কীটনাশক বা বালাইনাশকের বোতল ও প্যাকেটের গায়ে সবুজ, হলুদ বা লাল রঙের একটি দাগ বা চিহ্ন থাকে। ২০২৫ সালের ২৭ আগস্ট জাগো নিউজে প্রকাশিত এক লেখায় কৃষি ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ সমীরণ বিশ্বাস এই রঙের অর্থ ব্যাখ্যা করেন। তাঁর ভাষায়, সবুজ রং কম বিপজ্জনক, হলুদ অতিমাত্রার বিপজ্জনক এবং লাল অতি উচ্চমাত্রার বিপজ্জনক কীটনাশক বোঝায়। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) নির্দেশিকাও বলে, লেবেলের এই রঙিন পট্টি আসলে পণ্যটির বিষাক্ততার মাত্রার সংকেত।
রঙিন পট্টি কোথা থেকে এল
এফএও-র ২০১৫ সালের আগস্টে প্রকাশিত সংশোধিত ‘গাইডলাইনস অন গুড লেবেলিং প্র্যাকটিস ফর পেস্টিসাইডস’ অনুযায়ী, এফএও ডব্লিউএইচও-র বিপদমাত্রাভিত্তিক বালাইনাশক শ্রেণিবিন্যাসের ওপর ভিত্তি করে একটি রঙিন পট্টির পদ্ধতি চালু করেছিল। এতে পণ্যের বিপদ শ্রেণির সঙ্গে মিলিয়ে নির্দিষ্ট রঙের পট্টি লেবেলের নিচের অংশে আড়াআড়ি ছাপা হয়। নির্দেশিকায় বলা হয়েছে, বহু দেশ, বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশগুলো, লেবেলে এই পট্টি বাধ্যতামূলক করেছে। ওই নির্দেশিকার পরিশিষ্টে ডব্লিউএইচও শ্রেণির সঙ্গে রঙের মিল এভাবে দেওয়া আছে:
- শ্রেণি Ia (অত্যন্ত বিপজ্জনক) ও শ্রেণি Ib (উচ্চ বিপজ্জনক): লাল পট্টি
- শ্রেণি II (মাঝারি বিপজ্জনক): হলুদ পট্টি
- শ্রেণি III (সামান্য বিপজ্জনক): নীল পট্টি
- শ্রেণি U (স্বাভাবিক ব্যবহারে তীব্র বিপদের সম্ভাবনা কম): সবুজ পট্টি
ডব্লিউএইচও-র এই শ্রেণিবিন্যাসের সর্বশেষ সংস্করণটি ‘২০১৯ সংস্করণ’, প্রকাশিত হয় ২০২০ সালের মে মাসে। এটি মূলত মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য তীব্র ঝুঁকি বিবেচনা করে, যার জন্য গবেষণাগারে ইঁদুরের ওপর পাওয়া বিষাক্ততার তথ্য (এলডি৫০) ব্যবহার করা হয়। ২০২২ সালে এফএও ও ডব্লিউএইচও নির্দেশিকার দ্বিতীয় সংশোধনী প্রকাশ করে। তাতে জাতিসংঘের জিএইচএস পদ্ধতির ভিত্তিতে নতুন রঙের পরিকল্পনা দেওয়া হয়, সবুজের জায়গায় ধূসর রং আনা হয়, আর ক্যানসার, জিনগত ক্ষতি বা প্রজননে ক্ষতির ঝুঁকিপূর্ণ পণ্যে লাল পট্টি দেওয়ার সুপারিশ করা হয়।
জাগো নিউজের লেখায় প্রতিটি রঙের সঙ্গে ফসল তোলার আগে অপেক্ষার একটি নির্দিষ্ট দিনসংখ্যা জুড়ে দেওয়া হয়েছিল। এফএও নির্দেশিকা অনুযায়ী অবশ্য রঙের পট্টি বোঝায় বিষাক্ততার মাত্রা; ফসল তোলার আগের অপেক্ষার সময় প্রতিটি পণ্যের ব্যবহারবিধিতে আলাদা করে লেখা থাকার কথা, যেমন ‘ফসল তোলার এত দিন বা সপ্তাহ আগে আর প্রয়োগ করবেন না’। তাই অপেক্ষার সময় জানতে প্রতিটি পণ্যের লেবেলই পড়তে হবে।

