অগ্রহায়ণের শেষ, শীত নামছে। দেশের মাঠে মাঠে কৃষক বোরো ধানের প্রস্তুতি নিচ্ছেন: বীজতলায় চারা বড় হচ্ছে, সেচের নালা তৈরি হচ্ছে, আর রোপণের মৌসুমে শ্রমিক পাওয়া যাবে কি না, সেই দুশ্চিন্তাও শুরু হয়েছে। বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের (ব্রি) একজন বিজ্ঞানী ২০০৫ সালে দ্য ডেইলি স্টারে লিখেছিলেন, বোরো মৌসুমে ড্রাম সিডারে বীজ বোনার সবচেয়ে ভালো সময় ১ থেকে ১৫ ডিসেম্বর। অর্থাৎ ২০২৪ সালের এই ডিসেম্বরের মাঝামাঝিই সেই সময়।
ড্রাম সিডার প্লাস্টিকের তৈরি হালকা একটি বপন যন্ত্র। এটি দিয়ে কাদা করা জমিতে অঙ্কুরিত ধানবীজ সোজা সারিতে সরাসরি বোনা যায়; বীজতলা করা, চারা তোলা আর রোপণ, এই তিনটি কাজই বাদ পড়ে। এই প্রতিবেদনে ব্রি, আন্তর্জাতিক ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ইরি) এবং দেশের গবেষকদের প্রকাশিত তথ্য থেকে জানা যাবে যন্ত্রটি কীভাবে কাজ করে, বোরো মৌসুমে কেন এটি বেশি উপযোগী, বীজ ও শ্রম কতটা বাঁচে, ধাপে ধাপে কীভাবে বুনতে হয় এবং কোন সতর্কতা মানতে হয়।
বোরো মৌসুম: দেশের ধানের বড় অংশ, আর রোপণের বড় চাপ
বোরো শুকনো মৌসুমের সেচনির্ভর ধান। জাতীয় জ্ঞানকোষ বাংলাপিডিয়ার তথ্যে, ২০০৯-১০ সালে দেশের মোট ধানি জমির ৪১ শতাংশে বোরোর চাষ হয়েছিল, আর উফশী বোরো কাটা হয় মে-জুনে। বাংলাপিডিয়া আরও উল্লেখ করেছে, শুকনো মৌসুমে সেচ দিয়ে উফশী বোরো চাষ ছড়িয়ে পড়ায় গভীর পানির ধানের জমি কমে প্রায় ০.৮৫ মিলিয়ন হেক্টরে নেমেছে।
উৎপাদনের হিসাবেও বোরো এগিয়ে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য উদ্ধৃত করে দ্য ডেইলি স্টার জানায়, ২০২২-২৩ অর্থবছরে দেশে রেকর্ড ৩.৯১ কোটি টন চাল উৎপাদিত হয়, যার মধ্যে বোরো মৌসুম থেকেই আসে ২.০৭ কোটি টন; বোরোর উৎপাদন আগের বছরের চেয়ে ৩ শতাংশ বেশি ছিল। ২০২৪ সালের ৫ মে দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসে কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্যে বলা হয়, সেই মৌসুমে সারা দেশে ৫.০৫৮ মিলিয়ন হেক্টর জমিতে বোরো চাষ হয়েছে, যা আগের বছরের চেয়ে ২০ হাজার হেক্টরের বেশি; উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২২.২ মিলিয়ন টন। এর মধ্যে সাত জেলার হাওরেই বোরো হয়েছিল ৪ লাখ ৫৩ হাজার ৪০০ হেক্টরে।
