২০২৬ সালের ২০ জানুয়ারি, শীতের সবজির ভরা মৌসুমে, বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যম জাগো নিউজ ২৪-এর লাইফস্টাইল ডেস্ক "সবজির ললি"র একটি রেসিপি প্রকাশ করে। সেদ্ধ আলুর সঙ্গে কুচি করা শীতের সবজি, পাতা, মসলা আর পনির মিশিয়ে ছোট ছোট গোলা বানিয়ে, ডিম ও ব্রেডক্রাম্বে মুড়ে, কাঠিতে গেঁথে ডুবো তেলে ভাজা হয় এই ললি। ডেস্কটি একে পরিচিত শীতের সবজি নতুন রূপে পরিবেশনের উপায় হিসেবে তুলে ধরে, বিশেষ করে সেই শিশুদের জন্য, যারা প্রতিদিন একই রকম সবজির তরকারি খেতে খেতে বিরক্ত হয়ে পড়ে। এই প্রতিবেদনে মূল রেসিপিটি যেভাবে প্রকাশিত হয়েছিল সেভাবেই দেওয়া হলো, সঙ্গে রইল এর সবজিগুলোর পরিচয়, স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ এগুলো সম্পর্কে কী বলে, এবং ঘরে নিরাপদে ভাজার নিয়ম।
শীতের সবজি আর পরিবেশনের নতুন উপায়
রেসিপিটির শুরু একটি চেনা পর্যবেক্ষণ থেকে। লেখকেরা লিখেছিলেন, শীত এলেই বাজার ভরে ওঠে নানা রঙের টাটকা সবজিতে; ফুলকপি, বাঁধাকপি, গাজর, শিম, মটরের এই প্রাচুর্য চোখ ও মন দুটোকেই তৃপ্ত করে। কিন্তু প্রতিদিন একই রকম তরকারি খেতে খেতে অনেক সময় একঘেয়েমি এসে যায়, বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে, আর তখন সবজিকে ভিন্নভাবে উপস্থাপন করাই হতে পারে সবচেয়ে ভালো সমাধান। ডেস্কের পরামর্শ ছিল, শীত থাকতেই পরিচিত সবজিকে নতুন রূপে উপভোগ করুন: ঘরেই বানিয়ে নিন মজাদার, ঝরঝরে আর মুখরোচক সবজির ললি, যাতে শীতের সবজিও খাওয়া হয় আনন্দের সঙ্গে।
যে মৌসুমের কথা রেসিপিতে বলা হয়েছে, তার বিবরণ নথিতেও আছে। বাংলাদেশের জাতীয় জ্ঞানকোষ বাংলাপিডিয়া দেশের প্রধান শীতকালীন সবজির তালিকায় বাঁধাকপি, ফুলকপি, টমেটো, বেগুন, মুলা, শিম ও লাউয়ের নাম রেখেছে। এর ভুক্তিগুলো থেকে বোঝা যায় কেন জানুয়ারিতে বাজার সবচেয়ে ভরা থাকে: ফুলকপি ও বাঁধাকপির চারা মাঠে রোপণ করা হয় অক্টোবর-নভেম্বরে; গাজরের বীজ অক্টোবর থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে সরাসরি জমিতে বোনা হয় এবং প্রায় তিন মাসে মূল তোলার উপযোগী হয়; আর আলু লাগানোর উপযুক্ত সময় নভেম্বরের প্রথম পক্ষ, বেশির ভাগ জাত তোলা হয় ফেব্রুয়ারি-মার্চে।
