সরাসরিবাজারদর
আটা (প্যাকেটজাত)৫৮—আদা - আমদানিকৃত১৬৭—আদা - দেশী১৫৪—আমন চাল - মাঝারি৫৬—আমন চাল - মোটা৪৮—আমন চাল - সরু৭২—আয়োডিনযুক্ত লবণ (প্যাকেটজাত)৩২—কাঁচা মরিচ২১৮—খামারের মুরগী১৬২—খাসী৯০০—চিনি (দেশী)১৩২—ছোলা - গোটা৮৫—ডিম ফার্ম - লাল৪৭—পেঁয়াজ - দেশী৬০—বোরো চাল - মাঝারি৫৫—বোরো চাল - মোটা৪৭—বোরো চাল - সরু৬৬—মাংসঃ– গরু৭২৯—মুগ ডাল১২২—রসুন - আমদানিকৃত১৯২—রসুন - দেশী১৭৩—সয়াবিন তেল১৬৩—
হালনাগাদ ১৬ অক্টোবর ২০২৬
ঢাকা২৬°পরিষ্কার আকাশআর্দ্রতা ৭৪%বাতাস ৩ কিমি/ঘ

ইফতারে ট্রেন্ডি মোটা চালের খিচুড়ি বাড়িতে রান্নার পদ্ধতি

পাকিস্তানের চারসাড্ডার নামে পরিচিত মোটা চালের খিচুড়ি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়ে ২০২৬ সালের মার্চে রমজানে ঢাকার নানা জায়গায় বিক্রি হচ্ছিল; ৮ মার্চ জাগো নিউজ ২৪ গরুর মাংস, চাল ও ডাল দিয়ে বাড়িতে এটি রান্নার প্রণালি প্রকাশ করে।

ইফতারে ট্রেন্ডি মোটা চালের খিচুড়ি বাড়িতে রান্নার পদ্ধতি
রান্নাবান্না

২০২৬ সালের মার্চে রমজানে ঢাকায় ইফতারের যে খাবারগুলো নিয়ে সবচেয়ে বেশি আলোচনা হচ্ছিল, তার একটি ছিল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া মোটা চালের খিচুড়ি। ২০২৬ সালের ৮ মার্চ বাড়িতে এটি রান্নার প্রণালি প্রকাশ করে জাগো নিউজ ২৪ জানায়, খিচুড়িটি মূলত পাকিস্তানের একটি শহরের নামে চারসাড্ডা মোটা চাওয়াল খিচুড়ি নামে পরিচিত, আর এর স্বাদ ও ভিন্ন ধরনের টেক্সচারের কারণে অল্প সময়েই এটি মানুষের নজর কাড়ে। পত্রিকাটির তথ্য অনুযায়ী, ততদিনে বাংলাদেশেও খাবারটি বেশ পরিচিত হয়ে উঠেছিল; ঢাকার রেস্তোরাঁ, গলির ছোট দোকান কিংবা ফুডকার্ট, প্রায় সব জায়গাতেই এটি পাওয়া যাচ্ছিল এবং অনেকেই ইফতারের বিশেষ খাবার হিসেবে এটি বেছে নিচ্ছিলেন।

বাংলাদেশে ১৪৪৭ হিজরির রমজান শুরু হয়েছিল ২০২৬ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি, বৃহস্পতিবার। ১৮ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায় ঢাকা ট্রিবিউন জানায়, বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের সভাকক্ষে বৈঠকে বসে জাতীয় চাঁদ দেখা কমিটি নেত্রকোনা, সিরাজগঞ্জ ও কক্সবাজার জেলা থেকে নতুন চাঁদ দেখার খবর পেয়ে রোজা শুরুর ঘোষণা দেয়।

পত্রিকাটি লিখেছে, ইফতারে অনেকেরই পছন্দের তালিকায় খিচুড়ি আগে থেকেই থাকে। যে খিচুড়ির রেসিপি তারা দিয়েছে, সেটি মাংসভিত্তিক ভারী একটি পদ: পেঁয়াজ, আদা-রসুন বাটা ও গুঁড়া মসলায় গরুর মাংস কষিয়ে তাতে ভেজানো মোটা চাল এবং মুগ ও মসুর ডাল মিশিয়ে ঘন হওয়া পর্যন্ত রান্না করা হয়। নিচে জাগো নিউজের দেওয়া রেসিপিটি তুলে ধরা হলো, সঙ্গে বিশ্বকোষ, গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের সূত্র থেকে খাবারটি, এর পাকিস্তানি নামের উৎস এবং উপকরণগুলোর পটভূমি।

