২০২৫ সালের আমন মৌসুমে মাগুরা জেলার বিভিন্ন এলাকায় আমন ধানের বাম্পার ফলন হয়েছে, আর নভেম্বরের শুরুতে সেখানকার কৃষকেরা ধান কাটা ও মাড়াইয়ের কাজে ব্যস্ত সময় পার করছিলেন। ২০২৫ সালের ৪ নভেম্বর জাগো নিউজ ২৪ এই খবর প্রকাশ করে। কৃষকেরা পত্রিকাটিকে জানান, এ মৌসুমে বেশি বৃষ্টি হওয়ায় নিয়মিত আবাদি জমি এবং সাধারণত অনাবাদি পড়ে থাকা জমি, দুই জায়গাতেই আমনের ফলন কয়েক গুণ বেড়েছে। মাগুরার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) কর্মকর্তারা বলেন, এবার আবহাওয়া অনুকূল ছিল এবং সারের সরবরাহও ভালো ছিল। তবে কোনো কোনো কৃষক জানান, বৃষ্টি আর বাতাসে তাঁদের জমির ধান এরই মধ্যে মাটিতে হেলে পড়েছে, যা নিয়ে তাঁরা চিন্তিত।
মাগুরা দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে খুলনা বিভাগের একটি জেলা, আর বর্ষাজুড়ে মাঠে থাকা আমন ধান এ জেলার প্রধান মাঠফসলগুলোর একটি। খবরটি এমন সময়ে প্রকাশিত হয়, যখন সারা দেশে রোপা আমন কাটা শুরু হচ্ছিল এবং কৃষকেরা একদিকে ভালো ফলন, অন্যদিকে নতুন ধানের বাজারদর কেমন হবে, সেই হিসাব মেলাচ্ছিলেন।
মাঠে মাগুরার কৃষকেরা যা বললেন
মাগুরা সদর উপজেলার কৃষক আরজ আলী জাগো নিউজকে জানান, এ মৌসুমে তিনি ২০ বিঘা জমিতে বিভিন্ন জাতের ধান চাষ করেছেন। প্রচুর বৃষ্টি হওয়ায় ফলনও ভালো হয়েছে। তাঁর কথায়, বাজারে ন্যায্যমূল্য পেলে কৃষকদের লোকসান দিয়ে ধান বিক্রি করতে হবে না।
মাগুরা সদরের ভিটাশাইর গ্রামের কৃষক ধলা শেখ জানান, এ বছর তিনি আট বিঘা জমিতে আমন ধান চাষ করেছেন। তাঁর জমির ধান ভালো হয়েছে; পোকামাকড়ের আক্রমণ ও রোগবালাই কম হওয়ায় অন্য বছরের তুলনায় এবার ফলন বেশি হয়েছে। তবে তিনি জানান, এরই মধ্যে বৃষ্টি আর বাতাসে অনেক জমির ধান হেলে পড়েছে, তাতে তিনি কিছুটা চিন্তিত।
শ্রীপুর উপজেলার নাকোল গ্রামের কৃষক তালেব মিয়া বলেন, এবার আবহাওয়া আর সারের প্রাপ্যতা, দুটোই কৃষকের অনুকূলে ছিল। তিনি আরও বলেন, গত কয়েক বছর টানা লোকসানের কারণে এবার অনেক কৃষক আমন রোপণই করেননি, আর হয়তো সে কারণেও কৃষকেরা এবার ন্যায্য দাম পাচ্ছেন। নাকোল শ্রীপুর উপজেলার আটটি ইউনিয়নের একটি; বাকি ইউনিয়নগুলো হলো আমলসার, কাদিরপাড়া, গয়েশপুর, দারিয়াপুর, শ্রীকোল, শ্রীপুর ও সব্দালপুর।

কৃষি বিভাগ যা জানাল
প্রতিবেদনে উদ্ধৃত উপজেলা কৃষি অফিসার মো. তোজাম্মেল হক জানান, সে মুহূর্তে মাঠের সার্বিক অবস্থা ভালো ছিল।
