সরাসরিবাজারদর
আটা (প্যাকেটজাত)৫৮—আদা - আমদানিকৃত১৬৭—আদা - দেশী১৫৪—আমন চাল - মাঝারি৫৬—আমন চাল - মোটা৪৮—আমন চাল - সরু৭২—আয়োডিনযুক্ত লবণ (প্যাকেটজাত)৩২—কাঁচা মরিচ২১৮—খামারের মুরগী১৬২—খাসী৯০০—চিনি (দেশী)১৩২—ছোলা - গোটা৮৫—ডিম ফার্ম - লাল৪৭—পেঁয়াজ - দেশী৬০—বোরো চাল - মাঝারি৫৫—বোরো চাল - মোটা৪৭—বোরো চাল - সরু৬৬—মাংসঃ– গরু৭২৯—মুগ ডাল১২২—রসুন - আমদানিকৃত১৯২—রসুন - দেশী১৭৩—সয়াবিন তেল১৬৩—
হালনাগাদ ১৬ অক্টোবর ২০২৬
ঢাকা২৯°পরিষ্কার আকাশআর্দ্রতা ৫৮%বাতাস ৬ কিমি/ঘ

জলাবদ্ধতা যেভাবে মাটি ও ফসলের ক্ষতি করে, কৃষকের করণীয়

জমিতে পানি জমে থাকলে মাটিতে অক্সিজেন ফুরিয়ে যায়, নাইট্রোজেন হারায় ও বিষাক্ত যৌগ জমে। ২০২৬ সালের জুলাইয়ের বন্যা ও অতিবৃষ্টির মধ্যে এসআরডিআইয়ের এক মৃত্তিকা বিজ্ঞানী নিষ্কাশন, জৈব পদার্থ ও মাটি পরীক্ষাভিত্তিক সার প্রয়োগের পরামর্শ দেন।

জলাবদ্ধতা যেভাবে মাটি ও ফসলের ক্ষতি করে, কৃষকের করণীয়
ফসল

২০২৬ সালের ২৯ জুলাই, যখন সরকারি হিসাবে বন্যা ও অতিবৃষ্টিতে দেশের ৪৩ জেলায় ফসলের ক্ষতি হয়ে গেছে, তখন জাগো নিউজ২৪ মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের (এসআরডিআই) মৃত্তিকা বিজ্ঞানী মাহমুদুল হাসান চৌধুরীর একটি লেখা প্রকাশ করে। বিষয় ছিল, জলাবদ্ধতা কেন কৃষি উৎপাদনের ক্ষতি করে এবং এ থেকে বাঁচতে কী করা যায়। তাঁর মূল যুক্তি ছিল, জমিতে জমে থাকা পানিকে কেবল একটি মৌসুমি সমস্যা হিসেবে দেখলে চলবে না; এটি মাটির স্বাস্থ্যের প্রশ্ন। জলাবদ্ধতা মাঠের ফসলের ক্ষতি তো করেই, সেই সঙ্গে মাটির রসায়ন, মাটিতে বাস করা জীব এবং মাটির ভৌত গঠনও বদলে দেয়, যার প্রভাব পরের মৌসুম পর্যন্ত থেকে যেতে পারে।

লেখক মনে করিয়ে দেন, বাংলাদেশ কৃষিপ্রধান দেশ; দেশের খাদ্য নিরাপত্তা, কৃষকের জীবিকা ও সামগ্রিক অর্থনীতি অনেকাংশে কৃষির ওপর নির্ভরশীল। দেশের অধিকাংশ কৃষিজমি মৌসুমি বৃষ্টির ওপর নির্ভর করে বলে বর্ষাকালে অতিবৃষ্টি, উজান থেকে নেমে আসা ঢল, নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি এবং দুর্বল নিষ্কাশন ব্যবস্থার কারণে অনেক এলাকায় জমিতে পানি জমে থাকে। তিনি লেখেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে স্বল্প সময়ে ভারী বৃষ্টির প্রবণতা বেড়েছে, তাই জলাবদ্ধতাও আগের চেয়ে ঘন ঘন দেখা দিচ্ছে, যা কেবল ফসল নয়, মাটির স্বাস্থ্য, জীববৈচিত্র্য ও দীর্ঘমেয়াদি উৎপাদনক্ষমতারও ক্ষতি করছে।

জুলাইজুড়ে পানির নিচে ফসলের মাঠ


লেখাটি প্রকাশের আগের কয়েক সপ্তাহ ধরেই ফসল তলিয়ে যাওয়ার খবর আসছিল। ২০২৬ সালের ১১ জুলাই দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের বাংলা সংস্করণ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (ডিএই) ও জেলা মৎস্য কর্মকর্তার কার্যালয়ের প্রাথমিক হিসাব উদ্ধৃত করে জানায়, টানা এক সপ্তাহের ভারী বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে, অনেক এলাকায় জলাবদ্ধতাসহ, চট্টগ্রাম জেলায় ১৫ হাজার ৯১১ হেক্টর ফসলি জমি তলিয়ে গেছে। এর মধ্যে ছিল আবাদ হওয়া ৩০ হাজার ২২.৫ হেক্টরের মধ্যে ৯ হাজার ৪৩.৫ হেক্টর আউশ ধান, ২ হাজার ৭২১.৬৭ হেক্টরের মধ্যে ৯৬০.৬৬ হেক্টর আমন বীজতলা এবং ১৭ হাজার ৮২৮.৬৫ হেক্টরের মধ্যে ৫ হাজার ৯০৭ হেক্টর গ্রীষ্মকালীন সবজি। সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয় বাঁশখালী উপজেলায়, ৩ হাজার ৬০৫ হেক্টর। পুকুর ও খামার থেকে প্রায় ৯১ কোটি টাকার মাছ ভেসে যায়, এবং কর্মকর্তারা জানান, জরিপ শেষ হলে চূড়ান্ত হিসাবে ক্ষতি আরও বাড়তে পারে।

