২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে গাইবান্ধার এক কৃষক দম্পতির খেতে চলছিল বিটরুট তোলা, যাকে জেলা কৃষি বিভাগ গাইবান্ধায় প্রথম বাণিজ্যিক বিটরুট চাষ বলে উল্লেখ করেছে। গাইবান্ধা সদর উপজেলার লক্ষ্মীপুর ইউনিয়নের সুপারির ভিটা গ্রামের ফারুকুজ্জামান ফারুক ও মাহফুজা বেগম বহু বছর ধরে চাষ করে আসা ধান, পাটসহ প্রচলিত ফসলের বদলে ২০ শতক জমিতে এই ভিনদেশি সবজি আবাদ করেন। জাগো নিউজ ২৪ তাঁদের খবর প্রকাশ করে ২০২৫ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি; এর তিন দিন আগে, ৯ ফেব্রুয়ারি, একই খেত নিয়ে প্রতিবেদন ছাপে বণিক বার্তা।
যেভাবে বিটরুট চাষে এলেন দম্পতি
দম্পতি জাগো নিউজকে জানান, দীর্ঘদিন ধরে তাঁরা ধান, পাটসহ প্রচলিত নানা ফসল আবাদ করেছেন, কিন্তু কোনোটিতেই তেমন লাভবান হতে পারছিলেন না। তাঁদের ভাষায়, বিটরুটে তিন মাসের ব্যবধানে অন্য ফসলের চেয়ে বেশি লাভ হয়েছে। বণিক বার্তার প্রতিবেদন অনুযায়ী, গাইবান্ধাভিত্তিক বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা এসকেএস ফাউন্ডেশনের এসএমএপি প্রকল্পের কর্মকর্তাদের পরামর্শ ও সহায়তায় তাঁরা এ চাষ শুরু করেন। ফারুক পত্রিকাটিকে বলেন, এসকেএসের ২০ হাজার টাকা সহায়তায় আগের নভেম্বরে তিনি ২০ শতক জমিতে বিটরুট বোনেন।
সিদ্ধান্তটি ঘরেও সহজ ছিল না। মাহফুজা বেগম জাগো নিউজকে বলেন, 'ছেলেরা রাজি হলেও স্বামী অচেনা সবজি চাষে রাজি হচ্ছিলেন না। মোবাইলে দেখে এবং বিভিন্ন মানুষের সাথে পরামর্শ করে একপর্যায়ে তিনি রাজি হন। আবাদ ভালো হয়েছে। আমাদের দেখাদেখি অনেকে বিটরুট চাষ করতে চাচ্ছেন।'
ফলনের হিসাব দেন ফারুক। জাগো নিউজকে তিনি বলেন, '২০ শতক জমিতে বিটরুট চাষ করি। এখন জমিতে প্রায় ১ হাজার কেজি বিটরুট আছে। সর্বনিম্ন ১৫০ থেকে সর্বোচ্চ ২০০ টাকার কাছাকাছি দামে বিটরুট বিক্রি করছি। আশা করছি লক্ষাধিক টাকার মুনাফা হবে।' বণিক বার্তাকেও তিনি একই পরিমাণ ও একই দামের কথা বলেন, প্রতি কেজি ১৫০ থেকে ২০০ টাকা, এবং জানান সব মিলিয়ে লক্ষাধিক (এক লাখের বেশি) টাকা লাভ হবে। এগুলো ফসল তোলার মাঝপথে কৃষকের নিজের প্রত্যাশা; কোনো প্রতিবেদনেই দম্পতির খরচের হিসাব ছিল না, আর খবর প্রকাশের সময় চূড়ান্ত ফল জানা ছিল না।
দুই প্রতিবেদনেই গাছটির বর্ণনা কৃষকের চোখে দেখা রূপে এসেছে। বিটরুটের গাছ দেখতে অনেকটা পালংশাকের মতো হলেও রঙে ভিন্নতা আছে: পাতা সবুজ ও লালচে, নিচের মূল অংশ গাঢ় গোলাপি বা লালচে বেগুনি। শীতে উৎপাদন বেশি হলেও সারা বছরই এর দেখা মেলে, আর স্থানীয় কৃষকেরা বণিক বার্তাকে জানান, দামও সারা বছর ভালো থাকে। দুই পত্রিকাই সবজিটিকে পুষ্টি ও ঔষধি গুণসম্পন্ন 'সুপারফুড' বলেছে; পুষ্টি কর্তৃপক্ষ ও চিকিৎসা গবেষণা আসলে কী বলে, তা নিচে আলাদা করে দেওয়া হলো।