মাগুরা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. তাজুল ইসলাম বলেন, এবার আবহাওয়া অনুকূল ছিল, সারের সরবরাহও ভালো ছিল। সব মিলিয়ে এবার উৎপাদন ভালো হয়েছে এবং কৃষকেরা দামও ভালো পাচ্ছেন। তাঁর ভাষায়, সবচেয়ে বড় কথা হলো কৃষকের মুখে হাসি দেখা যাচ্ছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সরকারের সেই সংস্থা, যা কৃষি পরামর্শ ও সরকারি কর্মসূচি মাঠপর্যায়ে কৃষকের কাছে পৌঁছে দেয়। কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীন এই সংস্থার জেলা কার্যালয়ের প্রধান উপপরিচালক; উপজেলায় কাজ করেন উপজেলা কৃষি অফিসার, আর ইউনিয়ন পর্যায়ে উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তারা কৃষকের মাঠে যান। নিচে বর্ণিত সরকারের বড় কৃষি যান্ত্রিকীকরণ প্রকল্পটিও এই অধিদপ্তরই বাস্তবায়ন করেছে।
বৃষ্টি, বাতাস আর হেলে পড়া ধান
মাগুরার কৃষকেরা এবারের ভালো ফসলের বড় কৃতিত্ব দিয়েছেন মৌসুমের বৃষ্টিকে। আমন ধান বর্ষাকালজুড়ে মাঠে বেড়ে ওঠে, আর মাগুরায় বছরে গড়ে প্রায় ১ হাজার ৬৮১ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়।
তবে কাটার মৌসুমের কাছাকাছি সময়ের বৃষ্টি ও বাতাসে ঝুঁকিও থাকে, আর ধলা শেখের দুশ্চিন্তা ঠিক সেটি নিয়েই। দানাশস্যের কাণ্ড মাটির কাছাকাছি জায়গা থেকে বেঁকে হেলে পড়লে কৃষিবিজ্ঞানের ভাষায় তাকে লজিং বলা হয়। সাধারণত বৃষ্টি, বাতাস বা শিলাবৃষ্টি সামলানোর মতো দাঁড়িয়ে থাকার শক্তি ফসলের না থাকলে এমনটি ঘটে; মাটি, জমির ঢাল ও আগের ফসলও এতে ভূমিকা রাখে। হেলে পড়লে ফলন অনেকটা কমে যেতে পারে, ফসল কাটা খুব কঠিন হয়ে পড়ে, আর কখন হেলে পড়ল তার ওপর নির্ভর করে রোগবালাই, দানার আর্দ্রতা, মান এবং ফসল সমানভাবে পাকবে কি না, তাও প্রভাবিত হয়। খাটো বা বামন জাত উদ্ভাবন এই সমস্যা কমানোর একটি উপায়।
২০২৫ সালের অক্টোবরের শেষ দিনগুলোতে বঙ্গোপসাগরের আবহাওয়া অস্থির ছিল। প্রথম আলো ২৮ অক্টোবর জানায়, থাইল্যান্ডের দেওয়া নাম মন্থা (অর্থ সুগন্ধি ফুল) নামের ঘূর্ণিঝড়টি প্রবল ঘূর্ণিঝড়ে পরিণত হয়েছে এবং ভারতের অন্ধ্রপ্রদেশ উপকূল অতিক্রম করার কথা। সেদিন দুপুরে আবহাওয়া অধিদপ্তরের হিসাবে ঝড়ের কেন্দ্র ছিল চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর থেকে প্রায় ১ হাজার ২৬৫ কিলোমিটার ও মোংলা সমুদ্রবন্দর থেকে প্রায় ১ হাজার ১০৫ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে; কেন্দ্রের কাছে বাতাসের একটানা সর্বোচ্চ গতিবেগ ছিল ঘণ্টায় প্রায় ৯০ কিলোমিটার, যা দমকা হাওয়ার আকারে ১১০ কিলোমিটার পর্যন্ত উঠছিল। বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, মোংলা ও পায়রা সমুদ্রবন্দরকে ২ নম্বর দূরবর্তী সতর্কসংকেত দেখাতে বলে এবং উত্তর বঙ্গোপসাগরে থাকা মাছ ধরার নৌকাকে উপকূলের কাছাকাছি থাকতে বলে। আবহাওয়াবিদ মো. বজলুর রশীদ পত্রিকাটিকে বলেন, বাংলাদেশে ঝড়টির প্রভাব মূলত বৃষ্টি হিসেবে দেখা যাবে: ২৮ অক্টোবর সামান্য বৃষ্টি, ২৯ অক্টোবর থেকে উপকূলসহ বিভিন্ন অঞ্চলে বৃষ্টির সম্ভাবনা বেশি, আর ৩০ ও ৩১ অক্টোবর বৃষ্টি বাড়তে পারে।