১২ জুলাই বণিক বার্তা জানায়, ১২ জেলায় ২৮ হাজার ৬১০ হেক্টর জমির ফসল বন্যার কবলে পড়েছে, যার মধ্যে অন্তত ২ হাজার হেক্টর আমন বীজতলা ও ১৫ হাজার হেক্টর আউশ ধান। ডিএইর মাঠ উইংয়ের একজন পরিচালক পত্রিকাটিকে বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত ফসলের মধ্যে আছে আউশ ধান, রোপা আমনের বীজতলা, গ্রীষ্মকালীন সবজি, ফলের বাগান ও পানের বরজ, এবং ক্ষতির পরিমাণ তখনো নিরূপণ করা সম্ভব হয়নি। অধিদপ্তর সতর্ক করে বলে, আক্রান্ত জমি মানেই পুরো ক্ষতি নয়; বৃষ্টি কমে পানি নেমে গেলে বীজতলা ও গাছ টিকে যেতে পারে। প্রতিবেদনে উদ্ধৃত ডিএইর হিসাবে বীজতলা মোট ধানি জমির বিশ ভাগের এক ভাগ, ফলে ওই ২ হাজার হেক্টর বীজতলা থেকে সাধারণত ৪০ হাজার হেক্টর জমির চারা পাওয়া যেত। একই প্রতিবেদনে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন অধ্যাপক ভাসমান বীজতলা প্রযুক্তির প্রসার এবং মৌসুমি পূর্বাভাস দেওয়ার পরামর্শ দেন, যাতে কৃষক ঝুঁকিপূর্ণ সময় এড়িয়ে ধাপে ধাপে রোপণ করতে পারেন।

১৬ জুলাই ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশন (আইটিভি) কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ বিভাগের তথ্য উদ্ধৃত করে জানায়, বন্যায় ৪৩ জেলায় প্রায় ১ লাখ ১৫ হাজার হেক্টর জমির ফসলের ক্ষতি হয়েছে, এর মধ্যে সাড়ে ৬২ হাজার হেক্টর জমির আউশ ও আমনের বীজতলা প্লাবিত হয়েছে, এবং ডিএইর হিসাবে ৫ লাখের বেশি কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত। নোয়াখালীর দ্বীপ উপজেলা হাতিয়া নিয়ে দ্য ডেইলি স্টারের বাংলা সংস্করণ ২০ জুলাই জানায়, স্বাভাবিকের চেয়ে প্রায় ৩ ফুট উঁচু জোয়ার ও টানা বৃষ্টিতে নিচু এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। উপজেলা কৃষি অফিসের হিসাবে প্রায় ২৫ হাজার হেক্টর জমির ফসল ও বীজতলা তলিয়ে নষ্ট হয়েছে, যার মধ্যে ২১ হাজার ৫২০ হেক্টর আউশ ধান ও ১ হাজার ৯২০ হেক্টর আমন বীজতলা; ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক ৩৮ হাজার ৫৬৪ জন।

জমিতে পানি কেন জমে থাকে


এই চিত্রের শিকড় দেশের জলবায়ু ও ভূপ্রকৃতিতে। বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী, বাংলাদেশে বার্ষিক বৃষ্টিপাত পশ্চিম-মধ্যাঞ্চলে ১৫০০ মিলিমিটার থেকে উত্তর-পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে ৩০০০ মিলিমিটারের বেশি, এবং জুন থেকে অক্টোবরের বর্ষা মৌসুমেই হয় বছরের মোট বৃষ্টির ৭০ থেকে ৮৫ শতাংশ। দেশে সবচেয়ে বেশি বৃষ্টি হয় লালাখালে, ৬৪০০ মিলিমিটার। বাংলাপিডিয়া আরও জানায়, স্বাভাবিক বছরে দেশের প্রায় ২৬ হাজার বর্গকিলোমিটার, অর্থাৎ ১৮ শতাংশ এলাকা প্লাবিত হয়; ১৯৮৮ সালের বন্যায় প্রায় ৮২ হাজার বর্গকিলোমিটার, দেশের প্রায় ৬০ শতাংশ এলাকা ডুবে যায়, আর ১৯৯৮ সালে দেশের দুই-তৃতীয়াংশের বেশি এলাকা প্লাবিত হয়েছিল।

একই সূত্রে বন্যার তিনটি ধরন আলাদা করা হয়েছে: মৌসুমি বন্যা, যার পানি ধীরে বাড়ে ও ধীরে নামে; আকস্মিক বা ঢলের বন্যা, যাতে সাধারণত পাহাড়ি এলাকার উপত্যকায় পানি হঠাৎ বাড়ে ও হঠাৎ নামে; এবং স্বল্পস্থায়ী জোয়ারের বন্যা, যা দেশের ভেতরের বন্যার পানি নিষ্কাশনে বাধা দেয়। ২০২৬ সালের জুলাইয়ের প্রতিবেদনগুলোতে তিনটিরই দেখা মেলে: চট্টগ্রামে পাহাড়ি ঢল, উত্তরের নদীগুলোর পানি বিপৎসীমা ছাড়িয়ে যাওয়ার পূর্বাভাস, আর হাতিয়ায় উঁচু জোয়ার। পানি নামতে না পারলে এরা পেছনে যে অবস্থা রেখে যায়, সেটিই জলাবদ্ধতা। যুক্তরাষ্ট্রের নর্থ ডাকোটা স্টেট ইউনিভার্সিটির (এনডিএসইউ) সম্প্রসারণ বিভাগের একটি নোটে জলাবদ্ধতাকে প্লাবিত, পানি জমা বা পানিতে সম্পৃক্ত মাটি হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে, এবং বলা হয়েছে, এর প্রধান ক্ষতি অক্সিজেনের অভাব, কারণ অতিরিক্ত পানি নিজে গাছের সঙ্গে কোনো রাসায়নিক বিক্রিয়া করে না।

