২০১৯ সালের মে মাসে বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই) কাউকে না জানিয়ে দোকান থেকে নিত্যব্যবহার্য ২৭ ধরনের খাদ্যপণ্যের ৪০৬টি নমুনা কিনে পরীক্ষা করে এবং জাতীয় মান পূরণে ব্যর্থ ৫২টি পণ্যের নাম প্রকাশ করে। এর তিনটি ছিল ঘি: বাঘাবাড়ী স্পেশাল, বনলতা ও সূর্য ব্র্যান্ডের ঘি। দ্য ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসের খবর অনুযায়ী, ২০১৯ সালের ১২ মে হাইকোর্ট মান উন্নত না হওয়া পর্যন্ত ৫২টি পণ্যই বাজার থেকে সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেন।
ঘি দামি, দেশজুড়ে উৎসবের রান্না আর মিষ্টিতে এর কদর, আর ঠিক সে কারণেই ঘি নকল হয়। এই প্রতিবেদনে জানা যাবে আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী খাঁটি ঘি কী, বাংলাদেশে ঘিতে কীভাবে ভেজাল মেশানো হয়, একটি খাদ্য নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষ কোন প্রাথমিক পরীক্ষার কথা বলে আর ঘরোয়া কোন কৌশল কিছুই প্রমাণ করে না, পরীক্ষাগারে কী মাপা হয় এবং ঘি খাওয়া নিয়ে স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ কী বলে।
মান অনুযায়ী খাঁটি ঘি কাকে বলে
ঘির আন্তর্জাতিক খাদ্যমান হলো দুগ্ধচর্বিজাত পণ্যের কোডেক্স মান (কোডেক্স স্ট্যান ২৮০-১৯৭৩), যা ১৯৭৩ সালে গৃহীত ও ১৯৯৯ সালে সংশোধিত হয় এবং জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) প্রকাশ করে। এই মানে ঘিকে বলা হয়েছে এমন একটি পণ্য, যা কেবল দুধ, ক্রিম বা মাখন থেকে তৈরি হয়, যার প্রক্রিয়ায় প্রায় সব পানি ও চর্বিহীন কঠিন অংশ সরিয়ে ফেলা হয় এবং যার স্বাদ ও গঠন বিশেষভাবে গড়ে ওঠে।
এই মান অনুযায়ী ঘিতে ওজনের হিসাবে অন্তত ৯৯.৬ শতাংশ দুগ্ধচর্বি থাকতে হবে। কোডেক্স ঘির মানের সীমাও বেঁধে দিয়েছে: মুক্ত ফ্যাটি অ্যাসিড ০.৪ শতাংশের বেশি নয় (ওলিক অ্যাসিড হিসেবে) এবং পারঅক্সাইড মান প্রতি কেজি চর্বিতে ০.৬ মিলিইকুইভ্যালেন্ট অক্সিজেনের বেশি নয়।
গাজীপুরের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমআরএইউ) ডেইরি অ্যান্ড পোলট্রি সায়েন্স বিভাগের ২০২০ সালের একটি গবেষণা, যা জার্নাল অব অ্যাডভান্সড ভেটেরিনারি অ্যান্ড অ্যানিমেল রিসার্চে প্রকাশিত হয়, ঘিকে ভারতীয় উপমহাদেশের সবচেয়ে সমাদৃত চর্বিসমৃদ্ধ দুগ্ধপণ্য এবং বাংলাদেশেরও অন্যতম জনপ্রিয় দুগ্ধপণ্য বলে বর্ণনা করেছে। মাখন বা ক্রিম জ্বাল দিয়ে ঘি তৈরি হয়; এক গ্রাম ঘি থেকে ৯ কিলোক্যালরি শক্তি পাওয়া যায় এবং গ্রীষ্মমণ্ডলীয় আবহাওয়ায় সংরক্ষণে এটি প্রায় এক বছর ভালো থাকে।
