সরাসরিবাজারদর
আটা (প্যাকেটজাত)৫৮—আদা - আমদানিকৃত১৬৭—আদা - দেশী১৫৪—আমন চাল - মাঝারি৫৬—আমন চাল - মোটা৪৮—আমন চাল - সরু৭২—আয়োডিনযুক্ত লবণ (প্যাকেটজাত)৩২—কাঁচা মরিচ২১৮—খামারের মুরগী১৬২—খাসী৯০০—চিনি (দেশী)১৩২—ছোলা - গোটা৮৫—ডিম ফার্ম - লাল৪৭—পেঁয়াজ - দেশী৬০—বোরো চাল - মাঝারি৫৫—বোরো চাল - মোটা৪৭—বোরো চাল - সরু৬৬—মাংসঃ– গরু৭২৯—মুগ ডাল১২২—রসুন - আমদানিকৃত১৯২—রসুন - দেশী১৭৩—সয়াবিন তেল১৬৩—
হালনাগাদ ১৬ অক্টোবর ২০২৬
ঢাকা২৬°পরিষ্কার আকাশআর্দ্রতা ৭৪%বাতাস ৩ কিমি/ঘ

ফাতেমা ধান: বাগেরহাটের কৃষকের খেতে পাওয়া বড় শীষের ধান যেভাবে ছড়াল

বাগেরহাটের ফকিরহাটে হাইব্রিড ধানের খেতে পাওয়া তিনটি বড় শীষ থেকে জন্ম ‘ফাতেমা ধান’-এর; পরিবারের দাবি, শীষে হাজারের বেশি দানা। ২০২১ সালের এপ্রিলে ফরিদপুরের আলফাডাঙ্গায়ও এর চাষ হয়, তবে তখনো এটি অনুমোদিত জাত নয়।

ফাতেমা ধান: বাগেরহাটের কৃষকের খেতে পাওয়া বড় শীষের ধান যেভাবে ছড়াল
ফসল

২০১৮ সালের মে মাসে বাগেরহাটের ফকিরহাট উপজেলার বেতাগা ইউনিয়নের চাকুলিয়া গ্রামে ফাতেমা বেগমের বাড়িতে ছোটখাটো একটি ভিড় জমেছিল। দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ এসেছিলেন তাঁর পরিবারের চাষ করা একটি ধানের বীজ কিনতে। কেউ কেউ ঘুরে দেখছিলেন সেই জমি, যেখানে ধানটি ফলেছে। কিন্তু কয়েক দিন আগেই বীজ শেষ হয়ে যাওয়ায় বেশির ভাগ ক্রেতাকে খালি হাতে ফিরতে হয়েছিল।

এলাকার মানুষ এর মধ্যেই ধানটির একটি নাম দিয়েছিলেন: ‘ফাতেমা ধান’, যিনি ধানটি খুঁজে পেয়েছিলেন তাঁর নামে। প্রতিবেদন অনুযায়ী এর একেকটি শীষে এক হাজারের বেশি দানা থাকত, যা প্রচলিত জাতগুলোর চেয়ে অনেক বেশি। তিন বছর পর, ২০২১ সালের এপ্রিলে, ফরিদপুরের আলফাডাঙ্গা উপজেলার এক তরুণ কৃষক ইউটিউবে ভিডিও দেখে কেনা বীজে প্রথমবার এই ধান চাষ করে ফসল কাটার অপেক্ষায় ছিলেন।

এই প্রতিবেদন ২০২১ সালের এপ্রিল পর্যন্ত জানা তথ্যের ভিত্তিতে সেই গল্প বলছে: ধানটি কীভাবে পাওয়া গেল, পরিবার ও স্থানীয় কৃষি কর্মকর্তারা এ নিয়ে কী বলেছিলেন, এটি কীভাবে ফরিদপুরে পৌঁছাল এবং এর সম্পর্কে কী প্রমাণিত হয়েছিল আর কী হয়নি। হাইব্রিড ধানের খেত থেকে বেছে নেওয়া বীজ নিয়ে কেন প্রশ্ন ওঠে এবং বাংলাদেশে একটি ধান কীভাবে অনুমোদিত জাত হয়, সেটিও এখানে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।