জমে থাকা পানি মাটির কী করে


মাহমুদুল হাসান চৌধুরী মাটিকে একটি জীবন্ত ও গতিশীল প্রাকৃতিক ব্যবস্থা হিসেবে বর্ণনা করেন, যেখানে খনিজ কণা, জৈব পদার্থ, পানি, বায়ু ও অসংখ্য উপকারী অণুজীব মিলে একটি ভারসাম্যপূর্ণ পরিবেশ গড়ে তোলে। তাঁর ভাষায়, একটি সুস্থ মাটিতে সাধারণত প্রায় ৪৫ শতাংশ খনিজ পদার্থ, ২৫ শতাংশ পানি, ২৫ শতাংশ বায়ু ও ৫ শতাংশ জৈব পদার্থ থাকে, এবং এই ভারসাম্যই শেকড়ের বৃদ্ধি, পুষ্টি গ্রহণ ও অণুজীবের কাজ সচল রাখে। যুক্তরাষ্ট্রের কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের মৃত্তিকাবিজ্ঞান বিষয়ক প্রকাশনাতেও একই চিত্র: মাটির প্রায় অর্ধেক কঠিন পদার্থ, অর্ধেক ছিদ্র বা রন্ধ্র; আয়তনের প্রায় ৪৫ শতাংশ খনিজ ও প্রায় ৫ শতাংশ জৈব পদার্থ, আর রন্ধ্রে পানি ও বায়ুর ভাগ বৃষ্টি ও নিষ্কাশনের সঙ্গে প্রায়ই, কখনো প্রতিদিন, বদলায়।

জমিতে দীর্ঘ সময় পানি জমে থাকলে মাটির রন্ধ্রগুলো পানিতে ভরে যায় এবং বায়ু চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। ফ্রন্টিয়ার্স ইন প্ল্যান্ট সায়েন্স সাময়িকীতে ২০২১ সালে প্রকাশিত জলাবদ্ধতা সহনশীলতা বিষয়ক একটি পর্যালোচনা ব্যাখ্যা করে কেন এটি এত দ্রুত ক্ষতি করে: পানিতে অক্সিজেনের বিস্তারের হার বাতাসের তুলনায় মাত্র দশ হাজার ভাগের এক ভাগ, ফলে জলাবদ্ধতায় মাটি ও বায়ুমণ্ডলের মধ্যে গ্যাস বিনিময় বন্ধ হয়ে যায়, শেকড়ের শ্বসন কমে যায় এবং শেকড়ে শক্তির ঘাটতি দেখা দেয়। লেখক জানান, মাটিতে ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টা জলাবদ্ধতা থাকলেই অধিকাংশ উঁচু জমির ফসলের শেকড়ে অক্সিজেনের ঘাটতি শুরু হয়; দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতায় মাটি সম্পূর্ণ অবায়বীয় হয়ে যেতে পারে, তখন শেকড়ের কোষে শক্তি উৎপাদন কমে যায়, নতুন শেকড় গঠন ব্যাহত হয় এবং পানি ও পুষ্টি শোষণের ক্ষমতা দ্রুত কমে।

এনডিএসইউর নোট যোগ করে, অক্সিজেন কত দ্রুত ফুরাবে তা নির্ভর করে তাপমাত্রা ও মাটির জৈবিক কর্মকাণ্ডের ওপর: তাপমাত্রা বেশি হলে এবং মাটিতে জৈব পদার্থ সক্রিয়ভাবে পচতে থাকলে অক্সিজেন দ্রুত শেষ হয়। সাধারণভাবে, নোটটির ভাষ্য অনুযায়ী, পানিতে সম্পৃক্ত মাটিতে প্রায় ৪৮ থেকে ৯৬ ঘণ্টা পর অক্সিজেনের মাত্রা গাছের বৃদ্ধির জন্য ক্ষতিকর পর্যায়ে নামে। অঙ্কুরিত বীজ ও সদ্য গজানো চারা খুবই সংবেদনশীল, কারণ এদের বিপাকের হার বেশি; মাটির তাপমাত্রা ৬৫ ডিগ্রি ফারেনহাইটের বেশি থাকলে ৪৮ ঘণ্টার বেশি পানিতে সম্পৃক্ত মাটিতে ছোট গাছ মারা যেতে পারে।

লেখকের বর্ণনায় এর দৃশ্যমান ফল হলো, গাছের বৃদ্ধি মন্থর হয়, পাতা হলদে হতে থাকে, কুশির সংখ্যা কমে এবং ফলন উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়; অনেক ক্ষেত্রে শেকড় পচা রোগও বাড়ে। এনডিএসইউর নোটেও শেকড় পচার কথা আছে, সঙ্গে বলা হয়েছে, জলাবদ্ধতার শিকার গাছ প্রায়ই গরম আবহাওয়ায় বেশি সংবেদনশীল হয় এবং শেকড় সীমিত থাকায় মৌসুমের পরের দিকে নাইট্রোজেন ও ফসফরাসের ঘাটতি দেখায়; ফলে স্পষ্ট লক্ষণ না দেখা গেলেও ফলন কমতে পারে।

