সরাসরিবাজারদর
আটা (প্যাকেটজাত)৫৮—আদা - আমদানিকৃত১৬৭—আদা - দেশী১৫৪—আমন চাল - মাঝারি৫৬—আমন চাল - মোটা৪৮—আমন চাল - সরু৭২—আয়োডিনযুক্ত লবণ (প্যাকেটজাত)৩২—কাঁচা মরিচ২১৮—খামারের মুরগী১৬২—খাসী৯০০—চিনি (দেশী)১৩২—ছোলা - গোটা৮৫—ডিম ফার্ম - লাল৪৭—পেঁয়াজ - দেশী৬০—বোরো চাল - মাঝারি৫৫—বোরো চাল - মোটা৪৭—বোরো চাল - সরু৬৬—মাংসঃ– গরু৭২৯—মুগ ডাল১২২—রসুন - আমদানিকৃত১৯২—রসুন - দেশী১৭৩—সয়াবিন তেল১৬৩—
হালনাগাদ ১৬ অক্টোবর ২০২৬
ঢাকা২৬°পরিষ্কার আকাশআর্দ্রতা ৭৪%বাতাস ৩ কিমি/ঘ

চায়ের সঙ্গে চাপটি পিঠা: চালের গুঁড়ার শীতের ঝাল পিঠার রেসিপি

এক কাপ চালের গুঁড়া, পেঁয়াজ, মরিচ, ধনেপাতা, আদা ও হলুদ দিয়ে তাওয়ায় তৈরি পাতলা ঝাল চাপটি পিঠা শীতের সন্ধ্যায় গরম চায়ের সঙ্গে খাওয়া যায়; ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে প্রকাশিত রেসিপি, সঙ্গে পিঠা, খেজুরের গুড় ও চায়ের পটভূমি।

চায়ের সঙ্গে চাপটি পিঠা: চালের গুঁড়ার শীতের ঝাল পিঠার রেসিপি
রান্নাবান্না

২০২৬ সালের ২৪ জানুয়ারি, শীতের পিঠার মৌসুমের মাঝামাঝি সময়ে, অনলাইন সংবাদমাধ্যম জাগো নিউজ ২৪-এর লাইফস্টাইল ডেস্ক চাপটি পিঠার একটি সংক্ষিপ্ত রেসিপি প্রকাশ করে। চাপটি হলো চালের গুঁড়ার পাতলা, ঝাল স্বাদের একটি পিঠা, যা গরম গরম চায়ের সঙ্গে খাওয়ার জন্য। ডেস্কটি লিখেছিল, শীত মানেই শুধু খেজুর বা আখের গুড়ের মিষ্টি পিঠা নয়, এ মৌসুমের ঝাল পিঠাও কম জনপ্রিয় নয়। ঠান্ডার সন্ধ্যায় গরম চাপটি আর সঙ্গে কোনো ঝাল ভর্তা থাকলে স্বাদের এক রঙিন মিশেল তৈরি হয়। শুকনো চালের গুঁড়া আর বেশির ভাগ বাঙালি রান্নাঘরে থাকা কয়েকটি উপকরণ দিয়েই পিঠাটি বানানো যায়, তাই পরিবারের সবার জন্য অল্প সময়ে তৈরি করা সম্ভব।

এই প্রতিবেদনে সেই রেসিপি যেমন প্রকাশিত হয়েছিল তেমনই তুলে ধরা হলো, সঙ্গে যোগ করা হলো সে সময়ের পাঠকের কাজে লাগার মতো পটভূমি: পিঠা কী এবং শীত কেন এর মৌসুম, গোলায় যে চাল ও তাজা মসলা যায় সেগুলোর কথা, মৌসুমের অন্য পিঠাকে মিষ্টি করে যে খেজুরের গুড়, কাঁচা খেজুরের রসের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা স্বাস্থ্য সতর্কতা, আর শীতের নাশতার সঙ্গী যে চা বাংলাদেশ উৎপাদন করে ও পান করে।

