সরাসরিবাজারদর
আটা (প্যাকেটজাত)৫৮—আদা - আমদানিকৃত১৬৭—আদা - দেশী১৫৪—আমন চাল - মাঝারি৫৬—আমন চাল - মোটা৪৮—আমন চাল - সরু৭২—আয়োডিনযুক্ত লবণ (প্যাকেটজাত)৩২—কাঁচা মরিচ২১৮—খামারের মুরগী১৬২—খাসী৯০০—চিনি (দেশী)১৩২—ছোলা - গোটা৮৫—ডিম ফার্ম - লাল৪৭—পেঁয়াজ - দেশী৬০—বোরো চাল - মাঝারি৫৫—বোরো চাল - মোটা৪৭—বোরো চাল - সরু৬৬—মাংসঃ– গরু৭২৯—মুগ ডাল১২২—রসুন - আমদানিকৃত১৯২—রসুন - দেশী১৭৩—সয়াবিন তেল১৬৩—
হালনাগাদ ১৬ অক্টোবর ২০২৬
ঢাকা২৬°পরিষ্কার আকাশআর্দ্রতা ৭৪%বাতাস ৩ কিমি/ঘ

উন্নত দেশের কৃষি থেকে বাংলাদেশ যা শিখতে পারে: এক বিশেষজ্ঞের বিশ্লেষণ

কৃষি ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ সমীরণ বিশ্বাস ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে জাগো নিউজ ২৪-এ লেখেন, যান্ত্রিকীকরণ, স্মার্ট ফার্মিং, গবেষণা, ডিজিটাল বাজার, জৈব কৃষি, কৃষকবীমা ও প্রশিক্ষণে উন্নত দেশের পথ অনুসরণ করলে বাংলাদেশের কৃষি আরও আধুনিক ও লাভজনক হতে পারে।

উন্নত দেশের কৃষি থেকে বাংলাদেশ যা শিখতে পারে: এক বিশেষজ্ঞের বিশ্লেষণ
এগ্রোটেক

২০২৫ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর জাগো নিউজ ২৪ উন্নত দেশের কৃষি থেকে বাংলাদেশ কী শিখতে পারে, সে বিষয়ে কৃষি ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ সমীরণ বিশ্বাসের একটি বিশ্লেষণ প্রকাশ করে। লেখক শুরু করেন এই কথা দিয়ে যে বাংলাদেশ একটি কৃষিনির্ভর দেশ, যেখানে জনসংখ্যার একটি বড় অংশ সরাসরি কৃষির সঙ্গে জড়িত; কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তন, জনসংখ্যা বৃদ্ধি, কৃষিজমি কমে যাওয়া এবং প্রযুক্তির সীমিত ব্যবহার কৃষিকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। তাঁর মতে, উন্নত দেশগুলোর কৃষি ব্যবস্থাপনা, অর্থাৎ তাদের উদ্ভাবনী পদ্ধতি, প্রযুক্তির ব্যবহার ও কৃষক কল্যাণের মডেল, বাংলাদেশের কৃষিকে আরও আধুনিক, টেকসই ও লাভজনক করার জন্য একটি আদর্শ হতে পারে।

লেখক সাতটি শিক্ষার কথা বলেন: যান্ত্রিকীকরণ, স্মার্ট ফার্মিং, গবেষণা ও উদ্ভাবন, ডিজিটাল সাপ্লাই চেইন, অর্গানিক কৃষি, কৃষক কল্যাণ ও সামাজিক সুরক্ষা এবং কৃষি শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ। তাঁর যুক্তি, এসব থেকে শিক্ষা নিয়ে বাংলাদেশে স্মার্ট কৃষি বিপ্লব ঘটানো সম্ভব, তবে সে জন্য প্রযুক্তি সহজলভ্য হওয়া, কৃষকের ক্ষমতায়ন এবং গবেষণা ও নীতিগত সহায়তা দরকার। এই পথে এগোলে দেশ শুধু খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণই হবে না, বরং রপ্তানিমুখী ও পরিবেশবান্ধব কৃষি অর্থনীতির দিকে এগিয়ে যাবে বলে তিনি লেখেন। এই প্রতিবেদনে তাঁর প্রতিটি প্রস্তাবের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট সরকারি পরিসংখ্যান ও আগের প্রতিবেদন তুলে ধরা হলো, যেগুলো সবই লেখাটি প্রকাশের তারিখ পর্যন্ত প্রকাশিত এবং যেগুলো দেখায় প্রতিটি বিষয়ে বাংলাদেশ তখন কোথায় দাঁড়িয়ে ছিল।

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে কৃষির অবস্থান


কৃষি যে এখনো দেশের সবচেয়ে বড় কর্মসংস্থানের খাত, লেখকের এই সূচনাবিন্দুকে সরকারি পরিসংখ্যান সমর্থন করে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) শ্রমশক্তি জরিপ ২০২২ বিশ্লেষণ করে দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড ২০২৩ সালের এপ্রিলে জানায়, মোট কর্মসংস্থানে কৃষির অংশ ২০১৭ সালের ৪০.৬ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০২২ সালে ৪৫.৪ শতাংশ হয়েছে, আর একই সময়ে শিল্প খাতের অংশ ২০.৪ শতাংশ থেকে কমে ১৭ শতাংশে নেমেছে। একই বিশ্লেষণে বলা হয়, গ্রামীণ নারীদের কর্মসংস্থান ২০১৭ সালের ১৮.৭ মিলিয়ন থেকে বেড়ে ২০২২ সালে ২৫ মিলিয়নে পৌঁছেছে।

