চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার বাঁশবাড়িয়া ইউনিয়নের মধ্যম বাঁশবাড়িয়া গ্রামের কৃষক মহি উদ্দিন (৩৫) ২০২৩ সালের অক্টোবরে পাহাড়ি জমিতে বেগুনি রঙের গ্রীষ্মকালীন রূপবান শিম চাষ করে এলাকায় পরিচিতি পেয়েছিলেন। ২০২৩ সালের ২৪ অক্টোবর তাঁকে নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করে জাগো নিউজ ২৪। প্রতিবেদনটিতে বলা হয়, ওই মৌসুমে তিনি ৮ লাখ টাকার শিম বিক্রি করেছেন এবং পরের দুই মাসে আরও ৪ লাখ টাকার শিম বিক্রির আশা করছেন। তাঁর নিজের ভাষ্য ও স্থানীয় কৃষি দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এক বাজারেই তিনি ২ লাখ ৯৬ হাজার টাকার শিম বিক্রি করেছিলেন।
মহি উদ্দিন আব্দুর রহমানের ছেলে। জাগো নিউজকে তিনি জানান, সমতলে যে জমিতে তিনি আগে চাষ করতেন, তার বেশির ভাগই শিল্পকারখানার মালিকেরা কিনে নিয়েছেন; সে কারণে তিন বছর আগে তিনি পাহাড়ে চাষাবাদ শুরু করেন। ২০২৩ সালে তিনি প্রায় ২৫০ শতক পাহাড়ি জমিতে রূপবান শিম চাষ করেন। পাশাপাশি লাউ, বরবটি, ঝিঙা, চিচিঙ্গা, ঢ্যাঁড়স ও অন্যান্য সবজিও আবাদ করেন।
এক বাজারে ২ লাখ ৯৬ হাজার টাকার শিম
জাগো নিউজকে মহি উদ্দিন বলেন, "এক বাজারে ২ লাখ ৯৬ হাজার টাকার শিম বিক্রি করেছি।" ফসল তোলার শুরুতে তাঁর শিম পাইকারি প্রতি কেজি ১৭০ টাকা দরে বিক্রি হয়েছিল; অক্টোবরের শেষ দিকে তিনি পাইকারি বিক্রি করছিলেন কেজিপ্রতি ১৩০ টাকায়। ক্রেতা খুঁজতে তাঁকে দূরের হাটে শিম বয়ে নিতে হয় না বলেও জানান তিনি। তাঁর ভাষায়, "আমার শিম বাজারে মোবাইল ফোনে বিক্রি হয়ে যায়। ঢাকা-চট্টগ্রামের বড় বড় পাইকাররা খবর নিয়ে পাহাড়ের গোড়ায় এসে অপেক্ষা করেন। পরে তা ট্রাকে করে নিয়ে যান।"
বাঁশবাড়িয়া ইউনিয়নের দায়িত্বে থাকা উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা মোহাম্মদ আবুল মনছুরও এই হিসাব নিশ্চিত করেন। তিনি মহি উদ্দিনকে বাঁশবাড়িয়ার সবচেয়ে পরিশ্রমী কৃষক হিসেবে বর্ণনা করে বলেন, ২০২৩ সালের মৌসুমে তিনি এক বাজারে ২ লাখ ৯৬ হাজার টাকার শিম বিক্রি করেছেন। কর্মকর্তার ভাষ্যমতে, ওই শিম পাহাড় থেকে তুলে নিচের সড়ক পর্যন্ত আনতে তিন দিন লেগেছিল।
মহি উদ্দিন যে দামের কথা বলেছেন, উপজেলা কৃষি অফিস ও আরও কয়েকজন কৃষকের দেওয়া তথ্যের সঙ্গে তা মিলে যায়। জাগো নিউজকে তাঁরা জানান, রূপবান শিম ওঠার শুরুতে প্রতি কেজি পাইকারি বিক্রি হয়েছিল ১৬০ থেকে ১৭০ টাকায়, আর অক্টোবরের শেষেও দাম মিলছিল ১৩০ থেকে ১৪০ টাকা। কৃষি অফিসের ভাষ্য, খেতগুলো দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় হওয়ায় সমতলের তুলনায় উৎপাদন খরচ কিছুটা বেশি পড়ে।