হারিয়ে যায় নাইট্রোজেন, বাড়ে বিষাক্ত ধাতু


লেখকের মতে, জলাবদ্ধ মাটিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাসায়নিক পরিবর্তন হলো মাটির রেডক্স বিভব দ্রুত কমে যাওয়া। স্বাভাবিক বায়বীয় অবস্থায় যথেষ্ট অক্সিজেন থাকায় উপকারী রাসায়নিক বিক্রিয়াগুলো ঠিকমতো চলে; পানি জমে অক্সিজেনের সরবরাহ বন্ধ হলে মাটি ধীরে ধীরে অবায়বীয় হয়ে যায় এবং নাইট্রোজেন, সালফার, লৌহ, ম্যাঙ্গানিজসহ বিভিন্ন পুষ্টি উপাদানের রাসায়নিক রূপ বদলাতে থাকে, যা প্রায়ই গাছের উপকারের বদলে ক্ষতি করে। অক্সিজেনের অভাবে ডিনাইট্রিফিকেশন দ্রুত বাড়ে: মাটির নাইট্রেট ধাপে ধাপে নাইট্রিক অক্সাইড, নাইট্রাস অক্সাইড ও শেষে নাইট্রোজেন গ্যাসে পরিণত হয়ে বাতাসে চলে যায়। ফলে ফসলে নাইট্রোজেনের ঘাটতি দেখা দেয়।

এনডিএসইউর নোট ব্যাখ্যা করে, অতিরিক্ত পানি নাইট্রেটকে শেকড়ের নাগালের নিচে ধুয়েও নিয়ে যেতে পারে, বিশেষ করে হালকা ও সহজে পানি নিষ্কাশিত হয় এমন মাটিতে; আর ভারী মাটিতে নাইট্রেট হারায় ডিনাইট্রিফিকেশনের মাধ্যমে। কতটা হারাবে তা নির্ভর করে মাটিতে নাইট্রেটের পরিমাণ, মাটির তাপমাত্রা এবং কতদিন মাটি পানিতে সম্পৃক্ত থাকে তার ওপর। নোটে উদ্ধৃত গবেষণায় দেখা গেছে, মাটি যতদিন পানিতে সম্পৃক্ত থাকে, তার প্রতিদিন ডিনাইট্রিফিকেশনে ১ থেকে ৫ শতাংশ নাইট্রেট হারায়।

লেখক উল্লেখ করেন, নাইট্রাস অক্সাইড অত্যন্ত শক্তিশালী গ্রিনহাউস গ্যাস, যার বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ক্ষমতা কার্বন ডাই-অক্সাইডের প্রায় ২৭০ গুণ; তাই জলাবদ্ধতা সরাসরি জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গেও যুক্ত। যুক্তরাষ্ট্রের পরিবেশ সুরক্ষা সংস্থা (ইপিএ) জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক আন্তঃসরকার প্যানেলের (আইপিসিসি) ২০২১ সালের ষষ্ঠ মূল্যায়ন প্রতিবেদনের হিসাব ধরে জানায়, ১০০ বছরের হিসাবে নাইট্রাস অক্সাইডের বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ক্ষমতা কার্বন ডাই-অক্সাইডের ২৭৩ গুণ, এবং আজ নির্গত নাইট্রাস অক্সাইড গড়ে ১০০ বছরের বেশি সময় বায়ুমণ্ডলে থেকে যায়।

এরপর আরও পরিবর্তন ঘটে। লৌহ ও ম্যাঙ্গানিজ বিজারিত হয়ে বেশি দ্রবণীয় রূপ নেয়, এবং অতিরিক্ত পরিমাণে শেকড়ে ঢুকলে গাছে বিষক্রিয়া ঘটাতে পারে। ফসফরাস, জিঙ্ক, বোরন ও সালফারের প্রাপ্যতাও বদলে যায়, ফলে মাটিতে মোট পুষ্টি উপাদান যথেষ্ট থাকলেও গাছ তা কার্যকরভাবে নিতে পারে না; লেখক জানান, বিজ্ঞানীরা একে বলেন পুষ্টি উপাদানের শারীরবৃত্তীয় ঘাটতি। এ কারণেই, তাঁর যুক্তি, জলাবদ্ধ জমিতে কেবল সার দিলে সমস্যার সমাধান হয় না; মাটির পরিবেশ স্বাভাবিক করাও সমান জরুরি।

জার্মানির দক্ষিণ ব্ল্যাক ফরেস্টে একটি গ্লে মাটির স্তরচিত্র; গ্লে মাটি নিষ্কাশন না হলে ভূগর্ভস্থ পানিতে সম্পৃক্ত থাকে। ছবি: U. Burkhardt / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0)
জার্মানির দক্ষিণ ব্ল্যাক ফরেস্টে একটি গ্লে মাটির স্তরচিত্র; গ্লে মাটি নিষ্কাশন না হলে ভূগর্ভস্থ পানিতে সম্পৃক্ত থাকে। ছবি: U. Burkhardt / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0)

মাটির জীব, বিষাক্ত গ্যাস ও ভেঙে পড়া গঠন


ক্ষতি পৌঁছায় মাটির জীবন্ত অংশেও। লেখক জানান, একটি সুস্থ মাটিতে কোটি কোটি ব্যাকটেরিয়া, ছত্রাক, অ্যাকটিনোমাইসিটিস, শৈবাল, প্রোটোজোয়া, কেঁচো ও অন্যান্য জীব বাস করে, যাদের সম্মিলিত কাজে জৈব পদার্থ পচে গাছের জন্য পুষ্টি সহজলভ্য হয়। দীর্ঘ জলাবদ্ধতায় অক্সিজেন বন্ধ হলে এসব উপকারী জীবের কার্যক্ষমতা অনেক কমে যায়; বিশেষ করে নাইট্রোজেন সংবন্ধনকারী ও ফসফরাস দ্রবণকারী ব্যাকটেরিয়ার কাজ বাধাগ্রস্ত হয়, পুষ্টি উপাদানের স্বাভাবিক চক্র ব্যাহত হয় এবং মাটির উর্বরতা ধীরে ধীরে কমে।