তবে পুরো অর্থনীতিতে কৃষির ওজন উল্টো দিকে গেছে। একই প্রতিবেদনে মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) কৃষির অংশ ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ১৩.৬ শতাংশ এবং ২০২১-২২ অর্থবছরে ১১.৭ শতাংশ বলে উল্লেখ করা হয়, যেখানে শিল্পের অংশ ৩২.৭ শতাংশ থেকে বেড়ে ৩৫.৩ শতাংশ হয়েছে। অর্থাৎ দেশের কর্মজীবীদের ক্রমবর্ধমান একটি অংশ এমন একটি খাত থেকে জীবিকা নির্বাহ করছিলেন, জাতীয় উৎপাদনে যার অংশ কমছিল।

লেখাটি প্রকাশের সময় পাওয়া সর্বশেষ জাতীয় হিসাবও খাতটির জন্য একটি কঠিন বছরের ইঙ্গিত দিচ্ছিল। দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালের মে মাসে প্রকাশিত সাময়িক হিসাবে বিবিএস ২০২৪-২৫ অর্থবছরে কৃষি খাতের প্রবৃদ্ধি ১.৭৯ শতাংশ ধরেছিল, যা ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ছিল ৩.৩০ শতাংশ; আর সামগ্রিক জিডিপি প্রবৃদ্ধি ধরা হয়েছিল ৩.৯৭ শতাংশ, আগের বছর যা ছিল ৪.২২ শতাংশ। একই হিসাবে মাথাপিছু আয় ২ হাজার ৭৩৮ ডলার থেকে বেড়ে প্রায় ২ হাজার ৮২০ মার্কিন ডলার হয়।

যান্ত্রিকীকরণ: যন্ত্র, ভর্তুকি ও বিক্রয়োত্তর সেবা


লেখকের প্রথম শিক্ষা যান্ত্রিকীকরণ। তিনি লেখেন, উন্নত দেশগুলোতে ট্রাক্টর, কম্বাইন হারভেস্টার ও ড্রোনের মতো কৃষিযন্ত্রের ব্যবহার ব্যাপক, যাতে সময় ও শ্রম দুটোই সাশ্রয় হয়; ড্রোন দিয়ে জমির স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণ, কীটনাশক ছিটানো ও ফলনের পূর্বাভাস দেওয়া হয়। বাংলাদেশে এসব প্রযুক্তির ধীরে ধীরে বিস্তার ঘটলেও তা এখনো সীমিত। তাই সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে সহজ শর্তে যন্ত্রপাতি সরবরাহ ও কৃষকদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি তথ্য দেখায় সেখানে এ ধরনের যন্ত্র কতটা ছড়িয়েছে। মার্কিন কৃষি বিভাগের (ইউএসডিএ) অর্থনৈতিক গবেষণা সার্ভিস (ইআরএস) ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে জানায়, ২০২৩ সালে ট্রাক্টর, হারভেস্টার ও অন্যান্য যন্ত্রে স্বয়ংক্রিয় স্টিয়ারিং বা গাইডেন্স ব্যবস্থা ব্যবহার করেছে মাঝারি আকারের খামারের ৫২ শতাংশ এবং বড় ফসল উৎপাদনকারী খামারের ৭০ শতাংশ। বড় ফসল খামারের ৬৮ শতাংশে ফলন মনিটর, ফলনের মানচিত্র ও মাটির মানচিত্র ব্যবহার হয়েছে। ইআরএস দেখেছে, খামার যত বড়, এসব সূক্ষ্ম প্রযুক্তির ব্যবহার তত বেশি, আর প্রযুক্তিভেদে ব্যবহারের হারে বড় পার্থক্য রয়েছে।

লেখক যে ধরনের সহায়তার কথা বলেছেন, বাংলাদেশে তেমন একটি বড় ভর্তুকি কর্মসূচি আগে থেকেই চলছিল। দ্য ডেইলি স্টার ২০২৩ সালের জুলাইয়ে জানায়, ২০২০ সালের জুলাইয়ে শুরু হওয়া ৩ হাজার ২০ কোটি টাকার পাঁচ বছর মেয়াদি কৃষি যান্ত্রিকীকরণ প্রকল্পটি ২০০৯ সালের পর এ ধরনের তৃতীয় প্রকল্প। এর আওতায় হাওর ও উপকূলীয় এলাকার কৃষকেরা ৭০ শতাংশ এবং অন্য এলাকার কৃষকেরা ৫০ শতাংশ ভর্তুকিতে যন্ত্র কিনতে পারেন, আর যন্ত্র সরবরাহের জন্য ৩৪টি প্রতিষ্ঠানকে নিয়োগ দেওয়া হয়। নিয়োগপ্রাপ্ত সরবরাহকারীর কাছ থেকে ক্রেতারা তিন বছরের বিক্রয়োত্তর সেবা পাওয়ার কথা, আর কম্বাইন হারভেস্টার, পাওয়ার থ্রেশার ও রাইস ট্রান্সপ্লান্টারে ত্রুটি নির্ণয় ও মেরামতসহ এক বছরের ওয়ারেন্টি থাকার কথা।

একই প্রতিবেদনে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) একটি জরিপে পাওয়া সমস্যার কথা তুলে ধরা হয়। ৩২ জেলার ১ হাজার ৮২৪ জন কৃষকের ওপর চালানো ওই জরিপে প্রায় ৭৪ শতাংশ কৃষক বলেন, ভর্তুকির যোগ্য তালিকায় নাম তোলাতে তাঁদের বেগ পেতে হয়েছে; প্রায় ৪৩ শতাংশ বলেন, টাকা দেওয়ার পরও যন্ত্র পেতে ঝামেলা হয়েছে; আর প্রায় ৬ শতাংশ বলেন, তাঁরা নিম্নমানের যন্ত্র পেয়েছেন। স্থানীয় সরবরাহকারীর কাছ থেকে বিক্রয়োত্তর সেবা পেতে দেরির কথাও জানান কৃষকেরা। ২০২১ সালে কম্বাইন হারভেস্টার কেনা টাঙ্গাইলের এক কৃষক পত্রিকাটিকে বলেন, প্রথম বছর যন্ত্রটি ভালো চললেও এরপর এর কর্মক্ষমতা কমতে থাকে, আর সেবা পেতে সমস্যার কারণে তাঁর উৎপাদনশীলতা কমে গেছে। সহজ শর্তে যন্ত্রের সঙ্গে প্রশিক্ষণ দেওয়ার যে আহ্বান লেখক জানিয়েছেন, এই তথ্যগুলো সরাসরি তার সঙ্গে সম্পর্কিত।

