সরাসরিবাজারদর
আটা (প্যাকেটজাত)৫৮—আদা - আমদানিকৃত১৬৭—আদা - দেশী১৫৪—আমন চাল - মাঝারি৫৬—আমন চাল - মোটা৪৮—আমন চাল - সরু৭২—আয়োডিনযুক্ত লবণ (প্যাকেটজাত)৩২—কাঁচা মরিচ২১৮—খামারের মুরগী১৬২—খাসী৯০০—চিনি (দেশী)১৩২—ছোলা - গোটা৮৫—ডিম ফার্ম - লাল৪৭—পেঁয়াজ - দেশী৬০—বোরো চাল - মাঝারি৫৫—বোরো চাল - মোটা৪৭—বোরো চাল - সরু৬৬—মাংসঃ– গরু৭২৯—মুগ ডাল১২২—রসুন - আমদানিকৃত১৯২—রসুন - দেশী১৭৩—সয়াবিন তেল১৬৩—
হালনাগাদ ১৬ অক্টোবর ২০২৬
ঢাকা২৮°পরিষ্কার আকাশআর্দ্রতা ৬২%বাতাস ৫ কিমি/ঘ

ঈদের দিন কমলাপুর হাট থেকে লোকসান আর অবিক্রীত গরু নিয়ে ফিরলেন ব্যাপারীরা

ঈদুল আজহার দিন, ২৮ মে ২০২৬, রাজধানীর কমলাপুর অস্থায়ী হাটে কুষ্টিয়া ও সিরাজগঞ্জের কয়েকজন ব্যাপারী জানান, ক্রেতা না পেয়ে তারা বেশির ভাগ গরু গ্রামে ফিরিয়ে নিচ্ছেন এবং যা বিক্রি করেছেন তা-ও কেনা দামের চেয়ে কমে।

ঈদের দিন কমলাপুর হাট থেকে লোকসান আর অবিক্রীত গরু নিয়ে ফিরলেন ব্যাপারীরা
লাইভস্টক

বছরের পর বছর লাভের আশায় পশু লালন-পালন করা অনেক ব্যাপারীর কাছে ২০২৬ সালের কোরবানির ঈদের হাট হয়ে রইল হতাশা আর লোকসানের স্মৃতি। বছরের সবচেয়ে বড় মৌসুমি ব্যবসায় লাভের আশায় তারা দূরের জেলা থেকে ঢাকায় গরু এনেছিলেন, কিন্তু ঈদের দিন বৃহস্পতিবার (২৮ মে ২০২৬) অনেককেই বিক্রি না হওয়া গরু আর লোকসানের হিসাব নিয়ে গ্রামে ফিরতে হয়েছে।

জাগো নিউজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সেদিন দুপুরে রাজধানীর কমলাপুরের অস্থায়ী পশুর হাটে গিয়ে দেখা যায়, অনেক ব্যাপারী গরু নিয়ে মুখ ভার করে দাঁড়িয়ে আছেন। ক্রেতা না পাওয়ায় এসব গরু তারা গ্রামে ফিরিয়ে নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। কয়েকজন ব্যাপারীকে বিক্রি না হওয়া গরু ট্রাকে তুলতেও দেখা যায়। প্রতিবেদনে কুষ্টিয়া ও সিরাজগঞ্জ থেকে আসা কয়েকজন ব্যাপারী নিজেদের কেনা দাম, বিক্রির দাম ও ফেরার খরচের হিসাব দেন।

কুষ্টিয়া থেকে ৩০টি গরু, বিক্রি মাত্র দুটি


কুষ্টিয়া থেকে ১০ জন মিলে ৩০টি গরু নিয়ে কমলাপুরের হাটে এসেছিলেন মো. সোহেল আলী। জাগো নিউজকে তিনি জানান, ৩০টি গরুর মধ্যে মাত্র দুটি বিক্রি করতে পেরেছেন, বাকি ২৮টি গরু গ্রামে ফিরিয়ে নিয়ে যাবেন।

সোহেল আলী বলেন, এবার তাদের অনেক লোকসান হয়েছে। সবগুলো গরু নগদ টাকা দিয়ে কিনে আনা হয়েছিল এবং ৩০টি গরু কিনতে ৫০ লাখ টাকার মতো খরচ হয়েছে। দুটি গরু তিনি ৩ লাখ টাকায় বিক্রি করেছেন। এখন বাকি গরু গ্রামে ফিরিয়ে নিয়ে আবার লালন-পালন করতে হবে।

