষণ ও রান্না করতে হবে। অসুস্থ পাখির সংস্পর্শের পর কেউ অসুস্থ হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
এর আগে বাংলাদেশে বার্ড ফ্লু
বাংলাদেশে প্রথম বার্ড ফ্লু শনাক্ত হয় ২০০৭ সালের মার্চে, ঢাকার কাছে। ২০০৭ সালের ১৫ জুলাই রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, তত দিনে ভাইরাসটি দেশের ৬৪ জেলার ১৭টিতে ছড়িয়েছে, বেশির ভাগই উত্তরাঞ্চলে; প্রাদুর্ভাব শুরুর পর থেকে ২ লাখ ৫৭ হাজার মুরগি মেরে ফেলা হয়েছে এবং ২২ লাখের বেশি ডিম নষ্ট করা হয়েছে। একই প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশে প্রায় ৪০ লাখ মানুষ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে মুরগি পালনের সঙ্গে যুক্ত।
দ্য ডেইলি স্টার বাংলা ২০২৫ সালের ২৬ মার্চের এক প্রতিবেদনে স্মরণ করিয়ে দেয়, ২০০৭ সালের প্রাদুর্ভাবে প্রায় ৩৭০টি খামার বন্ধ হয়ে যায় এবং ১০ লাখেরও বেশি মুরগি মেরে ফেলা হয়; ২০১৩ সালে রোগটি আবার দেখা দিলেও শিল্প বড় ক্ষতির মুখে পড়েনি; ২০১৭ সালের শেষ দিকে আবারও কয়েকটি এলাকায় বার্ড ফ্লু দেখা দেয়, এবং এসব প্রাদুর্ভাবে প্রায় ৫০ লাখ মুরগি মেরে ফেলা হয় ও অনেক খামার বন্ধ হয়ে যায়। ওয়ার্ল্ড অর্গানাইজেশন ফর অ্যানিমেল হেলথের বরাত দিয়ে রয়টার্সের প্রতিবেদন উদ্ধৃত করে পত্রিকাটি লেখে, বাংলাদেশি খামারে ২০০৭ সালে প্রথম এবং ২০১৮ সালে সর্বশেষ বার্ড ফ্লু শনাক্ত হয়েছিল; আর ২০০৮ সালের মে মাসে দেশে মানুষের শরীরে বার্ড ফ্লু সংক্রমণ ধরা পড়ে।
২০২৫ সালের মার্চের ওই প্রতিবেদনটি ছিল সাত বছর পর নতুন শনাক্তের খবর: যশোরের একটি সরকারি মুরগির খামারে ২০২৫ সালের ১৩ মার্চ সংক্রমণ ধরা পড়ে। যশোরের জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা পত্রিকাটিকে জানান, শনাক্ত ভাইরাসটি এভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জা টাইপ-এ; খামারের ৩ হাজার ৯৭৮টি মুরগির মধ্যে ১ হাজার ৯০০টি মারা গেছে এবং সংক্রমণ যেন না ছড়ায়, সেজন্য বাকিগুলো মেরে ফেলা হয়। প্রান্তিক খামারিদের সংগঠন বাংলাদেশ পোল্ট্রি অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি তখন বাজারে অসুস্থ মুরগি বিক্রি ঠেকাতে নজরদারি, একটি বিশেষ টাস্কফোর্স গঠন এবং খামারিদের জন্য আর্থিক সহায়তা ও ক্ষতিপূরণের দাবি জানান।
২০২৫ সালে মানুষের দুটি সংক্রমণও শনাক্ত হয়। যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব মিনেসোটার সেন্টার ফর ইনফেকশাস ডিজিজ রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি (সিআইডিআরএপি) ২০২৫ সালে জানায়, খুলনা বিভাগের দুই শিশুর শরীরে এইচ৫এন১ শনাক্তের খবর বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাকে জানানো হয়েছে এবং দুজনই সুস্থ হয়েছে। একজনের নমুনা নেওয়া হয়েছিল ২০২৫ সালের এপ্রিলে, যা ৪ মে জানানো হয়; অন্যজনের সংক্রমণ ধরা পড়ে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে নেওয়া নমুনার পরবর্তী পরীক্ষায়, যা জানানো হয় ২৭ মে। রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) জিনোম বিশ্লেষণে ক্লেড ২.৩.২.১এ পাওয়া যায়, যা বাংলাদেশ ও ভারতের পাখিতে প্রচলিত একটি ধারা। প্রথম শিশুটি অসুস্থ হওয়ার এক মাস আগে একই জেলায় হাঁস-মুরগিতে প্রাদুর্ভাবের খবর পাওয়া গিয়েছিল।