হাইব্রিড ধানের খেতে তিনটি ব্যতিক্রমী শীষ


ফাতেমা বেগম জানান, ঘটনার শুরু ২০১৬ সালের বোরো মৌসুমে। বাড়ির পাশের জমিতে হাইব্রিড আফতাব-৫ জাতের ধান কাটার সময় তিনি তিনটি শীষ দেখতে পান, যেগুলো বাকিগুলোর চেয়ে আলাদা। শীষগুলো অনেক বড় ছিল এবং তাতে দানাও ছিল অনেক বেশি।

২০১৮ সালের মে মাসে বার্তা সংস্থা ইউএনবিকে তিনি বলেন, শীষগুলো অন্যগুলোর চেয়ে অনেক লম্বা ছিল এবং দানার সংখ্যা ছিল প্রায় দ্বিগুণ। তিনি শীষ তিনটি বাড়িতে এনে শুকিয়ে প্রক্রিয়া করে দানাগুলো বীজ হিসেবে রেখে দেন।

পরের মৌসুমে তিনি ছেলে লেবুয়াত শেখকে আলাদা করে ওই বীজ চাষ করতে বলেন। পরিবারের হিসাবে প্রথম সেই ছোট চাষে প্রায় আড়াই কেজি ধান পাওয়া যায়। তিনি এর পুরোটাই আবার বীজ হিসেবে রাখেন। পরের মৌসুমে পরিবারটি চারা তৈরি করে প্রায় ৪২ শতক জমিতে রোপণ করে।

লেবুয়াত শেখ জানান, ওই জমিটি ছিল বাড়ির পাশে দেড় বিঘার একটি মাছের ঘেরের ভেতরে। তিনি বলেন, অন্য ধানের মতোই সাধারণ পরিচর্যা করা হয়েছিল। তাঁর ভাষ্যে, জমিতে দুই দফায় ২০ কেজি ইউরিয়া ও ৩০ কেজি পটাশ সার দেওয়া হয় এবং পোকামাকড় দমনে দুই দফা কীটনাশক ছিটানো হয়। এগুলো পরিবারটির ব্যবহার করা পরিমাণ, কোনো সুপারিশ নয়; সার ও কীটনাশকের মাত্রা জানতে হবে স্থানীয় কৃষি অফিস থেকে।

লেবুয়াত শেখের হিসাবে ওই জমিতে প্রায় দুই হাজার ৬০০ কেজি ধান ফলেছিল। তিনি জানান, নিজেদের জন্য কিছু বীজ রেখে বাকি ধান কেজিপ্রতি ৪০০ টাকা দরে বিক্রি করে সাত লাখ ২০ হাজার টাকা আয় হয়েছে। তাঁর কথায়, সিলেট, রাজশাহী, সাতক্ষীরা, খুলনাসহ বিভিন্ন জেলা থেকে ক্রেতারা এসেছিলেন।

ফাতেমা বেগম আরও বলেন, ধানটি দেখতে ব্রি ধান২৮-এর মতো। ব্রি ধান২৮ বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের (ব্রি) বোরো জাত, যা তখন দেশে সবচেয়ে বেশি চাষ হতো।

২০২১ সালের ১৮ এপ্রিল বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে শুরুর গল্পটি কিছুটা ভিন্নভাবে এসেছে। সেখানে বলা হয়, মায়ের কথামতো নিজেদের জমিতে ধান চাষ করতে গিয়ে লেবুয়াত শেখ শীষ তিনটি খুঁজে পান, সেই শীষের ধান বুনে দুই কেজি বীজ পান, আর সেই বীজ এক বিঘা জমিতে চাষ করে ৩৫ মণ ধান ঘরে তোলেন; অথচ সেখানে অন্য ধানের ফলন বিঘাপ্রতি ১৮ মণের বেশি পাওয়া সম্ভব ছিল না। প্রতিবেদনটি আরও জানায়, লেবুয়াত মায়ের নামে ধানটির নাম রাখেন। এসব সংখ্যা পরিবার ও প্রতিবেদকদের বিবরণ; কোনো গবেষণা প্রতিষ্ঠানের মাঠ পরীক্ষায় এগুলো মাপা হয়নি।