জাগো নিউজ ২৪-এ প্রকাশিত রেসিপি


রেসিপির মূল উপকরণ এক কাপ চালের গুঁড়া। বাকি সবই স্বাদের জন্য, মাপা হয়েছে ঘরের সাধারণ চামচে:

  • চালের গুঁড়া: ১ কাপ
  • পেঁয়াজ কুচি: ৪ টেবিল চামচ
  • মরিচ কুচি: ১ চা চামচ
  • ধনেপাতা কুচি: ২ টেবিল চামচ
  • আদা কুচি: ১ চা চামচ
  • হলুদ গুঁড়া: আধা চা চামচ
  • লবণ: স্বাদমতো
  • পানি: প্রয়োজনমতো

তৈরির ধাপ পাঁচটি:

  • সব উপকরণ একসঙ্গে মিশিয়ে গোলা তৈরি করুন। খেয়াল রাখবেন, গোলা যেন খুব বেশি ঘন বা খুব বেশি পাতলা না হয়।
  • চুলায় তাওয়া (লোহার চ্যাপ্টা পাত্র) বসিয়ে অল্প তেল মাখিয়ে নিন।
  • একটি গোল চামচ দিয়ে গোলা তাওয়ায় পাতলা করে ছড়িয়ে দিন এবং ঢাকনা দিয়ে ঢেকে রাখুন।
  • কিছুক্ষণ পর ঢাকনা তুলে চাপটি উল্টে দিন এবং আরও কিছুক্ষণ চুলায় রাখুন।
  • গরম গরম চাপটি পিঠা চায়ের সঙ্গে পরিবেশন করুন; পাশে ঝাল ভর্তা থাকলে আরও ভালো জমে।

রাঁধুনিকে আসলে একটি বিষয়েই বিচার করতে হয়, তা হলো গোলার ঘনত্ব, কারণ রেসিপিতে পানির পরিমাণ শুধু "প্রয়োজনমতো" বলা আছে। গোলা বেশি ঘন হলে তা তাওয়ায় পাতলা হয়ে ছড়াবে না, আর বেশি পাতলা হলে তাওয়ায় জোড়া লাগবে না। ২০২২ সালের নভেম্বরে দ্য ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসে প্রকাশিত চালের গুঁড়ার আরেকটি পাতলা পিঠার রেসিপিতেও ঘনত্বের একই কথা বলা হয়েছে: পানি অল্প অল্প করে মেশাতে হবে, ফেটিয়ে সব দলা ভেঙে দিতে হবে, আর গোলা ঘন হলে পিঠাও মোটা হবে।

চাপটি পিঠা কী


পিঠা বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী ঘরে তৈরি খাবার। এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশ প্রকাশিত জাতীয় জ্ঞানকোষ বাংলাপিডিয়া পিঠাকে নিত্যদিনের খাবার নয়, বিশেষ উপলক্ষের খাবার হিসেবে বর্ণনা করেছে: বর বা কনেকে বরণ করতে, অতিথি আপ্যায়নে এবং পরিবার, আত্মীয় ও বন্ধুদের জমায়েতে পিঠা তৈরি হয়। পিঠার সবচেয়ে প্রচলিত উপকরণ চালের গুঁড়া বা ময়দা, সঙ্গে গুড় বা চিনি, নারকেল ও তেল। কোনো কোনো পিঠায় মাংস বা সবজি দেওয়া হয়, আবার কোনোটিতে কাঁঠাল, তাল, নারকেল বা কলার মতো ফল।