তিনি বলেন, এ বছরের অবস্থায় তাদের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে। এমন পরিস্থিতি হয় বলে গ্রামের মানুষ বাকিতে গরু দেন না, তাই ধার-দেনা করে গরু কিনে হাটে আনতে হয়। তার হিসাবে, এই গরু ফিরিয়ে নিতে গাড়িভাড়া লাগবে ৩৩ হাজার টাকা।

কুষ্টিয়ার মিরপুর উপজেলা থেকে চারটি গরু নিয়ে আসা আরেক ব্যাপারী জানান, চারটির মধ্যে তিনি দুটি গরু বিক্রি করেছেন এবং তাতে এক লাখ টাকা লোকসান হয়েছে। বাকি দুটি গরু বিক্রি না হওয়ায় তিনি সেগুলো গ্রামে ফিরিয়ে নিচ্ছিলেন। তার ভাষ্য, যে দুটি গরু বিক্রি হয়নি, ক্রেতারা সেগুলোর দাম বলছিলেন এক লাখ টাকা করে, অথচ প্রতিটি কেনা হয়েছিল দেড় লাখ টাকায়। গরু গ্রামে নিতে তিনি ৩৩ হাজার টাকায় ট্রাক ভাড়া করেছেন। তার সঙ্গে আরও কয়েকজন ব্যাপারী একই ট্রাকে গরু নেবেন, এক ট্রাকে মোট ২২টি গরু যাবে।

‘সিন্ডিকেট’ করার অভিযোগ এক ব্যাপারীর


কুষ্টিয়া থেকে আসা মো. জামাল মন্ডল জাগো নিউজকে বলেন, তিনি ১০টি গরু নিয়ে এই হাটে এসেছিলেন। এর মধ্যে মাত্র চারটি বিক্রি হয়েছে, বাকি ছয়টি ফিরিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। তার ভাষ্য, যে গরু তাদের আড়াই লাখ টাকায় কেনা, ক্রেতারা সেটির দাম বলছিলেন এক লাখ ৮০ হাজার টাকা, কেউ কেউ এক লাখ ৬০ হাজার টাকা।

জামাল মন্ডল অভিযোগ করেন, এবার এই হাটে ‘সিন্ডিকেট’ করা হয়েছে এবং তাতে তাদের বড় ক্ষতি হয়েছে। তার অভিযোগ, হাট থেকে গরু বের করতেও দেওয়া হয়নি; আগের দিন বাজার খারাপ দেখে হাট থেকে বের হতে দিলে তিনি অন্য জায়গায় নিয়ে বিক্রি করতে পারতেন বলে মনে করেন। এই অভিযোগের বিষয়ে হাট কর্তৃপক্ষ বা ইজারাদারের কোনো বক্তব্য জাগো নিউজের প্রতিবেদনে ছিল না, আর ঈদের দিনের অন্য কোনো প্রতিবেদনেও এ নিয়ে বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

জামাল মন্ডল আরও জানান, গ্রামে ফেরার সঙ্গে সঙ্গে যাদের কাছ থেকে গরু কেনা হয়েছে তাদের টাকা দিতে হবে; টাকা না দিলে তারা ছাড়বেন না, আবার গরুও ফেরত নেবেন না। তার হিসাবে, গাড়িভাড়া ও অন্যান্য খরচ মিলিয়ে ফিরিয়ে নেওয়া গরুতেই ৩০ হাজার টাকার মতো লোকসান হবে। সব মিলিয়ে এবার ঢাকায় গরু এনে প্রায় আড়াই লাখ টাকার ক্ষতিতে পড়েছেন বলে তিনি জানান।

ঈদের নামাজের পরও বিক্রি, তবে লোকসানে


সিরাজগঞ্জের ব্যাপারী রেজাউল করিম ঈদের নামাজের পর একটি গরু বিক্রি করেন। তিনি বলেন, বিক্রি না হওয়ায় দুটি গরু ফিরিয়ে নিয়ে যাচ্ছিলেন, তখন কয়েকজন ক্রেতা এসে কোরবানির জন্য গরুটি কিনে নেন। গরুটি তিনি ৮৯ হাজার টাকায় বিক্রি করেছেন, অথচ তার কেনা পড়েছিল এক লাখ ১২ হাজার টাকা। অন্যান্য খরচ যোগ করে এই একটি গরুতেই তার ২৫ হাজার টাকা লোকসান হয়েছে বলে তিনি জানান।

