সরাসরিবাজারদর
আটা (প্যাকেটজাত)৫৮—আদা - আমদানিকৃত১৬৭—আদা - দেশী১৫৪—আমন চাল - মাঝারি৫৬—আমন চাল - মোটা৪৮—আমন চাল - সরু৭২—আয়োডিনযুক্ত লবণ (প্যাকেটজাত)৩২—কাঁচা মরিচ২১৮—খামারের মুরগী১৬২—খাসী৯০০—চিনি (দেশী)১৩২—ছোলা - গোটা৮৫—ডিম ফার্ম - লাল৪৭—পেঁয়াজ - দেশী৬০—বোরো চাল - মাঝারি৫৫—বোরো চাল - মোটা৪৭—বোরো চাল - সরু৬৬—মাংসঃ– গরু৭২৯—মুগ ডাল১২২—রসুন - আমদানিকৃত১৯২—রসুন - দেশী১৭৩—সয়াবিন তেল১৬৩—
হালনাগাদ ১৬ অক্টোবর ২০২৬
ঢাকা২৮°পরিষ্কার আকাশআর্দ্রতা ৬২%বাতাস ৫ কিমি/ঘ

মৎস্য হ্যাচারি ও নার্সারিতে রোগ: ডিম ও পোনা রক্ষায় প্রতিরোধ ও চিকিৎসা

হ্যাচারির ডিম ও পোনা কেন সহজে রোগে আক্রান্ত হয়, ছত্রাক, ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া ও পরজীবী কীভাবে ঠেকাবেন এবং কোন চিকিৎসা কর্তৃপক্ষ অনুমোদন করে, জেনে নিন এক নজরে।

মৎস্য হ্যাচারি ও নার্সারিতে রোগ: ডিম ও পোনা রক্ষায় প্রতিরোধ ও চিকিৎসা
মৎস্য

এপ্রিল মাস বাংলাদেশের মাছের হ্যাচারিগুলোর সবচেয়ে ব্যস্ত সময়। দেশের দক্ষিণাঞ্চলের হ্যাচারি নিয়ে ২০২৩ সালের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, মার্চ থেকে জুন পর্যন্ত পোনা উৎপাদনের ভরা মৌসুম, কারণ এই মাসগুলোতেই চাষিরা পুকুরে পোনা ছাড়েন। আবার এই মৌসুমেই একটি হ্যাচিং জার বা একটি নার্সারি পুকুরে রোগ দেখা দিলে কয়েক দিনের মধ্যে লাখ লাখ ডিম ও রেণু নষ্ট হয়ে যেতে পারে।

বাংলাদেশে উন্নত প্রযুক্তির মাছ চাষ দ্রুত ছড়িয়েছে, আর মানসম্পন্ন পোনা এখন এই চাষের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ। নব্বইয়ের দশকের শুরু থেকে দেশের নানা অঞ্চলে ধীরে ধীরে বিপুল সংখ্যক মৎস্য হ্যাচারি গড়ে ওঠে। তখন থেকে হ্যাচারি ও নার্সারিতে রোগ সংক্রমণ হ্যাচারি মালিক ও পোনা চাষিদের নিয়মিত দুশ্চিন্তায় পরিণত হয়েছে, কারণ রোগাক্রান্ত পোনা দ্রুত মারা যায় এবং দেখতে সুস্থ পোনাও চাষির পুকুরে জীবাণু বয়ে নিয়ে যেতে পারে।

২০২৫ সালের এপ্রিলে প্রকাশিত এই নির্দেশিকায় জানা যাবে, ডিম ও পোনা কেন এত সহজে অসুস্থ হয়, হ্যাচারি ও নার্সারিতে কোন কোন ধরনের রোগ বেশি হয়, প্রতিটি রোগ কীভাবে প্রতিরোধ করা যায়, কর্তৃপক্ষ কোন চিকিৎসার কথা বলে, কোন পুরোনো ওষুধ এখন আর পরামর্শ দেওয়া হয় না এবং হ্যাচারি মালিক কোথায় সাহায্য পাবেন। এখানে দেওয়া প্রতিটি মাত্রা যে কর্তৃপক্ষ দিয়েছে, তার নাম সহ উল্লেখ করা হয়েছে।