পশুরোগ আইন, ২০০৫ যা বলে
খামারে রোগের প্রাদুর্ভাব সন্দেহ হলে যে আইন প্রযোজ্য, তা হলো পশুরোগ আইন, ২০০৫ (২০০৫ সনের ৫ নং আইন, তারিখ ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০০৫); এ আইনে ‘পশু’র সংজ্ঞায় পাখিও অন্তর্ভুক্ত। আইনের তফসিলে যেসব সংক্রামক রোগের তালিকা আছে, তার মধ্যে হাঁস-মুরগির রোগ হিসেবে রয়েছে এভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জা, নিউক্যাসল ডিজিজ (রানীক্ষেত), ফাউল কলেরা, ফাউল টাইফয়েড, পুলোরাম ডিজিজ, গামবোরো ডিজিজ, মারেক্স ডিজিজ, ফাউল পক্স ও ইনফেকশাস ব্রঙ্কাইটিস। কোনো নির্দিষ্ট মড়কের পেছনে এর কোনটি দায়ী, নাকি অন্য কিছু, তা পরীক্ষা ও গবেষণাগারের বিশ্লেষণের মাধ্যমে নির্ধারণ করার দায়িত্ব ভেটেরিনারি কর্তৃপক্ষের।
এ ধরনের ক্ষেত্রে আইনের প্রধান বিধানগুলো হলো:
- ধারা ৩: কোনো পশু তফসিলভুক্ত রোগে আক্রান্ত বলে বিশ্বাস করার যুক্তিসঙ্গত কারণ থাকলে মালিক, তত্ত্বাবধায়ক, পশু চিকিৎসক বা অধিদপ্তরের মাঠকর্মী অনতিবিলম্বে মহাপরিচালক বা ক্ষমতাপ্রাপ্ত ভেটেরিনারি কর্মকর্তাকে লিখিতভাবে জানাবেন; কর্মকর্তা পশু ও তা রাখার স্থান পরীক্ষা করে নির্ধারিত ব্যবস্থা নেবেন।
- ধারা ৪: পশু রোগাক্রান্ত বলে নিশ্চিত হলে মালিক বা তত্ত্বাবধায়ক সেটিকে অন্য পশু থেকে আলাদা রাখবেন এবং সুস্থ পশু যেন যতদূর সম্ভব এর সংস্পর্শে না আসে, সে ব্যবস্থা নেবেন।
- ধারা ১০: রোগে মারা গেছে বলে সন্দেহ হলে ভেটেরিনারি কর্মকর্তা মৃতদেহের পোস্টমর্টেম পরীক্ষা করতে এবং গবেষণাগারে পরীক্ষার জন্য দেহের অংশ সংগ্রহ করতে পারবেন।
- ধারা ১১(১): রোগে মারা গেছে বলে সন্দেহযুক্ত পশুর মৃতদেহ চামড়াসহ অন্যূন ছয় ফুট মাটির নিচে পুঁতে, আগুনে পুড়িয়ে বা নির্ধারিত অন্য পদ্ধতিতে অপসারণ করতে হবে।
- ধারা ১১(৩): রোগাক্রান্ত পশুর মৃতদেহ, কিংবা তার সংস্পর্শে আসা খড়কুটা, ঘাস, বর্জ্য বা অন্য বস্তু জনস্বাস্থ্য বা পশুস্বাস্থ্যের জন্য হুমকি হতে পারে এমন কোনো স্থানে ফেলা যাবে না।
- ধারা ১৬: নিবন্ধন ছাড়া বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে হাঁস-মুরগি বা গবাদিপশুর খামার স্থাপন ও পরিচালনা করা যাবে না; সরকারি খামার এবং পারিবারিক ব্যবহারের জন্য পালিত হাঁস-মুরগি এর বাইরে।
- ধারা ২৫: আইন বা বিধি লঙ্ঘন করলে অনূর্ধ্ব দুই বছর কারাদণ্ড, অনূর্ধ্ব ১০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড হতে পারে।
ডব্লিউওএএইচের নির্দেশনাও একই দিকে: মৃত পাখি ও লিটার যথাযথভাবে অপসারণ করতে হবে, যাতে সেগুলো সংক্রমণ আরও ছড়িয়ে না দেয়। মৃত মুরগি অপসারণ নিয়ে প্রাণিসম্পদ দপ্তর খামারটিকে কোনো নির্দেশনা দিয়েছে কি না, প্রতিবেদনগুলোতে তা বলা হয়নি।
সংখ্যায় দেশের পোল্ট্রি খাত
এই খাতের আকার বোঝা যায় প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের প্রকাশনা ‘লাইভস্টক ইকোনমি অ্যাট আ গ্লান্স ২০২৪-২০২৫’ থেকে, যা বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্যের ওপর ভিত্তি করে তৈরি। এতে ২০২৪-২৫ সালে দেশে মুরগির সংখ্যা ৩,৩৬০.৭০ লাখ এবং হাঁসের সংখ্যা ৭০৫.৮২ লাখ ধরা হয়েছে; মোট হাঁস-মুরগি ৪,০৬৬.৫২ লাখ। দশ বছর আগে, ২০১৫-১৬ সালে, মুরগির সংখ্যা ছিল ২,৬৮৩.৯৩ লাখ।