চারসাড্ডার নামে একটি খাবার


চারসাড্ডা পাকিস্তানের খাইবার পাখতুনখোয়া প্রদেশের একটি শহর এবং চারসাড্ডা জেলার সদর দপ্তর। পেশোয়ার উপত্যকায় অবস্থিত শহরটি প্রাদেশিক রাজধানী পেশোয়ার থেকে প্রায় ২৯ কিলোমিটার দূরে, সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ২৭৬ মিটার উচ্চতায়। নামটির সাধারণ ব্যাখ্যা হলো "চার রাস্তা": চার ("চার") আর সাড্ডা ("রাস্তা")। পাকিস্তানের ২০২৩ সালের আদমশুমারিতে শহরটির জনসংখ্যা ছিল ১ লাখ ২০ হাজার ১৭০, যাঁদের ৯৯.২ শতাংশের ভাষা পশতু। জায়গাটি অত্যন্ত প্রাচীন: খ্রিষ্টপূর্ব ষষ্ঠ শতক থেকে খ্রিষ্টীয় দ্বিতীয় শতক পর্যন্ত গান্ধারের রাজধানী পুষ্কলাবতীর ধ্বংসাবশেষ রয়েছে চারসাড্ডায়, আর এর বালা হিসার ঢিবিতে পাওয়া সবচেয়ে পুরোনো স্তরের বয়স ধরা হয় খ্রিষ্টপূর্ব প্রায় ১৪০০ সাল।

২০২৪ সালের ২ মার্চ পেশোয়ার থেকে অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস অব পাকিস্তান (এপিপি) শহরটির এই চালের পদ নিয়ে প্রতিবেদন করে; তখন ঠান্ডা আর বৃষ্টির মধ্যে মানুষ এর খোঁজে ভিড় করছিল। সংবাদ সংস্থাটির বর্ণনায় চারসাড্ডার মোটা চাওয়াল ("মোটা চাল") চারসাড্ডা জেলার একটি বিশেষ জাতের চাল, যা রান্নার পর সোনালি-বাদামি রং ধারণ করে, আর পরিবেশন করা হয় দই, রায়তা বা আচারের সঙ্গে। পাব্বি বাজারের একজন বিক্রেতা, যিনি জানান বাবার কাছ থেকে তিনি এই রান্না শিখেছেন, প্রণালিটি ব্যাখ্যা করেন: মাংস বড় টুকরো করে কেটে আদা-রসুন বাটা, লবণ, টমেটো, শুকনা মরিচ, বড় এলাচ, হলুদ, ধনে, জিরা, কারিপাতা ও গরম মসলা মেশানো হয়; প্রায় ৩০ মিনিট আগুনে রান্নার পর দেওয়া হয় পেঁয়াজ ও তেল, তারপর চাল সোনালি-বাদামি না হওয়া পর্যন্ত রান্না করা হয়।

এপিপি দেখেছে, পেশোয়ারের ফেরদৌস, বোর্ড, নমক মান্ডি ও কিসসা খোয়ানি এলাকায়, পেশোয়ার, চারসাড্ডা ও মর্দানের মধ্যকার জিটি রোডের দুই পাশের বিক্রেতাদের কাছে এবং খাইবার পাখতুনখোয়ার রেস্তোরাঁর মেনুতে পদটি বিক্রি হয়। সংস্থাটি লিখেছে, পেশোয়ারি পোলাওয়ের চেয়ে দাম কম বলে নিম্ন আয়ের পরিবারগুলো বিয়ে, জন্মদিন ও অন্যান্য অনুষ্ঠানে এটিকেই বেছে নেয়; নওশেরা জেলার একজন অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক এপিপিকে জানান, পরিবারের জন্য তিনি প্রায় ৩০০ রুপিতে এটি কিনে নিয়ে যান। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে আরব নিউজ জেলাটি থেকে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে, যার শিরোনাম ছিল "'মোটা চাওয়াল' রাইস ডিশ টেকস সেন্টার টেবিল অ্যাট ওয়েডিং ফিস্টস ইন পাকিস্তান'স চারসাড্ডা", অর্থাৎ চারসাড্ডার বিয়ের ভোজে 'মোটা চাওয়াল' প্রধান পদ হয়ে উঠেছে।