এত বড় আবাদের প্রায় পুরোটাই হয় চারা রোপণ করে। প্রথমে বীজতলায় চারা তৈরি হয়, তারপর চারা তুলে কাদা জমিতে হাতে লাগানো হয়। ২০২৪ সালের জুনে প্রকাশিত সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ও বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বারি) গবেষকদের একটি গবেষণাপত্রে বলা হয়েছে, হাতে রোপণে প্রচুর শ্রমিক লাগে, কাজটি কষ্টকর, আর বাংলাদেশে প্রধান সমস্যা হলো ভরা মৌসুমে শ্রমিক না পাওয়া; ফলে বেশি মজুরিতে শ্রমিক নিতে হয় এবং উৎপাদন খরচ বেড়ে যায়।
শীতও বোরোর বীজতলার জন্য ঝুঁকি। ২০১৯ সালের ১৮ ডিসেম্বর দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড জানায়, হঠাৎ শীতে চারার ক্ষতি হতে পারে বলে কৃষি কর্মকর্তারা কৃষকদের রাতে বোরো বীজতলা পলিথিন দিয়ে ঢেকে রাখার পরামর্শ দিয়েছিলেন। ২০১৮ সালের জানুয়ারিতে দ্য ডেইলি স্টার লালমনিরহাট থেকে জানায়, ঘন কুয়াশা ও দীর্ঘ শীতে বোরো বীজতলার চারার ক্ষতি হয়েছে; একজন কৃষক বলেন, তাঁর আট শতক বীজতলার অর্ধেক চারা নষ্ট হয়েছে। জেলা কৃষি বিভাগ তখন জানিয়েছিল, জেলায় ৩ হাজার ৪৯৫ হেক্টরে বোরো বীজতলা ছিল।
ড্রাম সিডার কী এবং কীভাবে কাজ করে
ব্রির ফ্যাক্ট শিটে ড্রাম সিডারকে বলা হয়েছে প্লাস্টিকের তৈরি একটি আধুনিক বপন যন্ত্র, যা দিয়ে কাদা মাটিতে অঙ্কুরিত বীজ সারিতে সরাসরি বোনা যায় এবং যা ধান চাষের একটি বিকল্প ও উন্নত পদ্ধতি। ব্রি ২০০৩ সালে বাংলাদেশে যন্ত্রটি প্রবর্তন করে।
২০০৫ সালে দ্য ডেইলি স্টারে প্রকাশিত লেখায় ব্রির তৎকালীন মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মোশাররফ হোসেন যন্ত্রটির বিবরণ দেন। উচ্চ ঘনত্বের প্লাস্টিকের তৈরি এই যন্ত্রে ছয় থেকে আটটি ড্রাম থাকে, প্রতিটির ব্যাস ১৬ সেন্টিমিটার। প্রতিটি ড্রামের দুই পাশে এক জোড়া করে সারিতে ৮-৯ মিলিমিটার ব্যাসের ছিদ্র থাকে। খালি অবস্থায় যন্ত্রটির ওজন মাত্র ৬ কেজির মতো, অঙ্কুরিত বীজ ভরলে ১৮-২০ কেজি।
ড্রামগুলো একটি কেন্দ্রীয় দণ্ডে বসানো থাকে। ইরির সাময়িকী রাইস টুডে ২০০৫ সালের সেপ্টেম্বরে ব্যাখ্যা করে, একজন মানুষ স্বাভাবিক হাঁটার গতিতে যন্ত্রটি টেনে নিলে ড্রাম ঘোরে এবং ছিদ্র দিয়ে অঙ্কুরিত বীজ কাদা মাটির ওপর সারি ধরে পড়ে। ব্রির ফ্যাক্ট শিট অনুযায়ী, ছয়টি ড্রামে বীজ ভরে একসঙ্গে ১২ লাইনে বীজ বোনা যায়।
রাইস টুডের তথ্যে, যন্ত্রটির মূল নকশা ইরির; পরে ভিয়েতনামের গবেষক ও নির্মাতারা এর ওজন ও দাম অনেক কমান এবং ব্যবহার সহজ করেন। ২০০৫ সালে এর দাম ছিল প্রায় ৪০ মার্কিন ডলার, আর একটি যন্ত্র টিকত ছয় থেকে আট বছর।
