ঈদুল আজহা সামনে রেখে ২০২৬ সালে রাজধানীতে ২৪টি অস্থায়ী পশুর হাট বসানোর পরিকল্পনা করে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন। জাগো নিউজ ২৪-এর ১২ এপ্রিল ২০২৬ তারিখের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) ৯ এপ্রিল ১২টি স্থানে হাট ইজারার দরপত্র আহ্বান করে, আর ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) আরও ১২টি অস্থায়ী হাটের দরপত্র ঘোষণার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। এর বাইরে ডিএনসিসির গাবতলী ও ডিএসসিসির সারুলিয়া স্থায়ী পশুর হাটেও কোরবানির পশু বিক্রি হওয়ার কথা। ঈদের দিনসহ মোট পাঁচ দিন রাজধানীতে হাট বসবে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়।
তবে পূর্ব ঢাকার আফতাবনগরে এবার হাট বসবে কি না, তা তখনো অনিশ্চিত ছিল। সীমানা জটিলতা, আবাসিক এলাকার পরিবেশ এবং জনদুর্ভোগের আশঙ্কা বিবেচনায় ডিএসসিসি বিষয়টি নিয়ে হিসাব কষছিল। প্রতিবেদনে বলা হয়, আগের বছর স্থানীয়দের বাধা ও উচ্চ আদালতের নিষেধাজ্ঞার কারণে আফতাবনগরে পশুর হাট বসানোর ইজারা কার্যক্রম স্থগিত করা হয়েছিল।
কোরবানির ঈদ ঘিরে দেশের নানা প্রান্ত থেকে খামারিরা গরু, ছাগলসহ পশু নিয়ে ঢাকায় আসেন, আর রাজধানীর বাসিন্দারা এসব হাট থেকেই পশু কিনে কোরবানি দেন। প্রতি বছর হাটগুলোতে উৎসবের আবহ তৈরি হয়; অনেকে পরিবার নিয়ে পশু দেখতে ও কিনতে যান। এসব হাটের ইজারা থেকে দুই সিটি করপোরেশন উল্লেখযোগ্য রাজস্ব পায়। প্রতিবেদন অনুযায়ী, চাঁদ দেখা সাপেক্ষে ২৭ বা ২৮ মে দেশে ঈদুল আজহা হওয়ার কথা ছিল।
উত্তর সিটির ১২টি হাট ও সরকারি মূল্য
ডিএনসিসি ৯ এপ্রিল যে দরপত্র বিজ্ঞপ্তি দেয়, তাতে ১২টি হাটের নাম ও প্রতিটির সরকারি মূল্য উল্লেখ করা হয়। সরকারি মূল্য হলো সেই ন্যূনতম অঙ্ক, যার চেয়ে বেশি দর দিলে তবেই কেউ হাটের ইজারা পাওয়ার যোগ্য হন। জাগো নিউজের প্রতিবেদনে তালিকাটি ছিল এরকম:
- খিলক্ষেত বাজার সংলগ্ন এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের নিচের খালি জায়গা: সরকারি মূল্য এক কোটি ৫১ লাখ টাকা।
- মিরপুর সেকশন-৬ এর ইস্টার্ন হাউজিংয়ের খালি জায়গা: এক কোটি ৭৬ লাখ ৪৭ হাজার ৮৫৮ টাকা।
- মিরপুর কালশী বালুর মাঠের (১৬ বিঘা) খালি জায়গা: ৩০ লাখ টাকা।
- ঢাকা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট সংলগ্ন খালি জায়গা: এক কোটি ১৩ লাখ ৫ হাজার ৯০০ টাকা।
- মেরুল বাড্ডা কাঁচাবাজার সংলগ্ন খালি জায়গা: ১৪ লাখ টাকা।
- ২৩ নম্বর ওয়ার্ডের পূর্ব হাজীপাড়ার ইকরা মাদরাসার পাশের খালি জায়গা: ১৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা।
