চীনের রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা মন্ত্রণালয় ২০২৬ সালের জুনে অভিযোগ করে, বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থাগুলো সামুদ্রিক কচ্ছপ ও মাছের শরীরে ট্র্যাকিং ও মনিটরিং যন্ত্র বসিয়ে দেশটির উপকূলীয় জলসীমা এবং উপকূল প্রতিরক্ষার দুর্বল জায়গা সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করছে। মন্ত্রণালয়ের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যাকাউন্টে দেওয়া একটি পোস্টে এই দাবি করা হয়, আর ২০২৬ সালের ১২ জুন আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা ও সংবাদপত্রগুলো তা প্রকাশ করে। মন্ত্রণালয় কোনো দেশ বা সংস্থার নাম বলেনি, প্রাণীগুলো কোথায় বা কবে পাওয়া গেছে তা-ও জানায়নি।
মন্ত্রণালয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, সেন্সরগুলো সমুদ্রের তাপমাত্রা, লবণাক্ততা ও স্রোতের মতো তথ্য সংগ্রহ করে স্যাটেলাইটের মাধ্যমে বিদেশে পাঠাচ্ছিল। মন্ত্রণালয় জেলেদের সমুদ্রে অস্বাভাবিক বয়া বা যন্ত্র পেলে জানাতে বলে এবং বিদেশ থেকে আসা সরঞ্জাম যথাযথভাবে নিরাপত্তা পরীক্ষা করার আহ্বান জানায়। কোনো প্রতিবেদনেই এই দাবির পক্ষে স্বাধীন কোনো প্রমাণ ছিল না; অভিযোগটি মন্ত্রণালয়ের নিজের।
মন্ত্রণালয় কী অভিযোগ করেছে
বার্তা সংস্থা এএফপির অনুবাদে পোস্টটির শিরোনাম ছিল ‘গভীর নীলের নিচে অন্তঃস্রোত ফুঁসে উঠছে’। ‘গুপ্তচর কচ্ছপ, গুপ্তচর মাছ’ শিরোনামের একটি অংশে বলা হয়, ‘চীনের কিছু জলসীমায় সেন্সর লাগানো তুলনামূলক বড় সামুদ্রিক প্রাণী পাওয়া গেছে।’ মন্ত্রণালয়ের দাবি, প্রাণীগুলো ‘একটি নির্দিষ্ট এলাকায় সাঁতরে বেড়াচ্ছিল, পানির তাপমাত্রা, লবণাক্ততা ও সমুদ্রস্রোতের মতো সামুদ্রিক পরিবেশের সংবেদনশীল তথ্য সংগ্রহ করে স্যাটেলাইটের মাধ্যমে বিদেশে পাঠাচ্ছিল।’
মন্ত্রণালয়ের যুক্তি, এসব তথ্য দিয়ে বিদেশি শক্তিগুলো ‘পানির নিচের মানচিত্র’ তৈরি করতে পারে, যা ‘চীনের উপকূল প্রতিরক্ষার দুর্বল জায়গা চিহ্নিত করবে এবং চীনের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য গুরুতর হুমকি তৈরি করবে।’ উইচ্যাটে পোস্টটি পড়ে মার্কিন সংবাদপত্র ডেজারেট নিউজ জানায়, এর শুরুতে বলা হয়েছিল ‘একটি অদৃশ্য গোপন গুপ্তচর যুদ্ধ নীরবে চলছে’, এবং সতর্ক করা হয়েছিল যে সংগৃহীত গোয়েন্দা তথ্য ‘চীনের জাতীয় নিরাপত্তা, সামরিক নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তাকে গুরুতরভাবে বিপন্ন করবে।’ একই প্রতিবেদন অনুযায়ী, মন্ত্রণালয় আরও বলে, চীনের সমুদ্রতলের তেল ও গ্যাসের মজুত সম্পর্কে তথ্য সামুদ্রিক সম্পদের গোপনীয়তা ফাঁস করতে পারে এবং ‘সম্পদ উন্নয়নের অধিকার নিয়ে বিরোধও উসকে দিতে পারে।’