স্মার্ট ফার্মিং, ড্রোন ও ফোনে কৃষি পরামর্শ


দ্বিতীয় শিক্ষা স্মার্ট ফার্মিং। লেখক উল্লেখ করেন, উন্নত দেশগুলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), ইন্টারনেট অব থিংস (আইওটি), সেন্সর ও স্যাটেলাইট প্রযুক্তি ব্যবহার করে জমির আর্দ্রতা, পুষ্টি ও রোগের অবস্থা জানে, ফলে সঠিক সময়ে সেচ, সার ও কীটনাশক প্রয়োগ করা সম্ভব হয়। তাঁর মতে, বাংলাদেশে স্মার্ট ফার্মিং চালু করতে হলে কৃষকদের ডিজিটাল প্রশিক্ষণ দিতে হবে এবং মোবাইল ফোন, মোবাইল অ্যাপ ও ইন্টারনেটের মাধ্যমে স্থানীয় ভাষায় প্রযুক্তি সহজলভ্য করতে হবে।

লেখক যে পদ্ধতির কথা বলেছেন, তাকে সাধারণত প্রিসিশন বা সূক্ষ্ম কৃষি বলা হয়। এটি এমন একটি ব্যবস্থাপনা কৌশল, যেখানে আলাদা আলাদা গাছ, প্রাণী ও জমির বিভিন্ন অংশের তথ্য সংগ্রহ, প্রক্রিয়া ও বিশ্লেষণ করে অন্যান্য তথ্যের সঙ্গে মিলিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, যাতে সম্পদের দক্ষ ব্যবহার হয় এবং উৎপাদনশীলতা, গুণমান, মুনাফা ও টেকসই ভাব বাড়ে। স্যাটেলাইটভিত্তিক অবস্থান নির্ণয় ব্যবস্থা (জিপিএস ও অন্যান্য জিএনএসএস) আসার পর এটি সম্ভব হয়েছে; এর সাহায্যে কৃষক একটি জমির এক অংশ থেকে আরেক অংশে ফলন, ভূপ্রকৃতি, জৈব পদার্থ, আর্দ্রতা, নাইট্রোজেন ও অন্যান্য বিষয় কীভাবে বদলায়, তার মানচিত্র তৈরি করতে পারেন। জিপিএসযুক্ত কম্বাইন হারভেস্টারে বসানো সেন্সর এসব তথ্য রেকর্ড করে, আর ভেরিয়েবল রেট বীজ বপন যন্ত্র ও স্প্রেয়ার সেই তথ্য ও স্যাটেলাইট ছবি ব্যবহার করে যেখানে দরকার সেখানে উপকরণ দেয়। মাল্টিস্পেকট্রাল ক্যামেরাযুক্ত ড্রোন জমির ছবি তুলে এনডিভিআই মানচিত্রের মতো ফসলের সতেজতার মানচিত্র তৈরি করতে পারে, যা কোথায় পানি, সার বা আগাছানাশক দরকার তা ঠিক করতে সাহায্য করে।

লেখাটি প্রকাশের আগে বাংলাদেশে কৃষিকাজে ড্রোনের অভিজ্ঞতা ছোট পরিসরের হলেও বাড়ছিল। দ্য ডেইলি স্টার ২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে জানায়, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইলেকট্রনিকস অ্যান্ড কমিউনিকেশন ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের এক স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের ৪ লাখ টাকা অর্থায়নে একটি রেডিও নিয়ন্ত্রিত ড্রোন তৈরি করেছেন। এটি ৩ লিটার কীটনাশক বহন করতে পারত, পূর্ণ চার্জে প্রায় ২৫ মিনিট উড়তে পারত এবং প্রায় আধা ঘণ্টায় এক বিঘা জমিতে ছিটাতে পারত, যেখানে হাতে ছিটাতে লাগে দুই থেকে তিন ঘণ্টা। তখন সেটি বাণিজ্যিক ব্যবহারের অনুমোদনের অপেক্ষায় ছিল। একই প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১৫ সালে বরিশাল ও পটুয়াখালীতে কৃষিবিদেরা ফসল পর্যবেক্ষণে ড্রোন ব্যবহার করেন, যা দেশে এ ধরনের প্রথম ব্যবহার।

২০২৪ সালের এপ্রিলে ঢাকা ট্রিবিউন জানায়, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (ডিএই) ফসল পর্যবেক্ষণ ও ফসলের ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণে ড্রোন ও স্যাটেলাইট ছবি ব্যবহারের ওপর সাত দিনের একটি প্রশিক্ষণ শুরু করেছে, যা পরিচালনা করেন আন্তর্জাতিক শুষ্ক অঞ্চল ফসল গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইক্রিস্যাটের ভূ-স্থানিক বিশেষজ্ঞেরা। প্রথম দফায় ডিএইর প্রায় ২০ জন কর্মকর্তা অংশ নেন, আর প্রশিক্ষণে সিলেটে মাঠ পরিদর্শন ছিল, যেখানে ২০২২ সালের বন্যায় ফসলের বড় ক্ষতি হয়েছিল। অনুদানটি এসেছিল জাপান সরকারের অর্থায়নে গঠিত জাপান ফান্ড ফর প্রসপারাস অ্যান্ড রেজিলিয়েন্ট এশিয়া অ্যান্ড দ্য প্যাসিফিক থেকে।

