সরাসরিবাজারদর
আটা (প্যাকেটজাত)৫৮—আদা - আমদানিকৃত১৬৭—আদা - দেশী১৫৪—আমন চাল - মাঝারি৫৬—আমন চাল - মোটা৪৮—আমন চাল - সরু৭২—আয়োডিনযুক্ত লবণ (প্যাকেটজাত)৩২—কাঁচা মরিচ২১৮—খামারের মুরগী১৬২—খাসী৯০০—চিনি (দেশী)১৩২—ছোলা - গোটা৮৫—ডিম ফার্ম - লাল৪৭—পেঁয়াজ - দেশী৬০—বোরো চাল - মাঝারি৫৫—বোরো চাল - মোটা৪৭—বোরো চাল - সরু৬৬—মাংসঃ– গরু৭২৯—মুগ ডাল১২২—রসুন - আমদানিকৃত১৯২—রসুন - দেশী১৭৩—সয়াবিন তেল১৬৩—
হালনাগাদ ১৬ অক্টোবর ২০২৬
ঢাকা২৬°পরিষ্কার আকাশআর্দ্রতা ৭৪%বাতাস ৩ কিমি/ঘ

চাঁপাইনবাবগঞ্জে সেচ পাম্প ও ট্রান্সফর্মার চুরি, হুমকিতে ২০০ বিঘার বোরো ধান

চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদরের নন্দনপুর পশ্চিম মাঠে তিন মাসে অন্তত অর্ধ শতাধিক সেচ পাম্প ও ট্রান্সফর্মার চুরি হয়েছে বলে কৃষকেরা ২০২৬ সালের এপ্রিলের শুরুতে জানান। ডিজেল সংকটের মধ্যে সেচ ব্যাহত হওয়ায় প্রায় ২০০ বিঘা জমির বোরো ধান নিয়ে শঙ্কায় তাঁরা; পুলিশ বলছে, থানায় কেউ অভিযোগ দেননি।

চাঁপাইনবাবগঞ্জে সেচ পাম্প ও ট্রান্সফর্মার চুরি, হুমকিতে ২০০ বিঘার বোরো ধান
ফসল

চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার শাজাহানপুর ইউনিয়নের নন্দনপুর পশ্চিম মাঠের কৃষকেরা ২০২৬ সালের এপ্রিলের শুরুতে জানান, রাতের আঁধারে একটি সংঘবদ্ধ চোর চক্র তাঁদের জমি থেকে একের পর এক ট্রান্সফর্মার খুলে নিচ্ছে, তুলে নিচ্ছে সেচ পাম্প। ২০২৬ সালের ৫ এপ্রিল প্রকাশিত জাগো নিউজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, আগের তিন মাসে শুধু ওই মাঠ থেকেই অন্তত অর্ধ শতাধিক পাম্প ও ট্রান্সফর্মার চুরি হয়েছে, আর ৩০ মার্চ এক রাতেই চুরি হয়েছে ১০টি মোটর। চুরির এই ঘটনাগুলো ঘটেছে বোরো মৌসুমের মাঝামাঝি, যখন ধানক্ষেতে নিয়মিত পানি দিতে হয়। কৃষকদের দাবি, পাম্প চুরি বন্ধ না হলে প্রায় ২০০ বিঘা জমির ধান শুকিয়ে নষ্ট হয়ে যাবে।

কৃষকেরা তখন এমনিতেই ডিজেল সংকট আর কৃষি উপকরণের বাড়তি দামের চাপে ছিলেন। স্থানীয়দের অভিযোগ, বারবার চুরির ঘটনা ঘটলেও পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেই, এমনকি পল্লী বিদ্যুৎ ও থানায় অভিযোগ দিয়েও কোনো প্রতিকার মেলেনি। জেলার একজন জ্যেষ্ঠ পুলিশ কর্মকর্তা অবশ্য এই অভিযোগ অস্বীকার করেন। তাঁর ভাষ্য, থানায় কেউ অভিযোগ দায়ের করেননি, আর যেসব অভিযোগ পাওয়া গেছে সেগুলোর ভিত্তিতে মালামাল উদ্ধার করা হয়েছে।

কৃষকেরা যা জানিয়েছেন


শাজাহানপুর ইউনিয়নের কৃষক লতিফুর হামমান জাগো নিউজকে বলেন, আগের এক বছরে তাঁর অন্তত পাঁচটি মোটর ও একটি ট্রান্সফর্মার চুরি হয়েছে। তাঁর কথায়, "বার বার কত টাকা দিয়ে কেনা যায়। এদিকে দেখা দিয়েছে জ্বালানি সংকট। পাচ্ছি না তেল। ডিজেল সংকটও রয়েছে।"