রেজাউল করিম হাটে ১৪টি গরু এনেছিলেন, তার মধ্যে ১৩টি বিক্রি হয়েছে। তবে তিনি বলেন, সবগুলোই লোকসানে বিক্রি করতে হয়েছে এবং তার মোট লোকসান প্রায় ৪ লাখ টাকার মতো। সবগুলো গরু কেনা ছিল; লোকসানে বিক্রি করা ছাড়া উপায় ছিল না, তাই বাধ্য হয়ে বিক্রি করেছেন।

জাগো নিউজের সঙ্গে কথা বলা ব্যাপারীদের হাটে আনা গরুগুলো ছিল গ্রাম থেকে কেনা: সোহেল আলী জানান সব গরু নগদ টাকায় কেনা, আর রেজাউল করিম জানান তার সবগুলো গরুই কেনা। তাদের বক্তব্যে বারবার উঠে এসেছে ধার-দেনা করে কেনা, ফেরার ট্রাকভাড়া এবং গ্রামে ফিরেই পাওনা শোধের চাপ।

ঢাকার শাহজাহানপুর কোরবানির হাটে বাঁধা গরু, ২৬ মে ২০২৬। ছবি: S.M.M.Musabbir Uddin / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
ঢাকার শাহজাহানপুর কোরবানির হাটে বাঁধা গরু, ২৬ মে ২০২৬। ছবি: S.M.M.Musabbir Uddin / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)

আগের রাতেই কমলাপুরে নেমেছিল দাম


ঈদের আগের রাতেই কমলাপুরের হাটের ছবি বদলে যেতে শুরু করে। বাংলা ট্রিবিউন ২৭ মে রাতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানায়, সেদিন রাত ১০টা পর্যন্ত হাট ঘুরে দেখা গেছে, হাটজুড়ে গরু আর বিক্রেতা থাকলেও প্রত্যাশিত ক্রেতা নেই। প্রতিবেদন অনুযায়ী, যে গরুর দাম মঙ্গলবারও (২৬ মে) দুই লাখ টাকা বলা হয়েছিল, বুধবার সেই গরুর দাম নেমে আসে এক লাখ ৩০ হাজার টাকায়। কোথাও কোথাও তিন লাখ টাকার গরুর দাম বলা হচ্ছিল এক লাখ ৭০ হাজার থেকে দুই লাখ টাকা।

একই প্রতিবেদনে চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গা থেকে ৮০টি গরু নিয়ে আসা এক ব্যবসায়ী বলেন, যে গরুর কেনা দামই দুই লাখ টাকা, সেটির দাম মানুষ বলছে এক লাখ ৩০ হাজার থেকে দেড় লাখ টাকা; এই দামে বিক্রি করলে প্রতিটি গরুতে অন্তত ২০ থেকে ৩০ হাজার টাকা লোকসান হবে। তিনি জানান, গরুগুলো ট্রাকে দীর্ঘ পথ দাঁড়িয়ে এসেছে, তারপর বৃষ্টির মধ্যে হাটে থেকেছে; অনেক গরু অসুস্থ হয়েছে, কয়েকটির জ্বরও এসেছে। ঝিনাইদহ থেকে আসা আরেক ব্যবসায়ী জানান, তার ১০টি গরুর সবই অবিক্রীত ছিল।

বাংলা ট্রিবিউনের প্রতিবেদক হাট ঘুরে দেখেন, ছোট, মাঝারি ও বড় সব ধরনের গরুই অবিক্রীত ছিল, তবে বড় গরুর বাজারেই ধস সবচেয়ে বেশি। ব্যবসায়ীদের কয়েকজন অভিযোগ করেন, শেষ মুহূর্তের বৃষ্টিতে ক্রেতার উপস্থিতি কমে গেছে। প্রতিবেদনে উদ্ধৃত বিশ্লেষকদের মতে, এ বছর বড় গরুর চেয়ে ছোট ও মাঝারি গরুর চাহিদা বেশি ছিল; উচ্চ মূল্যস্ফীতি, মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়া ও অর্থনৈতিক চাপে বড় গরুর ক্রেতা কমেছে, আর টানা বৃষ্টিতে শেষ সময়ের বেচাকেনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

