বাংলা বছরের প্রথম দিন পহেলা বৈশাখের এক দিন আগে, ২০২৬ সালের ১৩ এপ্রিল, ঢাকার অনলাইন সংবাদমাধ্যম জাগো নিউজের লাইফস্টাইল ডেস্ক উৎসবের খাবারের জন্য তিনটি ভর্তার রেসিপি প্রকাশ করে: ইলিশ সরিষা ভর্তা, লইট্টা শুটকি ভর্তা এবং রুই মাছ দিয়ে মাছের ভর্তা। তিনটিই ভাজা বা শুকনা মাছ ঝুরি করে কিংবা বেটে পেঁয়াজ, মরিচ আর সরিষার তেলে মাখানো পদ। উপকরণ ঘরোয়া ও সহজ, আর খাওয়ার কথা পান্তা ভাত অথবা গরম ভাতের সঙ্গে।
রেসিপিগুলোর আগে ডেস্কটি মৌসুম নিয়ে কয়েকটি কথা লিখেছিল। পহেলা বৈশাখ মানেই নতুন বছরের শুরু, আনন্দ-উৎসব আর বাঙালির চিরচেনা খাবারের আয়োজন; এই দিনে পান্তা ভাতের সঙ্গে নানা রকম ভর্তা যেন অপরিহার্য এক স্বাদ-ঐতিহ্য। কাঁচা মরিচের ঝাঁজ, সরিষার তেলের ঘ্রাণ আর দেশি মশলার মিশেলে তৈরি ভর্তা শুধু পেট ভরায় না, জাগিয়ে তোলে শৈশবের স্মৃতি আর গ্রামবাংলার আবহ। সে কারণেই ঘরোয়া সহজ উপকরণে তৈরি ভর্তা উৎসবের প্রাণ হয়ে ওঠে বলে জাগো নিউজ লিখেছিল।
পহেলা বৈশাখ ও নববর্ষের খাবার
বাংলাদেশের জাতীয় জ্ঞানকোষ বাংলাপিডিয়া পহেলা বৈশাখকে বাংলা পঞ্জিকার প্রথম দিন হিসেবে বর্ণনা করেছে, যা বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গ দুই জায়গাতেই উৎসবের আমেজে পালিত হয়। বাংলাদেশে দিনটি জাতীয় ছুটির দিন, পড়ে ১৪ বা ১৫ এপ্রিল। ২০২৬ সালে দিনটি ছিল ১৪ এপ্রিল। ঢাকা ট্রিবিউন ১২ এপ্রিল জানায়, শোভাযাত্রা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও মেলার মধ্য দিয়ে সারা দেশে বাংলা নববর্ষ ১৪৩৩ উদ্যাপনে সরকার ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়েছে, আর ১৪ এপ্রিল সকালে ঢাকার রমনা বটমূলে ছায়ানটসহ সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো তাদের ঐতিহ্যবাহী অনুষ্ঠান করবে।
বাংলা সনের জন্মই কৃষির সঙ্গে জড়িয়ে। বাংলাপিডিয়া জানায়, মুঘল আমলে ভূমিকর আদায় হতো হিজরি পঞ্জিকা অনুযায়ী। কিন্তু হিজরি চান্দ্র পঞ্জিকা হওয়ায় রাজস্ব বছরের সঙ্গে কৃষি বছর মিলত না, ফলে অসময়ে খাজনা দিতে গিয়ে কৃষক বিপাকে পড়তেন। ভূমিকর আদায় সুশৃঙ্খল করতে সম্রাট আকবর পঞ্জিকা সংস্কারের নির্দেশ দেন। তাঁর নির্দেশে বিশিষ্ট পণ্ডিত ও জ্যোতির্বিদ ফতেহউল্লাহ সিরাজি চান্দ্র হিজরি ও বাংলা সৌর পঞ্জিকার ভিত্তিতে বাংলা সন প্রণয়ন করেন। নতুন ফসলি সন চালু হয় ১৫৮৪ সালের ১০ বা ১১ মার্চ, তবে এর গণনা ধরা হয় ১৫৫৬ সালে আকবরের সিংহাসনে আরোহণের সময় থেকে।