একই প্রকাশনা অনুযায়ী, ডিম উৎপাদন ২০১৫-১৬ সালের ১,১৯১.২৪ কোটি থেকে বেড়ে ২০২৩-২৪ সালে ২,৩৭৪.৯৭ কোটি এবং ২০২৪-২৫ সালে ২,৪৪০.৬৫ কোটিতে দাঁড়িয়েছে। জনপ্রতি বছরে ১০৪টি ডিম ধরে অধিদপ্তর বার্ষিক চাহিদা হিসাব করেছে ১,৮৫০.১৬ কোটি; ২০২৪-২৫ সালে জনপ্রতি বছরে ডিমের প্রাপ্যতা দেখানো হয়েছে ১৩৭.১৯টি।
প্রকাশনাটি বলছে, ২০২৪-২৫ সালে স্থির মূল্যে মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) প্রাণিসম্পদ খাতের অবদান ছিল ১.৮১ শতাংশ (সাময়িক হিসাব), প্রবৃদ্ধি ৩.১৯ শতাংশ, আর কৃষিজ জিডিপিতে এর অংশ ১৬.৫৪ শতাংশ। দেশের ২০ শতাংশ মানুষের প্রত্যক্ষ এবং ৫০ শতাংশের আংশিক কর্মসংস্থান এই খাতে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। চপাতলার খামারটির মতো বাণিজ্যিক লেয়ার খামারগুলো এই ডিম সরবরাহের অংশ।
বাগেরহাট সদর: খামারটি যেখানে
বাগেরহাট জেলা খুলনা বিভাগে, দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমে; এর উত্তরে গোপালগঞ্জ ও নড়াইল, দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর। বাংলাপিডিয়ার তথ্যমতে, জেলার আয়তন ৩,৯৫৯.১১ বর্গকিলোমিটার এবং ২০১১ সালের আদমশুমারিতে জনসংখ্যা ছিল ১৪,৭৬,০৯০; জেলাটি গঠিত হয় ১৯৮৪ সালে, উপজেলা ৯টি। প্রধান নদীর মধ্যে আছে পশুর, মধুমতি, বলেশ্বর ও ভোলা। একই সূত্র অনুযায়ী, জেলার ৫৪ শতাংশ পরিবারের আয়ের প্রধান উৎস কৃষি।
বাগেরহাট সদর উপজেলার আয়তন ২৭২.৭৩ বর্গকিলোমিটার, ২০১১ সালের আদমশুমারিতে জনসংখ্যা ২,৬৬,৩৮৯। বাংলাপিডিয়া উপজেলার উল্লেখযোগ্য নদী হিসেবে ভৈরব, চিত্রা, দাউদখালী ও তালেশ্বরের নাম দিয়েছে এবং উপজেলায় ৩২০টি হাঁস-মুরগির খামার, ১০টি হ্যাচারি, ৪২টি দুগ্ধখামার ও ১০,৪৬১টি চিংড়িঘেরের হিসাব দিয়েছে; পাশাপাশি এখানে ধান, পাট, পান, সবজি এবং নারকেল ও সুপারির মতো ফল উৎপন্ন হয়।

এই উপজেলাতেই ষাটগম্বুজ মসজিদ, যাকে বাংলাপিডিয়া বাংলাদেশের সুলতানি আমলের মসজিদগুলোর মধ্যে বৃহত্তম বলে বর্ণনা করেছে। মসজিদটি খান জাহানের নির্মিত বলে ধরা হয়; তিনি ১৪৫৯ সালে মৃত্যু পর্যন্ত হাভেলি-খলিফাতাবাদ থেকে অঞ্চলটি শাসন করেন, যাকে বর্তমান বাগেরহাট হিসেবে শনাক্ত করা হয়। মসজিদটি ঘোড়াদিঘির পূর্ব পাড়ে, বাগেরহাট শহর থেকে প্রায় তিন মাইল পশ্চিমে।

ছবি: Stephen Ausmus, USDA Agricultural Research Service / উইকিমিডিয়া কমন্স (পাবলিক ডোমেইন)
সূত্র: জাগো নিউজ, দ্য ডেইলি স্টার বাংলা, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর (লাইভস্টক ইকোনমি অ্যাট আ গ্লান্স ২০২৪-২০২৫; অধিদপ্তরের ইতিহাস), পশুরোগ আইন, ২০০৫ (বিডিলজ, আইন মন্ত্রণালয়), বিশ্ব প্রাণিস্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউওএএইচ), বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও), সিআইডিআরএপি, এনবিসি নিউজ (রয়টার্স), বাংলাপিডিয়া, উইকিপিডিয়া (লেগহর্ন মুরগি)




মন্তব্য
(০)