সেই বছরের জানুয়ারির আবহাওয়াও বাজারকে প্রভাবিত করেছিল। ২০২৬ সালের ১২ জানুয়ারি ডেইলি অবজারভার ঢাকার তিনটি বাজার, কারওয়ান বাজার, আগারগাঁও কাঁচাবাজার ও নাখালপাড়ায় ১১ জানুয়ারি রোববার চালানো এক জরিপের খবর দেয়। ব্যবসায়ীরা পত্রিকাটিকে জানান, দীর্ঘ শৈত্যপ্রবাহে ফসল তোলা পিছিয়ে গেছে এবং রাজধানীতে সরবরাহ কমেছে; তীব্র শীত ও ঘন কুয়াশায় শ্রমিকেরা মাঠে যেতে চাইছেন না; কুয়াশায় টমেটো পাকতেও দেরি হচ্ছে। শিম ও ফুলকপির দাম বেড়েছিল, আর উত্তরাঞ্চল থেকে নতুন আলুর সরবরাহ কমে যাওয়ায় চাহিদা মেটাতে ব্যবসায়ীরা পুরোনো আলু বিক্রি করছিলেন।

উপকরণ
মূল রেসিপিতে নিচের উপকরণগুলো দেওয়া হয়েছিল। পরিমাণগুলো মূল রেসিপির; "পছন্দমতো সবজি"র এক কাপে সেই সপ্তাহে বাজারে যা মেলে তা-ই দেওয়া যায়, যেমন লেখকেরা শুরুতে যে মটর, শিম বা ফুলকপির কথা বলেছিলেন।
- সেদ্ধ করা আলু: ১ কাপ
- পছন্দমতো রঙের ক্যাপসিকাম কুচি: আধা কাপ
- গাজর কুচি: আধা কাপ
- বরবটি কুচি: ৩ টেবিল চামচ
- পুদিনাপাতা কুচি: ২ টেবিল চামচ
- পানি: ২ টেবিল চামচ
- ধনেপাতা কুচি: ২ টেবিল চামচ
- পছন্দমতো সবজি: ১ কাপ
- লবণ: স্বাদমতো
- কাঁচা মরিচ কুচি: ১ টেবিল চামচ বা পছন্দমতো
- চিলি ফ্লেক্স: আধা চা-চামচ বা পছন্দমতো
- কারি পাউডার: ২ চা-চামচ
- পনির কুচি: আধা কাপ
- ডিম: ১টি
- ময়দা: ২ টেবিল চামচ
- ব্রেডক্রাম্ব: ১ কাপ বা পরিমাণমতো
- তেল: ভাজার জন্য
তালিকার সব উপকরণ অবশ্য পুরে যায় না। ডিম, পানি আর ময়দা একসঙ্গে ফেটিয়ে বানানো হয় ওপরের প্রলেপ, ব্রেডক্রাম্ব দিয়ে তৈরি হয় মুচমুচে বাইরের স্তর, আর তেল লাগে শুধু ভাজার কাজে; বাকি সবকিছু একসঙ্গে মেখে তৈরি হয় ললির মূল মিশ্রণ, যেমনটা নিচের প্রণালিতে বলা আছে।

যেভাবে তৈরি করবেন
মূল রেসিপির প্রণালি চার ধাপে: মেশানো, আকার দিয়ে প্রলেপ লাগানো, ঠান্ডা করা এবং ভাজা। ক্রম অনুযায়ী ধাপগুলো এই:
- একটি পাত্রে ব্রেডক্রাম্ব, ময়দা, ডিম ও তেল ছাড়া অন্য সব উপকরণ নিয়ে একসঙ্গে ভালোভাবে মেখে নিন।
- মিশ্রণ থেকে পছন্দমতো আকারের ললিপপ গড়ে নিন।
- আলাদা পাত্রে ডিমের সঙ্গে ২ টেবিল চামচ পানি ও ময়দা দিয়ে ভালোভাবে ফেটিয়ে নিন।
- প্রতিটি ললিপপ ডিমের মিশ্রণে ডুবিয়ে ব্রেডক্রাম্বে গড়িয়ে নিন এবং কাঠিতে লাগান।
- সবগুলো বানানো হয়ে গেলে ঘণ্টাখানেকের জন্য ফ্রিজে রেখে দিন।
- ফ্রিজ থেকে ললিগুলো নামিয়ে অল্প আঁচে ডুবো তেলে ভেজে নিন।
- ভাজা ললিগুলো কিচেন টাওয়েল বা টিস্যুর ওপর তুলে রাখুন।
- পছন্দমতো সস দিয়ে পরিবেশন করুন।