হ্যাচারি মৌসুমে পোনার স্বাস্থ্য কেন গুরুত্বপূর্ণ


বাংলাদেশের পুকুরে মাছ চাষের শুরুটাই হয় হ্যাচারির পোনা দিয়ে। ২০২৩ সালের জুলাইয়ে ফ্রন্টিয়ার্স ইন অ্যাকুয়াকালচার সাময়িকীতে প্রকাশিত হযরত আলী, বেন বেল্টন ও সহকর্মীদের একটি গবেষণা মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্য উদ্ধৃত করে জানায়, দেশে মাছের পোনা (রেণু) উৎপাদন ২০০২ সালের ২৭৬ টন থেকে বেড়ে ২০২১ সালে ৬৭১ টনে দাঁড়িয়েছে। একই সময়ে চাষের মাছের উৎপাদন ৭,৮৬,৬০৪ টন থেকে বেড়ে ২৬ লাখ ৪০ হাজার টন হয়েছে, আর পুকুরের উৎপাদনশীলতা হেক্টরপ্রতি ২,৫৮০ কেজি থেকে বেড়ে ৫,১২৯ কেজি হয়েছে।

গবেষকেরা ২০২২ সালের মে থেকে আগস্টের মধ্যে দক্ষিণের সাত জেলার ৬৬টি হ্যাচারিতে জরিপ চালান: ৪২টি কার্প ও ক্যাটফিশ, ১৬টি তেলাপিয়া এবং ৮টি চিংড়ি জাতীয় হ্যাচারি। তাঁরা দেখেন, এক দশকে ওই জেলাগুলোতে হ্যাচারির সংখ্যা ১৫ শতাংশ বেড়েছে; এর মধ্যে মাছের হ্যাচারি বেড়েছে ২৭ শতাংশ, আর চিংড়ি জাতীয় হ্যাচারি কমেছে ৪৭ শতাংশ। কার্প ও ক্যাটফিশ হ্যাচারির বেশির ভাগ (৮৭ শতাংশ) পিটুইটারি গ্রন্থি ইনজেকশন দিয়ে প্রজনন করায়; বাকিরা কৃত্রিম হরমোন (১১ শতাংশ) ও হিউম্যান কোরিওনিক গোনাডোট্রপিন (২ শতাংশ) ব্যবহার করে।

রোগ বাস্তব সমস্যা হলেও সব জায়গায় সমান নয়। জরিপের ১৮ শতাংশ হ্যাচারি রোগ বা পানির মানের সমস্যার কথা জানিয়েছে, যদিও মৃত্যুজনিত গড় ক্ষতি ছিল পোনা বিক্রির মূল্যের মাত্র ০.৭১ শতাংশ। লেখকেরা আগের গবেষণার কথাও উল্লেখ করেছেন, যেখানে রোগকে হ্যাচারির সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ বলা হয়েছে, কারণ পোনা হঠাৎ মারা যেতে পারে। গলদা চিংড়ির ক্ষেত্রে ক্ষতি ছিল অনেক বেশি: ২০১৩ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে গলদার পোস্ট-লার্ভা উৎপাদন ৯৮ শতাংশ কমে যায়, যার সঙ্গে গবেষণাটি গলদা হ্যাচারিতে একটি অশনাক্ত রোগের সমস্যাকে যুক্ত করেছে।

গরম এই ঝুঁকি আরও বাড়ায়। ২০২৩ সালের নভেম্বরে দ্য ডেইলি স্টার বাংলা যশোর থেকে এক প্রতিবেদনে জানায়, দেশের মোট চাহিদার ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ রেণু যশোর থেকে সরবরাহ করা হয়। সংশ্লিষ্টরা পত্রিকাটিকে জানান, তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা এর কাছাকাছি থাকলে ৮০ শতাংশ পর্যন্ত রেণু নষ্ট হয়ে যেতে পারে।

ডিম ও পোনা কেন এত সহজে অসুস্থ হয়


মৎস্য বিজ্ঞানীদের মতে, অন্যান্য প্রাণীর মতো মাছেরও রোগ প্রতিরোধে মূল ভূমিকা রাখে তার শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা বা ইমিউন সিস্টেম। পুকুর ও ট্যাংকের পানিতে সব সময় যে রোগজীবাণু থাকে, তার বিরুদ্ধে এই ব্যবস্থা অবিরত লড়াই করে সুস্থ মাছকে সুস্থ রাখে।

হ্যাচারি ও নার্সারিতে ডিম, রেণু ও ছোট পোনা স্বভাবতই নাজুক অবস্থায় থাকে। তাদের ইমিউন সিস্টেম তখনও পরিপক্ব হয়নি, তাই বড় মাছের চেয়ে তারা অনেক সহজে রোগে আক্রান্ত হয়। জার, ট্যাংক ও নার্সারি পুকুরে ঘন করে রাখার ফলে এক পোনা থেকে আরেক পোনায় সংক্রমণ খুব দ্রুত ছড়ায়।