মাঠে যন্ত্রের ব্যবহার
জাগো নিউজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, মাগুরা জেলায় ধান কাটার কম্বাইন্ড হারভেস্টার রয়েছে ২৬টি, রাইস ট্রান্সপ্লান্টার ৪টি এবং রিপার ৩৩টি। প্রতিবেদনে বলা হয়, একটি কম্বাইন্ড হারভেস্টার ঘণ্টায় এক একর জমির ধান কাটতে পারে। প্রান্তিক কৃষকেরা জানান, চার থেকে পাঁচ হাজার টাকায় যন্ত্র ভাড়া নিলে এক একর জমির ধান কাটা যায়, এতে ধান উৎপাদনের খরচ ও সময় কিছুটা কমে।
দেশের মাঠে এসব যন্ত্র এসেছে মূলত সরকারি ভর্তুকিতে। ঢাকা টাইমস ২০২০ সালের ১৬ জুলাই জানায়, জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) "সমন্বিত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে কৃষি যান্ত্রিকীকরণ" শীর্ষক একটি প্রকল্প অনুমোদন করেছে। এর ব্যয় ধরা হয় ৩ হাজার ২০ কোটি ৬ লাখ টাকা, পুরোটাই সরকারি তহবিল থেকে; মেয়াদ ২০২০ সালের জুলাই থেকে ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত, আর বাস্তবায়নকারী সংস্থা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর। প্রকল্পে অঞ্চলভেদে ৫০ থেকে ৭০ শতাংশ ভর্তুকিতে কম্বাইন হারভেস্টার, রিপার ও রাইস ট্রান্সপ্লান্টারসহ প্রায় ৫১ হাজার ৩০০টি যন্ত্র দেওয়ার পরিকল্পনা ছিল।
প্রথম আলোর ২০২০ সালের ৩০ এপ্রিলের এক প্রতিবেদনে মাঠপর্যায়ে এই ভর্তুকির চিত্র উঠে আসে। সরকার সাধারণত কম্বাইন হারভেস্টারের দামের অর্ধেক দেয়, আর হাওর এলাকায় দেয় ৭০ শতাংশ। এসিআই মোটরসের বিক্রি করা জাপানি ব্র্যান্ড ইয়ানমারের একটি হারভেস্টারের দাম তখন ২৮ লাখ টাকা, আর মেটাল গ্রুপের বিক্রি করা চীনা ব্র্যান্ডের একটির দাম সাড়ে ২০ লাখ টাকা। প্রতিবেদন অনুযায়ী, হাতে ধান কাটতে একরে খরচ হয় ৯ থেকে ১০ হাজার টাকা, হারভেস্টারে লাগে প্রায় ৫ হাজার টাকা; আর যন্ত্রে কাটলে ফসলের অপচয় প্রায় ১২ শতাংশ থেকে ৫ শতাংশের নিচে নেমে আসে। এসিআইয়ের ভাষ্য ছিল, ধান কাটার মৌসুমে দেশের কৃষিতে সাধারণত ৪০ শতাংশ শ্রমিকের ঘাটতি থাকে; প্রতিষ্ঠানটির নির্বাহী পরিচালক সুব্রত রঞ্জন দাস পত্রিকাটিকে বলেন, এক হাজার হারভেস্টার এক মৌসুমে চার লাখ একর জমির ধান কাটতে পারবে।

মাগুরা জেলা: নদী, মানুষ ও ফসল
জাতীয় জ্ঞানকোষ বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী, মাগুরা জেলার আয়তন ১ হাজার ৩৯.১০ বর্গকিলোমিটার, অবস্থান ২৩°১৫' থেকে ২৩°৪১' উত্তর অক্ষাংশের মধ্যে। জেলার উত্তরে রাজবাড়ী, দক্ষিণে যশোর ও নড়াইল, পূর্বে ফরিদপুর এবং পশ্চিমে ঝিনাইদহ। গঙ্গা বদ্বীপের সমতল ভূমিতে অবস্থিত জেলাটি ঢাকা থেকে প্রায় ১৭৬ কিলোমিটার দূরে। এর চারটি উপজেলা হলো মাগুরা সদর (৪০১.৫৮ বর্গকিলোমিটার), মহম্মদপুর (২৩৩.৭০), শালিখা (২২৮.৬৫) ও শ্রীপুর (১৭৫.১৫)। জেলায় একটি পৌরসভা, ৩৬টি ইউনিয়ন, ৫১৩টি মৌজা ও ৭১১টি গ্রাম রয়েছে। প্রধান নদী গড়াই-মধুমতী, নবগঙ্গা ও কুমার।