জাগো নিউজ ঢাকার যে সংস্করণের কথা লিখেছে, তাতে মাংস আর মসলা দিয়ে মোটা চাল রান্নার ধারণাটি রয়ে গেছে, তবে এটি খিচুড়ি: চাল রান্না হয় ডালের সঙ্গে, আর এটাই খিচুড়ির মূল পরিচয়।

পাকিস্তানের খাইবার পাখতুনখোয়া প্রদেশের চারসাড্ডায় সূর্যাস্ত; এই শহরের নামেই পদটির নাম। ছবি: Rakonline / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0)
পাকিস্তানের খাইবার পাখতুনখোয়া প্রদেশের চারসাড্ডায় সূর্যাস্ত; এই শহরের নামেই পদটির নাম। ছবি: Rakonline / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0)

খিচুড়ি: চাল আর ডালের পুরোনো পদ


বাংলাদেশের জাতীয় বিশ্বকোষ বাংলাপিডিয়া খিচুড়িকে সংজ্ঞায়িত করেছে সহজভাবে: ভালোভাবে সেদ্ধ চালের সঙ্গে ডাল মেশানো খাবার। বিশ্বকোষটি আরও বলেছে, খিচুড়িতে ডাল ও সবজি যোগ করলে এর প্রোটিন দক্ষতা অনুপাত (প্রোটিন এফিশিয়েন্সি রেশিও) বাড়ে, ফলে শুধু ভাতের চেয়ে এটি বেশি পুষ্টিকর হয়।

খাবারটি পুরোনো এবং গোটা দক্ষিণ এশিয়ার; উর্দু ও হিন্দিতে একে বলা হয় খিচড়ি, আর শব্দটির উৎস ধরা হয় সংস্কৃত খিচ্চা, অর্থাৎ চাল ও ডালজাতীয় শস্যের একটি পদ। মরক্কোর পর্যটক ইবনে বতুতা আনুমানিক ১৩৫০ সালে ভারতবর্ষে অবস্থানকালে চাল ও মুগ দিয়ে তৈরি খিচড়ির বর্ণনা দিয়েছেন। সম্রাট আকবরের দরবারের ষোড়শ শতকের বিবরণ আইন-ই-আকবরি, যা লিখেছিলেন তাঁর উজির আবুল ফজল, রাজকীয় রন্ধনশালার পদগুলোর মধ্যে খিচড়িকে রেখেছে চাল, ডাল ও ঘিয়ের একটি প্রণালিসহ; ধারণা করা হয়, ইঙ্গ-ভারতীয় নাশতার পদ কেজেরির উৎসও এই খিচুড়ি।

২০২৫ সালের ২৩ জুলাই খিচুড়ির ইতিহাস নিয়ে প্রকাশিত এক ফিচারে প্রথম আলো মধ্যযুগের মনসামঙ্গল কাব্যে খিচুড়ির উল্লেখের কথাও লিখেছে এবং বলেছে, খিচুড়ি শুধু বাঙালির খাবার নয়, ভারতবর্ষের নানা জায়গায় বহু কাল ধরেই এটি খাওয়ার চল আছে। একই লেখায় বলা হয়, গ্রামবাংলায় খিচুড়ি দীর্ঘদিন ধরে কম দামি পদ হিসেবেই পরিচিত: ঘরে কিছু না থাকলে খিচুড়ির কথা মনে পড়ে, অতিথি আপ্যায়নে এই পদ ভাবাই যায় না; তবু বাঙালির হেঁশেল থেকে এটি কখনো হারিয়ে যায়নি।

পত্রিকাটি লিখেছে, বৃষ্টির দিনে খিচুড়ি হবে, এটা প্রায় সব বাঙালিরই জানা। সামর্থ্য অনুযায়ী কেউ রাঁধেন মুগ ডাল আর ছোট দানার সুগন্ধি কালিজিরা চালের ভুনা খিচুড়ি, কেউ সেদ্ধ চালে কয়েক রকম ডাল দিয়ে ঝরঝরে খিচুড়ি; আর অপেক্ষাকৃত অসচ্ছল পরিবারে চাল, ডাল, সামান্য সবজি আর এক হাঁড়ি পানি দিয়ে রান্না হতো পাতলা খিচুড়ি, ল্যাটকা, যা অঞ্চলভেদে ঢিলা, ল্যাটা বা গলা খিচুড়ি নামে পরিচিত।

