সরাসরিবাজারদর
আটা (প্যাকেটজাত)৫৮—আদা - আমদানিকৃত১৬৭—আদা - দেশী১৫৪—আমন চাল - মাঝারি৫৬—আমন চাল - মোটা৪৮—আমন চাল - সরু৭২—আয়োডিনযুক্ত লবণ (প্যাকেটজাত)৩২—কাঁচা মরিচ২১৮—খামারের মুরগী১৬২—খাসী৯০০—চিনি (দেশী)১৩২—ছোলা - গোটা৮৫—ডিম ফার্ম - লাল৪৭—পেঁয়াজ - দেশী৬০—বোরো চাল - মাঝারি৫৫—বোরো চাল - মোটা৪৭—বোরো চাল - সরু৬৬—মাংসঃ– গরু৭২৯—মুগ ডাল১২২—রসুন - আমদানিকৃত১৯২—রসুন - দেশী১৭৩—সয়াবিন তেল১৬৩—
হালনাগাদ ১৬ অক্টোবর ২০২৬
ঢাকা২৬°পরিষ্কার আকাশআর্দ্রতা ৭৪%বাতাস ৩ কিমি/ঘ

চন্দ্রমল্লিকা চাষ: চারা তৈরি, সার, পরিচর্যা ও রোগ-পোকা দমনের উপায়

শাখা কলম ও সাকার থেকে চারা, জমি ও টবের সার, ডিসবাডিং এবং বারি ও কৃষি তথ্য সার্ভিসের পরামর্শে জাবপোকা ও রোগ দমন: চন্দ্রমল্লিকা চাষের পুরো নিয়ম এক জায়গায়।

চন্দ্রমল্লিকা চাষ: চারা তৈরি, সার, পরিচর্যা ও রোগ-পোকা দমনের উপায়
ফুল

২০১৯ সালের শুরুতে নীলফামারীর ডোমার উপজেলার এক কৃষক সরকারের কৃষি তথ্য সার্ভিসের (এআইএস) মাসিক পত্রিকা কৃষিকথায় একটি সহজ প্রশ্ন পাঠিয়েছিলেন: চন্দ্রমল্লিকা ফুলে সাধারণত কী কী রোগ হয়, আর তার প্রতিকার কী? পত্রিকাটি ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে উত্তর ছাপে, আর ২০২২ সালের জানুয়ারিতে একই প্রশ্ন ও উত্তর আবার প্রকাশ করে। প্রতি শীতে, যখন নার্সারি, ছাদবাগান আর ফুলের বেডে চন্দ্রমল্লিকা ফোটে, অনেক চাষি ও বাগানির মনে এই একই প্রশ্ন জাগে।

২০২৪ সালের ৮ ডিসেম্বর প্রকাশিত এই নির্দেশিকায় সে সময় পর্যন্ত দেশের কৃষি কর্তৃপক্ষের দেওয়া পরামর্শ এক জায়গায় তুলে ধরা হলো। মূল সূত্র বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বারি), যারা দেশের জন্য চন্দ্রমল্লিকার জাত উদ্ভাবন করেছে, আর এআইএস। এখানে থাকছে গাছটির পরিচয়, ফুলের বাজারে এর জায়গা, জাত, চারা তৈরি, জমি ও টবের সার, গাছ গড়ে তোলার কৌশল এবং জাবপোকা, পাউডারি মিলডিউ ও পাতায় দাগ রোগ দমনের উপায়।

চন্দ্রমল্লিকা কী, এল কোথা থেকে


চন্দ্রমল্লিকা সূর্যমুখী-গোত্রের (Asteraceae) Chrysanthemum গণের সপুষ্পক উদ্ভিদ। এর আদি নিবাস পূর্ব এশিয়া ও উত্তর-পূর্ব ইউরোপ; বেশির ভাগ প্রজাতির উৎস পূর্ব এশিয়া, আর এই গণের বৈচিত্র্যের কেন্দ্র চীন। ইংরেজি নাম ক্রিস্যানথিমাম এসেছে প্রাচীন গ্রিক দুটি শব্দ থেকে: ক্রিসোস, অর্থাৎ সোনা, আর অ্যানথেমন, অর্থাৎ ফুল।

