ঈদুল আজহা সামনে রেখে নরসিংদী সদর উপজেলার করিমপুর ইউনিয়নের একটি পশুর হাটে ২০২৬ সালের ২৭ মে বুধবার ক্রেতা-বিক্রেতাদের ব্যাপক ভিড় দেখা যায়। এই হাটে পশু বিক্রির জন্য বিক্রেতাদের কোনো খাজনা বা হাসিল দিতে হয় না। প্রতিবছর করিমপুর ফুটবল মাঠে বসা এই অস্থায়ী হাট সেদিন গরু, মহিষ ও ছাগলে ভরে ওঠে বলে সেদিন বিকেলে জাগো নিউজের নরসিংদী জেলা প্রতিনিধি জানান। বাংলাদেশে সে বছর পবিত্র ঈদুল আজহা পালিত হওয়ার কথা ছিল ২৮ মে।
জাগো নিউজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, হাটটি জেলার অন্যতম পরিচিত ও ঐতিহ্যবাহী পশুর হাট। এর বড় বৈশিষ্ট্য হলো, এখানে পশু বিক্রির বিপরীতে বিক্রেতাদের কোনো ধরনের হাসিল বা খাজনা দিতে হয় না। দেশের পশুর হাটে সাধারণত প্রতিটি পশু বিক্রির সময় এই হাসিল আদায় করা হয়। ফলে অতিরিক্ত ব্যয়ের চাপ ছাড়াই বিক্রেতারা পশু বিক্রি করতে পারেন, আর ক্রেতারাও তুলনামূলক কম দামে পশু কেনার সুযোগ পান। ২০২৬ সালে করিমপুর প্রবাসী ঐক্য ফোরামের উদ্যোগে এবং স্থানীয় ছাত্রসমাজের সহযোগিতায় হাটটির আয়োজন করা হয়।
আয়োজকরা জানান, সরকারি প্রায় ৮০ হাজার টাকা ইজারা নিজেরা পরিশোধ করে হাটটিকে খাজনামুক্ত রাখা হয়েছে। হাটে বিভিন্ন জাতের ছোট, মাঝারি ও বড় আকারের গরু, মহিষ ও ছাগল বিক্রির জন্য তোলা হয়।
করিমপুর মাঠে ভিড়ের দিন
হাট সংশ্লিষ্টরা জানান, অন্যান্য বছরের তুলনায় সে বছর হাটে পশুর সংখ্যা বেশি ছিল। ক্রেতা ও বিক্রেতাদের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়। এর মধ্যে ছিল ব্যাংকিং সুবিধা, টাকা নিরাপদে রাখার জন্য লকার ব্যবস্থা এবং জাল নোট শনাক্তের মেশিন। এসব ব্যবস্থার কথা নিচে আলাদা করে বলা হয়েছে।
হাটে গরু কিনতে আসা সাকিব মিয়া জানান, তাঁর বাসা মহিষাসুরা এলাকায়। তিনি বলেন, "আমাদের এলাকাতেও হাট আছে, তারপরও আমি করিমপুরের এই হাটে এসেছি। এখানে সব সময় বিভিন্ন সাইজের পশু পাওয়া যায়। একটি গরু পছন্দ হয়েছে, দামাদামি চলছে। আর সবচেয়ে বড় বিষয় হলো গরু কিনলে কোনো খাজনা দিতে হয় না।"
আরেক ক্রেতা মাইনুদ্দিন বলেন, নরসিংদীর আর কোনো হাটে তিনি এত গরু-মহিষ দেখেননি। তাঁর ভাষায়, "এত পশু আগে কখনো দেখিনি। তবে দাম কিছুটা বেশি মনে হচ্ছে। আবার আবহাওয়াও ভালো না, তাই ঘুরে ঘুরে দেখতে কষ্ট হচ্ছে। পা ফেলার জায়গাও পাওয়া যাচ্ছে না।"
বিক্রেতা সোনা মিয়া জানান, তিনি প্রতিবছর এই হাটে গরু নিয়ে আসেন এবং বিক্রিও ভালো হয়। তিনি বলেন, "এবার চারটি গরু এনেছি। এর মধ্যে দুইটি বিক্রি হয়ে গেছে। বাকি দুইটিরও দামাদামি চলছে। আশা করছি বিক্রি হয়ে যাবে।"