বাংলাদেশের একটি গ্রামে রান্না করা বড় এক হাঁড়ি খিচুড়ি। ছবি: Ifkaar / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
বাংলাদেশের একটি গ্রামে রান্না করা বড় এক হাঁড়ি খিচুড়ি। ছবি: Ifkaar / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)

ভুনা, ল্যাটকা আর ঢাকার খিচুড়ির হালফ্যাশন


মোটা চালের খিচুড়ি রাজধানীতে খিচুড়িকেন্দ্রিক কয়েকটি চলতি ধারার সর্বশেষটি। ২০২৪ সালের অক্টোবরে দ্য ডেইলি স্টার বাংলা বাঙালি খিচুড়ির প্রধান দুই ধরনের পার্থক্য তুলে ধরে। ভুনা খিচুড়িতে প্রথমে উপকরণগুলো গোটা মসলার সুবাসসহ ঘিয়ে হালকা ভেজে নেওয়া হয়; এতে পদটিতে মসলাদার, ধোঁয়াটে একটি স্বাদ আসে এবং চাল ও ডালের দানা থাকে ঝরঝরে। অন্যদিকে ল্যাটকা খিচুড়ি সাধাসিধে ও ঝামেলামুক্ত; এর জন্য কোনো বিশেষ দিন লাগে না, বিশেষ পরিবেশনেরও দরকার হয় না। পত্রিকাটি যাঁদের সঙ্গে কথা বলেছে, তাঁদের মত ছিল ভিন্ন: স্থানীয় একটি রেস্তোরাঁর মালিক ভুনা খিচুড়িকেই আসল খিচুড়ি বলেন, আর আরেকজনের মতে দুটিই এক শেকড় থেকে এসে পরে ভিন্ন রূপ নিয়েছে; ল্যাটকা সাধারণভাবে খাওয়ার জন্য, ভুনা কোনো আয়োজন বা উদযাপনের জন্য।

২০২৫ সালের জুলাইয়ে প্রথম আলো জানায়, একসময় খিচুড়ির মধ্যেও সবচেয়ে অবহেলিত ল্যাটকা এখন শহুরে মানুষের, এমনকি জেন-জিদের কাছেও শখের খাবার হয়ে উঠেছে; এসি রেস্তোরাঁ বা পারিবারিক পার্টিতে এর জায়গা পোক্ত হচ্ছে। বনানী, মিরপুর, ধানমন্ডি ও কারওয়ান বাজারের রেস্তোরাঁয় ৫০ টাকা থেকে প্রায় ১ হাজার টাকায় কালাভুনা, কষা মাংস, মুরগি বা হাঁসের পদের সঙ্গে, কিংবা শুধু সবজির খিচুড়ির সঙ্গে একটি ডিম দিয়ে এটি বিক্রি হচ্ছিল, আর প্রায় সব জায়গায় সঙ্গে থাকত আচার; গুলশানের একটি প্রিমিয়াম মিষ্টির দোকানে ল্যাটকা খিচুড়ির দাম ছিল ৯০০ টাকা। পত্রিকাটি লিখেছে, ঝরঝরে বা ভুনা খিচুড়ির জন্য বিখ্যাত ঢাকার পুরোনো দোকানগুলোতে ল্যাটকা খিচুড়ি মেলে না।

জাগো নিউজ যে রেসিপি প্রকাশ করেছে, সেটি ভুনা ঘরানার। পানি দেওয়ার আগে ভেজানো চাল ও ডাল মাংস আর মসলার সঙ্গে দুই থেকে তিন মিনিট নেড়ে ভেজে নেওয়া হয়; পত্রিকাটির মতে এতে খিচুড়ি আরও নরম ও সুস্বাদু হয়। এরপর পাতলা ঝোল নয়, ঘন হওয়া পর্যন্ত খিচুড়ি রান্না করা হয়।