চীনে খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চদশ শতক থেকেই চন্দ্রমল্লিকা ফুলের ভেষজ গাছ হিসেবে চাষ হতো। ১৬৩০ সালের মধ্যে সেখানে ৫০০টির বেশি জাতের কথা লিপিবদ্ধ হয়, আর ২০১৪ সালের এক হিসাবে বিশ্বে ২০ হাজারের বেশি জাত ছিল, যার প্রায় ৭ হাজার চীনে। পঞ্চম শতকে ফুলটি চীন থেকে জাপানে পৌঁছায়, এবং জাপানের রাজকীয় সিলমোহরটিও একটি চন্দ্রমল্লিকা। আজকের বাগান ও ফুলের দোকানের বেশির ভাগ চন্দ্রমল্লিকা Chrysanthemum × morifolium নামের সংকর গাছ; যুক্তরাষ্ট্রের নর্থ ক্যারোলাইনা স্টেট বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্প্রসারণ সেবা একে চীনের পাঁচটি প্রজাতির জটিল সংকর বলে বর্ণনা করেছে।

যাকে আমরা একটি চন্দ্রমল্লিকা ফুল বলি, তা আসলে অনেকগুলো ছোট ফুলের (পুষ্পিকা) একটি মাথা। বুনো গাছে সাদা, হলুদ বা লাল রঙের এক সারি রশ্মি-পুষ্পিকা হলুদ চাকতি-পুষ্পিকার কেন্দ্রকে ঘিরে থাকে; চাষের জাতগুলোকে বহু সারি রশ্মি-পুষ্পিকা আর নানা রং ও আকারের জন্য বাছাই করে তৈরি করা হয়েছে, ডেইজির মতো একহারা ফুল থেকে শুরু করে আঁটসাঁট পম্পন বা বলের মতো ফুল পর্যন্ত। ফুল তোলার সময় এই গঠন জানা কাজে লাগে। জাগো নিউজের ২০১৮ সালের একটি চাষ-নির্দেশিকায় বলা হয়েছিল, চন্দ্রমল্লিকাকে ‘শরৎ রানি’ও বলা হয়, এবং বাড়ির আঙিনা, বারান্দা ও ছাদে এর চাষ করা যায়।

প্রচলিত হলুদ রঙের পাশাপাশি সাদা, বেগুনি ও লাল চন্দ্রমল্লিকাও আছে। নর্থ ক্যারোলাইনার সম্প্রসারণ সেবা বাদামি আভা, হালকা রং ও উজ্জ্বল হলুদ ফুলের কথা বলেছে; কোনো কোনো ফুলে দুই রংও থাকে।

বাংলাদেশের ফুলের বাজারে চন্দ্রমল্লিকা


জাতীয় জ্ঞানকোষ বাংলাপিডিয়ার বর্ণনায়, বাংলাদেশে ফুল চাষ এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে, আর কাটা ফুল ও মৌসুমি ফুলের বীজের চাহিদা ধীরে ধীরে বাড়ছে। বাংলাপিডিয়া জানায়, বাণিজ্যিক ফুল চাষে উৎসাহ দিতে বারি একটি ফুল গবেষণা কেন্দ্র খুলেছে। নিয়মিত বাণিজ্যিকভাবে বেচাকেনা হওয়া দেশি কাটা ফুলের তালিকায় সেখানে চন্দ্রমল্লিকাও আছে, জাত হিসেবে উল্লেখ আছে ‘বিয়ারিৎজ ইয়েলো’, ‘এলেন’ ও ‘ইউরো’।

২০১৫ সালের মে মাসে কৃষিকথায় খুলনার রূপসা উপজেলার একজন উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তার লেখা একটি নিবন্ধে গোলাপ, রজনীগন্ধা, ডালিয়া, চন্দ্রমল্লিকা ও গাঁদাকে দেশের কয়েকটি জনপ্রিয় ফুল বলা হয়, আর শীতকালীন মৌসুমি ফুলের তালিকায়ও চন্দ্রমল্লিকার নাম ছিল। নিবন্ধে যশোরের ঝিকরগাছা, শার্শা, চৌগাছা ও সদর উপজেলায় বাণিজ্যিক ফুল চাষ এবং ঢাকার সাভার, গাজীপুর ও কালিয়াকৈরে গোলাপ চাষের কথা বলা হয়। সেখানে আরও বলা হয়, বাংলাদেশ থেকে লন্ডন, সিঙ্গাপুর, সৌদি আরব, হল্যান্ড ও আবুধাবিতে ফুল রপ্তানি শুরু হয়েছে, এবং এক তথ্যের বরাতে জানানো হয়, বিশ্বে প্রতিবছর গড়ে আড়াই হাজার কোটি ডলারের ফুল বেচাকেনা হয়।