বেশির ভাগ পিঠা মিষ্টি, তবে বাংলাপিডিয়া জানায়, ঝাল ও টক পিঠাও আছে। দেশজুড়ে তৈরি পিঠার যে তালিকা জ্ঞানকোষটি দিয়েছে, তাতে চিতই, পাটিসাপটা, পাকান ও ভাপা থেকে শুরু করে কুলশি, নকশি, পাতা ও ঝুরি পিঠার পাশাপাশি জ্ঞানকোষটির ইংরেজি সংস্করণে 'চাপডি' (chapdi) পিঠার নামও আছে। প্রতিটি অঞ্চলের নিজস্ব পিঠা আছে, আর একই পিঠা ভিন্ন ভিন্ন এলাকায় ভিন্ন নামে পরিচিত। বাংলাপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯১ সালে বাংলাদেশ শিশু একাডেমির আয়োজিত এক প্রদর্শনীতে ১০৬ ধরনের পিঠা প্রদর্শিত হয়েছিল।

চাপটি সেই পাতলা পিঠাগুলোর একটি, যা গরম তাওয়ায় চালের গুঁড়ার গোলা ছড়িয়ে তৈরি করা হয়। এর কাছাকাছি একটি পিঠা হলো ছিটা পিঠা বা ছিট রুটি। দ্য ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস ২০২২ সালের নভেম্বরে একে শীতের জনপ্রিয় খাবার হিসেবে বর্ণনা করে, যা সকালের বা বিকেলের নাশতা হিসেবে, আবার পুরো বেলার খাবার হিসেবেও খাওয়া হয়। চালের গুঁড়া, লবণ, আদাবাটা আর চাইলে হলুদ দিয়ে তৈরি এর গোলা চামচে না ছড়িয়ে হাত দিয়ে তাওয়ায় গোল করে ছিটিয়ে দেওয়া হয়, যতক্ষণ না ফোঁটাগুলো জোড়া লাগে। এটি হাঁস, মুরগি বা গরুর মাংসের তরকারি কিংবা ভর্তার সঙ্গে খাওয়া হয়; পত্রিকাটির ভাষায়, শীতে হাঁসের মাংসই এর সবচেয়ে প্রিয় সঙ্গী। চাপটিতে একই সরল উপকরণের গোলার মধ্যেই পেঁয়াজ, মরিচ ও তাজা মসলা মিশিয়ে দেওয়া হয়, তাই এটি আলাদা তরকারি ছাড়াই শুধু চায়ের সঙ্গে খাওয়া যায়।

ধান কাটার সঙ্গে শুরু হয় পিঠার মৌসুম


বাংলাপিডিয়া জানায়, পিঠার মৌসুম শুরু হয় হেমন্তকালে, যখন কৃষক ধান কাটেন। সারা বছরই পিঠা তৈরি হয়, তবে শীতের পিঠাকেই সবচেয়ে সুস্বাদু ধরা হয়, কারণ তখন খেজুরের রস ও গুড়, সেই সঙ্গে আখের গুড়ও পাওয়া যায়। গ্রামে প্রতিবেশী পরিবারগুলো কখনো কখনো একসঙ্গে পিঠা বানিয়ে ভাগ করে খায়; শিশু ও বয়োজ্যেষ্ঠদের আবদারে মা, দাদি ও নানিরা পিঠা বানান। নতুন জামাইকে বরণ করা হয় নকশা করা রঙিন পিঠা দিয়ে, যাকে বলা হয় জামাই ভুলানো পিঠা।

জ্ঞানকোষটি শহরের একটি পরিবর্তনের কথাও লিখেছে: সেখানে বাণিজ্যিক কেক ও পেস্ট্রি ধীরে ধীরে ঘরে তৈরি পিঠার জায়গা নিচ্ছে। তবে পিঠার কদর কমেনি; অভিজাত বিপণিতে যেমন, তেমনি রাস্তার ধারের ছোট দোকানেও পিঠা বিক্রি হয়, আর বাংলাদেশ শিশু একাডেমি ও বিভিন্ন মহিলা সমিতির আয়োজিত পিঠামেলা এখনো জনপ্রিয়।