কেন মোটা চাল


জাগো নিউজ চালের কোনো নির্দিষ্ট জাতের নাম বলেনি, শুধু মোটা চাল। খিচুড়ির জন্য মোটা দানার চালের কদর বাঙালি রাঁধুনিদের কাছে বহু পুরোনো। ২০২৫ সালের জুলাইয়ের ফিচারে প্রথম আলো পশ্চিমবঙ্গের লেখক অনুপম পালের বাংলার কৃষি ও কৃষক বইয়ের কথা উল্লেখ করে, যেখানে বরিশাল অঞ্চলের আশাইল নামের একটি চালের বর্ণনা আছে; এই চাল নাকি শুধু খিচুড়ি রান্নার জন্যই চাষ করা হতো, আর এর বিশেষত্ব হলো রান্নার মাঝামাঝি অবস্থায় দানা ফেটে যায়। ফিচারের লেখক যোগ করেন, পাকা রাঁধুনিরা একবাক্যে মানবেন, রান্নার মধ্যে চাল ফেটে তাতে ডাল আর মসলার রস ঢুকলেই খিচুড়ি সবচেয়ে স্বাদের হয়। ছোটবেলায় নড়াইলের গ্রামে লক্ষ্মীকাজল নামের এক আমন ধানের মোটা চালের কথাও তিনি স্মরণ করেন, যা রান্নার পর ফেটে গিয়ে ডাল-মসলাকে আঠালোভাবে জড়িয়ে রাখত।

চাল বাংলাদেশের প্রধান খাদ্য। বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী বাংলাদেশের প্রায় ৯০ শতাংশ মানুষ ভাত খান, আর সারা বছর তিন মৌসুমে, আউশ, আমন ও বোরোতে, ধান চাষ হয়; জমির পরিমাণে রোপা আমন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। দেশের মানুষ রোদে শুকানো ধান থেকে ভাঙানো আতপ চাল এবং সেদ্ধ ধান থেকে ভাঙানো সিদ্ধ চাল, দুটোই খান। বিশ্বকোষটি জানায়, ১৯৭০ সালে ঢাকা থেকে ৩৬ কিলোমিটার দূরে গাজীপুরে প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি) দেশের উচ্চফলনশীল জাত উদ্ভাবন করে এবং এর জিন ব্যাংকে প্রায় ৫ হাজার ধানের জার্মপ্লাজম সংরক্ষিত আছে।

বাজারে মোটা চালই সবচেয়ে কম দামের। ২০২৫ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি চালের দাম নিয়ে প্রতিবেদনে দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড ঢাকার কারওয়ান বাজারে কেনাবেচা হওয়া মোটা চালের মধ্যে গুটি স্বর্ণা, ব্রি-২৮, ব্রি-২৯ ও পাইজামের নাম উল্লেখ করে; সেখানে খুচরা বাজারে স্বর্ণা বিক্রি হচ্ছিল কেজিপ্রতি ৫৪ থেকে ৫৮ টাকায়। প্রতিবেদনে উদ্ধৃত চট্টগ্রামের ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) দামের তালিকায় মোটা চাল ছিল কেজিপ্রতি ৫৪ থেকে ৫৬ টাকা, মাঝারি চাল ৫৮ থেকে ৬৫ টাকা এবং সরু চাল ৭০ থেকে ৭৫ টাকা।

মুগ আর মসুর: হাঁড়ির দুই ডাল


রেসিপিতে মুগ ও মসুর ডাল মিলিয়ে এক কাপ লাগে। বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী মসুর (লেন্স কুলিনারিস) বাংলাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় ডালশস্য এবং দেশের বেশির ভাগ মানুষের দৈনন্দিন খাবারের অন্যতম প্রধান উপাদান। এটি শীতকালীন ফসল; খুব বেশি ঠান্ডা বা গরম সহ্য করতে পারে না, কিছুটা খরা সইতে পারলেও জলাবদ্ধতায় অত্যন্ত সংবেদনশীল। আস্ত দানায় প্রায় ২৫ শতাংশ প্রোটিন, ৫৫.৮ শতাংশ শর্করা, ১ শতাংশ চর্বি ও ৩.৭ শতাংশ আঁশ থাকে, আর ভাঙা দানাই ডাল হিসেবে রান্না হয়।