দেশের ফুল ব্যবসার কেন্দ্র যশোরের ঝিকরগাছা উপজেলার গদখালী, যাকে চাষি ও ব্যবসায়ীরা ‘ফুলের রাজধানী’ বলেন। ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে ঝিকরগাছা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে জানান, উপজেলার ছয়টি ইউনিয়নের প্রায় ৬৩০ হেক্টর জমিতে বাণিজ্যিকভাবে ফুলের চাষ হচ্ছে, যার সঙ্গে প্রায় সাড়ে ছয় হাজার কৃষক এবং প্রায় এক লাখ শ্রমিক যুক্ত। এই জমির বেশির ভাগ জুড়ে ছিল গ্লাডিওলাস, রজনীগন্ধা, গোলাপ ও গাঁদা।

২০২৪ সালের অক্টোবরে কৃষিকথা জানায়, সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর শীতকালীন ফুল চাষ শুরুর উপযুক্ত সময়, আর সেই তালিকায় চন্দ্রমল্লিকাও আছে। চারা সংগ্রহ করতে বলা হয় সরকারি হর্টিকালচার সেন্টার বা বিশ্বস্ত নার্সারি থেকে।

যশোরের ঝিকরগাছা উপজেলার গদখালী ইউনিয়নে খেত থেকে গাঁদা ফুল তুলছেন নারীরা, ২০২৪ সালের জানুয়ারি; এলাকাটি বাণিজ্যিক ফুল চাষের জন্য পরিচিত। ছবি: মুহাম্মদ আমদাদ হোসেন / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
যশোরের ঝিকরগাছা উপজেলার গদখালী ইউনিয়নে খেত থেকে গাঁদা ফুল তুলছেন নারীরা, ২০২৪ সালের জানুয়ারি; এলাকাটি বাণিজ্যিক ফুল চাষের জন্য পরিচিত। ছবি: মুহাম্মদ আমদাদ হোসেন / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)

বারির উদ্ভাবিত চন্দ্রমল্লিকার জাত


এআইএসের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫ সালের মধ্যেই বারি চন্দ্রমল্লিকার দুটি জাত উদ্ভাবন করেছিল: বারি চন্দ্রমল্লিকা-১ ও বারি চন্দ্রমল্লিকা-২। বারির প্রযুক্তি ভান্ডারে দুটি জাতকেই রবি মৌসুমের শীতকালীন মৌসুমি ফুল বলা হয়েছে, যাদের জীবনকাল ১২০ থেকে ১৫০ দিন। দুটিই মূলত টবের গাছ হিসেবে বেশি ব্যবহৃত হয়, তবে কাটা ফুল হিসেবেও চাষ করা যায়; বারির বর্ণনায় গাছপ্রতি ফুলের সংখ্যা প্রায় ২০ থেকে ৩০টি।

  • বারি চন্দ্রমল্লিকা-১: ফুলের রং হলুদ, টবে ফুল টেকে ৯ থেকে ১০ দিন। বারি জানায়, সারা দেশে চাষ করা গেলেও রাজশাহী, যশোর, রংপুর, বগুড়া ও সাভার এলাকায় এ জাতের ফুল ভালো হয়। চারা লাগানোর ৬০ থেকে ৭০ দিন পর ফুল তোলা যায়।
  • বারি চন্দ্রমল্লিকা-২: ফুলের রং সাদা, টবে ফুল টেকে ১২ থেকে ১৪ দিন। রাজশাহী, যশোর, ঢাকা, গাজীপুর, পাবনা, রংপুর, বগুড়া ও সাভার এলাকায় এ জাতের ফুল ভালো হয়। চারা লাগানোর ৭০ থেকে ৭৫ দিন পর ফুল তোলা যায়।

দুটি জাতের জন্যই বারি একই সময়সূচি দিয়েছে: জুলাই ও আগস্টে সাকার বা শাখা কলম থেকে চারা তৈরি করতে হবে, আর ২০ থেকে ২৫ দিন বয়সী সেই চারা সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরে মাঠে বা টবে লাগাতে হবে। বারির পরামর্শ, ফুল পুরোপুরি ফোটা অবস্থায় তুলতে হবে।