খাবার শুরু থেকেই এই দিনের অংশ। চৈত্রের শেষ দিনে সব খাজনা-পাওনা মিটিয়ে দেওয়ার রীতি ছিল, আর নতুন বছরের প্রথম দিনে জমিদারেরা প্রজাদের মিষ্টিমুখ করাতেন। দিনের প্রধান আয়োজন হয়ে ওঠে হালখাতা, অর্থাৎ নতুন হিসাবের খাতা খোলা: ব্যবসায়ীরা পহেলা বৈশাখে পুরোনো খাতা বন্ধ করে নতুন খাতা খুলতেন এবং ক্রেতাদের মিষ্টিমুখের নিমন্ত্রণ জানাতেন। বাংলাপিডিয়ার ভাষায়, এই রীতি এখনো টিকে আছে, বিশেষ করে স্বর্ণকার ও মুদি দোকানিদের মধ্যে। এদিন ঘরদোর পরিষ্কার করা হয়, ভোরে স্নান সেরে মানুষ সবচেয়ে ভালো পোশাক পরে আত্মীয়-প্রতিবেশীর বাড়ি যান, অতিথি আপ্যায়নে বিশেষ খাবার রান্না হয়, আর বৈশাখী মেলায় বিক্রি হয় কৃষিপণ্য, হস্তশিল্প, খেলনা, নানা খাবার ও মিষ্টি। জ্ঞানকোষটি আরও বলছে, উৎসবের উৎস কৃষিতে হলেও এখন গ্রামের চেয়ে শহরেই এর উদ্যাপন বেশি চোখে পড়ে।
২০২৬ সালের পরিকল্পনাতেও তার ছাপ ছিল। ঢাকা ট্রিবিউনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, হোটেল ও ক্লাবগুলোতে বিশেষ অনুষ্ঠান ও ঐতিহ্যবাহী বাঙালি খাবার পরিবেশনের কথা ছিল; কারাগার, হাসপাতাল ও শিশুসদনে ঐতিহ্যবাহী খাবার বিতরণের বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল; আর বাংলা একাডেমি বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনের (বিসিক) সঙ্গে মিলে ১৪ থেকে ২০ এপ্রিল একাডেমি প্রাঙ্গণে সাত দিনের নববর্ষ মেলার আয়োজন করেছিল।
পান্তা ভাত, ভর্তা আর সরিষার তেল
পান্তা ভাত হলো রান্না করা ভাত, সাধারণত আগের রাতের বেঁচে যাওয়া ভাত, যা সারা রাত পানিতে ভিজিয়ে রাখা হয়। প্রথাগতভাবে এটি সকালে খাওয়া হয় লবণ, পেঁয়াজ আর মরিচ দিয়ে, প্রায়ই সঙ্গে থাকে শুটকি, মাছের ঝোল আর আলু বা বেগুনের মতো নানা ভর্তা। পহেলা বৈশাখে পান্তা ভাত জনপ্রিয় খাবার, তখন প্রায়ই এর সঙ্গে খাওয়া হয় ভাজা ইলিশ।
তিনটি রেসিপিতেই আছে সরিষার তেল। বাংলাপিডিয়া সরিষাকে এমন বীরুৎ উদ্ভিদ হিসেবে বর্ণনা করেছে, যার বীজ থেকে তেল হয়, যেমন ব্রাসিকা নেপাস (রেপ) ও ব্রাসিকা নাইগ্রা (কালো সরিষা)। জ্ঞানকোষটির ভাষায়, মাত্র কয়েক দশক আগেও বাংলাদেশে রান্নার তেল বলতে ছিল কেবল সরিষার তেল। অনেক জায়গায় এখনো ঘানি নামের প্রথাগত কলে বীজ পিষে তেল বের করা হয়, যে ঘানি দিনভর, এমনকি সারা রাত ধরেও টানত একটি বলদ। এই পেশার মানুষকে বলা হতো কলু, আর কেন কী করছে না জেনে একঘেয়ে কাজ করে যাওয়া মানুষকে বোঝাতে চালু হয় 'কলুর বলদ' কথাটি। এখন সরিষার তেল বের করা হয় বিদ্যুৎচালিত মিলে।