দুই উপজেলায় মোট ৩০ শতক
বণিক বার্তার উদ্ধৃত গাইবান্ধা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) তথ্য অনুযায়ী, জেলায় প্রথমবারের মতো বাণিজ্যিকভাবে বিটরুট চাষ হয় মোট ৩০ শতক জমিতে। এর মধ্যে ২০ শতক সদর উপজেলার লক্ষ্মীপুর ইউনিয়নের সুপারির ভিটা গ্রামে এই দম্পতির খেত, বাকি ১০ শতক ফুলছড়ি উপজেলার কঞ্চিপাড়া ইউনিয়নের ভাষার পাড়া গ্রামে। শতক বা ডেসিমাল বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের গ্রামাঞ্চলে এখনো প্রচলিত জমির একক: এক একরের একশো ভাগের এক ভাগ, প্রায় ৪০.৪৭ বর্গমিটার।
দম্পতির সাফল্য অন্যদের নজর কাড়ছিল। বণিক বার্তা লিখেছে, তাঁদের দেখে আশপাশের কৃষকেরাও উৎসাহী হচ্ছেন। জাগো নিউজ কথা বলে তাঁদের একজন, পাশের বেড়াডাঙ্গা গ্রামের যুবক মেহেদী হাসান নয়নের সঙ্গে। তিনি প্রাথমিকভাবে বাড়ির আঙিনায় বিটরুট চাষ করেছেন এবং আগামীতে বড় পরিসরে চাষের কথা জানান। তিনি বলেন, 'এ সবজির চাহিদা ভালো দেখছি। দামও সারাবছর ভালোই থাকে। ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা নাই।'
কৃষি বিভাগ জাগো নিউজকে জানায়, গাইবান্ধার দোআঁশ ও বেলে দোআঁশ মাটি বিটরুট চাষের উপযুক্ত, মাত্র তিন মাসেই ফলন পাওয়া যায় এবং এ অঞ্চলে বিটরুট চাষের অপার সম্ভাবনা আছে। গাইবান্ধা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. খোরশেদ আলম জাগো নিউজকে বলেন, 'কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে কৃষক দম্পতিকে নিয়মিত পরামর্শ ও সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। এটি ব্যাপকভাবে উৎপাদন করতে পারলে দেশের চাহিদা মিটিয়ে রপ্তানি করে বৈদেশিক মুদ্রাও আয় করা সম্ভব।' বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, 'জেলায় প্রথমবারের মতো ৩০ শতক জমিতে বিটরুট চাষ হয়েছে। গাইবান্ধার মাটি বিটরুট চাষের জন্য উপযুক্ত। এটি লাভজনক ফসল। আগামীতে বিটরুট চাষ সম্প্রসারণে উদ্যোগ নেয়া হবে।'
