সরাসরিবাজারদর
আটা (প্যাকেটজাত)৫৮—আদা - আমদানিকৃত১৬৭—আদা - দেশী১৫৪—আমন চাল - মাঝারি৫৬—আমন চাল - মোটা৪৮—আমন চাল - সরু৭২—আয়োডিনযুক্ত লবণ (প্যাকেটজাত)৩২—কাঁচা মরিচ২১৮—খামারের মুরগী১৬২—খাসী৯০০—চিনি (দেশী)১৩২—ছোলা - গোটা৮৫—ডিম ফার্ম - লাল৪৭—পেঁয়াজ - দেশী৬০—বোরো চাল - মাঝারি৫৫—বোরো চাল - মোটা৪৭—বোরো চাল - সরু৬৬—মাংসঃ– গরু৭২৯—মুগ ডাল১২২—রসুন - আমদানিকৃত১৯২—রসুন - দেশী১৭৩—সয়াবিন তেল১৬৩—
হালনাগাদ ১৬ অক্টোবর ২০২৬
ঢাকা২৮°পরিষ্কার আকাশআর্দ্রতা ৬২%বাতাস ৫ কিমি/ঘ

নারায়ণগঞ্জে কোরবানির জন্য প্রস্তুত 'ট্রাম্প' ও 'নেতানিয়াহু' নামের দুই মহিষ

২০২৬ সালের মে মাসে ঈদুল আজহার আগে নারায়ণগঞ্জের বন্দরে এসএস ক্যাটল এগ্রো ফার্মের দুটি এলবিনো মহিষ দেখতে ভিড় জমে, রাখালেরা যাদের ডাকনাম রেখেছিলেন 'ডোনাল্ড ট্রাম্প' ও 'নেতানিয়াহু'। জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা জানান, জেলায় চাহিদার চেয়ে বেশি কোরবানির পশু রয়েছে।

নারায়ণগঞ্জে কোরবানির জন্য প্রস্তুত 'ট্রাম্প' ও 'নেতানিয়াহু' নামের দুই মহিষ
লাইভস্টক

২০২৬ সালের মে মাসে ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে নারায়ণগঞ্জের বন্দর উপজেলার একটি খামারে দর্শনার্থীদের ভিড় জমেছিল দুটি হালকা রঙের মহিষ দেখতে। খামারের রাখালেরা মহিষ দুটির ডাকনাম রেখেছিলেন 'ডোনাল্ড ট্রাম্প' ও 'নেতানিয়াহু'। জাগো নিউজ ২০২৬ সালের ১৪ মে জানায়, খামার কর্তৃপক্ষের ভাষায় এলবিনো জাতের এই মহিষ দুটি বন্দরের এসএস ক্যাটল এগ্রো ফার্মে একসঙ্গে বেড়ে উঠেছে এবং কোরবানির মৌসুমের জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, ঈদুল আজহা উপলক্ষে নারায়ণগঞ্জে এর আগেই 'ডোনাল্ড ট্রাম্প' নামের একটি মহিষ সাড়া ফেলেছিল এবং দূর-দূরান্ত থেকে লোকজন সেটি দেখতে আসছিলেন। এবার এসএস ক্যাটল এগ্রো ফার্মে একই সঙ্গে দুটি এমন মহিষের দেখা মেলে, আর তাদের ঘিরে মানুষের কৌতূহলও বাড়ে। বিদেশি জাতের মহিষ ছাড়াও খামারটিতে দেশি ও বিদেশি জাতের কয়েকশ গরু ও ভেড়া রয়েছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, একটি মহিষের মাথার চুলের সঙ্গে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের চুলের মিল দেখে খামারের রাখালেরা এর নাম রাখেন 'ডোনাল্ড ট্রাম্প'। আরেকটি মহিষ অতিরিক্ত রাগী এবং তেড়ে আসার স্বভাবের হওয়ায় তার নাম রাখা হয় ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রীর নামে। নাম দুটি খামারের দুটি পশুর জন্য রাখালদের দেওয়া ডাকনাম মাত্র; প্রতিবেদনে মহিষ দুটির সঙ্গে ওই দুই ব্যক্তির আর কোনো সম্পর্কের কথা ছিল না।