মাগুরা ১৯৪৫ সালে মহকুমা এবং ১৯৮৪ সালের ১ মার্চ জেলা হয়। ২০২২ সালের জনশুমারিতে জেলায় ২ লাখ ৫৪ হাজার ১৫৪টি খানায় ১০ লাখ ৩৩ হাজার ১১৫ জন মানুষ গণনা করা হয়; প্রতি বর্গকিলোমিটারে প্রায় ৯৯৪ জন, আর শহরে বাস করেন ১৮.৯০ শতাংশ মানুষ। ২০১১ সালের আদমশুমারিতে জেলার ৬৬.৩ শতাংশ খানার আয়ের প্রধান উৎস ছিল কৃষি।
বাংলাপিডিয়ায় মাগুরা সদর উপজেলার প্রধান ফসল হিসেবে ধান, পাট, গম, সরিষা, ছোলা, মসুর, আখ ও সবজির নাম রয়েছে; এই উপজেলার ৬১.৬৪ শতাংশ খানার কৃষিজমি আছে, ৩৮.৩৬ শতাংশ ভূমিহীন। শ্রীপুরের প্রধান ফসল ধান, পাট, গম, সরিষা, ডাল ও সবজি, আর সেখানকার আয়ের প্রায় ৬৪ শতাংশ আসে কৃষি থেকে। মাগুরা সদরের প্রধান রপ্তানিপণ্যের মধ্যে আছে পাট, সুতা ও সবজি।
দেশের ধানের পঞ্জিকায় আমন
বাংলাদেশে বছরে তিন মৌসুমে ধান হয়: আউশ, আমন ও বোরো। বাংলাপিডিয়ার বর্ণনায়, জমির হিসাবে রোপা আমনই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ; ২০০৯-১০ সালে দেশের ধানি জমির প্রায় ৪৬ শতাংশে রোপা আমন হয়েছিল, বোরো ৪১ শতাংশে, আউশ ৯ শতাংশে এবং বোনা আমন ৪ শতাংশে। উৎপাদনের দিক থেকে প্রথম বোরো, তারপর আমন, তারপর আউশ। রোপা আমন সারা দেশে চাষ হয় এবং নভেম্বর থেকে জানুয়ারির মধ্যে কাটা হয়; আর সরাসরি জমিতে বীজ বুনে করা বোনা আমন মূলত দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে হয়, কাটা হয় নভেম্বর ও ডিসেম্বরে। ২০০৯-১০ সালে দেশে মোট আমন উৎপাদন ছিল ১ কোটি ২২ লাখ ৭ হাজার টন, জমি ছিল ১ কোটি ৩৯ লাখ ৯৩ হাজার একর।
২০২৫ মৌসুমের আগে ফসলটি একটি কঠিন বছর পার করেছে। ফিনান্সিয়াল এক্সপ্রেস ২০২৫ সালের ৬ জুলাই বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য উদ্ধৃত করে জানায়, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে আমন উৎপাদন হয়েছে ১ কোটি ৬৫ লাখ টন, যা ২০২৩-২৪ সালের ১ কোটি ৬৬ লাখ টনের চেয়ে সামান্য কম। অথচ ২০২৪ সালের আগস্টের আকস্মিক বন্যায় সাড়ে তিন লাখ হেক্টরের বেশি কৃষিজমি ডুবে গিয়েছিল, যার মাত্র ৩০ হাজার হেক্টরে আবার চারা রোপণ করা যায়। হেক্টরপ্রতি ফলন আগের বছরের ২.৮১ টন থেকে বেড়ে ২.৯৫ টন হয়। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. সাইফুল আলম বলেন, আমনের জমি এক লাখ হেক্টর কমেছে, তবে বাড়তি ফলন সেই ঘাটতি পুষিয়ে দিয়েছে। পত্রিকাটি জানায়, ২০২৩-২৪ সালে দেশের মোট চাল উৎপাদনের ৪০ শতাংশের বেশি এসেছে আমন থেকে।
দেশের অন্য অঞ্চলে এবারের মৌসুম