- মোহাম্মদপুরের বছিলার ৪০ ফুট রাস্তা সংলগ্ন খালি জায়গা: এক কোটি ৯৬ লাখ ২০ হাজার ৪৫৬ টাকা।
- উত্তরা দিয়াবাড়ির ১৬ ও ১৮ নম্বর সেক্টর সংলগ্ন বউবাজার এলাকার খালি জায়গা: আট কোটি ৩০ লাখ ৩৩ হাজার ৩৩৪ টাকা।
- ভাটুলিয়া সাহেব আলী মাদরাসা থেকে ১০ নম্বর সেক্টরের রানাভোলা অ্যাভিনিউ সংলগ্ন উত্তরা রানাভোলা স্লুইসগেট পর্যন্ত খালি জায়গা: ৮৮ লাখ ২০ হাজার ৭৫০ টাকা।
- ৪৪ নম্বর ওয়ার্ডের কাঁচকুড়া বাজার সংলগ্ন রহমাননগর আবাসিক এলাকার খালি জায়গা: ১৫ লাখ ৫ হাজার ৫০০ টাকা।
- খিলক্ষেতের মস্তুল চেকপোস্ট সংলগ্ন পশ্চিমপাড়ার খালি জায়গা: ৯৩ লাখ ২২ হাজার ৩৩৪ টাকা।
- ভাটারার সুতিভোলা খাল সংলগ্ন খালি জায়গা: তিন কোটি ১২ লাখ ৭৬ হাজার ৬৬৭ টাকা।
তালিকার বেশির ভাগ স্থান আগের বছরও ডিএনসিসির হাটের তালিকায় ছিল। প্রথম আলোর ৩ জুন ২০২৫ তারিখের প্রতিবেদনে ২০২৫ সালে উত্তর সিটির যে অস্থায়ী হাটগুলোর নাম আসে, তার মধ্যে ছিল খিলক্ষেতের মস্তুল চেকপোস্ট, তেজগাঁওয়ের ঢাকা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট এলাকা, উত্তরা দিয়াবাড়ির বউবাজার, মিরপুর-৬ এর ইস্টার্ন হাউজিং, মোহাম্মদপুরের বছিলা, উত্তরা ১০ নম্বর সেক্টরের রানাভোলা অ্যাভিনিউ, ভাটারার সুতিভোলা খাল, খিলক্ষেতে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের নিচের জায়গা, রহমাননগরের কাঁচকুড়া বাজার, মেরুল বাড্ডা কাঁচাবাজার এবং রামপুরার পূর্ব হাজীপাড়ার ইকরা মাদরাসা এলাকা।
মিরপুরের কালশী বালুর মাঠের হাট নিয়ে ২০২৫ সালে জটিলতা হয়েছিল। প্রথম আলো জানায়, সে বছর ওই হাটের সরকারি মূল্য ছিল ৮০ লাখ টাকা; তিন দফা দরপত্র ডাকা হয়, দ্বিতীয় দফায় ৩০ লাখ টাকার একটি দর পড়ে এবং তৃতীয় দফায় কোনো দরই পড়েনি। ২০২৬ সালের বিজ্ঞপ্তিতে একই মাঠের সরকারি মূল্য ধরা হয় ৩০ লাখ টাকা।

দরপত্র কেনা, জমা ও খোলার নিয়ম
ডিএনসিসির সম্পত্তি বিভাগ জানায়, ১২টি হাটের ইজারায় অংশ নিতে ইচ্ছুক ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে দরপত্র কিনতে হবে। দরপত্র বিক্রি হবে ডিএনসিসির প্রধান কার্যালয় নগর ভবনসহ সব আঞ্চলিক কার্যালয়, ঢাকা বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়, ঢাকা জেলা পুলিশ সুপারের কার্যালয় এবং ঢাকা জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে। সিটি করপোরেশন নির্ধারিত টাকা নির্দিষ্ট ব্যাংকে জমা দিয়ে যে কেউ দরপত্র কিনতে পারবেন।