মন্ত্রণালয় সাধারণভাবে ‘বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থা’ এবং ‘চীনের একটি নির্দিষ্ট সমুদ্র এলাকা’র কথা বলেছে। ইউরোনিউজ উল্লেখ করে, বেইজিং কোনো নির্দিষ্ট দেশ বা সংস্থাকে চিহ্নিত করেনি; ডেজারেট নিউজ জানায়, প্রাণীগুলো কোথায় পাওয়া গেছে বা কোথা থেকে এসেছে, মন্ত্রণালয় সে বিষয়ে কোনো বিবরণ দেয়নি।

বয়া, গ্লাইডার ও পণ্যবাহী জাহাজের যন্ত্র
প্রাণীগুলো মন্ত্রণালয়ের সতর্কবার্তার একটি অংশ মাত্র। বিদেশি গোষ্ঠীগুলো সামুদ্রিক গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহে আরও যেসব সরঞ্জাম ব্যবহার করছে বলে মন্ত্রণালয় দাবি করে, সেগুলো হলো:
- মনিটরিং বয়া: মন্ত্রণালয় আবহাওয়া যন্ত্র, নোঙরের শিকল ও শব্দ শোনার সেন্সরযুক্ত একটি গোলাকার সমুদ্র বয়ার বর্ণনা দেয়, যা তাদের দাবি অনুযায়ী আশপাশের শব্দতরঙ্গ এবং চীনা সাবমেরিনের শব্দ-বৈশিষ্ট্য তাৎক্ষণিকভাবে সংগ্রহ করতে পারে।
- ওয়েভ গ্লাইডার: সৌরশক্তিতে চলা শনাক্তকরণ, যোগাযোগ ও অবস্থান নির্ণয় ব্যবস্থাসহ ‘নতুন ধরনের ওয়েভ গ্লাইডার’, যা মন্ত্রণালয়ের দাবি অনুযায়ী সামুদ্রিক পরিবেশ ও জাহাজ চলাচলের তথ্য সংগ্রহ করে বিদেশে পাঠাতে পারে।
- বাণিজ্যিক জাহাজের যন্ত্র: বিদেশি কোম্পানিগুলোর ‘নেভিগেশন সেবা’ হিসেবে পণ্যবাহী জাহাজে বসানো যন্ত্র, যা মন্ত্রণালয়ের মতে বন্দরের কার্যক্রম তাৎক্ষণিকভাবে ধরে চীনা জলসীমায় একটি ‘সামুদ্রিক নজরদারি নেটওয়ার্ক’ গড়ে তুলতে পারে।
মন্ত্রণালয় জেলেদের সন্দেহজনক বয়া বা যন্ত্র পেলে জানাতে বলে এবং বিদেশ থেকে আসা সরঞ্জামের যথাযথ নিরাপত্তা পরীক্ষার আহ্বান জানায়। ডেজারেট নিউজ ও দ্য ডেইলি বিস্ট দুটিই জানায়, গুপ্তচর যন্ত্র খুঁজে দিলে জেলেরা সর্বোচ্চ ৫ লাখ ইউয়ান পর্যন্ত পুরস্কার পেতে পারেন; দ্য ডেইলি বিস্ট উল্লেখ করে, এটি নতুন প্রণোদনা নাকি আগের নিয়মের অংশ, তা তাদের প্রতিবেদনে স্পষ্ট নয়।

রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা মন্ত্রণালয় ও তার প্রকাশ্য সতর্কবার্তা
রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা মন্ত্রণালয় চীনের প্রধান বেসামরিক গোয়েন্দা সংস্থা। ১৯৮৩ সালের ২০ জুন এটি অনুমোদিত হয়; গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ, পাল্টা গোয়েন্দা কার্যক্রম ও গোপন পুলিশের কাজ একসঙ্গে করে সংস্থাটি। প্রায়ই একে যুক্তরাষ্ট্রের সিআইএ ও এফবিআইয়ের সম্মিলিত রূপের সঙ্গে তুলনা করা হয়। এর সদর দপ্তর বেইজিংয়ের হাইদিয়ান জেলায়।
