২০২৬ সালের ঈদুল আজহার বাকি ছিল আর মাত্র এক দিন। রাজধানীর কোরবানির পশুর হাট তখন জমে উঠেছে। কিন্তু বৃষ্টির কারণে কাদাপানিতে মাখামাখি হাটে ক্রেতা ও বিক্রেতা দুই পক্ষকেই চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়। এর মধ্যেই তারা গরুর দরদাম করছিলেন, যা অনেক ক্ষেত্রেই মিলছিল না।
মঙ্গলবার, ২৬ মে দুপুরের বৃষ্টির পর ঢাকার যাত্রাবাড়ীর কাজলা ও শনির আখড়া হাট ঘুরে এমন চিত্র দেখেছেন জাগো নিউজের জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক মুহাম্মদ ফজলুল হক। তার প্রতিবেদন অনুযায়ী, হাটে গরু-ছাগলের সরবরাহে কোনো ঘাটতি ছিল না। তবে যানজট আর অব্যবস্থাপনার দৃশ্য চোখে পড়েছে, ফলে কোরবানির পশু কেনার উৎসবের মধ্যেও ছিল অস্বস্তির ছাপ। দেশে ঈদুল আজহা উদযাপনের তারিখ ছিল ২৮ মে, বৃহস্পতিবার।
কাদায় ডুবে হাট, পানি নামে না
আগের দিন সোমবার দুপুরে রাজধানীতে বৃষ্টি নামলে হাটের পরিস্থিতি গুরুতর হয়ে পড়ে। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা ব্যাপারীরা গরু নিয়ে আটকা পড়েন কাদায়, কোথাও হাঁটুসমান, কোথাও গোড়ালি পর্যন্ত। ব্যাপারীরা জানান, এতে ক্রেতারা দূর থেকেই দাম জিজ্ঞাসা করে সরে যাচ্ছিলেন।
হাটের ভেতরে দেখা যায়, কোথাও গরু কাদার মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে, কোথাও বিক্রেতারা বাঁশ ও খড় বিছিয়ে অস্থায়ী শুকনো জায়গা তৈরির চেষ্টা করছেন। কয়েকজন ব্যাপারী অভিযোগ করেন, হাট ইজারাদাররা হাজার হাজার টাকায় ইজারা নিলেও বৃষ্টির পানি সরানোর কার্যকর ব্যবস্থা রাখেননি, ফলে ক্রেতারাও ভেতরে ঢুকতে আগ্রহ হারাচ্ছেন। এ অভিযোগের বিষয়ে ইজারাদারদের কোনো বক্তব্য প্রতিবেদনে ছিল না। এমন পরিস্থিতিতে কুষ্টিয়া, মাদারীপুর, জামালপুর, ফরিদপুর, চুয়াডাঙ্গা, মানিকগঞ্জ, রাজবাড়ী, টাঙ্গাইল ও ঝিনাইদহ থেকে আসা খামারি ও ব্যাপারীরা বিপাকে পড়েন।
একই দিন দুপুরে প্রকাশিত বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের প্রতিবেদনেও যাত্রাবাড়ীর অস্থায়ী হাটের একই ছবি উঠে আসে। সংবাদমাধ্যমটি লেখে, টানা দুই দিনের দমকা হাওয়া ও বৃষ্টিতে ত্রিপলের ছাউনি ছিঁড়ে গেছে, গরু রাখার জায়গা পানিতে ডুবেছে। হালকা বৃষ্টিতেই হাটজুড়ে পানি জমে, আর তা নামতে কয়েক ঘণ্টা লাগে। পানি, কাদা ও গোবর মিশে গরুর দাঁড়ানোর জায়গা পিচ্ছিল হয়ে যায়; ব্যাপারী ও ইজারাদারেরা খড় ও বালু ছিটিয়ে পশুগুলোকে কিছুটা স্বস্তি দেওয়ার চেষ্টা করছিলেন। ব্যাপারীরা জানান, রোববার সন্ধ্যার বৃষ্টির পানি মধ্যরাতের আগে পুরোপুরি নামেনি।