দেশেই কম দামে যন্ত্রটি বানানোর চেষ্টাও হয়েছে। ২০২৪ সালের জুনে সিআইজিআর জার্নালে প্রকাশিত গবেষণায় সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, বারি ও বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা স্থানীয় বাজারের উপকরণে একটি ড্রাম সিডার তৈরির বিবরণ দেন। এতে ছয়টি ড্রাম, প্রতিটি ৩০ সেন্টিমিটার লম্বা ও ১৭.৭৮ সেন্টিমিটার ব্যাসের; দুই সারির মধ্যে দূরত্ব ২০ সেন্টিমিটার, কাজের প্রস্থ ২.৪ মিটার, আর ওজন মাত্র ১৫ কেজি। গবেষণাপত্রের সারসংক্ষেপে যন্ত্রটি তৈরির মোট খরচ ১৮.১৫ মার্কিন ডলার বলা হয়েছে, যা গবেষকদের মতে কৃষকের কাছে গ্রহণযোগ্য।
বোরো মৌসুমে কেন ড্রাম সিডার বেশি উপযোগী
ড. মোশাররফ হোসেন লিখেছেন, ড্রাম সিডার বোরো মৌসুমের জন্য সবচেয়ে উপযোগী, কারণ এই মৌসুমে পানি ব্যবস্থাপনা কৃষকের নিজের নিয়ন্ত্রণে থাকে। বোনার পর প্রথম কয়েক দিন জমিতে দাঁড়ানো পানি রাখা যায় না, আবার পরে চাহিদামতো সেচ দিতে হয়; শুকনো মৌসুমে সেচনির্ভর জমিতে এই নিয়ন্ত্রণ সহজ।
তাঁর হিসাবে বোরো মৌসুমে ড্রাম সিডারে বোনার সেরা সময় ১ থেকে ১৫ ডিসেম্বর, আর আমনে ১ থেকে ১৫ জুলাই। ব্রির ফ্যাক্ট শিটে আরও বলা হয়েছে, আমন মৌসুমে জমি তৈরির দিনই এবং বোরো মৌসুমে জমি তৈরির পরের দিন বীজ বোনা উত্তম।
নিচু বিল এলাকার জন্য ব্রির একটি বিশেষ পরামর্শ আছে। ফ্যাক্ট শিট অনুযায়ী, কার্তিক-অগ্রহায়ণে (নভেম্বর) পানি নেমে যাওয়ার পর আবর্জনা ও খড়কুটো সরিয়ে এবং মই দিয়ে বিনা চাষেও সেখানে সরাসরি বীজ বোনা যায়, আর এতেও ভালো ফলন পাওয়া যাচ্ছে। ব্রির আগাছা দমন বিষয়ক ফ্যাক্ট শিটে বলা হয়েছে, সাধারণত নিচু জমি ও এক ফসলি জমিতে আগাছা কম হয়, আর যে জমিতে আগাছা কম হয় সেখানেই ড্রাম সিডার পদ্ধতি ব্যবহার করতে হবে।
বোরোতে ফলনের তুলনাও আছে। ব্রির গবেষণা মাঠে একই জাত ড্রাম সিডারে বুনে এবং রোপণ করে মেলানো হয়। ব্রির ফ্যাক্ট শিটের সারণি অনুযায়ী বোরো মৌসুমের ফল ছিল এরকম:
- ব্রি ধান২৮: বপনে হেক্টরে ৬.০০ টন, রোপণে ৫.০২ টন; ফলন বেশি ২০ শতাংশ। জীবনকাল বপনে ১৩০ দিন, রোপণে ১৪১ দিন; কমেছে ১১ দিন।
- ব্রি ধান২৯: বপনে হেক্টরে ৭.১৪ টন, রোপণে ৬.০৩ টন; ফলন বেশি ১৮ শতাংশ। জীবনকাল বপনে ১৫২ দিন, রোপণে ১৬২ দিন; কমেছে ১০ দিন।
- ব্রি ধান৩৬: বপনে হেক্টরে ৬.৫১ টন, রোপণে ৫.৪৬ টন; ফলন বেশি ১৯ শতাংশ। জীবনকাল বপনে ১২৮ দিন, রোপণে ১৪১ দিন; কমেছে ১৩ দিন।