বাংলাদেশের একটি ধানখেতে পাকা ধানের শীষ, প্রসঙ্গ হিসেবে। ছবি: Sajib5467 / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC0)
বাংলাদেশের একটি ধানখেতে পাকা ধানের শীষ, প্রসঙ্গ হিসেবে। ছবি: Sajib5467 / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC0)

ফাতেমা ধানের গাছ দেখতে কেমন


২০১৮ ও ২০২১ সালের প্রতিবেদনে এমন একটি গাছের বর্ণনা আছে, যা মাঠে আলাদা করে চোখে পড়ত। নিচের বর্ণনাগুলো ওই প্রতিবেদন ও স্থানীয় কৃষি কর্মীদের দেওয়া; এগুলো কোনো আনুষ্ঠানিক জাত পরীক্ষার ফল নয়।

  • প্রতি গোছায় একটি চারা রোপণ করা হয়, যা বেড়ে ৮ থেকে ১২টি কুশি হয়।
  • প্রতিটি গাছ ১১৫ থেকে ১৩০ সেন্টিমিটার লম্বা।
  • প্রতিটি শীষ বা ছড়া ৩৬ থেকে ৪০ সেন্টিমিটার লম্বা।
  • প্রতি ছড়ায় এক হাজার থেকে ১২০০টি দানা থাকে, যার ওজন ৩০ থেকে ৩৫ গ্রাম।
  • পাতা প্রায় ৮৮ সেন্টিমিটার লম্বা; শীষের ঠিক নিচের পাতা বা ফ্ল্যাগলিফ প্রায় ৪৪ সেন্টিমিটার।
  • পাতা প্রায় দেড় ইঞ্চি চওড়া।
  • কাণ্ড ও পাতা দেখতে অনেকটা আখগাছের মতো এবং বেশ শক্ত; প্রতিবেদন অনুযায়ী এ কারণে ঝড়-বৃষ্টিতে গাছ সহজে হেলে পড়ে না।

প্রতিবেদনগুলোতে ফলন বলা হয়েছিল একরপ্রতি প্রায় ১৩০ মণ। ২০১৮ সালের প্রতিবেদনে এবং আবার ২০২১ সালের এপ্রিলে এই সংখ্যা এসেছে, তবে তা স্থানীয় বিবরণ থেকে, মাপা কোনো পরীক্ষা থেকে নয়।

২০১৮ সালের মে মাসে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) কর্মকর্তা মোতাহার হোসেন ইউএনবিকে আরও বিস্তারিত তথ্য দেন। তিনি বলেন, এই জাতটি বোরো মৌসুমে চাষ হয়। নভেম্বরে বীজতলা তৈরি করা হয়েছিল এবং ডিসেম্বরের শেষে চারা রোপণ করা হয়। রোপণের ১৫০ থেকে ১৫৫ দিনের মধ্যে এই ধান কাটা যায়।

তাঁর হিসাবে গাছের গড় দৈর্ঘ্য ১১৫ থেকে ১৩০ সেন্টিমিটার, কুশির সংখ্যা আটটি এবং প্রতিটি শীষের গড় দৈর্ঘ্য ৩৬ সেন্টিমিটার। তিনি ফলন হেক্টরপ্রতি ১১ মেট্রিক টনের বেশি বলে জানান।

তুলনার জন্য, ২০১৭ সালের অক্টোবরে দ্য ডেইলি স্টারের প্রতিবেদন অনুযায়ী ব্রি ধান২৮-এর ফলন হেক্টরপ্রতি প্রায় ৬ টন। পত্রিকাটি একে তখনকার দেশের সবচেয়ে উৎপাদনশীল ধানের জাত বলেছিল।

বাংলাদেশের একটি গ্রামে রোপণের জন্য বীজতলা থেকে ধানের চারা তুলছেন কৃষকেরা, প্রসঙ্গ হিসেবে। ছবি: MdRamjanAliWiki / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY 4.0)
বাংলাদেশের একটি গ্রামে রোপণের জন্য বীজতলা থেকে ধানের চারা তুলছেন কৃষকেরা, প্রসঙ্গ হিসেবে। ছবি: MdRamjanAliWiki / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY 4.0)