পানি না নামার একটি কারণও ওই প্রতিবেদনে ব্যাখ্যা করা হয়। দক্ষিণ ঢাকার বৃষ্টির পানির বড় অংশ যাত্রাবাড়ী হয়ে বিভিন্ন খাল ও নালা দিয়ে শীতলক্ষ্যা ও বুড়িগঙ্গা নদীতে যায়। একসময় এসব খাল দ্রুত পানি সরিয়ে নিত, কিন্তু দখল ও দূষণে কুতুবখালী, কাজলা, মৃধাবাড়ী ও শনির আখড়ার খাল এখন প্রায় নর্দমার মতো সরু হয়ে গেছে। ফলে সামান্য বৃষ্টিতেই পানি আটকে যায়। ব্যাপারীদের আশঙ্কা ছিল, ক্লান্ত গরু পানিভরা জায়গায় বসে পড়ছে, এতে অসুস্থ হওয়া বা মারা যাওয়ার ঝুঁকি আছে; আবহাওয়া না বদলালে প্রত্যাশার চেয়ে কম দামেই পশু ছেড়ে দিতে হতে পারে।
ক্রেতার বাজেট আর বিক্রেতার চাওয়া দাম
মেরাজনগরের বাসিন্দা আবির হোসেন জাগো নিউজকে জানান, তিনি দুই ঘণ্টা ধরে মাঝারি আকারের গরু খুঁজছিলেন। তার সর্বোচ্চ বাজেট এক লাখ ৬০ হাজার টাকা, অথচ পছন্দের গরুর দাম চাওয়া হচ্ছিল আড়াই লাখ টাকা। তাই একা কোরবানি না দিয়ে তিনি ভাগে কোরবানি দেওয়ার কথা ভাবছিলেন।
হাটে আসা আরেক ক্রেতা আয়ুব বলেন, তার পরিবারের বাজেট দুই থেকে আড়াই লাখ টাকা, কিন্তু পছন্দের গরুগুলোর দাম চাওয়া হচ্ছিল সাড়ে তিন থেকে চার লাখ টাকা।
সুপ্রিম কোর্টের এক আইনজীবী ও তার পরিবারের সদস্যরা শনির আখড়ায় এসে লাল রঙের সুন্দর একটি গরু পছন্দ করেন, কিন্তু দামে মিলছিল না। তারা দুই লাখ টাকা বললেও বিক্রেতা চাইছিলেন তিন লাখ টাকা।
কোনাপাড়া এলাকার হাজি ইব্রাহিম এক লাখ ৮৮ হাজার টাকায় একটি গরু কেনেন। তিনি বলেন, বৃষ্টির কারণে অনেকেই আগে গরু কিনতে চাননি, সেদিন মোটামুটি লোকজন গরু কিনতে আসছিলেন। তার মতে, গরুর দাম আগের বছরের চেয়ে একটু বেশি।
রাজধানীর অন্য হাটেও একই দিনে দামের এই টানাপোড়েন দেখা যায়। ঢাকা ট্রিবিউন ২৬ মে দুপুরে ধোলাইখাল হাট নিয়ে লেখে, ঈদের এক দিন আগে দক্ষিণ সিটির হাটগুলোতে বিক্রি গতি পেলেও ক্রেতা ও বিক্রেতার দামের ফারাকে ঐতিহ্যবাহী ধোলাইখাল হাটে বিক্রি প্রত্যাশার নিচে ছিল। সেখানে কোনো কোনো ক্রেতা বলেছিলেন দাম এখনো চড়া, আবার কেউ বলেছিলেন সবকিছুর দাম বাড়ার তুলনায় গরুর দাম সহনীয়।

খাদ্য, পরিবহন আর শ্রমের খরচের হিসাব
বিক্রেতারা অবশ্য দাবি করেন, গোখাদ্যের দাম এক বছরে প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পরিবহন ও শ্রম খরচের বোঝা। তাদের ভাষ্য, ক্রেতার চাওয়া দামে গরু বিক্রি করলে প্রতিটিতে বড় অঙ্কের লোকসান গুনতে হবে।
রাজবাড়ীর কালুখালী থেকে আসা শরিফুল ইসলাম বলেন, ‘ক্রেতারা গরুপ্রতি ২০ থেকে ৩০ হাজার টাকা কম বলছেন। সেই দামে বিক্রি করা সম্ভব নয়।’