কৃষকের মাঠের ফলও উৎসাহজনক ছিল। ব্রির ফ্যাক্ট শিটে বলা হয়েছে, ২০০৪ সালের আমন এবং ২০০৪ ও ২০০৫ সালের বোরো মৌসুমে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে কৃষকের মাঠে পরীক্ষা করে দেখা গেছে, ড্রাম সিডারে বোনা ধানের ফলন গড়ে প্রায় ১৫ থেকে ২০ শতাংশ বেশি হয় এবং ধান ১০ থেকে ১২ দিন আগে কাটা যায়। ব্রির হিসাবে, রোপণের বদলে ড্রাম সিডারে আবাদ করলে বোরো মৌসুমে হেক্টরপ্রতি প্রায় ৮ হাজার টাকা এবং আমন মৌসুমে প্রায় ৬ হাজার টাকা বেশি মুনাফা সম্ভব। এসব হিসাব প্রায় দুই দশক আগের মাঠ পরীক্ষার; এখনকার খরচ ও দামে অঙ্কটি ভিন্ন হতে পারে।
বীজ ও শ্রমে কতটা সাশ্রয়
ড্রাম সিডারের সবচেয়ে বড় সুবিধা শ্রমে। ড. মোশাররফ হোসেন লিখেছেন, যেখানে চারা তোলা ও রোপণে এক হেক্টরে প্রায় ৪৫ জন শ্রমিক লাগে, সেখানে ড্রাম সিডারে মাত্র দুজনেই এক হেক্টরে বীজ বুনতে পারেন; দুজন মিলে দিনে এক হেক্টরের বেশি জমিতে বোনা শেষ করা যায়। রাইস টুডে ২০০৫ সালে একই কথা লিখেছে অন্যভাবে: এক হেক্টরে ধান রোপণে ৫০ শ্রমদিবস পর্যন্ত লাগতে পারে, আর ড্রাম সিডারে সরাসরি ভেজা বপনে লাগে বড়জোর ২ শ্রমদিবস।
বীজও কম লাগে। ড. মোশাররফ হোসেনের তথ্যে, ড্রাম সিডারের একক সরু সারিতে বুনলে হেক্টরে বীজ লাগে মাত্র প্রায় ২৫ কেজি, যা রোপণের জন্য কৃষকেরা সাধারণত যে পরিমাণ বীজ ব্যবহার করেন তার তিন ভাগের এক ভাগ। তাঁর হিসাবে শুধু বীজেই হেক্টরে প্রায় এক হাজার টাকা বাঁচে, আর উৎপাদন খরচ কমিয়ে কৃষক হেক্টরে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত বাড়তি আয় করতে পারেন।
ইরি ও ব্রির প্রথম মাঠ পরীক্ষাতেও লাভের চিত্র ছিল। রাইস টুডের তথ্যে, ২০০৩ সালের আমন মৌসুমে আন্তর্জাতিক কৃষি উন্নয়ন তহবিলের (ইফাদ) অর্থায়নে হওয়া সেই পরীক্ষায় রোপণের তুলনায় ড্রাম সিডারে বোনা ধানে গড়ে ১৮ শতাংশ বেশি ফলন হয়, খরচ কমে ৬ শতাংশ, ফসল গড়ে ১০ দিন আগে পাকে এবং মোট আয় হয় ২১ শতাংশ বেশি।
শরীরের কষ্টও কমে। ব্রির ফ্যাক্ট শিটে বলা হয়েছে, ড্রাম সিডারে বপন কৃষকের জন্য স্বাস্থ্যসম্মত একটি পদ্ধতি, কারণ এতে কাদা পানির মধ্যে কোমর বাঁকা করে অনেকক্ষণ ধরে চারা রোপণ করতে হয় না। ড. মোশাররফ হোসেনও লিখেছেন, ভরা অবস্থায় যন্ত্রটি হালকা বলে গড় স্বাস্থ্যের একজন কৃষক কোমর না বাঁকিয়েই এটি টানতে পারেন।
ব্রি ফ্যাক্ট শিটে সরাসরি বপনের প্রয়োজনের কারণও ব্যাখ্যা করেছে: দেশে আবাদি জমি প্রতি বছর প্রায় এক শতাংশ হারে কমছে, তাই সীমিত জমিতে হেক্টরপ্রতি ফলন বাড়াতে হবে; আবার অকৃষি খাতে কাজের সুযোগ বাড়ায় কৃষিতে শ্রমিকের ঘাটতি দেখা দিচ্ছে এবং মজুরি বেড়ে প্রচলিত পদ্ধতির ধান চাষ ব্যয়বহুল ও অলাভজনক হয়ে পড়ছে। ব্রির ভাষায়, ড্রাম সিডারে কাদা মাটিতে সরাসরি অঙ্কুরিত বীজ বপন একটি শ্রমসাশ্রয়ী প্রযুক্তি।