মাগুরার খবরের কয়েক দিন আগে অন্য অঞ্চলের প্রতিবেদনেও একই রকম চিত্র উঠে আসে। বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস) ২০২৫ সালের ৩১ অক্টোবর জানায়, রংপুর কৃষি অঞ্চলে তখন পর্যন্ত ৩২ হাজার ৯৯০ হেক্টর জমির স্বল্পমেয়াদি আমন কাটা হয়েছে এবং তা থেকে ১ লাখ ৭ হাজার ১১২ টন চাল পাওয়া গেছে। ডিএইর রংপুর অঞ্চলের অতিরিক্ত পরিচালক মো. সিরাজুল ইসলাম বলেন, কৃষকেরা হেক্টরপ্রতি গড়ে ৩.২৫ টন চাল (৪.৮৭৫ টন ধান) পাচ্ছেন। তাঁর ভাষায়, চারা রোপণের সময় খরার মতো পরিস্থিতির পর সাম্প্রতিক বৃষ্টি গাছের জন্য টনিকের মতো কাজ করেছে।
ওই অঞ্চলের পাঁচ জেলায় ডিএই এ মৌসুমে ৬ লাখ ২০ হাজার ৪৩০ হেক্টর জমি থেকে ২০ লাখ ১০ হাজার ৫০৫ টন চাল উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করেছিল। কৃষকেরা আবাদ করেন ৬ লাখ ২১ হাজার ৫০৫ হেক্টরে, যা লক্ষ্যমাত্রার ১০০.১৭ শতাংশ; এর মধ্যে ৬২ হাজার হেক্টরের বেশি জমিতে ছিল স্বল্পমেয়াদি জাত। আগাম স্বল্পমেয়াদি জাতগুলো তখন হেক্টরে ৪.৬০ থেকে ৬.৫০ টন ধান দিচ্ছিল। রংপুরের নাজিরদিগর গ্রামের আরিফুল হক বাটুল জানান, তাঁর আট একর জমিতে বর্গাচাষিরা ব্রি ধান৭৫, ব্রি ধান৫১, ব্রি ধান৫২ ও বিনা ধান১৭ লাগিয়েছেন, আর ৪০ কেজিতে মণ ধরে তিনি একরে ৪৮ থেকে ৫৮ মণ ফলনের আশা করছেন।
দাম, সরকারি সংগ্রহ ও কৃষকের লাভ
মাগুরার কৃষকদের কথায় বারবার দামের প্রসঙ্গ এসেছে। আরজ আলী তাঁর আশা বেঁধেছেন বাজারে ন্যায্যমূল্যের সঙ্গে; তালেব মিয়ার ধারণা, কয়েক বছরের লোকসানের পর কম কৃষক আমন লাগানোয় দাম ভালো হয়েছে; আর ডিএইর উপপরিচালক বলেছেন, এবার কৃষকেরা দাম ভালো পাচ্ছেন। প্রতিবেদনে অবশ্য মাগুরার বাজারে প্রতি মণ ধানের দাম উল্লেখ করা হয়নি।
প্রতি আমন মৌসুমে সরকারও কৃষক ও চালকলমালিকদের কাছ থেকে ধান-চাল কেনে। আগের মৌসুমের জন্য খাদ্য পরিকল্পনা ও পরিধারণ কমিটি ২০২৪ সালের ৬ নভেম্বর প্রতি কেজি ধান ৩৩ টাকা, সেদ্ধ চাল ৪৭ টাকা এবং আতপ চাল ৪৬ টাকা দরে কেনার সিদ্ধান্ত নেয় বলে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম জানায়। উৎপাদন খরচ বাড়ায় এই দর আগের মৌসুমের চেয়ে কেজিতে ৩ টাকা বেশি ধরা হয়। লক্ষ্যমাত্রা ছিল সাড়ে তিন লাখ টন ধান, সাড়ে পাঁচ লাখ টন সেদ্ধ চাল ও এক লাখ টন আতপ চাল; ধান ও সেদ্ধ চাল কেনার সময় ধরা হয় ১৭ নভেম্বর থেকে ২৮ ফেব্রুয়ারি। একই সভায় পাঁচ লাখ টন চাল আমদানির অনুমোদনও দেওয়া হয়।
২০২৪ সালের দুর্বল মৌসুমের চাপ ভোক্তারাও টের পেয়েছেন। ফিনান্সিয়াল এক্সপ্রেস ২০২৫ সালের জুলাইয়ে জানায়, এক মাসে কেজিতে ৬ থেকে ৮ টাকা বেড়ে ঢাকায় মোটা চাল বিক্রি হচ্ছিল ৫৫-৫৬ টাকায়, মাঝারি চাল ৬৪-৬৬ টাকায় এবং সরু চাল ৭৮ থেকে ১০০ টাকায়; আর দেশে চাল আমদানি হয়েছে সাড়ে ১২ লাখ টন। কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের এস এম নাজের হোসাইনের মতে, বন্যার প্রভাবে ২০২৫ সালের মে পর্যন্ত দাম চড়া ছিল, এরপর জুন থেকে আবার বাড়তে শুরু করে।