সমস্যা শুধু হ্যাচারিতেই সীমাবদ্ধ থাকে না। রোগাক্রান্ত হ্যাচারি থেকে যে পোনা চাষের পুকুরে নেওয়া হয়, তারা সঙ্গে করে রোগজীবাণুও নিয়ে যায়, আর সেই সংক্রমণে পুকুরে মজুদ করা পোনা মারা যেতে পারে। তাই হ্যাচারির পোনার স্বাস্থ্য শুধু হ্যাচারি মালিকের নয়, যিনি পোনা কেনেন সেই প্রত্যেক চাষির জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।

সাধারণত চাপ বা স্ট্রেস থেকেই রোগের শুরু। পানির মান খারাপ হওয়া, তাপমাত্রার হঠাৎ ওঠানামা, অখাদ্য খাবার ও মৃত জৈব পদার্থ থেকে জৈব দূষণ এবং অধিক মজুদ ঘনত্ব ছোট মাছকে দুর্বল করে দেয়, আর তখন ব্যাকটেরিয়া ও পরজীবী সহজে বাসা বাঁধে। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) ২০০৫ সালে চাষের মাছে অ্যান্টিবায়োটিকের দায়িত্বশীল ব্যবহার নিয়ে প্রকাশিত কারিগরি প্রতিবেদনে বলেছে, ভালো চাষ ব্যবস্থাপনা, পরিচ্ছন্নতা ও টিকার মাধ্যমে ওষুধের প্রয়োজন কমাতে হবে, যাতে ওষুধ রোগ প্রতিরোধে নয়, শুধু চিকিৎসায় ব্যবহার হয়।

রুই মাছের একটি পোনা; এ অঞ্চলের হ্যাচারিতে যেসব কার্প জাতীয় মাছ সবচেয়ে বেশি প্রজনন করানো হয়, রুই তার একটি। ছবি: Subho1122020 / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
রুই মাছের একটি পোনা; এ অঞ্চলের হ্যাচারিতে যেসব কার্প জাতীয় মাছ সবচেয়ে বেশি প্রজনন করানো হয়, রুই তার একটি। ছবি: Subho1122020 / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)

হ্যাচারি ও নার্সারির প্রধান রোগগুলো


মাছের হ্যাচারি ও নার্সারিতে সাধারণত নয় ধরনের রোগ বা পরজীবীর আক্রমণ দেখা যায়:

  • ছত্রাকজনিত (ওয়াটার মোল্ড) রোগ, প্রধানত ডিম ও রেণুর
  • ভাইরাসজনিত রোগ
  • ব্যাকটেরিয়াজনিত রোগ
  • খারাপ পানি ও অযত্নে নাড়াচাড়ার কারণে পরিবেশজনিত রোগ
  • সাধারণভাবে পরজীবীঘটিত রোগ
  • মিক্সোস্পোরিডিওসিস, যা মিক্সোবোলাসের মতো রেণু (স্পোর) তৈরি করা মিক্সোজোয়া পরজীবীর কারণে হয়
  • উকুনজনিত রোগ, যা আরগুলাস নামের মাছের উকুনের কারণে হয়
  • ট্রাইকোডিনিয়াসিস, যা ট্রাইকোডিনা নামের এককোষী সিলিয়েট পরজীবীর কারণে হয়
  • কৃমিজাতীয় রোগ, যেমন ফুলকার কৃমি

প্রতিটি দলের জন্য আলাদা ব্যবস্থা দরকার। কিছু রোগ ভালো পরিচ্ছন্নতা দিয়েই প্রায় পুরোপুরি ঠেকানো যায়, কিছু রোগ চিকিৎসায় সারে, আর ভাইরাসের বিরুদ্ধে কার্যত প্রতিরোধই একমাত্র উপায়। নিচের অংশগুলোতে একে একে সেগুলো বলা হলো।

ডিমে ছত্রাকের আক্রমণ: আগে প্রতিরোধ


ছত্রাকজনিত সংক্রমণ, যা প্রধানত স্যাপ্রোলেগনিয়া গণের ওয়াটার মোল্ডের কারণে হয়, সবচেয়ে বেশি আক্রমণ করে মাছের ডিম ও রেণুকে, আর হ্যাচারিতে ডিম ফোটানোর সময় এটি জটিল সমস্যা তৈরি করে। সাদা বা ধূসর তুলার মতো আঁশ তৈরি করে বলে স্যাপ্রোলেগনিয়াকে প্রায়ই কটন মোল্ড বলা হয়। এটি মৃত পদার্থ খেয়ে বাঁচে এবং আহত বা দুর্বল টিস্যুর সুযোগ নেয়।