লেখকেরা তৈরি ললিকে মজাদার ও মচমচে বলে বর্ণনা করেছিলেন। প্রতিটি ললির আকার, কোন সবজি দেওয়া হবে, মরিচ কতটা আর কোন সস, এসব রেসিপিতে রাঁধুনির পছন্দের ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে, তাই পরিবারের রুচি অনুযায়ী এটি বদলে নেওয়া যায়। মূল রেসিপিতেই কাঁচা মরিচ ও চিলি ফ্লেক্সের পাশে লেখা ছিল "বা পছন্দমতো", ফলে ছোট শিশুদের জন্য কম ঝাল দিয়েও বানানো সম্ভব।
আলু ও মিশ্রণের অন্য ফসলগুলো
যে আলু পুরো রেসিপিটিকে ধরে রাখে, সেটি দেশের প্রধান শীতকালীন ফসলগুলোর একটি। বাংলাপিডিয়া একে Solanum tuberosum উদ্ভিদের ভোজ্য কন্দ এবং বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান খাদ্য হিসেবে বর্ণনা করেছে। এতে বলা হয়েছে, ধারণা করা হয় সতেরো শতকের শুরুতে পর্তুগিজ নাবিকেরা প্রথম ভারতবর্ষে আলু আনেন, আর এখন শীতকালে বাংলাদেশের সব জেলায় ব্যাপকভাবে আলুর চাষ হয়। পুষ্টির দিক থেকে, ভুক্তিটি বলছে, আলু শর্করায় সমৃদ্ধ এবং আমিষ, ভিটামিন সি, বি ভিটামিন, পটাশিয়াম, ফসফরাস ও লৌহের ভালো উৎস; এর বেশির ভাগ খনিজ ও আমিষ থাকে খোসার ঠিক নিচের পাতলা স্তরে।
রেসিপি প্রকাশের আগের মৌসুমে আলুর জোগান ছিল প্রচুর। ২০২৫ সালের নভেম্বরে বণিক বার্তার প্রতিবেদনে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) তথ্য উদ্ধৃত করে বলা হয়, ২০২৪-২৫ মৌসুমে বাংলাদেশে ৪ লাখ ৯৪ হাজার ৯০০ হেক্টর জমিতে ১ কোটি ১৫ লাখ ৭০ হাজার টন আলু উৎপাদিত হয়েছে, যেখানে দেশে চাহিদা প্রায় ৮০ লাখ টন, সঙ্গে বীজের জন্য রাখা হয় আরও প্রায় ১০ লাখ টন। কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের হিসাবে দেশে ৩৮৪টি হিমাগার ছিল, যেগুলোর মোট ধারণক্ষমতা ৩২ লাখ ৭০ হাজার টন।
ললির দ্বিতীয় প্রধান সবজি গাজর। বাংলাপিডিয়া একে Umbelliferae গোত্রের শীতকালীন সবজি Daucus carota হিসেবে বর্ণনা করেছে, যা ষোলো শতক থেকে ভোজ্য মূলের জন্য চাষ হয়ে আসছে এবং যাতে প্রচুর শর্করা, ক্যারোটিন, ক্যালসিয়াম ও ফসফরাস থাকে। অক্টোবর থেকে ডিসেম্বরে এর বীজ সরাসরি জমিতে বোনা হয়, তিন মাসের মধ্যে মূল তোলার উপযোগী হয়, আর হেক্টরপ্রতি ফলন ৫ থেকে ৭ টন। ভুক্তিটি জানায়, গাজর সালাদে এবং স্যুপ ও তরকারির উপকরণ হিসেবে ব্যবহৃত হয়, অন্য সবজির সঙ্গে মিশিয়ে রসও তৈরি হয়।