গুড় দিয়ে মিষ্টি করা ভাপে সেদ্ধ চালের পিঠা, ভাপা পিঠা; ছবিটি ২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশে তোলা। ছবি: Mohammed Tawsif Salam / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0)
গুড় দিয়ে মিষ্টি করা ভাপে সেদ্ধ চালের পিঠা, ভাপা পিঠা; ছবিটি ২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশে তোলা। ছবি: Mohammed Tawsif Salam / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0)

গোলার চালের গুঁড়া আসে দেশের প্রধান ফসল থেকে। বাংলাপিডিয়ার ধান বিষয়ক নিবন্ধে চালকে বাঙালি সংস্কৃতিতে "সমৃদ্ধির প্রতীক" বলা হয়েছে, এবং জানানো হয়েছে যে বাংলাদেশে সারা বছর আউশ, আমন ও বোরো, এই তিন মৌসুমে ধান চাষ হয়। পিঠার মৌসুমের শুরুতে যে ধান কাটা হয়, তা আমন। রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা বাসস ২০২৫ সালের ১৮ নভেম্বর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) একটি প্রতিবেদনের বরাতে জানায়, ২০২৫-২৬ মৌসুমে ৫৯ লাখ হেক্টরের বেশি জমি থেকে প্রায় ১ কোটি ৮১ লাখ টন আমন চাল উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। সে সময় পর্যন্ত আমনের প্রায় ২০ শতাংশ ধান কাটা হয়েছিল, আর কর্মকর্তারা আশা করছিলেন ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহের মধ্যে কাটা শেষ হবে।

ডিএইর ওই প্রতিবেদনে আমনের লক্ষ্যমাত্রা জাত অনুযায়ী ভাগ করে দেখানো হয়: উচ্চফলনশীল জাত থেকে ১ কোটি ৫১ লাখ টন, হাইব্রিড থেকে ১৭ লাখ ৫০ হাজার টন, স্থানীয় জাত থেকে ৯ লাখ ৭৫ হাজার টন এবং বোনা ও গভীর পানির আমন থেকে ৩ লাখ ৩০ হাজার টন। একই প্রতিবেদনে ৩২ লাখ ২২ হাজার টন লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে ওই মৌসুমে আউশ উৎপাদন ২৯ লাখ ৯৩ হাজার টন বলা হয়, আর আসন্ন বোরো মৌসুমের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয় ২ কোটি ২৭ লাখ টন।

গোলায় যে মসলা ও তাজা পাতা যায়


চাপটির স্বাদ আসে চিনি থেকে নয়, তাজা মসলা থেকে। গোলায় যে ধনেপাতা কুচি দেওয়া হয়, সেই ধনে (Coriandrum sativum) বাংলাদেশে শীতের ফসল। বাংলাপিডিয়া জানায়, শীতকালে এর ব্যাপক চাষ হয়; অক্টোবর ও নভেম্বরে বীজ বোনা হয় এবং ৯০ থেকে ১০৫ দিনে ফসল পরিপক্ব হয়, আর কচি গাছ চাটনি, সস, তরকারি ও স্যুপে ব্যবহার করা হয়।

আদা (Zingiber officinale) জিঞ্জিবেরেসি গোত্রের একটি কন্দজাতীয় ফসল, যার আদি নিবাস দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া। বাংলাপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে আদা মূলত বৃষ্টিনির্ভর ফসল হিসেবে উঁচু জমি ও পাহাড়ের ঢালে চাষ হয়; প্রধান জেলাগুলোর মধ্যে আছে দিনাজপুর, রংপুর, টাঙ্গাইল, চট্টগ্রাম ও রাঙামাটি, আর অনেক কৃষক বসতবাড়ির জমিতেও আদা চাষ করেন। জ্ঞানকোষটি বলছে, বাংলাদেশে আদা মসলার চেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয় স্বাদবর্ধক উপকরণ হিসেবে। দ্য ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসের ছিটা পিঠার রেসিপিতেও আদাবাটা একই কাজে লাগে, গোলায় হালকা স্বাদ আনতে, আর রঙের জন্য হলুদ সেখানে ঐচ্ছিক।