তুলনার জন্য খাঁটি নমুনা পেতে বিএসএমআরএইউ দল নিজেদের খামারের দুধের ক্রিম গরম করে ঘি বানায়: ক্রিম ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে গলতে শুরু করে, ৬০ ডিগ্রিতে পুরো গলে যায়, তারপর ঘন হয়ে বুদবুদ উঠে পরিষ্কার হলদেটে তরলে পরিণত হয়, যা দুই ভাঁজ মসলিন কাপড়ে ছেঁকে নেওয়া হয়।

বাংলাদেশে ঘি: পেছনের দুধ আর দামের ফারাক
ঘির শুরু দুধ থেকে, আর বাংলাদেশ প্রয়োজনের চেয়ে কম দুধ উৎপাদন করে। প্রথম আলো ২০২৩ সালের ২ জুন প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের যে হিসাব প্রকাশ করে, সে অনুযায়ী দুধ উৎপাদন ২০১২-১৩ অর্থবছরের ৫.০৭ মিলিয়ন টন থেকে বেড়ে ২০২১-২২ অর্থবছরে ১৩.০৭৪ মিলিয়ন টনে দাঁড়ায়, যেখানে বার্ষিক চাহিদা ১৫.৬০৬৮ মিলিয়ন টন। মাথাপিছু দৈনিক উৎপাদন ছিল ২০৮ মিলিলিটার, পত্রিকাটির উল্লেখ করা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মান ২৫০ মিলিলিটারের চেয়ে কম।
দেশের সবচেয়ে পরিচিত দুগ্ধ অঞ্চল সিরাজগঞ্জ জেলায়। ইউএনবি ২০২১ সালের ১৮ এপ্রিল জানায়, শুধু শাহজাদপুর উপজেলাতেই ১৫ হাজার ৩৮০টি সমবায়ভিত্তিক খামারের প্রায় সাড়ে ১০ লাখ গবাদিপশু থেকে দিনে প্রায় সাড়ে ২০ লাখ লিটার দুধ উৎপাদিত হয়, আর সমবায়ভিত্তিক দুগ্ধ প্রতিষ্ঠান মিল্ক ভিটা, যার প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা বাঘাবাড়ীতে, দিনে ২ লাখ ২৫ হাজার লিটার দুধ সংগ্রহ করে। নিচের ঘটনাগুলো দেখাবে, পরীক্ষায় ব্যর্থ ঘির মোড়কে বারবার বাঘাবাড়ী নামটি এসেছে।
বিএসএমআরএইউর গবেষকেরা ২০২০ সালে লেখেন, ব্র্যান্ডের ঘির গড় খুচরা দাম ছিল কেজিপ্রতি ১,১০০ থেকে ১,২০০ টাকা, অথচ ব্র্যান্ডহীন অনেক স্থানীয় ঘি বিক্রি হচ্ছিল কেজিপ্রতি মাত্র ৪০০ থেকে ৫০০ টাকায়, যা বড় ব্যবধান। তাঁদের মতে, ঘির উচ্চ দাম ও সীমিত সরবরাহ নানা অসাধু চর্চার জন্ম দেয়, যার প্রধানটি হলো বাড়তি মুনাফার জন্য সস্তা চর্বি বা তেল মেশানো।

ঘিতে ভেজাল যেভাবে: আদালত ও গবেষণা যা পেয়েছে
২০২০ সালের বিএসএমআরএইউ গবেষণা অনুযায়ী ঘিতে প্রধানত উদ্ভিজ্জ তেল ও পশুর দেহের চর্বি মেশানো হয়। যেসব ভেজালের গঠন ঘির মতো, সেগুলোই বেশি পছন্দ করা হয়, কারণ চোখে দেখে সেগুলো ধরা কঠিন। হাইড্রোজেনেটেড উদ্ভিজ্জ তেল, যা বাংলাদেশে ডালডা নামে পরিচিত, সবচেয়ে উপযোগী ভেজাল হিসেবে ধরা হয়, এবং গবেষকেরা লিখেছেন, ৫০ শতাংশের বেশি হাইড্রোজেনেটেড তেলযুক্ত ঘির নমুনা পাওয়া অস্বাভাবিক নয়। পাম তেল, নারকেল তেল ও আংশিক হাইড্রোজেনেটেড চিনাবাদাম তেলও মেশানো হয়। পশুর দেহের চর্বি ধরা আরও কঠিন, কারণ এর পরীক্ষার মান খাঁটি ঘির সীমার মধ্যেই পড়তে পারে।