করিমপুর হাটে কোন পশু কত দামে বিক্রি হয়েছে, জাগো নিউজের প্রতিবেদনে তা বলা হয়নি। দাম নিয়ে একমাত্র মন্তব্য ক্রেতা মাইনুদ্দিনের, যাঁর মনে হয়েছে দাম কিছুটা বেশি। ২৭ মের আগের কয়েক দিনে দেশের অন্য এলাকার প্রতিবেদনেও খরচের একই চাপের কথা এসেছিল। ২০২৬ সালের ২২ মে ঢাকা ট্রিবিউনে প্রকাশিত বাংলা ট্রিবিউনের একটি প্রতিবেদনে খামারিরা জানান, গোখাদ্য, শ্রমিক, বিদ্যুৎ ও পরিবহন খরচ বেড়েছে। আদিল ডেইরি ফার্মের মালিক আদিল হোসেন বলেন, যে মাঝারি আকারের গরু আগে এক লাখ টাকার কিছু বেশি দামে বিক্রি হতো, সেটির দাম এবার প্রায় দেড় লাখ টাকায় পৌঁছাতে পারে। ঢাকার এক খামারি জানান, ছোট গরুর চাহিদা বেশি, আর বড় গরু তুলনামূলক কম দামে বিক্রি হচ্ছে।

আট বছর ধরে খাজনামুক্ত
করিমপুর প্রবাসী ঐক্য ফোরামের সাকিল মাহমুদ বলেন, প্রতিবছরই এখানে খাজনাবিহীন পশুর হাট বসে। তাঁর কথায়, "এই বাজারটি সবার জন্য। ক্রেতা-বিক্রেতাদের সুবিধার কথা চিন্তা করেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়। আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতিও ভালো রয়েছে। জাল নোট শনাক্তের মেশিনসহ নানা ধরনের সুবিধা রাখা হয়েছে।"
করিমপুর ইউনিয়ন বিএনপির সদস্যসচিব মনিরুল ইসলাম মনির বলেন, গত আট বছর ধরে এই হাট সম্পূর্ণ খাজনামুক্ত রাখা হয়েছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, প্রতিবছর সরকারি ইজারা পরিশোধ করে প্রবাসী ঐক্য ফোরাম হাটটি পরিচালনা করে। তিনি জানান, হাটে ব্যাংকিং সুবিধা, টাকা রাখার জন্য লকার এবং জাল নোট শনাক্তকরণের ব্যবস্থা রয়েছে, আর দূর-দূরান্ত থেকে যাঁরা পশু নিয়ে এসেছেন তাঁদের থাকার ব্যবস্থাও করা হয়েছে।
তিনি বলেন, "এখন পর্যন্ত ২ হাজার পশু কেনাবেচা হয়ে গেছে, আশা করি ৩ হাজার পশু বিক্রি হবে। এবার অন্য বছরের তুলনায় অনেক বেশি পশু এসেছে।" এই সংখ্যাগুলো আয়োজকদের নিজস্ব হিসাব, যা প্রতিবেদনে উদ্ধৃত হয়েছে; হাটটির কোনো সরকারি হিসাব প্রকাশিত হয়নি।
হাসিল কী, আর খাজনামুক্ত হাট কেন গুরুত্বপূর্ণ
দেশের বেশির ভাগ পশুর হাট মৌসুমের জন্য ইজারা দেওয়া হয়। ইজারাদার হাটের মালিক কর্তৃপক্ষকে ইজারামূল্য পরিশোধ করেন এবং প্রতিটি পশু বিক্রির ওপর হাসিল আদায় করে সেই অর্থ তোলেন। ২০২৬ সালের ২৭ মে দুপুরে প্রকাশিত প্রথম আলোর চট্টগ্রামের পশুর হাট নিয়ে একটি প্রতিবেদনে বড় শহরে এই ব্যবস্থা কীভাবে চলে, তার একটি চিত্র পাওয়া যায়। সেখানে নগরের হাটগুলোর ইজারা দেয় সিটি করপোরেশন, আর কোরবানিতে পশুর চাহিদা নির্ণয় করে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর। পত্রিকাটি জানায়, ইজারাদারদের মূল আয় হাসিল আদায়; বিক্রি হওয়া পশুর দামের বিপরীতে ৫ শতাংশ হারে তাঁরা হাসিল আদায় করে থাকেন।