লেখক মোবাইল ফোনে পরামর্শের যে কথা বলেছেন, তার একটি প্রাথমিক রূপ আগে থেকেই ছিল। ঢাকা ট্রিবিউন ২০১৬ সালের অক্টোবরে জানায়, ডিএই ২০১৪ সালের জুনে ১৬১২৩ নম্বরে কৃষি কল সেন্টার চালু করে। ঢাকার খামারবাড়িতে কৃষি কর্মকর্তারা ফোন ধরেন; সাধারণ ফসলের সমস্যায় তাঁরা চার্ট ও ম্যানুয়াল দেখে তাৎক্ষণিক সমাধান দেন, আর নতুন সমস্যা বা মাঠ পরিদর্শন দরকার এমন ক্ষেত্রে কৃষককে তাঁর এলাকার কর্মকর্তাদের যোগাযোগের ঠিকানা দেন। পত্রিকাটির তথ্য অনুযায়ী, সেবাটি তখন শুক্রবার ও সরকারি ছুটির দিন ছাড়া সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত খোলা থাকত; শুরুতে কল বিনা মূল্যে করা যেত, পরে প্রতি মিনিটে ২৫ পয়সা খরচ হতো।

কৃষি ড্রোন দিয়ে ধানখেতে ছিটানো হচ্ছে; প্রসঙ্গ বোঝাতে দেওয়া ছবি, আলোকচিত্রী স্থানের নাম উল্লেখ করেননি। ছবি: Shreesha Sharma / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
কৃষি ড্রোন দিয়ে ধানখেতে ছিটানো হচ্ছে; প্রসঙ্গ বোঝাতে দেওয়া ছবি, আলোকচিত্রী স্থানের নাম উল্লেখ করেননি। ছবি: Shreesha Sharma / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)

গবেষণা ও উদ্ভাবন: জাতীয় কৃষি গবেষণা ব্যবস্থা


তৃতীয়ত, লেখক গবেষণার কথা বলেন। তিনি লেখেন, উন্নত দেশগুলো কৃষি গবেষণায় বিপুল বিনিয়োগ করে উচ্চফলনশীল, রোগ প্রতিরোধী ও জলবায়ুসহনশীল জাত উদ্ভাবন করে এবং জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং ও বায়োটেকনোলজি ব্যবহার করে ফসলের গুণগত মান বাড়ায়। তিনি বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি), বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বারি) ও বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিএলআরআই) মতো প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও শক্তিশালী করে গবেষণার পরিধি বাড়ানোর আহ্বান জানান।

এই প্রতিষ্ঠানগুলো জাতীয় কৃষি গবেষণা ব্যবস্থার অংশ, যার নেতৃত্বে রয়েছে ঢাকার ফার্মগেটে অবস্থিত বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল (বিএআরসি)। ১৯৭৩ সালে রাষ্ট্রপতির ৩২ নম্বর আদেশে বিএআরসি প্রতিষ্ঠিত হয়। এই ব্যবস্থার সাতটি গবেষণা প্রতিষ্ঠান কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীন: বারি, ব্রি, বাংলাদেশ গম ও ভুট্টা গবেষণা ইনস্টিটিউট, মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউট, বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউট, বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট এবং বাংলাদেশ সুগারক্রপ গবেষণা ইনস্টিটিউট। বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট ও বিএলআরআই মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের অধীন।

ব্রির যাত্রা শুরু ১৯৭০ সালের ১ অক্টোবর, পূর্ব পাকিস্তান ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট নামে; স্বাধীনতার পর সংসদের আইনে এর বর্তমান নাম হয়। এর সদর দপ্তর গাজীপুরের জয়দেবপুরে, আর দেশের বিভিন্ন কৃষি-পরিবেশ অঞ্চলে এর ১৭টি আঞ্চলিক কার্যালয় রয়েছে। ২০২৩ সাল পর্যন্ত এর মোট জনবল ছিল ৭৮৬ জন, যার মধ্যে ৩০৮ জন বিজ্ঞানী; ২০২২-২৩ অর্থবছরে এর বাজেট ছিল প্রায় ১.১ বিলিয়ন টাকা, যা ২০১২-১৩ অর্থবছরে ছিল ৭৮৫ মিলিয়ন টাকা। প্রতিষ্ঠানটি এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক, বিল অ্যান্ড মেলিন্ডা গেটস ফাউন্ডেশন, আন্তর্জাতিক ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটসহ বিভিন্ন অংশীদারের অনুদানও পায়। এর গবেষণা সাতটি কর্মসূচি এলাকায় সাজানো, যার মধ্যে রয়েছে জাত উদ্ভাবন, বালাই ব্যবস্থাপনা, খামার যান্ত্রিকীকরণ ও প্রযুক্তি হস্তান্তর। প্রথম দিকের উচ্চফলনশীল জাত বিআর-৩ সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে এবং আউশ, আমন ও বোরো, তিন মৌসুমেই চাষ হতে থাকে।

১৯৭৬ সালে স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান হিসেবে যাত্রা শুরু করা বারির উৎস ১৯০৮ সালের ঢাকা ফার্ম। ধান, পাট, আখ ও চা ছাড়া, যেগুলোর জন্য আলাদা প্রতিষ্ঠান আছে, সব ফসল নিয়ে বারি গবেষণা করে। জয়দেবপুরে এর কেন্দ্রীয় গবেষণা কেন্দ্র ১৭৬ হেক্টর জায়গাজুড়ে, যার ১২৬ হেক্টর পরীক্ষামূলক মাঠ। ঈশ্বরদী, জামালপুর, যশোর, হাটহাজারী, রহমতপুর ও আকবরপুরে এর আঞ্চলিক গবেষণা কেন্দ্র, খাগড়াছড়ি, রামগড় ও রাইখালীতে পাহাড়ি গবেষণা কেন্দ্র এবং কন্দাল ফসল, গম, উদ্যান, ডাল, তেলবীজ ও মসলা গবেষণা কেন্দ্র রয়েছে। বিএলআরআই ১৯৮৪ সালে সাভারে প্রতিষ্ঠিত হয় এবং প্রাণিসম্পদ নিয়ে গবেষণা করে; ২০১৪ সালে প্রতিষ্ঠানটি এমন একটি লেয়ার মুরগির জাত উদ্ভাবন করে, যার বাচ্চা মোরগ না মুরগি তা জন্মের প্রথম দিনেই বোঝা যায়।