আবহাওয়া, মাটি, দিনের দৈর্ঘ্য ও রোপণের সময়


এআইএসের চাষ-নির্দেশিকা অনুযায়ী, চন্দ্রমল্লিকা তুলনামূলক ঠান্ডা আবহাওয়া ও রোদ ঝলমলে জায়গা পছন্দ করে, আর বাংলাদেশে শীতকালই এ ফুল চাষের উত্তম সময়। জৈব পদার্থসমৃদ্ধ, পানি সহজে বেরিয়ে যায় এমন দোআঁশ ও বেলে মাটি এর জন্য উপযোগী; মাটির পিএইচ ৬.০ থেকে ৭.০ হওয়া বাঞ্ছনীয়। নর্থ ক্যারোলাইনার সম্প্রসারণ সেবাও পূর্ণ রোদ ও ভালো নিষ্কাশনের মাটির কথা বলেছে, আর সতর্ক করেছে যে বেশি ছায়ায় গাছ সোজা না উঠে এলিয়ে পড়ে।

কেন শীতে ফুল ফোটে, তার উত্তর দিনের দৈর্ঘ্যে। যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্প্রসারণ সেবা জানায়, দিন ছোট হলে চন্দ্রমল্লিকায় স্বাভাবিকভাবে কুঁড়ি আসে ও ফুল ফোটে; আরকানসাস বিশ্ববিদ্যালয়ের এক সম্প্রসারণ উদ্যানতত্ত্ববিদ ২০০৩ সালে লিখেছিলেন, দিন যত ছোট হয়, গাছে তত ফুলের কুঁড়ি আসে। বাংলাদেশের সময়সূচির সঙ্গে এটি মিলে যায়: বর্ষায় তৈরি চারায় হেমন্তের শেষ ও শীতে ফুল ফোটে।

এআইএসের মতে, জমি বা টবে চারা রোপণের উপযুক্ত সময় অক্টোবর ও নভেম্বর, আর জাতভেদে ৩০ x ২৫ দূরত্বে চারা লাগাতে হয় (নির্দেশিকায় দূরত্বের একক উল্লেখ নেই)। বারির জাত-বর্ণনায় নিজের দুটি জাতের জন্য সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরের কথা বলা হয়েছে। এআইএস বিকেলে চারা লাগিয়ে গোড়ার মাটি চেপে দিতে এবং পরে হালকা সেচ দিতে বলেছে।

চারা তৈরি: শাখা কলম ও সাকার


বীজ, সাকার ও শাখা কলম, তিনভাবেই চন্দ্রমল্লিকার চারা তৈরি করা যায়। এআইএস ব্যাখ্যা করেছে, বীজ থেকে চারা করলে ভালো ফুল পাওয়া যায় না এবং ফুল পেতে অনেক দিন লাগে; শাখা কলম বা সাকার থেকে চারা করলে এ সমস্যা থাকে না। এ দেশে সাধারণত শাখা কলম করেই চারা তৈরি হয়। ফ্লোরিডা বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্প্রসারণ সেবা জানায়, গাছের ঝাড় ভাগ করেও নতুন চারা পাওয়া যায়। এআইএসের বর্ণনায় ধাপগুলো এমন:

  • জুলাইয়ের মাঝামাঝি থেকে এক বছর বয়সী সতেজ, সবল ডাল থেকে ৮ থেকে ১০ সেন্টিমিটার লম্বা ডাল তেরছাভাবে কেটে বেডে বা বালতিতে বসিয়ে দিন; এতে শিকড় গজাবে।
  • ফেব্রুয়ারির দিকে ফুল দেওয়া শেষ হলে গাছগুলো মাটির ওপর ১৫ থেকে ২০ সেন্টিমিটার রেখে কেটে দিন।
  • কিছু দিন পর কাটা গোড়া থেকে সাকার বের হবে। সাকার ৫ থেকে ৭ সেন্টিমিটার লম্বা হলে মা গাছ থেকে আলাদা করে ছায়াযুক্ত বীজতলায় বা টবে লাগান।
  • মে থেকে জুলাই মাসে চারাকে বৃষ্টি ও কড়া রোদ থেকে বাঁচানোর ব্যবস্থা করুন।
  • শেষবারের মতো জমিতে বা টবে লাগানোর আগে চারাগুলো একবার আলাদা বেডে বা টবে সরিয়ে নেওয়া যায়; এআইএস বলছে, এতে ফুল দেওয়ার উপযুক্ততা বাড়ে।
  • বারির জাত-বর্ণনা অনুযায়ী, সাকার বা শাখা কলম থেকে তৈরি ২০ থেকে ২৫ দিন বয়সী চারা মূল জমিতে বা টবে লাগান।