ঈদের চার দিন আগে, রোববার (২৪ মে) দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড (টিবিএস) তেজগাঁও, কমলাপুর, পোস্তগোলা ও ভাটারাসহ কয়েকটি হাট ঘুরে জানিয়েছিল, তীব্র গরমে হাটে ক্রেতা কম আসছেন এবং অনেকে দরদাম করেই ফিরে যাচ্ছেন। কমলাপুর হাটের ব্যবসায়ী আবু বকর টিবিএসকে বলেছিলেন, গরম এত বেশি যে গরুগুলো ঠিকমতো দাঁড়িয়ে থাকতে পারছে না, বারবার পানি দিতে হচ্ছে।

ঈদের সকালে গাবতলীতেও একই চিত্র


কমলাপুরের এই চিত্র একক ছিল না। যুগান্তর ২৮ মে দুপুরে প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানায়, রাজধানীর গাবতলী পশুর হাটে শেষ মুহূর্তে ক্রেতা কম থাকা এবং সরবরাহ বেশি হওয়ায় গরুর দামে বড় ধস নামে। সেদিন সকাল সাড়ে ৯টা থেকে সাড়ে ১২টা পর্যন্ত হাটে দেখা যায়, বিক্রেতারা একের পর এক ট্রাকে অবিক্রীত গরু তুলছেন, কেউ কেউ পরিবহন না পেয়ে ট্রাক খুঁজছেন।

যুগান্তরের প্রতিবেদনে মানিকগঞ্জ থেকে আসা এক ব্যবসায়ী জানান, তিনি ৫০টি গরু এনে মাত্র ১৮টি বিক্রি করতে পেরেছেন। আরেক ব্যবসায়ী জানান, ৪০টি গরুর মধ্যে ২০টি বিক্রি হয়নি এবং ঈদের দুই দিন আগে যে গরুর দাম ৩ লাখ ৮০ হাজার টাকা বলা হয়েছিল, সেটি শেষ পর্যন্ত ২ লাখ ৭০ হাজার টাকায় বিক্রি করতে হয়েছে। খামারি ও ব্যাপারীদের ভাষ্য, কয়েক দিনের বৃষ্টি ও কাদায় হাটে রাখা পশুর অসুস্থ হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছিল, তাই অনেকে বড় লোকসান মেনেই বিক্রি করেছেন। ব্যাপারীদের দাবি অনুযায়ী, বুধবার ভোর থেকেই দাম কমতে শুরু করে। ক্রেতাদের অনেকে অবশ্য জানান, দাম কমায় তারা স্বস্তি পেয়েছেন।

সরকারি হিসাবে ২২ লাখের বেশি পশু উদ্বৃত্ত


এবারের বাজারের পেছনে ছিল সরবরাহের বড় উদ্বৃত্ত। ৩ মে ২০২৬ মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ে এক ব্রিফিংয়ে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ এবং কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ জানান, এ বছর কোরবানির জন্য পশুর সম্ভাব্য চাহিদা নির্ধারণ করা হয়েছে ১ কোটি ১ লাখ ৬ হাজার ৩৩৪টি, আর দেশে প্রাপ্যতা রয়েছে ১ কোটি ২৩ লাখ ৩৩ হাজার ৮৪০টি পশু। সেই হিসাবে প্রায় ২২ লাখ ২৭ হাজার ৫০৬টি পশু উদ্বৃত্ত থাকবে বলে তিনি জানান।

মন্ত্রীর দেওয়া তথ্যে কোরবানিযোগ্য পশুর মধ্যে গরু-মহিষ ৫৬ লাখ ৯৫ হাজার ৮৭৮টি, ছাগল-ভেড়া ৬৬ লাখ ৩২ হাজার ৩০৭টি এবং অন্যান্য প্রজাতির প্রাণী ৫ হাজার ৬৫৫টি। সারা দেশে ৩ হাজার ৬০০টির বেশি পশুর হাট বসবে এবং ঢাকায় উত্তর সিটি করপোরেশনে ১৬টি ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে ১১টি মিলিয়ে মোট ২৭টি হাট নির্ধারণ করা হয়েছে বলেও জানানো হয়। এসব হাটে ২০টি ভেটেরিনারি মেডিকেল টিম দায়িত্ব পালনের কথা ছিল।