সমতল ছেড়ে পাহাড়ে
মহি উদ্দিনের পাহাড়ে যাওয়ার পেছনে রয়েছে আশপাশের জমির বদলে যাওয়া। জাগো নিউজকে তিনি বলেন, "প্রথমে সমতলে বিভিন্ন শাক-সবজি চাষ করেছি। পাশাপাশি কাঠের ও সজনার ব্যবসা করেছি। এলাকার জমিগুলো বিভিন্ন শিল্প-মালিক কিনে নিয়েছেন। এখন ফসলি জমি নেই বললেই চলে। তাই ৩ বছর আগে কয়েকজনের পরামর্শে পাহাড়ে চাষাবাদ শুরু করেছি।"
পাহাড়ে চাষে অনেক পরিশ্রম করতে হয় বলে জানান তিনি। তাঁর খেতে বছরের বারো মাসই তিনজন লোক কাজ করেন; তাঁর ভাষ্যমতে প্রত্যেকের মাসিক বেতন ২০ হাজার টাকা। শিম তোলা ও পরিচর্যার সময় কখনো আরও ১০ থেকে ১২ জন শ্রমিক কাজ করেন। সার, কীটনাশকসহ বিভিন্ন উপকরণের দাম বেড়ে যাওয়ায় খরচও বেশি পড়ছে বলে জানান তিনি। মহি উদ্দিনের দাবি, আগের বছর, অর্থাৎ ২০২২ সালে সব খরচ বাদ দিয়ে রূপবান শিম বিক্রি করে তাঁর ৫ লাখ টাকা লাভ হয়েছিল।
উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা আবুল মনছুর জাগো নিউজকে বলেন, মহি উদ্দিনের অভিজ্ঞতা ব্যতিক্রম নয়। তাঁর ভাষ্য, বাঁশবাড়িয়ার সমতলে আবাদি জমির পরিমাণ দিন দিন কমে যাচ্ছে, কারণ শিল্প-মালিকেরা এসব জমি কিনে নিচ্ছেন; ফলে অনেক কৃষক বাধ্য হয়ে পাহাড়ে চাষ করছেন।
৭৫ একর জমি, ৩০০ কৃষক
জাগো নিউজের প্রতিবেদনে উপজেলা কৃষি অফিসের বরাতে বলা হয়, ২০২৩ সালে সীতাকুণ্ড উপজেলায় ৭৫ একর জমিতে রূপবান শিমের আবাদ হয়েছে, চাষ করেছেন প্রায় ৩০০ কৃষক। প্রতি বছর এপ্রিল মাসে এই শিম লাগানো হয়; প্রায় ৬০ দিনের মাথায় তোলা শুরু হয় এবং ডিসেম্বর পর্যন্ত বিক্রি চলে।
২০২৩ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর কুমিরা ইউনিয়নের পাহাড় থেকে পাঠানো প্রতিবেদনে প্রথম আলোও নিজস্ব হিসাবে একই চিত্র তুলে ধরে। উপজেলা কৃষি বিভাগের তথ্য উদ্ধৃত করে পত্রিকাটি জানায়, ২০২১ সালে সীতাকুণ্ডে গ্রীষ্মকালীন শিমের চাষ হয়েছিল ২৫ হেক্টর জমিতে, ২০২২ সালেও একই পরিমাণ জমিতে, আর ২০২৩ সালে তা বেড়ে হয় ৩০ হেক্টর। প্রথম আলোর হিসাবেও চাষির সংখ্যা প্রায় ৩০০। পত্রিকাটি জানায়, রূপবান শিমের বেশির ভাগ আবাদ হয়েছে কুমিরার পাহাড়ি এলাকায়; এ ছাড়া বাঁশবাড়িয়া, সৈয়দপুর ও বারৈয়ারঢালা ইউনিয়ন এবং সীতাকুণ্ড পৌর সদরেও এর চাষ হয়েছে।
কৃষি কর্মকর্তা ও কৃষকেরা প্রথম আলোকে জানান, গ্রীষ্মকালীন শিম এপ্রিল মাসে লাগানো হয়; প্রায় ৬০ দিন পর, অর্থাৎ জুন মাস থেকে কৃষকেরা শিম তুলতে শুরু করেন এবং ডিসেম্বর পর্যন্ত বিক্রি চলে। ডিসেম্বরে পানির সংকটে রূপবানের উৎপাদন কমতে থাকে, অন্যদিকে নভেম্বরের শেষ দিক থেকে শীতকালীন শিম বাজারে আসতে শুরু করে।

