রাজবাড়ী সদর উপজেলার বাগমারা মোড় এলাকার গ্রিন এগ্রো নার্সারিতে মাটি ছাড়াই কোকোপিটে সবজি ও ফলের চারা তৈরি সাড়া ফেলেছিল বলে ২০২৪ সালের ৫ ডিসেম্বর খবর দেয় জাগো নিউজ। প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্লাস্টিকের ট্রেতে নারকেলের ছোবড়া, জৈব সার ও অনুখাদ্যের মিশ্রণে বীজ থেকে ১৫ থেকে ৩০ দিনের মধ্যে বেগুন, মরিচ, টমেটো, পেঁপে, বাঁধাকপি, ফুলকপি, লাউ, কলা ও তরমুজসহ ২৯ ধরনের সবজি ও ফলের চারা তৈরি হচ্ছিল। চাহিদা এতটাই বেড়েছিল যে চাহিদামতো সরবরাহ দিতে নার্সারি কর্তৃপক্ষকে হিমশিম খেতে হচ্ছিল।
নার্সারিতে যেভাবে চারা তৈরি হতো
প্রতিবেদন অনুযায়ী, সাধারণ কৃষকের কাছে মাটিবিহীন উন্নত জাতের চারা পৌঁছে দিতে ২০২২ সালের শুরুতে ১ বিঘা জমির ওপর নার্সারিটি গড়ে তোলেন কাজী মোর্শেদ আলম। নার্সারিতে প্লাস্টিকের ট্রেতে নারকেলের ছোবড়া, জৈব সার ও অনুখাদ্যের মিশ্রণে পানি ও সামান্য ছত্রাকনাশক দিয়ে প্রায় ২৯ ধরনের চারা তৈরি হতো। চারা তৈরি ও পরিচর্যার কাজ করতেন ১২ জন শ্রমিক।
বীজতলার তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে শেডের ওপরে পলিফিল্ম দেওয়া হয়েছিল, আর রোগজীবাণু ও মশা-মাছি ঠেকাতে চারপাশ সাইড নেট দিয়ে ঘেরা ছিল। জাগো নিউজ জানায়, গ্রিন এগ্রো ছাড়াও জেলায় মাটিবিহীন পদ্ধতিতে চারা তৈরির আরও কয়েকটি নার্সারি ছিল।
নার্সারির ব্যবস্থাপক রবিউল ইসলামের দাবি, তাঁদের ২৯ ধরনের চারা রোগবালাইমুক্ত এবং একটি চারাও মারা যায় না। তিনি জানান, মান ভালো হওয়ায় রাজবাড়ীসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় অনলাইনে চারা বিক্রি হচ্ছিল, আর চাহিদা বেশি থাকায় শেড বাড়ানোর পরিকল্পনা ছিল।

কৃষকেরা যা বলেছিলেন
এলাকার চাষি জামাল শেখ জাগো নিউজকে বলেন, মাটির বীজতলা থেকে চারা তোলার সময় শিকড় ছিঁড়ে যেত, কিন্তু ট্রের চারার শিকড় ছেঁড়ে না, তাই লাগানোর পর চারা মরে না, রোগবালাইও কম হয়। তিনি জানান, দুই বছর ধরে এই চারায় চাষ করে ভালো ফলন পাচ্ছেন, আর তাঁর খেত দেখে আশপাশের অনেকে এই চারা কিনছেন।
আরেক চাষি শের আলী বলেন, মাটির চারা অনেক মারা যায় এবং সময়মতো চারা পাওয়া যায় না। তাই তিনি এক সপ্তাহ আগে বিভিন্ন ধরনের ২ হাজার সবজির চারার অর্ডার দিয়ে সেদিন নিতে এসেছিলেন। চাষি খলিল মণ্ডল, খন্দকার এনামুল হাসান ও ফরিদ বলেন, মাটির বীজতলায় পোকামাকড় ও রোগের আক্রমণে চারা ভালো হতো না, রোপণের পরও অনেক চারা মারা যেত। তাঁদের ভাষ্য, মাটির বীজতলা তৈরির খরচ আর কোকোপিটের চারা কেনার খরচ একই, তবে কিনে আনা চারায় ঝামেলা কম।
রাজবাড়ী সদর উপজেলা কৃষি অফিসার মো. জনি খান বলেন, এ পদ্ধতিতে কৃষকেরা সারা বছর উন্নত চারা পাচ্ছেন। তাঁর মতে, এ চারার রোগজীবাণু প্রতিরোধের ক্ষমতা থাকায় মাঠে রোপণের পর রোগবালাই কম হবে এবং মাটির বীজতলার চেয়ে সময় ও খরচ বাঁচে। তিনি জানান, এই শেডের চারা অন্য জেলাতেও যাচ্ছিল।

