ঝালকাঠি সদর উপজেলার ধানসিঁড়ি ইউনিয়নের গাবখান বাজারের মো. রেজাউল করীম দুটি গাভি দিয়ে যে খামার শুরু করেছিলেন, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে তাতে গরুর সংখ্যা দাঁড়ায় ২২টিতে। জাগো নিউজের ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৫ তারিখের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এর মধ্যে ১৮টি গাভি ও ৪টি এঁড়ে বাছুর। ১৫টি গাভি থেকে তিনি প্রতিদিন শতাধিক লিটার দুধ পেতেন, যা বিক্রি হতো প্রতি লিটার ৭০ টাকা দরে। খামার দেখাশোনার জন্য তিনজন শ্রমিক কাজ করতেন। রেজাউল জানান, তখন পর্যন্ত তাঁকে লোকসানের মুখে পড়তে হয়নি।
ঝালকাঠি বরিশাল বিভাগের একটি জেলা, আয়তন ৭৫৮.০৬ বর্গকিলোমিটার। বিষখালী, ধানসিঁড়ি, গাবখান ও সুগন্ধা এ জেলার প্রধান নদীগুলোর মধ্যে পড়ে। পিরোজপুরের সন্ধ্যা নদী ও ঝালকাঠির সুগন্ধা নদীকে যুক্ত করতে ১৯১৮ সালে খনন করা হয় ১৮ কিলোমিটার দীর্ঘ গাবখান চ্যানেল।

ইটভাটা ছেড়ে গাভির খামার
রেজাউল করীম জানান, ছোটবেলা থেকেই তিনি উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন। উচ্চশিক্ষা শেষে অবসরপ্রাপ্ত বাবার কাছ থেকে ৫ লাখ টাকা ঋণ নিয়ে তিনি একটি ইটভাটার অংশীদার হন। সেই ইটভাটায় সাতক্ষীরার শ্রমিকেরা কাজ করতেন। পরিবারের দুধের চাহিদা মেটাতে তাঁদের সাহায্যে তিনি সাতক্ষীরা থেকে দুটি গাভি আনেন। এরপর গাভি পালনে তাঁর আগ্রহ বাড়ে।
পরে তিনি ইটভাটার অংশ ছেড়ে দেন এবং আরও চারটি গাভি কিনে খামার শুরু করেন। জায়গা না কুলানোয় নতুন শেড বানান। খামারের সব গরুই ফ্রিজিয়ান ও জার্সি জাতের। হলস্টেইন ফ্রিজিয়ান বিশ্বের বেশির ভাগ দুগ্ধ খামারির পছন্দের জাত; ইউরোপে এ জাতের একটি গাভি বছরে গড়ে ৭ থেকে ৮ হাজার লিটার দুধ দেয়। ব্রিটেনের জার্সি দ্বীপের জাত জার্সি গাভি আকারে ছোট, এর দুধে চর্বির ভাগ বেশি, আর নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চলের অনেক জাতের তুলনায় এটি গরম ভালো সহ্য করে।
খামারের দুধ দিয়ে মিষ্টি তৈরির জন্য রেজাউল ঝালকাঠি শহরের ডাক্তারপট্টিতে একটি দোকান দিয়েছেন। বাইরের দোকানেও তিনি দুধ বিক্রি করেন। গত কোরবানির ঈদসহ বিভিন্ন সময়ে তিনি ১০টি গরু ১৪ লাখ টাকার বেশি দামে বিক্রি করেছেন।

ঘাস চাষ, খড় আর গোবরে বায়োগ্যাস
গোখাদ্যের জোগান দিতে রেজাউল সাড়ে পাঁচ বিঘা জমিতে ঘাস চাষ করেন। আমন ধান ঘরে উঠলে তিনি পর্যাপ্ত খড় কিনে রাখেন। তিনজন শ্রমিকের বেতন বাবদ প্রতি মাসে তাঁর খরচ হয় ৫০ হাজার টাকা।
গরুর মল-মূত্র মোটরের পানি দিয়ে ধুয়ে একটি ট্যাংকে জমা করা হয়। সেখান থেকে বায়োগ্যাস প্ল্যান্টে তৈরি গ্যাস পাইপে করে বাড়িতে নেওয়া হয় এবং প্রতিদিনের পারিবারিক কাজে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা হয়।
গবাদিপশুর চিকিৎসা নিয়ে রেজাউল জানান, ১৯৯৮ সালে যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর থেকে গবাদিপশু পালনের প্রশিক্ষণ নেওয়ায় প্রাথমিক চিকিৎসা তিনি নিজেই দেন। উন্নত চিকিৎসার দরকার হলে পশু নিয়ে যান সদর উপজেলা প্রাণিসম্পদ কার্যালয়ে।

প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তারা যা বললেন
সদর উপজেলা প্রাণিসম্পদ কার্যালয়ের চিকিৎসক মিজানুর রহমান বলেন, ‘ধানসিঁড়ি ইউনিয়নের গাবখান বাজারের রেজাউল করীম গাভির খামার করে স্বাবলম্বী হয়েছেন। তিনি খামারিদের জন্য অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত।’ তিনি জানান, কার্যালয় থেকে তাঁকে পরামর্শসহ সার্বিক সহযোগিতা দেওয়া হচ্ছে।
সদর উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. ফারুক হোসেন বলেন, ‘রেজাউল করীম দুধ উৎপাদনকারী খামার গড়ে সফল হয়েছেন। তাকে দেখে অনেকেই খামার গড়তে উৎসাহিত হচ্ছেন।’ জেলা প্রশাসক আশরাফুর রহমান বলেন, প্রাণীকে রোগমুক্ত ও সুস্থ রাখতে পারলে দুধ, মাংস ও ডিমের মাধ্যমে দেশ ও খামারি দুই পক্ষই সচ্ছল ও স্বাবলম্বী হতে পারে।
দেশে দুধের চাহিদা ও উৎপাদনের মধ্যে তখনো ঘাটতি ছিল। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের ২০২৩-২৪ অর্থবছরের হিসাবে দেশে দুধ উৎপাদন হয় ১৫০.৪৪ লাখ মেট্রিক টন, আর চাহিদা ছিল ১৫৮.৭৮ লাখ মেট্রিক টন। জনপ্রতি দৈনিক ২৫০ মিলিলিটার চাহিদার বিপরীতে প্রাপ্যতা ছিল ২৩৪.৪৫ মিলিলিটার। একই অর্থবছরে দেশে গরুর সংখ্যা ছিল ২৫০.১৩ লাখ।
ছবি: Ibrahim Husain Meraj / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর (লাইভস্টক ইকোনমি অ্যাট আ গ্লান্স ২০২৩-২৪), উইকিপিডিয়া (ঝালকাঠি জেলা, গাবখান চ্যানেল, হলস্টেইন ফ্রিজিয়ান, জার্সি গরু)




মন্তব্য
(০)