রূপবান: সীতাকুণ্ডের গ্রীষ্মকালীন শিম
সীতাকুণ্ড শিমের জন্য বিখ্যাত, তবে দীর্ঘদিন ধরে সেই খ্যাতি ছিল মূলত শীতকালীন শিমের। প্রথম আলোর বর্ণনায়, উপজেলাটি ছুরি, লইট্টা ও বাঁটা জাতের শীতকালীন শিমের জন্য পরিচিত; শীতে মাঠজুড়ে, এমনকি জমির আলেও এসব শিমের চাষ হয়। রূপবান আলাদা। ২০২১ সালের ৩১ অক্টোবর প্রথম আলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই শিমের রং বেগুনি; বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ মাসে, অর্থাৎ গরমের সময় লাগানো হয় বলে একে গ্রীষ্মকালীন শিমও বলা হয়। শ্রাবণ মাস থেকে এর ফলন শুরু হয়।
২০২১ সালে উপজেলা কৃষি বিভাগ প্রথম আলোকে জানায়, এই জাতের আকর্ষণ এর দাম, কারণ শিমের মৌসুম না থাকার সময়ে এটি বাজারে আসে। সে বছর উপজেলায় ২৫ হেক্টর জমিতে রূপবান, ইপসা-১ ও ইপসা-২ জাতের শিমের আবাদ হয়েছিল; এর বেশির ভাগ বারৈয়ারঢালা ও সৈয়দপুর ইউনিয়নে। শুধু বারৈয়ারঢালার টেরিয়াইল ব্লকেই ১০০ জন কৃষক ১০ হেক্টর জমিতে এই শিম চাষ করেছিলেন। একজন উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা পত্রিকাটিকে জানান, তাঁরা হেক্টরপ্রতি প্রায় ছয় মেট্রিক টন উৎপাদনের আশা করছেন; অন্যান্য শিমের তুলনায় রূপবানের ফলন কিছুটা কম হলেও দাম বেশি হওয়ায় কোনো কৃষককে লোকসান গুনতে হয় না।
২০২১ সালে টেরিয়াইলের কৃষকেরা প্রথম আলোকে এই ফসলের ধরন সম্পর্কে জানান। তাঁদের ভাষ্য, সপ্তাহে দুই দিন শিম তুলে বাজারে নেওয়া যায় এবং একবার লাগালে প্রায় এক বছর ধরে ফলন পাওয়া যায়। তবে শীতে অন্যান্য শিম বাজারে এলে রূপবানের দাম একেবারে কমে যায়; তখন অনেকে কাঁচা শিম না তুলে বিচি সংগ্রহ করেন।
২০২৩ সালের প্রতিবেদনে প্রথম আলো কুমিরার মাঠ থেকে আরও বিস্তারিত তথ্য দেয়। কৃষকেরা জানান, গ্রীষ্মকালীন রূপবান শিমের ফলন শীতকালীন শিমের চেয়ে দীর্ঘ সময় ধরে পাওয়া যায়, তাই এতে লাভও বেশি। রেলওয়ের পুরোনো টিবি হাসপাতাল এলাকা থেকে পূর্ব দিকে অন্তত তিনটি পাহাড়ের ঢালে শিমের চাষ হয়েছিল। পাহাড়ের চূড়া থেকে নিচের দিকে ঢালু অংশে বাঁশের কঞ্চি দিয়ে খুঁটি গেড়ে মাচা তৈরি করা হয়েছিল, আর প্রতিটি খুঁটির গোড়ায় লাগানো হয়েছিল তিনটি করে শিমগাছ। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা পত্রিকাটিকে বলেন, দীর্ঘ সময় ধরে ফলন পাওয়া যায় এবং শীতকালীন শিমের চেয়ে দামও বেশি মেলে বলে কৃষকেরা এই শিমের দিকে ঝুঁকছেন; ফলে প্রতি বছর এর আবাদ বাড়ছে।