জমিতে ও টবে সার ব্যবস্থাপনা


এআইএস জানায়, চন্দ্রমল্লিকা মাটি থেকে প্রচুর খাদ্য উপাদান শোষণ করে, তাই জৈব ও রাসায়নিক সারযুক্ত মাটিতে খুব ভালো সাড়া দেয়, আর ভালো ফলনের জন্য সুষম মাত্রায় সার দিতে হয়। নির্দেশিকায় প্রতি হেক্টরে যে সার দেওয়ার কথা বলা হয়েছে: ১০ টন পচা গোবর বা কম্পোস্ট, ৪০০ কেজি ইউরিয়া, ২৭৫ কেজি টিএসপি, ৩০০ কেজি মিউরেট অব পটাশ (এমওপি), ১৬৫ কেজি জিপসাম এবং ১২ কেজি বোরিক এসিড, সঙ্গে জিংক অক্সাইড; জিংক অক্সাইডের আলাদা পরিমাণ নির্দেশিকায় দেওয়া নেই।

সার দেওয়ার সময় নিয়ে এআইএস বলছে, সাকার রোপণের ১০ থেকে ১৫ দিন আগে পচা গোবর বা কম্পোস্ট, আর ইউরিয়া বাদে অন্য সব সার ৭ থেকে ১০ দিন আগে মাটির সঙ্গে ভালোভাবে মিশিয়ে দিতে হবে। রোপণের ২৫ থেকে ৩০ দিন পর ইউরিয়ার অর্ধেক এবং ৪৫ থেকে ৫০ দিন পর বাকি অর্ধেক গাছের গোড়ার চারপাশে একটু দূর দিয়ে দিতে হবে। প্রতিবার উপরি প্রয়োগের পর সার মাটির সঙ্গে মিশিয়ে সেচ দিতে হবে।

বারির প্রযুক্তি ভান্ডারে তাদের জাতের জন্য আরেকটু কম মাত্রার সূচি আছে: জমি তৈরির পর হেক্টরপ্রতি ৮ থেকে ১০ টন পচা গোবর, ১০০ কেজি ফসফরাস ও ১০০ কেজি পটাশ সার মাটিতে মিশিয়ে দিতে হবে; এরপর ১৫০ কেজি ইউরিয়ার অর্ধেক চারা রোপণের এক মাস পর গাছের দৈহিক বৃদ্ধির জন্য, আর বাকি অর্ধেক ফুলের কুঁড়ি আসার সময় উপরি প্রয়োগ করতে হবে। প্রকাশিত দুটি সূচিতে পার্থক্য থাকায় বাণিজ্যিক চাষের আগে নিজের জমির জন্য কোনটি উপযোগী, তা উপজেলা কৃষি অফিস থেকে জেনে নেওয়া যায়।

টবে চাষের জন্য বারির পরামর্শ: ২ ভাগ মাটি, ২ ভাগ গোবর সার, ১ ভাগ পাতাপচা সার ও ১ ভাগ হাড়ের গুঁড়ার সঙ্গে ৩ গ্রাম টিএসপি ও ৩ গ্রাম মিউরেট অব পটাশের মিশ্রণ সবচেয়ে ভালো। ৮ গ্রাম ইউরিয়ার অর্ধেক সাকার বা কাটিং রোপণের ২৫ থেকে ৩০ দিন পর গাছের দৈহিক বৃদ্ধির সময়, আর বাকি অর্ধেক ফুলের কুঁড়ি আসার সময় উপরি প্রয়োগ করতে হবে।

পিনচিং, ডিসবাডিং, ঠেকা ও সেচ


কাণ্ডের আগার অংশ কেটে ফেলাকে শাখা ভাঙা বা পিনচিং বলে। বারি জানায়, চারা লাগানোর ২৫ থেকে ৩০ দিন পর পিনচিং করলে গাছ ঝোপালো হয় এবং বেশি ফুল পাওয়া যায়। এআইএসও চারা লাগানোর মাসখানেক পর গাছের আগা কেটে দিতে বলেছে, যাতে গাছ লম্বা না হয়ে ঝোপালো হয়। এআইএসের পরামর্শ, বেড ও টব আগাছামুক্ত রাখতে হবে, আর চারা গাছে আগেভাগে ফুল এলে তা সঙ্গে সঙ্গে ছিঁড়ে ফেলতে হবে।