কৃষি কর্মকর্তারা যা বলেছিলেন


ফকিরহাটের মাসকাটা ব্লকের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা মো. সোলায়মান আলী জানান, ধান রোপণের পর তাঁরা তা তত্ত্বাবধান করেছেন এবং চাষি তাঁদের পরামর্শ অনুযায়ী চাষ করেছেন। তিনি ইউএনবিকে বলেন, ধানটির উচ্চ ফলনের সম্ভাবনা দেখে তাঁরা উৎসাহিত হয়েছেন।

স্থানীয় কৃষি কর্মকর্তারা নমুনাও পাঠিয়েছিলেন। ২০১৮ সালের মে মাসে ইউএনবি জানায়, পরীক্ষা ও গবেষণার জন্য ধানের নমুনা বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি) ও মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউটে (এসআরডিআই) পাঠানো হয়েছে। মোতাহার হোসেন বলেন, আরও গবেষণার জন্য নমুনাগুলো এই দুই প্রতিষ্ঠানে পাঠানো হয়েছে।

বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী বিএডিসি রাষ্ট্রীয় করপোরেশন, যার অন্যান্য কাজের মধ্যে কৃষকদের কাছে বীজ বিতরণ ও বীজ বর্ধন খামার পরিচালনা রয়েছে; এসআরডিআই দেশের মাটি নিয়ে কাজ করা সরকারি প্রতিষ্ঠান। ২০২১ সালের এপ্রিল পর্যন্ত প্রকাশিত প্রতিবেদনে এসব পরীক্ষার ফল জানানো হয়নি। বাংলাদেশের জন্য ধানের জাত উদ্ভাবন ও পরীক্ষা করে যে প্রতিষ্ঠান, সেই ব্রির কোনো বক্তব্যও ওই প্রতিবেদনগুলোতে ছিল না।

২০২১ সালের এপ্রিলে আলফাডাঙ্গা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রিপন প্রসাদ সাহা আরও জোরালো মত দেন। তিনি বলেন, বাগেরহাটের কৃষকের উদ্ভাবিত ফাতেমা জাতের ধানের নানা বৈশিষ্ট্য রয়েছে এবং এর ফলন শুধু দেশ নয়, গোটা বিশ্বকে তাক লাগাতে পারে। তাঁর মতে, এটি দেশের খাদ্য ঘাটতি পূরণে সহায়তা করতে পারে এবং বিদেশেও রপ্তানি করা যেতে পারে।

তিনি জানান, উপজেলায় এ ধানের আবাদ বাড়াতে কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে। এলাকায় পরীক্ষামূলক চাষকে তিনি সাধুবাদ জানান এবং বলেন, ইউটিউবে কৃষি নিয়ে দেশি ভিডিও প্রচারে প্রত্যন্ত অঞ্চলের কৃষকেরা উপকৃত হবেন। এগুলো ২০২১ সালের এপ্রিলে প্রকাশিত তাঁর নিজের মত; কোনো জাত পরীক্ষার ফলাফল নয়।

ইউটিউব দেখে আলফাডাঙ্গায় পরীক্ষামূলক চাষ


২০২০-২১ সালের বোরো মৌসুমের মধ্যে ধানটি ফরিদপুরে পৌঁছে যায়। আলফাডাঙ্গা উপজেলার হেলেঞ্চা পশ্চিমপাড়া গ্রামের তরুণ কৃষক রিয়াজুল ইসলাম তাঁর ৭৫ শতাংশ জমিতে এই ধান চাষ করেন।

রিয়াজুল ইসলাম জানান, ইউটিউবের কয়েকটি ভিডিও দেখে তিনি ফাতেমা ধান সম্পর্কে জানতে পারেন। প্রায় ছয় মাস অপেক্ষার পর বাগেরহাটে লেবুয়াত শেখের মায়ের কাছ থেকে তিনি বীজ সংগ্রহ করেন। ২০২১ সালের ১৮ এপ্রিল বাংলা ট্রিবিউন জানায়, তাঁর ধান পাকতে শুরু করেছে এবং আট-দশ দিন পর কাটা শুরু হবে।