নামটি শুধু সীতাকুণ্ডেই সীমাবদ্ধ নয়। ২০২০ সালের সেপ্টেম্বরে প্রথম আলো জানায়, 'শিম সাগর' নামে পরিচিত পাবনার আটঘরিয়া উপজেলায় সেই মৌসুমে ১ হাজার ৫৫০ হেক্টর শিমের মধ্যে ৪৫০ হেক্টরে 'রূপভান' নামের একটি আগাম জাতের শিমের আবাদ হয়েছিল; সঙ্গে ছিল 'অটো' ও 'চকলেট' নামের জাত। সেখানকার কৃষকদের ভাষ্য, বেগুনি ফুল আর হালকা লালচে শিমের সৌন্দর্যের জন্যই এর নাম রূপভান। তখন সেখানে পাইকারিতে প্রতি কেজি শিম বিক্রি হচ্ছিল ১৫০ থেকে ১৭০ টাকায়।

পাহাড়েই কেন এই চাষ
সীতাকুণ্ডে পাহাড়ের ঢালে গ্রীষ্মকালীন শিম চাষের একটি বড় কারণ ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরের প্রতিবেদনে ব্যাখ্যা করে প্রথম আলো। বর্ষায় সমতলে অতিবৃষ্টিতে জমিতে পানি জমে থাকে, আর জলাবদ্ধতায় শিমের লতা নষ্ট হয়ে যেতে পারে। পাহাড়ে পানি জমে না, তাই গাছ সেভাবে নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে না। পত্রিকাটি আরও জানায়, পাহাড়ে শিমের চাষ বাড়তে থাকায় অনাবাদি জমির পরিমাণও কমছে।
উদ্ভিদটি সম্পর্কে জানা তথ্যের সঙ্গেও এটি মেলে। যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগের (ইউএসডিএ) প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ সার্ভিসের প্রকাশিত শিম-উদ্ভিদ (ল্যাবল্যাব) নির্দেশিকায় বলা হয়েছে, এটি বেলে থেকে এঁটেল পর্যন্ত নানা ধরনের মাটিতে এবং ৪.৫ থেকে ৭.৫ পিএইচ মাত্রার মধ্যে জন্মায়, তবে লবণাক্ত বা পানি নিষ্কাশন ভালো নয় এমন মাটিতে ভালো হয় না। অম্লীয় মাটিতে এটি বেশির ভাগ শিম্বজাতীয় ফসলের চেয়ে ভালো জন্মায়, খরা বা ছায়াতেও বাড়তে পারে, এবং সাধারণ শিম (কমন বিন) ও কাউপির চেয়ে বেশি খরাসহিষ্ণু; এর শিকড় প্রায় ছয় ফুট গভীর থেকে পানি টেনে নিতে পারে।
এই পাহাড়গুলো সীতাকুণ্ড পাহাড়শ্রেণির অংশ, যা উপজেলার মাঝখান দিয়ে প্রায় ৩২ কিলোমিটার লম্বা একটি শৈলশিরা। এর সর্বোচ্চ চূড়া চন্দ্রনাথ বা সীতাকুণ্ড চূড়া, উচ্চতা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৩৫২ মিটার; এটি চট্টগ্রাম জেলার সবচেয়ে উঁচু চূড়া। উপজেলার একাংশ এই নিচু পাহাড়ে ঢাকা, বাকি অংশ পাহাড় আর সন্দ্বীপ চ্যানেলের মাঝের প্লাবনভূমি।