লেখকেরা শুরুতে যে "পছন্দমতো সবজি"র কথা বলেছিলেন, সেগুলোও শীতের ফসল। বাংলাপিডিয়া ফুলকপিকে (Brassica oleracea var. botrytis) এমন শীতকালীন ফসল হিসেবে বর্ণনা করেছে, যার পুষ্পমঞ্জরি ঘন, মাংসল মাথা তৈরি করে; দেশে আগাম, মধ্যমৌসুমি ও নাবি এই তিন ধরনের জাত চাষ হয়, আর বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বারি) ১৯৯৮ সালে "রূপা" নামে একটি মধ্যমৌসুমি উচ্চফলনশীল জাত অবমুক্ত করে। বাঁধাকপির ২৫ থেকে ৩০ দিন বয়সী চারা রোপণ করা হয় অক্টোবর-নভেম্বরে; বারি এর দুটি জাত অবমুক্ত করেছে, স্থানীয়ভাবে যেগুলো "প্রভাতী" ও "অগ্রদূত" নামে পরিচিত, এবং বাঁধাকপির জোগান মূলত আসে শহরের আশপাশের এলাকা থেকে।
মসলার উপকরণও আসে একই মৌসুমের ফসল থেকে। বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী মরিচ গ্রীষ্ম ও শীত দুই মৌসুমেই চাষ করা যায়; শীতকালীন ফসল হিসেবে এটি বেশি চাষ হয় কুমিল্লা, নোয়াখালী, ফরিদপুর, বরিশাল, পটুয়াখালী ও বগুড়ায়, আর শুকনা মরিচ কারি পাউডারের একটি উপকরণ। ধনে তীব্র গন্ধযুক্ত একবর্ষজীবী লতাগুল্ম, এর আদি নিবাস ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চল, তবে বাংলাদেশে শীতকালীন ফসল হিসেবে ব্যাপকভাবে চাষ হয়: অক্টোবর-নভেম্বরে বোনা হয়, ৯০ থেকে ১০৫ দিনে পরিপক্ব হয়; এর শুকনা বীজ কারি পাউডারের গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ, আর কচি গাছ ব্যবহৃত হয় চাটনি, সস, তরকারি ও স্যুপে।
রেসিপির পনির সম্পর্কে বাংলাপিডিয়া জানায়, রান্নার পনির, কটেজ চিজ ও ক্রিম চিজ হলো অ্যাসিড চিজ, যা গরম দুধে অম্ল মিশিয়ে ছানা কেটে তৈরি হয়; রেনেট দিয়ে তৈরি পরিপক্ব চিজের মতো এগুলোর জন্য দীর্ঘ সময় লাগে না, মাত্র কয়েক ঘণ্টায় তৈরি হয়ে যায়। গঠন অনুযায়ী চিজে সাধারণত ২০ থেকে ৩০ শতাংশ চর্বি, ১৫ থেকে ২০ শতাংশ আমিষ এবং ৪ থেকে ১২ শতাংশ লবণ থাকে। ভুক্তিটি আরও জানায়, বাংলাদেশে চিজ দ্রুত জনপ্রিয় হচ্ছে, ঠাকুরগাঁও, রংপুর, কিশোরগঞ্জ, সিরাজগঞ্জ ও মুন্সীগঞ্জের মতো এলাকায় ছোট-বড় অনেক চিজ কারখানা গড়ে উঠেছে।

সবজিগুলো পাতে কী যোগ করে
মূল রেসিপিতে স্বাদ ও পুষ্টির সমন্বয়ের কথা বলা হয়েছিল। প্রধান উপকরণগুলোতে কী আছে, তা স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের তথ্যে জানা যায়। যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল লাইব্রেরি অব মেডিসিনের স্বাস্থ্যতথ্য সেবা মেডলাইনপ্লাস বলছে, ভিটামিন এ সুস্থ দাঁত, হাড়, নরম কলা, শ্লেষ্মাঝিল্লি ও ত্বক গঠনে এবং বজায় রাখতে সাহায্য করে, আর দৃষ্টিশক্তিতে, বিশেষ করে কম