ইতিহাসের বেশির ভাগ সময় মন্ত্রণালয়টি জনসমক্ষে খুব কম আসত। সিএনএন ২০২৩ সালের আগস্টে জানায়, ২০২৩ সালের জুলাইয়ের শেষে চীনের সবচেয়ে জনপ্রিয় মেসেজিং অ্যাপ উইচ্যাটে অ্যাকাউন্ট খোলার আগে এর কোনো প্রকাশ্য ওয়েবসাইটও ছিল না। প্রথম দিকের পোস্টে সংস্থাটি গুপ্তচরবৃত্তির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ‘সমাজের সব সদস্যকে’ যুক্ত হওয়ার আহ্বান জানায় এবং যাঁরা তথ্য দেবেন, তাঁদের স্বীকৃতি, পুরস্কার ও সুরক্ষা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়। সিএনএন উল্লেখ করে, আগের প্রচারণাগুলোতে গুরুত্বপূর্ণ তথ্যের জন্য সর্বোচ্চ ১ লাখ ইউয়ান এবং কম গুরুত্বের তথ্যের জন্য সনদ দেওয়ার কথা বলা হয়েছিল।
সময়ের সঙ্গে অ্যাকাউন্টটি অনেক বেশি সক্রিয় হয়ে ওঠে। রেডিও ফ্রি এশিয়া ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে জানায়, শুধু ২০২৫ সালের জানুয়ারিতেই ‘জাতীয় নিরাপত্তা সবার দায়িত্ব’ স্লোগানে সংস্থাটি পাঁচটি সতর্কবার্তা প্রকাশ করেছে। এর একটিতে বলা হয়, বিদেশি এজেন্টরা গোপন তথ্যে প্রবেশাধিকার আছে এমন মানুষের কাছে পৌঁছাতে ‘ধনী ও সুন্দরী, কিংবা লম্বা, ধনী ও সুদর্শন’ মানুষের ছদ্মবেশ নিতে পারে। এএফপি একে ‘হানিট্র্যাপ’ বা প্রেমের ফাঁদ নিয়ে সতর্কবার্তা হিসেবে বর্ণনা করে।
এই সতর্কবার্তার পেছনে আছে আরও কঠোর একটি আইন। চীনের সংশোধিত গুপ্তচরবৃত্তি প্রতিরোধ আইন ২০২৩ সালের ১ জুলাই কার্যকর হয়। সিএনএনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এতে গুপ্তচরবৃত্তির সংজ্ঞা রাষ্ট্রীয় গোপন তথ্যের বাইরে বাড়িয়ে ‘জাতীয় নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট যেকোনো নথি, উপাত্ত, উপকরণ বা বস্তু’ পর্যন্ত বিস্তৃত করা হয় এবং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোয় সাইবার হামলাকেও গুপ্তচরবৃত্তি হিসেবে গণ্য করা হয়। ২০২৬ সালের জুনে মন্ত্রণালয় যে ধরনের সমুদ্র-উপাত্তের কথা বলেছে, তা এই সুরক্ষিত এলাকার মধ্যেই পড়ে বলে মন্ত্রণালয়ের দাবি।
বিজ্ঞানীরা কীভাবে কচ্ছপ ও অন্য সামুদ্রিক প্রাণীতে সেন্সর বসান
সামুদ্রিক কচ্ছপ, সিল ও মাছের শরীরে ইলেকট্রনিক ট্যাগ লাগানো সমুদ্রবিজ্ঞানের একটি প্রতিষ্ঠিত পদ্ধতি। প্রাণীগুলো কোথায় যায় এবং কেমন পরিবেশে থাকে, তা জানতে সারা বিশ্বে এটি ব্যবহার হয়। মন্ত্রণালয়ের পোস্টে বলা হয়নি, তাদের বর্ণিত ট্যাগগুলো বিজ্ঞানীদের নাকি গোয়েন্দা সংস্থার; কোনো প্রতিবেদনে চীনা জলসীমার কোনো ট্যাগ লাগানো প্রাণীর ছবিও ছিল না।