একই প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, সে বছর তিনটি স্থায়ী ও সাতটি অস্থায়ী হাট ইজারা দিয়ে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন রাজস্ব পেয়েছে ১৩ কোটি ১৯ লাখ টাকা। ইজারামূল্যের পাশাপাশি ইজারাদারদের ২৫ শতাংশ হারে সরকারকে ভ্যাট ও আয়কর দিতে হয়, আর হাট ব্যবস্থাপনায় খরচ হয় এক থেকে দেড় কোটি টাকা। প্রতিবেদনে বলা হয়, নগরের হাটে ৫০-৬০ হাজার টাকা দামের গরু যেমন আছে, তেমনি ৮-১০ লাখ টাকা দামের গরুও আছে; তবে মাঝারি আকারের গরুর চাহিদা বেশি। চট্টগ্রাম জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা মো. আলমগীরের মতে, নগরের হাটে বিক্রি হওয়া প্রতিটি গরুর গড় দাম এক লাখ টাকা।
এই প্রেক্ষাপটে করিমপুরের ব্যবস্থাটি প্রচলিত ধারার উল্টো। সেখানে ইজারাদার হাটে আসা ক্রেতা-বিক্রেতার কাছ থেকে ইজারার টাকা তোলেন না; আয়োজকদের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রায় ৮০ হাজার টাকার ইজারা তাঁরা নিজেরাই পরিশোধ করেন। ফলে বিক্রেতাদের বিক্রির ওপর কিছু দিতে হয় না, আর ক্রেতা সাকিব মিয়ার কথায়, গরু কিনলেও কোনো খাজনা দিতে হয় না।
সরকারও হাটের বেচাকেনা আর অন্যান্য মাধ্যমের মধ্যে পার্থক্য টেনেছিল। বাসসের খবর অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ৩ মে এক সংবাদ সম্মেলনে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী মোহাম্মদ আমিনুর রশিদ বলেন, অনলাইনে পশু কিনলে ক্রেতাদের হাসিল দিতে হবে না; হাসিল প্রযোজ্য হবে কেবল সরাসরি পশুর হাট থেকে পশু কিনলে।
লকার, ব্যাংকিং ও জাল নোট শনাক্তের ব্যবস্থা
ঈদুল আজহার আগে পশুর হাটে বিপুল পরিমাণ নগদ টাকার লেনদেন হয়। করিমপুরে আয়োজকরা জানান, তাঁরা ব্যাংকিং সুবিধা, ক্রেতা-বিক্রেতাদের টাকা নিরাপদে রাখার লকার এবং জাল নোট শনাক্তের বিশেষ মেশিনের ব্যবস্থা রেখেছেন।
সে বছর এ ধরনের যাচাই ছিল একটি জাতীয় পরিকল্পনার অংশ। দেশ রূপান্তরের খবর অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ১০ মে বাংলাদেশ ব্যাংকের কারেন্সি ম্যানেজমেন্ট বিভাগ সব তফসিলি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে চিঠি পাঠিয়ে কোরবানির পশুর হাটে জাল নোট প্রচলন চক্রের অপতৎপরতা রোধে ১০টি নির্দেশনা দেয়। এর প্রধান বিষয়গুলো ছিল:
- ঢাকা উত্তর ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন অনুমোদিত পশুর হাটে দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যাংকগুলো জাল নোট শনাক্তকরণ মেশিনের সহায়তায় অভিজ্ঞ ক্যাশ কর্মকর্তাদের দিয়ে হাট শুরুর দিন থেকে ঈদের আগের রাত পর্যন্ত বিরতিহীনভাবে পশু ব্যবসায়ী ও ক্রেতাদের বিনামূল্যে নোট যাচাইয়ের সেবা দেবে।
- ঢাকার বাইরে যেসব জেলায় বাংলাদেশ ব্যাংকের অফিস আছে, সেখানে সংশ্লিষ্ট সিটি করপোরেশন বা পৌরসভার অনুমোদিত হাটে বাংলাদেশ ব্যাংকের অফিসের নেতৃত্বে নেওয়া একই ধরনের ব্যবস্থায় ব্যাংকগুলোর আঞ্চলিক কার্যালয় ও প্রধান শাখা সহায়তা দেবে।