অনাকাঙ্ক্ষিত, অপরিপক্ব ফুলের কুঁড়ি সরিয়ে ফেলাকে কুঁড়ি অপসারণ বা ডিসবাডিং বলে। বারি বলছে, মুকুট কুঁড়িগুলো রেখে বাকিগুলো ছিঁড়ে দিলে বড় আকারের ফুল পাওয়া যায়। এআইএস বিষয়টি হাতে-কলমে বুঝিয়েছে: বড় ফুল চাইলে মাঝের কুঁড়িটি রেখে পাশের দুটি কুঁড়ি কেটে ফেলুন; মাঝারি আকারের ফুল চাইলে মাঝের কুঁড়িটি সরিয়ে দিন।

চন্দ্রমল্লিকার ফুল ডালপালার তুলনায় বড় ও ভারী, তাই ঠেকা দিতে হয়। এআইএসের পরামর্শ, গাছের গোড়া থেকে কুঁড়ি পর্যন্ত একটি শক্ত বাঁশের কাঠি পুঁতে দিতে হবে, যাতে ফুল নুয়ে না পড়ে; কাঠি বাছতে হবে জাত অনুযায়ী গাছের উচ্চতা বুঝে। চারা লাগানোর সময়েই একবারে কাঠি পুঁতে দেওয়া ভালো, গোড়া থেকে একটু দূরে। একেবারে গোড়ায় বা গাছ বড় হওয়ার পর কাঠি পুঁতলে শিকড়ের ক্ষতি হতে পারে, আর শিকড়ের ক্ষত দিয়ে রোগজীবাণু ঢুকে রোগ ছড়াতে পারে।

এআইএস সতর্ক করেছে, চন্দ্রমল্লিকা গাছ বেশি পানি সহ্য করতে পারে না। তাই এমনভাবে পানি দিতে হবে যেন গোড়ায় বেশিক্ষণ পানি জমে না থাকে; তবে চারা রোপণের আগে ও পরে প্রতিদিন নিয়মিত পরিমাণমতো সেচ দেওয়া জরুরি।

চন্দ্রমল্লিকার ফুলের কুঁড়ি; ডিসবাডিংয়ে অনাকাঙ্ক্ষিত কুঁড়ি সরিয়ে দিলে বাকি কুঁড়ির ফুল বড় হয়। ছবি: হিট্রোমিলানিজ / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
চন্দ্রমল্লিকার ফুলের কুঁড়ি; ডিসবাডিংয়ে অনাকাঙ্ক্ষিত কুঁড়ি সরিয়ে দিলে বাকি কুঁড়ির ফুল বড় হয়। ছবি: হিট্রোমিলানিজ / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)

রোগ ও পোকামাকড়: বারি ও এআইএসের পরামর্শ


নর্থ ক্যারোলাইনার সম্প্রসারণ সেবার তালিকায় চন্দ্রমল্লিকার মাঝে মাঝে দেখা দেওয়া পোকার মধ্যে আছে জাবপোকা, থ্রিপস, মাকড় ও লেস বাগ, আর রোগের মধ্যে পাউডারি মিলডিউ, মরিচা, পাতায় দাগ এবং কাণ্ড ও শিকড় পচা। বাংলাদেশে বারি ও এআইএসের পরামর্শ মূলত জাবপোকা, একটি অতি ক্ষুদ্র শোষক পোকা, পাউডারি মিলডিউ ও পাতায় দাগ রোগ নিয়ে। নিচের ওষুধ ও মাত্রা এই প্রতিষ্ঠানগুলো যেভাবে প্রকাশ করেছে, সেভাবেই দেওয়া হলো।

জাবপোকা। বারির বর্ণনায় এ পোকা খুব ছোট, নরম ও কালো-সবুজ রঙের, আর শীতকালে এর প্রকোপ অনেক বেড়ে যায়। এটি পাতা, ডগা ও ফুল থেকে রস চুষে খায়, ফলে আক্রান্ত নতুন কুঁড়ি ও পাতা কুঁকড়ে যায়। এআইএস জাবপোকাকে ফুলের প্রধান ক্ষতিকর পোকা বলেছে এবং জানিয়েছে, এরা গাঢ় সবুজ, বেগুনি বা কালো রঙের হয়। বারির পরামর্শ ধাপে ধাপে:

  • আক্রমণের প্রাথমিক পর্যায়ে আক্রান্ত পাতা বা ফুল ছিঁড়ে পোকাসহ ধ্বংস করুন।
  • হলুদ রঙের আঠালো ফাঁদ ব্যবহার করুন; বারি জানায়, এতেও ভালো ফল পাওয়া যায়।
  • প্রতি লিটার পানিতে ৫ গ্রাম সাবানের গুঁড়া মিশিয়ে ৭ থেকে ১০ দিন পরপর ২ থেকে ৩ বার স্প্রে করুন।
  • আক্রমণ বেশি হলে ডাইমেথয়েট জাতীয় কীটনাশক (বারি উদাহরণ হিসেবে পারফেকথিয়ন, সানগর ও টাফগর ৪০ ইসির নাম দিয়েছে) প্রতি লিটার পানিতে ২.০ মিলি মিশিয়ে ১০ দিন পরপর ২ থেকে ৩ বার স্প্রে করুন।

অতি ক্ষুদ্র শোষক পোকা। এআইএসের চাষ-নির্দেশিকায় আরেকটি শোষক পোকার কথা আছে, যা এত ছোট ও ছাই রঙের যে খালি চোখে দেখা যায় না। এটি পাতা ও ফুলের রস শোষণ করে, ফলে আক্রান্ত পাতা ও ফুলে দাগ পড়ে; পাতা ও ফুল শুকিয়ে যায়, আর আক্রমণ বেশি হলে পুরো গাছও শুকিয়ে যায়। এআইএস প্রতি লিটার পানিতে ২ মিলি ম্যালাথিয়ন মিশিয়ে ৭ থেকে ১০ দিন অন্তর স্প্রে করতে বলেছে।

পাউডারি মিলডিউ। এই ছত্রাকজনিত রোগে পাতার ওপর সাদা থেকে ধূসর গুঁড়ার মতো আবরণ পড়ে, পাতা আস্তে আস্তে কুঁকড়ে বিকৃত হয়ে যায়; বেশি আক্রমণে পাতা শুকিয়ে গাছ মারা যায়। বারি ও কৃষিকথার উত্তর, দুই জায়গাতেই বলা হয়েছে, গরম ও আর্দ্র আবহাওয়ায় এ রোগ বেশি ও দ্রুত ছড়ায়। তাই প্রথম প্রতিরোধ হলো সঠিক রোপণ দূরত্ব মেনে গাছে পর্যাপ্ত আলো-বাতাসের ব্যবস্থা করা। আক্রমণের তীব্রতা বুঝে বারি ব্যাভিস্টিন (০.১%), ক্যালথেন (০.১%) বা সালটাফ (০.২%) ৭ থেকে ১০ দিন অন্তর স্প্রে করার পরামর্শ দিয়েছে। এআইএসের চাষ-নির্দেশিকায় আছে প্রতি লিটার পানিতে টিল্ট ২৫০ ইসি ০.৫ মিলি বা থিওভিট ২ গ্রাম মিশিয়ে ৭ থেকে ১০ দিন অন্তর স্প্রে করার কথা।

পাতায় দাগ পড়া রোগ। এ রোগে প্রথমে নিচের পাতায় হলদে দাগ পড়ে, আর আক্রমণ বাড়লে দাগগুলো বাদামি থেকে কালো হয়ে যায়। বারি ব্যাভিস্টিন বা বেনলেট (০.১%) স্প্রে করতে বলেছে; কৃষিকথার উত্তরে কার্বেনডাজিম গ্রুপের ছত্রাকনাশক, যেমন ব্যাভিস্টিন, প্রতি লিটার পানিতে ১ মিলি মিশিয়ে সঠিক নিয়মে স্প্রে করার কথা বলা হয়েছে।

এআইএসের উত্তরে বারবার ‘সঠিক নিয়মে’ স্প্রে করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে, আর বারির প্রযুক্তি ভান্ডার প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞের সঙ্গে কথা বলতে বলেছে; কোনো ওষুধ কেনার আগে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার কাছ থেকে যাচাই করে নেওয়া ভালো। বাড়ির বাগানিদের আরও জানা দরকার, নর্থ ক্যারোলাইনার সম্প্রসারণ সেবা বাগানের চন্দ্রমল্লিকাকে মৃদু বিষাক্ত বৈশিষ্ট্যের গাছ হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে: এতে ত্বকে জ্বালাপোড়া (কন্টাক্ট ডার্মাটাইটিস) হতে পারে, আর বিড়াল, কুকুর ও ঘোড়ার জন্য এটি সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত।

গাছের কাণ্ডে জাবপোকার দল, প্রসঙ্গ বোঝাতে দেওয়া ছবি; বারির বর্ণনায় জাবপোকাই চন্দ্রমল্লিকার প্রধান পোকা। ছবি: ড্যানিয়েল শোয়েন / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0)
গাছের কাণ্ডে জাবপোকার দল, প্রসঙ্গ বোঝাতে দেওয়া ছবি; বারির বর্ণনায় জাবপোকাই চন্দ্রমল্লিকার প্রধান পোকা। ছবি: ড্যানিয়েল শোয়েন / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0)

