বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলায় ২০২৬ সালের ৩ জানুয়ারি, শনিবার সকালে বন্যহাতির আক্রমণে আবদুস ছালাম (৩৫) নামের এক যুবক নিহত হন। উপজেলার বাইশারী ইউনিয়নের আলীক্ষ্যং সড়কের তিতার পাড়া গলাশিরা এলাকায় লোকালয়ে আসা একটি বন্যহাতির ছবি তুলতে গিয়ে তিনি হাতির পায়ে পিষ্ট হন এবং ঘটনাস্থলেই মারা যান। তিনি ওই এলাকার আবদুর সাত্তারের ছেলে। প্রথম আলো ও বাসসের খবরে বলা হয়, পেশায় তিনি ছিলেন নলকূপের মিস্ত্রি।
যেভাবে ঘটে দুর্ঘটনা
প্রথম আলো জানায়, পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রের ভাষ্যে সকাল সাড়ে ছয়টার দিকে হাতিটি লোকালয়ে ঢোকে এবং তখন থেকেই বাসিন্দারা সেটিকে তাড়ানোর চেষ্টা করছিলেন। অনেকে মুঠোফোনে ভিডিও করছিলেন। জাগো নিউজের প্রতিবেদনে স্থানীয় সূত্রের বরাতে বলা হয়, সকাল পৌনে সাতটার দিকে হাতিটি আবদুস ছালামের বাড়ির সামনে দিয়ে রাস্তা পার হচ্ছিল। কৌতূহলবশত তিনি হাতিটির ছবি তুলতে পেছনে কিছুটা এগিয়ে যান।
এ সময় আশপাশে কুকুর ডাকতে শুরু করলে হাতিটি হঠাৎ উত্তেজিত হয়ে ওঠে এবং মুহূর্তের মধ্যে তেড়ে এসে তাঁকে পায়ের নিচে পিষ্ট করে। বাসসের খবরে প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাতে বলা হয়, দৌড়ে সরে যাওয়ার সময় তিনি মাটিতে পড়ে যান। ঘটনাস্থলেই তাঁর মৃত্যু হয়। প্রথম আলোর তথ্য অনুযায়ী, তিতার পাড়া উপজেলা সদর থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরে।

পুলিশ ও বন বিভাগ যা জানায়
বাইশারী ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য উবাচিং মার্মা জাগো নিউজকে জানান, খবর পেয়ে তিনি ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহ উদ্ধার করেন। পরে এলাকাবাসীকে নিয়ে হাতিটিকে তাড়ানোর ব্যবস্থা করা হয়।
নাইক্ষ্যংছড়ি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবদুল বাতেন মৃধা হাতির আক্রমণে মৃত্যুর কথা নিশ্চিত করেন। তিনি জানান, মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে এবং থানায় একটি অপমৃত্যু মামলা হয়েছে। প্রথম আলো জানায়, আইনি প্রক্রিয়া শেষে ময়নাতদন্ত ছাড়াই মরদেহ হস্তান্তর করা হয়।
লামা বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মোস্তাফিজুর রহমান জানান, নিহতের পরিবার ক্ষতিপূরণের আবেদন করলে উপজেলা কমিটি যাচাই-বাছাই করে ক্ষতিপূরণের সুপারিশ করবে, এবং আইন অনুযায়ী বন বিভাগ পরিবারটিকে ক্ষতিপূরণ দেবে। ২০২১ সালের মার্চে বাংলা ট্রিবিউনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ‘বন্যপ্রাণী দ্বারা আক্রান্ত জানমালের ক্ষতিপূরণ বিধিমালা-২০২১’ অনুযায়ী বাঘ, হাতি, কুমির বা ভাল্লুকের আক্রমণে মৃত্যুতে তিন লাখ টাকা, গুরুতর আহত হলে এক লাখ টাকা পর্যন্ত এবং সম্পদের ক্ষতিতে পঞ্চাশ হাজার টাকা পর্যন্ত ক্ষতিপূরণের বিধান রয়েছে।

পাহাড়ি জনপদে মানুষ ও হাতির সংঘাত
নাইক্ষ্যংছড়ি বান্দরবান জেলার একটি উপজেলা; এর উত্তরে লামা, পূর্বে আলীকদম, দক্ষিণে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য এবং পশ্চিমে কক্সবাজার জেলা। বাইশারী এই উপজেলার পাঁচটি ইউনিয়নের একটি। বন অধিদপ্তর চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার অঞ্চলে হাতি চলাচলের যে ১২টি করিডর চিহ্নিত করেছে, তার একটি নাইক্ষ্যংছড়ি-রাজারকুল করিডর; ২০২২ সালে দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড এ তথ্য জানায়।
এশীয় হাতি (Elephas maximus) ১৯৮৬ সাল থেকে আইইউসিএনের লাল তালিকায় বিপন্ন প্রজাতি হিসেবে তালিকাভুক্ত। ২০২৫ সালের অক্টোবরে প্রকাশিত দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, সাম্প্রতিক গবেষণায় বাংলাদেশে হাতির সংখ্যা ২২৮ থেকে ৩২৭টির মধ্যে ধরা হয়। বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের তথ্য উদ্ধৃত করে ওই প্রতিবেদনে জানানো হয়, ২০১৯ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে মানুষ-হাতি সংঘাতে অন্তত ৮৩ জনের মৃত্যু হয়েছে, যার ৪৪ জনই চট্টগ্রাম বিভাগে। আবাস ধ্বংস হয়ে চলাচলের পথ আটকে গেলে খাবারের খোঁজে হাতি লোকালয়ে নেমে আসে। চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, শেরপুর ও বান্দরবানে ১৫৯ সদস্যের এলিফ্যান্ট রেসপন্স টিম (ইআরটি) টহল দেয়।

ছবি: Rifatwm / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, প্রথম আলো, বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস), বাংলা ট্রিবিউন, দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, উইকিপিডিয়া





মন্তব্য
(০)