বাংলা ট্রিবিউনকে তিনি বলেন, “৭৫ শতাংশ জমিতে সবমিলিয়ে ১০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। অবশ্য বাড়িতে না থাকায় ধানের সঠিক যত্ন নিতে পারিনি। তারপরও আশা করছি ৯৫-১০০ মণ ধান হবে।” এই ধান উপজেলার সর্বত্র ছড়িয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া দরকার বলেও তিনি মনে করেন।

রিয়াজুল ইসলাম আরও জানান, এই ধান চাষ করে তিনি লাভবান ও স্বাবলম্বী হওয়ার আশা করছেন এবং পরের মৌসুমে আরও বেশি জমিতে এটি চাষ করবেন। ওই প্রতিবেদনের সময় তাঁর ফসল মাঠেই ছিল, তাই তাঁর বলা সংখ্যাটি ছিল প্রত্যাশা, প্রকৃত ফলন নয়।

ব্রি ধান২৮-এর নমুনা; ফাতেমা বেগম বলেছিলেন তাঁর ধান দেখতে এই বোরো জাতের মতো। ছবি: ROCKY / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
ব্রি ধান২৮-এর নমুনা; ফাতেমা বেগম বলেছিলেন তাঁর ধান দেখতে এই বোরো জাতের মতো। ছবি: ROCKY / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)

ফকিরহাট ও আলফাডাঙ্গা: যেখানে ধানটি চাষ হয়েছে


ফকিরহাট খুলনা বিভাগের বাগেরহাট জেলার একটি উপজেলা। জাতীয় জ্ঞানকোষ বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী এর আয়তন ১৬০.৬৮ বর্গকিলোমিটার এবং ইউনিয়ন আটটি, যার একটি বেতাগা। প্রধান নদী রূপসা ও ভৈরব।

বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী এখানকার প্রধান ফসল ধান, পাট, আলু, পান ও সবজি, আর ৫৩.৬৩ শতাংশ পরিবারের আয়ের প্রধান উৎস কৃষি। উপজেলায় চিংড়ি চাষসহ ৮ হাজার ৭৭৯টি মৎস্য খামারও ছিল। এ থেকে বোঝা যায় ফাতেমা ধানের জমি কেন মাছের ঘেরের ভেতরে ছিল: দক্ষিণ-পশ্চিমের এই অঞ্চলে ধান ও মাছ প্রায়ই একই নিচু জমি ভাগাভাগি করে।

১৯৮৪ সালে গঠিত বাগেরহাট জেলার আয়তন ৩ হাজার ৯৫৯.১১ বর্গকিলোমিটার এবং জেলাটি বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত। ২০১১ সালের আদমশুমারিতে জেলার জনসংখ্যা ছিল ১৪ লাখ ৭৬ হাজার ৯০ জন, আর ফকিরহাটে এক লাখ ৩৭ হাজার ৭৮৯ জন।

আলফাডাঙ্গা ঢাকা বিভাগের ফরিদপুর জেলার সবচেয়ে ছোট উপজেলা; আয়তন ১২৭.৮৭ বর্গকিলোমিটার, ইউনিয়ন ছয়টি। প্রধান নদীগুলোর একটি মধুমতী। বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী এখানকার প্রধান ফসল ধান, পাট, চিনাবাদাম, গম, আলু, কলাই, পেঁয়াজ, রসুন ও আখ, আর ৫৬.১৫ শতাংশ পরিবারের আয়ের প্রধান উৎস কৃষি। ২০১১ সালের আদমশুমারিতে উপজেলার জনসংখ্যা ছিল এক লাখ ৮ হাজার ৩০২ জন।

হাইব্রিড খেতের বীজ নিয়ে কেন প্রশ্ন ওঠে


ফাতেমা ধানের শুরু হাইব্রিড ধানের খেতে পাওয়া তিনটি ব্যতিক্রমী শীষ থেকে। এই উৎস গুরুত্বপূর্ণ, কারণ বীজ রেখে দিলে হাইব্রিড ধানের আচরণ সাধারণ ধানের মতো হয় না।