বাংলাদেশে লেবেলের নিয়ম
বাংলাদেশে বালাইনাশক নিয়ন্ত্রণ করে বালাইনাশক (পেস্টিসাইডস) আইন, ২০১৮, যা ২০১৮ সালের ২৯ জুলাই ১৯৭১ সালের পেস্টিসাইডস অর্ডিন্যান্সের জায়গায় প্রণীত হয়। আইনের ১৬ ধারা অনুযায়ী, প্রতিটি কন্টেইনারের গায়ে টেকসই ট্যাগ বা লেবেল না লাগিয়ে কেউ বালাইনাশক বিক্রি বা বিক্রির জন্য মজুত করতে পারবেন না, এবং লেবেলে ব্র্যান্ডসহ অন্যান্য তথ্য সুস্পষ্ট বাংলা অক্ষরে ছাপা থাকতে হবে। লাইসেন্সিং কর্তৃপক্ষ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উদ্ভিদ সংরক্ষণ উইংয়ের পরিচালক। কোনো ব্র্যান্ডের নিবন্ধনের মেয়াদ তিন বছর।
সবচেয়ে বিপজ্জনক শ্রেণির কীটনাশক বাংলাদেশে আগেই সরানো হয়েছে। ২০১৭ সালে ইন্টারন্যাশনাল জার্নাল অব এপিডেমিওলজিতে প্রকাশিত এক গবেষণা জানায়, ২০০০ সালে ডব্লিউএইচও-র শ্রেণি I-এর সব কীটনাশক নিষিদ্ধ করা হয় এবং ১৯৯৬ থেকে ২০০৭ সালের মধ্যে ২১টি কীটনাশক আংশিক বা পুরোপুরি নিষিদ্ধ হয়। গবেষকদের হিসাবে কীটনাশকে আত্মহত্যার হার ১৯৯৬ সালে প্রতি লাখে ৬.৩ থেকে ২০১৪ সালে ২.২-এ নেমে আসে, অথচ ধান উৎপাদনে নিষেধাজ্ঞার কোনো দৃশ্যমান প্রভাব পাওয়া যায়নি।

স্বাস্থ্যঝুঁকি ও নিরাপদ ব্যবহার
সমীরণ বিশ্বাস লেখায় সতর্ক করেন, কীটনাশকের অপব্যবহার মানুষের শরীরের ক্ষতি করে। ডব্লিউএইচও-র ২০২২ সালের তথ্যপত্র বলছে, কীটনাশক মানুষের জন্য সম্ভাব্য বিষাক্ত এবং কতটা ও কীভাবে সংস্পর্শে আসা হলো তার ওপর নির্ভর করে তীব্র ও দীর্ঘমেয়াদি দুই ধরনের প্রভাবই ফেলতে পারে; বেশি পরিমাণে সংস্পর্শে তীব্র বিষক্রিয়া বা ক্যানসার ও প্রজননে ক্ষতির মতো দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব দেখা দিতে পারে। সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকেন যাঁরা কাজের সূত্রে, বাড়িতে বা বাগানে কীটনাশকের সংস্পর্শে আসেন, বিশেষ করে মাঠে প্রয়োগকারী কৃষিশ্রমিকেরা।
এফএও নির্দেশিকা অনুযায়ী প্রতিটি লেবেলে অন্তত এই সতর্কবার্তাগুলো থাকতে হবে, যা ব্যবহারকারীর জন্য মৌলিক নিয়মও:
- ব্যবহারের আগে লেবেল পড়ুন।
- তালাবদ্ধ করে শিশুদের নাগালের বাইরে রাখুন।
- ব্যবহারের সময় খাওয়া, পান করা বা ধূমপান করবেন না।
- লেবেলে বলা সুরক্ষা পোশাক ও সরঞ্জাম ব্যবহার করুন এবং কাজ শেষে হাত-মুখ ধুয়ে নিন।
- খালি পাত্র অন্য কাজে আবার ব্যবহার করবেন না।
ডব্লিউএইচও আরও বলে, ফল ও সবজি ধুয়ে বা খোসা ছাড়িয়ে খেলে কীটনাশকের অবশিষ্টাংশ গ্রহণ কমানো যায়। কোন ফসলে কোন বালাইনাশক কখন দেওয়া যাবে, তা জানতে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা বা উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তার পরামর্শ নিন। কীটনাশক শরীরে গেলে বা গায়ে লেগে অসুস্থ বোধ করলে দেরি না করে চিকিৎসকের কাছে বা হাসপাতালে যান।

ছবি: T. R. Shankar Raman / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: জাগো নিউজ২৪, জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও), বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও), বালাইনাশক (পেস্টিসাইডস) আইন, ২০১৮ (বাংলাদেশের আইন), ইন্টারন্যাশনাল জার্নাল অব এপিডেমিওলজি




মন্তব্য
(০)