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর বাংলাদেশে কৃষি সম্প্রসারণের দায়িত্বপ্রাপ্ত সরকারি দপ্তর; এটি কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীন, প্রধান কার্যালয় ঢাকায়। ১৯৮২ সালে কৃষি পরিদপ্তর (সম্প্রসারণ ও ব্যবস্থাপনা), পাট পরিদপ্তর, উদ্ভিদ সংরক্ষণ পরিদপ্তর, হর্টিকালচার বোর্ড, তামাক উন্নয়ন বোর্ড এবং কেন্দ্রীয় সম্প্রসারণ সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউট একীভূত করে অধিদপ্তরটি গঠিত হয়। ১৯৯০ সাল পর্যন্ত এটি কৃষক প্রশিক্ষণে 'ট্রেনিং অ্যান্ড ভিজিট' পদ্ধতি চালায়, পরে দলভিত্তিক প্রশিক্ষণে যায়; ১৯৯৬ সাল থেকে এর কাজ পরিকল্পিত হয় নতুন কৃষি সম্প্রসারণ নীতির আওতায়।
এসকেএস ফাউন্ডেশন ও তার কৃষি অর্থায়ন প্রকল্প
এসকেএস ফাউন্ডেশন নিজেকে ১৯৮৭ সালের ১ ডিসেম্বর প্রতিষ্ঠিত একটি জাতীয় বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা হিসেবে পরিচয় দেয়। সংস্থার বার্ষিক প্রতিবেদন ২০২৩-২৪ অনুযায়ী, স্থানীয় একদল তরুণ-তরুণী নিপীড়নের বিরুদ্ধে লড়াই এবং গাইবান্ধা জেলার দরিদ্র ও প্রান্তিক চরবাসী, অর্থাৎ নদীর চরে বসবাসকারী মানুষের উন্নয়নের লক্ষ্যে সংস্থাটি গড়ে তোলেন।
বণিক বার্তার প্রতিবেদনে উল্লেখিত এসএমএপি হলো ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকের কৃষি উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি ও বহুমুখীকরণ অর্থায়ন প্রকল্প (Small and Marginal Sized Farmers Agricultural Productivity Improvement and Diversification Financing Project)। ২০২৩ সালের জুলাই থেকে ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত সময়ের ওই বার্ষিক প্রতিবেদন বলছে, সে বছর এ প্রকল্পের আওতায় এসকেএস ৯ হাজার ১৮৬ জন কৃষককে সহায়তা দেয়, যাঁদের ৯ হাজার ১৫১ জন নারী। বিতরণ করা হয় ৫৬ কোটি ৭৪ লাখ ৯ হাজার টাকা, বছর শেষে বকেয়া ছিল ৩০ কোটি ৭৯ লাখ ৬৪ হাজার ৫০৮ টাকা। প্রত্যেক কৃষকের প্রয়োজন ও সামর্থ্য অনুযায়ী ৫ হাজার থেকে ২ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ দেওয়া হয়, আর সঙ্গে ছিল তিনটি বিষয়ে প্রশিক্ষণ ও কারিগরি সহায়তা: কৃষি, কৃষিযন্ত্র ও প্রাণিসম্পদ।
এসকেএস ফাউন্ডেশনের এসএমএপি প্রকল্পের ব্যবস্থাপক হারুন অর রশিদ বণিক বার্তাকে বলেন, 'আমরা শুরু থেকেই কৃষকদের আর্থিক ও কারিগরি সহায়তা দিয়েছি। সেইসঙ্গে বাজারজাতকরণের ব্যাপারেও সহযোগিতা করছি।'
গাইবান্ধা: বড় নদীর তীরের কৃষিনির্ভর জেলা
জাতীয় জ্ঞানকোষ বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী, রংপুর বিভাগের জেলা গাইবান্ধার আয়তন ২ হাজার ১১৪.৭৭ বর্গকিলোমিটার। এর উত্তরে কুড়িগ্রাম ও রংপুর, দক্ষিণে বগুড়া, পূর্বে জামালপুর, কুড়িগ্রাম ও ব্রহ্মপুত্র নদ এবং পশ্চিমে জয়পুরহাট, দিনাজপুর ও রংপুর জেলা। প্রধান নদী ব্রহ্মপুত্র, যমুনা, তিস্তা, করতোয়া, বাঙালি ও ঘাঘট। এলাকাটি একসময় ছিল ভবানীগঞ্জ মহকুমা, যা গঠিত হয় ১৮৫৮ সালে; নদীভাঙনে ভবানীগঞ্জ বিলীন হলে ১৮৭৫ সালে সদর দপ্তর গাইবান্ধায় সরে আসে, আর ১৯৮৪ সালে গাইবান্ধা জেলা হয়।