মুগের (ভিগনা রেডিয়াটা) উৎপত্তি দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় বলে ধারণা করা হয়; বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, মিয়ানমার, থাইল্যান্ডসহ নানা দেশে এর ব্যাপক চাষ হয়। বাংলাপিডিয়া এর প্রধান দুই ধরনের কথা বলেছে: সোনালি বা হলুদ মুগ, অর্থাৎ সোনামুগ, এবং সবুজ মুগ, যা মূলত দানার জন্য চাষ হয়। বাংলাদেশে মুগ প্রথাগতভাবে শীতকালীন ফসল, বরিশাল ও পটুয়াখালীতে এর ব্যাপক চাষ হয়। দানা আস্ত বা ভেঙে ডাল হিসেবে খাওয়া হয়, আর গাছ পশুখাদ্য ও সবুজ সার হিসেবেও কাজে লাগে। দুটিই শিমজাতীয় শস্য, আর চালের সঙ্গে এগুলো মেশানোর ফলেই খিচুড়ি পায় বাংলাপিডিয়ার বর্ণিত বাড়তি প্রোটিন-মান।

ভাঙা ডাল: হলুদ মুগ ও লালচে-কমলা মসুর, এই খিচুড়ির দুই ডাল। ছবি: jasleen_kaur / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 2.0)
ভাঙা ডাল: হলুদ মুগ ও লালচে-কমলা মসুর, এই খিচুড়ির দুই ডাল। ছবি: jasleen_kaur / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 2.0)

উপকরণ


জাগো নিউজ পদটির জন্য নিচের উপকরণগুলোর তালিকা দিয়েছে:

  • গরুর মাংস (ছোট টুকরো): আধা কেজি
  • মোটা চাল: ১ কাপ
  • মুগ ও মসুর ডাল মিলিয়ে: ১ কাপ
  • পেঁয়াজ কুচি: আধা কাপ
  • আদা-রসুন বাটা: ২ টেবিল চামচ
  • কাঁচা মরিচ: ৪টি
  • হলুদ গুঁড়া: ১ চা চামচ
  • মরিচ গুঁড়া: ১ চা চামচ
  • ধনে গুঁড়া: আধা চা চামচ
  • জিরা গুঁড়া: আধা চা চামচ
  • আস্ত গরম মসলা (এলাচ, দারুচিনি, তেজপাতা): ৪-৫টি
  • ঘি বা তেল: আধা কাপ
  • লবণ: স্বাদমতো
  • পানি: প্রয়োজনমতো

রান্না শেষে ওপরে ছড়ানোর জন্য প্রণালিতে ধনেপাতা বা বেরেস্তা (মচমচে করে ভাজা পেঁয়াজ) ব্যবহারের কথাও আছে; এগুলো পত্রিকার উপকরণ তালিকায় নেই।

রান্নার ধাপ


  • কড়াই বা ভারী হাঁড়িতে তেল বা ঘি গরম করে আস্ত গরম মসলা ফোড়ন দিন।
  • পেঁয়াজ কুচি দিয়ে সোনালি হওয়া পর্যন্ত ভাজুন।
  • আদা-রসুন বাটা ও সব গুঁড়া মসলা দিয়ে ভালোভাবে কষান।
  • মসলা থেকে তেল আলাদা হয়ে ওপরে উঠে এলে মাংস দিন। মাঝারি আঁচে কষিয়ে নিন, যাতে মাংস নরম হয় এবং মসলার সঙ্গে ভালোভাবে মিশে যায়।
  • এর মধ্যে চাল ও ডাল ভালোভাবে ধুয়ে প্রায় ৩০ মিনিট ভিজিয়ে রাখুন।
  • কষানো মাংসে ভেজানো চাল ও ডাল দিয়ে ২-৩ মিনিট নেড়ে ভেজে নিন; পত্রিকাটির মতে এতে খিচুড়ি আরও নরম ও সুস্বাদু হয়।
  • প্রয়োজনমতো গরম পানি দিন; খেয়াল রাখুন, পানি যেন চালের ওপরে কিছুটা বেশি থাকে।
  • লবণ ও কাঁচা মরিচ দিয়ে ঢেকে মাঝারি আঁচে রান্না করুন; মাঝে মাঝে নেড়ে দিন, যাতে নিচে লেগে না যায়।
  • চাল ও ডাল নরম হয়ে পানি কমে খিচুড়ি ঘন হয়ে এলে ওপরে ধনেপাতা বা বেরেস্তা ছড়িয়ে নামিয়ে নিন।
  • গরম গরম ইফতারে পরিবেশন করুন।

চাল-ডাল দেওয়ার আগে গরুর মাংস মসলায় কষিয়ে নরম করে নেওয়া হয়, আর ভেজানো দানাগুলো মসলাদার তেলে অল্প সময় ভেজে নেওয়ার এই ধাপটিই, ডেইলি স্টারের বর্ণনা অনুযায়ী, ভুনা খিচুড়িকে মসলাদার ধোঁয়াটে স্বাদ দেয় এবং দানা ঝরঝরে রাখে।