খরচ বাড়ার এই অভিযোগ ঈদের কয়েক সপ্তাহ আগে থেকেই খামারিরা করে আসছিলেন। ৮ মে রাজধানীর ডেমরা ও মেরাদিয়া এলাকার কয়েকটি খামার ঘুরে বাংলা ট্রিবিউন জানায়, খামারিরা গোখাদ্য ও পরিবহন খরচ বাড়াকে দাম বাড়ার কারণ বলছেন। বাংলাদেশ ডেইরি ফার্মার্স অ্যাসোসিয়েশনের এক জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি সংবাদমাধ্যমটিকে বলেন, গরুর খাদ্যের দাম অনেক বেশি, ঢাকায় গরু আনার পরিবহন খরচ আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি, রাখালদের মজুরিও বেড়েছে; তার হিসাবে আগে যে মাঝারি গরু এক লাখ টাকার কিছু বেশিতে বিক্রি হতো, তা এবার দেড় লাখের মতো পড়বে।
টাঙ্গাইলের খামারিদের নিয়ে ৯ মে দৈনিক ইনকিলাব লেখে, প্রান্তিক খামারিদের অভিযোগ, খৈল ও ভুষির দাম আগের বছরের তুলনায় কয়েক গুণ বেড়েছে; ফলে হাটে ন্যায্য দাম মিলবে কি না, তা নিয়ে তারা অনিশ্চয়তায় ছিলেন। খামারিরা জানান, তারা খড়, খৈল, ভুষি, গুড়ের চিটা, চাল-ডালের গুঁড়ো আর নিজেদের চাষ করা নেপিয়ার ঘাস খাইয়ে গরু পালছেন। জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তার কার্যালয়ের হিসাবে, টাঙ্গাইলে সে বছর কোরবানির পশুর চাহিদা ছিল প্রায় দুই লাখ, আর প্রস্তুত ছিল দুই লাখ ৩৪ হাজার পশু।
ঈদের আগের দিনে আবহাওয়াও খরচ বাড়িয়েছে। নিউ এজ ২৬ মে লেখে, ব্যাপারীদের অনেকে হাটে এসেছিলেন দুই-তিন দিন আগে, কিন্তু তখন পর্যন্ত অল্প কয়েকটি গরুই বিক্রি করতে পেরেছেন; আগের কয়েক দিনের তীব্র গরমে গরুগুলো দুর্বল ও অস্থির হয়ে পড়েছিল বলেও তারা জানান।
গ্রামের হাটের চেয়ে কম দাম, বাড়ি ফেরার তাড়া
ফরিদপুরের আলফাডাঙ্গা থেকে মো. ইয়াদাত হোসেন ১৪টি গরু নিয়ে এসেছিলেন, তখনো বিক্রি হয়নি ৯টি। তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘টার্গেট অনুযায়ী গরু বিক্রি হচ্ছে না। গ্রামের তুলনায় এখানে দাম কম। যেসব গরু বিক্রি করেছি সবই এক লাখ ১৪ থেকে ৪০ হাজার টাকায়। একটু বড়, আড়াই-তিন লাখ টাকার গরুর দরদাম করছে না। অথচ গ্রামে আমাদের সাথের ব্যাপারিরা এর চেয়ে বেশি দামে গরু বিক্রি করে ফেলেছে। তারা বাড়িতে চলে গেছে আর আমরা এখনো হাটে।’
জামালপুরের বকশীগঞ্জ থেকে ১৮টি গরু নিয়ে আসা মুনাজ উদ্দিন সাতটি বিক্রি করতে পেরেছিলেন। তিনি বলেন, ‘বকশীগঞ্জে গরুর দাম চড়া হলেও ঢাকা এনে দেখছি কমের দিকে। এই লাল রঙের গরুটা কিনেছি এক লাখ ৭০ হাজার টাকায়, এখন দাম বলে এক লাখ ৪০ হাজার টাকা। গাড়ির ভাড়া পড়েছে গরুপ্রতি এক হাজার ৮০০ থেকে দুই হাজার টাকা। গরু বিক্রি করবো কীভাবে?’