ধাপে ধাপে ড্রাম সিডারে বোরো ধান বপন
ড. মোশাররফ হোসেন ড্রাম সিডারে সরাসরি ভেজা বপনকে জ্ঞাননির্ভর প্রযুক্তি বলেছেন এবং ব্যবহারের আগে কৃষকের প্রশিক্ষণ নেওয়ার ওপর জোর দিয়েছেন। ব্রির ফ্যাক্ট শিট এবং ২০০৫ সালে তাঁর দেওয়া নির্দেশনা মিলিয়ে ধাপগুলো এরকম:
- জমি তৈরি: চাষ ও মই দিয়ে জমির আগাছা ও অন্যান্য আবর্জনা মাটিতে পচিয়ে নিন এবং জমি ভালো করে কাদা করুন।
- জমি সমান করা: জমি খুব যত্ন করে সমতল করুন। বোনার সময় জমিতে কোনো দাঁড়ানো পানি রাখা যাবে না।
- বীজ ভেজানো: ভালো ও মিশ্রণমুক্ত বীজ বেছে নিন। বীজ ২৪ ঘণ্টা পানিতে ডুবিয়ে রাখুন, তারপর জাগ দিন। ড. মোশাররফ হোসেনের তথ্যে, তাপমাত্রা ও মৌসুম অনুযায়ী জাগ দিতে ৩ থেকে ৫ দিন লাগে; শীতের বোরো মৌসুমে এ কথা মাথায় রাখা দরকার।
- অঙ্কুরের দৈর্ঘ্য: ভালোভাবে অঙ্কুরিত বীজ, যার শিকড় ৪-৫ মিলিমিটার লম্বা, ড্রাম সিডারে বোনার উপযোগী।
- ছায়ায় শুকানো: ড্রামে ভরার আগে অঙ্কুরিত বীজ ছায়াযুক্ত জায়গায় হালকা করে শুকিয়ে নিন; ব্রির ফ্যাক্ট শিটে প্রায় ২ ঘণ্টা, ড. মোশাররফ হোসেনের লেখায় ১-২ ঘণ্টা বলা হয়েছে। এতে বীজ ড্রামের ছিদ্র দিয়ে সমানভাবে পড়ে।
- ড্রাম ভরা: প্রতিটি ড্রামের দুই-তৃতীয়াংশ অঙ্কুরিত বীজে ভরুন, এক-তৃতীয়াংশ খালি রাখুন, যাতে বীজ সমানভাবে পড়ে। ড. মোশাররফ হোসেনের তথ্যে, ড্রাম একবার ভরলে প্রায় এক একর জমি বোনা যায়।
- বপন: ছয়টি ড্রামে বীজ ভরে যন্ত্রটি স্বাভাবিক হাঁটার গতিতে জমির এক মাথা থেকে অন্য মাথায় টেনে নিন; একবারে ১২ লাইনে বীজ পড়বে।
- সময়: বোরো মৌসুমে জমি তৈরির পরের দিন বপন উত্তম, আর ড. মোশাররফ হোসেনের হিসাবে বোরোতে বোনার সেরা সময় ১ থেকে ১৫ ডিসেম্বর।
বোনার পর কয়েকটি ঝুঁকি থাকে। ব্রির ফ্যাক্ট শিটে সতর্কতা হিসেবে এগুলো বলা হয়েছে:
- বোনার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ভারী বৃষ্টি হলে বীজ এলোমেলো হয়ে যেতে পারে।
- জমি অসমান হলে কিংবা জমিতে পানি জমে থাকলে অঙ্কুর পচে যেতে পারে।
- ঠিকমতো অঙ্কুর না গজালে বীজ বেশি লাগে এবং চারা সমানভাবে গজায় না।
- যে জমিতে বেশি আগাছা জন্মে, সেখানে আগাছানাশক ব্যবহার জরুরি হয়ে পড়ে।
- বোনার পর প্রথম সাত দিন পাখি এবং হাঁস-মুরগির উপদ্রব হতে পারে।