নিরাপদে রান্না ও সংরক্ষণ


বিকেলে রেঁধে সন্ধ্যায় ইফতারে খাওয়ার মাংস-চালের পদে যেকোনো ঘরোয়া রান্নাঘরের সাধারণ সতর্কতাই প্রযোজ্য। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) ২০০১ সালে সব খাদ্য প্রস্তুতকারীর জন্য নিরাপদ খাদ্যের পাঁচটি চাবিকাঠি চালু করে: পরিচ্ছন্ন থাকুন; কাঁচা ও রান্না করা খাবার আলাদা রাখুন; ভালোভাবে রান্না করুন; খাবার নিরাপদ তাপমাত্রায় রাখুন; এবং নিরাপদ পানি ও কাঁচামাল ব্যবহার করুন। এই চাবিকাঠিগুলোর প্রশিক্ষণ নির্দেশিকায় ডব্লিউএইচও মাংস, সামুদ্রিক খাবার, রান্না করা ভাত, রান্না করা পাস্তা, দুধ, পনির ও ডিমকে জীবাণু বাড়ার জন্য আদর্শ খাবার হিসেবে চিহ্নিত করেছে, কারণ জীবাণুর বাড়তে লাগে শুধু খাবার, পানি, সময় ও উষ্ণতা; মাত্র ১৫ মিনিটে একটি ব্যাকটেরিয়া দুটি হতে পারে, আর ছয় ঘণ্টার মধ্যে একটি ব্যাকটেরিয়া বেড়ে ১ কোটি ৬০ লাখের বেশি হতে পারে।

গরুর মাংসের খিচুড়ির ক্ষেত্রে নির্দেশিকার পরামর্শগুলো কয়েকটি অভ্যাসে দাঁড়ায়:

  • খাবার ধরার আগে হাত ধুয়ে নিন; অন্য খাবারে আবার ব্যবহারের আগে রান্নার জায়গা ও সরঞ্জাম পরিষ্কার করুন।
  • কাঁচা মাংস আর রান্না করা খাবারের জন্য আলাদা ছুরি ও কাটিং বোর্ড ব্যবহার করুন, আর কাঁচা ও রান্না করা খাবার আলাদা করে রাখুন।
  • মাংস পুরোপুরি সেদ্ধ হয়েছে কি না দেখুন: মাংসের রস স্বচ্ছ হয়েছে কি না, অথবা থার্মোমিটার দিয়ে; ঝোলজাতীয় খাবার ফুটিয়ে নিন।
  • রান্না করা মাংস ঠান্ডা করার জন্য সারা রাত ঘরের তাপমাত্রায় ফেলে রাখবেন না; বেঁচে যাওয়া খাবার রান্নার দুই ঘণ্টার মধ্যে ঠান্ডা জায়গায় রাখুন।
  • রান্না করা খাবার আবার গরম করলে ভেতর পর্যন্ত ভালোভাবে গরম করুন।
  • নিরাপদ পানি ব্যবহার করুন, আর কাঁচা মরিচ ও ধনেপাতার মতো তাজা উপকরণ ধুয়ে নিন।

ডব্লিউএইচওর নির্দেশিকা অনুযায়ী খাদ্যবাহিত রোগের সবচেয়ে সাধারণ উপসর্গ পেটব্যথা, বমি ও ডায়রিয়া; বেশির ভাগ ক্ষেত্রে খাবার খাওয়ার ২৪ থেকে ৭২ ঘণ্টা পর উপসর্গ দেখা দেয়, আর ডায়রিয়ার সময় প্রচুর তরল পান করলে পানিশূন্যতা এড়ানো যায়। শিশু, অসুস্থ মানুষ, অন্তঃসত্ত্বা নারী ও বয়স্কদের ক্ষেত্রে এর পরিণতি সাধারণত বেশি গুরুতর হয়।

ইফতারের টেবিলে খিচুড়ি


বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বাংলাদেশ কার্যালয় ২০১৮ সালের মে মাসে রমজানের স্বাস্থ্য পরামর্শে খেজুর দিয়ে ইফতার শুরু করাকে প্রথাগত ও স্বাস্থ্যকর উপায় বলেছে, কারণ খেজুর আঁশের চমৎকার উৎস; আর ধীরে খেতে বলেছে, কারণ দ্রুত বেশি খাবার খেলে বুক জ্বালাপোড়া ও অস্বস্তি হতে পারে।

