রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলাকে স্থানীয়ভাবে ‘টমেটোর রাজ্য’ বলা হয়। জাগো নিউজ ২৪-এর রাজশাহী জেলা প্রতিনিধি সাখাওয়াত হোসেন ২০২৫ সালের ২০ জানুয়ারি জানান, প্রতিবেদন অনুযায়ী সারাদেশের টমেটো উৎপাদনের বেশিরভাগই হয় রাজশাহীতে, আর জেলার মধ্যে সবচেয়ে বেশি হয় গোদাগাড়ীতে। গত সাত বছরে সেখানে টমেটো চাষে ‘নীরব বিপ্লব’ ঘটলেও চাষের জমি বাড়েনি। কৃষকদের ভাষ্য, বছরভেদে দামের ওঠানামার কারণে তারা এই ফসলে থিতু হতে পারছেন না।
গোদাগাড়ী রাজশাহী জেলার একটি উপজেলা, আয়তন ৪৭৫.২৬ বর্গকিলোমিটার। এখানে মহানন্দা নদী পদ্মায় মিশেছে, আর উপজেলার দক্ষিণে ভারতের সীমান্ত। ২০২২ সালের জনশুমারিতে এর জনসংখ্যা ছিল ৩ লাখ ৭৬ হাজার ৩৮৬। উপজেলায় নয়টি ইউনিয়ন রয়েছে, যার একটি গোগ্রাম। ২০২১ সালের জানুয়ারিতে দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডও লিখেছিল, দেশে সবচেয়ে বেশি টমেটো উৎপাদন হয় গোদাগাড়ীতে এবং প্রতি বছর সেখানে আড়াই হাজার হেক্টরের বেশি জমিতে টমেটো চাষ হয়।

সাত বছরে আবাদ ও উৎপাদন
রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) তথ্য অনুযায়ী গোদাগাড়ীতে টমেটোর আবাদ ও উৎপাদন ছিল এরকম:
- ২০১৮-১৯ অর্থবছর: ২,৬৫০ হেক্টর, উৎপাদন ৫৮ হাজার ৫৯৫ মেট্রিক টন
- ২০১৯-২০ অর্থবছর: ২,১৫০ হেক্টর, উৎপাদন ৪৯ হাজার ৫২৫ টন
- ২০২০-২১ অর্থবছর: ২,৪৬০ হেক্টর, উৎপাদন ৫৯ হাজার ৪০ টন
- ২০২১-২২ অর্থবছর: ২,৮৫০ হেক্টর, উৎপাদন ৭১ হাজার ২৫০ টন
- ২০২২-২৩ অর্থবছর: ৩,০১৫ হেক্টর, উৎপাদন ৮৭ হাজার ৪৩৫ টন
- ২০২৩-২৪ অর্থবছর: ২,২৪৫ হেক্টর, উৎপাদন ৬৫ হাজার ১০৫ টন
- ২০২৪-২৫ অর্থবছর: ২,৬৭০ হেক্টর, উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ৭৪ হাজার ৭৬০ টন
প্রথম আলো ২০২২ সালের ডিসেম্বরে জানিয়েছিল, সেই মৌসুমে গোদাগাড়ীতে ৩,০১৫ হেক্টর জমিতে টমেটো লাগানো হয়, যা আগের বছরের চেয়ে বেশি, এবং উপজেলায় সবজির মধ্যে টমেটোই সবচেয়ে বেশি চাষ হয়। জাগো নিউজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ মৌসুমে সরাসরি টমেটো চাষের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন আট হাজার কৃষক।