হাকিম এলাকার কৃষক জাহাঙ্গীর আলম জানান, কথা বলার দুই দিন আগে তাঁর নিজের মোটর চুরি হয়েছে। তিনি আরও জানান, চার দিনের ব্যবধানে খলিল, নাসির, মতিউর রহমান, মতিন ও রশিদের একটি করে এবং মফিজ আলীর তিনটি মোটর চুরি হয়েছে।

কৃষকেরা জানান, একদিকে ডিজেল সংকট, অন্যদিকে কৃষি উপকরণের দাম বৃদ্ধির কারণে ফসল ফলাতে তাঁদের অতিরিক্ত টাকা খরচ করতে হচ্ছে। এর পরও ফসলের ন্যায্য দাম পাওয়া নিয়ে ঝুঁকি থেকেই যাচ্ছে। এসবের মধ্যে পানির মোটর ও ট্রান্সফর্মার চুরি তাঁদের মধ্যে নতুন আতঙ্ক যোগ করেছে।

এর এক দিন আগে, ২০২৬ সালের ৪ এপ্রিল, অনলাইন সংবাদমাধ্যম বাংলা স্ট্রিম একই মাঠ নিয়ে আলাদা প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এর প্রতিবেদক লেখেন, প্রায় প্রতিদিনই পাম্পঘরের তালা কেটে চুরি হচ্ছে, আর রাতে পাহারা দিয়েও চোর চক্রকে থামানো যাচ্ছে না। কৃষকেরা বাংলা স্ট্রিমকে জানান, ধারদেনা করে, এমনকি এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে তাঁরা নতুন যন্ত্র কিনে আবার সেচ চালু করছেন, আর কেউ কেউ ভবিষ্যতে বিকল্প ফসল চাষের কথা ভাবছেন। বাংলা স্ট্রিমের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, কৃষকদের অভিযোগ, ট্রান্সফর্মার চুরির সঙ্গে পল্লী বিদ্যুতের কর্মীদের হাত রয়েছে, এবং চোর চক্রকে ধরিয়ে দিতে কৃষকেরা লাখ টাকা পুরস্কার ঘোষণা করেছেন। এই অভিযোগ কৃষকদের নিজেদের; কোনো প্রতিবেদনেই এর সত্যতা প্রমাণের কোনো তথ্য ছিল না। বাংলা স্ট্রিমে চুরির সংখ্যা জাগো নিউজের চেয়ে বেশি বলা হয়েছিল; এই প্রতিবেদনে জাগো নিউজের হিসাবই রাখা হয়েছে।

কর্মকর্তারা যা বলেছেন


চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সুনাইন বিন জামান বলেন, চরাঞ্চলে ফসলে অতিরিক্ত সেচ দিতে হয়, সময়মতো সেচ না পেলে ফসল ফলানো যাবে না। চুরির বিষয়টি জেনে তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেন এবং বিকল্প সেচব্যবস্থা হিসেবে আগামীতে সোলার প্যানেল বা পাতকুয়া যুক্ত করার কথা জানান।

এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহকারী গ্রাহক সমবায় চাঁপাইনবাবগঞ্জ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির জেনারেল ম্যানেজার হাওলাদার মো. ফজলুর রহমান বলেন, চুরি প্রতিরোধে কৃষক ও স্থানীয়দের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে নিয়মিত সভা ও প্রচারণা চালানো হচ্ছে। নিজ দপ্তরের কেউ জড়িত থাকলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার এএনএম ওয়াসিম ফিরোজ কৃষকদের অভিযোগ অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, থানায় কেউ অভিযোগ দায়ের করেননি; যাঁদের অভিযোগ পাওয়া গেছে, তাঁদের নিয়ে পুলিশ কাজ করেছে এবং মোটরসহ অনেক মালামাল উদ্ধার করেছে। বাংলা স্ট্রিমের প্রতিবেদন অনুযায়ী তিনি আরও বলেন, অভিযোগ পেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