সরিষা রবি মৌসুমের ফসল। বাংলাপিডিয়া জানায়, প্রায় সব জেলাতেই এর চাষ হয়, তবে চট্টগ্রাম, সিলেট, ঢাকা, টাঙ্গাইল, যশোর, বগুড়া, সিরাজগঞ্জ ও পাবনায় আবাদ তুলনামূলক বেশি। দেশি সরিষার তেলে দেশের রান্নার তেলের চাহিদার সামান্য অংশই মেটে, তাই বিপুল পরিমাণ সয়াবিন ও সূর্যমুখী তেল আমদানি করতে হয়, আর আমদানি করা সয়াবিন তেল সস্তা হওয়ায় সরিষার আবাদ কমছে। এই একই গাছের বীজ বেটেই তৈরি হয় প্রথম রেসিপির সরিষা বাটা।
ইলিশ সরিষা ভর্তা
প্রথম রেসিপিতে ইলিশ আগে থেকেই মচমচে করে ভাজা থাকে, তাই কেবল ঝুরি করে মেখে নিলেই চলে। জাগো নিউজের দেওয়া উপকরণ:
- ইলিশ মাছ কয়েক টুকরা (অল্প জিরা গুঁড়া ও লবণ দিয়ে মেখে তেলে খুব মচমচে করে ভেজে নেওয়া)
- সাদা সরিষা বাটা ২ টেবিল চামচ
- লবণ স্বাদমতো
- সরিষার তেল
- পেঁয়াজ কুচি
যেভাবে তৈরি করবেন:
- ভাজা ইলিশের কাঁটা ছাড়িয়ে মাছ ঝুরি করে নিন।
- ইলিশ ঝুরির সঙ্গে সাদা সরিষা বাটা, স্বাদমতো লবণ, সরিষার তেল ও পেঁয়াজ কুচি দিয়ে খুব ভালোভাবে মেখে নিন।
- তৈরি হয়ে গেল ইলিশ সরিষা ভর্তা। পান্তা ভাত অথবা গরম ভাতের সঙ্গে পরিবেশন করুন।
রেসিপিতে তেল ও পেঁয়াজের নির্দিষ্ট পরিমাণ দেওয়া নেই, তাই এগুলো স্বাদ অনুযায়ী দিতে হবে।
ইলিশ বাংলাদেশের জাতীয় মাছ। বাংলাপিডিয়ার বর্ণনায় এর দেহ বেশ চাপা, রং ধাতব রুপালি; দৈর্ঘ্য ৬০ সেন্টিমিটার পর্যন্ত হতে পারে, তবে সচরাচর পাওয়া যায় ৩৫ থেকে ৪০ সেন্টিমিটারের মাছ। বড় একটি ইলিশের ওজন প্রায় আড়াই কেজি; স্ত্রী মাছ দ্রুত বাড়ে এবং সাধারণত পুরুষের চেয়ে বড় হয়; এক থেকে দুই বছরে মাছটি প্রজননক্ষম হয়। ইলিশ অ্যানাড্রোমাস বা নদীগামী মাছ: পূর্ণবয়স্ক মাছ উজানের মিঠা পানিতে ডিম ছাড়ে, পোনা নদীর খাতে বড় হয়ে খাবার আর বৃদ্ধির জন্য সাগরে নেমে যায়, তারপর প্রজননক্ষম হয়ে আবার নদীতে ফেরে। বড় একটি স্ত্রী ইলিশ ২০ লাখ পর্যন্ত ডিম দিতে পারে। প্রায় সারা বছরই কমবেশি ডিম ছাড়লেও ফেব্রুয়ারি-মার্চে ছোট এবং সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে প্রধান প্রজনন মৌসুম। ৬ থেকে ১০ সেন্টিমিটারের ছোট ইলিশকে বলে জাটকা, যা সাগরে নামার পথে কয়েকটি বড় নদীতে প্রচুর ধরা পড়ে।
মাছের প্রজাতির বৈশ্বিক তথ্যভান্ডার ফিশবেস জানায়, ইলিশের (টেনুয়ালোসা ইলিশা) বিস্তার ভারত-পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগর অঞ্চলে, পারস্য উপসাগর থেকে পূর্বে ভিয়েতনাম পর্যন্ত। উপকূলের পানিতে ঝাঁক বেঁধে থাকে এবং নদীর উজানে যায়, কখনো ১,২০০ কিলোমিটার পর্যন্ত, তবে সাধারণত ৫০ থেকে ১০০ কিলোমিটার। প্রধানত দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ুর সময় নদীতে প্রজনন করে, আর বিক্রি হয় তাজা অথবা লবণ দিয়ে শুকিয়ে।