হ্যাচিং জারে ছত্রাক প্রথমে মৃত ও অনিষিক্ত ডিমের গায়ে বাসা বাঁধে। সেখান থেকে আশপাশের সুস্থ ডিমে ছড়িয়ে পড়ে, আর কিছু না করলে এক পর্যায়ে পুরো ব্যাচের ডিমই নষ্ট করে দিতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব ফ্লোরিডার সম্প্রসারণ বিভাগ (ইউএফ/আইএফএএস) একই কথা বলে: মৃত ডিম দ্রুত সরিয়ে ফেলতে হবে, কারণ এগুলো পাশের সুস্থ ডিমে সংক্রমণের উৎস।

তাই প্রতিরোধ মূলত হ্যাচারির নিয়মিত কাজের ব্যাপার:

  • ডিম ধুয়ে নেওয়া এবং ডিম ফোটানোর সরঞ্জাম পরিষ্কার রাখা
  • মৃত, নষ্ট ও অনিষিক্ত ডিম যত তাড়াতাড়ি ও যত ঘন ঘন সম্ভব সরিয়ে ফেলা
  • জার ও ইনকিউবেটরে পানির প্রবাহ বাড়ানো
  • প্রতিটি জার বা ট্রেতে ডিমের সংখ্যা বা ঘনত্ব কমানো

চিকিৎসার প্রয়োজন হলে, ইউএফ/আইএফএএস ২০২২ সালের ডিসেম্বরে হালনাগাদ করা ফরমালিন বিষয়ক নির্দেশিকায় বলেছে, মাছের ডিমে ওয়াটার মোল্ড নিয়ন্ত্রণে যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসন (এফডিএ) ফরমালিন অনুমোদন করেছে, মাত্রা প্রতি লিটারে ১,০০০ থেকে ২,০০০ মিলিগ্রাম, ১৫ মিনিটের জন্য। নির্দেশিকাটি সতর্ক করেছে, মাছের শরীরের ছত্রাক বা ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণে ফরমালিন পছন্দের চিকিৎসা নয়; ফরমালডিহাইড একটি স্বীকৃত ক্যানসার সৃষ্টিকারী পদার্থ, তাই কেবল দস্তানা, চোখ ও শ্বাসযন্ত্রের সুরক্ষা নিয়ে এটি নাড়াচাড়া করতে হবে; আর যখনই ব্যবহার করা হোক, জোরালো বায়ু সঞ্চালন (এয়ারেশন) দরকার। এগুলো যুক্তরাষ্ট্রের মাত্রা; বাংলাদেশের হ্যাচারিকে উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তার কাছ থেকে ওষুধ ও মাত্রা নিশ্চিত হয়ে নিতে হবে।

যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়ার উইথভিল হ্যাচারিতে কর্মীরা মৃত ডিম বেছে সরাচ্ছেন, একটি পুরোনো আলোকচিত্র। ছবি: John J. Baird / উইকিমিডিয়া কমন্স (পাবলিক ডোমেইন)
যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়ার উইথভিল হ্যাচারিতে কর্মীরা মৃত ডিম বেছে সরাচ্ছেন, একটি পুরোনো আলোকচিত্র। ছবি: John J. Baird / উইকিমিডিয়া কমন্স (পাবলিক ডোমেইন)
সামুদ্রিক ট্রাউট মাছের গায়ে স্যাপ্রোলেগনিয়ার সাদা, তুলার মতো আস্তরণ, যা দ্বিতীয় পর্যায়ের ওয়াটার মোল্ড সংক্রমণ। ছবি: Velela / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY 3.0)
সামুদ্রিক ট্রাউট মাছের গায়ে স্যাপ্রোলেগনিয়ার সাদা, তুলার মতো আস্তরণ, যা দ্বিতীয় পর্যায়ের ওয়াটার মোল্ড সংক্রমণ। ছবি: Velela / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY 3.0)