- বাংলাদেশ ব্যাংকের অফিস নেই এমন জেলার সিটি করপোরেশন, পৌরসভা ও থানা বা উপজেলার অনুমোদিত হাটে বিভিন্ন ব্যাংকের মধ্যে দায়িত্ব বণ্টনের ভার দেওয়া হয় সোনালী ব্যাংক পিএলসির চেস্ট শাখাগুলোকে; সেই বণ্টন অনুযায়ী ব্যাংকগুলোর জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের শাখা হাটে নোট যাচাইয়ের সেবা দেবে।
- হাটের বুথে নোট কাউন্টিং মেশিনে নগদ টাকা গোনার সুবিধা থাকবে, আর বুথে ব্যাংকের নাম ও 'জাল নোট শনাক্তকরণ বুথ' লেখা ব্যানার বা নোটিশ টানাতে হবে।
- বুথ বসাতে সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, উপজেলা নির্বাহী অফিসার, হাটের ইজারাদার এবং প্রয়োজনে নিরাপত্তার জন্য পুলিশ, বিজিবি, র্যাব ও আনসারের সঙ্গে যোগাযোগ করা যাবে; জাল নোট ধরা পড়লে ২০০৭ সালের একটি পরিপত্র অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে।
- ঈদের আগ পর্যন্ত প্রতি কর্মদিবসে পুরো ব্যাংকিং সময়ে শাখার টিভি মনিটরে ব্যাংক নোটের নিরাপত্তা বৈশিষ্ট্যের ভিডিও দেখাতে হবে, আর ঈদের পরের ৩০ কর্মদিবসের মধ্যে প্রতিটি ব্যাংককে কী করা হয়েছে তার প্রতিবেদন পাঠাতে হবে।
এসব যাচাইয়ের পাশাপাশি ডিজিটাল লেনদেনও বাড়ছিল। প্রথম আলো ২০২৬ সালের ২০ মে জানায়, বাংলাদেশ ব্যাংক ও প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের যৌথ উদ্যোগে বিভিন্ন জেলার খামারিদের 'স্মার্ট' হাট সেবার আওতায় আনা হয়েছে, যেখানে ডিজিটাল বুথে কার্ড বা মোবাইল আর্থিক সেবার মাধ্যমে ক্রেতা-বিক্রেতারা লেনদেন করতে পারেন। ঢাকাসহ দেশের পাঁচটি মহানগরীর ৩০টি হাটে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর অস্থায়ী ক্যাম্প বসানো হচ্ছিল, যেখানে জাল টাকা শনাক্তকরণ মেশিন, এটিএম বুথ ও ডিজিটাল ব্যাংকিং সুবিধা থাকার কথা। পত্রিকাটি জানায়, বাংলাদেশ ব্যাংকের উদ্যোগে ২০২২ সাল থেকে পশুর হাটে ডিজিটাল লেনদেন সেবা চালু হয়; প্রথম বছরে ঢাকার ছয়টি হাটে ছয়টি ব্যাংক অংশ নেয়, আর ২০২৫ সালে ঢাকা ও চট্টগ্রামের ১৯টি হাটে ১৪টি ব্যাংক অংশ নেয়। ওই বছর ক্যাশলেস লেনদেনের পরিমাণ ছিল ২০০ কোটি টাকার বেশি।
নরসিংদী সদর ও করিমপুর
নরসিংদী জেলা ঢাকা বিভাগের অন্তর্গত। বাংলাদেশের জাতীয় জ্ঞানকোষ বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী, জেলার আয়তন ১১৫০.১৪ বর্গকিলোমিটার। এর উত্তরে কিশোরগঞ্জ, দক্ষিণে নারায়ণগঞ্জ ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া, পূর্বে ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও কিশোরগঞ্জ এবং পশ্চিমে গাজীপুর জেলা। প্রধান নদী মেঘনা, পুরাতন ব্রহ্মপুত্র, আড়িয়াল খাঁ ও শীতলক্ষ্যা। নরসিংদী ছিল বৃহত্তর ঢাকা জেলার একটি মহকুমা, ১৯৮৪ সালে এটি জেলায় রূপান্তরিত হয়; জেলায় উপজেলা ছয়টি। ২০১১ সালের আদমশুমারিতে জেলার জনসংখ্যা ছিল ২২,২৪,৯৪৪ জন। পরিবারগুলোর আয়ের প্রধান উৎস কৃষি (৪২.৭৩ শতাংশ) ও ব্যবসা (১৭.৮৪ শতাংশ)।