২০২৬ সালের বৈশাখের আগে ইলিশের দাম ও জাটকা নিষেধাজ্ঞা
রেসিপিগুলো যখন প্রকাশিত হয়, উৎসবকে সামনে রেখে তখন ইলিশের দাম চড়ছিল। ঢাকা পোস্ট ২০২৬ সালের ৮ এপ্রিল রাজধানীর কারওয়ান বাজার, মহাখালী, শ্যামবাজার ও আফতাবনগরের বাজার ঘুরে জানায়, ১ কেজি ২০০ গ্রামের ইলিশ বিক্রি হচ্ছিল কেজিপ্রতি ৩,০০০ থেকে ৩,২০০ টাকায়, যা এক সপ্তাহ আগেও ছিল ২,৫০০ থেকে ২,৮০০ টাকা। ১ কেজির ইলিশ ২,৬০০ থেকে ২,৮০০ টাকা, ৮০০ থেকে ৯০০ গ্রামের ইলিশ কেজিপ্রতি ২,৪০০ থেকে ২,৫০০ টাকা, ৫০০ থেকে ৬০০ গ্রামের ইলিশ ১,৮০০ থেকে ২,০০০ টাকা, কোথাও কোথাও ২,২০০ টাকা, আর ৩০০ থেকে ৪০০ গ্রামের ইলিশ কেজিপ্রতি ১,৪০০ থেকে ১,৬০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছিল, যা এক সপ্তাহ আগে ছিল ১,২০০ টাকা। ব্যবসায়ীরা পত্রিকাটিকে বলেন, জেলেদের জালে মাছ কম ধরা পড়ায় এ বছর সরবরাহ আগের কয়েক বছরের তুলনায় অনেক কম।
দুই দিন পর, ১০ এপ্রিল, সারাবাংলা রাজধানীর বাজারে ১ কেজি ২০০ গ্রামের ইলিশ কেজিপ্রতি ৩,১০০ থেকে ৩,৩০০ টাকায় বিক্রি হতে দেখে এবং জানায়, পান্তার সঙ্গে খাওয়ার জন্য অনেকে এখন ইলিশের বদলে অন্য মাছ কিনছেন।
এই সংকটের সরকারি প্রেক্ষাপটও ছিল। দ্য ডেইলি অবজারভারের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ৬ এপ্রিল সচিবালয়ে 'জাটকা সংরক্ষণ সপ্তাহ-২০২৬' উপলক্ষে সংবাদ সম্মেলনে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী বলেন, নদী ভরাট, জলবায়ু পরিবর্তন, নদীদূষণ আর মৎস্যসম্পদের ওপর অব্যাহত চাপের কারণে ইলিশের উৎপাদন বাড়ানো এখন বড় চ্যালেঞ্জ। মৎস্য অধিদপ্তরের হিসাব উদ্ধৃত করে পত্রিকাটি জানায়, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশে প্রায় ৫ লাখ টন ইলিশ উৎপাদিত হয়, যা ২০১৬-১৭ অর্থবছরের পর সর্বনিম্ন; এর আগে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে উৎপাদন ছিল ৫ লাখ ২৯ হাজার টন, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৫ লাখ ৭১ হাজার টন এবং ২০২১-২২ অর্থবছরে ৫ লাখ ৬৬ হাজার টন। মন্ত্রী জানান, দেশের মোট মাছ উৎপাদনে ইলিশের অবদান প্রায় ৯.৭৯ শতাংশ এবং জিডিপিতে প্রায় ১ শতাংশ, বিশ্বের ৮০ শতাংশের বেশি ইলিশ আসে বাংলাদেশ থেকে, আর প্রায় ৬ লাখ মানুষ সরাসরি ইলিশ আহরণে যুক্ত।