নাম দিয়েছেন রাখালেরা, মালিক নন


এসএস ক্যাটল এগ্রো ফার্মের রাখাল রাসেল জাগো নিউজকে নামগুলোর ব্যাখ্যা দেন। তিনি বলেন, "মাথার চুলের কারণে একটি মহিষের নাম দেওয়া হয়েছে 'ডোনাল্ড ট্রাম্প'। আরেকটি মহিষ আছে যেটা শুধু শুধু রাগ দেখায়। নিজে ইচ্ছা করে অন্য মহিষের সঙ্গে লড়াইয়ে লেগে যায়। লড়াই শেষে আবার পরাজিত হয়। যে কারণে তার নাম রাখা হয়েছে 'নেতানিয়াহু'।"

রাসেল জানান, মহিষ দুটির খাবারের দিকেও বিশেষ নজর দেওয়া হয়। তারা ঘাস, ভুট্টা ও ভুসি খেতে পছন্দ করে। তাদের নাম ছড়িয়ে পড়ার পর থেকে অনেকেই খামারে এসে মহিষ দুটি দেখে যাচ্ছেন বলে জানান তিনি।

দর্শনার্থী সাদিয়া রহমান নিহা প্রতিবেদককে বলেন, এতদিন ধরে তিনি 'ডোনাল্ড ট্রাম্প' ও 'নেতানিয়াহু' নাম দুটি শুনে আসছিলেন, এবার খামারে এসে মহিষ দুটি দেখতে পেলেন। তাদের দেখে তিনি বেশ অবাক হয়েছেন এবং মহিষগুলো দেখতে অনেক সুন্দর বলে মন্তব্য করেন।

খামারের স্বত্বাধিকারী মেহেনুমা মেহজাবিন বলেন, তাঁরা অনেক দিন ধরে খামার পরিচালনা করছেন এবং সেখানে নানা ধরনের পশু রয়েছে; তারই অংশ হিসেবে এলবিনো জাতের মহিষ লালন-পালন করা হচ্ছে। নামকরণের প্রশ্নে তিনি বলেন, 'নামগুলো রাখালরা দিয়ে থাকে। আমরা এসব নাম দেই না। এই মহিষগুলো একটু অন্যরকম। তাই খামারের রাখালরা তাদের আগ্রহ থেকে এসব নাম দিয়ে থাকে।'

পাইকপাড়ায় আগের 'ডোনাল্ড ট্রাম্প'


সেই মৌসুমে নারায়ণগঞ্জে এই ডাকনামের মহিষ বন্দরের জোড়াটিই প্রথম নয়। দুই দিন আগে, ২০২৬ সালের ১২ মে, জাগো নিউজ নারায়ণগঞ্জ শহরের পাইকপাড়া এলাকার রাবেয়া অ্যাগ্রো ফার্মের গোলাপি রঙের একটি এলবিনো মহিষের খবর দেয়, যার নামও রাখা হয়েছিল 'ডোনাল্ড ট্রাম্প'। সেই প্রতিবেদনে বলা হয়, বিশালাকৃতির মহিষটির ওজন প্রায় ৭০০ কেজি, বয়স সাড়ে তিন বছর। মাথার সামনের অংশে তুলনামূলক বড় চুল থাকায় অনেকে এর সঙ্গে মার্কিন প্রেসিডেন্টের চেহারার মিল খুঁজে পাচ্ছিলেন।

রাবেয়া অ্যাগ্রো ফার্মের কর্মচারীরা পত্রিকাটিকে জানান, আগের বছরের কোরবানির ঈদের প্রায় এক মাস পর রাজশাহী সিটি পশুর হাট থেকে মহিষটি কেনা হয় এবং এরপর থেকে বিশেষ পরিচর্যায় খামারে লালন-পালন করা হচ্ছিল। খামার কর্তৃপক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, লাইভ ওয়েট হিসেবে প্রতি কেজি ৫৫০ টাকা দরে ঢাকার এক ক্রেতার কাছে মহিষটি আগেই বিক্রি হয়ে গিয়েছিল এবং ঈদুল আজহার আগে সেটি বুঝিয়ে দেওয়ার কথা ছিল। মহিষটির খাবারের তালিকায় ছিল ১২ ধরনের খাদ্যমিশ্রিত ঘাস, ভুট্টা ও ভুসি।

রাবেয়া অ্যাগ্রো ফার্মের স্বত্বাধিকারী জিয়াউদ্দিন মৃধা জাগো নিউজকে বলেন, এটি এলবিনো জাতের মহিষ, ওজন ৭০০ কেজির বেশি। মাথার সামনের দিকে চুল থাকায় তাঁর ছোট ভাইয়ের মনে হয়েছিল মহিষটি দেখতে ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতো, সেখান থেকেই নামটি আসে। খামারের কর্মচারী মো. পারভেজ জানান, নামটি ছড়িয়ে পড়ার পর থেকেই মানুষ ভিড় করছিলেন; কেউ কেউ কিনতে আগ্রহ দেখালেও মহিষটি আগেই বিক্রি হয়ে গিয়েছিল।