একই এলাকা থেকে আসা আরেক পাইকার জানান, তিনি ১৭টি গরু এনে তখন পর্যন্ত সাতটি বিক্রি করেছেন। তার মতে, সে বছর মানুষের হাতে টাকা কম, তাই ক্রেতারা কম দাম বলছিলেন।
মাঝারি আকারের ৩০টি গরু নিয়ে ভোলার চরফ্যাশন থেকে আসা মো. হোসেন জানান, তিনি এসেছিলেন রোববার, ২৪ মে রাতে। মঙ্গলবার সন্ধ্যা পর্যন্ত বিক্রি করেছিলেন ৯টি গরু। তিনি বলেন, ‘বিক্রি শুরু করেছি মূলত সোমবার থেকে। বৃষ্টি ও ক্রেতা কম, তাই গরু বিক্রি হচ্ছে না।’
মাগুরা থেকে চারটি গরু নিয়ে কাজলায় আসা বাহারুল ইসলাম তখন ফোনে তার শ্যালককে আঞ্চলিক ভাষায় বলছিলেন, ‘এখানে বারি (বৃষ্টি) পড়িছে খুব। গরু বেচা হলি চলি আসবোনি। বেশি দরদাম করবোনানি।’
পরে বাহারুল জাগো নিউজকে বলেন, ‘নিজের গোয়ালের পালা গরু। লাভ-লসের হিসাব নেই। কিন্তু বাড়ি থেকে বলছে, বৃষ্টির মধ্যে দরদাম কোনো বিষয় নয়, গরু বিক্রি করে দিতে হবে। গরু নিয়ে রোববার রাতে দুজন এলেও আজ মঙ্গলবার সকালে শালা বাড়িতে চলে গেছে। বাড়ি পৌঁছে ফোন দিলে তার সাথে কথা বলছিলাম।’
তিনি জানান, চারটি গরুর মধ্যে একটি এক লাখ ২৭ হাজার টাকায় আর একটি এক লাখ ৩৫ হাজার টাকায় বিক্রি করেছেন। বাড়ি থেকে হাটে আনতে গরুপ্রতি দুই হাজার ৬৮০ টাকা ট্রাক ভাড়া গুনতে হয়েছে। বাকি দুটি গরু বিক্রি হলেই তিনি বাড়ি ফিরতে পারবেন।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম সেদিন যাত্রাবাড়ী হাটের দামের একটি পরিসরও দিয়েছিল: সেখানে গরুর দাম ছিল সর্বনিম্ন ৭০ হাজার টাকা থেকে সর্বোচ্চ পাঁচ লাখ টাকা, আর বেশির ভাগ গরু ছিল এক লাখ ৩০ হাজার থেকে দুই লাখ ২০ হাজার টাকার মধ্যে। সংবাদমাধ্যমটি আরও লেখে, ঢাকার অস্থায়ী হাটের বেশির ভাগ ক্রেতা আসেন ঈদের আগের দুই দিনে, কারণ শহরে পশু বেশি দিন রাখার জায়গা, লোক ও ব্যবস্থা অনেকের নেই; তাই এই শেষ সময়টাই ব্যাপারীদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
যেসব এলাকা থেকে গরু নিয়ে এসেছিলেন ব্যাপারীরা
প্রতিবেদনে কথা বলা ব্যাপারীরা এসেছিলেন দেশের নানা প্রান্ত থেকে। রাজবাড়ী জেলার কালুখালী ঢাকা বিভাগের একটি উপজেলা, সাতটি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত; ২০২২ সালের জনশুমারিতে এর জনসংখ্যা ছিল এক লাখ ৭২ হাজার ৩৪৭। ফরিদপুর জেলার আলফাডাঙ্গা উপজেলায় ছয়টি ইউনিয়ন, ২০২২ সালের জনশুমারিতে জনসংখ্যা এক লাখ ১৯ হাজার ৬৩১।
