কৃষকের খামার থেকে ভোক্তার টেবিল পর্যন্ত খাদ্যপণ্যের দাম ঠিক কোন স্তরে কতটা বাড়ে, তা শনাক্ত করতে সরকার অনেকগুলো পণ্যে ট্রেসেবিলিটি (পণ্য অনুসরণ) ব্যবস্থা চালু করতে যাচ্ছে বলে জানিয়েছিলেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। ২০২৬ সালের ৩০ জুলাই, বৃহস্পতিবার, রাজধানীর মহাখালীর ব্র্যাক সেন্টার ইনে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) আয়োজিত ‘খাদ্যের মূল্যশৃঙ্খল: বাংলাদেশের বাজারব্যবস্থা, মুনাফা ও মধ্যস্বত্বভোগী’ শীর্ষক সংলাপে তিনি প্রধান অতিথি হিসেবে এ কথা বলেন।
মন্ত্রীর ভাষ্য অনুযায়ী, এই ব্যবস্থায় উৎপাদন, পরিবহন, সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণের প্রতিটি ধাপে দাম বাড়ার কারণ চিহ্নিত করে অপ্রয়োজনীয় ব্যয়, পণ্য পরিবহনে চাঁদাবাজি ও বাজারের অদক্ষতা কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে। তিনি বলেন, ‘এটা যদি আমরা করে ফেলতে পারি তাহলে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত কোন জায়গায় সমস্যা হচ্ছে তা আমরা চিহ্নিত করতে পারবো।’ জাতিসংঘের খাদ্য মান সংস্থা কোডেক্স অ্যালিমেন্টারিয়াস কমিশনের ২০০৬ সালের নির্দেশিকায় ট্রেসেবিলিটিকে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বিতরণের নির্দিষ্ট ধাপগুলোর মধ্য দিয়ে একটি খাদ্যের চলাচল অনুসরণ করার সক্ষমতা হিসেবে।
লজিস্টিক ব্যয় ও মূল্যস্ফীতি নিয়ে মন্ত্রীর বক্তব্য
বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, দীর্ঘদিন ধরে খাদ্য মূল্যস্ফীতি বেশি থাকার অন্যতম কারণ দেশের উচ্চ লজিস্টিক ব্যয়। তাঁর হিসাবে, বিশ্বে লজিস্টিক ব্যয়ের সাধারণ মান মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ১০ শতাংশ, অথচ বাংলাদেশে তা ১৬ শতাংশ। প্রথম আলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, তিনি বলেন কোভিডের পর অন্য দেশে মূল্যস্ফীতি কমলেও বাংলাদেশে ৯ থেকে সাড়ে ৯ শতাংশ উচ্চ মূল্যস্ফীতি বিরাজ করছে। তাঁর মতে, লজিস্টিক ও উপকরণ ব্যয় কমাতে হবে।
কৃষক বাজারের সঠিক তথ্য পান না, এর উদাহরণ হিসেবে মন্ত্রী আলুর কথা বলেন: ‘দুই বছর ধরে এক কোটি টনের ওপরে আলু উৎপাদন করি। দুই বছর আগেও কৃষক টাকা পাননি। গত বছরও পাননি।’ তাঁর প্রশ্ন ছিল, উৎপাদনের এক তৃতীয়াংশ দেশের চাহিদার বাইরে থাকার পরও কৃষক কেন তৃতীয় বছরেও সমপরিমাণ আলু চাষ করছেন; তাঁর মতে, এর মানে কৃষকের কাছে সঠিক তথ্য ও বিকল্প ফসলের পরামর্শ পৌঁছাচ্ছে না।