বাংলাদেশে বছরের পর বছর অভিযানের নথিতে একই চিত্র:
- ২০০৭ সালের নভেম্বর, চট্টগ্রাম: দ্য ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসের খবর অনুযায়ী, একজন ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে ভ্রাম্যমাণ আদালত খুলশীতে বিএসটিআইয়ের সনদপ্রাপ্ত একটি কারখানা থেকে ৫ টন নকল ঘি জব্দ করেন। মালিক স্বীকার করেন, তিন বছরে তিনি ২০০ টনের বেশি ভেজাল ঘি ও বাটার অয়েল তৈরি করেছেন; মালিক ও ব্যবস্থাপককে এক বছর করে কারাদণ্ড দেওয়া হয় এবং কারখানা সিলগালা করা হয়।
- ২০০৯ সালের সেপ্টেম্বর, চট্টগ্রাম: দ্য ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস জানায়, বিএসটিআই কর্মকর্তাদের নিয়ে ভ্রাম্যমাণ আদালত বায়েজিদ এলাকায় বিএসটিআইয়ের অনুমোদন ছাড়া বিপুল পরিমাণ ঘি তৈরির দায়ে একটি কারখানা সিলগালা করেন এবং নিম্নমানের ঘি তৈরির দায়ে আরও দুটি প্রতিষ্ঠানকে ৩৯ হাজার ও ৮০ হাজার টাকা জরিমানা করেন।
- ২০১৬ সালের জুন, চট্টগ্রাম: ঢাকা ট্রিবিউনের খবর অনুযায়ী, ভ্রাম্যমাণ আদালত একটি কারখানার সন্ধান পান, যেখানে পাম তেল, আঠা, ক্ষতিকর রাসায়নিক ও রং দিয়ে নকল 'বাঘাবাড়ী স্পেশাল গাওয়া ঘি' তৈরি হচ্ছিল।
- ২০১৯ সালের মে, সারা দেশ: বিএসটিআইয়ের বাজার জরিপে নিম্নমানের ৫২টি পণ্যের তালিকায় বাঘাবাড়ী স্পেশাল, বনলতা ও সূর্য ব্র্যান্ডের ঘি আসে এবং হাইকোর্ট সেগুলো প্রত্যাহারের নির্দেশ দেন। দ্য ডেইলি স্টার জানায়, বিএসটিআই কর্মকর্তারা বলেছেন, ৫২টি পণ্যের বেশির ভাগ নিম্নমানের, তবে ভেজাল নয়। ২০১৯ সালের ১৫ মে দ্য ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস জানায়, বিএসটিআই সাতটি প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স বাতিল করেছে, যার মধ্যে ছিল মিরপুরের বনলতা সুইটস অ্যান্ড বেকারির ঘির লাইসেন্স।
দুটি বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণা সমস্যাটি সরাসরি মেপেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা স্থানীয় বাজার থেকে বাটার অয়েলের ৩টি ও ঘির ২৪টি নমুনা বিএসটিআইয়ের মানের সঙ্গে মিলিয়ে পরীক্ষা করেন এবং ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে বাংলাদেশ জার্নাল অব নিউট্রিশনে ফল প্রকাশ করেন। ২৭টি নমুনার সবগুলোই আর্দ্রতা, স্যাপোনিফিকেশন মান ও তিলের তেল পরীক্ষায় বিএসটিআইয়ের সীমা পূরণে ব্যর্থ হয়, আর মাত্র একটি ঘির নমুনা বিএসটিআইয়ের আয়োডিন মানের সীমা ২৬ থেকে ৩৫-এর মধ্যে ছিল।
