নারায়ণগঞ্জের বন্দর উপজেলার তিনগাঁও এলাকার মো. হাসিব একসময় গাড়ি চালাতেন, পরে চালিয়েছেন অটোরিকশা। নানা উদ্যোগে সফল না হয়ে ২০২০ সালের শুরুর দিকে এক বন্ধুর পরামর্শে তিনি মাশরুম চাষ শুরু করেন। ২০২৫ সালের ১১ মার্চ জাগো নিউজ ২৪-এ প্রকাশিত প্রতিবেদনে তিনি জানান, স্ত্রী ও সন্তানদের নিয়ে মাশরুম চাষ করে বছরে প্রায় ৭-৮ লাখ টাকা আয় করেন। তাঁর ইচ্ছা, উদ্যোগটিকে শিল্পে রূপ দিয়ে অন্যদের কর্মসংস্থান করবেন।
গাড়িচালক থেকে মাশরুম চাষি
হাসিবের এই পথ সহজ ছিল না। স্বাধীনভাবে কাজ করার ইচ্ছা থেকে তিনি গাড়ি চালানোর পেশায় এসেছিলেন, কিন্তু তাতে পরিবারকে সময় দিতে পারতেন না, অন্যের অধীনে থাকতে হতো। পরে নিজ এলাকায় অটোরিকশা চালানো শুরু করেন। সেখানেও তৃপ্তি পাননি, কারণ সন্তানেরা অটোরিকশাচালক হয়ে বেড়ে উঠুক, তা তিনি চাননি। স্বাবলম্বী হতে তিনি কোয়েল পাখি, হাঁস ও কবুতরের খামার করেন, পরে শাকসবজির চাষও করেন, কিন্তু কোনোটিতেই সফলতা আসেনি।
মাশরুম চাষ শুরুর পর কঠোর পরিশ্রম ও আত্মবিশ্বাসের জোরে বছরখানেকের মধ্যেই তিনি লাভের মুখ দেখেন বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়। ২০২৫ সালের মার্চে তিনি বড় পরিসরে মাশরুম চাষ করছিলেন এবং পরিবারের চাহিদা মিটিয়ে বাণিজ্যিকভাবে বিক্রি করছিলেন।
বন্দর উপজেলা ঢাকা বিভাগের নারায়ণগঞ্জ জেলার অংশ এবং বৃহত্তর ঢাকার মধ্যে পড়ে। উপজেলাটির আয়তন ৫৪.৩৯ বর্গকিলোমিটার। শীতলক্ষ্যা নদী একে পশ্চিম ও দক্ষিণে নারায়ণগঞ্জ সদর ও মুন্সীগঞ্জ সদর উপজেলা থেকে আলাদা করেছে।

ভাড়া ঘরে বীজ উৎপাদন ও চাষ
হাসিবের নিজের কোনো জমি নেই। স্ত্রী ও দুই সন্তান নিয়ে তিনি দুই কক্ষের একটি টিনশেড ভাড়া বাড়িতে থাকেন। এক কক্ষে পরিবার থাকে, অন্যটিকে তিনি মাশরুমের বীজ উৎপাদনের ল্যাবরেটরি বানিয়েছেন। মাশরুম উৎপাদনের জন্য ব্যবহার হয় দুটি কক্ষ।
হাসিব জানান, তিনি সাভারের মাশরুম উন্নয়ন ইনস্টিটিউট থেকে বীজ কিনে আনেন। তাঁর হিসাবে, খামারে প্রতি মাসে ২০০ থেকে ২৫০ কেজি মাশরুম উৎপাদন হয়, যা তিনি পাইকারিতে কেজিপ্রতি ২০০ থেকে ২৫০ টাকা এবং খুচরায় ৩০০ থেকে ৪০০ টাকায় বিক্রি করেন। মৌসুমভেদে দাম ওঠানামা করে; শীতে উৎপাদন বেশি হয় বলে তখন তুলনামূলক কম দামে বিক্রি হয়। তাঁর মতে, মাশরুম চাষে যে খরচ হয়, তার দ্বিগুণ আয় করা সম্ভব।
স্ত্রী সাদিয়া আক্তার বলেন, ‘মাশরুম চাষ খুবই ভালো লাগে। আমার স্বামীর কাছ থেকে শিখেছি। তাকে সহযোগিতা করি।’ তিনি জানান, প্রথমে বীজ কিনে চাষ করলেও এখন তাঁরা নিজেরাই বীজ উৎপাদন করছেন। পরিবারটি নিজেদের খাদ্যতালিকায়ও মাশরুম রেখেছে এবং অন্যদেরও তা করতে উৎসাহ দিচ্ছে।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে হাসিব বলেন, ‘আগামীতে আরও বড় পরিসরে মাশরুম চাষ করবো। বিভিন্ন জাতের মাশরুম নিয়ে কাজ করবো। মাশরুমকে ইন্ডাস্ট্রিয়াল অবস্থায় নিয়ে যেতে চাই। আমার স্বপ্ন বাস্তবায়নে সরকার এগিয়ে আসবে, সেই প্রত্যাশাই করি।’