খেজুরের গুড়: শীতের মিষ্টি দিক


রেসিপির প্রথম লাইনেই যে মিষ্টি পিঠার কথা বলা হয়েছে, সেগুলোর ভরসা গুড়, অর্থাৎ মিষ্টি রস জ্বাল দিয়ে ঘন করে তৈরি অপরিশোধিত চিনি। বাংলাপিডিয়ার গুড় বিষয়ক নিবন্ধ জানায়, দেশের বেশির ভাগ গুড় তৈরি হয় আখের রস ও খেজুরের রস থেকে। খেজুরের রস সংগ্রহ করা হয় নভেম্বরের মাঝামাঝি থেকে মার্চের মাঝামাঝি পর্যন্ত: গাছি গাছের মাথার নরম অংশ চেঁছে দেন, আর সারা রাত সরু বাঁশের নল বেয়ে রস ফোঁটায় ফোঁটায় হাঁড়িতে জমে। ছয় দিন রস সংগ্রহের পর তিন দিন গাছকে বিশ্রাম দেওয়া হয়। প্রথম রাতের রস, যাকে জিরান বলে, সবচেয়ে ভালো; তারপর দোকাট ও ঝরা। একটি সুস্থ গাছ দিনে প্রায় ছয় লিটার রস দেয়, সবচেয়ে বেশি দেয় ডিসেম্বর ও জানুয়ারিতে। গাঁজন ঠেকাতে রস দ্রুত জ্বাল দিতে হয়, আর সেই গুড় দিয়ে তৈরি হয় পায়েস, শীতের পিঠা ও মিষ্টি।

খেজুরের গুড়ের জন্য যশোরের খ্যাতি পুরোনো। দৈনিক ইত্তেফাক ২০২৪ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি জানায়, সেদিন শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীন পেটেন্ট, ডিজাইন ও ট্রেডমার্কস অধিদপ্তর রাজশাহীর মিষ্টি পান ও জামালপুরের নকশিকাঁথার সঙ্গে যশোরের খেজুরের গুড়কে ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্য হিসেবে জার্নালে প্রকাশ করে; এতে বাংলাদেশে অনুমোদিত জিআই পণ্যের সংখ্যা দাঁড়ায় ৩১টি।

দেশে মোট কত গুড় হয়, তার সঠিক হিসাব পাওয়া কঠিন। কৃষি তথ্য সার্ভিসের বরাতে প্রথম আলো ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে জানায়, বাংলাদেশে বছরে প্রায় সাড়ে ৩ থেকে ৪ লাখ টন গুড় উৎপাদিত হয়, যার মধ্যে খেজুর ও তালের রসের গুড় ৩০ থেকে ৪০ হাজার টন, এবং এর বেশির ভাগই খেজুরের গুড়; ব্যবসায়ীদের ধারণা, প্রকৃত বাজার এর চেয়ে বড়। পত্রিকাটি যশোরকে বড় বাজার হিসেবে উল্লেখ করে এবং উৎপাদক জেলা হিসেবে ফরিদপুর, মেহেরপুর, সাতক্ষীরা, নাটোর, সিরাজগঞ্জ, রংপুর, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, নীলফামারী ও গাইবান্ধার নাম দেয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, শহরেও খেজুরের গুড়ের চাহিদা বাড়ছে; ঘরের রান্নায়, রাস্তার ধারের পিঠার দোকানে, এমনকি কিছু চায়ের দোকানে আখের গুড়ের বদলে খেজুরের গুড় ব্যবহার করা হচ্ছে। সে মৌসুমে চুয়াডাঙ্গা জেলা ডিএই কার্যালয় জানায়, জেলায় ২ লাখ ৭১ হাজার ৯৬০টি খেজুরগাছ থেকে রস সংগ্রহ করা হচ্ছে, উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ৩ হাজার ২৬৪ টন।