মন্ত্রী জানান, সার ও বীজে এখনো বড় ভর্তুকি দেওয়া হয়। ‘আমরা আমেরিকা কিংবা সৌদি আরব নই। মাটির নিচে অফুরন্ত তেল-গ্যাস নেই আমাদের। কিন্তু আমাদের কৃষিজমি আছে,’ বলে তিনি খাদ্য নিরাপত্তাকে জাতীয় নিরাপত্তার বিষয় হিসেবে উল্লেখ করেন।
সিপিডির গবেষণায় খামার থেকে খুচরা পর্যন্ত দামের ব্যবধান
সংলাপে সিপিডির সিনিয়র রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট ফকরুদ্দিন আল কবির গবেষণার ফল উপস্থাপন করেন। বাংলা ট্রিবিউনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ঢাকা বিভাগের ১০টি বাজারে ৮২০ জন ব্যবসায়ীর ওপর জরিপ চালিয়ে দেশে উৎপাদিত ১০টি নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যের সরবরাহ ব্যবস্থা বিশ্লেষণ করা হয়। গবেষণায় উৎপাদক ও খুচরা বাজারের মধ্যে দামের এই ব্যবধান পাওয়া যায়:
- কাঁচা মরিচ: ১১৬ শতাংশ
- মাঝারি মানের চাল: প্রায় ১০০ শতাংশ
- পেঁয়াজ: ৮৭ শতাংশ
- মসুর ডাল: ৭৮ শতাংশ
- বেগুন: ৭২ শতাংশ
- আলু: ৫০ শতাংশ
- ডিম: ২৫ শতাংশ, মুরগির মাংস: ২২ শতাংশ, গরুর মাংস: ১৩ শতাংশ, রুই মাছ: ১০ শতাংশ
প্রথম আলো জানায়, কৃষক পর্যায়ে প্রতি কেজি পাইজাম চাল গড়ে ৩০ টাকা ৬৫ পয়সায় বিক্রি হলেও খুচরা পর্যায়ে তা বিক্রি হয় ৫৯ টাকা ৬৯ পয়সায়। গবেষণা অনুযায়ী মাঝারি মানের চালের চূড়ান্ত খুচরা দামের ৫০ দশমিক ৮ শতাংশ পান কৃষক। তবে গবেষণায় বলা হয়, শুধু মধ্যস্বত্বভোগীদের দায়ী করা উচিত নয়। সিপিডি সরবরাহ শৃঙ্খলের অপ্রয়োজনীয় ধাপ কমানো, পাইকারি বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়ানো, দাম নির্ধারণে স্বচ্ছতা এবং হিমাগার ও কোল্ড-চেইন সুবিধা বাড়ানোর সুপারিশ করে।

আলোচকদের বক্তব্য
সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন বলেন, চার বছর ধরে মূল্যস্ফীতি অর্থনীতির জন্য উদ্বেগের কারণ, আর খাদ্যের দাম বাড়া মানুষের ওপর সরাসরি চাপ তৈরি করে। গার্মেন্টস শ্রমিক সংহতির সভাপতি তাসলিমা আক্তার লিমা বলেন, খাদ্যমূল্য বাড়লে নিম্ন আয়ের মানুষের প্রকৃত মজুরি কমে যায়, তাই বাজারে কার্যকর নজরদারি জরুরি।
সাবেক সচিব সিদ্দিকুর রহমান বলেন, আগে সরকার ধান ও গমের বাজারে সক্রিয়ভাবে হস্তক্ষেপ করত, মুক্তবাজার অর্থনীতিতে সেই ভূমিকা সীমিত হয়ে গেছে এবং বিষয়টি নতুন করে মূল্যায়ন করা দরকার। এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান আবদুল মজিদ বলেন, শুধু কর কমিয়ে দাম কমানো যায় না, এজন্য সমন্বিত বাজার ব্যবস্থাপনা লাগে।
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি এ এইচ এম শফিকুজ্জামান বলেন, কৃষকরাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন এবং সরকারের প্রণোদনা প্রকৃত কৃষকের কাছে পৌঁছায় না। কৃষি অর্থনীতিবিদ এম এ সাত্তার মণ্ডল বলেন, কৃষি বাণিজ্যিক রূপ পাওয়ায় কৃষিপণ্যের বিপণন ব্যবস্থাকে আরও দক্ষ, প্রতিযোগিতামূলক ও স্বচ্ছ করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

ছবি: NahidSultan / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, প্রথম আলো, বাংলা ট্রিবিউন, কোডেক্স অ্যালিমেন্টারিয়াস কমিশন





মন্তব্য
(০)