আন্তর্জাতিক ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ইরি) ২০০৭ সালে তাদের সাময়িকী রাইস টুডেতে ব্যাখ্যা করে, জিনগতভাবে ভিন্ন দুটি জাতের সংকরায়ণে হাইব্রিড ধানের বীজ তৈরি হয়। প্রথম প্রজন্ম, যাকে এফ১ বলা হয়, সংকর তেজ বা হেটারোসিস দেখায় এবং বেশি ফলন দেয়।

কিন্তু এফ১ হাইব্রিড ফসল থেকে যে দানা পাওয়া যায়, তা একরকম হয় না। ইরি লিখেছে, ইনব্রেড বা সাধারণ উফশী জাতের দানা জিনগতভাবে প্রায় মা-গাছের মতোই হয়, তাই তা রেখে পরে বোনা যায়। কিন্তু হাইব্রিড ফসল থেকে রাখা বীজ বুনলে গাছগুলোর বৈশিষ্ট্য নানা রকম হয়, ঠিক যেমন ভাইবোনেরা একে অপরের থেকে আলাদা হয়। এ কারণেই হাইব্রিড ধানের চাষিরা প্রতি মৌসুমে নতুন বীজ কেনেন।

তাই হাইব্রিড খেতে কয়েকটি ব্যতিক্রমী গাছ হতে পারে হাইব্রিডেরই এমন বংশধর, যা আশপাশের গাছ থেকে আলাদা, কিংবা অন্য কোনো উৎসের গাছ। এমন একটি সারি আসলে কী এবং তা কয়েক মৌসুম ধরে একই বৈশিষ্ট্য ধরে রাখে কি না, তা কেবল প্রজননবিদদের পরীক্ষাতেই জানা যায়। ২০২১ সালের এপ্রিল পর্যন্ত প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়নি যে ব্রি বা অন্য কোনো গবেষণা প্রতিষ্ঠান ফাতেমা ধানের এমন পরীক্ষা করেছে বা এর উৎস নিয়ে কিছু জানিয়েছে।

কৃষকের হাতে পাওয়া ধান বাংলাদেশে আগেও দেখা গেছে। নব্বইয়ের দশকের শুরুতে ঝিনাইদহ সদর উপজেলার কৃষক হরিপদ কাপালি ব্রির জাত বিআর১১-এর খেত থেকে সামান্য ভিন্ন বৈশিষ্ট্যের কিছু গাছ আলাদা করেন। ১৯৯২ সালে সেগুলোর বীজ বুনে তিনি বিআর১১-এর চেয়ে বেশি ফলন পান এবং প্রতিবেশীদের সঙ্গে বীজ ভাগ করে নেন। ধানটি ‘হরি ধান’ নামে পরিচিতি পায়।

২০১৭ সালের জুলাইয়ে হরিপদ কাপালির মৃত্যুর পর ঢাকা ট্রিবিউন জানায়, কৃষি কর্মকর্তা ও বিজ্ঞানীরা তখনো ধানটির উৎস নির্ণয় করতে পারেননি। পত্রিকাটি হরি ধানকে বিআর১১-এর মতোই, তবে কিছুটা লম্বা ও বেশি ফলনশীল বলে বর্ণনা করে।

একটি ধান কীভাবে অনুমোদিত জাত হয়


কৃষক মায়ের নামে ধানের নাম রাখতে পারেন, প্রতিবেশীরা তার বীজও কিনতে পারেন, কিন্তু আইনের চোখে তাতে সেটি অবমুক্ত জাত হয় না। এর নিয়ম ঠিক করে বীজ আইন ২০১৮ (২০১৮ সালের ৬ নম্বর আইন), যা ১৯৭৭ সালের বীজ অধ্যাদেশের জায়গা নিয়েছে।

আইনের ৭ ধারা অনুযায়ী সরকার বীজ বিক্রি নিয়ন্ত্রণের জন্য কোনো ফসল বা জাতকে ‘নোটিফাইড’ ঘোষণা করতে পারে। কোনো সরকারি প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তির উদ্ভাবিত নোটিফাইড ফসলের নতুন জাত জাতীয় বীজ বোর্ডের গঠিত কমিটির সুপারিশে বোর্ডের অনুমোদন নিয়েই অবমুক্ত হয় এবং বোর্ডে নিবন্ধিত হয়।