জামালপুরের বকশীগঞ্জ ময়মনসিংহ বিভাগের সীমান্তবর্তী উপজেলা; এর উত্তরে ভারতের মেঘালয় রাজ্য, উত্তর-পূর্বে গারো পাহাড়। উপজেলাটি একটি পৌরসভা ও সাতটি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত, ২০২২ সালের জনশুমারিতে জনসংখ্যা দুই লাখ ৩৯ হাজার ৮৫৭। ভোলার চরফ্যাশন বরিশাল বিভাগের উপকূলীয় উপজেলা, আয়তন এক হাজার ৪৪০.০৪ বর্গকিলোমিটার; এর দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর, আর উপজেলায় চর কুকরি মুকরি, ঢালচর, চর নিজামসহ শতাধিক দ্বীপ ও চর আছে। ২০২২ সালের জনশুমারিতে চরফ্যাশনের জনসংখ্যা ছিল পাঁচ লাখ ১৮ হাজার ৮১৭।
মাগুরা খুলনা বিভাগের জেলা, ঢাকা থেকে প্রায় ১৭৬ কিলোমিটার দূরে; গঙ্গা বদ্বীপের সমতল ভূমিতে অবস্থিত জেলাটিতে চারটি উপজেলা: মাগুরা সদর, মোহাম্মদপুর, শালিখা ও শ্রীপুর। দূরের এসব জেলা থেকে ট্রাকে গরু আনার ভাড়াও ব্যাপারীদের খরচের হিসাবে যুক্ত হয়; বাহারুল ইসলাম গরুপ্রতি দুই হাজার ৬৮০ টাকা আর মুনাজ উদ্দিন এক হাজার ৮০০ থেকে দুই হাজার টাকা ভাড়ার কথা বলেছেন।
যাত্রাবাড়ীর হাট ও ঢাকার পশুর হাটের নিয়ম
যাত্রাবাড়ী ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের একটি মহানগর থানা, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের শুরুর মুখে অবস্থিত। এর আয়তন ১৩.১৯ বর্গকিলোমিটার; ২০২২ সালের জনশুমারিতে থানার জনসংখ্যা ছিল চার লাখ ৯২ হাজার ১৮০। এর উত্তরে সবুজবাগ ও ডেমরা, দক্ষিণে কদমতলী ও শ্যামপুর, পশ্চিমে গেন্ডারিয়া ও সূত্রাপুর থানা।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম জানায়, সে বছর যাত্রাবাড়ীর অস্থায়ী হাট কাজলা থেকে মৃধাবাড়ী মোড় পর্যন্ত প্রায় এক কিলোমিটার জুড়ে বসে এবং সংযোগ সড়কেও ছড়িয়ে পড়ে। আগে এই হাট দনিয়া কলেজ মাঠের আশপাশে বসত; যানজট কমাতে সে বছর তা ডেমরা মহাসড়কে সরানো হয়। হাটের একটি হাসিল কাউন্টারের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তি সংবাদমাধ্যমটিকে জানান, নতুন জায়গায় আগের বছরের চেয়ে বেশি গরু এসেছে।

ঢাকা ট্রিবিউন ১৯ এপ্রিল জানায়, ঈদ উপলক্ষে রাজধানীতে ২৪টি অস্থায়ী হাট বসানোর প্রস্তুতি চলছে, দক্ষিণ ও উত্তর সিটিতে ১২টি করে। দক্ষিণ সিটির তালিকায় ছিল কাজলা সেতু থেকে মাতুয়াইল মৃধাবাড়ী পানির পাম্প পর্যন্ত সড়কের আশপাশের জায়গা, অর্থাৎ এই হাটটি। দক্ষিণ সিটির প্রধান সম্পত্তি কর্মকর্তার বরাতে সংবাদমাধ্যমটি জানায়, হাটগুলো ঈদের দিনসহ পাঁচ দিন চলবে; ইজারাদারদের ইজারামূল্যের সঙ্গে পরিচ্ছন্নতা ফি, ১৫ শতাংশ ভ্যাট ও ১০ শতাংশ আয়কর দিতে হবে; প্রয়োজনে কোনো হাট বাতিল বা সরিয়ে নেওয়ার অধিকার কর্তৃপক্ষের থাকবে।