ম্যালাকাইট গ্রিন কেন আর পরামর্শ দেওয়া হয় না


হ্যাচারি নিয়ে পুরোনো বাংলা নির্দেশিকায়, এই লেখার আগের সংস্করণেও, ম্যালাকাইট গ্রিনকে ছত্রাকজনিত রোগের সর্বোত্তম ও নির্ভরযোগ্য চিকিৎসা বলা হয়েছিল এবং ডিমে ও পুকুরে প্রয়োগের হার দেওয়া হয়েছিল। সেই পরামর্শ পুরোনো হয়ে গেছে, তাই এখানে তা বাদ দেওয়া হয়েছে।

ম্যালাকাইট গ্রিন একটি শিল্প রং। হংকংয়ের সরকারি খাদ্য নিয়ন্ত্রক সংস্থা সেন্টার ফর ফুড সেফটি ২০১৯ সালের জুনে ব্যাখ্যা করে, এফএও ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার যৌথ বিশেষজ্ঞ কমিটি (জেইসিএফএ) দেখেছে, খাবারে ম্যালাকাইট গ্রিন বা এর বিপাকজাত পদার্থের অবশিষ্টাংশের এমন কোনো নিরাপদ মাত্রা নেই, যা ভোক্তার জন্য গ্রহণযোগ্য ঝুঁকি। সংস্থাটির মতে, এই রং জিনগত ক্ষতিকারক ও ক্যানসার সৃষ্টিকারী দুই-ই হতে পারে। অনেক দেশে খাদ্য উৎপাদনকারী প্রাণীতে এর ব্যবহার নিষিদ্ধ।

এটি শুধু ভোক্তার জন্য নয়, বাংলাদেশের মাছ রপ্তানির জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। রপ্তানি করা চিংড়িতে নিষিদ্ধ ওষুধের অবশিষ্টাংশ পাওয়ায় ইউরোপের বাজারে চালান ফেরত আসে, আর ২০১০ সালের জানুয়ারিতে জাতীয় সংসদ মৎস্যখাদ্য ও পশুখাদ্য আইন পাস করে। এই আইনে খাদ্য প্রস্তুতকারক ও ব্যবসায়ীদের লাইসেন্স বাধ্যতামূলক করা হয় এবং মাছ ও পশুর খাদ্যে অ্যান্টিবায়োটিক, হরমোন ও অন্যান্য ক্ষতিকর পদার্থ নিয়ন্ত্রণ করা হয়। হ্যাচারি মালিকদের উচিত পরিচ্ছন্নতা এবং মৎস্য কর্তৃপক্ষের অনুমোদিত চিকিৎসার ওপর নির্ভর করা।

ভাইরাসজনিত রোগ: চিকিৎসা নেই, আছে শুধু প্রতিরোধ


ছোট মাছের সবচেয়ে বড় ক্ষতিগুলোর কয়েকটি হয় ভাইরাসে। গ্রাস কার্প রিওভাইরাসের (জিসিআরভি) কারণে হওয়া গ্রাস কার্পের রক্তক্ষরা (হেমোরেজিক) রোগ গ্রাস কার্পের রেণু ও পোনা মেরে ফেলে। ২০১৭ সালের জুনে বিএমসি জিনোমিকস সাময়িকীতে প্রকাশিত একটি গবেষণা একে গ্রাস কার্পের সবচেয়ে মারাত্মক রোগগুলোর একটি বলেছে। ভাইরাসটি অ্যাকুয়ারিওভাইরাস গণের; এটি ব্ল্যাক কার্প ও কয়েকটি ছোট বুনো মাছকেও আক্রমণ করে, আর এর একটি ধরনে এক বছর বয়সী মাছের ৮০ শতাংশ মারা গেছে।

কই হারপিস ভাইরাস (কেএইচভি) কমন কার্প ও এর শৌখিন রূপ কই কার্পে অত্যন্ত ছোঁয়াচে রোগ সৃষ্টি করে। এই রোগের লক্ষণের মধ্যে আছে ফুলকায় ছোপ ছোপ দাগ ও রক্তক্ষরণ, চোখ বসে যাওয়া, শরীরে ফ্যাকাশে দাগ এবং আচরণে পরিবর্তন। যে মাছ এই রোগ থেকে বেঁচে যায়, সেটিও সারা জীবন ভাইরাসের বাহক থেকে যেতে পারে।

মৎস্য বিজ্ঞানীরা একমত যে মাছের ভাইরাসজনিত রোগের মূলত কোনো চিকিৎসা নেই। নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা ও কঠোর জৈব নিরাপত্তাই একমাত্র কার্যকর প্রতিরোধ। বাস্তবে এর মানে হলো: পরিচিত ও সুস্থ উৎস থেকে মা-বাবা মাছ ও পোনা কেনা, নতুন মাছ মূল মজুদে মেশানোর আগে আলাদা রাখা, প্রতিটি ব্যাচের পর জাল, বালতি ও জার জীবাণুমুক্ত করা, আর হ্যাচারির ট্যাংকে বুনো মাছ ও নোংরা পানি ঢুকতে না দেওয়া।