১১ ধারায় বলা আছে, বোর্ডে নিবন্ধিত না হলে, ফসল বা জাত হিসেবে শনাক্তযোগ্য না হলে, নির্ধারিত মান পূরণ না করলে এবং সিলমোহর ও লেবেল না থাকলে কোনো বীজ ডিলার নোটিফাইড ফসল বা জাতের বীজ বিক্রি বা বিক্রির প্রস্তাব করতে পারবেন না। ২৪ ধারা অনুযায়ী নোটিফাইড ফসলের বীজ বিক্রির শর্ত ভঙ্গ করা অপরাধ, যার শাস্তি সর্বোচ্চ ৯০ দিনের বিনাশ্রম কারাদণ্ড, সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ড।

বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী ১৯৭৪ সালে কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীনে গাজীপুরে প্রতিষ্ঠিত বীজ প্রত্যয়ন এজেন্সি নোটিফাইড ফসলের জাত মূল্যায়ন ও অবমুক্তির কাজ সমন্বয় করে। সংস্থাটি প্রজনন বীজ ও ভিত্তি বীজ প্রত্যয়ন করে এবং বাজারে বিক্রি হওয়া বীজের মানও পরীক্ষা করে।

নতুন ধানের এই পথ দীর্ঘ। ২০১৭ সালের অক্টোবরে জাতীয় বীজ বোর্ড ব্রি ধান৮১ অনুমোদন দিলে ব্রির মহাপরিচালক মো. শাহজাহান কবীর দ্য ডেইলি স্টারকে জানান, সংকরায়ণ, গবেষণাগার ও মাঠ পরীক্ষা মিলিয়ে ১৫ বছর লেগেছে, তারপর বোর্ড অনুমোদন দিয়েছে।

২০২১ সালের এপ্রিল পর্যন্ত ফাতেমা ধান নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়নি যে এটি অবমুক্তির জন্য জমা পড়েছে, বীজ প্রত্যয়ন এজেন্সি এটি পরীক্ষা করেছে বা জাতীয় বীজ বোর্ড অনুমোদন দিয়েছে। প্রতিবেদনের ভাষায় এটি ছিল কৃষকের উদ্ভাবিত ধান, যা এক খামার থেকে আরেক খামারে বিক্রি ও বিনিময় হচ্ছিল।

গ্রামবাংলায় ঝড়ো আকাশের নিচে বোরো ধান ঘরে তুলছেন কৃষকেরা, প্রসঙ্গ হিসেবে। ছবি: ZahidTushar / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
গ্রামবাংলায় ঝড়ো আকাশের নিচে বোরো ধান ঘরে তুলছেন কৃষকেরা, প্রসঙ্গ হিসেবে। ছবি: ZahidTushar / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)

বোরো ধান ও ব্রি ধান২৮: প্রেক্ষাপট


ফাতেমা ধান বোরো মৌসুমের ধান, যা শুষ্ক মৌসুমে সেচের জমিতে চাষ হয়। বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী উফশী বোরো ধান কাটা হয় মে-জুনে, আর স্থানীয় বোরো কাটা হয় এপ্রিল-মে মাসে।

বোরো তত দিনে দেশের সবচেয়ে বড় ধানের ফসল। ২০২০ সালের আগস্টে ব্রি জানায়, ২০২০ সালের বোরো মৌসুমে আবাদ ০.৭১ শতাংশ কমলেও রেকর্ড ২ কোটি ২ লাখ ৬০ হাজার টন চাল উৎপাদন হয়েছে। দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসে প্রকাশিত একই তথ্য অনুযায়ী আগের মৌসুমে, ২০১৯ সালে, ৪৯ লাখ হেক্টর জমিতে উৎপাদন হয়েছিল ২ কোটি ৩ লাখ টন।

এই ফসলের বড় অংশ জুড়ে ছিল ব্রি ধান২৮। ২০১৭ সালের অক্টোবরে দ্য ডেইলি স্টার জানায়, বোরো মৌসুমে প্রায় ৪৫ শতাংশ ধানি জমিতে কৃষকেরা ব্রি ধান২৮ চাষ করেন এবং বিজ্ঞানীরা একে মেগা জাত বলেন। এটি ও ব্রি ধান২৯ অবমুক্ত হয়েছিল ১৯৯৪ সালে, এবং পত্রিকাটির প্রতিবেদন অনুযায়ী বয়সের কারণে দুটি জাতই সম্ভাবনা হারাচ্ছিল।