বোনার পর পানি, সার ও আগাছা ব্যবস্থাপনা
রোপা ধানের জমির মতো শুরুতেই পানি ধরে রাখা যাবে না। ব্রির ফ্যাক্ট শিট অনুযায়ী, বপনের প্রাথমিক অবস্থায় মাটিতে দাঁড়ানো পানির প্রয়োজন নেই; মাটি রসালো রাখতে হবে এবং চারা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ধীরে ধীরে সেচের পরিমাণ বাড়াতে হবে। ড. মোশাররফ হোসেন লিখেছেন, বোনার পর পাঁচ দিন পর্যন্ত সেচের দরকার নেই; এরপর মাটি ভেজা রাখতে হবে, আর ধান গাছের বৃদ্ধির জন্য পরে জমিতে ৫-৭ সেন্টিমিটার দাঁড়ানো পানি রাখতে হবে।
সারের বিষয়ে ব্রি বলছে, অনুমোদিত মাত্রায় সার ব্যবহার করতে হবে, আর নাইট্রোজেন সার, অর্থাৎ ইউরিয়া, কখন দিতে হবে তা ঠিক করতে লিফ কালার চার্ট (এলসিসি) ব্যবহার করা যেতে পারে। নিজের জমির মাটি ও বোরোর জাত অনুযায়ী সারের সঠিক মাত্রা উপজেলা কৃষি অফিস থেকে জেনে নেওয়া উচিত।
আগাছাই এই পদ্ধতির প্রধান সমস্যা। ব্রির আগাছা দমন বিষয়ক ফ্যাক্ট শিটে বলা হয়েছে, কাদা জমিতে বীজ বোনার পর কিছুদিন পানি দেওয়া হয় না বলে আগাছা বেশি হয়; চারা বড় হওয়ার পর দাঁড়ানো পানি রাখলে আগাছা কমে। আগাছা সমস্যা এলাকাভিত্তিক; সব অঞ্চলে ও সব জমিতে এর উপদ্রব সমান নয়।
প্রতিরোধের জন্য ব্রি কয়েকটি পরোক্ষ উপায়ের কথা বলেছে: অন্য জাত ও আগাছার বীজমুক্ত ভালো বীজ ব্যবহার, যে জমিতে আগাছা কম জন্মে তা বাছাই, সময়মতো চাষ ও মই দিয়ে আগাছা পচিয়ে জমি তৈরি, আর ঘন ফসল নিশ্চিত করে ফাঁকা জায়গা চারা দিয়ে ভরে দেওয়া। ঘন ধানের জমিতে আগাছা কম হয়।
প্রত্যক্ষ দমনের মধ্যে হাতে নিড়ানি সবচেয়ে কার্যকর, তবে সময়সাপেক্ষ ও ব্যয়বহুল; ব্রির মতে দুই-তিনটি নিড়ানিই যথেষ্ট। সারিতে বোনা ধানে যান্ত্রিক নিড়ানিও চলে: ব্রি জানিয়েছে, ড্রাম সিডারের সারির সঙ্গে মিলিয়ে ১২ সেন্টিমিটার প্রস্থের ব্রি উইডার তৈরি করা হয়েছে, যা দিয়ে সহজে আগাছা দমন করা যায়। ব্রির ফ্যাক্ট শিটে উল্লেখ আছে, গাজীপুরের বোর্ড বাজার এলাকার কৃষকেরা ড্রাম সিডারে বোনা ধানে মাত্র দুটি হাত নিড়ানি দিয়েই সুফল পেয়েছেন।
আগাছানাশকের ক্ষেত্রে ব্রির ফ্যাক্ট শিটে বলা হয়েছে, প্রতি ৫ শতক জমিতে ১০ লিটার পানিতে ২০-২৫ মিলিলিটার রনস্টার অথবা ১০-১২ মিলিলিটার রিফিট মিশিয়ে প্রয়োগ করা যায়। বোরো মৌসুমে বপনের ৭ থেকে ১০ দিনের মধ্যে, জমিতে ছিপছিপে দাঁড়ানো পানি থাকা অবস্থায় এটি প্রয়োগ করতে হয় এবং এর পরও ৪-৫ দিন ছিপছিপে পানি রাখতে হয়; আউশ ও আমনে বপনের ৪-৫ দিনের মধ্যে প্রয়োগ ভালো। ব্রি সতর্ক করেছে, আগাছানাশক সাবধানে ব্যবহার করতে হবে এবং সময়, মাত্রা ও পানি ব্যবস্থাপনা এখানে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। প্রয়োগের আগে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার পরামর্শ নেওয়া এবং বোতলের লেবেলের নির্দেশনা মেনে চলা উচিত।