ব্যাকটেরিয়াজনিত রোগ ও অ্যান্টিবায়োটিকের সাবধানী ব্যবহার


হ্যাচারি ও নার্সারিতে পোনা মৃত্যুর একটি সাধারণ কারণ ব্যাকটেরিয়া। প্রধান দায়ী হলো চলনশীল অ্যারোমোনাস ব্যাকটেরিয়া এবং লোনা পানিতে ভিব্রিও। এরা কখনো প্রাথমিক রোগ সৃষ্টিকারী জীবাণু হিসেবে, কখনো চাপে দুর্বল হয়ে পড়া মাছে সুবিধাভোগী অনুপ্রবেশকারী হিসেবে রোগ ঘটায়। লেজপচা ও পাখনাপচা রোগ সাধারণত এসব ব্যাকটেরিয়ার কারণেই হয়।

কার্প জাতীয় মাছের পোনার জন্য অ্যারোমোনাস হাইড্রোফিলা ঘটিত ব্যাকটেরিয়াল হেমোরেজিক সেপটিসেমিয়া একটি গুরুতর সমস্যা। এই ব্যাকটেরিয়া উষ্ণ অঞ্চলের মিঠা ও লোনা পানিতে থাকে এবং মাছের একটি প্রধান রোগজীবাণু হিসেবে ব্যাপকভাবে স্বীকৃত; এটি সুস্থ মাছকে কদাচিৎ আক্রমণ করে, কিন্তু মাছের প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে গেলে সহজেই বাসা বাঁধে।

পানির গুণাগুণ নষ্ট হওয়া, তাপমাত্রার তারতম্য, জৈব দূষণ এবং অধিক মজুদ ঘনত্ব পোনায় ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণে বড় ভূমিকা রাখে, চাষিরা যাকে পেটফোলা রোগ বলেন সেটিও এর মধ্যে পড়ে। কোনো ওষুধের আগে এসব কারণ দূর করা জরুরি: পানি বদলানো, খাবার কমানো, মরা মাছ সরিয়ে ফেলা এবং মজুদ পাতলা করা। এই লেখার আগের সংস্করণে পেটফোলা রোগে পটাশ (পটাশিয়াম পারম্যাঙ্গানেট) প্রয়োগের একটি হার দেওয়া হয়েছিল; কোনো মৎস্য কর্তৃপক্ষের সূত্রে সেই হার পাওয়া যায়নি, তাই তা বাদ দেওয়া হয়েছে।

অ্যান্টিবায়োটিকের ক্ষেত্রে বিশেষ সতর্কতা দরকার। এফএওর ২০০৫ সালের কারিগরি প্রতিবেদনে চাষের মাছে অনুমোদিত অ্যান্টিবায়োটিকের তালিকায় অক্সিটেট্রাসাইক্লিন আছে, অ্যারোমোনাস হাইড্রোফিলা ঘটিত হেমোরেজিক সেপটিসেমিয়ার চিকিৎসাসহ। প্রতিবেদনটি সুপারিশ করেছে, অ্যান্টিবায়োটিক শুধু রোগের চিকিৎসায় ব্যবহার করতে হবে, প্রতিরোধের জন্য নয়। এতে আরও ব্যাখ্যা করা হয়েছে, প্রতিটি ভেটেরিনারি ওষুধের একটি প্রত্যাহারকাল থাকে, অর্থাৎ চিকিৎসার পর কত দিন মাছ খাবারের জন্য ধরা যাবে না, যাতে অবশিষ্টাংশ নিরাপদ সীমার নিচে থাকে। মাত্রা, মেয়াদ ও প্রত্যাহারকাল আন্দাজে নয়, উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা বা মাছের স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের কাছ থেকে নিতে হবে।

পরজীবী: ট্রাইকোডিনা, মিক্সোজোয়া, উকুন ও ফুলকার কৃমি


নার্সারি পুকুরে পরজীবী নিত্যদিনের সমস্যা। ট্রাইকোডিনা চাকতির মতো এককোষী সিলিয়েট পরজীবী, যা মাছের ফুলকা, চামড়া ও পাখনায় থাকে এবং সরল কোষ বিভাজনে বংশবৃদ্ধি করে; তাই ঘন করে রাখা পোনায় এর সংখ্যা দ্রুত বাড়তে পারে। মিক্সোবোলাসের মতো মিক্সোজোয়া পরজীবী মাছের টিস্যুতে স্পোর তৈরি করে মিক্সোস্পোরিডিওসিস ঘটায়।