সামুদ্রিক কচ্ছপের স্যাটেলাইট ট্যাগ হলো খোলসের ওপরে বসানো ছোট একটি রেডিও ট্রান্সমিটার। গ্রায়েম হেইসের নেতৃত্বে ইকোলজি অ্যান্ড ইভোলিউশন সাময়িকীতে প্রকাশিত ২০২১ সালের একটি গবেষণায় ২০১২ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে সবুজ ও হকসবিল কচ্ছপে বসানো ৭৮টি ফাস্টলক-জিপিএস আরগোস ট্যাগ বিশ্লেষণ করা হয়। ট্যাগগুলো খোলসে ইপক্সি দিয়ে বসানো হয় এবং শেওলা-জাতীয় আবরণ ঠেকাতে বিশেষ রং দেওয়া হয়। গড়ে ২৬৭ দিন কাজ করে এগুলো আরগোস স্যাটেলাইট ব্যবস্থায় গড়ে ৪৮ হাজার ৩৯৭টি বার্তা পাঠায়; যেসব ক্ষেত্রে তথ্য আসা বন্ধ হয়েছিল, তার ৮৭ শতাংশের কারণ ছিল ব্যাটারি ফুরিয়ে যাওয়া। লেখকেরা উল্লেখ করেন, আগের গবেষণাগুলোতে ট্যাগ আটকাতে ফাইবারগ্লাস কাপড় ব্যবহার হতো, এখন অনেক শক্ত ইপক্সি ব্যবহার করা হয়।
চীনা বিজ্ঞানীরাও একই পদ্ধতি ব্যবহার করেন। ফ্রন্টিয়ার্স ইন মেরিন সায়েন্স সাময়িকীতে ২০২৩ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত একটি গবেষণায় ছয়টি অপ্রাপ্তবয়স্ক সবুজ কচ্ছপের বিবরণ আছে, যেগুলোকে গুয়াংডং প্রদেশের হুইদং সামুদ্রিক কচ্ছপ জাতীয় প্রকৃতি সংরক্ষণাগার ২০২১ সালের ৩ মে থেকে ১১ আগস্টের মধ্যে স্যাটেলাইট ট্রান্সমিটারসহ হুইদং টার্টল বে-তে ছেড়ে দেয়। কচ্ছপগুলোকে ১০ থেকে ৯১ দিন পর্যন্ত অনুসরণ করা হয়, সেগুলো ১২৪ থেকে ৪ হাজার ৬২৭ কিলোমিটার পথ পাড়ি দেয়, আর গবেষকেরা এই তথ্য দিয়ে দক্ষিণ চীন সাগরে তাদের খাদ্য সংগ্রহের এলাকা খুঁজে বের করেন।
ট্যাগ প্রাণীকে সমুদ্র পর্যবেক্ষকেও পরিণত করে। আন্তর্জাতিক জোট মেরিন ম্যামালস এক্সপ্লোরিং দ্য ওশানস পোল টু পোল (এমইওপি) দক্ষিণের এলিফ্যান্ট সিলের মতো গভীরে ডুব দেওয়া প্রাণীর শরীরে পরিবাহিতা, তাপমাত্রা ও গভীরতা মাপার ট্যাগ বসায় এবং ২০০৪ সাল থেকে বিশ্ব মহাসাগরে তাপমাত্রা ও লবণাক্ততার উল্লম্ব চিত্র সংগ্রহ করছে। এর তথ্যভান্ডার বিজ্ঞানীদের জন্য উন্মুক্ত। চীনের মন্ত্রণালয় তাদের ‘গুপ্তচর কচ্ছপ’ ও ‘গুপ্তচর মাছ’ যে তাপমাত্রা ও লবণাক্ততার তথ্য সংগ্রহ করছিল বলে দাবি করেছে, এগুলো ঠিক সেই ধরনের পরিমাপ।
এ ধরনের সমুদ্র-উপাত্তের বেশির ভাগ অবশ্য প্রাণী নয়, যন্ত্র দিয়ে সংগ্রহ করা হয়। ২০০০-এর দশকের শুরুতে চালু হওয়া আন্তর্জাতিক আর্গো কর্মসূচির হাজার হাজার ভাসমান যন্ত্র বিশ্বজুড়ে কাজ করে। প্রতিটি যন্ত্র প্রায় ১ হাজার মিটার গভীরে থাকে, প্রতি ১০ দিনে ২ হাজার মিটার পর্যন্ত নামে এবং তাপমাত্রা ও লবণাক্ততা মাপতে মাপতে ওপরে উঠে স্যাটেলাইটে তথ্য পাঠায়। এই তথ্য সবার জন্য বিনামূল্যে ও কোনো বিধিনিষেধ ছাড়াই উন্মুক্ত। তাপমাত্রা ও লবণাক্ততা বিজ্ঞানীদের মতো সামরিক বাহিনীর কাছেও গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এ দুটি পানির নিচে শব্দ চলাচলের ধরন ঠিক করে, ফলে সোনার দিয়ে সাবমেরিন খোঁজার সক্ষমতাও এর ওপর নির্ভর করে।

চীনের জলসীমার সামুদ্রিক কচ্ছপ