বিনিয়োগ নিয়ে লেখকের উদ্বেগের পক্ষে গবেষণা ব্যয়ের সবচেয়ে বিস্তারিত সমীক্ষাটিও সাক্ষ্য দেয়। আন্তর্জাতিক খাদ্যনীতি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (ইফপ্রি) এগ্রিকালচারাল সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি ইন্ডিকেটরস (এএসটিআই) কর্মসূচি ও বিএআরসির ২০১৪ সালের একটি কান্ট্রি ফ্যাক্টশিটে বলা হয়, ২০১২ সালে বাংলাদেশের কৃষি গবেষণার তীব্রতা অনুপাত, অর্থাৎ কৃষি জিডিপির তুলনায় গবেষণা ব্যয়, ছিল ০.৪০ শতাংশ, যা খুবই কম। তবে ফ্যাক্টশিটে এটিও বলা হয় যে ন্যাশনাল এগ্রিকালচারাল টেকনোলজি প্রজেক্ট (২০০৯-২০১৪) চালুর পর বিনিয়োগ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে এবং কৃষি গবেষকের সংখ্যাও অনেক বেড়েছে।

রাজশাহীতে বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের (ব্রি) আঞ্চলিক কার্যালয়। ছবি: Omitab obak / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
রাজশাহীতে বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের (ব্রি) আঞ্চলিক কার্যালয়। ছবি: Omitab obak / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)

ডিজিটাল বাজার, কোল্ড চেইন ও রপ্তানির একটি দৃষ্টান্ত


চতুর্থ শিক্ষা সরবরাহ ব্যবস্থা নিয়ে। লেখক লেখেন, উন্নত দেশগুলোতে কৃষকেরা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে পণ্য বাজারজাত করে সরাসরি ভোক্তার সঙ্গে যুক্ত হন, আর লজিস্টিকস ও ট্রেসেবিলিটি বা পণ্যের উৎস শনাক্তের ব্যবস্থা নিশ্চিত থাকে। বাংলাদেশের কৃষকের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করতে তিনি ডিজিটাল মার্কেটপ্লেস তৈরি এবং কোল্ড চেইন ও পরিবহন ব্যবস্থার আধুনিকায়নের আহ্বান জানান।

সরকার এমন একটি প্ল্যাটফর্ম পাঁচ বছর আগেই চালু করেছিল। দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড ২০২০ সালের জুনে জানায়, দেশের প্রথম সরকারি উন্মুক্ত কৃষি বাজার হিসেবে বর্ণিত ফুড ফর নেশন ২০২০ সালের ২৩ মে উদ্বোধন করা হয়, যখন কোভিড-১৯ মহামারিতে সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছিল। এটি এটুআই (অ্যাকসেস টু ইনফরমেশন) কর্মসূচির অধীনে চলত, আর কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের কর্মকর্তারাও এতে যুক্ত ছিলেন। কৃষক, ব্যবসায়ী, মজুতদার ও ক্রেতারা সেখানে পণ্যের বিজ্ঞাপন দিতে, দাম ও মান যাচাই করতে এবং যোগাযোগ খুঁজে পেতে পারতেন; সাইটে ফসলের দৈনিক দামও দেওয়া থাকত। প্রথম মাসে ১ হাজার ৩৫২ জন ব্যবহারকারী নিবন্ধন করেন এবং ১ হাজার ৬৮২টি পণ্যের বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়; শুরুর দিকে ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় ৬০ টন আম, ১৫ টন সবজি ও ১ লাখ ৬৬ হাজার লিচু পাঠানো হয়। একই প্রতিবেদনে এমন প্ল্যাটফর্মের সীমাবদ্ধতাও উঠে আসে: পরিবহন খরচের কারণে ক্রেতারা নিরুৎসাহিত হচ্ছিলেন, কুরিয়ারে ফল পাঠানো সহজ হলেও অন্য পণ্য পাঠানো কঠিন ছিল, আর অনেক সম্ভাব্য ব্যবহারকারী তখনো সাইটটির সঙ্গে পরিচিত ছিলেন না।

লেখক যে দুর্বল কোল্ড চেইনের কথা বলেছেন, তার মূল্য অনেক দিন ধরেই নষ্ট হওয়া ফসলে মাপা হচ্ছে। দ্য ডেইলি স্টারের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৩ সালের সেপ্টেম্বরে ঢাকায় এক সংলাপে বারির এক মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা বিবিএসের ২০১০-১১ সালের তথ্য তুলে ধরে জানান, ফসল তোলার পর ক্ষতির হার লিচুতে ৮.১ শতাংশ থেকে কাঁঠালে ৩২.৪ শতাংশ পর্যন্ত; কলায় ৩০.৮ শতাংশ, টমেটোতে ২৭.৬৪ শতাংশ, বাঁধাকপিতে ২৪.৪৪ শতাংশ এবং শিমে ২৪.২৯ শতাংশ। তিনি বলেন, হিমাগারগুলো প্রায় পুরোপুরি আলুর জন্য ব্যবহৃত হয়, অন্য উদ্যান ফসলের জন্য প্রায় কোনো হিমাগার নেই, আর কৃষকের চেয়ে ব্যবসায়ী পর্যায়ে ক্ষতি অনেক বেশি। এর আগে অধ্যাপক এম কামরুল হাসানের নেতৃত্বে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের নিয়ে করা একটি সমীক্ষা ২০১১ সালের অক্টোবরে জানায়, ১৩টি ফল ও সবজি ফসল তোলার পর নষ্ট হওয়ায় খুচরা দামে দেশের বছরে প্রায় ৩ হাজার ৪৪২ কোটি টাকার ক্ষতি হয় এবং ক্ষতির হার ২৩.৬ থেকে ৪৩.৫ শতাংশ। এর কারণ হিসেবে স্থানীয় বাজার থেকে পাইকারি বাজারে দুর্বল পরিবহন, সংরক্ষণাগারের অভাব ও পণ্যের অযত্নে নাড়াচাড়াকে দায়ী করা হয়।