প্রথম পর্যায়ে দরপত্রের শিডিউল বিক্রির শেষ দিন ছিল ২৬ এপ্রিল। পূরণ করা দরপত্র ২৭ এপ্রিল সকাল ৯টা থেকে দুপুর ১টার মধ্যে নগর ভবনসহ সংশ্লিষ্ট কার্যালয়ে জমা দিতে হবে, আর সেদিনই দুপুর আড়াইটায় নগর ভবনে দরদাতা বা তাদের প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে দরপত্রের বাক্স খোলা হবে। সরকারি ছুটি বা অনিবার্য কারণে নির্ধারিত দিনে দরপত্র গ্রহণ ও খোলা সম্ভব না হলে পরের কর্মদিবসে একই সময়ে তা করা হবে।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, সরকার নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে যে বেশি দর দেবেন, তিনিই হাটের ইজারা পাবেন। ইজারাদারের কাছ থেকে ইজারামূল্যের ১০ শতাংশ পরিচ্ছন্নতা ফি নেওয়া হবে, যা ব্যাংক চালানের মাধ্যমে করপোরেশনের হিসাবে জমা দিতে হবে। দরপত্রে স্বাক্ষর করেন ডিএনসিসির প্রধান সম্পত্তি কর্মকর্তা মোহাম্মদ শওকত ওসমান।
বিজ্ঞপ্তির বিশেষ নির্দেশনায় হাটের পরিচ্ছন্নতা নিয়েও শর্ত ছিল। হাটের ভেতরের ময়লা-আবর্জনা সংগ্রহ করে নির্ধারিত স্থানে জমা রাখতে হবে, সেখান থেকে সিটি করপোরেশনের ময়লার গাড়ি তা সরিয়ে নেবে। ঈদের পরদিন দুপুর ১২টা থেকে হাটের বাঁশের খুঁটি সরানোসহ পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম শুরু করবে করপোরেশন।
দক্ষিণ সিটির খসড়া তালিকা
ডিএসসিসির সম্পত্তি বিভাগ জাগো নিউজকে জানায়, রাজধানীবাসীর কোরবানির পশুর চাহিদা মেটাতে সংস্থাটি ১২টি স্থানে অস্থায়ী হাট বসানোর পরিকল্পনা করছে এবং সেই সপ্তাহের মধ্যেই বিজ্ঞপ্তি দিয়ে দরপত্র আহ্বান করা হবে। পরে সর্বোচ্চ দরদাতাকে ইজারা দেওয়া হবে, আর কার্যাদেশ পাওয়া ইজারাদাররা ঈদের দিনসহ মোট পাঁচ দিন নির্ধারিত স্থানে হাট বসাতে পারবেন।
ডিএসসিসির খসড়া তালিকায় যেসব স্থানের নাম ছিল:
- উত্তর শাহজাহানপুরের মৈত্রী সংঘ ক্লাবের খালি জায়গা।
- পোস্তগোলা শ্মশানঘাটের পশ্চিম পাশে নদীর পাড়ের খালি জায়গা।
- দনিয়া কলেজের পূর্ব পাশে ও ছনটেক মহিলা মাদরাসার পূর্ব-পশ্চিমের খালি জায়গা।
- ধোলাইখালে সাদেক হোসেন খোকা মাঠের দক্ষিণ পাশের খালি জায়গা ও ধোলাইখাল ট্রাক টার্মিনালের খালি জায়গা।
- রহমতগঞ্জ ক্লাবের খালি জায়গা।
- হাজারীবাগের ইনস্টিটিউট অব লেদার টেকনোলজি কলেজের পূর্ব পাশের খালি জায়গা।
- মেরাদিয়া বাজারের পূর্ব পাশে খালপাড়ের খালি জায়গা।
- কমলাপুরের সাদেক হোসেন খোকা কমিউনিটি সেন্টারের পূর্ব পাশের খালি জায়গা।
- আমুলিয়া আলীগড় মডেল কলেজের উত্তর পাশের খালি জায়গা।
- শ্যামপুর কদমতলী ট্রাক স্ট্যান্ডের খালি জায়গা।
- লালবাগের রহমতগঞ্জ ক্লাব সংলগ্ন খালি জায়গা।
- কামরাঙ্গীরচরের বেড়িবাঁধ।