অঞ্চলভেদে সরবরাহে ছিল বড় পার্থক্য। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্য উদ্ধৃত করে বাংলা ট্রিবিউন ১৯ মে জানায়, রাজশাহী বিভাগের আট জেলায় প্রায় ৪৩ লাখ পশু প্রস্তুত, যেখানে স্থানীয় চাহিদা ২৪ লাখ। অন্যদিকে ঢাকা বিভাগে চাহিদা প্রায় ২১ লাখ ৫৮ হাজার ৮৬৯টি হলেও প্রস্তুত ছিল ১৪ লাখ ৪৩ হাজার ৯৪২টি পশু; ঘাটতি অন্য বিভাগ থেকে পূরণ করার কথা। অর্থাৎ ঢাকার হাটের বড় অংশ পশু আসে উত্তর ও পশ্চিমাঞ্চলের জেলাগুলো থেকে, আর সেই পশু নিয়েই আসেন কুষ্টিয়া, সিরাজগঞ্জ, পাবনা ও আশপাশের ব্যাপারীরা।

উদ্বৃত্ত নতুন নয়। বাংলা ট্রিবিউনের ২২ মে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৩ সালে দেশে প্রায় ১ কোটি ২৫ লাখ পশু উৎপাদিত হলেও কোরবানি হয়েছিল প্রায় ১ কোটি; ২০২৪ সালে উৎপাদন ছিল ১ কোটি ২১ লাখ, কোরবানি প্রায় ৯৫ লাখ; আর ২০২৫ সালে ১ কোটি ২৪ লাখ পশুর বিপরীতে কোরবানি হয়েছিল প্রায় ৯০ লাখ। প্রথম আলো ২০২৫ সালের ১০ জুন মন্ত্রণালয়ের বিজ্ঞপ্তি উদ্ধৃত করে জানিয়েছিল, সে বছর ঈদুল আজহায় ৯১ লাখ ৩৬ হাজার ৭৩৪টি পশু কোরবানি হয় এবং ৩৩ লাখ ১০ হাজার ৬০৩টি পশু অবিক্রীত থাকে। তখন প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর বলেছিল, উৎপাদন বেশি হওয়ায় পশু অবিক্রীত থাকা অস্বাভাবিক নয়।

বাংলাদেশে ঈদুল আজহার আগে একটি পশুর হাট, জুন ২০২৪। ছবি: Wasiul Bahar / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
বাংলাদেশে ঈদুল আজহার আগে একটি পশুর হাট, জুন ২০২৪। ছবি: Wasiul Bahar / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)

দাম, খরচ আর আবহাওয়া: ঈদের আগের সপ্তাহের হাট


হাট জমে ওঠার আগেই দাম ও খরচ নিয়ে দুশ্চিন্তার কথা শোনা যাচ্ছিল। টিবিএসের ২৫ মে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, ঢাকার হাটে দুই থেকে আড়াই মণ মাংস হবে এমন গরুর দাম হাঁকা হচ্ছিল ১ লাখ ২০ হাজার থেকে ১ লাখ ৩০ হাজার টাকা; আড়াই থেকে চার মণের গরু দেড় লাখ থেকে দুই লাখ টাকা; চার থেকে ছয় মণের গরু ২ লাখ ২০ হাজার থেকে ২ লাখ ৮০ হাজার টাকা; আর ছয় মণের বেশি ওজনের গরুর দাম তিন লাখ টাকার বেশি চাইছিলেন ব্যবসায়ীরা। খামারিদের দাবি ছিল, ভুসি, খৈল ও খড়সহ গোখাদ্যের দাম বাড়ায় গত বছরের চেয়ে পশুর দাম বেড়েছে।