চাপটির রেসিপি যে মৌসুমে প্রকাশিত হয়, সেই মৌসুমে দৈনিক দেশ রূপান্তর ২০২৫ সালের ২৭ নভেম্বর যশোর জেলা ডিএই কার্যালয়ের বরাতে জানায়, আগের মৌসুমে জেলায় ৩ হাজার ৫০০ টন খেজুরের গুড় উৎপাদিত হয়েছিল, যার ৫০০ টন বিদেশে রপ্তানি হয়; গাছিদের স্বাস্থ্যসম্মতভাবে গুড় তৈরি ও সংরক্ষণের প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছিল। এর এক দিন আগে একই পত্রিকা জানায়, ২০২৫-২৬ মৌসুমে, যা আশ্বিন থেকে চৈত্র পর্যন্ত চলে, যশোরে প্রায় ১০০ কোটি টাকার রস, গুড় ও পাটালি বিক্রির লক্ষ্য ধরা হয়েছে, আর ডিএই খোলা হাঁড়ির বদলে ঢেকে নিরাপদে রস সংগ্রহে উৎসাহ দিচ্ছে।

যশোরে বড় পাত্রে খেজুরের রস জ্বাল দিয়ে গুড় তৈরি করছেন একজন গাছি। ছবি: NIslamPhoto / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
যশোরে বড় পাত্রে খেজুরের রস জ্বাল দিয়ে গুড় তৈরি করছেন একজন গাছি। ছবি: NIslamPhoto / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)

নিপাহ ভাইরাস: কাঁচা খেজুরের রস কেন নিরাপদ নয়


শীতের এই রস কাঁচা অবস্থায় পান করলে গুরুতর ঝুঁকি আছে। রাতে রসের হাঁড়িতে মুখ দেওয়ার সময় বাদুড়ের লালা বা প্রস্রাবে রস দূষিত হতে পারে, আর সেই রসের মাধ্যমে ছড়াতে পারে নিপাহ ভাইরাস। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) ২০২৫ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর তাদের ডিজিজ আউটব্রেক নিউজে জানায়, ২০০১ সালে প্রথম শনাক্ত প্রাদুর্ভাবের পর থেকে বাংলাদেশে নিপাহর ৩৪৭টি সংক্রমণ নথিভুক্ত হয়েছে, মৃত্যুহার ৭১.৭ শতাংশ। এর প্রায় অর্ধেক, ১৬২ জন, ছিলেন প্রাথমিক সংক্রমিত, যাঁদের কাঁচা খেজুরের রস বা তাড়ি (গাঁজানো রস) পানের ইতিহাস নিশ্চিত হয়েছে; আর প্রাদুর্ভাব ঘটে রস সংগ্রহের মৌসুমে, ডিসেম্বর থেকে এপ্রিলের মধ্যে।

ডব্লিউএইচও জানায়, ২০২৫ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ২৯ আগস্টের মধ্যে বাংলাদেশে নিপাহর চারটি সংক্রমণ নিশ্চিত হয়, চারজনই মারা যান; রোগীরা ছিলেন পাবনা, ভোলা, ফরিদপুর ও নওগাঁ জেলার। প্রথম তিনজন কাঁচা খেজুরের রস পান করেছিলেন; চতুর্থজন, নওগাঁর একটি শিশু, যে স্বাভাবিক মৌসুমের বাইরে আগস্টে অসুস্থ হয়, রস পান করেনি, এবং তার সংক্রমণের উৎস তখনো অনুসন্ধানাধীন ছিল। ২০২৪ সালে পরীক্ষাগারে নিশ্চিত পাঁচটি সংক্রমণ পাওয়া যায়, পাঁচজনই মারা যান।