করিমপুর যে উপজেলায়, সেই নরসিংদী সদর উপজেলার আয়তন ২১৩.৪৩ বর্গকিলোমিটার, প্রধান নদী মেঘনা; ২০১১ সালের আদমশুমারিতে জনসংখ্যা ছিল ৭,০৭,৫২৫ জন, জানায় বাংলাপিডিয়া। নরসিংদী থানা গঠিত হয় ১৯৩০ সালে, আর শহরটি পৌরসভা হয় ১৯৭২ সালে। উপজেলার ৫৫.৪৭ শতাংশ পরিবারের আয়ের প্রধান উৎস কৃষি এবং ১২.৭৪ শতাংশের ব্যবসা। প্রধান ফসল ধান, গম, সরিষা, পাট, আলু, রসুন ও শাকসবজি। উপজেলায় হাটবাজার আছে ২৭টি; এর মধ্যে মাধবদী হাট ও শেখের চর বাজারের সঙ্গে করিমপুর বাজারকেও উল্লেখযোগ্য হিসেবে নাম দিয়েছে বাংলাপিডিয়া। একই ভুক্তিতে উপজেলায় ২৫টি গবাদিপশুর খামার, ৫১১টি হাঁস-মুরগির খামার, ২২৫টি মৎস্য খামার এবং একটি পশু চিকিৎসা কেন্দ্রের কথা বলা হয়েছে।
হাটে ওঠা গরু, মহিষ ও ছাগল
অন্যান্য কোরবানির হাটের মতো করিমপুরেও মূল আকর্ষণ ছিল গরু। বাংলাপিডিয়ার গবাদিপশু ভুক্তি অনুযায়ী, বাংলাদেশের বেশির ভাগ গরু নির্দিষ্ট জাতবিহীন দেশি জেবু বা কুঁজওয়ালা বস ইন্ডিকাস ধরনের, যা একসঙ্গে দুধ, মাংস, হালচাষ এবং সার ও জ্বালানির জন্য গোবরের কাজে লাগে। দেশে এখনো নির্দিষ্ট কোনো গরুর জাত প্রতিষ্ঠিত হয়নি, তবে দীর্ঘ প্রাকৃতিক নির্বাচনের ফলে কয়েকটি উন্নত দেশি ধরন গড়ে উঠেছে: পাবনা গরু, রেড চিটাগং, মুন্সিগঞ্জ গরু ও নর্থ বেঙ্গল গ্রে। উৎপাদন বাড়াতে হলস্টেইন-ফ্রিজিয়ান, জার্সি ও শাহিওয়ালের মতো বিদেশি জাতের সঙ্গে দেশি গরুর সংকরায়ন করা হয়েছে। ভুক্তিতে বলা হয়, ঈদুল আজহার সময় দেশে মাংসের গরুর মৌসুমি চাহিদা তৈরি হয় এবং মানুষ সাধারণত সুস্থ-সবল পশু কোরবানি দিতে চান; কিছু খামারি এই বাজারের জন্য বাছুর ষাঁড় মোটাতাজা করেন, যেমন বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিএলআরআই) উদ্ভাবিত ইউরিয়া-মোলাসেস মেশানো খড় খাওয়ানোর পদ্ধতিতে।
করিমপুরের আয়োজকরা যে মহিষের কথা বলেছেন, সেটি গৃহপালিত জলমহিষ, বৈজ্ঞানিক নাম বুবালাস বুবালিস। বাংলাপিডিয়া জানায়, বাংলাদেশে মহিষের উল্লেখযোগ্য নিজস্ব কোনো জাত নেই; চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, রাজশাহী, রংপুর, দিনাজপুর ও বগুড়ার মতো জেলায় মহিষ মূলত হালচাষ ও গাড়ি টানার কাজে দেখা যায়। মহিষ পালনের প্রধান বাধা সবুজ ঘাসের অভাব, কারণ একটি মহিষের দিনে অন্তত ৩০ কেজি ঘাস লাগে।