একই সংবাদ সম্মেলনে তখনকার বিধিনিষেধগুলোও তুলে ধরা হয়। যুগান্তর জানায়, 'জাটকা ধরা থামাই যদি, ইলিশে ভরবে সাগর-নদী' প্রতিপাদ্যে ৭ থেকে ১৩ এপ্রিল দেশের ইলিশসমৃদ্ধ ২০টি জেলায় জাটকা সংরক্ষণ সপ্তাহ পালনের কথা ছিল, আর মন্ত্রী জাটকা আহরণ, কেনাবেচা ও মজুত থেকে বিরত থাকতে জনসাধারণের প্রতি আহ্বান জানান। ১ নভেম্বর থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত জাটকা ধরা, পরিবহন ও বিক্রি নিষিদ্ধ; প্রজনন মৌসুমে ২২ দিন ইলিশ ধরা বন্ধ থাকে; ইলিশের ছয়টি অভয়াশ্রমে নির্দিষ্ট সময়ে মাছ ধরা বন্ধ থাকে; আর ১৫ এপ্রিল থেকে ১১ জুন পর্যন্ত ৫৮ দিন বঙ্গোপসাগরে সব ধরনের মাছ ধরা নিষিদ্ধ থাকার কথা। বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস) ১ মার্চ জানায়, সেদিন সকাল থেকে অভয়াশ্রমগুলোতে দুই মাসের নিষেধাজ্ঞা শুরু হয়েছে, চলবে ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত; ভোলায় মেঘনা ও তেঁতুলিয়া নদীর ১৯০ কিলোমিটার এলাকা এর আওতায়, আর সেখানে ৯০ হাজার ২১৩ জন জেলের মাসে ৪০ কেজি করে সরকারি চাল পাওয়ার কথা।
উৎসবের বাজার করতে যাওয়া রাঁধুনির জন্য এর মানে সহজ: এপ্রিলে বাজারে ওঠা ছোট ইলিশ জাটকা হতে পারে, যা ধরা, পরিবহন ও বিক্রি তখন নিষিদ্ধ ছিল। ভর্তার জন্য বড় মাছের ভাজা টুকরা, কিংবা একেবারে অন্য মাছও সমান কাজের।

লইট্টা শুটকি ভর্তা
দ্বিতীয় রেসিপিটি সামুদ্রিক মাছ লইট্টার শুটকি বেটে বানানো ভর্তা। জাগো নিউজের দেওয়া উপকরণ:
- লইট্টা শুটকি আধা কাপ
- পেঁয়াজ ৩টি
- রসুন ৭-৮ কোয়া
- মরিচ ৭-৮টি (কম-বেশি করা যাবে)
- ধনিয়াপাতা কুচি
- লবণ স্বাদমতো
- সরিষার তেল অল্প
যেভাবে তৈরি করবেন:
- শুটকি ভালোভাবে পরিষ্কার করে ধুয়ে নিন।
- তাওয়ায় দিয়ে মচমচে করে ভেজে নিন।
- একটি তাওয়ায় পেঁয়াজ, রসুন ও মরিচ অল্প আঁচে ভেজে নিন।
- ভেজে নেওয়া পেঁয়াজ, রসুন, মরিচের সঙ্গে ভাজা শুটকি, ধনিয়াপাতা কুচি, লবণ আর অল্প তেল দিয়ে চপার কিংবা ব্লেন্ডারে ব্লেন্ড করে নিন।
- গরম ভাতের সঙ্গে পরিবেশন করুন।
লইট্টা (লইট্যা নামেও লেখা হয়) মাছের ইংরেজি নাম বোম্বে ডাক, বৈজ্ঞানিক নাম হারপাডন নেহেরিয়াস। বাংলাপিডিয়া বাংলাদেশে শুকানো গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক মাছের তালিকায় লইট্টার নাম রেখেছে, সঙ্গে আছে ছুরি, পুঁটি, চাপিলা, লাক্ষা, রূপচাঁদা ও চিংড়ি। ইংরেজি নামে 'ডাক' থাকলেও এটি মাছ, লিজার্ডফিশ পরিবার সিনোডন্টিডির সদস্য। ফিশবেসের বর্ণনায় এটি ভারত-পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগর অঞ্চলের, সোমালিয়া থেকে পাপুয়া নিউগিনি পর্যন্ত, সামুদ্রিক ও লোনাপানির মাছ, লম্বায় প্রায় ৬১ সেন্টিমিটার পর্যন্ত হয়। বছরের বেশির ভাগ সময় এটি গভীর সাগরে বালুকাময় কাদার ওপরে থাকে এবং বর্ষায় খাবারের খোঁজে নদীর মোহনার কাছে বড় ঝাঁকে জড়ো হয়। মাছটি আগ্রাসী শিকারি এবং অত্যন্ত আলো বিচ্ছুরণকারী (ফসফরেসেন্ট), বাণিজ্যিকভাবে ব্যাপক হারে ধরা হয়, আর বিক্রি হয় তাজা, শুকনা বা লবণ দেওয়া অবস্থায়।
শুটকি কোথা থেকে আসে, কেনার সময় যা দেখবেন
মাছ শুকিয়ে রাখা এ অঞ্চলের সবচেয়ে পুরোনো সংরক্ষণ পদ্ধতিগুলোর একটি, আর বাংলাপিডিয়া বলছে, বাংলাদেশের অনেক মানুষের কাছে শুটকি উপাদেয় খাবার। মূল নীতি হলো প্রথাগতভাবে রোদে শুকিয়ে মাছের পানি বের করে দেওয়া, যাতে পেশির এনজাইম আর অণুজীবের তৎপরতা সর্বনিম্নে নামে। নির্দিষ্ট কিছু উপকূল ও ভেতরের নিচু এলাকায় মাছ শুকানো হয়, যেমন সুন্দরবনের দুবলার চর, সেন্ট মার্টিন দ্বীপ, রাঙ্গাবালী, সোনাদিয়া দ্বীপ, মহেশখালী, কক্সবাজার, সুনামগঞ্জের ইব্রাহিমপুর ও জামালগঞ্জের যশমন্তপুর। মাছ আসে মূলত মোহনা ও সাগরে পাতা বেহুন্দি জাল থেকে; ভাড়া করা শ্রমিকেরা প্রজাতি অনুযায়ী বাছাই করে মাদুরে বিছিয়ে বা উঁচু মাচায় ঝুলিয়ে আকার ও প্রজাতিভেদে দুই থেকে আট দিন শুকান।
জ্ঞানকোষটি সমস্যার কথাও লিখেছে। মেঘলা ও বৃষ্টির দিনে শুকানোর সময় মাছে প্রায়ই ব্লো-ফ্লাই মাছি ও তার শূককর (ম্যাগট) আক্রমণ করে, আর গুদামে আক্রমণ করে বিটল ও মাইট। পণ্য রক্ষায় ব্যবসায়ীরা প্রায়ই ক্ষতিকর কীটনাশক ও ছত্রাকনাশক ব্যবহার করেন। বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের ইনস্টিটিউট অব ফুড অ্যান্ড রেডিয়েশন বায়োলজি বিকিরণ ব্যবহার করে শুটকি সংরক্ষণ নিয়ে গবেষণা করছে।
সামুদ্রিক মাছের শুটকির সবচেয়ে পরিচিত উৎস কক্সবাজার। প্রথম আলো ২০২৪ সালের নভেম্বরে জানায়, কক্সবাজার পৌরসভার ১ নম্বর ওয়ার্ডের নাজিরারটেক উপকূলে প্রায় ৮০০টি শুটকি মহালে দৈনিক ১২০ মেট্রিক টন শুটকি উৎপাদিত হচ্ছিল, যার বেশির ভাগ লইট্যা, ছুরি, পোপা, মাইট্যা, কামিলা, ফাইস্যা ও রূপচাঁদা। বাঁকখালী নদীর তীরের নতুন ফিশারিপাড়ায় খোলা লোনা হাওয়ায় বাঁশের মাচায় কোনো রাসায়নিক ছাড়া মাছ শুকানো হয় এবং মৎস্য বিভাগও তা নিশ্চিত করেছে বলে পত্রিকাটি জানায়।