দ্য ডেইলি স্টার জানায়, ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে ঢাকায় রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানে (আইইডিসিআর) নিপাহ বিষয়ক এক মতবিনিময় সভায় প্রতিষ্ঠানটির অধ্যাপক তাহমিনা শিরীন বলেন, কাঁচা খেজুরের রসই সংক্রমণের প্রধান পথ, এবং দূষিত রস পানের আট দিনের মধ্যে জ্বরসহ উপসর্গ দেখা দিতে পারে। ততদিনে দেশের ৩৪টি জেলায় ভাইরাসটি শনাক্ত হয়েছিল, এর কোনো টিকা ছিল না, আর ১২টি টারশিয়ারি হাসপাতালে নিপাহ রোগীদের জন্য পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র করা হয়েছিল। তিনি ফল ও সবজি ভালো করে ধুয়ে খাওয়ার এবং বাদুড়, অন্য প্রাণী বা পাখিতে খাওয়া ফল না খাওয়ার পরামর্শ দেন।

ডব্লিউএইচওর পরামর্শ স্পষ্ট: সদ্য সংগ্রহ করা খেজুরের রস ফুটিয়ে নিতে হবে, আর ফল ভালো করে ধুয়ে ও খোসা ছাড়িয়ে খেতে হবে। বাদুড়ে খাওয়ার চিহ্ন আছে এমন ফল ফেলে দিতে হবে। চাপটির রেসিপিতে কোনো রস নেই; সতর্কতাটি কাঁচা রস সরাসরি পান করা বা পিঠায় কাঁচা রস ঢেলে খাওয়ার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। কাঁচা রস পানের পর কারও জ্বর, মাথাব্যথা বা আচ্ছন্ন ভাব দেখা দিলে দেরি না করে চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে।

চা: এই জুটির অন্য অর্ধেক


রেসিপির শেষ লাইনে পিঠার সঙ্গী গরম চা, আর বাংলাপিডিয়া বলছে, বাংলাদেশে সবচেয়ে জনপ্রিয় ও সর্বজনগ্রাহ্য পানীয় হলো কালো চা। বাংলাপিডিয়ার চা শিল্প বিষয়ক নিবন্ধ অনুযায়ী, বর্তমান বাংলাদেশ ভূখণ্ডে চা চাষ শুরু হয় ১৮৪০ সালে চট্টগ্রামে, চীন থেকে আনা কয়েকটি চারা দিয়ে, আর প্রথম চা বাগান প্রতিষ্ঠিত হয় ১৮৫৪ সালে সিলেটের মালনীছড়ায়।

বাংলাদেশ চা বোর্ডের তথ্য উদ্ধৃত করে দ্য ডেইলি স্টার ২০২৫ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি জানায়, ২০২৪ সালে দেশে চা উৎপাদন হয় ৯ কোটি ৩০ লাখ কেজি, যা ২০২৩ সালের রেকর্ড ১০ কোটি ২০ লাখ কেজির চেয়ে কম। বোর্ডের গবেষণা ও উন্নয়ন বিষয়ক সদস্য পীযূষ দত্ত এর জন্য অনিয়মিত বৃষ্টিকে দায়ী করেন, যা চাষের পরিবেশকে প্রতিকূল করে তুলেছিল; বাগানগুলো মানের দিকেও বেশি মনোযোগ দিয়েছিল, আর ২০২৪ সালে ন্যাশনাল টি কোম্পানির রাষ্ট্রায়ত্ত ১২টি বাগান ১০ সপ্তাহের বেশি বন্ধ ছিল। তখন দেশের চা শিল্পের বয়স ১৮৪ বছর, বাগান ১৬৯টি, আয়তন ২ লাখ ৮০ হাজার একরের বেশি। ৯০টি বাগান নিয়ে মৌলভীবাজার জাতীয় উৎপাদনের ৫৫ শতাংশ দিত, ২২ শতাংশ নিয়ে দ্বিতীয় ছিল হবিগঞ্জ; উৎপাদনের ভরা মৌসুম জুন থেকে নভেম্বর।