আলোয় দেখায়, ভূমিকা রাখে। উদ্ভিজ্জ খাবারে এটি থাকে বিটা-ক্যারোটিন হিসেবে, যা পাওয়া যায় গাজর, মিষ্টি আলু ও আমের মতো কমলা ও হলুদ রঙের ফল-সবজিতে; রং যত গাঢ়, ক্যারোটিনয়েড সাধারণত তত বেশি। রেসিপির পনির ও ডিমে থাকে সরাসরি ব্যবহারযোগ্য ভিটামিন এ। দৈনিক প্রস্তাবিত পরিমাণ ১ থেকে ৩ বছরের শিশুর জন্য ৩০০ মাইক্রোগ্রাম, ৪ থেকে ৮ বছরের জন্য ৪০০ এবং ৯ থেকে ১৩ বছরের জন্য ৬০০ মাইক্রোগ্রাম।
মেডলাইনপ্লাস ব্যাখ্যা করে, ভিটামিন সি দেহের বৃদ্ধি ও কলা মেরামতে দরকার; দেহ এটি দিয়ে কোলাজেন তৈরি করে, ক্ষত সারায় এবং লৌহ শোষণ করে। দেহ এই ভিটামিন নিজে তৈরি বা জমিয়ে রাখতে পারে না, তাই প্রতিদিন খাবার থেকেই এটি পেতে হয়। সবুজ ও লাল ক্যাপসিকাম বা মরিচ, ফুলকপি ও বাঁধাকপি ভিটামিন সি সবচেয়ে বেশি থাকা সবজিগুলোর মধ্যে পড়ে, আলু ও টমেটোতেও এটি থাকে। সংস্থাটি আরও জানায়, রান্না, দীর্ঘ সময় সংরক্ষণ ও ভাপে রান্নায় খাবারের ভিটামিন সি কমে যেতে পারে, আর কাঁচা ফল-সবজিই এর সেরা উৎস। দৈনিক প্রস্তাবিত পরিমাণ ১ থেকে ৩ বছরের শিশুর জন্য ১৫ মিলিগ্রাম, ৪ থেকে ৮ বছরের জন্য ২৫ এবং ৯ থেকে ১৩ বছরের জন্য ৪৫ মিলিগ্রাম।
পনির যোগ করে ক্যালসিয়াম, যা দেহের সবচেয়ে বেশি পরিমাণে থাকা খনিজ এবং হাড় ও দাঁত গঠন ও রক্ষণাবেক্ষণ করে। মেডলাইনপ্লাসের তথ্যে, বেশির ভাগ চিজের প্রায় ৪৫ গ্রামে মোটামুটি ৩০০ মিলিগ্রাম ক্যালসিয়াম থাকে, আর ভিটামিন ডি দেহকে ক্যালসিয়াম কাজে লাগাতে সাহায্য করে। ১ থেকে ৩ বছরের শিশুর দিনে দরকার ৭০০ মিলিগ্রাম, ৪ থেকে ৮ বছরের ১ হাজার এবং ৯ থেকে ১৮ বছরের ১ হাজার ৩০০ মিলিগ্রাম।
বাংলাদেশে এই পুষ্টি উপাদানগুলোর গুরুত্ব আলাদা। পুষ্টিতে উদ্যানফসলের ভূমিকা নিয়ে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) একটি প্রচারপত্র বলছে, খাদ্যে বৈচিত্র্য কম থাকায় দেশের জনসংখ্যার বড় অংশ প্রয়োজনীয় অণুপুষ্টি পায় না; ২০১০ সালের খানা আয়-ব্যয় জরিপে খাদ্যশক্তির ৭০ শতাংশ আসত দানাশস্য থেকে, যেখানে প্রস্তাবিত মাত্রা ৬০ শতাংশ; আর ২০১০ সালে মাথাপিছু গড়ে দিনে ফল ও সবজি খাওয়া হতো ২১১ গ্রাম, অথচ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) ও এফএওর সুপারিশ ৪০০ গ্রাম। প্রচারপত্রটির ভাষায়, অণুপুষ্টির অপুষ্টি বাংলাদেশের অর্ধেকের বেশি শিশু এবং প্রজননক্ষম বয়সের নারীকে প্রভাবিত করে। এতে প্রো-ভিটামিন এ সমৃদ্ধ খাবারের মধ্যে গাজরের নাম আছে, এবং একটি উদাহরণ দেওয়া হয়েছে: সিকি কাপ মিষ্টিকুমড়া, সিকি কাপ গাজর আর আধা কাপ ফজলি আম একসঙ্গে পাঁচ বছরের কম বয়সী একটি শিশুর দিনের পুরো প্রস্তাবিত ভিটামিন এ জোগায়। কোনো শিশুর বা নিজের অসুস্থতা থাকলে খাদ্যতালিকা ঠিক করার আগে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