ফিশারিপাড়ার একজন ব্যবসায়ী প্রথম আলোকে বলেছিলেন, খাঁটি ও বিষমুক্ত শুটকি হবে শক্ত, চাপ দিলে ভাঙবে না, চকচক করবে না, ওপরে সাদা গুঁড়ার আস্তর থাকবে না এবং গন্ধ থাকবে স্বাভাবিক। জেলা মৎস্য কর্মকর্তা বলেন, পর্যটকের চাপ বাড়লে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী বিদেশ থেকে আমদানি করা শুটকি এনে বিক্রি করেন, আর এসব শুটকিতে স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর বিষ বা কীটনাশক মেশানো থাকে।

রুই মাছের ভর্তা
তৃতীয় রেসিপিটি সবচেয়ে সহজ, প্রায় যেকোনো মাছ দিয়েই করা যায়। জাগো নিউজ রুই মাছ নিয়েছিল। উপকরণ:
- রুই মাছের টুকরা ৩-৪টি (পছন্দমতো যেকোনো মাছ নেওয়া যায়)
- পেঁয়াজ কুচি
- শুকনা মরিচ টালা
- সরিষার তেল
যেভাবে তৈরি করবেন:
- মাছের টুকরাগুলো ভালোভাবে ভেজে নিন।
- মাছের কাঁটা বেছে তাতে পেঁয়াজ কুচি, শুকনা মরিচ টালা ও সরিষার তেল দিয়ে ভালোভাবে মাখিয়ে নিন।
রুইয়ের বৈজ্ঞানিক নাম লেবিও রোহিটা, এটি সাইপ্রিনিডি পরিবারের কার্পজাতীয় মাছ। বাংলাপিডিয়া একে বাংলাদেশের মিঠা পানির পরিচিত কার্পের তালিকায় রেখেছে, স্থানীয় নাম রুই, রোহিত বা রৌ, পাওয়া যায় সারা দেশে। পুকুর, হ্রদ ও ডোবায় মিশ্র মাছ চাষে সাধারণ রীতি হলো ভারতীয় প্রধান কার্প, অর্থাৎ কাতলা, রুই ও মৃগেলের সঙ্গে মলা, পুঁটির মতো দেশি ছোট মাছের চাষ। প্রধান কার্পের ডিম-পোনা পদ্মা, ব্রহ্মপুত্র ও যমুনা নদীর ৫০টির বেশি প্রজননক্ষেত্র থেকে সংগ্রহ করে নার্সারিতে বড় করা হয়।
ফিশবেস জানায়, রুইয়ের আদি নিবাস পাকিস্তান, ভারত, বাংলাদেশ, মিয়ানমার ও নেপাল। পূর্ণবয়স্ক মাছ নদীতে থাকে এবং উদ্ভিদ খায়; প্রজনন সাধারণত দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ুর সময়, বন্যার পানিতে ভরা নদী ও অগভীর প্লাবিত সমতলে। প্রাকৃতিক উৎস থেকে আহরণ ও চাষ দুই ক্ষেত্রেই এটি উচ্চ বাণিজ্যিক গুরুত্বের মাছ, আর জলাধারে মজুত ও চাষের জন্য একে আদি এলাকার বাইরেও ব্যাপকভাবে নেওয়া হয়েছে।

তাজা মাছ, নিরাপদ রান্না আর লবণের পরিমাণ
তিনটি ভর্তাই বানানো হয় আগে রান্না করা মাছ হাতে মেখে, সঙ্গে কাঁচা পেঁয়াজ, তেল আর মসলা। তাই রান্নাঘরের সাধারণ পরিচ্ছন্নতা জরুরি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) ২০০৬ সালে প্রকাশিত 'ফাইভ কিজ টু সেফার ফুড' নিরাপদ খাবারের কথা পাঁচটি নিয়মে বলে: পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকুন; কাঁচা ও রান্না করা খাবার আলাদা রাখুন; খাবার ভালোভাবে রান্না করুন; খাবার নিরাপদ তাপমাত্রায় রাখুন; এবং নিরাপদ পানি ও কাঁচামাল ব্যবহার করুন।