কোরবানির ছোট পশু ছাগল। বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী, দেশের ছাগলের ৯০ শতাংশের বেশি ব্ল্যাক বেঙ্গল জাতের; বাকিগুলো মূলত যমুনাপারি ও তার সংকর। ৯০ শতাংশের বেশি ছাগল পালন করেন গ্রামের মানুষ, প্রায়ই নারী ও শিশুরা; পতিত জমি, আল, রাস্তার ধার ও বাঁধে চরে খেয়ে সামান্য বা কোনো বাড়তি খাবার ছাড়াই এরা বড় হয়। জাতটি দ্রুত প্রজননক্ষম হয়: মাদি ছাগল প্রায় ১২ মাস বয়সে প্রথম বাচ্চা দেয় এবং বছরে দুবার বা দুই বছরে তিনবার বাচ্চা দিতে পারে। প্রাপ্তবয়স্ক পাঁঠার ওজন ১৬ থেকে ১৮ কেজি, মাদির ১২ থেকে ১৪ কেজি; এর মাংস নরম ও সুস্বাদু হিসেবে এবং চামড়া উন্নত মানের হিসেবে পরিচিত।

২০২৬ সালে কোরবানির পশুর জাতীয় হিসাব
করিমপুরে ভিড় জমেছিল এমন এক বছরে, যখন সরকার জানিয়েছিল দেশে উৎসবের জন্য প্রয়োজনের চেয়ে বেশি পশু আছে। ঢাকা ট্রিবিউনের খবর অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ৩ মে সচিবালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী মোহাম্মদ আমিনুর রশিদ প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য উদ্ধৃত করে বলেন, কোরবানিযোগ্য পশু আছে ১,২৩,৩৩,৮৪০টি, বিপরীতে সম্ভাব্য চাহিদা ১,০১,০৬,৩৩৪টি; ফলে প্রায় ২২,২৭,৫০৬টি পশু উদ্বৃত্ত থাকতে পারে। এর মধ্যে গরু ও মহিষ ৫৬,৯৫,৮৭৮টি, ছাগল ও ভেড়া ৬৬,৩২,৩০৭টি এবং উট ও দুম্বার মতো অন্যান্য প্রজাতির পশু ৫,৬৫৫টি।
মন্ত্রী আগের বছরের সঙ্গেও তুলনা করেন। ২০২৫ সালের ঈদুল আজহায় মোট কোরবানিযোগ্য পশু ছিল ১,২৪,৪৭,৩৩৭টি; শুরুতে ২০,৬৮,০০০টির বেশি পশু উদ্বৃত্ত থাকবে বলে ধারণা করা হলেও প্রকৃত হিসাবে কোরবানি হয় ৯১,৩৬,৭৩৪টি পশু, উদ্বৃত্ত থাকে প্রায় ৩৩.১০ লাখ।
সরকারি তথ্যের ভিত্তিতে ২০২৬ সালের ২২ মে প্রকাশিত ঢাকা ট্রিবিউনের প্রতিবেদন এই সংখ্যাগুলোকে কয়েক বছরের ধারায় দেখায়। ২০২৩ সালে প্রায় ১ কোটি ২৫ লাখ পশু উৎপাদিত হয় এবং কোরবানি হয় প্রায় ১ কোটি; ২০২৪ সালে উৎপাদন ছিল ১ কোটি ২১ লাখ, কোরবানি প্রায় ৯৫ লাখ; আর ২০২৫ সালে ১ কোটি ২৪ লাখ পশুর বিপরীতে কোরবানি হয় প্রায় ৯০ লাখ। প্রতিবেদনে বলা হয়, উৎপাদন ধারাবাহিকভাবে বাড়লেও চাহিদা মোটামুটি স্থিতিশীল ছিল।
একই প্রতিবেদনে অঞ্চলভেদে জোগানের অসমতার কথাও আসে। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকায় চাহিদা ২১,৫৮,৮৬৯টি পশু, বিপরীতে প্রাপ্যতা ১৪,৪৩,৯৪২টি; চট্টগ্রামেও প্রায় ৫০ হাজার পশুর ঘাটতি। অন্যদিকে রাজশাহী, রংপুর, খুলনা ও ময়মনসিংহ বিভাগে বড় উদ্বৃত্ত ছিল; শুধু রাজশাহীতেই চাহিদার চেয়ে প্রায় ১৯ লাখ পশু বেশি। তাই রাজধানীর হাটের বড় অংশের পশু উত্তরাঞ্চল থেকে আসবে বলে ধারণা করা হয়। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের উপপরিচালক (খামার) মো. শরিফুল হক বলেন, সে বছর পশুর কোনো ঘাটতি নেই। বাংলাদেশ ডেইরি ফারমার্স অ্যাসোসিয়েশনের জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি নিলয় হোসেন বলেন, বড় গরুর চাহিদা কমেছে, আর গোখাদ্য ও পরিবহন খরচ বাড়ায় বড় খামারিদের ঝুঁকি বেড়েছে।