একই পরামর্শে বলা হয়েছে পর্যাপ্ত পানি পান করতে এবং সাহরি ও ইফতারে স্যুপ, সবজি এবং শসা, লেটুস, টমেটো ও তরমুজের মতো পানিসমৃদ্ধ খাবার খেতে; ইফতারে চিনিযুক্ত খাবার ও পানীয় সীমিত রাখতে; ভাজাপোড়া, চর্বিযুক্ত খাবার ও চর্বিযুক্ত মাংস কম খেতে; লাল মাংসের বদলে সাদা মাংস বেছে নিতে, চর্বিহীন অংশ নিতে এবং দৃশ্যমান চর্বি ছেঁটে ফেলতে; প্রক্রিয়াজাত মাংস, আচার, নোনতা পনির ও সসের মতো বেশি লবণযুক্ত খাবার এড়াতে; সাহরি হালকা রাখতে কিন্তু বাদ না দিতে; এবং সন্ধ্যায় দ্রুত হাঁটার মতো শারীরিক কাজে সক্রিয় থাকতে।

আধা কেজি গরুর মাংস আর আধা কাপ ঘি বা তেলের এই রেসিপিতে সেই পরামর্শ মানলে দৃশ্যমান চর্বি ছেঁটে ফেলা চর্বিহীন মাংস, পরিমিত পরিবেশন এবং খিচুড়ির সঙ্গে প্রায়ই দেওয়া আচার কম খাওয়ার কথাই আসে। ডায়াবেটিস, হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ, কিডনির রোগ বা অন্য কোনো দীর্ঘমেয়াদি অসুখ থাকলে, কিংবা অন্তঃসত্ত্বা হলে, রোজা রাখা ও ভারী ইফতার আপনার জন্য উপযুক্ত কি না, খাদ্যাভ্যাস বদলানোর আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

ছবি: রিজওয়ান আহমেদ / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)

সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, ঢাকা ট্রিবিউন, অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস অব পাকিস্তান (এপিপি), আরব নিউজ, প্রথম আলো, দ্য ডেইলি স্টার বাংলা, দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, বাংলাপিডিয়া, উইকিপিডিয়া, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও), ডব্লিউএইচও বাংলাদেশ

অনলাইন ডেস্কদা এগ্রো নিউজ

রান্নাবান্না

সম্পর্কিত খবর

রান্নাবান্না

ঘরেই ক্যাফে-স্টাইলের ক্রিমি প্রন পাস্তা: উপকরণ আর রান্নার ধাপ

২৫০ গ্রাম পাস্তা, এক কাপ চিংড়ি, ১০০ গ্রাম চিজ, মেয়োনিজ আর দুধে তৈরি ঘন ক্রিমি সসে প্রন পাস্তা; সেদ্ধ থেকে পরিবেশন পর্যন্ত সময় লাগে অল্পই।

সারাবাংলা১৪ অক্টোবর ২০২৬১ মিনিটের পড়া
স্বাস্থ্য

প্রোটিন শেক কি খাবারের বিকল্প? কার কতটা প্রোটিন লাগে

প্রাপ্তবয়স্কের দৈনিক প্রতি কেজি ওজনে ০.৮ গ্রাম প্রোটিন লাগে, ৭০ কেজির মানুষের ৫৬ গ্রাম, যা সুষম খাবার থেকেই মেলে; প্রোটিন শেক দরকার কেবল যাঁদের চাহিদা খাবারে পূরণ হয় না।

প্রথম আলো১৪ অক্টোবর ২০২৬২ মিনিটের পড়া
রান্নাবান্না

মৌসুমি তালের পিউরিতে নরম কেক, ঘরে বানানোর সহজ রেসিপি

আধা কাপ তালের পিউরি, এক কাপ ময়দা, দুটি ডিম আর এক-তৃতীয়াংশ কাপ গুঁড়া দুধ ও তেলে ওভেনে ১৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে ৩৫-৪০ মিনিটে তৈরি হয় তুলতুলে তালের কেক।

এগ্রিকেয়ার২৪১৪ অক্টোবর ২০২৬১ মিনিটের পড়া

মন্তব্য

(০)