দক্ষিণ ককেশাস অঞ্চলের দেশ জর্জিয়ার বিজ্ঞানী ও উদ্যোক্তারা মঙ্গল গ্রহে আঙুর চাষের উপায় খুঁজতে একটি গবেষণা প্রকল্প হাতে নিয়েছেন। প্রকল্পটির নাম ‘আইএক্স মিলেনিয়াম’ বা নবম সহস্রাব্দ, যা দেশটির আট হাজার বছরের বেশি পুরোনো আঙুর চাষ ও ওয়াইন তৈরির ঐতিহ্যের দিকে ইঙ্গিত করে। ২০১৯ সালের জানুয়ারিতে মার্কিন দৈনিক দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট এবং বিজ্ঞানবিষয়ক সংবাদমাধ্যম লাইভ সায়েন্স ও স্মিথসোনিয়ান ম্যাগাজিন প্রকল্পটির খবর প্রকাশ করে। লক্ষ্য হলো পৃথিবীর কোন আঙুরের জাত মঙ্গলের কঠোর বিকিরণ, ভয়াবহ ধুলিঝড় ও তাপমাত্রার তীব্র ওঠানামা সইতে পারবে, তা খুঁজে বের করা।
প্রকল্পে কারা, কী পরিকল্পনা
স্মিথসোনিয়ান ম্যাগাজিনের তথ্যে, আইএক্স মিলেনিয়াম সরকারি সংস্থা, বিশ্ববিদ্যালয়ের আঙুর-বিশেষজ্ঞ ও উদ্যোক্তাদের একটি জোট। তারা রাজধানী তিবিলিসির উত্তরে সাগুরামোর সরকারি আঙুর সংগ্রহশালায় নজর দেবে, যেখানে ৪৫০টি দেশি ও ৩৫০টি বিদেশি জাতের আঙুর চাষ হয়। প্রকল্পের উপদেষ্টা ও জর্জিয়ার মহাকাশ গবেষণা সংস্থার প্রতিষ্ঠাতা নিকোলোজ দোবোরজগিনিদজে ওয়াশিংটন পোস্টকে বলেন, ‘একদিন যদি আমরা মঙ্গলে বাস করি, তাহলে জর্জিয়ার অবদান রাখা দরকার। আমাদের পূর্বপুরুষেরা পৃথিবীতে ওয়াইন এনেছিলেন, আমরাও মঙ্গলে তা নিয়ে যেতে পারি।’
লাইভ সায়েন্স জানায়, পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০১৯ সালেই তিবিলিসির একটি হোটেলে ‘ভার্টিক্যাল গ্রিনহাউস’ বা উল্লম্ব খামার বসানোর কথা ছিল। সেখানে মেঝে থেকে ছাদ পর্যন্ত সাজানো পাত্রে মাটি ও বীজ (আঙুর, স্ট্রবেরি ও আরুগুলা শাক) হাইড্রোপনিক আলোর নিচে মানুষের সামান্য হস্তক্ষেপে বড় হবে, যাতে মঙ্গলের কোনো নিয়ন্ত্রিত কৃষি-কক্ষের অবস্থা অনুকরণ করা যায়। এর পাশাপাশি তিবিলিসির বিজনেস অ্যান্ড টেকনোলজি ইউনিভার্সিটির গবেষকেরা পরের কয়েক বছর পরীক্ষাগারে মঙ্গলের মতো পরিবেশ তৈরি করে মাটির নমুনাকে শূন্যের নিচের তাপমাত্রা, উচ্চমাত্রার কার্বন মনোক্সাইড এবং পৃথিবীর প্রায় ৬ হাজার মিটার উচ্চতার মতো পাতলা বাতাসে রাখার পরিকল্পনা করেন।