জেলায় উপজেলা ৭টি, ইউনিয়ন ৮২টি, মৌজা ১ হাজার ৮২টি। ২০১১ সালের আদমশুমারিতে জনসংখ্যা ছিল ২৩ লাখ ৭৯ হাজার ২৫৫, আর বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০২২ সালের জনশুমারিতে ২৫ লাখ ৬২ হাজার ২৩২। স্থানীয় অর্থনীতির মূল ভিত্তি কৃষি: বাংলাপিডিয়ায় ব্যবহৃত ২০১১ সালের শুমারির তথ্যে জেলার ৬৫.০৮ শতাংশ খানার প্রধান আয়ের উৎস কৃষি।
দম্পতির খেত যে উপজেলায়, সেই গাইবান্ধা সদরের আয়তন ৩২৪.০৫ বর্গকিলোমিটার, ইউনিয়ন ১৩টি, যার একটি লক্ষ্মীপুর; ২০১১ সালে জনসংখ্যা ছিল ৪ লাখ ৩৭ হাজার ২৬৮। বাংলাপিডিয়া এখানকার প্রধান ফসল হিসেবে ধান, পাট, গম, আলু, সরিষা, মসুর ডাল, চীনাবাদাম, ভুট্টা ও শাকসবজির নাম দিয়েছে, আর প্রধান রপ্তানিপণ্য ধান, পাট ও শাকসবজি। আউশ ধান, আখ, মিষ্টি আলু ও কাউন এখানে বিলুপ্ত বা প্রায় বিলুপ্ত ফসল হিসেবে লিপিবদ্ধ। উপজেলার ৫৫.২৩ শতাংশ খানার প্রধান আয় কৃষি, আর ৪৯.৩০ শতাংশ খানা ভূমিহীন। লক্ষ্মীপুর হাট উপজেলার পরিচিত হাটগুলোর একটি, আর ১৯৫৪ সাল থেকে উপজেলায় চালু আছে একটি কৃষি প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট।
এখানকার মাটি নদীর গড়ন মেনে চলে। দেশের কৃষি-পরিবেশ অঞ্চল নিয়ে বাংলাপিডিয়ার বিবরণে তিস্তা মিয়েন্ডার প্লাবনভূমি অঞ্চল, যার মধ্যে তিস্তা ও করতোয়াসহ কয়েকটি নদীর প্লাবনভূমি পড়ে, সেখানে প্রশস্ত উঁচু ভিটায় জলপাই-বাদামি রঙের দ্রুত পানি চুইয়ে যাওয়া দোআঁশ মাটির কথা বলা হয়েছে, যা মাঝারি অম্লীয়, উর্বরতায় নিম্ন থেকে মাঝারি এবং ভালো আর্দ্রতা ধরে রাখতে পারে। নবীন ব্রহ্মপুত্র ও যমুনা প্লাবনভূমির ভিটায় রয়েছে পানি চুইয়ে যাওয়া পলি দোআঁশ থেকে পলিময় এঁটেল দোআঁশ মাটি, যা নিরপেক্ষ থেকে সামান্য অম্লীয়, ভিটায় জৈব পদার্থ কম এবং নাইট্রোজেন, ফসফরাস ও সালফারের ঘাটতি আছে। এগুলো অঞ্চলের প্লাবনভূমির সাধারণ বৈশিষ্ট্য; নির্দিষ্ট জমির কী দরকার, তা ঠিক হয় মাটি পরীক্ষা ও স্থানীয় কৃষি অফিসের পরামর্শে।

বিটরুট কী