তাদের জায়গায় সক্রিয় হয়ে ওঠে কিছু অবায়বীয় অণুজীব। এরা জৈব পদার্থ ভাঙার সময় মিথেন, হাইড্রোজেন সালফাইড ও নানা জৈব অ্যাসিড তৈরি করে। হাইড্রোজেন সালফাইড শেকড়ের জন্য অত্যন্ত বিষাক্ত; এটি শেকড়ের শ্বসন ও কোষের স্বাভাবিক বিপাকে বাধা দেয়। আর মিথেন একটি শক্তিশালী গ্রিনহাউস গ্যাস। ইপিএর হিসাবে ১০০ বছরে মিথেনের বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ক্ষমতা ২৭ থেকে ৩০, এবং আজ নির্গত মিথেন গড়ে প্রায় এক দশক বায়ুমণ্ডলে থাকে, যা কার্বন ডাই-অক্সাইডের চেয়ে অনেক কম সময়।

লেখকের মতে, জমি যত বেশি দিন জলাবদ্ধ থাকে, বিষাক্ততার ঝুঁকি তত বাড়ে: শেকড়ের বৃদ্ধি কমে, পাতায় বাদামি বা কালচে দাগ পড়ে, কচি পাতা শুকিয়ে যেতে পারে এবং পুষ্টি গ্রহণ ব্যাহত হয়; একই সঙ্গে জৈব অ্যাসিড ও অন্যান্য বিজারিত যৌগ জমে মাটির পরিবেশ আরও প্রতিকূল করে তোলে। তাই পানি সরানো কেবল প্রথম ধাপ; মাটির রাসায়নিক ভারসাম্যও ফিরিয়ে আনতে হয়।

মাটির ভৌত গঠনও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। খুব ভেজা জমিতে ভারী কৃষিযন্ত্র চালালে বা বারবার হাঁটাচলা করলে মাটির কণাগুলো শক্তভাবে একসঙ্গে চেপে যায় এবং মাটি দেবে যায়। এতে রন্ধ্রের পরিমাণ কমে, নিষ্কাশন ক্ষমতা কমে এবং শেকড় ছড়াতে পারে না, ফলে পরের মৌসুমেও উৎপাদন কমতে পারে। লেখক সতর্ক করেন, এ অবস্থা দীর্ঘদিন চললে মাটির গঠন ভেঙে যায়, পানি ধরে রাখা ও নিষ্কাশনের স্বাভাবিক ভারসাম্য নষ্ট হয় এবং জমি চাষের উপযোগিতা হারায়।

কোন ফসল বেশি ঝুঁকিতে


সব ফসল সমানভাবে জলাবদ্ধতা সহ্য করতে পারে না। লেখক জানান, ধান তুলনামূলকভাবে সহনশীল হলেও গম, ভুট্টা, আলু, ডাল, পেঁয়াজ, রসুন, মরিচ এবং অধিকাংশ সবজি অল্প সময়ের জলাবদ্ধতাতেই ক্ষতিগ্রস্ত হয়; আর অঙ্কুরোদগম, চারা প্রতিষ্ঠা এবং ফুল ও ফল ধরার সময় পানি জমলে ক্ষতি সবচেয়ে বেশি হয়। তাই তিনি ফসলের ধরন, জমির অবস্থান ও বৃষ্টিপাতের ধরন বিবেচনা করে পানি ব্যবস্থাপনার পরিকল্পনা নেওয়ার কথা বলেন।

এনডিএসইউর নোটে বিভিন্ন সূত্রের ভিত্তিতে সবচেয়ে সহনশীল থেকে সবচেয়ে সংবেদনশীল পর্যন্ত একটি সম্ভাব্য ক্রম দেওয়া হয়েছে: ধান, সয়াবিন, ওট, গম, ভুট্টা, বার্লি, ক্যানোলা, মটর, শুকনো শিম ও মসুর; তবে বৃদ্ধির পর্যায় ও জাতভেদে এ ক্রম বদলাতে পারে। নোটটি আরও বলে, দানাশস্য ও ভুট্টা যতদিন তাদের বর্ধনশীল অংশ মাটির নিচে থাকে, অর্থাৎ পাঁচ-ছয় পাতা হওয়ার আগে, ততদিন জলাবদ্ধতায় বেশি সংবেদনশীল।

পুরোপুরি ডুবে গেলে ধানেরও সীমা আছে, এবং দেশের গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো এই ঝুঁকির জন্য জাত উদ্ভাবন করেছে। দ্য ডেইলি স্টার ২০১০ সালের জুনে জানায়, বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি) আন্তর্জাতিক ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের (ইরি) সঙ্গে চার বছর কাজ করে জলমগ্নতা সহনশীল ব্রি ধান৫১ ও ব্রি ধান৫২ উদ্ভাবন করেছে; এদের স্বাভাবিক ফলন হেক্টরে ৫ থেকে ৫.৫ টন, আর ডুবে গেলে ৪ থেকে ৪.৫ টন। ২০২০ সালের ১১ আগস্ট প্রকাশিত বন্যা-পরবর্তী পরামর্শে ডিএই কৃষকদের বলে, বন্যা দীর্ঘস্থায়ী হলে বন্যা সহনশীল জাতের চাষ করতে এবং উঁচু জায়গায় সম্মিলিতভাবে ব্রি ধান৫১, ব্রি ধান৫২ অথবা বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিনা) বিনা ধান১১ ও বিনা ধান১২-এর বীজতলা তৈরি করতে।