চীনের জলসীমায় পাঁচ প্রজাতির সামুদ্রিক কচ্ছপ বাস করে: লগারহেড, হকসবিল, অলিভ রিডলি, সবুজ কচ্ছপ ও লেদারব্যাক। ২০২৩ সালের ফ্রন্টিয়ার্স গবেষণাটি জানায়, ২০১৪ সালের আইইউসিএন লাল তালিকায় এদের সবাই সংকটাপন্ন, বিপন্ন বা মহাবিপন্ন শ্রেণিভুক্ত ছিল, আর ২০২১ সালে চীন সব সামুদ্রিক কচ্ছপকে প্রথম স্তরের সংরক্ষিত বন্যপ্রাণীর মর্যাদা দেয়।
ওই গবেষণায় অনুসরণ করা সবুজ কচ্ছপগুলো বেইবু উপসাগর, ঝানজিয়াং বন্দর, দায়া উপসাগর, রেড বে, নানআও দ্বীপ ও ঝেলিন উপসাগরে খাবার খুঁজেছে; এসব এলাকায় ম্যানগ্রোভ, সমুদ্রঘাসের বিস্তৃত এলাকা ও প্রবালপ্রাচীর আছে। লেখকেরা লিখেছেন, যেখানে সমুদ্রঘাস থাকে, সেখানে সাধারণত সবুজ কচ্ছপও থাকে। তাঁরা কচ্ছপগুলো ছেড়েছিলেন চীনের গ্রীষ্মকালীন মাছ ধরার নিষেধাজ্ঞার সময়, যা ২০২১ সালে ১ মে থেকে ১৬ আগস্ট পর্যন্ত চলে, কারণ এ সময় মাছ ধরার সরঞ্জামের ঝুঁকি কমে। গবেষণায় বাণিজ্যিক মাছ ধরায় অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে জালে ধরা পড়াকে (বাইক্যাচ) সামুদ্রিক কচ্ছপের আঘাত ও মৃত্যুর একটি বড় কারণ বলা হয়েছে।
মাছ ধরার সঙ্গে এই যোগসূত্রই জেলেদের প্রতি মন্ত্রণালয়ের আহ্বানকে গুরুত্বপূর্ণ করে তোলে। চীন বিশ্বের সবচেয়ে বড় মাছ উৎপাদনকারী দেশ: জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) ‘দ্য স্টেট অব ওয়ার্ল্ড ফিশারিজ অ্যান্ড অ্যাকুয়াকালচার ২০২৪’ প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২২ সালে বিশ্বের আহরিত মাছের ১৪ দশমিক ৩ শতাংশ চীনের, আর সামগ্রিকভাবে জলজ প্রাণী উৎপাদনেও ৩৬ শতাংশ নিয়ে দেশটি শীর্ষে ছিল। এফএওর হিসাবে ২০২২ সালে বিশ্বে মৎস্য ও জলজ চাষের মোট উৎপাদন ছিল রেকর্ড ২২ কোটি ৩২ লাখ টন, যার ৭৫ শতাংশ এশিয়ায়। ফলে সমুদ্রে কোনো বয়া, গ্লাইডার বা ট্যাগ লাগানো প্রাণীর মুখোমুখি হওয়ার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি চীনের মাছ ধরার বহরেরই।
চীনের জলসীমায় আগেও মিলেছে সমুদ্র-ড্রোন
চীনের জেলে ও নৌবাহিনী এর আগেও সমুদ্র-যন্ত্র জমা দিয়েছে বা জব্দ করেছে। ২০১৬ সালের ১৫ ডিসেম্বর ফিলিপাইনের সুবিক বে থেকে প্রায় ৫০ নটিক্যাল মাইল উত্তর-পশ্চিমে চীনা নৌবাহিনীর একটি জাহাজ মার্কিন সমুদ্রজরিপ জাহাজ ইউএসএনএস বাউডিচের একটি চালকবিহীন পানির নিচের গ্লাইডার জব্দ করে, যখন জাহাজটি সেটি তুলতে যাচ্ছিল। পেন্টাগন জানায়, গ্লাইডারটিতে বাজারে পাওয়া যায় এমন অশ্রেণিভুক্ত প্রযুক্তি ছিল এবং এটি পানির তাপমাত্রা, লবণাক্ততা ও স্বচ্ছতার তথ্য সংগ্রহ করত। চীনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানায়, ২০১৬ সালের ২০ ডিসেম্বর সেটি ফেরত দেওয়া হয়; বেইজিং বলে, যন্ত্রটি অন্য জাহাজের জন্য ঝুঁকি তৈরি করছিল এবং দক্ষিণ চীন সাগরে মার্কিন নজরদারির বিরোধিতা করে, অন্যদিকে ওয়াশিংটন জব্দ করাকে বেআইনি বলে।