বিটরুট হলো কন্ডিটিভা গ্রুপের Beta vulgaris subsp. vulgaris গাছের প্রধান মূল; গাছটি টেবিল বিট, গার্ডেন বিট বা লাল বিট নামেও পরিচিত। এর পাতা শাক হিসেবে খাওয়া হয়, যাকে বলে বিট গ্রিনস। একই উপপ্রজাতির অন্য চাষকৃত রূপের মধ্যে আছে চিনি তৈরির সুগার বিট, পাতার সবজি সুইস চার্ড বা স্পিনাচ বিট এবং পশুখাদ্যের ফসল ম্যাঙ্গেলওয়ার্জেল। বিটরুটকে প্রথম পোষ মানানো হয় প্রাচীন মধ্যপ্রাচ্যে, শুরুতে মূলত পাতার জন্য; প্রাচীন মিসরীয়, গ্রিক ও রোমানরা এর চাষ করত, আর ধারণা করা হয় রোমান যুগে মূলের জন্যও এর আবাদ শুরু হয়। খ্রিষ্টপূর্ব অষ্টম শতকের ব্যাবিলনের লিখিত নথিতে এর উল্লেখ মেলে।
বিটরুটের লাল রং আসে বেটানিন থেকে, যা বেটালেইন শ্রেণির রঞ্জক। মূল থেকে নেওয়া বেটানিন শিল্পে লাল খাদ্যরং হিসেবে ব্যবহৃত হয়, আর বিশ্বের বাণিজ্যিক বিটরুটের বড় অংশ সেদ্ধ, জীবাণুমুক্ত বা আচার করা পণ্যে প্রক্রিয়াজাত হয়। মূলটি কাঁচা, ভাজা, ভাপে বা সেদ্ধ করে খাওয়া যায়; ভারতীয় রান্নায় কুচি করে রান্না করা মসলাদার বিটরুট প্রচলিত পার্শ্বপদ, আর পূর্ব ইউরোপে বর্শের মতো স্যুপের মূল উপাদান। কচি পাতা সালাদে কাঁচা খাওয়া যায়, বড় পাতা রান্না করা হয় পালংশাকের মতো।
বাংলাদেশে এটি এখনো অপ্রচলিত ফসল। বাংলাপিডিয়া জানায়, দেশে দেশি-বিদেশি মিলিয়ে প্রায় ১০০ ধরনের সবজি চাষ হয়, আর প্রধান শীতকালীন সবজি হিসেবে বাঁধাকপি, ফুলকপি, টমেটো, বেগুন, মুলা, শিম ও লাউয়ের নাম দেয়; প্রধান সবজির তালিকায় বিটরুট নেই। একই ভুক্তিতে বলা হয়েছে, দেশে সবজির প্রাপ্যতা জনপ্রতি দৈনিক প্রস্তাবিত ২০০ গ্রামের মাত্র এক-পঞ্চমাংশের মতো।

বিটরুট যেভাবে চাষ হয়
বিটরুট ঠান্ডা মৌসুমের সবজি। যুক্তরাষ্ট্রের ইউটাহ স্টেট ইউনিভার্সিটি এক্সটেনশন ২০২০ সালের মে মাসে প্রকাশিত পিয়ার-রিভিউড তথ্যপত্রে বলেছে, বিট রোদেলা জায়গা এবং প্রচুর জৈব পদার্থযুক্ত উর্বর, গভীর ও ভালো নিষ্কাশনের মাটি পছন্দ করে; বীজ থেকে চারা বের হতে ৭ থেকে ১৪ দিন লাগে, আর গরম আবহাওয়ায় অঙ্কুরোদ্গম কমে যায়। ভারতের তামিলনাড়ু কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (টিএনএইউ), যাদের ফসল নির্দেশিকা সর্বশেষ হালনাগাদ হয় ২০১৩ সালে, বলছে ঝুরঝুরে সব ধরনের মাটিতেই ফসলটি ভালো হয়, উপযুক্ত পিএইচ ৬.০ থেকে ৭.০, আর এটি ঠান্ডা আবহাওয়ার ফসল। তাদের তথ্যে তামিলনাড়ুতে জনপ্রিয় জাত উটি ১, ক্রিমসন গ্লোব, ডেট্রয়েট ডার্ক রেড ও রেড বল।
যুক্তরাজ্যের রয়্যাল হর্টিকালচারাল সোসাইটি (আরএইচএস) ব্যাখ্যা করে, বিটরুটের একটি 'বীজ' আসলে সাধারণত কয়েকটি বীজের শক্ত, কর্কের মতো গুচ্ছ, তাই একবার বুনলে কয়েকটি চারা গজাতে পারে। বীজ গজাতে দেরি হতে পারে বলে আরএইচএস বোনার আগে এক ঘণ্টা কুসুম গরম পানিতে ভিজিয়ে রাখার পরামর্শ দেয়। মাঠ ফসলের জন্য টিএনএইউ যে ধাপগুলো দিয়েছে:
- জমি ভালোভাবে চাষ দিয়ে ঝুরঝুরে করে ৩০ সেন্টিমিটার পরপর আইল ও নালা তৈরি করা।
- আইলের ওপর ১০ সেন্টিমিটার পরপর সরাসরি বীজ বোনা; এক হেক্টরে প্রায় ৬ কেজি বীজ লাগে।
- বোনার পরপরই ভালোভাবে সেচ দেওয়া, পরে প্রয়োজনমতো।
- বোনার প্রায় ২০ দিন পর চারা পাতলা করে প্রতি গোছায় একটি গাছ রাখা।
ইউটাহ স্টেট ইউনিভার্সিটি আরও বলেছে, বিট আগাছার সঙ্গে প্রতিযোগিতায় ভালো পারে না, তাই চারা যখন ধীরে বাড়ে তখন নিড়ানি সবচেয়ে জরুরি; আর গাছের খুব কাছে কোদাল বা নিড়ানি চালানো ঠিক নয়, কারণ শিকড় ক্ষতিগ্রস্ত হলে বৃদ্ধি ও ফলন কমে। বিটের যথেষ্ট বোরনও দরকার: মূলের গায়ে বা ভেতরে কালো, বসে যাওয়া দাগ সাধারণত মাটিতে বোরনের ঘাটতি নির্দেশ করে, আর বোরনের ঘাটতিতে থাকা গাছ শিকড়ের রোগে বেশি আক্রান্ত হয়। টিএনএইউ তামিলনাড়ুর পরিবেশের জন্য পূর্ণাঙ্গ সার-সূচি প্রকাশ করেছে; বাংলাদেশের কোনো জমির সঠিক সারের মাত্রা জানতে হবে উপজেলা কৃষি অফিস থেকে, যারা মাটি পরীক্ষার ব্যবস্থাও করতে পারে।
টিএনএইউর তালিকায় প্রধান পোকা পাতা সুড়ঙ্গকারী পোকা (লিফ মাইনার) ও ফ্লি বিটল, আর প্রধান রোগ সারকোস্পোরা পাতা দাগ ও রাইজোকটোনিয়া শিকড় পচা। রোগ নিয়ন্ত্রণে ইউটাহ স্টেট ইউনিভার্সিটি প্রতিবছর ফসলের জায়গা বদলানোর পরামর্শ দেয়। আরএইচএস সতর্ক করে, গরম ও শুষ্ক আবহাওয়ায় কিংবা খুব ঠান্ডায় বিটরুটে আগাম ফুল আসতে (বোল্টিং) পারে, তখন মূল আর ফোলে না; বোল্টিং-সহনশীল জাত এ ঝুঁকি কমায়। যেকোনো বালাইনাশক স্প্রের ক্ষেত্রে কৃষকের উচিত স্থানীয় কৃষি কর্মকর্তার পরামর্শ মেনে চলা।
সময়ের হিসাবে ইউটাহ স্টেট ইউনিভার্সিটি বলছে, জাতভেদে বোনার ৬০ থেকে ৮০ দিনের মধ্যে মূল সাধারণত পরিপক্ব হয়, আর মূল যত বড় হয় তত আঁশালো হয়ে ওঠে; হিমাঙ্কের কাছাকাছি তাপমাত্রা ও উচ্চ আর্দ্রতায় রাখলে তা দুই থেকে চার মাস ভালো থাকে। টিএনএইউ তামিলনাড়ুর পরিবেশে ১২০ দিনে হেক্টরপ্রতি প্রায় ২০ থেকে ২৫ টন ফলনের কথা বলেছে। গাইবান্ধার কৃষি বিভাগ জাগো নিউজকে জানিয়েছে, সেখানে তিন মাসে ফলন পাওয়া যায়।

পুষ্টি ও স্বাস্থ্য: কর্তৃপক্ষ যা বলে
যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগের (ইউএসডিএ) ফুডডেটা সেন্ট্রাল তথ্যভান্ডার অনুযায়ী, প্রতি ১০০ গ্রাম কাঁচা বিটে থাকে ৮৭.৫৮ গ্রাম পানি, ৪৩ কিলোক্যালরি, ১.৬১ গ্রাম আমিষ, ০.১৭ গ্রাম চর্বি এবং ৯.৫৬ গ্রাম শর্করা, যার ৬.৭৬ গ্রাম চিনি ও ২.৮ গ্রাম খাদ্য আঁশ। একই ১০০ গ্রামে আছে ১০৯ মাইক্রোগ্রাম ফোলেট, ৩২৫ মিলিগ্রাম পটাশিয়াম, ৭৮ মিলিগ্রাম সোডিয়াম, ২৩ মিলিগ্রাম ম্যাগনেশিয়াম, ০.৮ মিলিগ্রাম আয়রন ও ৪.৯ মিলিগ্রাম ভিটামিন সি।