ভাজা খাবার, লবণ ও সুষম খাবার
সবজির ললি ভাজা নাশতা, তাই ভাজা খাবার নিয়ে স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের পরামর্শ এখানেও প্রযোজ্য। ডব্লিউএইচওর স্বাস্থ্যকর খাদ্যবিষয়ক তথ্যপত্র, সে সময় যে সংস্করণ চালু ছিল, তাতে দিনে অন্তত ৪০০ গ্রাম বা পাঁচ ভাগ ফল ও সবজি খাওয়ার পরামর্শ ছিল, তবে আলু, মিষ্টি আলু, কাসাভা ও অন্যান্য শ্বেতসারযুক্ত কন্দ এর বাইরে। অর্থাৎ ললির আলু এই হিসাবে ধরা হবে না, কিন্তু গাজর, ক্যাপসিকাম, বরবটি ও অন্য সবজিগুলো ধরা হবে। ফল-সবজি খাওয়া বাড়াতে ডব্লিউএইচও প্রতিবেলার খাবারে সবজি রাখা, মৌসুমি টাটকা সবজি খাওয়া এবং নানা রকম সবজি খাওয়ার কথা বলেছিল।
চর্বি নিয়ে একই তথ্যপত্রের পরামর্শ ছিল: মোট চর্বি খাদ্যশক্তির ৩০ শতাংশের নিচে, সম্পৃক্ত চর্বি ১০ শতাংশের নিচে এবং ট্রান্স ফ্যাট ১ শতাংশের নিচে রাখা; আর সম্পৃক্ত চর্বির বদলে সয়াবিন, সূর্যমুখী ও ক্যানোলার মতো অসম্পৃক্ত চর্বির তেল বেছে নেওয়া। সম্পৃক্ত চর্বির উৎস হিসেবে তথ্যপত্রে মাখন, ঘি, পাম তেল ও চিজের নাম ছিল। চর্বি কমাতে ভাজার বদলে ভাপে বা সেদ্ধ করে রান্না করা এবং বেক করা ও ভাজা খাবার সীমিত রাখার পরামর্শও দেওয়া হয়েছিল। প্রাপ্তবয়স্কদের দিনে ৫ গ্রামের কম, মোটামুটি এক চা-চামচ, আয়োডিনযুক্ত লবণ খাওয়ার কথা বলা হয়েছিল, এবং লবণ জোগানো প্রক্রিয়াজাত খাবারের মধ্যে চিজের নামও ছিল; রেসিপিতে পনির ও লবণ দুটোই আছে বলে লবণ হালকা রাখা যায়।
যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসন (এফডিএ) ২০২৪ সালের মার্চ পর্যন্ত হালনাগাদ নির্দেশনায় ব্যাখ্যা করেছে, অ্যাক্রিলামাইড এমন একটি রাসায়নিক যা ভাজা, রোস্ট বা বেক করার মতো উচ্চ তাপের রান্নায় কিছু খাবারে তৈরি হতে পারে। এটি তৈরি হয় শর্করা ও অ্যাসপারাজিন নামের একটি অ্যামাইনো অ্যাসিড থেকে, মূলত পাওয়া যায় আলু ও শস্যজাত খাবার এবং কফির মতো উদ্ভিজ্জ খাবারে, আর সেদ্ধ বা ভাপে রান্নায় সাধারণত তৈরি হয় না; বেশি তাপে বেশি সময় রান্না করলে এর পরিমাণ বাড়ে। এফডিএ ভাজা, রোস্ট বা বেক করা খাবার খাওয়া বন্ধ করতে বলে না, বরং সামগ্রিকভাবে স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের পরামর্শ দেয়। পরিবারের জন্য এর অর্থ, এই ললির মতো ভাজা নাশতাকে মাঝেমধ্যের বদল হিসেবে রাখা, সবজি খাওয়ানোর প্রধান উপায় হিসেবে নয়।