মাছের উকুন আরগুলাস একটি ছোট ক্রাস্টেশিয়ান, যা পোষক মাছের গায়ে শক্ত করে লেগে থাকে। কম বয়সী উকুন মাছের পিচ্ছিল আবরণ (মিউকাস) ও চামড়ার কোষ খায়, আর বড় উকুন রক্ত খায়। ডাক্টাইলোগাইরাস গণের ফুলকার কৃমি প্রধানত কার্প ও এর আত্মীয় মাছের ফুলকায় থাকে; এরা আংটার মতো হুক দিয়ে আটকে থাকে এবং একটি পোষকেই জীবনচক্র শেষ করে।

বাইরের পরজীবীর বিরুদ্ধে ফরমালিন একটি প্রচলিত চিকিৎসা। ইউএফ/আইএফএএস বলেছে, এটি বেশির ভাগ প্রোটোজোয়া এবং মনোজেনিয়ান কৃমির মতো কিছু বড় পরজীবীর বিরুদ্ধে অত্যন্ত কার্যকর, তবে শরীরের ভেতরের সংক্রমণে কাজ করে না। নির্দেশিকাটিতে দীর্ঘ সময়ের গোসল (প্রলম্বিত বাথ) হিসেবে প্রতি লিটারে ১২.৫ থেকে ২৫ মিলিগ্রাম মাত্রা দেওয়া হয়েছে, কম মাত্রাটি সংবেদনশীল বা খুব অসুস্থ মাছের জন্য; আর পানির প্রবাহ বেশি এমন ব্যবস্থায় ৩০ থেকে ৬০ মিনিটের স্বল্প গোসলে প্রতি লিটারে সর্বোচ্চ ২৫০ মিলিগ্রাম।

একই নির্দেশিকা পুকুরে ফরমালিন ব্যবহারে নিরুৎসাহিত করেছে। পুকুরে যে পরিমাণ লাগে তাতে খরচ বেশি; এটি পানির দ্রবীভূত অক্সিজেন কমিয়ে দেয় এবং শেওলা মেরে ফেলে, ফলে হঠাৎ অক্সিজেন সংকটে মাছ মারা যেতে পারে। যেকোনো রাসায়নিক প্রয়োগের সময় মাছ ছোটাছুটি করলে, খাবি খেলে বা পানি থেকে লাফিয়ে উঠতে চাইলে সঙ্গে সঙ্গে তাদের পরিষ্কার পানিতে সরিয়ে নিতে হবে।

মাছের উকুন আরগুলাস ফোলিয়াসিয়াস; এ ধরনের পরজীবী মাছের চামড়ায় লেগে থাকে। ছবি: Donald Hobern / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY 4.0)
মাছের উকুন আরগুলাস ফোলিয়াসিয়াস; এ ধরনের পরজীবী মাছের চামড়ায় লেগে থাকে। ছবি: Donald Hobern / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY 4.0)

বাংলাদেশে হ্যাচারির আইন ও কোথায় সাহায্য পাবেন


বাংলাদেশে হ্যাচারি চলে মৎস্য হ্যাচারি আইন, ২০১০ (২০১০ সনের ১৪ নং আইন) অনুযায়ী, যার লক্ষ্য মানসম্পন্ন রেণু, পোস্ট-লার্ভা ও পোনা উৎপাদন। এফএওর আইন বিষয়ক তথ্যভান্ডার ফাওলেক্স অনুযায়ী, নিবন্ধন ছাড়া কেউ বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে হ্যাচারি চালাতে পারবেন না, আর মৎস্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বা ক্ষমতাপ্রাপ্ত কর্মকর্তা যেকোনো সময় যেকোনো হ্যাচারিতে গিয়ে এর যন্ত্রপাতি, রাসায়নিক দ্রব্য ও প্রজনন পদ্ধতি পরিদর্শন করতে পারেন।

বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিএফআরআই) মৎস্য গবেষণার জাতীয় প্রতিষ্ঠান, যা ১৯৮৪ সালে প্রতিষ্ঠিত এবং এর সদর দপ্তর ময়মনসিংহে। বাংলাপিডিয়া জানায়, ময়মনসিংহে এর স্বাদুপানি কেন্দ্রে একটি কার্প হ্যাচারি ও পরীক্ষামূলক পুকুর আছে, আর চাঁদপুর, খুলনার পাইকগাছা ও কক্সবাজারে এর আরও কেন্দ্র রয়েছে।