স্বাস্থ্যের দিক থেকে সবচেয়ে বেশি গবেষণা হয়েছে রক্তচাপ নিয়ে। যুক্তরাজ্যের নিউক্যাসল বিশ্ববিদ্যালয়ের মারিও সিয়েরভো ও সহকর্মীদের একটি পদ্ধতিগত পর্যালোচনা ও মেটা-বিশ্লেষণ ২০১৩ সালে জার্নাল অব নিউট্রিশনে প্রকাশিত হয়। তাতে ২০০৬ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে পরিচালিত ১৬টি দৈবচয়িত পরীক্ষার ফল একত্র করা হয়, অংশগ্রহণকারী ছিলেন মোট ২৫৪ জন। দুই ঘণ্টা থেকে ১৫ দিন পর্যন্ত অজৈব নাইট্রেট বা বিটরুটের রস গ্রহণের সঙ্গে সিস্টোলিক বা ওপরের রক্তচাপ গড়ে ৪.৪ মিলিমিটার পারদ কমার সম্পর্ক পাওয়া যায়, তবে ডায়াস্টোলিক বা নিচের রক্তচাপের পরিবর্তন পরিসংখ্যানগতভাবে তাৎপর্যপূর্ণ ছিল না। গবেষকেরা লিখেছেন, এ ফল দীর্ঘমেয়াদি পরীক্ষায় এবং হৃদ্রোগের বেশি ঝুঁকিতে থাকা মানুষের ওপর যাচাই করা দরকার।
বিটরুট প্রস্রাবের রংও বদলে দিতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল লাইব্রেরি অব মেডিসিনের স্বাস্থ্যতথ্য সেবা মেডলাইনপ্লাস গোলাপি বা লাল প্রস্রাবের কারণের তালিকায় ব্ল্যাকবেরি ও কিছু খাদ্যরঙের সঙ্গে বিটের নাম রেখেছে। তাদের পরামর্শ, লাল, গোলাপি বা ধোঁয়াটে বাদামি প্রস্রাব যদি কোনো খাবার বা ওষুধের কারণে না হয়, কিংবা প্রস্রাবে একবারও রক্ত দেখা যায়, তবে স্বাস্থ্যসেবাদাতার কাছে যেতে হবে।
বিটরুট সবজি, ওষুধ নয়। উচ্চ রক্তচাপ, কিডনির রোগ বা অন্য কোনো অসুস্থতা থাকলে খাদ্যাভ্যাস বদলানো বা নিয়মিত বিটরুটের রস খাওয়ার আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে, আর চিকিৎসকের দেওয়া ওষুধ বন্ধ করা যাবে না।

ছবি: Evan-Amos / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, বণিক বার্তা, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (ডিএই) গাইবান্ধা, এসকেএস ফাউন্ডেশন (বার্ষিক প্রতিবেদন ২০২৩-২৪), বাংলাপিডিয়া, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (জনশুমারি ও গৃহগণনা ২০২২), ইউটাহ স্টেট ইউনিভার্সিটি এক্সটেনশন, তামিলনাড়ু কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, রয়্যাল হর্টিকালচারাল সোসাইটি, ইউএসডিএ ফুডডেটা সেন্ট্রাল, জার্নাল অব নিউট্রিশন (সিয়েরভো ও সহকর্মী, ২০১৩), মেডলাইনপ্লাস (যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল লাইব্রেরি অব মেডিসিন), উইকিপিডিয়া





মন্তব্য
(০)