২০২১ সালের এপ্রিলে চীনের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম সিসিটিভি জানায়, সাংহাইয়ের উত্তরে ইয়ানচেংয়ের কাছে পীত সাগরে একটি মাছ ধরার নৌকার জালে অ্যান্টেনা ও সোলার প্যানেলযুক্ত প্রায় তিন মিটার লম্বা, সার্ফবোর্ডের মতো কালো একটি যন্ত্র উঠে আসে; কর্মকর্তারা সেটিকে ‘কোনো বিদেশি দেশের গোপনে বসানো নজরদারি যন্ত্র’ বলে সন্দেহ করেন। দ্য মেরিটাইম এক্সিকিউটিভ উল্লেখ করে, যন্ত্রটি লিকুইড রোবোটিকসের তৈরি ওয়েভ গ্লাইডারের মতোই দেখতে, এবং ২০২০ সালের ডিসেম্বরে ইন্দোনেশিয়ার মাকাসার প্রণালির কাছে চীনের তৈরি চিহ্নহীন একটি ‘সি উইং’ গ্লাইডার পাওয়া গিয়েছিল।
২০২২ সালের জানুয়ারিতে চীনের জিয়াংসু প্রদেশের কর্তৃপক্ষ পানির নিচের যন্ত্র জমা দেওয়া জেলেদের পুরস্কৃত করে। শিনহুয়া ডেইলি জানায়, ২০২০ সাল থেকে জিয়াংসুর জেলেরা পানির নিচে অনুসন্ধান চালাতে সক্ষম বিদেশে তৈরি ১০টি যন্ত্র খুঁজে পেয়েছেন। ওয়েভ গ্লাইডার যুক্তরাষ্ট্রের নকশা: ২০০৭ সালে প্রতিষ্ঠিত এবং ২০১৬ সালের ডিসেম্বরে বোয়িংয়ের কিনে নেওয়া লিকুইড রোবোটিকস দুই অংশের এই যান তৈরি করে, যার ভাসমান অংশকে নিচে ঝুলে থাকা ডানার কাঠামো ঢেউয়ের দোলায় সামনে টেনে নেয়, আর সোলার প্যানেল এর ইলেকট্রনিক যন্ত্র চালায়। সমুদ্র গবেষণা, সামুদ্রিক প্রাণী পর্যবেক্ষণ ও প্রতিরক্ষার কাজে এটি ব্যবহার হয়।
অন্য দেশে সামরিক ও গোয়েন্দা কাজে প্রাণী
নৌবাহিনীগুলো কয়েক দশক ধরে সামুদ্রিক প্রাণীকে প্রশিক্ষণ দিয়ে আসছে। মার্কিন নৌবাহিনীর মেরিন ম্যামাল প্রোগ্রাম ১৯৬০ সালে শুরু হয়, এর ঘাঁটি সান ডিয়েগোতে; এটি মূলত বটলনোজ ডলফিন ও ক্যালিফোর্নিয়া সি লায়ন ব্যবহার করে মাইন শনাক্ত, সমুদ্রতল থেকে সরঞ্জাম উদ্ধার ও বন্দরের নিরাপত্তার কাজে। ২০০৩ সালে ইরাক যুদ্ধের সময় এর ডলফিনগুলো পারস্য উপসাগরে মাইন সরাতে সহায়তা করে।
২০১৯ সালের এপ্রিলে নরওয়ের উত্তরাঞ্চলের হ্যামারফেস্টের কাছে ক্যামেরা বসানোর কাঠামোসহ আঁটসাঁট বন্ধনী পরা একটি বেলুগা তিমি দেখা যায়। বন্ধনীর বাকলে লেখা ছিল ‘ইকুইপমেন্ট সেন্ট পিটার্সবার্গ’, যা থেকে ধারণা ছড়ায় যে তিমিটিকে রুশ নৌবাহিনী প্রশিক্ষণ দিয়েছিল। তিমিটি ‘হভালদিমির’ নামে পরিচিতি পায়। এটি কোনো নৌঘাঁটি থেকে পালিয়েছে কি না, রাশিয়া তা নিশ্চিতও করেনি, অস্বীকারও করেনি। ২০২৪ সালের ৩১ আগস্ট স্টাভাঙ্গারের কাছে রিসাভিকা উপসাগরে তিমিটিকে মৃত পাওয়া যায়; ময়নাতদন্তে দেখা যায়, মুখে কাঠি আটকে যাওয়া থেকে ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণে এর মৃত্যু হয়।
২০২৩ সালের জুনে যুক্তরাজ্যের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এক গোয়েন্দা হালনাগাদে জানায়, শত্রুপক্ষের ডুবুরি ঠেকাতে রাশিয়া সম্ভবত সেভাস্তোপলে তার কৃষ্ণসাগর নৌবহরের ঘাঁটির প্রতিরক্ষায় প্রশিক্ষিত বটলনোজ ডলফিন যুক্ত করেছে, এবং আর্কটিক জলসীমায় বেলুগা তিমি ও সিলও ব্যবহার করে।

গুপ্তচরবৃত্তি নিয়ে বৃহত্তর বিরোধ
মন্ত্রণালয়ের সতর্কবার্তা আসে এমন এক সময়ে, যখন চীন ও পশ্চিমা সরকারগুলোর মধ্যে গুপ্তচরবৃত্তি নিয়ে অভিযোগ ও পাল্টা অভিযোগ চলছিল। ২০২৬ সালের ৩ জুন ‘ফাইভ আইজ’ গোয়েন্দা জোটের সদস্য অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, নিউজিল্যান্ড, যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্র সতর্ক করে যে চীনা গোয়েন্দা সংস্থাগুলো লিংকডইন, ইনডিড ও আপওয়ার্কের মতো সাইটে নিয়োগকারী সেজে আবেদনকারীদের কাছ থেকে প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ে প্রতিবেদন চাইছে।
ইউরোপে ২০২৬ সালের ৭ মে লন্ডনের একটি আদালত হংকংয়ের পক্ষে ব্রিটেনে থাকা গণতন্ত্রপন্থী হংকং অ্যাক্টিভিস্টদের ওপর নজরদারি করে বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থাকে সহায়তার দায়ে দুজনকে দোষী সাব্যস্ত করে; ধারণা করা হয়, চীনের হয়ে গুপ্তচরবৃত্তির দায়ে ব্রিটেনে এটিই প্রথম দণ্ড। লন্ডনের চীনা দূতাবাস ব্রিটেনের বিরুদ্ধে অভিযোগ ‘বানানোর’ অভিযোগ তোলে, আর ইউরোনিউজ জানায়, বেইজিং বিচারপ্রক্রিয়াকে ‘রাজনৈতিক প্রহসন’ বলেছে। ২০২৬ সালের ২০ মে জার্মানির ফেডারেল প্রসিকিউটররা মিউনিখে এক দম্পতিকে গ্রেপ্তার করান; তাঁদের বিরুদ্ধে সন্দেহ, তাঁরা একটি চীনা গোয়েন্দা সংস্থার হয়ে কাজ করছিলেন এবং মহাকাশ প্রকৌশল, কম্পিউটার বিজ্ঞান ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিজ্ঞানীদের সঙ্গে যোগাযোগ গড়ছিলেন। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে ফ্রান্সের প্রসিকিউটররা জিরোঁদ অঞ্চলে একটি স্যাটেলাইট ডিশ স্থাপনার ঘটনায় চারজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনেন, যাঁদের দুজন চীনা নাগরিক; প্রসিকিউটরদের ভাষ্য, ওই স্থাপনা সামরিক যোগাযোগ আড়ি পাততে পারত। একই মাসে গ্রিসের কর্তৃপক্ষ বিমানবাহিনীর এক কর্নেলকে গ্রেপ্তার করে, যাঁর বিরুদ্ধে ন্যাটো-সংশ্লিষ্ট গোপন তথ্য চীনকে দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। প্রতিটি ক্ষেত্রে অভিযোগ প্রসিকিউটরদের, এবং মামলাগুলো তখন আদালতে বা তদন্তাধীন ছিল।
কুনমিংয়ে এক মার্কিন গবেষক আটক