২০২০ সালের বিএসএমআরএইউ গবেষণায় গাজীপুর থেকে কেনা ব্র্যান্ডের পাঁচটি নমুনার সবগুলোতেই ৯৯.৫ শতাংশের বেশি চর্বি ছিল এবং গবেষকেরা সেগুলোতে কোনো ভেজাল পাননি। ব্র্যান্ডহীন ১৪টি স্থানীয় নমুনার মধ্যে মাত্র তিনটিতে ৯৭ শতাংশের বেশি চর্বি ছিল, কয়েকটিতে আর্দ্রতা ছিল ৮ শতাংশের বেশি, যেখানে খাঁটি ঘিতে তা ০.৫ শতাংশের কম, এবং আটটি নমুনায় বাইরের তেল ও চর্বি মেশানো হয়েছে বলে গবেষকেরা সিদ্ধান্তে পৌঁছান।

হাতের তালু আর কড়াইয়ের পরীক্ষা কেন যথেষ্ট নয়
এই প্রতিবেদনের আগের সংস্করণে রান্নাঘরের দুটি পরীক্ষার কথা বলা হয়েছিল: হাতের তালুতে এক চামচ ঘি রেখে শরীরের উষ্ণতায় গলে গেলে খাঁটি ধরে নেওয়া, আর কড়াইয়ে গরম করলে ঘির রং হলুদ হয়ে গেলে নকল ধরে নেওয়া। এই প্রতিবেদনের জন্য যেসব খাদ্য নিরাপত্তা নির্দেশিকা ও বৈজ্ঞানিক গবেষণা দেখা হয়েছে, তার কোনোটিতেই এ দুটি পরীক্ষা নেই, তাই এখানে এগুলোকে আর বিশুদ্ধতার পরীক্ষা হিসেবে বলা হচ্ছে না।
বিএসএমআরএইউর গবেষকেরা ব্যাখ্যা করেছেন, ভেজালের জন্য সেসব চর্বিই বেছে নেওয়া হয়, যেগুলো দেখতে ও ছুঁয়ে ঘির মতোই লাগে, আর পরীক্ষাগারের মানেও পশুর চর্বি কখনো কখনো ধরা পড়ে না। প্রশিক্ষিত রসায়নবিদের কাছে যে প্রশ্ন কঠিন, হাতের তালুতে তার মীমাংসা হয় না।
খাদ্য নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষের বলা প্রাথমিক পরীক্ষা
ভারতের খাদ্য নিরাপত্তা ও মান কর্তৃপক্ষ (এফএসএসএআই) তাদের নির্দেশিকা 'কুইক টেস্ট ফর সাম অ্যাডালটারেন্টস ইন ফুড'-এ ভেজাল শনাক্তের কয়েকটি সহজ প্রাথমিক পদ্ধতি দিয়েছে। ঘির জন্য সেখানে যা আছে:
- শ্বেতসার, আলু বা মিষ্টি আলুর মণ্ড: অল্প একটু ঘিতে কয়েক ফোঁটা আয়োডিন (টিংচার অব আয়োডিন) দিন। আয়োডিনের রং বাদামি; তা নীল হয়ে গেলে বুঝতে হবে ঘিতে আলু, মিষ্টি আলু বা অন্য শ্বেতসার মেশানো আছে।
- বনস্পতি বা মার্জারিন: ছিপিযুক্ত টেস্টটিউবে প্রায় এক চা-চামচ গলানো ঘির সঙ্গে সমপরিমাণ ঘন হাইড্রোক্লোরিক অ্যাসিড মিশিয়ে এক চিমটি চিনি দিন, এক মিনিট ঝাঁকিয়ে পাঁচ মিনিট রেখে দিন। নিচের (অ্যাসিডের) স্তরে গাঢ় লাল রং দেখা দিলে বনস্পতি বা মার্জারিন আছে। এফএসএসএআই ব্যাখ্যা করেছে, পরীক্ষাটি আসলে তিলের তেল শনাক্ত করে, যা ভারতে বনস্পতি ও মার্জারিনে বাধ্যতামূলকভাবে মেশানো হয়।