ঢালে চাষের খরচও আছে। জাগো নিউজ জানায়, দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় উৎপাদন খরচ কিছুটা বেশি। এক বাজারের শিম নিচে নামাতে মহি উদ্দিনের তিন দিন লেগেছিল, আর সারা বছর তাঁকে শ্রমিক রাখতে হয়। ২০২৩ সালে কৃষকেরা প্রথম আলোকে জানান, ফুল আসার সময় বৃষ্টি হলে ফুল ঝরে যেতে পারে, যা ফলন কমিয়ে দেয়। কুমিরা ইউনিয়নের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা বলেন, তাঁরা পাহাড়ে গিয়ে তদারক করেন এবং কৃষকদের পরামর্শ দেন, বিশেষ করে ফুল ধরে রাখতে যেসব ওষুধ প্রয়োগ করতে হয় সে বিষয়ে। কোনো প্রতিবেদনেই ওষুধের নাম বা মাত্রা উল্লেখ করা হয়নি; এমন পরামর্শ, মাত্রাসহ, কৃষকের নিজ ইউনিয়নের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা বা উপজেলা কৃষি অফিস থেকে নেওয়াই নিয়ম।
মৌসুমের বাইরের দাম ও বাজার
গ্রীষ্মকালীন শিমের লাভ আসে সময়ের কারণে। ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে প্রথম আলো জানায়, মৌসুমে সীতাকুণ্ডে কৃষক পর্যায়ে শীতকালীন শিম যেখানে কেজিপ্রতি ৩০ থেকে ৪০ টাকায় বিক্রি হয়, সেখানে গ্রীষ্মকালীন শিম বিক্রি হচ্ছিল ১১০ থেকে ১৫০ টাকায়; কারণ এটি যখন বাজারে আসে, তখন শিমের মৌসুম নয়। ২০২৩ সালের ফলন ওঠার শুরুতে কৃষকেরা কেজিপ্রতি ১৬০ থেকে ১৭০ টাকা পেয়েছিলেন, সেপ্টেম্বরের শেষেও দাম ছিল ১৪০ টাকা; ঢাকা, চট্টগ্রামসহ দেশের নানা জায়গার পাইকারেরা এসে এই শিম কিনে নিচ্ছিলেন।
বিক্রির পরিমাণও ছিল বড়। কুমিরা ইউনিয়নের দায়িত্বে থাকা উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, সপ্তাহে দুই দিনের প্রতিটি হাটে শুধু তাঁর ইউনিয়ন থেকেই কৃষকেরা অন্তত ১৫ টন শিম বিক্রি করেন, তখনকার দামে যার মূল্য ১৫ থেকে ১৮ লাখ টাকা। চট্টগ্রাম নগরের রিয়াজউদ্দিন বাজারের এক ব্যবসায়ী পত্রিকাটিকে জানান, তিনি কেজিপ্রতি ১১০ টাকা দরে ৭৮৫ কেজি শিম কিনেছেন, যা নগরের বিভিন্ন কাঁচাবাজারে খুচরা বিক্রেতাদের কাছে বিক্রি করবেন; জোগানের ওপর নির্ভর করে তাঁরা দাম ঠিক করেন।
দুই বছর আগেও দাম একই ধারায় চলেছিল। ২০২১ সালের অক্টোবরে টেরিয়াইলের কৃষকেরা প্রথম আলোকে জানান, বাজারে প্রতি কেজি শিম ১০০ থেকে ১৪০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে; দাম এত বেশি যে বীজ আসার আগেই তাঁরা শিম তুলে বিক্রি করছেন। তাঁদের ভাষ্য, ফলন ওঠার এক মাসের মাথায় তাঁরা খরচের সমপরিমাণ অর্থ তুলে নিয়েছিলেন।
২০২৩ সালের অক্টোবরে মহি উদ্দিনের বর্ণনাও এই ধারার সঙ্গে মেলে। তিনি জানান, মৌসুমের মধ্যে তাঁর শিমের দাম কেজিপ্রতি ১৭০ টাকা থেকে নেমে ১৩০ টাকায় এসেছে; শীতকালীন শিম বাজারে আসা এবং ডিসেম্বরে রূপবানের মৌসুম শেষ হওয়া পর্যন্ত আরও প্রায় দুই মাস তিনি বিক্রি চালিয়ে যাওয়ার আশা করছিলেন।