লেখাটিতে নির্দিষ্ট কোনো দেশের নাম ছিল না। লেখক যে রপ্তানিমুখী কৃষি অর্থনীতির কথা বলেছেন, উন্নত দেশগুলোর মধ্যে তার একটি দৃষ্টান্ত নেদারল্যান্ডস। দেশটির পরিসংখ্যান সংস্থা স্ট্যাটিস্টিকস নেদারল্যান্ডস (সিবিএস) ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে জানায়, ২০২৪ সালে নেদারল্যান্ডস ১২৮.৯ বিলিয়ন ইউরোর কৃষিপণ্য রপ্তানি করেছে, যা ২০২৩ সালের চেয়ে ৪.৮ শতাংশ বেশি। এই রপ্তানি থেকে ডাচ অর্থনীতির আনুমানিক আয় ৪৭.৪ বিলিয়ন ইউরো, যার ৪২.৩ বিলিয়ন ইউরো এসেছে নেদারল্যান্ডসে উৎপাদিত পণ্য থেকে এবং ৫.২ বিলিয়ন ইউরো পুনঃরপ্তানি থেকে। তালিকার শীর্ষে ছিল দুগ্ধজাত পণ্য ও ডিম, ১২.৩ বিলিয়ন ইউরো; এরপর উদ্যান ফসল ১১.৯ বিলিয়ন এবং মাংস ১০.৭ বিলিয়ন ইউরো। রপ্তানির এক-চতুর্থাংশ গেছে জার্মানিতে।

নেদারল্যান্ডসের দক্ষিণ হল্যান্ড প্রদেশের ওয়েস্টল্যান্ডে গ্রিনহাউস। ছবি: Vera de Kok / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0)
নেদারল্যান্ডসের দক্ষিণ হল্যান্ড প্রদেশের ওয়েস্টল্যান্ডে গ্রিনহাউস। ছবি: Vera de Kok / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0)

অর্গানিক কৃষি ও সনদ ব্যবস্থা


পঞ্চম শিক্ষা অর্গানিক বা জৈব কৃষি। লেখক উল্লেখ করেন, উন্নত দেশে অর্গানিক ফার্মিং জনপ্রিয়: সেখানে রাসায়নিকমুক্ত, পরিবেশবান্ধব ও স্বাস্থ্যসম্মত খাদ্য উৎপাদন হয় এবং বাজারে তা উচ্চমূল্যে বিক্রি হয়। বাংলাদেশে অর্গানিক কৃষিকে উৎসাহিত করতে তিনি সনদ ও ব্র্যান্ডিং ব্যবস্থা গড়ে তোলার পাশাপাশি প্রশিক্ষণ ও সচেতনতা বাড়ানোর কথা বলেন।

বাংলাদেশ এ বিষয়ে ২০১৬ সালে একটি নীতি গ্রহণ করেছিল। দ্য ডেইলি স্টার ২০১৭ সালের জুনে জানায়, সরকার আগের বছর বাংলাদেশ জৈব কৃষি নীতি অনুমোদন করেছে এবং এতে একটি সনদ প্রদানকারী সংস্থা গঠনের বিধান রয়েছে। পত্রিকাটির তথ্য অনুযায়ী, তখন প্রায় ১২ হাজার কৃষক প্রায় ৭ হাজার হেক্টর জমিতে জৈব পদ্ধতিতে ফসল ফলাচ্ছিলেন, যা দেশের কৃষিজমির ০.১৯ শতাংশ, আর আগের এক দশকে জৈব কৃষকের সংখ্যা দ্বিগুণ হয়েছিল। উৎপাদকেরা পত্রিকাটিকে বলেন, চাহিদার তুলনায় সরবরাহ অনেক কম; আর একটি খাদ্য প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী সতর্ক করেন, সনদ প্রদানকারী সংস্থা না থাকলে অনেকেই নিজেদের পণ্যকে জৈব দাবি করে ভোক্তাদের ঠকাতে পারেন।

যুক্তরাষ্ট্রে লেখকের বলা ধরনের সনদ ব্যবস্থা চালায় ইউএসডিএর এগ্রিকালচারাল মার্কেটিং সার্ভিসের ন্যাশনাল অর্গানিক প্রোগ্রাম। ১৯৯০ সালের অর্গানিক ফুডস প্রোডাকশন অ্যাক্ট জাতীয় মানদণ্ড তৈরির নির্দেশ দেয়, আর কর্মসূচিটি প্রতিষ্ঠার বিধিমালা প্রকাশিত হয় ২০০০ সালে। এর আওতায় কেবল সনদপ্রাপ্ত উৎপাদকেরাই পণ্যকে অর্গানিক বলতে পারেন; তবে বছরে ৫ হাজার ডলারের কম বিক্রি করা চাষিরা সনদ নেওয়া থেকে অব্যাহতি পান, যদিও তাঁদেরও মানদণ্ড মানতে ও হিসাব রাখতে হয়। ইউএসডিএর স্বীকৃতিপ্রাপ্ত রাজ্য, অলাভজনক ও বেসরকারি সংস্থাগুলো সনদ দেয়; অন্তত ৯৫ শতাংশ জৈব উপাদানের পণ্যে ইউএসডিএ অর্গানিক সিল ব্যবহার করা হয়; আর জৈব উৎপাদনে কোন কৃত্রিম পদার্থ ব্যবহার করা যাবে এবং কোন প্রাকৃতিক পদার্থ নিষিদ্ধ, তার একটি জাতীয় তালিকা কর্মসূচিটি সংরক্ষণ করে।