- আলকাতরাজাত রং (কোলটার ডাই): চিনি দেওয়ার আগে শুধু ঘন হাইড্রোক্লোরিক অ্যাসিডেই লাল রং দেখা দিলে নমুনায় কোলটার রং আছে; আর চিনি দিয়ে ঝাঁকানোর পরেই কেবল গাঢ় লাল রং এলে শুধু বনস্পতি বা মার্জারিন আছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণাতেও তিলের তেলের এই সূচক ব্যবহার করা হয়েছিল, এবং সেখানে উল্লেখ করা বিএসটিআইয়ের মান অনুযায়ী ঘিতে তিলের তেলের পরীক্ষা নেতিবাচক হতে হবে। অ্যাসিডের পরীক্ষায় ঘন হাইড্রোক্লোরিক অ্যাসিড লাগে, যা পরীক্ষাগারের রাসায়নিক, তাই এটি রান্নাঘরে নয়, পরীক্ষাগারে করার বিষয়। আর ফল নেতিবাচক এলে শুধু সেই ভেজালগুলোই বাদ পড়ে, যেগুলো পরীক্ষাটি খোঁজে; পশুর চর্বি বা নারকেল তেল তাতে ধরা পড়ে না।
পরীক্ষাগারে কী মাপা হয়
মূল প্রতিবেদনটি ঠিকই বলেছিল যে পরীক্ষাগারের পরীক্ষাই নির্ভরযোগ্য উপায়। খাদ্য পরীক্ষাগার ঘি যাচাই করে কয়েকটি 'দুগ্ধচর্বির ধ্রুবক' দিয়ে, অর্থাৎ এমন কিছু মান, যা খাঁটি দুগ্ধচর্বিতে নির্দিষ্ট থাকে এবং অন্য চর্বি মেশালে বদলে যায়। বিএসএমআরএইউর গবেষণায় দুগ্ধচর্বির জন্য এই আদর্শ সীমাগুলো দেওয়া হয়েছে:
- রাইখার্ট-মাইসল (আরএম) মান ১৭ থেকে ৩৫। এটি দুগ্ধচর্বির বৈশিষ্ট্যসূচক স্বল্প-শৃঙ্খল ফ্যাটি অ্যাসিড মাপে; এফএসএসএআইয়ের বিধিতে একে ঘির প্রধান মানদণ্ড ধরা হয়।
- স্যাপোনিফিকেশন মান ২২৫ থেকে ২৩০।
- পোলেনস্কি মান ১.২ থেকে ২.৪; উদ্ভিজ্জ তেল ও দেহের চর্বিতে তা ১.০-এর কম।
- অ্যাসিড মান ০.০ থেকে ১.০, যা চর্বি বাসি বা টক হওয়ার মাপ।
- কির্শনার মান ২০ থেকে ২৬।
- বিউটিরো-রিফ্র্যাক্টোমিটার (বিআর) পাঠ প্রায় ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে ৩৭ থেকে ৪৪; উদ্ভিজ্জ তেল ও চর্বিতে তা ৫০-এর বেশি।
এই মানগুলো কতটা সংবেদনশীল, গবেষকেরা তা দেখিয়েছেন। খাঁটি ঘিতে মাত্র ৫ শতাংশ হাইড্রোজেনেটেড উদ্ভিজ্জ তেল মেশালে আরএম মান হয় ১৪.১০; ৫ শতাংশ সয়াবিন তেলে ৪.১৪; আর ২০ শতাংশ নারকেল তেলে ১.২৯। গাজীপুরের কয়েকটি স্থানীয় নমুনার মান ঠিক এই সীমাগুলোর মধ্যেই পড়ে।
২০১৯ সালের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণায় ব্যবহৃত বিএসটিআইয়ের মানে ঘির জন্য নিজস্ব কিছু সীমাও আছে, যেমন আয়োডিন মান ২৬ থেকে ৩৫, স্যাপোনিফিকেশন মান প্রতি গ্রামে ২১৮ মিলিগ্রামের বেশি, অ্যাসিড মান প্রতি গ্রামে ১.৯ মিলিগ্রামের কম, পারঅক্সাইড মান প্রতি কেজিতে ০.৮ মিলিইকুইভ্যালেন্ট অক্সিজেনের কম এবং তিলের তেলের পরীক্ষা নেতিবাচক।
বাংলাদেশে মান নির্ধারণ ও পরীক্ষার জাতীয় প্রতিষ্ঠান বিএসটিআই। শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীনে ১৯৮৫ সালে প্রতিষ্ঠিত এই সংস্থার কাজের মধ্যে আছে বাংলাদেশ মান (বিডিএস) প্রণয়ন, সার্টিফিকেশন মার্কের লাইসেন্স দেওয়া, পরীক্ষাগারে পরীক্ষা এবং বাজার তদারকি।