লেখক বিভিন্ন গবেষণার উল্লেখ করে বলেন, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত ও আকস্মিক বন্যার কারণে ভবিষ্যতে জলাবদ্ধতার ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে, তাই মাটির স্বাস্থ্য রক্ষা ও জলাবদ্ধতা-সহনশীল কৃষি প্রযুক্তির সম্প্রসারণ এখন জরুরি। তাঁর মতে, মাটিকে কেবল উৎপাদনের মাধ্যম হিসেবে নয়, একটি জীবন্ত প্রাকৃতিক সম্পদ হিসেবে সংরক্ষণ করতে হবে।

ইংল্যান্ডের ইস্ট সাসেক্সের একটি মাঠ, যেখানে জলাবদ্ধতায় ফসলের বৃদ্ধি পিছিয়ে গেছে; ছবিটি ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে তোলা। ছবি: Andrew Diack / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 2.0)
ইংল্যান্ডের ইস্ট সাসেক্সের একটি মাঠ, যেখানে জলাবদ্ধতায় ফসলের বৃদ্ধি পিছিয়ে গেছে; ছবিটি ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে তোলা। ছবি: Andrew Diack / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 2.0)

পানি নিষ্কাশন ও মাটিতে জৈব পদার্থ


ক্ষতি কমাতে লেখক সবার আগে কার্যকর নিষ্কাশনের কথা বলেন। জমির চারপাশে ও মাঝখানে পর্যাপ্ত নালা কাটলে অতিরিক্ত পানি দ্রুত বের হয়ে যায়; নিচু এলাকায় উঁচু বেডে সবজি চাষ করলে শেকড় অনেকাংশে ক্ষতি থেকে রক্ষা পায়; আর খাল, নালা ও প্রাকৃতিক জলপ্রবাহের পথ নিয়মিত পরিষ্কার রাখলে অতিবৃষ্টির সময় পানি দ্রুত সরে যায়। তিনি যোগ করেন, যেখানে সম্ভব, সুষম ভূমি সমতলকরণ ও নিয়ন্ত্রিত নিষ্কাশন জলাবদ্ধতার ঝুঁকি অনেক কমাতে পারে।

যেখানে পানি একেবারেই সরানো যায় না, সেখানে দেশের কিছু এলাকার কৃষক বহুদিন ধরে পানির ওপরেই ফসল ফলান। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) ২০১৫ সালে গোপালগঞ্জ, পিরোজপুর ও বরিশালের ভাসমান বাগান কৃষিপদ্ধতিকে বিশ্বব্যাপী গুরুত্বপূর্ণ কৃষি ঐতিহ্য ব্যবস্থা (জিআইএএইচএস) হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। এফএওর বর্ণনায়, কচুরিপানা ও অন্যান্য উদ্ভিদের অবশিষ্টাংশ দিয়ে তৈরি এসব বেডে গ্রীষ্মকালে ঢেঁড়স, ঝিঙা, পুঁইশাক, বেগুন ও শসার মতো সবজি চাষ হয়, এবং স্থানীয় কৃষকেরা প্রায় দুই শতাব্দী ধরে এ পদ্ধতি অনুসরণ করছেন। ডিএইর ২০২০ সালের পরামর্শেও বলা হয়েছিল, জমি থেকে পানি না সরলে আমনের ভাসমান বীজতলা তৈরি করা যেতে পারে।

জমিতে, লেখকের ভাষায়, মাটির স্বাস্থ্য পুনরুদ্ধারে জৈব পদার্থের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নিয়মিত কম্পোস্ট, পচা গোবর, ভার্মি কম্পোস্ট, সবুজ সার ও ফসলের অবশিষ্টাংশ মাটিতে মেশালে মাটির গঠন উন্নত হয়, রন্ধ্র বাড়ে এবং পানি ধরে রাখা ও নিষ্কাশনের মধ্যে ভালো ভারসাম্য তৈরি হয়। জৈব পদার্থ উপকারী অণুজীবের খাদ্য হিসেবেও কাজ করে, ফলে মাটির জৈবিক কর্মকাণ্ড ও পুষ্টির প্রাকৃতিক চক্র আবার সচল হয়। তিনি গবেষণার উল্লেখ করে বলেন, জৈব পদার্থসমৃদ্ধ মাটি জলাবদ্ধতা ও খরা দুটোই তুলনামূলকভাবে ভালোভাবে সামলাতে পারে।

দক্ষিণাঞ্চলের একটি নদীর খালে ভাসমান সবজি বেড; ছবিটি ২০২০ সালের নভেম্বরে তোলা। ছবি: Azimronnie / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
দক্ষিণাঞ্চলের একটি নদীর খালে ভাসমান সবজি বেড; ছবিটি ২০২০ সালের নভেম্বরে তোলা। ছবি: Azimronnie / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)

পানি নামার পর সার প্রয়োগ ও আবার রোপণ


লেখক সতর্ক করেন, জলাবদ্ধতার পর সার প্রয়োগে বিশেষ সতর্কতা দরকার, কারণ অতিবৃষ্টিতে নাইট্রোজেন, সালফার ও বোরন ধুয়ে যেতে পারে বা গ্যাস হয়ে হারিয়ে যেতে পারে। তাঁর মতে, সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো পানি নেমে যাওয়ার পর মাটি পরীক্ষা করে প্রয়োজন অনুযায়ী সুষম সার দেওয়া। বিশেষ করে ইউরিয়া একবারে না দিয়ে দুই বা তিন কিস্তিতে দিলে নাইট্রোজেনের অপচয় কমে এবং গাছ ধীরে ধীরে পুষ্টি নিতে পারে; জৈব ও অজৈব সারের সমন্বিত ব্যবহার মাটির দীর্ঘমেয়াদি উর্বরতা ধরে রাখতে সাহায্য করে। তিনি জলাবদ্ধতাপ্রবণ এলাকায় সহনশীল ফসল ও জাত নির্বাচন, ফসল পর্যায়ক্রম, মালচিং, সংরক্ষণমূলক চাষ এবং সঠিক সময়ে বপন বা রোপণের পরামর্শ দেন, সঙ্গে স্থানীয় আবহাওয়ার পূর্বাভাস, বৃষ্টির সম্ভাবনা ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের পরামর্শ মেনে মাঠ ব্যবস্থাপনার কথা বলেন।