ফসলের পেছনের জাত ও গবেষণা
দেশে চাষ হওয়া আমনের বেশির ভাগ জাত এসেছে বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি) থেকে। ১৯৭০ সালে প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানটির প্রধান কার্যালয় গাজীপুরের জয়দেবপুরে। ধানের জাত উদ্ভাবন, চাষপদ্ধতি, পোকামাকড় ও রোগ দমনের পাশাপাশি একটি আলাদা বিভাগের মাধ্যমে কৃষিযন্ত্র ও ফসল-উত্তর প্রযুক্তি নিয়েও ব্রি কাজ করে। এর একটি আঞ্চলিক কার্যালয় মাগুরার কাছের জেলা কুষ্টিয়ায়।
প্রথম আলো জানায়, ২০২২ সালের এপ্রিলে ব্রি ও আন্তর্জাতিক ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ইরি) দেশের বিভিন্ন স্থানে তিন বছর ধরে চালানো তুলনামূলক মাঠপরীক্ষার ফল প্রকাশ করে। পরীক্ষিত রোপা আমন জাতগুলোর মধ্যে সারা দেশে সবচেয়ে ভালো ফলন দিয়েছে ব্রি ধান৮৭; আকস্মিক বন্যাপ্রবণ এলাকার জন্য সুপারিশ করা হয় ব্রি ধান৭৯ ও ইরির একটি কৌলিক সারি আইআর১৩এফ৪৪১; আর উত্তরাঞ্চলে ভারতীয় জাত স্বর্ণার বিকল্প হিসেবে চিহ্নিত হয় ব্রি ধান৯৩, ব্রি ধান৯৪ ও ব্রি ধান৯৫।
এমন জাত একজন কৃষকের জন্য কী বদল আনতে পারে, মাঠের খবরে তা দেখা গেছে। দ্য ডেইলি স্টার ২০২০ সালের নভেম্বরে জানায়, পিরোজপুরের নাজিরপুর উপজেলার বানিয়ারী গ্রামে ১৬ জন কৃষকের প্রথমবারের মতো তিন একর জমিতে করা পরীক্ষামূলক চাষে ব্রি ধান৮৭ একরে প্রায় ৫২ মণ ফলন দিয়েছে, যেখানে স্থানীয় জাতে ফলন ছিল প্রায় ২৫ মণ; আর স্থানীয় আমনের ১৬০ দিনের বিপরীতে জাতটি পাকতে সময় নিয়েছে সর্বোচ্চ ১৩০ দিন। কৃষক প্রজেশ কুমার মণ্ডল জানান, স্থানীয় জাতে যেখানে প্রায় সাড়ে ৫ হাজার টাকা খরচ হয়, ব্রি ধান৮৭ চাষে লাগে তার চেয়ে প্রায় ১ হাজার টাকা বেশি; তবে বর্ষাকালে ধান বেড়ে ওঠে বলে সেচের পেছনে টাকা খরচ করতে হয় না। কৃষক আনন্দ রায় পত্রিকাটিকে বলেন, ব্রি ধান৮৭ কাটার পর তাঁরা রবিশস্যের জন্য জমি তৈরি করতে পারবেন, অথচ স্থানীয় জাতের চাষিদের ধান কাটতে আরও প্রায় এক মাস অপেক্ষা করতে হবে। মাগুরার প্রতিবেদনে অবশ্য জাতগুলোর নাম না দিয়ে শুধু "বিভিন্ন জাত" ও হাইব্রিড ধানের কথা বলা হয়েছে।
ছবি: Balaram Mahalder / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, বাংলাপিডিয়া, উইকিপিডিয়া, দ্য ফিনান্সিয়াল এক্সপ্রেস, বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস), প্রথম আলো, ঢাকা টাইমস, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম, দ্য ডেইলি স্টার




মন্তব্য
(০)