জাগো নিউজ জানায়, রোববার ১২ এপ্রিল পর্যন্ত এ তালিকা চূড়ান্ত হয়নি এবং এতে সংযোজন-বিয়োজন হতে পারে। ডিএসসিসির প্রধান সম্পত্তি কর্মকর্তা মোহাম্মদ মোবাশ্বের হাসান পত্রিকাটিকে বলেন, দু-তিন দিনের মধ্যেই দক্ষিণ সিটির অস্থায়ী পশুর হাটের ইজারা দরপত্র আহ্বান করা হবে। তার ভাষায়, “জনগণের চাহিদার ওপর ভিত্তি করে যত বেশি হাট দেওয়া যায়, তা দেবো।” তবে ঠিক কয়টি হাটের নাম চূড়ান্ত হয়েছে, তা তিনি নির্দিষ্ট করে বলেননি।
খসড়া তালিকার মেরাদিয়া হাট নিয়ে আগের বছর আদালতের আদেশ ছিল। দ্য ডেইলি স্টার বাংলার ২৯ এপ্রিল ২০২৫ তারিখের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বনশ্রীর মেরাদিয়ায় পশুর হাট বসাতে ডিএসসিসি ২১ এপ্রিল যে ইজারা বিজ্ঞপ্তি দিয়েছিল, তার বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে বনশ্রীর এক বাসিন্দা রিট করেন। বিচারপতি কাজী জিনাত হক ও বিচারপতি আইনুন নাহার সিদ্দিকার হাইকোর্ট বেঞ্চ সিদ্ধান্তটি তিন মাসের জন্য স্থগিত করেন এবং মেরাদিয়ায় হাট বসানোর সিদ্ধান্ত কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না, তা জানতে রুল জারি করেন। রিটকারীর আইনজীবী আদালতে যুক্তি দেন, বনশ্রী আবাসিক এলাকা এবং মেরাদিয়ায় হাট বসলে তা আশপাশের আবাসিক এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে বাসিন্দাদের চরম ভোগান্তি হবে।
আফতাবনগর নিয়ে কেন অনিশ্চয়তা
আফতাবনগর পূর্ব ঢাকার একটি আবাসিক এলাকা, যার কিছু অংশ উত্তর সিটির আর কিছু অংশ দক্ষিণ সিটির আওতায় পড়ে। কোরবানির হাট নিয়ে এখানে কয়েক বছর ধরেই আদালতে মামলা হয়েছে, আর ২০২৬ সালে ডিএসসিসি যে সীমানা জটিলতা ও জনদুর্ভোগের কথা বিবেচনা করছিল, তার পেছনে এই ইতিহাস রয়েছে।
দ্য ডেইলি স্টার বাংলার ১৪ জুন ২০২৩ তারিখের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সে বছর ১৮ মে হাইকোর্ট সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মো. ইউনুস আলী আকন্দের এক রিটে আফতাবনগরে ডিএনসিসির অস্থায়ী গরুর হাট বসানোর সিদ্ধান্ত আট সপ্তাহের জন্য স্থগিত করেন। পরে আপিল বিভাগ হাইকোর্টের ওই আদেশ চার সপ্তাহের জন্য স্থগিত করেন। ডিএনসিসির আইনজীবী তখন পত্রিকাটিকে বলেন, ঈদুল আজহা উপলক্ষে সেখানে অস্থায়ী হাট চালাতে আর কোনো আইনি বাধা নেই এবং স্থানীয় জনগণের সুবিধার্থে খালি জায়গায় হাট চলবে।
২০২৫ সালে চিত্র ছিল ভিন্ন। দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড বাংলা জানায়, ৪ মে ২০২৫ হাইকোর্ট আফতাবনগর আবাসিক এলাকায় অস্থায়ী পশুর হাট বসানোর জন্য ২৫ এপ্রিল প্রকাশিত ইজারা বিজ্ঞপ্তির কার্যক্রম রুলসহ স্থগিত করেন; রিটটি করেন আইনজীবী মো. ইউনুস আলী আকন্দ। বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের ২১ মে ২০২৫ তারিখের প্রতিবেদন অনুযায়ী, তিনি ২৪ এপ্রিল আইনি নোটিশ পাঠিয়ে জবাব না পেয়ে ৩০ এপ্রিল রিট করেন এবং ৪ মের আদেশটি ছিল আফতাবনগরের দক্ষিণ সিটির অংশের হাট নিয়ে।