১১ মে ঢাকা ট্রিবিউনের আরেক প্রতিবেদনে বলা হয়, রাজধানীতে মোট ২৬টি হাট বসবে, দুই সিটিতে ১৩টি করে; সিটি করপোরেশন সূত্রে জানানো হয়, অধিকাংশ হাটের ইজারা হয়ে গেছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড জমি অধিগ্রহণ করায় সারুলিয়ার স্থায়ী হাট সে বছর বসবে না বলেও জানানো হয়। দক্ষিণ সিটির প্রশাসক তখন সতর্ক করেন, নির্ধারিত জায়গার বাইরে বা নির্ধারিত সময়ের আগে হাট বসালে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ২৬ মে নিউ এজ জানায়, দুই সিটি করপোরেশনের তত্ত্বাবধানে স্থায়ী হাটসহ মোট ২২টি পশুর হাট চলছিল, আর রোববার থেকে আনুষ্ঠানিক বেচাকেনা শুরু হয়েছিল।
বৃষ্টির পূর্বাভাস ছিল আগেই
ঈদের আগের এই বৃষ্টি অপ্রত্যাশিত ছিল না। দ্য ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস ইউএনবির বরাতে ২৪ মে জানায়, বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর ২৫ মে থেকে ঈদের দিন ২৮ মে পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন জায়গায় বৃষ্টির পূর্বাভাস দিয়েছে, যা ওই সময়ের পরেও চলতে পারে। নিয়মিত বুলেটিনে রংপুর, ময়মনসিংহ ও সিলেট বিভাগের অনেক জায়গায় এবং রাজশাহী, ঢাকা ও চট্টগ্রাম বিভাগের কিছু জায়গায় দমকা বা ঝোড়ো হাওয়াসহ হালকা থেকে মাঝারি বৃষ্টি বা বজ্রবৃষ্টির কথা বলা হয়। একই সময়ে ঢাকা, ফরিদপুর, মাদারীপুরসহ কয়েকটি জেলায় মৃদু তাপপ্রবাহ চলছিল।
২৫ মে সোমবার বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম জানায়, সেদিন বেলা সাড়ে ১১টার দিকে দিনের বেলাতেই রাজধানীর আকাশ অন্ধকার হয়ে আসে এবং পৌনে ১২টার দিকে ভারী বৃষ্টি শুরু হয়। আবহাওয়া অধিদপ্তরের একজন আবহাওয়াবিদ জানান, উত্তরে তৈরি হওয়া একটি স্থানীয় বজ্রমেঘ ধীরে ধীরে দক্ষিণে সরছিল। সেদিন সকাল ৯টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় ঢাকায় ১৭ মিলিমিটার বৃষ্টি রেকর্ড করা হয়, আর দেশের সর্বোচ্চ ১০১ মিলিমিটার বৃষ্টি হয় ফেনীতে। আবহাওয়া অধিদপ্তরের বিশেষ সতর্কবার্তায় ঢাকাসহ কয়েকটি অঞ্চলে ঘণ্টায় ৪৫ থেকে ৬০ কিলোমিটার বেগে দমকা হাওয়ার সঙ্গে বৃষ্টি বা বজ্রঝড়ের আশঙ্কার কথা জানিয়ে নদীবন্দরগুলোকে এক নম্বর সতর্কসংকেত দেখাতে বলা হয়।