শিশুকে সবজি খেতে অভ্যস্ত করা
রেসিপির মূল ভাবনা, নতুনভাবে পরিবেশন করলে শিশু সবজি খেতে পারে, তা যুক্তরাজ্যের জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা (এনএইচএস) খাবারে বাছবিচার করা শিশুদের নিয়ে যে পরামর্শ দেয়, তার কাছাকাছি। ২০২৩ সালের নভেম্বরে সর্বশেষ পর্যালোচিত এই নির্দেশনা বলছে, কোনো কোনো খাবার মেনে নিতে শিশুর অনেকবার চেষ্টা লাগতে পারে, তাই নানা রকম খাবার দিতে থাকা এবং আগে ফিরিয়ে দেওয়া খাবার আবার দেওয়া উচিত, কারণ সময়ের সঙ্গে রুচি বদলায়। শিশুরা বড়দের দেখে নতুন খাবার পছন্দ করতে শেখে, তাই যত বেশি সম্ভব একসঙ্গে খাওয়া ভালো। অল্প পরিমাণে খাবার দেওয়া এবং সামান্য খেলেও প্রশংসা করার পরামর্শ আছে; শিশু কোনো খাবার না খেতে চাইলে জোর করা যাবে না, শান্তভাবে সরিয়ে নিয়ে অন্য সময় আবার দিতে হবে।
এনএইচএস আরও বলছে, খাবার পরিবেশনের ধরন বদলালে তা আকর্ষণীয় হয়ে উঠতে পারে; উদাহরণ হিসেবে বলা হয়েছে, যে শিশু রান্না করা গাজর খায় না, সে হয়তো কাঁচা কোরানো গাজর খাবে। ব্রেডক্রাম্বে মোড়ানো সবজির ললি এমনই একটি বদল; অন্য দিনগুলোতে একই সবজি কাঁচা, ভাপে বা তরকারিতে দিলে নির্দেশনায় বলা বৈচিত্র্যও বজায় থাকে।
এফএওর প্রচারপত্রেও বাংলাদেশের জন্য কাছাকাছি একটি কথা আছে। পুষ্টিশিক্ষার অংশ হিসেবে এতে রান্নার প্রদর্শনীর সুপারিশ করা হয়েছে, যেখানে অংশগ্রহণকারীরা পুষ্টি কম নষ্ট হয় এমন রান্নার পদ্ধতি ও খাবারের ভালো সমন্বয় শেখেন। প্রচারপত্রটি আরও বলছে, সারা বছর নানা রকম ফল ও সবজি পাওয়ার দিক থেকে বাংলাদেশ সৌভাগ্যবান, আর এসব ফল-সবজির বাগান মূলত বাড়ির কাছেই, বেশির ভাগই নারীরা দেখাশোনা করেন।
ঘরে নিরাপদে প্রস্তুত ও ভাজার নিয়ম
রেসিপিতে কাঁচা ডিমের প্রলেপ, ফ্রিজে রাখা আর গরম তেল তিনটিই আছে, তাই খাদ্য নিরাপত্তা ও রান্নাঘরের নিরাপত্তার মৌলিক নিয়মগুলো মানা জরুরি। ২০০৬ সালে প্রকাশিত ডব্লিউএইচওর "নিরাপদ খাদ্যের পাঁচ চাবিকাঠি" খাদ্য পরিচ্ছন্নতাকে পাঁচটি নিয়মে বেঁধেছে: পরিচ্ছন্ন থাকুন; কাঁচা ও রান্না করা খাবার আলাদা রাখুন; ভালোভাবে রান্না করুন; খাবার নিরাপদ তাপমাত্রায় রাখুন; এবং নিরাপদ পানি ও কাঁচামাল ব্যবহার করুন। কাজের ক্ষেত্রে এর মানে, কাঁচা ডিম ধরার পর হাত, কাটার বোর্ড ও পাত্র ধুয়ে নেওয়া, কুচি করার আগে সবজি নিরাপদ পানিতে ধোয়া, গড়া ললিগুলো ভাজার আগ পর্যন্ত ফ্রিজে রাখা এবং ভেতর পর্যন্ত ভালোভাবে ভাজা।