পানি নামার পর আমন ধানের ক্ষেত্রে এই পরামর্শ মাঠে কীভাবে কাজে লাগে, তা দেখা যায় ডিএইর ২০২০ সালের আগস্টের বন্যা-পরবর্তী বিশেষ কৃষি আবহাওয়া পরামর্শে। ধানের জন্য এর প্রধান কথাগুলো ছিল:

  • আমনের বীজতলা ও মূল জমি থেকে অতিরিক্ত পানি নিষ্কাশন করুন, নতুন বীজতলার জন্য উঁচু জায়গা বেছে নিন, এবং বন্যার পানি নেমে যাওয়ার পরই চারা রোপণ করুন; রোপণের আগে চারার শিকড় শোধন করে নিন।
  • পানি নেমে যাওয়ার পর স্বল্প জীবনকালীন জাত, যেমন ব্রি ধান৩৩, ব্রি ধান৫৬, ব্রি ধান৫৭, ব্রি ধান৬২, ব্রি ধান৭১ ও ব্রি ধান৭৫, সরাসরি ২৫ আগস্ট পর্যন্ত রোপণ করা যায়।
  • আলোক সংবেদনশীল উফশী জাত, যেমন বিআর৫, বিআর২২, বিআর২৩, ব্রি ধান৩৪ ও ব্রি ধান৪৬, ১৫ আগস্টের মধ্যে বীজতলায় চারা করে ১৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত রোপণ করা যায়, আর সরাসরি বপন ৩০ আগস্ট পর্যন্ত; নাইজারশাইল ও গাইঞ্জাসহ স্থানীয় জাত ১৫ সেপ্টেম্বরের মধ্যে রোপণ বা ৩০ আগস্টের মধ্যে সরাসরি বপন করতে হবে।
  • বন্যায় আক্রান্ত হয়নি এমন বাড়ন্ত ধানগাছ থেকে, রোপণের ৩০ থেকে ৪০ দিনের মধ্যে, ২ থেকে ৩টি কুশি রেখে বাকি কুশি সযত্নে শিকড়সহ তুলে সঙ্গে সঙ্গে অন্য জমিতে রোপণ করা যায়।
  • নাবিতে রোপণের সময় প্রতি গোছায় একটু বেশি, ৪ থেকে ৫টি চারা দিন এবং ঘন করে, ২০ x ১৫ সেন্টিমিটার দূরত্বে রোপণ করুন।
  • বন্যার পানিতে আসা পলিতে জমি উর্বর হয়; তাই দেরিতে রোপণ করা ধানে দ্রুত কুশি গজানোর জন্য সুপারিশকৃত ইউরিয়ার দুই-তৃতীয়াংশ এবং টিএসপি, এমওপি ও জিপসাম জমি তৈরির সময় দিন, আর বাকি এক-তৃতীয়াংশ ইউরিয়া রোপণের ২০ থেকে ২৫ দিনের মধ্যে দিন।

একই পরামর্শে সতর্ক করা হয়, আংশিক প্লাবিত বীজতলায় ব্যাকটেরিয়াজনিত পাতা পোড়া রোগ, ফুল আসার সময় বিশেষ করে সুগন্ধি জাতে শীষ ব্লাস্ট, এবং বন্যার পর মাজরা, পাতা মোড়ানো ও পামরি পোকার আক্রমণ দেখা দিতে পারে। এর জন্য সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনার কথা বলা হয়: হাতজাল, পার্চিং, আলোক ফাঁদ, রোপণের আগে চারার পাতার আগা কেটে দেওয়া (কারণ মাজরা পোকা সেখানে ডিম পাড়ে), এবং কেবল অনুমোদিত বালাইনাশক অনুমোদিত মাত্রায়; কোন ওষুধ কত মাত্রায় দেবেন, তা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার কাছ থেকে জেনে নেওয়াই নিরাপদ। আউশ ধান, সবজি ও অন্যান্য দণ্ডায়মান ফসলের জমি থেকে পানি নিষ্কাশন করতে এবং বন্যার পানি নেমে গেলে নতুন সবজি চাষ শুরু করতে বলা হয়।

গ্রামীণ বাংলাদেশে রোপণের জন্য বীজতলা থেকে ধানের চারা তুলছেন কৃষকেরা, ২০২৬ সালের এপ্রিল। ছবি: MdRamjanAliWiki / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY 4.0)
গ্রামীণ বাংলাদেশে রোপণের জন্য বীজতলা থেকে ধানের চারা তুলছেন কৃষকেরা, ২০২৬ সালের এপ্রিল। ছবি: MdRamjanAliWiki / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY 4.0)

লেখার পেছনের প্রতিষ্ঠান


লেখক কর্মরত মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউটে, যা কৃষি মন্ত্রণালয়ের প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণাধীন একটি সরকারি প্রতিষ্ঠান; এর প্রধান নির্বাহী মহাপরিচালক। প্রতিষ্ঠানটির যাত্রা শুরু হয়েছিল পাকিস্তানের মৃত্তিকা জরিপ প্রকল্পের পূর্ব পাকিস্তান শাখা হিসেবে। প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইট অনুযায়ী, এর ২টি উইং, ২টি বিভাগ, ৯টি শাখা, ৮টি বিভাগীয় কার্যালয়, ৩৩টি আঞ্চলিক কার্যালয়, ৮টি বিভাগীয় গবেষণাগার, ১৬টি আঞ্চলিক গবেষণাগার ও ২টি গবেষণা কেন্দ্র রয়েছে। এ ছাড়া কৃষকের মাটির নমুনা সরেজমিনে পরীক্ষা করে ফলাফলের ভিত্তিতে সুষম মাত্রার সার সুপারিশের জন্য আছে ১০টি ভ্রাম্যমাণ মৃত্তিকা পরীক্ষাগার।