সরকারের প্রস্তুতি ও প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের ভূমিকা
বাসসের খবর অনুযায়ী, ৩ মের ওই সংবাদ সম্মেলনেই ২০২৬ সালের হাট নিয়ে সরকারের পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়। মন্ত্রী জানান, সারা দেশে ৩ হাজার ৬০০টির বেশি পশুর হাট বসবে; এর মধ্যে ঢাকা শহরে ২৭টি, যার ১৬টি ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন এবং ১১টি ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের তত্ত্বাবধানে। ঢাকায় শুধু নির্ধারিত জায়গায় হাট বসবে, যান চলাচলে বিঘ্ন ঘটায় এমনভাবে রাস্তার পাশে হাট বসতে দেওয়া হবে না। আগের বছরের মতো সে বছরও বাইরে থেকে কোরবানির পশু আমদানি করা হবে না, আর সীমান্ত হাটের ইজারা স্থগিত থাকবে। মন্ত্রী বলেন, অসুস্থ পশুর জরুরি চিকিৎসার জন্য প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধানে দেশের প্রতিটি পশুর হাটে বিশেষজ্ঞ ভেটেরিনারি দল নিয়োজিত থাকবে। ঢাকা ট্রিবিউন ২২ মে জানায়, রাজধানীর ২৭টি হাটে ২০টি ভেটেরিনারি মেডিকেল টিম কাজ করবে।
মন্ত্রী আরও বলেন, গরু মোটাতাজাকরণের ইনজেকশন বা যেকোনো স্টেরয়েড আমদানি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ; তবু কিছু অসাধু ব্যবসায়ী কোরবানির পশু মোটাতাজা করতে এসব ওষুধ সংগ্রহ করতে পারেন বলে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর সারা দেশে অভিযান চালিয়ে এসব অবৈধ ওষুধ ধ্বংস করবে। তিনি জানান, পশুর হাটে এবং সড়ক ও নৌপথে পশুবাহী যানবাহন থেকে চাঁদাবাজি ঠেকাতে সরকার কঠোর ব্যবস্থা নিয়েছে, আর এ বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। পশুর দাম মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে থাকবে বলেও তিনি আশা প্রকাশ করেন।
ঢাকা ট্রিবিউনের খবর অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ১৪ মে সাভারে বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউটে এক মতবিনিময়ে মন্ত্রী বলেন, দেশে কোরবানির পশুর কোনো ঘাটতি নেই এবং দেশের খামারিদের লালন-পালন করা পশু দিয়েই কোরবানি সম্পন্ন হবে। সীমান্ত দিয়ে অবৈধভাবে গবাদিপশু প্রবেশ ঠেকাতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে এবং সীমান্ত এলাকার মানুষকেও পশু চোরাচালানের বিষয়ে সতর্ক করা হয়েছে। তিনি জানান, কম খরচে গরু পালন নিশ্চিত করতে এবং উন্নত জাতের ঘাসের উৎপাদন বাড়াতে কাজ চলছে।
ছবি: Wasiul Bahar / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪ (২৭ মে ২০২৬), প্রথম আলো (২০ মে ও ২৭ মে ২০২৬), দেশ রূপান্তর (১০ মে ২০২৬), বাসস (৩ মে ২০২৬), ঢাকা ট্রিবিউন (৩ মে, ১৪ মে ও ২২ মে ২০২৬), বাংলাপিডিয়া (নরসিংদী জেলা, নরসিংদী সদর উপজেলা, গবাদিপশু, মহিষ, ছাগল)




মন্তব্য
(০)