তাজা মাছ চেনার কিছু ব্যবহারিক উপায় দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসন (এফডিএ)। মাছের গন্ধ হবে তাজা ও মৃদু, আঁশটে, টক বা অ্যামোনিয়ার মতো নয়; চোখ হবে স্বচ্ছ ও উজ্জ্বল; আস্ত মাছের মাংস হবে দৃঢ়, কানকো লাল, আর চাপ দিলে মাংস আবার আগের মতো উঠে আসবে। দুই দিনের মধ্যে রান্না করলে মাছ পরিষ্কার ফ্রিজে ৪০ ডিগ্রি ফারেনহাইট বা তার নিচে রাখতে হবে, নইলে ভালোভাবে মুড়ে ডিপ ফ্রিজে রাখতে হবে। কাঁচা মাছ ধরার পর অন্তত ২০ সেকেন্ড সাবান ও কুসুম গরম পানিতে হাত ধুতে হবে, আর কাঁচা মাছ ও তৈরি খাবারের মাঝে কাটিং বোর্ড ও বাসনপত্র সাবান ও গরম পানিতে ধুয়ে নিতে হবে।
এফডিএ বলছে, বেশির ভাগ সামুদ্রিক খাবার ভেতরের তাপমাত্রা ১৪৫ ডিগ্রি ফারেনহাইটে না পৌঁছানো পর্যন্ত রান্না করা উচিত; থার্মোমিটার না থাকলে মাংস অস্বচ্ছ হয়ে কাঁটাচামচে সহজে আলাদা হয়ে এলে বুঝতে হবে মাছ রান্না হয়েছে। পচনশীল খাবার দুই ঘণ্টার বেশি ফ্রিজের বাইরে রাখা যাবে না, আর তাপমাত্রা ৯০ ডিগ্রি ফারেনহাইটের ওপরে হলে এক ঘণ্টার বেশি নয়। উৎসবের সকালের জন্য আগেভাগে ভর্তা বানিয়ে রাখলে কথাটি মনে রাখা দরকার।
প্রতিটি রেসিপিতে লবণ দিতে বলা হয়েছে স্বাদমতো। ডব্লিউএইচও প্রাপ্তবয়স্কদের দিনে ৫ গ্রামের কম, অর্থাৎ মোটামুটি এক চা-চামচ লবণ খাওয়ার পরামর্শ দেয়, আর ২০২৩ সালের মার্চে সংস্থাটির হিসাবে বিশ্বে গড়ে মানুষ দিনে ১০.৮ গ্রাম লবণ খায়, যা পরামর্শের দ্বিগুণেরও বেশি। সংস্থাটি বলছে, অতিরিক্ত সোডিয়াম হৃদ্রোগ, স্ট্রোক ও অকালমৃত্যুর ঝুঁকি বাড়ায়, আর বেশি লবণ খাওয়ার সঙ্গে পাকস্থলীর ক্যানসার, স্থূলতা, অস্টিওপোরোসিস ও কিডনি রোগেরও যোগ পাওয়া গেছে। উচ্চ রক্তচাপ বা কিডনি রোগ থাকলে, কিংবা চিকিৎসকের দেওয়া খাদ্যতালিকা মেনে চললে, কতটা লবণ খাওয়া চলবে তা চিকিৎসকের কাছ থেকে জেনে নিন।
ছবি: রিজওয়ান আহমেদ / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, বাংলাপিডিয়া (পহেলা বৈশাখ; ইলিশ; শুটকি; কার্প; মাছ; সরিষা), ঢাকা ট্রিবিউন, ঢাকা পোস্ট, সারাবাংলা, দ্য ডেইলি অবজারভার, যুগান্তর, বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস), প্রথম আলো, ফিশবেস, উইকিপিডিয়া (পান্তা ভাত), বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও), যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসন (এফডিএ)





মন্তব্য
(০)