এই প্রেক্ষাপটেই ২০১৮ সালে ব্রি ধান২৮-এর মতো দেখতে অথচ অনেক বড় শীষের একটি ধান সারা দেশ থেকে ক্রেতা টেনেছিল, আর ২০২১ সালে অন্য জেলার কৃষকেরাও তা চাষ করছিলেন। ধান প্রতিটি পরিবারের কাছে গুরুত্বপূর্ণ: ২০১৭ সালে দ্য ডেইলি স্টার জানায়, বাংলাদেশের মানুষ দৈনিক ক্যালরি ও প্রোটিনের অর্ধেকের বেশি পান ভাত থেকে।

নতুন বা অপরিচিত বীজ চাষ করতে চাইলে কৃষকের প্রথম যাওয়ার জায়গা ডিএইর উপজেলা কৃষি অফিস; সেখানে বীজের উৎস যেমন জানা যায়, তেমনি মৌসুমের সার, সেচ ও বালাই দমনের পরামর্শও পাওয়া যায়।

ছবি: Salauddin.hossain / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)

সূত্র: দ্য এগ্রো নিউজ (মূল প্রতিবেদন), ইউএনবি (মে ২০১৮), বাংলা ট্রিবিউন (১৮ এপ্রিল ২০২১), দ্য ডেইলি স্টার (অক্টোবর ২০১৭), দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস (আগস্ট ২০২০), ঢাকা ট্রিবিউন (জুলাই ২০১৭), ইরির রাইস টুডে (২০০৭), বীজ আইন ২০১৮, বাংলাপিডিয়া

অনলাইন ডেস্কদা এগ্রো নিউজ

ফসল

সম্পর্কিত খবর

ফসল

ইংল্যান্ডে যবের ফলন ১৪ বছরে সর্বনিম্ন, গম সামান্য বেশি

যুক্তরাজ্যের কৃষি মন্ত্রণালয় ডেফরার প্রাথমিক হিসাবে ইংল্যান্ডে যব উৎপাদন ১১ শতাংশ কমে ৩৭ লাখ টন হয়েছে, গম ০ দশমিক ৮ শতাংশ বেড়ে ১ কোটি ৮ লাখ টন; গমের তুলনায় পশুখাদ্যের যব বিক্রি হচ্ছে অনেক কম দামে।

Farmers Weekly১৬ অক্টোবর ২০২৬২ মিনিটের পড়া
বিশ্ব

ভালো ফসলের বছরেও আফগানিস্তানে শীতে তীব্র খাদ্যসংকটে পড়বে ১ কোটি ৯২ লাখ মানুষ

অনুকূল বৃষ্টি ও ভালো ফসলের পরও নভেম্বর-এপ্রিলে আফগানিস্তানের ৩৮ শতাংশ মানুষ তীব্র খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় পড়বে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে এফএও ও ডব্লিউএফপি; গত বছর একই সময়ের পূর্বাভাস ছিল ১ কোটি ৭৪ লাখ।

ডব্লিউএফপি১৬ অক্টোবর ২০২৬২ মিনিটের পড়া
ফসল

জমির সিদ্ধান্তের ভার পেয়ে তুলার ফলন সাত গুণ করলেন মহারাষ্ট্রের সুনীতা

একসময় দিনমজুরি করা, পরিবারের ১২ একর জমি নিয়ে কোনো সিদ্ধান্তের অধিকার না থাকা মহারাষ্ট্রের পাচোদ গ্রামের সুনীতা নেহারে এখন খামার চালান; মাটি ও পানি সংরক্ষণে একরপ্রতি তুলার ফলন প্রায় ১ থেকে বাড়িয়েছেন ৭ দশমিক ১৪ কুইন্টালে।

ডাউন টু আর্থ১৬ অক্টোবর ২০২৬২ মিনিটের পড়া

মন্তব্য

(০)