বাংলা ট্রিবিউনের ২২ মে প্রকাশিত প্রতিবেদনে এক খামারি জানান, তেলের দাম বাড়ায় পরিবহন ব্যয় অনেক বেড়েছে, অথচ পশুর দাম গত বছরের কাছাকাছি। একই প্রতিবেদনে বাংলাদেশ ডেইরি ফার্মার্স অ্যাসোসিয়েশনের সিনিয়র সহসভাপতি নিলয় হোসেনের বরাতে বলা হয়, এবার বড় গরুর চাহিদা কমে গেছে এবং খাদ্য ও পরিবহন ব্যয় বাড়ায় বড় খামারিরা বেশি ঝুঁকিতে পড়েছেন। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের উপপরিচালক (খামার) মো. শরিফুল হক তখন বলেন, এ বছরও পশুর কোনো সংকট নেই। প্রতিবেদনে সংশ্লিষ্টদের সতর্কবার্তাও ছিল: শুধু উৎপাদন বাড়লেই হবে না, বাজার ব্যবস্থাপনাও শক্তিশালী করতে হবে, নইলে উদ্বৃত্ত পশুর চাপ খামারিদের লোকসানের কারণ হতে পারে।

আবহাওয়াও হাটের হিসাব বদলে দেয়। ২৪ মে ঢাকার হাটে ছিল তীব্র গরম; পশুকে ঠান্ডা রাখতে পাইপে পানি ঢালা হচ্ছিল, কেউ তালপাখায় বাতাস করছিলেন বলে টিবিএস জানায়। এরপর টানা বৃষ্টি নামে। দৈনিক ইনকিলাব ২৭ মে জানায়, টানা তিন দিনের ভারী বৃষ্টি, কাদা আর জলজট পেরিয়ে শেষ মুহূর্তে হাট জমে উঠলেও কুষ্টিয়া ও উত্তরবঙ্গসহ নানা অঞ্চল থেকে আসা অনেক বেপারি লোকসান এড়াতে নামমাত্র লাভে গরু ছেড়ে দিচ্ছিলেন। প্রতিবেদনে বলা হয়, ৮০ হাজার থেকে ২ লাখ টাকার ছোট ও মাঝারি বলদ ও ষাঁড়ের চাহিদাই সবচেয়ে বেশি ছিল।

বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস) ২৫ মে জানায়, ঈদের ছুটি শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে রাজধানীর হাটে ক্রেতা-বিক্রেতার উপস্থিতি বাড়ে, আর কুষ্টিয়া, পাবনা, সিরাজগঞ্জ, নাটোর, কুমিল্লা, নওগাঁ ও রাজবাড়ীসহ বিভিন্ন এলাকার খামারিরা তাদের পশু নিয়ে ঢাকায় আসেন। বাসসের পর্যবেক্ষণেও দেশি মাঝারি আকারের গরুর চাহিদা ছিল সবচেয়ে বেশি, আর বড় গরুর দাম তখনো চড়া বলে ক্রেতারা জানিয়েছিলেন।

কুষ্টিয়া ও সিরাজগঞ্জ: যেখান থেকে আসে ঢাকার কোরবানির গরু


কমলাপুরের হাটে যাদের কথা উঠে এসেছে, তাদের বেশির ভাগ কুষ্টিয়ার। কুষ্টিয়া খুলনা বিভাগের একটি জেলা, যার উত্তর দিক দিয়ে বয়ে গেছে পদ্মা নদী। জেলাটির আয়তন ১,৬০৮.৮০ বর্গকিলোমিটার, উপজেলা ছয়টি; মিরপুর তার একটি। ২০২২ সালের জনশুমারি অনুযায়ী জেলার জনসংখ্যা ২১ লাখ ৪৯ হাজার ৬৯২। জেলাটি মূলত কৃষিনির্ভর।

গবাদিপশুর জন্যও কুষ্টিয়া পরিচিত। ২০২৫ সালের কোরবানির আগে জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. আল-মামুন হোসেন মন্ডল খবর সংযোগকে জানিয়েছিলেন, জেলার ১৮ হাজার খামারে কোরবানির জন্য ২ লাখ গবাদিপশু প্রস্তুত করা হয়েছে, আর জেলার এক লাখ পশুর চাহিদা মিটিয়ে বাকি পশু দেশের বিভিন্ন হাটে বিক্রি হচ্ছে। একই প্রতিবেদনে খামারিরা বলেছিলেন, ভুসি, খুদ ও কুঁড়ার দাম বাড়ায় পালনের খরচ বেড়েছে, কিন্তু সে তুলনায় দাম মিলছে না।