১৪ মের প্রতিবেদনেও আগের এই খবরের সূত্র দেওয়া হয়েছিল। ফলে সেই সপ্তাহে নারায়ণগঞ্জের পাঠকেরা দুটি আলাদা খামারের কথা জানতে পারেন, একটি পাইকপাড়ায় এবং অন্যটি বন্দরে, যেখানে আলোচিত ডাকনামের হালকা রঙের মহিষ ঈদের হাটের অপেক্ষায় ছিল।

নারায়ণগঞ্জের প্রস্তুতি: উদ্বৃত্ত পশু ও ২৫টি ভেটেরিনারি টিম


দুটি প্রতিবেদনেই জেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরের একই বার্তা ছিল। নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. আব্দুল মান্নান মিয়া জাগো নিউজকে জানান, সে বছর জেলায় কোরবানির পশুর চাহিদার তুলনায় উদ্বৃত্ত পশু রয়েছে।

তিনি বলেন, কোরবানির পশুর স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে জেলায় ২৫টি ভেটেরিনারি মেডিকেল টিম কাজ করবে। এসব টিম অসুস্থ পশু শনাক্ত করবে এবং দ্রুত চিকিৎসাসেবা দেবে। ১২ মের প্রতিবেদনে তিনি আরও জানান, স্বাস্থ্যসম্মতভাবে পশু জবাই নিশ্চিত করতে ১৯০ জন পেশাদার ও ৩১৫ জন মৌসুমি কসাইকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে।

কোনো প্রতিবেদনেই জেলা কর্মকর্তা উদ্বৃত্তের পেছনের সংখ্যাগুলো জানাননি; সে কারণে এখানে জেলার মোট পশুর কোনো হিসাব দেওয়া হলো না।

কিছু মহিষ কেন সাদা বা গোলাপি


বাংলাদেশের জাতীয় জ্ঞানকোষ বাংলাপিডিয়ার বর্ণনায়, এ অঞ্চলের গৃহপালিত মহিষ লম্বা মাথার বিশাল আকারের প্রাণী, যার শরীর অনুজ্জ্বল কালো এবং গায়ে খুব কম, ছোট লোম থাকে। এর পাশে ফ্যাকাশে বা গোলাপি চামড়ার একটি মহিষ সহজেই চোখে পড়ে, নারায়ণগঞ্জের দুই খামারের ভিড়ই তার প্রমাণ।

নারায়ণগঞ্জের খামারগুলো তাদের পশুকে এলবিনো মহিষ বলেছে। এলবিনিজম বা রঞ্জকহীনতা আসলে রঞ্জক পদার্থের অভাবকে বোঝায়, এটি কোনো জাত নয়; আর ফ্যাকাশে রঙের কারণ এক পশু থেকে আরেক পশুতে ভিন্ন হতে পারে। একটি কারণ নিয়ে বিস্তারিত গবেষণা হয়েছে। ২০২০ সালের নভেম্বরে 'মলিকুলার বায়োলজি অ্যান্ড ইভোলিউশন' সাময়িকীতে প্রকাশিত এক গবেষণাপত্রে লিয়াং ও তাঁর সহকর্মীরা জানান, সোয়াম্প বা জলাভূমির মহিষের সাদা রঙের কারণ এএসআইপি (অ্যাগুটি সিগন্যালিং প্রোটিন) জিনের ভেতরে ২ হাজার ৮০৯ বেস-পেয়ার দীর্ঘ একটি লাইন-১ অনুপ্রবেশ, অর্থাৎ ডিএনএর একটি স্থানান্তরযোগ্য অংশ।

গবেষকেরা দেখেন, এই অনুপ্রবেশ একটি শক্তিশালী প্রোমোটারের মতো কাজ করে এবং সাদা মহিষের চামড়ায় এএসআইপি জিনের কার্যকারিতা প্রায় ১০ গুণ বাড়িয়ে দেয়। বাড়তি এএসআইপি রঞ্জক কোষ বা মেলানোসাইটকে পরিণত হতে দেয় না, ফলে এসব মহিষের চামড়া ও লোমে কোনো রঞ্জক থাকে না। তাঁদের বিশ্লেষণে দেখা যায়, সাদা মহিষের জিনের এই রূপটি সোয়াম্প মহিষে সাম্প্রতিক একটি জিনগত স্থানান্তরের ফলে তৈরি হয়েছে। তাঁরা আরও উল্লেখ করেন, গরুর এএসআইপি জিনেও একই ধরনের লাইন-১ অনুপ্রবেশ পাওয়া গেছে।