ডিম সাদা ও তুলার মতো হয়ে যাওয়া, পোনা পানির ওপরে খাবি খাওয়া, শরীরে লাল দাগ, পেট ফুলে যাওয়া কিংবা হঠাৎ মৃত্যু বেড়ে যাওয়া দেখলে হ্যাচারি মালিকের উচিত দেরি না করে নমুনা নিয়ে মৎস্য অধিদপ্তরের উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তার কাছে যাওয়া। তিনি রোগ নির্ণয়ের ব্যবস্থা করতে পারেন, অনুমোদিত চিকিৎসা ও মাত্রার পরামর্শ দিতে পারেন এবং কোনো ব্যাচ চাষিদের কাছে বিক্রি না করে নষ্ট করে ফেলা উচিত কি না, সে বিষয়েও পরামর্শ দিতে পারেন।

ছবি: syed sajidul islam / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)

সূত্র: দ্য এগ্রো নিউজ (নিজস্ব প্রতিবেদক), ফ্রন্টিয়ার্স ইন অ্যাকুয়াকালচার (আলী, বেল্টন ও অন্যান্য, জুলাই ২০২৩), দ্য ডেইলি স্টার বাংলা (নভেম্বর ২০২৩), ইউনিভার্সিটি অব ফ্লোরিডা আইএফএএস এক্সটেনশন (ফরমালিন বিষয়ক নির্দেশিকা, ডিসেম্বর ২০২২ সংস্করণ), জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (চাষের মাছে অ্যান্টিবায়োটিকের দায়িত্বশীল ব্যবহার, ২০০৫), সেন্টার ফর ফুড সেফটি হংকং (জুন ২০১৯), বিএমসি জিনোমিকস (জুন ২০১৭), ফুড সেফটি নিউজ (জানুয়ারি ২০১০), ফাওলেক্স, বাংলাপিডিয়া, উইকিপিডিয়া

অনলাইন ডেস্কদা এগ্রো নিউজ

মৎস্য

সম্পর্কিত খবর

মৎস্য

কেরালার উপকূলীয় নারীদের ৮৪টি মাছের ব্যবসা, পারিবারিক আয় বেড়েছে ৩০-৩৫ শতাংশ

আইসিএআর-সিএমএফআরআইয়ের এক কর্মসূচির সহায়তায় ২০২২ থেকে ২০২৬ সালে কেরালার আট জেলায় ৮৪টি মৎস্যভিত্তিক ক্ষুদ্র উদ্যোগ গড়ে উঠেছে; সরাসরি উপকৃত ৪৬৯ জন, যাঁদের বেশির ভাগ তফসিলি জাতিভুক্ত।

আইসিএআর১৬ অক্টোবর ২০২৬১ মিনিটের পড়া
মৎস্য

সৌরশক্তির রিসার্কুলেটিং ট্যাংকে পাহাড়ে ট্রাউট চাষ, পানি লাগবে ৮০ শতাংশ কম

ভারতের উত্তরাখণ্ডের এক খামারে সৌরশক্তিচালিত হাইব্রিড রিসার্কুলেটিং অ্যাকুয়াকালচার সিস্টেম চালু করেছে আইসিএআর-সিআইসিএফআর; প্রতিষ্ঠানটির দাবি, এতে পানি প্রায় ৮০ শতাংশ কম লাগে এবং একজন ট্রাউটচাষি বছরে ৪ থেকে ৫ লাখ রুপি উদ্বৃত্ত পেতে পারেন।

আইসিএআর১৬ অক্টোবর ২০২৬১ মিনিটের পড়া
মৎস্য

আট পদের পাঁচটিই শূন্য, তিনজনে চলছে শায়েস্তাগঞ্জের সরকারি মৎস্য বীজ খামার

১৯৬২ সালে প্রতিষ্ঠিত হবিগঞ্জের শায়েস্তাগঞ্জ সরকারি মৎস্য বীজ উৎপাদন খামারে ১২টি পুকুরে পোনা উৎপাদন চললেও আট পদের পাঁচটি শূন্য, নৈশপ্রহরী নেই, বরাদ্দ না থাকায় চাষি প্রশিক্ষণও বন্ধ।

মানবজমিন১৫ অক্টোবর ২০২৬১ মিনিটের পড়া

মন্তব্য

(০)