বাংলাদেশে ড্রাম সিডারের দুই দশক
ড্রাম সিডার বাংলাদেশে প্রথম পরীক্ষা করা হয় ২০০৩ সালের আমন মৌসুমে, গাজীপুরে ব্রির অভিযোজন গবেষণা বিভাগের বিজ্ঞানীদের হাতে। রাইস টুডের তথ্যে, ইরি ও ব্রির যৌথ সেই উদ্যোগে নেতৃত্বে ছিলেন ইরির এম. জয়নুল আবেদীন, আর মাঠে তা বাস্তবায়ন করেন ড. মোশাররফ হোসেন ও অংশগ্রহণকারী কৃষকেরা। ড. মোশাররফ হোসেন লিখেছেন, ২০০৪ সালে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (ডিএই) প্রায় আড়াই হাজার ড্রাম সিডার আমদানি করে এবং ২০০৫ সালের বোরো মৌসুমে প্রায় ৩০০ উপজেলায় পৌঁছে দেয়।
শুরুর দিকে সব যন্ত্রই ছিল আমদানি করা। যুক্তরাজ্যের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন বিভাগের অর্থায়নে বরেন্দ্র অঞ্চলে সরাসরি বপন নিয়ে কাজ করা একটি গবেষণা প্রকল্পের ২০০৬ সালের জানুয়ারির চূড়ান্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, তখন দেশে যত ড্রাম সিডার ছিল, সবই মূল্যায়নের জন্য কৃষি মন্ত্রণালয় আমদানি করেছিল, এবং শিগগিরই ২ হাজার থেকে আড়াই হাজার টাকায় দেশে তৈরি যন্ত্র পাওয়া যাবে বলে আশা করা হচ্ছিল। ব্রির ফ্যাক্ট শিটে বলা হয়েছে, ড্রাম সিডার এখন বাংলাদেশেই তৈরি হচ্ছে; আমদানির পাশাপাশি দেশে তৈরি হওয়ায় সরাসরি বপন পদ্ধতি দ্রুত জনপ্রিয় হচ্ছে।
তবে ব্যবহার এখনো সীমিত। ২০২৪ সালের জুনের সিআইজিআর জার্নালের গবেষণাপত্রে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে ড্রাম সিডার ব্যবহৃত হলেও তা খুবই সীমিত পরিসরে; দেশে ড্রাম সিডারের সংখ্যা কম, আর একেকটি যন্ত্রের দাম বেশি হওয়ায় কৃষকেরা ব্যবহারে আগ্রহী হন না। রাইস টুডেও ২০০৫ সালে লিখেছিল, পরীক্ষায় অংশ নেওয়া কৃষকেরা যন্ত্র কেনার খরচ, যন্ত্র পাওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং আগাছা দমনকে বাধা হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন।