কৃষকের বীমা ও সামাজিক সুরক্ষা


ষষ্ঠ শিক্ষা কৃষক কল্যাণ ও সামাজিক সুরক্ষা। লেখক লেখেন, উন্নত দেশে কৃষকদের জন্য স্বাস্থ্যবীমা, শস্যবীমা, অবসর ভাতা ও দুর্যোগ সহায়তা রয়েছে। তাঁর যুক্তি, বাংলাদেশে কৃষকদের জন্য বীমা স্কিম সহজ করতে হবে এবং ডিজিটাল নিবন্ধন ও সুবিধা প্রদান নিশ্চিত করতে হবে।

বিদেশে এর সবচেয়ে পরিচিত দৃষ্টান্ত যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল শস্যবীমা কর্মসূচি, যা পরিচালনা করে ফেডারেল ক্রপ ইনস্যুরেন্স করপোরেশন; এটি সম্পূর্ণ সরকারি মালিকানাধীন একটি করপোরেশন, যা ইউএসডিএর রিস্ক ম্যানেজমেন্ট এজেন্সি পরিচালনা করে। ১৯৩০-এর দশকে ডাস্ট বোল খরায় কৃষকেরা যখন ফসল ফলাতে পারছিলেন না, তখনকার নিউ ডিল কর্মসূচি থেকে এর জন্ম। ১৯৮০ সালে কর্মসূচিটি সম্প্রসারিত হয়, কৃষকদের অংশগ্রহণে উৎসাহ দিতে প্রিমিয়ামে ভর্তুকি দেওয়া হয়, আর ১৯৯৪, ১৯৯৬ ও ২০০০ সালের আইনে এর কাঠামো বদলানো হয়। ১৯৮০ থেকে ২০০৫ সালের মধ্যে এতে ৪৩.৬ বিলিয়ন ডলারের দাবি নথিভুক্ত হয়, যার প্রায় তিন-চতুর্থাংশের কারণ তিন ধরনের আবহাওয়া: খরা, অতিরিক্ত আর্দ্রতা ও শিলাবৃষ্টি।

বাংলাদেশের নিজস্ব উদ্যোগগুলো পরীক্ষামূলক পর্যায়েই ছিল। রাষ্ট্রায়ত্ত সাধারণ বীমা করপোরেশন (এসবিসি) ২০১৪ সালের মার্চে খরাপ্রবণ রাজশাহী, বন্যাপ্রবণ সিরাজগঞ্জ ও ঘূর্ণিঝড়প্রবণ নোয়াখালীতে আবহাওয়া সূচকভিত্তিক শস্যবীমা চালু করে; ২১ কোটি ৩৪ লাখ টাকার প্রকল্প ব্যয়ের ১৬ কোটি ৩৮ লাখ টাকা দেয় এডিবি, বাকিটা সরকার। দ্য ডেইলি স্টারের ২০১৭ সালের এপ্রিলের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ৬ হাজার লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে ৬ হাজার ৭৭২ জন প্রান্তিক কৃষক এতে যুক্ত হন, আর রাজশাহী ও নোয়াখালীতে আমন ও আলুর জন্য এসবিসি ১৭ লাখ ৫৫ হাজার টাকার দাবি পরিশোধ করে। এডিবির এক আর্থিক খাত বিশেষজ্ঞ পত্রিকাটিকে বলেন, এটি অত্যন্ত জটিল একটি পণ্য, তাই সংশ্লিষ্ট সবার মধ্যে শেখা ও সচেতনতা দরকার।

পাঁচ বছর পরও বীমার আওতা ছিল সামান্য। ঘূর্ণিঝড় সিত্রাং বীমাহীন কৃষকদের ফসল ও মাছের খামারের ক্ষতি করার পর দ্য ডেইলি স্টার ২০২২ সালের অক্টোবরে জানায়, গ্রিন ডেল্টা ইনস্যুরেন্স কোম্পানিই একমাত্র বীমা প্রতিষ্ঠান, যারা বাণিজ্যিক পণ্য হিসেবে শস্যবীমা দিচ্ছিল। ২০২১ সাল থেকে ব্র্যাক, সিনজেনটা ফাউন্ডেশন এবং সুইস সহায়তাপুষ্ট একটি ক্ষুদ্রবীমা প্রকল্পের অংশীদারত্বে আবহাওয়া সূচকভিত্তিক একটি পরীক্ষামূলক কর্মসূচি চলছিল, যার আওতায় এসবিসি ও গ্রিন ডেল্টা পলিসি দিচ্ছিল। ব্র্যাক ২০২১ সালে ৯৬৬ জন এবং ২০২২ সালে ১ হাজার ৯৩ জন কৃষককে বীমার আওতায় আনে, আর গ্রিন ডেল্টা জানায়, ২০১৫ সাল থেকে তারা ৬ লাখ কৃষককে সহায়তা দিয়েছে। এসবিসির এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, আবহাওয়াসহ নানা তথ্য কিনতে হয় বলে প্রিমিয়াম বেশি, তাই সরকারি ভর্তুকি দরকার; আর খাতসংশ্লিষ্টরা একটি কৃষিবীমা নির্দেশিকা এবং কৃষকের প্রিমিয়ামে ভ্যাট মওকুফের পরামর্শ দেন।