দেশের সবচেয়ে বেশি চা বাগানের জেলা মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলের একটি বাগানে চা গাছের সারি। ছবি: Ifsanjry / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
দেশের সবচেয়ে বেশি চা বাগানের জেলা মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলের একটি বাগানে চা গাছের সারি। ছবি: Ifsanjry / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)

উৎপাদিত চায়ের বেশির ভাগই দেশে পান হয়। একই প্রতিবেদনে শিল্পসংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে দেশে বছরে চায়ের চাহিদা ৮ কোটি ৫০ লাখ থেকে ৯ কোটি কেজি বলা হয়। ২০২৪ সালে রপ্তানি হয় ২৪ লাখ ৫০ হাজার কেজি চা, যা ২০১৭ সালের পর এক বছরে সর্বোচ্চ, আয় হয় ৩৮২.৫২ মিলিয়ন টাকা; ২০২৫ সালের জন্য চা বোর্ড দেড় কোটি কেজির বেশি রপ্তানির লক্ষ্য ঠিক করেছিল। বাংলাদেশ চা সংসদের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে চা উৎপাদনে বাংলাদেশ নবম, বিশ্ব উৎপাদনের প্রায় ২ শতাংশ আসে এ দেশ থেকে।

ঢাকায় রাস্তার ধারের একটি দোকানে চা পরিবেশন। ছবি: Kritzolina / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
ঢাকায় রাস্তার ধারের একটি দোকানে চা পরিবেশন। ছবি: Kritzolina / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)

ছবি: Ferdous / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)

সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, বাংলাপিডিয়া (এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশ), দ্য ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস, বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস) ও দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (ডিএই), প্রথম আলো, দৈনিক ইত্তেফাক, দেশ রূপান্তর, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও), রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর) ও দ্য ডেইলি স্টার, বাংলাদেশ চা বোর্ড ও দ্য ডেইলি স্টার

অনলাইন ডেস্কদা এগ্রো নিউজ

রান্নাবান্না

সম্পর্কিত খবর

রান্নাবান্না

ঘরেই ক্যাফে-স্টাইলের ক্রিমি প্রন পাস্তা: উপকরণ আর রান্নার ধাপ

২৫০ গ্রাম পাস্তা, এক কাপ চিংড়ি, ১০০ গ্রাম চিজ, মেয়োনিজ আর দুধে তৈরি ঘন ক্রিমি সসে প্রন পাস্তা; সেদ্ধ থেকে পরিবেশন পর্যন্ত সময় লাগে অল্পই।

সারাবাংলা১৪ অক্টোবর ২০২৬১ মিনিটের পড়া
স্বাস্থ্য

প্রোটিন শেক কি খাবারের বিকল্প? কার কতটা প্রোটিন লাগে

প্রাপ্তবয়স্কের দৈনিক প্রতি কেজি ওজনে ০.৮ গ্রাম প্রোটিন লাগে, ৭০ কেজির মানুষের ৫৬ গ্রাম, যা সুষম খাবার থেকেই মেলে; প্রোটিন শেক দরকার কেবল যাঁদের চাহিদা খাবারে পূরণ হয় না।

প্রথম আলো১৪ অক্টোবর ২০২৬২ মিনিটের পড়া
রান্নাবান্না

মৌসুমি তালের পিউরিতে নরম কেক, ঘরে বানানোর সহজ রেসিপি

আধা কাপ তালের পিউরি, এক কাপ ময়দা, দুটি ডিম আর এক-তৃতীয়াংশ কাপ গুঁড়া দুধ ও তেলে ওভেনে ১৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে ৩৫-৪০ মিনিটে তৈরি হয় তুলতুলে তালের কেক।

এগ্রিকেয়ার২৪১৪ অক্টোবর ২০২৬১ মিনিটের পড়া

মন্তব্য

(০)