প্রশিক্ষণ ও সরকারি সহায়তা
বন্দর উপজেলা কৃষি অফিসার তাসলিমা আক্তার জাগো নিউজকে জানান, সাভারের মাশরুম উন্নয়নকেন্দ্রে একটি প্রকল্পের অধীনে প্রশিক্ষণ হয়, যেখানে হাসিবকে ১৫ দিনের আবাসিক প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। তিনি বলেন, ‘তাকে এ পর্যন্ত ২ লাখ ৯৫ হাজার টাকা আর্থিক অনুদান দেওয়া হয়েছে। মাশরুম উৎপাদনের জন্য দুটি ঘর তৈরি করে দিয়েছি। একজন উদ্যোক্তার যা যা প্রয়োজন তা দেওয়া হয়েছে।’
মাশরুম উন্নয়ন ইনস্টিটিউট কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) হর্টিকালচার উইংয়ের অধীন প্রতিষ্ঠান। এর অবস্থান ঢাকা থেকে প্রায় ৩১ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে, সাভারের সোবহানবাগে ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের পাশে। প্রতিষ্ঠানটির নিজস্ব পরিচিতি অনুযায়ী, দেশে মাশরুম চাষ প্রথম শুরু হয় ১৯৮০ সালে সোবহানবাগের হর্টিকালচার সেন্টারে, আর মাশরুম নিয়ে গবেষণা ও সম্প্রসারণের জন্য ২০১৫ সালে ইনস্টিটিউটটি প্রতিষ্ঠিত হয়। এটি সরকার নির্ধারিত দামে চাষিদের মাশরুমের বীজ (পিওর কালচার, মাদার কালচার ও স্পন) সরবরাহ করে এবং প্রতি কর্মদিবসে সকাল সাড়ে ৯টা থেকে বিকেল ৩টা পর্যন্ত আগ্রহীদের বিনা খরচে এক দিনের ‘অবহিতকরণ ও প্রযুক্তি প্রদর্শন’ প্রশিক্ষণ দেয়।
মাশরুমের উৎপাদন ও ব্যবহার বাড়াতে ডিএই সে সময় ‘মাশরুম চাষ সম্প্রসারণের মাধ্যমে পুষ্টি উন্নয়ন ও দারিদ্র্য হ্রাসকরণ প্রকল্প’ বাস্তবায়ন করছিল, যার মেয়াদ ২০২৩ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৭ সালের ডিসেম্বর। দেশের ১৬০টি উপজেলা ও ১৫টি মেট্রোপলিটন থানায় চলা এ প্রকল্পের কাজের মধ্যে ছিল দলভুক্ত চাষি ও উদ্যোক্তা প্রশিক্ষণ, প্রদর্শনী এবং স্পন উৎপাদন। হাসিবের প্রশিক্ষণ কোন প্রকল্পের অধীনে হয়েছিল, জাগো নিউজের প্রতিবেদনে তার নাম বলা হয়নি।
ছবি: Moheen Reeyad / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, মাশরুম উন্নয়ন ইনস্টিটিউট (কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর), কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, উইকিপিডিয়া




মন্তব্য
(০)