সরকারের যান্ত্রিকীকরণ উদ্যোগেও বপন যন্ত্র আছে। দ্য ডেইলি স্টার জানায়, কৃষি মন্ত্রণালয় ২০২১ সালের ৬ এপ্রিল ৩ হাজার ২০ কোটি টাকার পাঁচ বছর মেয়াদি খামার যান্ত্রিকীকরণ প্রকল্প শুরু করে, যার আওতায় ৫১ হাজার ৩০০টি কৃষিযন্ত্র বিতরণের কথা; হাওর ও উপকূলীয় জেলায় ৭০ শতাংশ এবং অন্যান্য এলাকায় ৫০ শতাংশ ভর্তুকিতে। কম্বাইন হারভেস্টার, রিপার ও রাইস ট্রান্সপ্লান্টারের পাশাপাশি সিডার বা বপন যন্ত্রও এর তালিকায় ছিল। কোন বপন যন্ত্র কোথায় ভর্তুকিতে পাওয়া যায়, তা উপজেলা কৃষি অফিস থেকে জানা যায়।
সরাসরি বপন নিয়ে আগ্রহ নতুন করে বাড়ছে পানির কারণেও। ২০২৪ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর ইরির এক প্রতিবেদনে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য উদ্ধৃত করে বলা হয়, বিশেষ করে উত্তরাঞ্চলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর বছরে প্রায় ৫০.৮ সেন্টিমিটার করে নামছে। ইরি জানায়, রংপুর ও রাজশাহী অঞ্চলে তাদের স্কেলডাইরেক্ট প্রকল্প উন্নত জাত, যন্ত্রে বপন ও উন্নত আগাছা ব্যবস্থাপনা মিলিয়ে সরাসরি বপনের প্রসার ঘটাচ্ছে; রাজশাহীর তানোর উপজেলার দুবইল গ্রামে ২০২৪ সাল পর্যন্ত দশজন কৃষক এই প্রযুক্তি গ্রহণ করেছেন।
ড্রাম সিডার নিয়ে পরামর্শ কোথায় পাবেন
ড্রাম সিডারে বোরো আবাদের আগে যন্ত্র কোথায় পাওয়া যায়, প্রশিক্ষণ কোথায় হয়, আর নিজের এলাকার জমিতে পদ্ধতিটি চলবে কি না, তা জানতে কৃষক ডিএইর উপজেলা কৃষি অফিস বা ইউনিয়নের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন। ব্রির ফ্যাক্ট শিটে আরও তথ্যের জন্য পরিচালক (গবেষণা), ব্রি, গাজীপুর-১৭০১ ঠিকানার উল্লেখ আছে।
ব্রির ফ্যাক্ট শিটের সারকথাও মনে রাখার মতো: উন্নত মানের মিশ্রণমুক্ত বীজ, ভালোভাবে তৈরি জমি এবং সুষ্ঠু পানি ব্যবস্থাপনা ধানক্ষেত আগাছামুক্ত রাখতে সাহায্য করে।

ছবি: AbuSayeed / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: দ্য এগ্রো নিউজ (নিজস্ব প্রতিবেদক), বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি) ফ্যাক্ট শিট ও রাইস নলেজ ব্যাংক, আন্তর্জাতিক ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ইরি) ও রাইস টুডে, দ্য ডেইলি স্টার, দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস, দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, সিআইজিআর জার্নাল (সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, বারি ও বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা), যুক্তরাজ্যের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন বিভাগের গবেষণা প্রকল্প প্রতিবেদন, বাংলাপিডিয়া




মন্তব্য
(০)