জমিতেই বিক্রি, বেশিরভাগ হাইব্রিড জাত
সংশ্লিষ্টরা জাগো নিউজকে জানান, গোদাগাড়ীর টমেটো জমি থেকেই বিক্রি হয়ে যায়। উৎপাদন ও বিক্রির ব্যবস্থা সহজ হওয়ায় কৃষকেরা টমেটো চাষে ঝুঁকছেন। সাধারণত আউশ ধান কাটার পর টমেটোর চাষ শুরু হয়; আউশ বাংলার গ্রীষ্মকালীন ধান। উপজেলায় ১৭ থেকে ২০টি জাতের টমেটো চাষ হয়, যার বেশিরভাগই হাইব্রিড। অন্য মাঠ ফসলের চেয়ে টমেটো অনেক বেশি লাভজনক হলেও ফলন, বীজ ও দাম নিয়ে লোকসানের ভয়ে কোনো বছর চাষ বেড়েছে, কোনো বছর কমেছে।
টমেটো (Solanum lycopersicum) বেগুন ও আলুর গোত্র সোলানেসির উদ্ভিদ; এর আদি নিবাস দক্ষিণ আমেরিকার পশ্চিমাঞ্চল। দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের ২০২১ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী গোদাগাড়ীর কৃষকেরা সাধারণত ভিএল-৬৪২ জাতের হাইব্রিড বীজ ব্যবহার করেন এবং এতে সাধারণ জাতের চেয়ে ১০ থেকে ২০ শতাংশ বেশি ফলন পান। তখন প্রাণ-আরএফএল গোদাগাড়ীর আট হাজার কৃষকের সঙ্গে চুক্তিভিত্তিক টমেটো চাষে কাজ করছিল।

কৃষক ও ব্যবসায়ীদের অভিজ্ঞতা
গোদাগাড়ীর হেলিপ্যাড এলাকার কৃষক নাইমুল ইসলাম জাগো নিউজকে বলেন, ‘গোদাগাড়ীতে আগের মতো টমেটো চাষ নেই। এখন যা হয় সব মাঠেই বিক্রি হয়ে যায়। আগে তো মাঠের পাশেই অনেক টমেটো দেখা যেত। এখন সেখানে দেখা যায় না। তবে চাষ আছে। মানুষ চাষ করছে। ব্যবসায়ীরা জমিতে থেকেই টমেটো কিনে নেন। লাভও হচ্ছে।’
গোগ্রাম এলাকার চাষি বিভূতি ভূষণ বলেন, ‘আমি কয়েক বছর ধরেই টমেটো চাষ করছি। গতবছর তেমন দাম পাইনি। এজন্য এবার অল্প পরিমাণ জমিতে চাষ করেছি। বাকিটাতে সরিষার আবাদ করেছি। তবে সিজন তো এখন শেষ। ভালোই দাম পেয়েছি।’
কৃষক আব্দুল হাদি জানান, সেবার তিনি ৬৪২ জাতের টমেটো চাষ করেছিলেন; অনেকে অন্য জাতও লাগিয়েছিলেন। তার ভাষ্য, সে বছর গাছে তুলনামূলক কম টমেটো ধরেছিল, ফলন ভালো হয়নি, তবে দাম মোটামুটি ভালো ছিল।
টমেটো ব্যবসায়ী শামসুল আলম বাবু জানান, গোদাগাড়ীর টমেটো এক বছর ভালো গেলে পরের বছর খারাপ যায়; বাজার, বীজ আর ফলনের ওপর নির্ভর করে চাষ কমে-বাড়ে। তিনি প্রতিদিন এক ট্রাক টমেটো ঢাকায় পাঠাচ্ছিলেন, আর এই টমেটো যাচ্ছিল ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট ও কুমিল্লায়। তার দাবি, সে বছর দাম বেশি থাকায় ব্যবসায়ীদের লোকসান হচ্ছিল।
কৃষি কর্মকর্তার হিসাব
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মরিয়ম আহমেদ জাগো নিউজকে বলেন, এই অঞ্চলে বছরে দুবার টমেটোর চাষ হয়, যার মধ্যে গ্রীষ্মকালীন টমেটোও আছে, আর এই টমেটোতে চাষিরা বেশি দাম পান। তার হিসাবে সে বছর এই টমেটো বাজারে কেজিপ্রতি ১৫ থেকে ১৬০ টাকা দরে বিক্রি হয়েছিল।
তিনি আরও বলেন, গড়ে ১৫ টাকা কেজি ধরে বিক্রি হলে টমেটো থেকে আয় হবে ১১২ কোটি ১৪ লাখ টাকা। টমেটো বেচাকেনাকে কেন্দ্র করে অস্থায়ীভাবে ৮ থেকে ৯ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে বলেও জানান তিনি।
ছবি: Jubair Bin Iqbal / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, প্রথম আলো, দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, উইকিপিডিয়া (গোদাগাড়ী উপজেলা; টমেটো; ধান)





মন্তব্য
(০)