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম ৫ মে ২০২৫ জানায়, পরদিন একই বেঞ্চ আরেকটি রিটে আফতাবনগরের (ইস্টার্ন হাউজিং) তিনটি ব্লক ও সানভ্যালি এলাকার একাংশে হাট বসাতে ডিএনসিসির ২৯ এপ্রিলের ইজারা বিজ্ঞপ্তিও তিন মাসের জন্য স্থগিত করেন। সেই রিটের আবেদনকারী, এলাকার এক বাসিন্দা, যুক্তি দেন যে এলাকাটি পুরোপুরি আবাসিক, সেখানে বেশ কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে এবং হাট বসলে বাসিন্দাদের দুর্ভোগ হবে।
দুই সিটি করপোরেশন হাইকোর্টের আদেশ স্থগিত চেয়ে আপিল বিভাগের চেম্বার আদালতে আবেদন করে। বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের ২১ মে ২০২৫ তারিখের প্রতিবেদন অনুযায়ী, চেম্বার বিচারপতি সেই আবেদনে ‘নো অর্ডার’ দেন, ফলে হাইকোর্টের আদেশ বহাল থাকে। দ্য ডেইলি স্টার বাংলা ২৬ মে ২০২৫ জানায়, ডিএসসিসির কর্মকর্তারা বলেছিলেন, তাদের ১১টি নির্ধারিত হাটের মধ্যে সীমানা নিয়ে বিরোধের কারণে আফতাবনগরের হাট বাতিল করা হয়েছে এবং আইনি জটিলতার কারণে মেরাদিয়ার হাট বসানো হচ্ছে না।

গত বছর রাজধানীতে কত হাট বসেছিল
২০২৫ সালে ঈদুল আজহা হয়েছিল ৭ জুন, আর ঈদের চার দিন আগে থেকে হাটে পশু বেচাকেনা শুরু হয়। প্রথম আলোর ৩ জুন ২০২৫ তারিখের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সে বছর স্থায়ী ও অস্থায়ী মিলিয়ে দুই সিটিতে ১৯টি হাট চূড়ান্ত হয়: উত্তর সিটিতে ১২টি এবং দক্ষিণ সিটিতে ৭টি। গাবতলী ছিল উত্তর সিটির একমাত্র স্থায়ী হাট এবং সারুলিয়া দক্ষিণ সিটির স্থায়ী হাট।
প্রথম আলো সে সময় জানায়, দক্ষিণ সিটির অস্থায়ী হাটগুলো বসছিল উত্তর শাহজাহানপুরের মৈত্রী সংঘ ক্লাবের উত্তর পাশে, ডেমরার আমুলিয়ায় আলীগড় মডেল কলেজের উত্তর পাশে, পোস্তগোলা শ্মশানঘাটের পশ্চিমে নদীর পাড়ে, দনিয়া ক্লাবের পূর্ব পাশে ও ছনটেক মহিলা মাদরাসার পশ্চিম পাশে, লালবাগের পোস্তায় রহমতগঞ্জ ক্লাবে এবং হাজারীবাগে ইনস্টিটিউট অব লেদার টেকনোলজি কলেজের পূর্ব পাশে। দক্ষিণ সিটির আরও দুটি হাটের ইজারা, একটি নারিন্দায় সাদেক হোসেন খোকা মাঠের দক্ষিণ পাশ ও ধোলাইখাল ট্রাক টার্মিনালের এবং অন্যটি ব্রাদার্স ইউনিয়ন ক্লাবসংলগ্ন খালি জায়গার, তখন মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় ছিল। ঝুলে থাকা তিনটি হাটের বিষয়ে সিদ্ধান্ত চেয়ে দুই সিটি করপোরেশন স্থানীয় সরকার বিভাগে চিঠি দিয়েছিল।