প্রতিষ্ঠানটির ঘোষিত কাজের মধ্যে আছে কৃষক ও অন্যান্য উপকারভোগীকে মাটি, পানি, উদ্ভিদ ও সার বিশ্লেষণ সেবা দেওয়া, মাটি পরীক্ষার ফলাফল অনুযায়ী স্থানভিত্তিক সার সুপারিশ, ইন্টারনেটে অনলাইন সার সুপারিশ সেবা, উপজেলা পর্যায়ের সম্প্রসারণ ও গবেষণাকর্মীদের জন্য মাটি ও কৃষি উন্নয়ন সম্ভাবনা বিষয়ে সহজবোধ্য নির্দেশিকা প্রণয়ন, সেচ, নিষ্কাশন ও ভূমি পুনরুদ্ধার প্রকল্প পরিকল্পনায় মৃত্তিকা তথ্য দেওয়া, এবং বিভিন্ন ফসলের সেচ চাহিদা নিরূপণে গবেষণাগারে মাটির আর্দ্রতা নিয়ে গবেষণা। এর লক্ষ্যের মধ্যে আছে মাটি ও ভূমি সম্পদের তালিকা তৈরি, সক্ষমতাভিত্তিক শ্রেণিবিন্যাস এবং সমস্যাক্লিষ্ট মাটির ব্যবস্থাপনা।

লেখার শেষে মাহমুদুল হাসান চৌধুরী উল্লেখ করেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে চরম আবহাওয়ার ঘটনা বাড়ছে, এবং অতিবৃষ্টি, আকস্মিক বন্যা ও দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা বাংলাদেশের কৃষির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। এ পরিস্থিতিতে তাৎক্ষণিক প্রতিকারের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা দরকার, এবং কৃষি, পানি ব্যবস্থাপনা, মৃত্তিকা সংরক্ষণ ও পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির সমন্বিত প্রয়োগ প্রয়োজন। তাঁর মতে, কৃষক, গবেষক, সম্প্রসারণকর্মী ও নীতিনির্ধারকদের সমন্বিত উদ্যোগ, সঙ্গে বিজ্ঞানভিত্তিক পানি ব্যবস্থাপনা, নিয়মিত মাটি পরীক্ষা, জৈব পদার্থ বৃদ্ধি ও সুষম সার প্রয়োগ জলাবদ্ধতার ক্ষতি অনেকাংশে কমাতে পারে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন নিশ্চিত করতে সাহায্য করবে।

ছবি: Ziaul Hoque / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY 2.0)

সূত্র: জাগো নিউজ২৪, দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, বণিক বার্তা, ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশন (আইটিভি), দ্য ডেইলি স্টার, বাংলাপিডিয়া, নর্থ ডাকোটা স্টেট ইউনিভার্সিটি এক্সটেনশন, কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়, ফ্রন্টিয়ার্স ইন প্ল্যান্ট সায়েন্স, যুক্তরাষ্ট্রের পরিবেশ সুরক্ষা সংস্থা (ইপিএ), কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (বিএএমআইএস), জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও), মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউট, উইকিপিডিয়া

অনলাইন ডেস্কদা এগ্রো নিউজ

ফসল

সম্পর্কিত খবর

ফসল

ইংল্যান্ডে যবের ফলন ১৪ বছরে সর্বনিম্ন, গম সামান্য বেশি

যুক্তরাজ্যের কৃষি মন্ত্রণালয় ডেফরার প্রাথমিক হিসাবে ইংল্যান্ডে যব উৎপাদন ১১ শতাংশ কমে ৩৭ লাখ টন হয়েছে, গম ০ দশমিক ৮ শতাংশ বেড়ে ১ কোটি ৮ লাখ টন; গমের তুলনায় পশুখাদ্যের যব বিক্রি হচ্ছে অনেক কম দামে।

Farmers Weekly১৬ অক্টোবর ২০২৬২ মিনিটের পড়া
বিশ্ব

ভালো ফসলের বছরেও আফগানিস্তানে শীতে তীব্র খাদ্যসংকটে পড়বে ১ কোটি ৯২ লাখ মানুষ

অনুকূল বৃষ্টি ও ভালো ফসলের পরও নভেম্বর-এপ্রিলে আফগানিস্তানের ৩৮ শতাংশ মানুষ তীব্র খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় পড়বে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে এফএও ও ডব্লিউএফপি; গত বছর একই সময়ের পূর্বাভাস ছিল ১ কোটি ৭৪ লাখ।

ডব্লিউএফপি১৬ অক্টোবর ২০২৬২ মিনিটের পড়া
ফসল

জমির সিদ্ধান্তের ভার পেয়ে তুলার ফলন সাত গুণ করলেন মহারাষ্ট্রের সুনীতা

একসময় দিনমজুরি করা, পরিবারের ১২ একর জমি নিয়ে কোনো সিদ্ধান্তের অধিকার না থাকা মহারাষ্ট্রের পাচোদ গ্রামের সুনীতা নেহারে এখন খামার চালান; মাটি ও পানি সংরক্ষণে একরপ্রতি তুলার ফলন প্রায় ১ থেকে বাড়িয়েছেন ৭ দশমিক ১৪ কুইন্টালে।

ডাউন টু আর্থ১৬ অক্টোবর ২০২৬২ মিনিটের পড়া

মন্তব্য

(০)