নিউ এজ ২৬ মে লেখে, রোববার ও সোমবারের মুষলধারে বৃষ্টিতে রাজধানীর অস্থায়ী হাটগুলোতে বেচাকেনা মার খায়; বৃষ্টি শুরু হলে আগে আসা অনেক ক্রেতা হাট ছেড়ে চলে যান, আবহাওয়া স্বাভাবিক হলে আবার বেচাকেনা শুরু হয়।
কোরবানির পশুর জোগান: সরকারি হিসাব
হাটে জোগানের ঘাটতি না থাকার কথা সরকারি হিসাবেও ছিল। ৩ মে সচিবালয়ে সংবাদ সম্মেলনে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য তুলে ধরে জানান, সে বছর দেশে কোরবানিযোগ্য পশু আছে এক কোটি ২৩ লাখ ৩৩ হাজার ৮৪০টি, আর সম্ভাব্য চাহিদা এক কোটি এক লাখ ছয় হাজার ৩৩৪টি। তার হিসাবে প্রায় ২২ লাখ ২৭ হাজার ৫০৬টি পশু উদ্বৃত্ত থাকতে পারে।
- গরু ও মহিষ: ৫৬ লাখ ৯৫ হাজার ৮৭৮টি
- ছাগল ও ভেড়া: ৬৬ লাখ ৩২ হাজার ৩০৭টি
- উট, দুম্বাসহ অন্যান্য পশু: পাঁচ হাজার ৬৫৫টি
আগের বছর, ২০২৫ সালে কোরবানিযোগ্য পশু ছিল এক কোটি ২৪ লাখ ৪৭ হাজার ৩৩৭টি। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্যে, সে বছর কোরবানি হয়েছিল ৯১ লাখ ৩৬ হাজার ৭৩৪টি পশু: ৪৭ লাখ পাঁচ হাজার ১০৬টি গরু ও মহিষ, ৪৪ লাখ ৩০ হাজার ৬৬৮টি ছাগল ও ভেড়া এবং ৯৬০টি অন্যান্য পশু। ঢাকা ট্রিবিউনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, তখন প্রায় ৩৩ লাখ ১০ হাজার পশু উদ্বৃত্ত ছিল। ২০২৫ সালের ১০ জুন দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড অধিদপ্তরের তথ্য দিয়ে জানায়, বিভাগওয়ারি সবচেয়ে বেশি পশু কোরবানি হয় রাজশাহী বিভাগে, ২৩ লাখ ২৪ হাজার ৯৭১টি; সবচেয়ে কম সিলেট বিভাগে, তিন লাখ ১৯ হাজার ৮২৩টি।
দেশের প্রাণিসম্পদের বড় ছবিটিও প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের ‘লাইভস্টক ইকোনমি অ্যাট আ গ্লান্স (২০২৩-২৪)’ প্রকাশনায় পাওয়া যায়। এতে বলা হয়, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে দেশে গরু ছিল ২৫০.১৩ লাখ, মহিষ ১৫.২৪ লাখ, ছাগল ২৭১.১৭ লাখ ও ভেড়া ৩৯.০৩ লাখ। স্থির মূল্যে দেশের মোট দেশজ উৎপাদনে প্রাণিসম্পদ খাতের অংশ ছিল ১.৮০ শতাংশ আর কৃষি জিডিপিতে ১৬.৩৩ শতাংশ (সাময়িক হিসাব)। দেশের ২০ শতাংশ মানুষ সরাসরি এবং ৫০ শতাংশ আংশিকভাবে এই খাতে কর্মরত বলে প্রকাশনাটিতে উল্লেখ আছে। সে বছর মাংস উৎপাদন হয় ৯২.২৫ লাখ মেট্রিক টন।