ঘিতে কী থাকে
যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগের (ইউএসডিএ) ফুডডেটা সেন্ট্রাল তথ্যভান্ডারে অ্যানহাইড্রাস বাটার অয়েল, অর্থাৎ ঘির মতো একই কোডেক্স শ্রেণির দুগ্ধচর্বিজাত পণ্যের প্রতি ১০০ গ্রামে এই মানগুলো দেওয়া আছে: ৮৭৬ কিলোক্যালরি, ৯৯.৫ গ্রাম চর্বি, যার ৬১.৯ গ্রাম সম্পৃক্ত, ২৮.৭ গ্রাম একক অসম্পৃক্ত ও ৩.৬৯ গ্রাম বহু অসম্পৃক্ত, ২৫৬ মিলিগ্রাম কোলেস্টেরল, ৮৪০ মাইক্রোগ্রাম ভিটামিন এ (রেটিনল অ্যাকটিভিটি ইকুইভ্যালেন্ট হিসেবে), ২.৮ মিলিগ্রাম ভিটামিন ই এবং ০.২৮ গ্রাম আমিষ।
এই সংখ্যাগুলো ঘির দুই দিকই বুঝিয়ে দেয়। মূল প্রতিবেদনে ঘিকে পুষ্টিকর বলা হয়েছিল; সত্যিই এটি শক্তির এবং চর্বিতে দ্রবণীয় ভিটামিন এ-র ঘন উৎস। আবার ওজনের হিসাবে এর বেশির ভাগই সম্পৃক্ত চর্বি। ময়মনসিংহের বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে (বাকৃবি) মহিষের দুধে তৈরি ঘি নিয়ে ২০২২ সালের একটি গবেষণায় ৬৮ শতাংশ সম্পৃক্ত ফ্যাটি অ্যাসিড পাওয়া যায়, এবং একই দুধ থেকে তৈরি পনিরের তুলনায় ঘি ও মাখনে অনেক বেশি কোলেস্টেরল পাওয়া যায়।
ঘি খাওয়া নিয়ে স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ যা বলে
এই প্রতিবেদনের আগের সংস্করণে বলা হয়েছিল, সবার প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় ঘিকে প্রাধান্য দেওয়া উচিত। স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ এমন কথা বলে না, তাই দাবিটি বাদ দেওয়া হয়েছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার স্বাস্থ্যকর খাদ্য বিষয়ক তথ্যপত্রে (২৯ এপ্রিল ২০২০) চর্বিযুক্ত মাংস, মাখন, পাম ও নারকেল তেল, ক্রিম, পনির ও লার্ডের সঙ্গে ঘিকেও সম্পৃক্ত চর্বির উৎস হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। সংস্থাটির পরামর্শ, মোট চর্বি থেকে আসা শক্তি দৈনিক মোট শক্তির ৩০ শতাংশের নিচে এবং সম্পৃক্ত চর্বি থেকে আসা শক্তি ১০ শতাংশের নিচে রাখা উচিত। সম্পৃক্ত চর্বি কমানোর উপায় হিসেবে সংস্থাটি 'মাখন, লার্ড ও ঘির বদলে সয়াবিন, ক্যানোলা (সরিষাজাতীয় রেপসিড), ভুট্টা, কুসুম ফুল ও সূর্যমুখীর মতো বহু অসম্পৃক্ত চর্বিসমৃদ্ধ তেল' ব্যবহারের কথা বলেছে।
যুক্তরাজ্যের জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা (এনএইচএস) তাদের পাতায় (২০২৩ সালের এপ্রিলে পর্যালোচিত) ঘিকে উচ্চ সম্পৃক্ত চর্বিযুক্ত খাবারের তালিকায় রেখেছে। এনএইচএস বলছে, অতিরিক্ত সম্পৃক্ত চর্বি রক্তে 'খারাপ' এলডিএল কোলেস্টেরল বাড়াতে পারে, যা হৃদরোগ ও স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ায়; তাদের পরামর্শ, পুরুষেরা দিনে ৩০ গ্রামের বেশি এবং নারীরা ২০ গ্রামের বেশি সম্পৃক্ত চর্বি খাবেন না।