কৃষকের প্রশিক্ষণ: দেশে ও বিদেশে সম্প্রসারণ সেবা


সপ্তম শিক্ষা কৃষি শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ। লেখক লেখেন, উন্নত দেশে কৃষকেরা নিয়মিত প্রশিক্ষণ, সেমিনার ও কর্মশালায় অংশ নেন এবং কারিগরি কলেজ ও অনলাইন কোর্সের মাধ্যমে দক্ষতা অর্জন করেন। বাংলাদেশে উপজেলা পর্যায়ে প্রশিক্ষণকেন্দ্র গড়ে তোলা এবং মোবাইলভিত্তিক শিক্ষা ও ভিডিও টিউটোরিয়াল চালুর প্রস্তাব দেন তিনি।

যুক্তরাষ্ট্রে এই ভূমিকা পালন করে কোঅপারেটিভ এক্সটেনশন সিস্টেম, যা ১৯১৪ সালের স্মিথ-লিভার আইনে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়। এটি সরকারি অর্থে চলে এবং ল্যান্ড-গ্রান্ট বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কেন্দ্রীয়, রাজ্য ও স্থানীয় সরকারের সঙ্গে মিলে এটি পরিচালনা করে। ইউএসডিএর ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ফুড অ্যান্ড এগ্রিকালচার কেন্দ্রীয় পর্যায়ে তদারকি ও বরাদ্দ দেয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্প্রসারণ বিশেষজ্ঞেরা ক্যাম্পাসের গবেষণাকে কর্মসূচিতে রূপ দেন, আর কাউন্টি পর্যায়ের সম্প্রসারণ কার্যালয় ও কর্মীরা তা স্থানীয় মানুষের কাছে পৌঁছে দেন। এর কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে কৃষি ও প্রাকৃতিক সম্পদ, পারিবারিক ও ভোক্তা বিজ্ঞান, সমাজ ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং ফোর-এইচ নামের যুব সংগঠন।

বাংলাদেশে এর সমতুল্য প্রতিষ্ঠান কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর। কৃষি পরিদপ্তর (সম্প্রসারণ ও ব্যবস্থাপনা), পাট পরিদপ্তর, উদ্ভিদ সংরক্ষণ পরিদপ্তর, হর্টিকালচার বোর্ড, তামাক উন্নয়ন বোর্ড এবং সেন্ট্রাল এক্সটেনশন রিসোর্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ইনস্টিটিউট একীভূত করে ১৯৮২ সালে অধিদপ্তরটি গঠিত হয়। ১৯৯০ সাল পর্যন্ত এটি ট্রেনিং অ্যান্ড ভিজিট পদ্ধতিতে কৃষকদের প্রশিক্ষণ দিত, এরপর দলভিত্তিক প্রশিক্ষণে যায়; ১৯৯৬ সাল থেকে নতুন কৃষি সম্প্রসারণ নীতির আলোকে এর কার্যক্রম পরিকল্পনা করা হয়। ওপরে বলা ১৬১২৩ কল সেন্টার এবং কর্মকর্তাদের জন্য ২০২৪ সালের ড্রোন ও স্যাটেলাইট প্রশিক্ষণ ছিল লেখকের প্রস্তাবিত প্রযুক্তিভিত্তিক পরামর্শের দিকে অধিদপ্তরের কয়েকটি পদক্ষেপ।

ছবি: Balaram Mahalder / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0)

সূত্র: জাগো নিউজ ২৪ (সমীরণ বিশ্বাস, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৫), দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, দ্য ডেইলি স্টার, ঢাকা ট্রিবিউন, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো, মার্কিন কৃষি বিভাগের অর্থনৈতিক গবেষণা সার্ভিস (ইউএসডিএ ইআরএস), ইফপ্রি-এএসটিআই ও বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল, স্ট্যাটিস্টিকস নেদারল্যান্ডস (সিবিএস), উইকিপিডিয়া

অনলাইন ডেস্কদা এগ্রো নিউজ

এগ্রোটেক

সম্পর্কিত খবর

মৎস্য

সৌরশক্তির রিসার্কুলেটিং ট্যাংকে পাহাড়ে ট্রাউট চাষ, পানি লাগবে ৮০ শতাংশ কম

ভারতের উত্তরাখণ্ডের এক খামারে সৌরশক্তিচালিত হাইব্রিড রিসার্কুলেটিং অ্যাকুয়াকালচার সিস্টেম চালু করেছে আইসিএআর-সিআইসিএফআর; প্রতিষ্ঠানটির দাবি, এতে পানি প্রায় ৮০ শতাংশ কম লাগে এবং একজন ট্রাউটচাষি বছরে ৪ থেকে ৫ লাখ রুপি উদ্বৃত্ত পেতে পারেন।

আইসিএআর১৬ অক্টোবর ২০২৬১ মিনিটের পড়া
এগ্রোটেক

শিকড়ের কাছে তরল সার পৌঁছাবে হালকা যন্ত্র, পরের লক্ষ্য সার দেওয়ার রোবট

নেদারল্যান্ডসের এক প্রদর্শনীতে দেখানো হালকা ডিস্ক যন্ত্রটি তরল সার সরাসরি মাটির ভেতরে দেয়। এর উদ্ভাবকেরা একে বিদ্যুৎচালিত এমন রোবটে রূপ দিতে চান, যা নিজেই ডকিং স্টেশনে গিয়ে ট্যাংক ভরে নেবে।

Future Farming১৬ অক্টোবর ২০২৬১ মিনিটের পড়া
ফসল

২০ নভেম্বরের আগে গম বুনুন: উত্তর প্রদেশে শূন্য চাষ পদ্ধতির প্রশিক্ষণ দিল ইরি ও সিমিট

খড় পোড়ানোর বিকল্প হিসেবে শূন্য চাষে গম বপন ও ফসলের অবশিষ্টাংশ ব্যবস্থাপনায় পূর্ব উত্তর প্রদেশের ৬৩ জন কৃষক, যন্ত্রসেবাদাতা ও সম্প্রসারণকর্মীকে প্রশিক্ষণ দিয়েছে ইরি ও সিমিট।

IRRI১৬ অক্টোবর ২০২৬২ মিনিটের পড়া

মন্তব্য

(০)