কেন সাদা আঙুর, কবে ফল
লাইভ সায়েন্সের তথ্যে, এসব পরীক্ষার ফল অন্তত ২০২২ সালের আগে মিলবে না বলে ধারণা করা হচ্ছিল। তবে বিজ্ঞানীদের প্রাথমিক অনুমান ছিল, লাল নয়, সাদা ওয়াইনের আঙুরই মঙ্গলে ভালো করবে। জর্জিয়ার কৃষি বৈজ্ঞানিক গবেষণা কেন্দ্রের পরিচালক লেভান উজমাজুরিদজে ওয়াশিংটন পোস্টকে বলেন, ‘সাদা আঙুর সাধারণত ভাইরাসের বিরুদ্ধে বেশি প্রতিরোধী। তাই আমার ধারণা, বিকিরণের বিরুদ্ধেও এরা ভালো করবে। এদের খোসা বিকিরণ প্রতিফলিত করতে পারে।’ এটি তাঁর অনুমান, পরীক্ষায় প্রমাণিত তথ্য নয়। যে জাতটি নিয়ে আগ্রহ ছিল, তা হলো জর্জিয়ার প্রচলিত সাদা আঙুর রকাতসিতেলি, যার রসে অম্লতা বেশি।
প্রকল্পটি শুধু আঙুর চাষের উপায় খুঁজবে; গাঁজন, বোতলজাত ও সংরক্ষণের কাজ মঙ্গলে বসবাসকারীদেরই করতে হবে। লাইভ সায়েন্স জানায়, কম মাধ্যাকর্ষণে আঙুরের গাঁজন ঠিক কীভাবে হবে তা তখনো কেউ জানত না, তবে নাসার বিজ্ঞানীরা একে সম্ভব মনে করেন। প্রতিবেদনটি আরও বলে, স্পেসএক্সের প্রতিষ্ঠাতা ইলন মাস্ক ২০২৪ সালে মঙ্গলে প্রথম মানুষবাহী অভিযান পাঠানোর ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন, আর নাসা ২০৩০-এর দশকে সেখানে মানুষ পাঠানোর আশা করে।
জর্জিয়ার আট হাজার বছরের ওয়াইন ঐতিহ্য
জর্জিয়ার এই দাবির পেছনে প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ আছে। ২০১৭ সালের নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের বিজ্ঞান সাময়িকী প্রসিডিংস অব দ্য ন্যাশনাল একাডেমি অব সায়েন্সেসে (পিএনএএস) প্রকাশিত এক গবেষণায় জর্জিয়ার নব্য প্রস্তর যুগের বসতি থেকে পাওয়া মাটির পাত্রের রাসায়নিক বিশ্লেষণে খ্রিষ্টপূর্ব আনুমানিক ৬০০০ থেকে ৫৮০০ সালের আঙুরের ওয়াইনের চিহ্ন মেলে। গবেষকদের মতে, এটি নিকট প্রাচ্যে আঙুরের ওয়াইন ও আঙুর চাষের প্রাচীনতম জৈব-অণুভিত্তিক প্রত্নপ্রমাণ। বড় আকারের ওই পাত্রগুলো সম্ভবত একসঙ্গে গাঁজন, সংরক্ষণ ও পরিবেশনের কাজে ব্যবহৃত হতো।

মহাকাশে কৃষি ও পানীয়ের আগের পরীক্ষা
মহাকাশে কৃষির চেষ্টা এটিই প্রথম নয়। লাইভ সায়েন্সের তথ্যে, আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনের (আইএসএস) নভোচারীরা কম মাধ্যাকর্ষণে সালাদের সবজি চাষ শুরু করেছেন, আর চীনের চাং’ই-৪ ল্যান্ডার চাঁদে আলু ও সরিষা-জাতীয় ফুলগাছ রকক্রেস জন্মানোর চেষ্টা করবে। বাডওয়াইজার বিয়ারের প্রস্তুতকারক আনহাইজার-বুশ তিন দফায় বার্লি বীজ আইএসএসে পাঠিয়েছে, কম মাধ্যাকর্ষণে অঙ্কুরোদ্গম, মল্টিং ও গাঁজন কেমন হয় তা দেখতে। আর্ডমোর স্কচ হুইস্কির একটি ব্যাচ ২০১১ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত আইএসএসে ছিল; পৃথিবীতে ফেরার পর এর স্বাদ বদলে গিয়েছিল বলে জানা যায়।
ছবি: Mikheil88 / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0)
সূত্র: দ্য এগ্রো নিউজ, লাইভ সায়েন্স, স্মিথসোনিয়ান ম্যাগাজিন, দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট, প্রসিডিংস অব দ্য ন্যাশনাল একাডেমি অব সায়েন্সেস (পিএনএএস)




মন্তব্য
(০)