কোকোপিট কী, চারা তৈরিতে কেন ব্যবহার হয়
কোকোপিট বা কয়ার ডাস্ট নারকেলের ছোবড়া থেকে পাওয়া আঁশজাতীয় উপাদান। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) ২০১৩ সালের গ্রিনহাউসে সবজি চাষের উত্তম কৃষি চর্চা নির্দেশিকা অনুযায়ী, কয়ারে বাতাস চলাচল ও পানি ধরে রাখার ক্ষমতা ভালো এবং এর স্বাভাবিক পিএইচ ৫.৫ থেকে ৬.৮। তবে কোনো কোনো কয়ারে লবণের মাত্রা বেশি থাকে, তাই ভালো মানের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহারের আগে একে ধুয়ে নিতে হয়। উইকিপিডিয়ার ভুক্তি অনুযায়ী, কোকোপিটে পুষ্টি উপাদান কম থাকায় সাধারণত একে একমাত্র উপাদান হিসেবে ব্যবহার করা হয় না; রাজবাড়ীর নার্সারিতেও কোকোপিটের সঙ্গে জৈব সার ও অনুখাদ্য মেশানো হচ্ছিল।
এফএওর একই নির্দেশিকা বলছে, মাটিবিহীন মাধ্যম শুরুতে রোগজীবাণুমুক্ত থাকে বলে মাটিবাহিত রোগের চাপ কম থাকে। নির্দেশিকায় আরও বলা হয়েছে, চারা শুরুতেই ভাইরাস বা মাটিবাহিত রোগজীবাণুতে আক্রান্ত হলে রোপণের পর ফসল বাঁচাতে খুব কমই করা যায়, তাই সুস্থ চারা দিয়ে শুরু করা জরুরি।

দেশে মাটিবিহীন চারার আগের অভিজ্ঞতা
বাংলাদেশে এই পদ্ধতি একেবারে নতুন ছিল না। ২০২০ সালের ৩০ নভেম্বর প্রথম আলো দিনাজপুরের বেলবাড়ী এলাকার একটি নার্সারির খবর দেয়, যেখানে ট্রে ও কাপে নারকেলের ছোবড়া ও কচুরিপানার মিশ্রণে চারা তৈরি হচ্ছিল। সেখানে তিন দিনের মধ্যে বীজ থেকে অঙ্কুর বের হতো এবং ১৫ দিন পর চারা বিক্রির উপযোগী হতো। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক তৌহিদ ইকবাল তখন প্রথম আলোকে বলেন, এই পদ্ধতিতে চারা মাটিবাহিত রোগবালাই থেকে মুক্ত থাকে।
রাজবাড়ী ঢাকা বিভাগের একটি জেলা। পদ্মাসহ কয়েকটি নদী জেলাটির ভেতর দিয়ে বয়ে গেছে, আর এর জমি মূলত পদ্মার পলিতে গড়া।

ছবি: Judgefloro / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, প্রথম আলো, জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও), উইকিপিডিয়া




মন্তব্য
(০)