একই সময়ে ডিজেল সংকট


নন্দনপুরের চুরির ঘটনাগুলো ঘটেছে দেশজুড়ে জ্বালানি সংকটের মধ্যে। বিবিসি বাংলা ২০২৬ সালের ৪ এপ্রিল জানায়, ইরান যুদ্ধের জের ধরে তৈরি হওয়া জ্বালানি সংকটের প্রভাব বাংলাদেশেও পড়তে শুরু করেছে; শহরের রাইড শেয়ারিং থেকে শুরু করে গ্রামের ক্ষেতখামার ও পণ্য পরিবহন পর্যন্ত এর প্রভাব দেখা যাচ্ছে। বোরো ধানে সেচ জরুরি হলেও অনেক জায়গায় সেচ পাম্পের জন্য ডিজেল মিলছিল না। সরকার তখন বলছিল, ডিজেল সংকটের কোনো আশঙ্কা নেই; ৩ ও ৪ এপ্রিল প্রায় ৬১ হাজার টন ডিজেল চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছেছে, আর জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের মুখপাত্র বলেন, এপ্রিলে জ্বালানির কোনো সংকট হবে না। পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার অফিসের সময় কমিয়ে সকাল নয়টা থেকে বিকেল চারটা পর্যন্ত করে এবং জ্বালানি, বিদ্যুৎ ও গ্যাস খাতে সরকারি ব্যয় ৩০ শতাংশ কমানোর সিদ্ধান্ত নেয়। বিবিসির সঙ্গে কথা বলা গবেষকেরা বলেন, সাম্প্রতিক বৃষ্টিতে কৃষকেরা কিছুটা স্বস্তি পেয়েছেন, তবে সামনে পানির চাহিদা আরও বাড়লে সংকট তীব্র হতে পারে।

দ্য ডেইলি স্টার বাংলা ২০২৬ সালের ২৯ মার্চ কয়েকটি জেলা থেকে প্রতিবেদন প্রকাশ করে। গোপালগঞ্জের এক কৃষক জানান, তাঁকে প্রতি লিটার ডিজেল ১৫০ টাকায় কিনতে হচ্ছে, ধানক্ষেতে পানি দিতে পারছেন না, পাটও বুনতে পারছেন না। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) জেলা কার্যালয়ের তথ্যমতে, সেই মৌসুমে গোপালগঞ্জে ৮২ হাজার ৫৯৩ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছিল, যার ২৫ হাজার ৬৫৪ হেক্টরে সেচ দেওয়া হচ্ছিল ডিজেলচালিত যন্ত্রে। বরিশালে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) কর্মকর্তা জানান, বিদ্যুৎচালিত সেচব্যবস্থা স্বাভাবিকভাবে চললেও ডিজেলচালিত পাম্পগুলো সমস্যায় পড়েছে: ৭০টি পাম্পের প্রতিটিতে প্রায় ১২ লিটার ডিজেল দরকার হলেও মিলছিল মাত্র প্রায় ২ লিটার।

অন্তত বরিশালে বিদ্যুৎচালিত পাম্প সচল ছিল, ডিজেলচালিত পাম্প ধুঁকছিল। নন্দনপুরের প্রতিবেদনগুলোতে যে মাঠের কথা বলা হয়েছে, সেখানে সেচ চলে ট্রান্সফর্মারের মাধ্যমে বিদ্যুৎ পাওয়া মোটরে, আর কৃষকদের অভিযোগ, ঠিক এই যন্ত্রগুলোই চুরি হচ্ছিল।

রাজশাহী কৃষি অঞ্চলে সেচের চিত্র


চাঁপাইনবাবগঞ্জ ডিএইর রাজশাহী কৃষি অঞ্চলের অংশ; এই অঞ্চলে আরও আছে রাজশাহী, নাটোর ও নওগাঁ। ডিএইর তথ্য উদ্ধৃত করে প্রতিদিনের কাগজ ২০২৬ সালের ২৬ মার্চ জানায়, সেই মৌসুমে অঞ্চলটিতে প্রায় তিন লাখ ৫২ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো চাষের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল। অঞ্চলের মোট সেচনির্ভর জমির প্রায় ২১ শতাংশ ডিজেলচালিত পাম্পের ওপর নির্ভরশীল। অঞ্চলটিতে গভীর নলকূপ ছিল ১১ হাজার ৫৩৫টি, যার ৩১৫টি ডিজেলচালিত; অগভীর নলকূপ ছিল এক লাখ ১০ হাজার ৪৪৯টি, যার ৮৮ হাজার ২৬৮টি ডিজেলচালিত; আর আট হাজার ৬৪৭টি লো-লিফট পাম্পের মধ্যে সাত হাজার ৪৫৮টি চলত ডিজেলে। পাশের রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার দিয়ারমানিক চরের এক কৃষক জানান, চার দিনে ডিজেলের দাম লিটারপ্রতি ১০২ টাকা থেকে বেড়ে ১২০ টাকা হয়েছে। ডিএইর রাজশাহী বিভাগীয় কার্যালয়ের অতিরিক্ত পরিচালক তখন বলেন, ডিজেল সংকট বা বেশি দামে বিক্রির কোনো অভিযোগ তাঁদের কাছে আসেনি।