সিরাজগঞ্জ রাজশাহী বিভাগের জেলা, যমুনা নদীর অববাহিকায় অবস্থিত এবং উত্তরবঙ্গের প্রবেশদ্বার হিসেবে পরিচিত। জেলার আয়তন প্রায় ২,৪৯৭.৯২ বর্গকিলোমিটার। বাংলা ট্রিবিউনের ১৯ মে প্রকাশিত প্রতিবেদনে সিরাজগঞ্জ জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. এ কে এম আনোয়ারুল হক জানান, চলতি বছর জেলায় ৬ লাখ ১৭ হাজার পশু কোরবানির জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে। একই প্রতিবেদনে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্য উল্লেখ করে বলা হয়, জেলায় চাহিদা ২ লাখ ৯৩ হাজার ৬৭৬টি।

রাজশাহী বিভাগে সবচেয়ে বেশি পশু উদ্বৃত্ত থাকার কথা জানিয়ে বিভাগীয় প্রাণিসম্পদ দপ্তরের উপপরিচালক ডা. অন্তিম কুমার সরকার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেছিলেন, আট জেলায় ২৪ লাখ পশুর চাহিদার বিপরীতে ৪৩ লাখ পশু প্রস্তুত করা হয়েছে, বাকি ১৮ লাখ দেশের অন্যান্য জেলায় পাঠানো হবে। বাংলা ট্রিবিউনের ২২ মে প্রকাশিত প্রতিবেদনেও বলা হয়, উত্তরাঞ্চলে বড় উদ্বৃত্ত থাকায় রাজধানীর বাজারে কোরবানির পশুর বড় অংশ উত্তরাঞ্চল থেকেই আসবে।

কুষ্টিয়া জেলায় নদী পার হচ্ছে গবাদিপশু, জানুয়ারি ২০১৪। ছবি: Enamur Reza / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY 2.0)
কুষ্টিয়া জেলায় নদী পার হচ্ছে গবাদিপশু, জানুয়ারি ২০১৪। ছবি: Enamur Reza / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY 2.0)

ঢাকার হাট ব্যবস্থাপনা ও কমলাপুর


কমলাপুর ঢাকার কেন্দ্রীয় রেলস্টেশনের এলাকা। এখানকার কমলাপুর রেলস্টেশন, যার আনুষ্ঠানিক নাম ঢাকা রেলওয়ে স্টেশন, দেশের সবচেয়ে বড় রেলস্টেশন; এটি চালু হয় ১৯৬৮ সালের ১ মে। ২০২৬ সালের কোরবানির মৌসুমে এখানে বসা অস্থায়ী পশুর হাট থেকে টিবিএস, বাংলা ট্রিবিউন ও জাগো নিউজ প্রতিবেদন করে।

টিবিএস ২১ মে জানায়, ঈদ ২৮ মে ধরে রাজধানীর হাটগুলোতে প্রস্তুতি চলছে এবং দুই সিটি করপোরেশন জানিয়েছে, এবার পাঁচ দিনব্যাপী হাটে কেনাবেচা চলবে। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আব্দুস সালাম তখন বলেন, যত্রতত্র বা সড়কের ওপর কোনো পশুর হাট বসতে দেওয়া হবে না এবং নিয়মের বাইরে কাউকে হাটের ইজারা দেওয়া হয়নি। তিনি আরও বলেন, প্রতিটি হাটে কোরবানির বর্জ্যের জন্য বিশেষ ব্যবস্থাপনা রাখা হয়েছে।

৩ মের ব্রিফিংয়ে মন্ত্রী জানিয়েছিলেন, পশুবাহী ট্রাকে চাঁদাবাজি বন্ধে সরকার কঠোর অবস্থানে থাকবে এবং হাট ও ক্রেতা-বিক্রেতার নিরাপত্তায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী সার্বক্ষণিক তৎপর থাকবে। দেশীয় খামারিদের স্বার্থে সীমান্তবর্তী এলাকায় পশুর হাট না বসানোর নীতিগত সিদ্ধান্তের কথাও তিনি জানান। এ ছাড়া অনলাইনে পশু কেনার ক্ষেত্রে কোনো খাজনা বা হাসিল নেওয়া হবে না বলে জানানো হয়।