ফুল তোলা, ফলন ও কোথায় পরামর্শ মিলবে


এআইএস সতর্ক করেছে, কুঁড়ি অবস্থায় তুললে চন্দ্রমল্লিকা ফোটে না। বাইরের পাপড়িগুলো (রশ্মি-পুষ্পিকা) পুরোপুরি খুলে গেছে এবং মাঝের পাপড়িগুলো ফুটতে শুরু করেছে, এমন অবস্থায় খুব সকালে বা বিকেলে ধারালো ছুরি দিয়ে লম্বা বোঁটাসহ ফুল কেটে তুলতে হবে।

জাতভেদে ফলন কমবেশি হয়। এআইএসের হিসাবে গাছপ্রতি বছরে গড়ে ৩০ থেকে ৪০টি ফুল পাওয়া যায়, আর বারির দুটি জাতে গাছপ্রতি প্রায় ২০ থেকে ৩০টি।

চাষ নিয়ে প্রশ্ন থাকলে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপজেলা কৃষি অফিসে যোগাযোগ করা যায়, অথবা এআইএসের কৃষি কল সেন্টারের ১৬১২৩ নম্বরে ফোন করা যায়। কৃষিকথার পরামর্শ অনুযায়ী চারা কিনতে হবে সরকারি হর্টিকালচার সেন্টার বা বিশ্বস্ত নার্সারি থেকে।

ছবি: তানভীরইসলাম৬৩৫০ / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)

সূত্র: দ্য এগ্রো নিউজ (নিজস্ব প্রতিবেদক), বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বারি প্রযুক্তি ভান্ডার), কৃষি তথ্য সার্ভিস (চাষ-নির্দেশিকা ও কৃষিকথা), বাংলাপিডিয়া, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম, জাগো নিউজ, নর্থ ক্যারোলাইনা স্টেট বিশ্ববিদ্যালয় সম্প্রসারণ সেবা, ফ্লোরিডা বিশ্ববিদ্যালয় আইএফএএস সম্প্রসারণ সেবা, আরকানসাস বিশ্ববিদ্যালয় সমবায় সম্প্রসারণ সেবা, উইকিপিডিয়া

অনলাইন ডেস্কদা এগ্রো নিউজ

ফুল

সম্পর্কিত খবর

জৈব

গরুর চারণের আচ্ছাদন ফসলে সূর্যমুখী, সেই মাঠেই ফুল তুলতে আসেন দর্শনার্থী

কানাডার ম্যানিটোবার আর্নেসের দুগিদ পরিবার পুনরুৎপাদনশীল চারণের আচ্ছাদন ফসলে কাটা ফুলের সূর্যমুখী জাত যোগ করেছে। এখন একই মাঠ তাদের গরুর খাবার জোগায়, আবার দর্শনার্থীদের নিজ হাতে ফুল তোলার দিনেও ভিড় টানে।

Manitoba Co-operator১৫ অক্টোবর ২০২৬২ মিনিটের পড়া
ফুল

আগুনরঙা সুগন্ধি পানামা রোজ: গোলাপ নয়, রঙ্গনের আত্মীয়; কাটিংয়েই চারা

মিরপুরের জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যানে ফোটা কমলা-লাল পানামা রোজ (Rondeletia odorata) পানামা ও কিউবার গুল্ম; অক্টোবর থেকে মে পর্যন্ত ফোটে, ১০-১৫ সেন্টিমিটার ডাল কেটে পুঁতলে তিন থেকে পাঁচ সপ্তাহে শিকড় গজায়।

সমকাল১৪ অক্টোবর ২০২৬২ মিনিটের পড়া
ফুল

পাবনার বিল-ঝিলে লাল-সাদা শাপলার সমারোহ, তবু কমছে শাপলা জন্মানোর জায়গা

গাজনার বিল, ডিকশির বিল, চলনবিলসহ পাবনার জলাশয়ে এখন লাল ও সাদা শাপলা ফুটেছে; তবে জলাশয় ভরাট, অপরিকল্পিত মাছ চাষ আর কীটনাশকে শাপলার জায়গা সংকুচিত হচ্ছে বলে জানান স্থানীয়রা।

দেশ রূপান্তর১২ অক্টোবর ২০২৬১ মিনিটের পড়া

মন্তব্য

(০)