পরিমিত পরিমাণ নিয়ে কিছু গবেষণা তুলনামূলক আশ্বস্ত করে। হরি শর্মা, শিয়াওইং ঝাং ও চন্দ্রধর দ্বিবেদীর ২০১০ সালে আয়ু জার্নালে প্রকাশিত পর্যালোচনায়, যেখানে খাদ্যে ১০ শতাংশ ঘি দিয়ে ইঁদুরের ওপর তাঁদের নিজেদের একটি পরীক্ষাও ছিল, সিদ্ধান্ত টানা হয় যে 'সাধারণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে পরিমিত ঘি খাওয়ার ক্ষতিকর প্রভাবের সিদ্ধান্ত বিদ্যমান গবেষণা-তথ্য সমর্থন করে না'। একই লেখকেরা উল্লেখ করেন, আসল ঘিতে সবচেয়ে বেশি মেশানো উদ্ভিজ্জ ঘি বা বনস্পতিতে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত ট্রান্স ফ্যাটি অ্যাসিড থাকতে পারে। এই প্রমাণের বড় অংশ প্রাণীর ওপর গবেষণা থেকে পাওয়া, এবং তা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও এনএইচএসের বেঁধে দেওয়া সীমাকে বাতিল করে না।
ট্রান্স ফ্যাটের প্রশ্নেই ভেজাল স্বাস্থ্যের বিষয় হয়ে ওঠে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরামর্শ, ট্রান্স ফ্যাট থেকে আসা শক্তি মোট শক্তির ১ শতাংশের নিচে রাখা উচিত এবং শিল্পে উৎপাদিত ট্রান্স ফ্যাট এড়িয়ে চলা উচিত। বাংলাদেশে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ (বিএফএসএ) ২০২১ সালের ২৯ নভেম্বরের গেজেটে খাদ্যদ্রব্যে ট্রান্স ফ্যাটি অ্যাসিড নিয়ন্ত্রণ প্রবিধানমালা, ২০২১ জারি করে, যাতে ২০২২ সালের ৩১ ডিসেম্বর থেকে সব তেল, চর্বি ও খাদ্যে ট্রান্স ফ্যাট মোট চর্বির ২ শতাংশে সীমিত করা হয়; দ্য ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস জানায়, এর প্রধান উৎস আংশিক হাইড্রোজেনেটেড তেল, যা দেশে ডালডা বা বনস্পতি ঘি নামে পরিচিত। ফলে গোপনে ডালডা মেশানো ঘি ঠিক সেই চর্বিই বহন করতে পারে, যা খাদ্যতালিকা থেকে সরাতে স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ সবচেয়ে বেশি জোর দেয়।
যাঁদের রক্তে কোলেস্টেরল বেশি, হৃদরোগ, ডায়াবেটিস বা অন্য দীর্ঘমেয়াদি রোগ আছে, কিংবা যাঁরা নিশ্চিত নন কতটা চর্বি তাঁদের জন্য উপযুক্ত, তাঁদের ঘিকে নিয়মিত খাদ্যতালিকায় রাখার আগে চিকিৎসক বা যোগ্য পুষ্টিবিদের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
ঘি কেনার সময় যা দেখবেন, অভিযোগ কোথায় করবেন
ঘরোয়া পরীক্ষায় যেহেতু বিশুদ্ধতা প্রমাণ হয় না, তাই কাজের সুরক্ষা হলো নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর দেওয়া ব্যবস্থা:
- মোড়ক পড়ুন। কোডেক্স মান অনুযায়ী পাত্রের গায়ে খাদ্যের নাম, লট শনাক্তকরণ এবং প্রস্তুতকারক বা মোড়কজাতকারীর নাম-ঠিকানা থাকতে হবে।
- বিএসটিআইয়ের সনদ দেখুন। ২০০৯ সালের চট্টগ্রামের ঘটনায় বিএসটিআইয়ের অনুমোদন ছাড়া ঘি তৈরির দায়ে একটি কারখানা সিলগালা করা হয়েছিল, আর ২০১৯ সালের জরিপ দেখায়, বাজারে থাকা ঘিও বিএসটিআই পরীক্ষা করে।
- খুব কম দামে সতর্ক থাকুন: ২০২০ সালের গবেষণায় ভেজাল পাওয়া সব নমুনাই ছিল ব্র্যান্ডহীন স্থানীয় ঘি, যে ধরনের ঘি গবেষকেরা কেজিপ্রতি ৪০০ থেকে ৫০০ টাকায় বিক্রি হতে দেখেছেন; তবে ২০১৯ সালের বিএসটিআই জরিপ দেখায়, শুধু ব্র্যান্ডের নাম নিশ্চয়তা দেয় না।
- সন্দেহজনক পণ্যের খবর দিন। জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর হটলাইন ১৬১২১ বা ওয়েবসাইটের মাধ্যমে বিনা খরচে অভিযোগ নেয়, এবং ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ আইন, ২০০৯ অনুযায়ী আদায় করা জরিমানার ২৫ শতাংশ অভিযোগকারী পান বলে ঢাকা ট্রিবিউন ২০২৪ সালের মার্চে জানায়।
সামগ্রিকভাবে খাদ্য নিরাপত্তা দেখভাল করে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ, যা নিরাপদ খাদ্য আইন, ২০১৩-এর অধীনে ২০১৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে গঠিত হয় এবং খাদ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে কাজ করে। নিম্নমানের ৫২টি পণ্য নিয়ে ২০১৯ সালের আদেশে হাইকোর্ট নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ ও ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, দুই সংস্থাকেই পদক্ষেপ নিয়ে আদালতে প্রতিবেদন দিতে নির্দেশ দেন।
ছবি: মিদোরি / উইকিমিডিয়া কমন্স (সিসি বাই ৩.০)
সূত্র: দ্য এগ্রো নিউজ (নিজস্ব প্রতিবেদক), কোডেক্স অ্যালিমেন্টারিয়াস কমিশন (এফএও/ডব্লিউএইচও, দুগ্ধচর্বিজাত পণ্যের কোডেক্স মান), জার্নাল অব অ্যাডভান্সড ভেটেরিনারি অ্যান্ড অ্যানিমেল রিসার্চ (বিএসএমআরএইউ ২০২০; বাকৃবি ২০২২), বাংলাদেশ জার্নাল অব নিউট্রিশন (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ২০১৯), ভারতের খাদ্য নিরাপত্তা ও মান কর্তৃপক্ষ, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, যুক্তরাজ্যের জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা (এনএইচএস), আয়ু জার্নাল (২০১০), ইউএসডিএ ফুডডেটা সেন্ট্রাল, দ্য ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস, দ্য ডেইলি স্টার, ঢাকা ট্রিবিউন, প্রথম আলো, ইউএনবি



মন্তব্য
(০)