কোথাও কোথাও সাদা ও ছোপওয়ালা মহিষের কদর বেশি। ইন্দোনেশিয়ার সুলাওয়েসির তোরাজা জনগোষ্ঠী 'তেদং বোঙ্গা' নামে সাদা-কালো ছোপের মহিষ পছন্দ করে। তবে নারায়ণগঞ্জের মহিষগুলোর মধ্যে একই জিনগত পরিবর্তন আছে কি না, তা পরীক্ষা করা হয়নি বা কোনো প্রতিবেদনে আসেনি; প্রতিবেদনগুলোতে কেবল তাদের চেহারার বর্ণনা ছিল।

থাইল্যান্ডের চিয়াং মাইয়ে কালো একটি মহিষের পাশে (বাঁয়ে) হালকা চামড়ার এলবিনো মহিষ। ছবি: স্টিভ জুরভেটসন / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY 2.0)
থাইল্যান্ডের চিয়াং মাইয়ে কালো একটি মহিষের পাশে (বাঁয়ে) হালকা চামড়ার এলবিনো মহিষ। ছবি: স্টিভ জুরভেটসন / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY 2.0)

বাংলাদেশে মহিষ


গৃহপালিত মহিষের (বুবালুস বুবালিস) দুটি স্বীকৃত ধরন আছে। রিভার বা নদীর মহিষ ভারতীয় উপমহাদেশ ও তার পশ্চিমের দেশগুলোর, আর সোয়াম্প বা জলাভূমির মহিষের বিস্তার আসাম থেকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া হয়ে চীনের ইয়াংসি উপত্যকা পর্যন্ত। নদীর মহিষের ক্রোমোজোম ৫০টি, জলাভূমির মহিষের ৪৮টি। প্রাপ্তবয়স্ক মহিষের ওজন সাধারণত ৩০০ থেকে ৫৫০ কেজি হয়, তবে ১ হাজার কেজির বেশি ওজনের মহিষও দেখা গেছে। বেশির ভাগ বিবরণে মহিষের গর্ভকাল ৩০০ থেকে ৩২০ দিন বলা হয়েছে; বাংলাপিডিয়া একে ১০ মাস বলে উল্লেখ করেছে।

বাংলাপিডিয়া জানায়, বাংলাদেশে মহিষের নিজস্ব কোনো গুরুত্বপূর্ণ জাত নেই। দীর্ঘদিন ধরে মহিষ মূলত হালচাষ ও গাড়ি টানার কাজে ব্যবহৃত হয়ে আসছে, বিশেষ করে চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, রাজশাহী, রংপুর, দিনাজপুর ও বগুড়ায়। জ্ঞানকোষটির মতে, দেশে মহিষ পালনের প্রধান বাধা সবুজ ঘাসের অভাব; একটি মহিষের দিনে অন্তত ৩০ কেজি ঘাস দরকার হয়।

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের (ডিএলএস) 'লাইভস্টক ইকোনমি অ্যাট আ গ্লান্স ২০২৪-২৫' অনুযায়ী, যার উৎস বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশে মহিষ ছিল ১৫ দশমিক ৩২ লাখ। ২০২৩-২৪ সালে এই সংখ্যা ছিল ১৫ দশমিক ২৪ লাখ এবং ২০১৫-১৬ সালে ১৪ দশমিক ৭১ লাখ। দেশের মোট পশুসম্পদে মহিষের অংশ ছোট: একই সারণিতে ২০২৪-২৫ সালে গরু ২৫১ দশমিক ৭১ লাখ, ছাগল ২৭২ দশমিক ৯১ লাখ এবং ভেড়া ৩৯ দশমিক ৮১ লাখ দেখানো হয়েছে।

ডিএলএসের ওই সারণিতে ২০২৪-২৫ সালের (সাময়িক) হিসাবে মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) প্রাণিসম্পদের অংশ ১ দশমিক ৮১ শতাংশ এবং কৃষি জিডিপিতে ১৬ দশমিক ৫৪ শতাংশ বলা হয়েছে। প্রাণিসম্পদে প্রত্যক্ষ কর্মসংস্থান ২০ শতাংশ এবং আংশিক কর্মসংস্থান ৫০ শতাংশ ধরা হয়েছে। জনপ্রতি দিনে ১২০ গ্রাম ধরে সে বছর মাংসের চাহিদা নির্ধারণ করা হয় ৭৭ দশমিক ৯২ লাখ টন, আর মাংসের প্রাপ্যতা দেখানো হয় জনপ্রতি দিনে ১৩৭ দশমিক ৯০ গ্রাম।