আগের বছরের ঈদেও ঢাকার হাটে বৃষ্টি ও কাদা ছিল। ২০২৫ সালের ৫ জুন প্রথম আলো ইংরেজি সংস্করণ জানায়, রাজধানীর ২২টি নির্ধারিত হাটে থেমে থেমে বৃষ্টি আর কাদার মধ্যেও ক্রেতা-বিক্রেতার ভিড় ছিল, আর কয়েকজন ক্রেতা বলেছিলেন দাম আগের বছরের তুলনায় কিছুটা কম মনে হচ্ছে। হাটে পশুর স্বাস্থ্যসেবার ব্যবস্থাও প্রতিবছর রাখা হয়: ২০২৩ সালে ইত্তেফাক জানায়, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর ঢাকার হাটগুলোর জন্য ২২টি এবং সারা দেশে এক হাজার ৬৯৭টি ভেটেরিনারি মেডিকেল টিম গঠন করে।

ভাগে কোরবানির নিয়ম
বাজেটে না মেলায় আবির হোসেন যে ভাগে কোরবানির কথা ভাবছিলেন, তা বাংলাদেশে বহুল প্রচলিত। ২৪ মে প্রথম আলোর ধর্ম বিভাগে প্রকাশিত লেখায় বলা হয়, শরিয়তের বিধান অনুযায়ী গরু, মহিষ ও উটে সর্বোচ্চ সাতজন শরিক হতে পারেন, সাতজনের বেশি হলে কোরবানি সহিহ হবে না। এর সূত্র হিসেবে সহিহ মুসলিমের হাদিস উল্লেখ করা হয়, যেখানে হজরত জাবের (রা.) বলেন, হোদাইবিয়ায় তারা নবীজির (সা.) সঙ্গে গরু ও উটে সাতজন করে শরিক হয়ে কোরবানি করেছিলেন।
ওই লেখায় আরও বলা হয়, প্রত্যেক শরিকের অংশ অন্তত এক সপ্তমাংশ হতে হবে, আর শরিকানা কোরবানির মাংস অনুমান করে নয়, ওজন করে সমানভাবে ভাগ করতে হবে। পশু কেনার আগেই শরিক ঠিক করে নেওয়া উত্তম বলেও উল্লেখ করা হয়।
ইসলামি বিধানে কোরবানি করা যায় জিলহজ মাসের ১০ তারিখ সকাল থেকে ১২ তারিখ সূর্যাস্ত পর্যন্ত; শাফেয়ি মাজহাবে ১৩ তারিখ সূর্যাস্ত পর্যন্ত। কোরবানির পশু সুস্থ ও রোগমুক্ত হতে হয়; অন্ধ, এক চোখ কানা বা লেজ-কানের অংশ কাটা পশু কোরবানির উপযুক্ত নয়। প্রচলিত রীতিতে মাংস তিন ভাগ করা হয়: এক ভাগ কোরবানিদাতার, এক ভাগ তার পরিবার-পরিজনের, আর এক ভাগ গরিব ও অভাবীদের জন্য। বাংলাদেশে ঈদুল আজহা ‘কোরবানির ঈদ’ নামে পরিচিত, আর জিলহজ মাসের শুরু থেকেই দেশজুড়ে অস্থায়ী পশুর হাট বসতে শুরু করে।
ছবি: S.M.M.Musabbir Uddin / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম, নিউ এজ, ঢাকা ট্রিবিউন, দ্য ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস, বাংলা ট্রিবিউন, দৈনিক ইনকিলাব, প্রথম আলো, দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, দৈনিক ইত্তেফাক, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর, উইকিপিডিয়া




মন্তব্য
(০)