ডুবো তেলে ভাজা ঘরের রান্নাঘরের ঝুঁকিপূর্ণ কাজগুলোরও একটি। যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ফায়ার প্রোটেকশন অ্যাসোসিয়েশনের (এনএফপিএ) ২০১৬ সালের রান্নার নিরাপত্তাবিষয়ক তথ্যপত্র বলছে, রান্নাঘরে আগুনের প্রধান কারণ চুলায় রান্না রেখে সরে যাওয়া; তাই ভাজার সময় রান্নাঘরেই থাকতে হবে, আর অল্প সময়ের জন্য বাইরে গেলেও চুলা বন্ধ করতে হবে। চুলার কাছ থেকে আগুন ধরতে পারে এমন জিনিস, যেমন ওভেন মিট বা হাতমোজা, কাঠের খুন্তি, খাবারের মোড়ক ও তোয়ালে, সরিয়ে রাখার পরামর্শ আছে, এবং চুলার চারপাশে ও যেখানে গরম খাবার বা পানীয় তৈরি বা বহন করা হয় সেখানে অন্তত তিন ফুট জায়গা শিশুমুক্ত রাখার কথা বলা হয়েছে। শিশুদের কথা ভেবে বানানো নাশতার ক্ষেত্রে এটি গুরুত্বপূর্ণ: মাখা ও গড়ার কাজে শিশুরা সাহায্য করতে পারে, কিন্তু ভাজার কাজটি বড়দের।
কড়াইয়ের অল্প তেলে আগুন ধরে গেলে এনএফপিএর তথ্যপত্রের পরামর্শ হলো, কড়াইয়ের ওপর ঢাকনা টেনে দিয়ে আগুন নিভিয়ে চুলা বন্ধ করা এবং পুরোপুরি ঠান্ডা না হওয়া পর্যন্ত ঢাকনা সরানো যাবে না। আগুন নেভাতে পারবেন কি না, এ নিয়ে সামান্য সন্দেহ থাকলেও বেরিয়ে আসতে হবে, আগুন আটকে রাখতে পেছনের দরজা বন্ধ করে দিতে হবে এবং বাড়ির বাইরে থেকে জরুরি নম্বরে ফোন করতে হবে।
ছবি: Biswarup Ganguly / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY 3.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, বাংলাপিডিয়া, বণিক বার্তা (ফ্রেশপ্লাজার মাধ্যমে), ডেইলি অবজারভার (ফ্রেশপ্লাজার মাধ্যমে), জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও), বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও), মেডলাইনপ্লাস (যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল লাইব্রেরি অব মেডিসিন), যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসন (এফডিএ), যুক্তরাজ্যের জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা (এনএইচএস), ন্যাশনাল ফায়ার প্রোটেকশন অ্যাসোসিয়েশন (এনএফপিএ)





মন্তব্য
(০)