শিম উদ্ভিদ: ল্যাবল্যাব পারপিউরিয়াস
বাংলাদেশের দেশি শিম হলো হায়াসিন্থ বিন বা ল্যাবল্যাব, বৈজ্ঞানিক নাম Lablab purpureus (পুরোনো নাম Lablab niger), যা শিম্বগোত্রের (লিগিউম) উদ্ভিদ। জাতীয় জ্ঞানকোষ বাংলাপিডিয়া একে দেশের সর্বত্র ফলানো শীতকালীন সবজি হিসেবে বর্ণনা করেছে; এর শুঁটি ক্যালসিয়াম, ফসফরাস, প্রোটিন ও ভিটামিন 'সি' সমৃদ্ধ। প্রচলিত শীতকালীন চাষে সাধারণত ১৫ থেকে ২০ দিনের চারা জুন থেকে আগস্ট মাসে মাঠে লাগানো হয় এবং ৮০ থেকে ৯০ দিন পর ফসল তোলা যায়; হেক্টরপ্রতি গড়ে ১০ থেকে ১২ মেট্রিক টন শিম ফলে। প্রধানত কাঁচা শিমের জন্যই এর চাষ হয়, যা সবজি হিসেবে রান্না করা হয়; শুকনো বীজ দিয়েও নানা খাবার তৈরি হয়।
ইউএসডিএর নির্দেশিকায় শিমকে বর্ণনা করা হয়েছে উষ্ণ মৌসুমের লতানো একবর্ষজীবী বা স্বল্পায়ু বহুবর্ষজীবী উদ্ভিদ হিসেবে, যার মূলশিকড় সতেজ ও শক্তিশালী এবং লতা প্রায় ২৫ ফুট পর্যন্ত ছড়াতে পারে। পাতায় তিনটি করে পত্রক থাকে; থোকায় ধরা ফুল জাতভেদে সাদা, নীল বা বেগুনি হয়। শুঁটি মসৃণ, চ্যাপ্টা ও সুচালো, ভেতরে দুই থেকে চারটি বীজ; বীজের রং সাদা, ঘিয়ে, বাদামি, লাল, কালো বা ছোপযুক্ত হতে পারে। দৈনিক গড় তাপমাত্রা ৬৪ থেকে ৮৬ ডিগ্রি ফারেনহাইটের মধ্যে থাকলে উদ্ভিদটি সবচেয়ে ভালো বাড়ে।
অন্যান্য শিম্বজাতীয় ফসলের মতো শিমও শিকড়ের গুটিতে থাকা ব্যাকটেরিয়ার মাধ্যমে বাতাস থেকে নাইট্রোজেন সংবন্ধন করে। ইউএসডিএর নির্দেশিকা জানায়, বিভিন্ন দেশে মাটির উন্নতির জন্য একে সবুজ সার হিসেবে ব্যবহার করা হয় এবং এর বিস্তৃত শিকড় মাটির ভৌত গঠন ভালো করে। একই নির্দেশিকায় বলা হয়েছে, শিমের বীজে ট্যানিন ও ট্রিপসিন-প্রতিরোধী উপাদান থাকে, তাই মানুষের খাওয়ার আগে বীজ ভিজিয়ে রাখতে বা রান্না করতে হয়।
বাংলাদেশের গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো শিমের নানা জাত উদ্ভাবন করেছে। উদাহরণ হিসেবে, ২০২১ সালের মে মাসে প্রথম আলো জানায়, গাজীপুরের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এ কে এম আমিনুল ইসলাম 'বিইউ খাট শিম ৮' ও 'বিইউ খাট শিম ৯' নামে দুটি খাটো জাত উদ্ভাবন করেছেন, যা বীজ বোর্ডের অনুমোদন পেয়েছে; এ দুটি জাত মাচা বা খুঁটি ছাড়াই মাঠ ফসলের মতো চাষ করা যায়।
সীতাকুণ্ড: শিল্পের পাশে কৃষিজমি
বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী, সীতাকুণ্ড উপজেলার আয়তন প্রায় ৪৮৪ বর্গকিলোমিটার; এর উত্তরে মিরসরাই ও ফটিকছড়ি উপজেলা, পশ্চিমে সন্দ্বীপ চ্যানেল, আর দক্ষিণে চট্টগ্রাম নগরের পাহাড়তলী থানা। ২০১১ সালের আদমশুমারিতে একটি পৌরসভা ও নয়টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত উপজেলাটির জনসংখ্যা ছিল ৩ লাখ ৮৭ হাজার ৮৩২। মহি উদ্দিনের বাড়ি যে বাঁশবাড়িয়া ইউনিয়নে, তার আয়তন ৬ হাজার ৭৯৫ একর; ২০১১ সালে সেখানে পুরুষ ছিলেন ১১ হাজার ৪১ জন, নারী ১০ হাজার ৮০৯ জন। রূপবানের বড় অংশের আবাদ যে কুমিরা ইউনিয়নে, তার আয়তন ৮ হাজার ৫৩৪ একর।
বাংলাপিডিয়ায় উপজেলার প্রধান ফসল হিসেবে ধান, পান, আদা, হলুদ, পেঁয়াজ, রাবার ও শাকসবজির নাম আছে; আর প্রধান রপ্তানি পণ্যের তালিকায় আছে তরমুজ, রাবার, পান ও শাকসবজি। উপজেলার ২৪.১২ শতাংশ পরিবারের আয়ের প্রধান উৎস কৃষি, আর ৬৪.৬৩ শতাংশ পরিবারের নিজের কোনো কৃষিজমি নেই।
একই উপকূল দেশের অন্যতম শিল্পাঞ্চলও। বাংলাপিডিয়ায় উপজেলার উল্লেখযোগ্য কলকারখানার তালিকায় আছে চালকল, আটাকল, পাটকল, বস্ত্রকল, রি-রোলিং মিল, জাহাজ নির্মাণ কারখানা, ইটভাটা, মোটরগাড়ি সংযোজন কারখানা এবং সিমেন্ট, কাচ ও অক্সিজেন কারখানা। উপকূলে চট্টগ্রাম নগর থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরে ফৌজদারহাটকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা সীতাকুণ্ডের জাহাজভাঙা শিল্প বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ জাহাজভাঙা শিল্পে পরিণত হয়েছে; এখান থেকে আসা পুরোনো লোহা স্থানীয় রি-রোলিং মিলগুলোতে প্রক্রিয়াজাত হয়। সীতাকুণ্ডের অর্থনৈতিক বিকাশ মূলত ঘটেছে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক ও রেলপথ ঘিরে, যা উপজেলার এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত পর্যন্ত বিস্তৃত।
সেই সমতলেই একসময় মহি উদ্দিন ও বাঁশবাড়িয়ার অন্য কৃষকেরা সবজি চাষ করতেন। ২০২৩ সালের অক্টোবরে মহি উদ্দিন ও ইউনিয়নের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা দুজনেই জাগো নিউজকে জানান, শিল্প-মালিকেরা কৃষিজমি কিনে নিচ্ছেন, ফলে অনেক কৃষকের সামনে পাহাড়ে চাষ ছাড়া বিকল্প থাকছে না। উপজেলার ৪৮৩.৯৭ বর্গকিলোমিটার আয়তনের মধ্যে ৬১.৬১ বর্গকিলোমিটার বনভূমি, যার বড় অংশ এই পাহাড়শ্রেণিতে।
ছবি: কামরুল ইসলাম শাহীন / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, প্রথম আলো, বাংলাপিডিয়া (বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি), যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগের প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ সার্ভিস (ইউএসডিএ-এনআরসিএস), উইকিপিডিয়া





মন্তব্য
(০)