একই সপ্তাহে চীন নিশ্চিত করে যে মিয়ানমারবিষয়ক একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের প্রধান, মার্কিন নাগরিক মিন জিনকে আটক করা হয়েছে। ২০২৬ সালের ৩ জুন মিয়ানমার সীমান্তের কাছে দক্ষিণ-পশ্চিম চীনের ইউনান প্রদেশের কুনমিং বিমানবন্দরে পৌঁছানোর পর তাঁকে আটক করা হয়। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র লিন জিয়ান ১২ জুন বলেন, ‘গুপ্তচরবৃত্তিতে জড়িত থাকা এবং চীনের জাতীয় নিরাপত্তা বিপন্ন করার সন্দেহে মিন জিনকে ফৌজদারি আটকে রাখা হয়েছে।’ আঞ্চলিক কূটনীতিকদের উদ্ধৃত করে মার্কিন সংবাদমাধ্যম এনপিআর জানায়, তিনি একটি চীনা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আমন্ত্রণে কুনমিং গিয়েছিলেন। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর জানায়, চীনে এক মার্কিন নাগরিক আটকের খবর তারা জানে এবং ‘কোনো মার্কিন নাগরিক আটক হলে আমরা যথাযথ কনস্যুলার সহায়তা দিতে কাজ করি।’
মিন জিন মিয়ানমারের ১৯৮৮ সালের গণতন্ত্র আন্দোলনের একজন ছাত্রকর্মী ছিলেন। ২০০৮ সালের একটি সাক্ষাৎকারভিত্তিক পরিচিতিতে বলা হয়, তিনি ১৯৮৯ সালে আত্মগোপনে যান এবং ১৯৯৬ সালের ছাত্র বিক্ষোভের পর থাইল্যান্ড-মিয়ানমার সীমান্তে পালিয়ে যান; সেখানে নির্বাসিতদের পত্রিকা দ্য ইরাবতীর উপসম্পাদক হিসেবে কাজ করেন, পরে ২০০১ সালের আগস্টে ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বার্কলেতে ভিজিটিং স্কলার হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রে যান। তিনি ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজি অ্যান্ড পলিসি-মিয়ানমার (আইএসপি-মিয়ানমার) প্রতিষ্ঠা করেন, যা ২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর কাজ দেশের বাইরে সরিয়ে নেয় এবং মিয়ানমারের সংঘাত ও চীনের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে গবেষণা করে। এনপিআরের তথ্যমতে, তিনি বার্কলেতে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে পিএইচডি গবেষক ছিলেন।
ছবি: ইউএস জিওলজিক্যাল সার্ভে / উইকিমিডিয়া কমন্স (পাবলিক ডোমেইন)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪ (ইউরোনিউজের বরাতে), ইউরোনিউজ, এএফপি (দ্য ডিফেন্স পোস্ট ও তাইপে টাইমস), ডেজারেট নিউজ, দ্য ডেইলি বিস্ট, সিএনএন, রেডিও ফ্রি এশিয়া, ইকোলজি অ্যান্ড ইভোলিউশন (হেইস ও সহকর্মী, ২০২১), ফ্রন্টিয়ার্স ইন মেরিন সায়েন্স (২০২৩), এমইওপি, আর্গো, ক্রিশ্চিয়ান সায়েন্স মনিটর, আল জাজিরা, দ্য মেরিটাইম এক্সিকিউটিভ, এশিয়া ফিন্যান্সিয়াল, এফএও, গ্লোবাল সিফুড অ্যালায়েন্স, নোভায়া গাজেতা ইউরোপ, ডব্লিউটিওপি (এপি), রয়টার্স, এনপিআর, আজ নিউজ (এএফপি), আকতুয়ালনে ডট সিজেড, উইকিপিডিয়া (রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা মন্ত্রণালয়, ওয়েভ গ্লাইডার, মার্কিন নৌবাহিনীর মেরিন ম্যামাল প্রোগ্রাম, হভালদিমির)




মন্তব্য
(০)