এই প্রতিবেদনের আগের দুই বছরে মহিষ নীতিনির্ধারণী আলোচনাতেও ছিল। নিউ এজের খবর অনুযায়ী, ২০২৪ সালের অক্টোবরে সাভারে একাদশ এশিয়ান বাফেলো কংগ্রেসের উদ্বোধনীতে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উপদেষ্টা ফরিদা আখতার মাংস ও দুধের মাধ্যমে আমিষের চাহিদা মেটাতে মহিষের উৎপাদন বাড়ানোর আহ্বান জানান এবং ভোলায় হাজার হাজার মহিষ পালন করে মহিষের দুধের দই তৈরির কথা উল্লেখ করেন। ২০২৫ সালের আগস্টে বরিশালে উপকূলীয় এলাকায় মহিষের চারণভূমি নিয়ে এক জাতীয় কর্মশালায় তিনি বলেন, অপরিকল্পিত উন্নয়নে চারণভূমি কমে যাওয়ায় মহিষসম্পদ ঝুঁকিতে পড়ছে। কর্মশালার বক্তারা বলেন, চারণভূমি কমে যাওয়া ও খাদ্যের দাম বাড়ায় দেশে মহিষসহ অন্যান্য পশুর সংখ্যা কমছে।

সুনামগঞ্জের শনির হাওরে মহিষের গাড়ি; বাংলাদেশে এখনো মালামাল বহনে মহিষ ব্যবহৃত হয়। ছবি: বলরাম মহলদার / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0)
সুনামগঞ্জের শনির হাওরে মহিষের গাড়ি; বাংলাদেশে এখনো মালামাল বহনে মহিষ ব্যবহৃত হয়। ছবি: বলরাম মহলদার / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0)

কোরবানির হাটের জন্য পশুর খাবার


নারায়ণগঞ্জের খামারগুলো যে খাবারের কথা বলেছে, সেই বসন্তে অন্য জেলার খামারিরাও প্রতিবেদকদের প্রায় একই কথা জানান। রাসেল বলেছিলেন, বন্দরের মহিষ দুটি ঘাস, ভুট্টা ও ভুসি পছন্দ করে; রাবেয়া অ্যাগ্রো ফার্ম জানিয়েছিল, তাদের মহিষটি ১২ ধরনের খাদ্যমিশ্রিত ঘাস, ভুট্টা ও ভুসি খায়।

নিউ এজ ২০২৬ সালের ২৬ এপ্রিল জানায়, রাজশাহী বিভাগে ঈদের জন্য পশু প্রস্তুতকারী খামারিরা খড়, কাঁচা ঘাস, ভুট্টা, খৈল ও ভুসির মতো প্রাকৃতিক খাবার ব্যবহার করছেন এবং স্টেরয়েড বা ক্ষতিকর রাসায়নিক এড়িয়ে চলছেন বলে দাবি করেন। সেখানকার বাণিজ্যিক খামারগুলো কোরবানির জন্য শাহীওয়াল, সিন্ধি, রেড চিটাগাং, পাবনা ও মীরকাদিম জাতের গরু মোটাতাজা করছিল। খামারিরা আরও জানান, পশুখাদ্যের দাম বাড়ায় তাঁদের খরচ বেড়েছে এবং এতে সে মৌসুমে কোরবানির পশুর দামও বাড়তে পারে।

নিউ এজের ওই প্রতিবেদনে উদ্ধৃত ডিএলএসের হিসাবে, রাজশাহী বিভাগে স্থানীয় প্রায় ২৬ লাখ চাহিদার বিপরীতে প্রায় ৪৩ লাখ কোরবানির পশু প্রস্তুত করা হয়েছিল, আর প্রায় ১৭ লাখ পশু দেশের অন্য এলাকায়, বিশেষ করে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেটে পাঠানোর কথা ছিল। পাইকপাড়ার 'ডোনাল্ড ট্রাম্প'ও এক বছর আগে এই রাজশাহী থেকেই কেনা হয়েছিল।

