বাংলাদেশ সরকার ২০২৬ সালের ১৮ এপ্রিল, শনিবার, প্রতি লিটার ডিজেলের দাম ১০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১১৫ টাকা নির্ধারণ করে। বোরো ধান কাটার মৌসুমের ঠিক এই সময়ে দাম বাড়ায় কৃষকের উৎপাদন খরচ কতটা বাড়বে, তা নিয়ে পরদিন ১৯ এপ্রিল জাগো নিউজ একটি বিশেষ প্রতিবেদন প্রকাশ করে। প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশে বছরে ডিজেলের চাহিদা প্রায় ৪৩ লাখ ৫০ হাজার টন, যার প্রায় ২৪ শতাংশ, অর্থাৎ ১০ লাখ ৪৪ হাজার টন, ব্যবহার হয় কৃষিকাজে। দেশের ৮০ শতাংশ সেচও ডিজেলনির্ভর।
দাম কত বাড়ল, খরচের হিসাব কী
প্রথম আলোর খবর অনুযায়ী, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ সেদিন সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায়, যা শনিবার রাত ১২টা থেকে কার্যকর হয়। ডিজেল ১০০ টাকা থেকে ১১৫ টাকা, কেরোসিন ১১২ টাকা থেকে ১৩০ টাকা, পেট্রল ১১৬ টাকা থেকে ১৩৫ টাকা এবং অকটেন ১২০ টাকা থেকে ১৪০ টাকা হয়। বিভাগটি জানায়, আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখা ও সরবরাহব্যবস্থা স্থিতিশীল রাখতে এই সমন্বয় করা হয়েছে।
জাগো নিউজের হিসাবে, আগের দামে কৃষকের বছরে ডিজেলে খরচ হতো ১০ হাজার ৪৪০ কোটি টাকা; নতুন দামে তা দাঁড়ায় ১২ হাজার ৬ কোটি টাকায়, অর্থাৎ বাড়তি খরচ প্রায় ১ হাজার ৫৬৬ কোটি টাকা। একই দিনে দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস কৃষি অর্থনীতিবিদদের বরাতে লেখে, কৃষিকাজে ডিজেলের জন্য কৃষকদের বছরে প্রায় ১৮ বিলিয়ন টাকা বেশি খরচ করতে হতে পারে।

বোরো কাটা, মাড়াই ও সেচে চাপ
বোরো হলো শুষ্ক মৌসুমের সেচনির্ভর ধান, যা সাধারণত নভেম্বরের মাঝামাঝি থেকে ফেব্রুয়ারির মধ্যে রোপণ করে এপ্রিল থেকে জুনে কাটা হয়। প্রতিবেদনের সময় বোরো মৌসুমের শেষভাগ চলছিল, তাই বেশি সেচের দরকার ছিল না; তবে যন্ত্র দিয়ে ধান কাটা, মাড়াই ও পরিবহনের খরচ বাড়ার কথা বলা হয়। কিছু এলাকায় বৃষ্টি কম হওয়ায় তখনো এক-দুবার সেচ লাগত, আর দাম বাড়ার আগেই জ্বালানি সংকটে অনেকে বেশি দামে সেচ নিয়েছিলেন।
নওগাঁর সাপাহারের কৃষক আব্দুল মতিন জাগো নিউজকে জানান, তিনি তিন বিঘা জমিতে বোরো করেছেন। ডিজেল না থাকায় বিঘাপ্রতি দুই হাজার টাকার সেচে এবার আড়াই হাজার টাকা দিতে হচ্ছিল। তাঁর হিসাবে, আগের বছর বিঘাপ্রতি মোট খরচ ছিল ১৬ হাজার টাকার মতো, এবার তা ২০ হাজার টাকা ছাড়িয়ে যাবে।
বগুড়ার দুপচাঁচিয়া উপজেলার জিয়ানগর গ্রামের কৃষক হালিম মিয়া বলেন, আগের বোরো মৌসুমে শ্যালো মেশিনে সেচের জন্য ঘণ্টায় ১২০ টাকা নেওয়া হতো, তখন তা ২০০ টাকা। তিনি জানান, আগেরবার ভাড়া করা রিপারে ধান কাটতে বিঘাপ্রতি ৮০০ টাকা এবং মাড়াইয়ে বিঘাপ্রতি ১ হাজার ৮০০ টাকা লেগেছিল; তাঁর ধারণা, এবার সব মিলিয়ে প্রায় তিন হাজার টাকা বেশি খরচ পড়বে।

যন্ত্র ও সেচের বড় অংশ ডিজেলে চলে
কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্য উদ্ধৃত করে জাগো নিউজ জানায়, দেশে ৭৫৪টি গভীর নলকূপ, ১০ লাখ ৩৯ হাজার ৩৩৭টি অগভীর নলকূপ ও ১ লাখ ৮৪ হাজার ৩৮৪টি লো-লিফট পাম্প আছে, যার বড় অংশ ডিজেলচালিত। আরও আছে ১০ হাজার কম্বাইন হারভেস্টার, কয়েক লাখ রিপার এবং মাড়াই-ঝাড়াইসহ অন্যান্য ৪ লাখ ৯৬ হাজার ৮০৫টি যন্ত্র। জাগো নিউজ ও দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস দুটিই জানায়, দেশে প্রায় ১৯ লাখ কৃষিযন্ত্রের ৭৫ শতাংশ ডিজেলে চলে।
জাগো নিউজের প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশের মোট চালের ৬০ শতাংশ আসে বোরো থেকে; দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস এই অংশ প্রায় ৫৫ শতাংশ বলে উল্লেখ করে। দুই সূত্রই বলে, বোরো পুরোপুরি সেচনির্ভর।

বিশেষজ্ঞরা যা বলেছিলেন
বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের সাবেক নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. ওয়াইস কবির দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসকে বলেন, এতে দুইভাবে চাপ তৈরি হবে: উৎপাদন খরচ বাড়ায় কৃষকের ন্যায্যমূল্য পাওয়া কঠিন হবে, আর বাজারে খাদ্যের দাম বাড়লে বিশেষ করে নিম্ন আয়ের মানুষের জীবনযাত্রার খরচ বাড়বে। কৃষকেরা জানান, ভারত থেকে চাল আমদানি চলায় আমন ধানের দাম এমনিতেই কম ছিল, তাই আসন্ন বোরোর দাম নিয়েও তাঁরা শঙ্কায় ছিলেন।
সাবেক কৃষি সচিব আনোয়ার ফারুক জাগো নিউজকে বলেন, ‘স্বাভাবিকভাবে তেলের দাম বাড়লে এর প্রভাব সবকিছুতে পড়ে। এতে নিশ্চিতভাবে কৃষকের খরচ বড় আকারে বাড়লো। সাশ্রয়ীভাবে মাঠে থাকা বোরো ঘরে তোলা, মাড়াই ও পরিবহন বাধাগ্রস্ত হলো। ফলে চালের দাম বাড়বে।’
কৃষি অর্থনীতিবিদ জাহাঙ্গীর আলম খান বলেন, ‘আমাদের কৃষি ডিজেলচালিত সেচের ওপর নির্ভরশীল। উৎপাদন স্বাভাবিক রাখতে দাম বাড়লেও ডিজেল সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। কৃষকের বর্ধিত খরচ সমন্বয়ে প্রণোদনা বা ভর্তুকি দেওয়া জরুরি।’
ছবি: ZahidTushar / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, প্রথম আলো, দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস, উইকিপিডিয়া




মন্তব্য
(০)