দ্য ডেইলি স্টার বাংলার ২৬ মে ২০২৫ তারিখের প্রতিবেদনে বলা হয়, সে সময় নগর ভবনে চলা আন্দোলনে ডিএসসিসির প্রশাসনিক কাজ বন্ধ থাকায় দক্ষিণ সিটির কোনো হাটের ইজারা তখনো চূড়ান্ত হয়নি; সংস্থাটির প্রশাসক বলেছিলেন, অবরোধের কারণে ইজারা চূড়ান্ত করা বা কার্যাদেশ দেওয়ার কাজ করা যাচ্ছে না। একই প্রতিবেদন অনুযায়ী উত্তর সিটির ১১টি হাটের মধ্যে কয়েকটির দরপত্র আবার ডাকতে হয়েছিল।
হাটের ব্যবস্থাপনা নিয়ে ডিএনসিসির তৎকালীন প্রশাসক প্রথম আলোকে বলেছিলেন, নিরাপত্তা, যানজট, অবৈধ হাট ঠেকানো এবং হাটে আনা পশুর স্বাস্থ্য নিয়ে স্বরাষ্ট্র, বাণিজ্য, প্রাণিসম্পদ ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় সিদ্ধান্ত নিয়েছে এবং মাঠপর্যায়ে তা কঠোরভাবে তদারক করা হবে। তিনি জানান, হাটে ভ্রাম্যমাণ আদালত থাকবে, আর ক্রেতা-বিক্রেতার নিরাপত্তা ও জাল নোট শনাক্তের ব্যবস্থাও করা হবে।
দেশে কোরবানির পশুর সরবরাহ ও কোরবানির হিসাব
রাজধানীর হাটগুলোতে পশু আসে সারা দেশের খামার ও গৃহস্থের কাছ থেকে। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্য তুলে ধরে দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড ৪ মে ২০২৫ জানায়, সে বছর ঈদুল আজহার জন্য দেশে কোরবানিযোগ্য পশু ছিল ১ কোটি ২৪ লাখ ৪৭ হাজার ৩৩৭টি। এর মধ্যে গরু ও মহিষ ৫৬ লাখ ২ হাজার ৯০৫টি, ছাগল ও ভেড়া ৬৮ লাখ ৩৮ হাজার ৯২০টি এবং অন্যান্য পশু ৫ হাজার ৫১২টি। চাহিদা মেটানোর পর প্রায় ২০ লাখ ৬৮ হাজার ১৩৫টি পশু উদ্বৃত্ত থাকবে বলে তখন ধারণা করা হয়েছিল। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উপদেষ্টা তখন বলেন, কোরবানির পশু আমদানির কোনো প্রয়োজন নেই।
ঈদের পর প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের হিসাব তুলে ধরে প্রথম আলো ১০ জুন ২০২৫ জানায়, ২০২৫ সালের ঈদুল আজহায় দেশে ৯১ লাখ ৩৬ হাজার ৭৩৪টি পশু কোরবানি হয়। এর মধ্যে গরু ও মহিষ ৪৭ লাখ ৫ হাজার ১০৬টি, ছাগল ও ভেড়া ৪৪ লাখ ৩০ হাজার ৬৬৮টি এবং অন্যান্য পশু ৯৬০টি। অবিক্রীত ছিল ৩৩ লাখ ১০ হাজার ৬০৩টি পশু। বিভাগভিত্তিক হিসাবে ঢাকা বিভাগে কোরবানি হয় ২১ লাখ ৮৫ হাজার ৪০টি পশু, যা রাজশাহী বিভাগের ২৩ লাখ ২৪ হাজার ৯৭১টির পর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ।
একই প্রতিবেদনে আগের বছরগুলোর তুলনাও ছিল: ২০২৪ সালে দেশে কোরবানি হয়েছিল ১ কোটি ৪ লাখ ৮ হাজার ৯১৮টি পশু, ২০২১ সালে কোভিড-১৯ পরিস্থিতির মধ্যে ৯০ লাখ ৯৩ হাজার এবং ২০১৯ সালে ১ কোটি ৬ লাখের বেশি। অর্থাৎ ২০২৬ সালের হাট পরিকল্পনার আগের বছরেই সরবরাহ চাহিদার চেয়ে বেশি ছিল, আর রাজধানী ঘিরে থাকা ঢাকা বিভাগ ছিল কোরবানির অন্যতম বড় কেন্দ্র।