২০২৬ সালের ঈদুল আজহার আগে সারা দেশের চিত্র


নিউ এজের খবর অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ৩ মে এক সংবাদ সম্মেলনে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিনুর রশিদ জানান, আসন্ন ঈদুল আজহার জন্য ১ দশমিক ০১ কোটি পশুর আনুমানিক চাহিদার বিপরীতে প্রায় ১ দশমিক ২৩ কোটি কোরবানির পশু প্রস্তুত রয়েছে, ফলে ২২ দশমিক ২৭ লাখের বেশি পশু উদ্বৃত্ত থাকবে। প্রাপ্য পশুর মধ্যে প্রায় ৫৭ লাখ গরু ও মহিষ এবং ৬৬ লাখ ছাগল ও ভেড়া, বাকি অল্প কিছু অন্যান্য প্রজাতির।

মন্ত্রী জানান, সারা দেশে ৩ হাজার ৬০০টির বেশি পশুর হাট বসবে, এর মধ্যে ঢাকা শহরে ২৭টি: ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন এলাকায় ১৬টি এবং দক্ষিণে ১১টি। স্থানীয় খামারিদের সুরক্ষায় নীতিগত সিদ্ধান্ত হিসেবে সীমান্ত এলাকার পশুর হাট বন্ধ রাখা হবে, কারণ অতীতে এসব হাট দিয়ে বিদেশি পশু অবৈধভাবে ঢুকে দেশি খামারিদের ক্ষতি করেছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। অনলাইনে কোরবানির পশু বিক্রিতে কোনো কর বা হাসিল লাগবে না এবং চামড়ার ক্ষতি ঠেকাতে পেশাদার ও অপেশাদার কসাইদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।

২০২৬ সালের ৭ মে মন্ত্রিসভা ২৫ থেকে ৩১ মে পর্যন্ত ঈদুল আজহার সাত দিনের সাধারণ ছুটি অনুমোদন করে। নারায়ণগঞ্জের খবরটির আগের দিন, ১৩ মে, নিউ এজ জানায়, চাঁদ দেখা সাপেক্ষে বাংলাদেশে ঈদুল আজহা ২৮ মে উদ্‌যাপিত হতে পারে।

একই দিনে সরকার লবণযুক্ত কাঁচা চামড়ার দাম নির্ধারণ করে। ঢাকায় লবণযুক্ত গরুর চামড়ার দাম প্রতি বর্গফুট ৬২ থেকে ৬৭ টাকা ঠিক করা হয়, আগের বছর যা ছিল ৬০ থেকে ৬৫ টাকা; ঢাকার বাইরে ৫৭ থেকে ৬২ টাকা, আগের বছর ছিল ৫৫ থেকে ৬০ টাকা। লবণযুক্ত খাসির চামড়া প্রতি বর্গফুট ২২ থেকে ২৫ টাকা এবং বকরির চামড়া ২৫ থেকে ৩০ টাকা নির্ধারণ করা হয়। বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির জানান, চামড়া সংরক্ষণের জন্য সরকার বিনা মূল্যে ১৭ কোটি ৬০ লাখ টাকার লবণ দেবে এবং দেশে প্রতিবছর ঈদুল আজহায় প্রায় ১ কোটি পশু কোরবানি হয়।

আগের বছরের হিসাব থেকে এই আয়োজনের ব্যাপ্তি বোঝা যায়। ডিএলএসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ঈদুল আজহায় ৯১ লাখ ৩৬ হাজার ৭৩৪টি পশু কোরবানি হয়: ৪৭ লাখ ৫ হাজার ১০৬টি গরু, ৪৪ লাখ ৩০ হাজার ৬৬৮টি ছাগল ও ভেড়া এবং ৯৬০টি অন্যান্য পশু। নারায়ণগঞ্জ যে বিভাগের অংশ, সেই ঢাকা বিভাগে কোরবানি হয় ২১ লাখ ৮৫ হাজার ৪০টি পশু, যা রাজশাহী বিভাগের পরেই সর্বোচ্চ। অধিদপ্তর জানায়, উৎপাদন বেশি হওয়ায় ২০২৫ সালে ৩৩ লাখ ১০ হাজার ৬০৩টি কোরবানির পশু অবিক্রীত ছিল। স্তরভিত্তিক দৈবচয়ন পদ্ধতিতে প্রতিটি উপজেলার ছোট, মাঝারি ও বড় তিনটি গ্রাম থেকে অন্তত ১ শতাংশ নমুনা নিয়ে এই হিসাব করা হয়।