নগদ লেনদেনের ঝুঁকি কমাতে বাংলাদেশ ব্যাংক ২৪ মে এক সার্কুলারে ঢাকার দুই সিটিসহ কয়েকটি সিটি করপোরেশনের অনুমোদিত হাটের নিকটস্থ নির্ধারিত ব্যাংক শাখা ও উপশাখা ২৪ মে থেকে ঈদের আগের দিন পর্যন্ত প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত খোলা রাখার নির্দেশ দেয়। হাটের ভেতরে বা কাছে অস্থায়ী বুথ বসিয়ে টাকা জমা, উত্তোলন ও নতুন হিসাব খোলার সেবা দিতেও ব্যাংকগুলোকে বলা হয়। ব্যাপারীদের বড় অংশ যে নগদ টাকায় পশু কেনাবেচা করেন, কমলাপুরের সোহেল আলীর বক্তব্যেও তা উঠে এসেছে।

ঈদুল আজহা ইসলামের দুটি প্রধান উৎসবের একটি, যা পালিত হয় হিজরি বছরের শেষ মাস জিলহজের ১০ তারিখে। ঈদের নামাজের পর পশু কোরবানি করা হয়; এটি নবী ইব্রাহিম (আ.)-এর আল্লাহর আদেশ পালনে আত্মত্যাগের প্রস্তুতির স্মরণে। বাংলাদেশে মুসলিম পরিবারগুলোর এই কোরবানি ঘিরেই গড়ে ওঠে বছরের সবচেয়ে বড় পশু বাণিজ্য, আর ঈদের দিন সকাল পর্যন্ত হাটে থাকা ব্যাপারীদের ভাগ্য নির্ভর করে শেষ কয়েক ঘণ্টার বেচাকেনার ওপর।

ঢাকার কমলাপুর রেলস্টেশন, মে ২০১৫। ছবি: Masum Ibn Musa / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
ঢাকার কমলাপুর রেলস্টেশন, মে ২০১৫। ছবি: Masum Ibn Musa / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)

ছবি: Wasiul Bahar / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)

সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, বাংলা ট্রিবিউন, দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড বাংলা, যুগান্তর, দৈনিক ইনকিলাব, বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস), প্রথম আলো, খবর সংযোগ, উইকিপিডিয়া

অনলাইন ডেস্কদা এগ্রো নিউজ

লাইভস্টক

সম্পর্কিত খবর

লাইভস্টক

সৌরপ্যানেলের নিচে ভেড়া চরালে বাড়ে মৌমাছি, তবে সংখ্যা রাখতে হবে কম

কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণায় দেখা গেছে, সৌরখামারে হেক্টরপ্রতি দুটি ভেড়া চরালে ঘাস কাটার তুলনায় উপকারী পোকা ৩৮ শতাংশ বাড়ে। খামারিদের জন্য ভেড়ার পাল পরিকল্পনার একটি সহায়ক টুলও তৈরি করেছেন গবেষকেরা।

Farms.com১৬ অক্টোবর ২০২৬২ মিনিটের পড়া
লাইভস্টক

প্রোটিনের চাহিদায় বদলে গেল কানাডার দুধের বাজার, মাখনের উদ্বৃত্ত শেষ

দুগ্ধজাত প্রোটিনের চাহিদা বাড়ায় পাঁচ বছরের মধ্যে কানাডার দুধের বাজারে মাখনচর্বির কাঠামোগত উদ্বৃত্ত মিটে গেছে, দুধের দাম নির্ধারণেও এসেছে পরিবর্তন।

Manitoba Co-operator১৬ অক্টোবর ২০২৬১ মিনিটের পড়া
লাইভস্টক

সিকি হেক্টরে ওটের বীজ চাষ, ইথিওপিয়ার এক কৃষকের পারিবারিক ব্যবসা

ইথিওপিয়ার এক ক্ষুদ্র কৃষক মাত্র শূন্য দশমিক ২৫ হেক্টর জমিতে বীজের জন্য ওট চাষ করে প্রথম ফসল ৪৫ হাজার বির্রে বিক্রি করেন এবং পরের বছর চাষ বাড়ান। আইএলআরআইয়ের পশুখাদ্যের বীজকে ব্যবসায় রূপ দেওয়ার উদ্যোগের অংশ এটি।

ILRI১৬ অক্টোবর ২০২৬২ মিনিটের পড়া

মন্তব্য

(০)