হাটে পশুর স্বাস্থ্যসেবা, পরিবহন ও বর্জ্য
কোরবানির হাট কেবল সিটি করপোরেশনের বিষয় নয়; পশুর স্বাস্থ্য, পরিবহন ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় আরও কয়েকটি সংস্থা যুক্ত থাকে। দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের ৪ মে ২০২৫ তারিখের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সে বছর রাজধানীর ১৯টি পশুর হাটে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের ২০টি মেডিকেল টিম এবং প্রয়োজনে কাজ করার জন্য ২টি বিশেষজ্ঞ টিম রাখার পরিকল্পনা জানানো হয়। বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে পশু জবাই ও চামড়া ছাড়ানোর জন্য ৩৬ হাজার ৫৭৭ জন কসাইকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়, যার মধ্যে পেশাদার ১৫ হাজার ৩৬৯ জন এবং অপেশাদার ২১ হাজার ২০৮ জন।
একই প্রতিবেদনে বলা হয়, উত্তরাঞ্চল থেকে ঢাকা ও চট্টগ্রামে পশু আনতে বিশেষ ট্রেন চলবে এবং রেল ও নৌপথে পশু পরিবহনে প্রাণিকল্যাণ আইন, ২০১৯ মানতে হবে। সীমান্ত দিয়ে অবৈধভাবে গবাদিপশু আনা নিষিদ্ধ ছিল; তা ঠেকাতে বিজিবি, পুলিশ, কোস্ট গার্ড, জেলা প্রশাসন ও জেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরের সমন্বয়ের কথাও বলা হয়। হাটের বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব স্থানীয় সরকার বিভাগ ও সিটি করপোরেশনের এবং স্বাস্থ্যসম্মত ও যান্ত্রিক পদ্ধতিতে জবাইয়ে উৎসাহ দিতে নির্দেশিকা দেওয়ার কথাও জানানো হয়।
ঈদের পর বর্জ্যের পরিমাণও সিটি করপোরেশনের জন্য বড় কাজ। দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের ৯ জুন ২০২৫ তারিখের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ঈদে ডিএনসিসি এলাকায় ৪ লাখ ৬৬ হাজার ৮০টি পশু কোরবানি হয়, যার মধ্যে প্রায় ৩ লাখ ৬০ হাজার গরু। ঈদের তিন দিনে ৩ হাজার ৯৪৮ বার গাড়ি চালিয়ে ২০ হাজার ৮৮৯ টন কোরবানির বর্জ্য সরানো হয়: প্রথম দিনে ১০ হাজার ৬১৪ টন, দ্বিতীয় দিনে ৭ হাজার ৩৫৩ টন এবং তৃতীয় দিনে ২ হাজার ৯২২ টন। প্রতিবেদনে বলা হয়, সংবাদ সম্মেলনের দিন থেকে হাটগুলোর বর্জ্য পরিষ্কারের কাজ শুরু হয়। ২০২৬ সালের দরপত্রে হাটের ময়লা নির্ধারিত স্থানে রাখা এবং ঈদের পরদিন দুপুর থেকে বাঁশের খুঁটি সরানোর যে শর্ত দেওয়া হয়, তা এই পরিচ্ছন্নতা কাজেরই অংশ।
ঈদুল আজহা ও সরকারি ছুটি
বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী, ঈদুল আজহা জিলহজ মাসের ১০ তারিখে পালিত হয় এবং ঈদের নামাজের পর থেকে পরের দুই বা তিন দিনের সূর্যাস্ত পর্যন্ত কোরবানি করা যায়। উৎসবটি হজরত ইবরাহিম (আ.)-এর কোরবানির স্মরণে পালিত হয়। বাংলাদেশে সাধারণত গরু, ছাগল ও মহিষ কোরবানি দেওয়া হয়; একটি উট, গরু বা মহিষে সাতজন পর্যন্ত শরিক হতে পারেন, আর একটি ছাগল বা ভেড়া একজনের পক্ষ থেকে কোরবানি হয়। বাংলাপিডিয়া আরও জানায়, প্রচলিত রীতিতে মাংসের এক-তৃতীয়াংশ নিজের জন্য রাখা হয়, এক-তৃতীয়াংশ আত্মীয়স্বজনকে এবং বাকি অংশ দরিদ্রদের দেওয়া হয়।
২০২৬ সালের সরকারি ছুটির তালিকা নিয়ে দ্য ডেইলি স্টার বাংলার ১০ নভেম্বর ২০২৫ তারিখের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ঈদুল আজহায় মোট ছয় দিন ছুটি রাখা হয়: ২৮ মে সাধারণ ছুটি এবং নির্বাহী আদেশে ঈদের আগে ২৬ ও ২৭ মে এবং পরে ২৯ থেকে ৩১ মে। প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, চাঁদ দেখার ওপর নির্ভরশীল ছুটির তারিখ প্রয়োজন অনুযায়ী পরিবর্তন হবে। এ কারণেই এপ্রিলের প্রতিবেদনে ঈদের সম্ভাব্য দিন ২৭ বা ২৮ মে বলা হয়, আর সেই হিসাবেই দুই সিটি করপোরেশন হাটের দরপত্রের সময়সূচি সাজায়।
দুই সিটি করপোরেশন ও হাটের ইজারা
বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী, ঢাকা পৌরসভা গঠিত হয় ১৮৬৪ সালে এবং ১৯৮৩ সালে এটি ঢাকা মিউনিসিপ্যাল করপোরেশনে রূপ নেয়। স্থানীয় সরকার (সিটি করপোরেশন) সংশোধন আইন, ২০১১ অনুযায়ী ২৯ নভেম্বর ২০১১ ঢাকা সিটি করপোরেশন বিলুপ্ত হয় এবং ৪ ডিসেম্বর ২০১১ থেকে শহরটি ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন ও ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে ভাগ হয়। দুটি সংস্থাই স্বশাসিত, তাই রাজধানীর কোরবানির হাটের ইজারা, পরিচ্ছন্নতা ও তদারকি দুই করপোরেশন আলাদাভাবে পরিচালনা করে।
প্রতিটি সংস্থার সম্পত্তি বিভাগ হাটের স্থান ঠিক করে, সরকারি মূল্য নির্ধারণ করে দরপত্র ডাকে এবং সর্বোচ্চ দরদাতাকে কার্যাদেশ দেয়। ২০২৬ সালের এপ্রিলে উত্তর সিটি সেই প্রক্রিয়ার প্রথম ধাপ শুরু করেছিল, আর দক্ষিণ সিটি তালিকা চূড়ান্ত করার কাজ করছিল; আফতাবনগর ও মেরাদিয়ার মতো যেসব স্থানে আগের বছরগুলোতে আদালতের আদেশ হয়েছিল, সেগুলোর ভাগ্য তখনো নির্ধারিত হয়নি।
ছবি: S.M.M.Musabbir Uddin / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪ (১২ এপ্রিল ২০২৬), প্রথম আলো (৩ ও ১০ জুন ২০২৫), দ্য ডেইলি স্টার বাংলা (১৪ জুন ২০২৩; ২৯ এপ্রিল, ২৬ মে ও ১০ নভেম্বর ২০২৫), বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম (৫ ও ২১ মে ২০২৫), দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড (৪ মে ও ৯ জুন ২০২৫; বাংলা, ৪ মে ২০২৫), বাংলাপিডিয়া




মন্তব্য
(০)