বাংলাদেশে ঈদুল আজহার একটি পশুর হাট। ছবি: ওয়াসিউল বাহার / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
বাংলাদেশে ঈদুল আজহার একটি পশুর হাট। ছবি: ওয়াসিউল বাহার / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)

কোরবানির পশুর শর্ত


ঈদুল আজহা, যা বাংলাদেশে কোরবানির ঈদ নামে পরিচিত, হযরত ইবরাহিম (আ.)-এর ত্যাগের স্মরণে পালিত হয়। বাংলাপিডিয়া জানায়, জিলহজ মাসের ১০ তারিখে এই ঈদ পালিত হয় এবং ঈদের নামাজের পর থেকে পরের দিনগুলোতেও কোরবানি দেওয়া যায়। একটি উট, গরু বা মহিষ সাতজনের নামে কোরবানি দেওয়া যায়, কিন্তু একটি ভেড়া বা ছাগল কেবল একজনের নামে। বাংলাদেশে সাধারণত গরু, ছাগল ও মহিষ কোরবানি দেওয়া হয়।

কোরবানির পশুর নির্দিষ্ট বয়স হতে হয় এবং কিছু ত্রুটিমুক্ত হতে হয়: পশুটি অন্ধ হতে পারবে না, পা বা শিং ভাঙা থাকতে পারবে না, কান আংশিক বা পুরোপুরি কাটা থাকতে পারবে না। বাংলাপিডিয়ায় মাংস তিন ভাগ করার প্রথার কথা বলা হয়েছে: এক ভাগ নিজের, এক ভাগ আত্মীয়স্বজনের এবং এক ভাগ গরিবদের জন্য। নিজের ভোগের জন্য চামড়া, মাংস, চর্বি বা হাড় বিক্রি করা জায়েজ নয়; চামড়া বা তার বিক্রির টাকা গরিবদের, কিংবা মাদ্রাসা ও এতিমখানার দরিদ্র শিক্ষার্থীদের দিতে হয়।

এই উৎসব শিল্পের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাপিডিয়ার চামড়াশিল্প বিষয়ক ভুক্তিতে বলা হয়েছে, দেশের কাঁচা চামড়ার প্রায় ৪০ শতাংশ আসে ঈদুল আজহায় জবাই করা পশু থেকে। এ কারণেই প্রতি ঈদের আগে সরকার কাঁচা চামড়ার দাম ঠিক করে এবং লবণের ব্যবস্থা করে।

বন্দর, নারায়ণগঞ্জ ও শীতলক্ষ্যা


ঢাকা বিভাগের নারায়ণগঞ্জ জেলার আয়তন ৬৮৪ দশমিক ৩৭ বর্গকিলোমিটার। জেলার পাঁচটি উপজেলা হলো আড়াইহাজার, নারায়ণগঞ্জ সদর, বন্দর, রূপগঞ্জ ও সোনারগাঁ। প্রধান নদী শীতলক্ষ্যা, মেঘনা, পুরাতন ব্রহ্মপুত্র, বুড়িগঙ্গা, বালু ও ধলেশ্বরী। ১৮৮২ সালে নারায়ণগঞ্জ মহকুমা গঠিত হয় এবং ১৯৮৪ সালে এটি জেলায় উন্নীত হয়। নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন প্রতিষ্ঠিত হয় ২০১১ সালের ৫ মে।

এসএস ক্যাটল এগ্রো ফার্ম যে বন্দর উপজেলায়, সেটি ৫৪ দশমিক ৩৯ বর্গকিলোমিটার আয়তন নিয়ে জেলার সবচেয়ে ছোট উপজেলা। এর উত্তর ও পূর্বে সোনারগাঁ উপজেলা, দক্ষিণে মুন্সিগঞ্জ সদর উপজেলা এবং পশ্চিমে নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলা ও শীতলক্ষ্যা নদী। বন্দর থানা গঠিত হয় ১৯৬৪ সালে এবং ১৯৯৩ সালে এটি উপজেলা হয়। এর পাঁচটি ইউনিয়ন হলো কলাগাছিয়া, ধামগড়, বন্দর, মদনপুর ও মুছাপুর। বন্দরের সাবেক কদম রসুল পৌরসভা এখন সিটি করপোরেশনের ১৯ থেকে ২৭ নম্বর ওয়ার্ড।

বাংলাপিডিয়ার তালিকায় বন্দরের প্রধান ফসল আলু, ধান, পাট, সরিষা ও গম, আর উপজেলায় ১২৩টি দুগ্ধ খামার ও ১৪১টি হাঁস-মুরগির খামারের উল্লেখ আছে। এখানকার হাটবাজারের মধ্যে সোনাকান্দা, লাঙ্গলবন্দ ও মদনপুর হাট উল্লেখযোগ্য। উপজেলাটি প্রাচীন স্থাপনার জন্যও পরিচিত, যেমন ১৪৮১ সালের বন্দর শাহী মসজিদ, ১৫০৪ সালের বাবা সালেহ মসজিদ ও মাজার এবং সোনাকান্দা দুর্গ।

বন্দরের পশ্চিম পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া এবং নারায়ণগঞ্জ শহরের পূর্ব দিক দিয়ে প্রবাহিত শীতলক্ষ্যা নদী প্রায় ১১০ কিলোমিটার দীর্ঘ; নারায়ণগঞ্জের কাছে এর প্রস্থ প্রায় ৩০০ মিটার। নদীটি সারা বছর নৌচলাচলের উপযোগী, আর এর তীরেই নারায়ণগঞ্জের গুরুত্বপূর্ণ নদীবন্দর এবং আদমজী জুট মিলসের মতো ভারী শিল্প গড়ে উঠেছে।

নারায়ণগঞ্জের কাছে শীতলক্ষ্যা নদী। ছবি: পি কে নিয়োগী / উইকিমিডিয়া কমন্স (পাবলিক ডোমেইন)
নারায়ণগঞ্জের কাছে শীতলক্ষ্যা নদী। ছবি: পি কে নিয়োগী / উইকিমিডিয়া কমন্স (পাবলিক ডোমেইন)

ছবি: জে রিনতানেন / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0)

সূত্র: জাগো নিউজ ২৪ (১৪ মে ২০২৬ ও ১২ মে ২০২৬), নিউ এজ (৩, ৮ ও ১৩ মে ২০২৬, ২৬ এপ্রিল ২০২৬, ১১ জুন ২০২৫, ২৫ আগস্ট ২০২৫ ও ২৬ অক্টোবর ২০২৪), প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর (লাইভস্টক ইকোনমি অ্যাট আ গ্লান্স ২০২৪-২৫), বাংলাপিডিয়া, মলিকুলার বায়োলজি অ্যান্ড ইভোলিউশন (লিয়াং ও অন্যান্য, ২০২০), উইকিপিডিয়া (ওয়াটার বাফেলো)

অনলাইন ডেস্কদা এগ্রো নিউজ

লাইভস্টক

সম্পর্কিত খবর

লাইভস্টক

সৌরপ্যানেলের নিচে ভেড়া চরালে বাড়ে মৌমাছি, তবে সংখ্যা রাখতে হবে কম

কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণায় দেখা গেছে, সৌরখামারে হেক্টরপ্রতি দুটি ভেড়া চরালে ঘাস কাটার তুলনায় উপকারী পোকা ৩৮ শতাংশ বাড়ে। খামারিদের জন্য ভেড়ার পাল পরিকল্পনার একটি সহায়ক টুলও তৈরি করেছেন গবেষকেরা।

Farms.com১৬ অক্টোবর ২০২৬২ মিনিটের পড়া
লাইভস্টক

প্রোটিনের চাহিদায় বদলে গেল কানাডার দুধের বাজার, মাখনের উদ্বৃত্ত শেষ

দুগ্ধজাত প্রোটিনের চাহিদা বাড়ায় পাঁচ বছরের মধ্যে কানাডার দুধের বাজারে মাখনচর্বির কাঠামোগত উদ্বৃত্ত মিটে গেছে, দুধের দাম নির্ধারণেও এসেছে পরিবর্তন।

Manitoba Co-operator১৬ অক্টোবর ২০২৬১ মিনিটের পড়া
লাইভস্টক

সিকি হেক্টরে ওটের বীজ চাষ, ইথিওপিয়ার এক কৃষকের পারিবারিক ব্যবসা

ইথিওপিয়ার এক ক্ষুদ্র কৃষক মাত্র শূন্য দশমিক ২৫ হেক্টর জমিতে বীজের জন্য ওট চাষ করে প্রথম ফসল ৪৫ হাজার বির্রে বিক্রি করেন এবং পরের বছর চাষ বাড়ান। আইএলআরআইয়ের পশুখাদ্যের বীজকে ব্যবসায় রূপ দেওয়ার উদ্যোগের অংশ এটি।

ILRI১৬ অক্টোবর ২০২৬২ মিনিটের পড়া

মন্তব্য

(০)