সারা দেশেই শুষ্ক মৌসুমের ফসলের মূল ভরসা ক্ষুদ্র সেচ। ২০২৪ সালের নভেম্বরে বণিক বার্তায় প্রকাশিত বিএডিসির অবসরপ্রাপ্ত সদস্য পরিচালকের (ক্ষুদ্র সেচ) এক নিবন্ধ অনুযায়ী, বিএডিসির জরিপে ২০২১-২২ সেচ মৌসুমে দেশে বিভিন্ন ধরন ও ক্ষমতার মোট ১৭ লাখ ১২ হাজার ৫১৫টি সেচযন্ত্র চালু ছিল, যার ১২ লাখ ৪৫ হাজার ৭৫৮টি ডিজেলচালিত। ডিজেলচালিত যন্ত্রের মধ্যে ছিল ৮০৪টি গভীর নলকূপ, ১০ লাখ ৬০ হাজার ৫২৫টি অগভীর নলকূপ ও ১ লাখ ৮৪ হাজার ৪২৯টি শক্তিচালিত পাম্প।

বাংলাপিডিয়ায় প্রধান সেচযন্ত্রগুলোর বর্ণনা আছে। গভীর নলকূপ সাধারণত ৬০ থেকে ৯০ মিটার গভীর হয়, এর ইঞ্জিন ২০ থেকে ৩০ অশ্বশক্তির, আর এতে টারবাইন পাম্প ব্যবহার করা হয়, যা ভূগর্ভস্থ পানির স্তর শোষণসীমার নিচে নেমে গেলেও কাজ করতে পারে। অগভীর নলকূপ সাধারণত ৩০ মিটারের কম গভীর, ইঞ্জিন ৪ থেকে ৮ অশ্বশক্তির, আর দেশের সব অঞ্চলেই এর ব্যাপক ব্যবহার হয়। লো-লিফট পাম্প নদী, খাল ও অন্যান্য ভূ-উপরিস্থ উৎস থেকে পানি তোলে।

গ্রামাঞ্চলে বিদ্যুৎ সরবরাহ করে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি, যা পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের অধীনে গঠিত গ্রাহক সমবায়। বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী, ১৯৭৭ সালের একটি সরকারি অধ্যাদেশে বোর্ড গঠিত হয় এবং ১৯৭৮ সালে কাজ শুরু করে। ২০১১ সাল নাগাদ পল্লী বিদ্যুতায়ন কর্মসূচির বিদ্যুতে চলত ২ লাখ ৪০ হাজার ৫৪২টি সেচ পাম্প, যেখানে ২০০০ সালে এই সংখ্যা ছিল ৮৬ হাজার ৭৬৬।

বোরো ধান কেন পানির জন্য অপেক্ষা করতে পারে না


বোরো বাংলাদেশের শুষ্ক মৌসুমের ধান, যার প্রায় পুরোটাই সেচনির্ভর। বণিক বার্তার ওই নিবন্ধে বিএডিসির সাবেক কর্মকর্তা লেখেন, বোরো ধানের চারা রোপণ চলে জানুয়ারির শেষ পর্যন্ত আর কাটা চলে মে মাসের মাঝামাঝি পর্যন্ত; ফলে মধ্য জানুয়ারি থেকে মধ্য এপ্রিল পর্যন্ত সেচ সবচেয়ে বেশি লাগে। নন্দনপুরের চুরির খবর যখন এল, সেই এপ্রিলের শুরু এই সর্বোচ্চ চাহিদার সময়ের শেষ ভাগ।

আন্তর্জাতিক ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ইরি) তাদের রাইস নলেজ ব্যাংকে জানিয়েছে, এশিয়ায় সেচনির্ভর ধানে সাধারণত ১ হাজার ৩০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ মিলিমিটার পানি লাগে, আর সেচনির্ভর নিচু জমির চাষে এক কেজি ধান উৎপাদনে গড়ে প্রায় ১ হাজার ৪৩২ লিটার পানি খরচ হয়। ইরির ভাষ্য, ধান পানির ঘাটতিতে অত্যন্ত সংবেদনশীল, বিশেষ করে ফুল আসার সময়: এই পর্যায়ে খরা হলে শিষের দানা চিটা হয়ে যায়, ফলে দানা কমে যায়। তাদের পরামর্শ, শিষ বের হওয়া থেকে ফুল আসা শেষ হওয়া পর্যন্ত জমিতে সব সময় প্রায় ৫ সেন্টিমিটার পানি রাখতে হবে। পানি সাশ্রয়ী পদ্ধতি পর্যায়ক্রমে ভেজানো ও শুকানো (এডব্লিউডি) মানলেও ফুল আসার এক সপ্তাহ আগে থেকে এক সপ্তাহ পর পর্যন্ত জমিতে পানি ধরে রাখার কথা বলে ইরি।

দেশের অন্য জায়গায় বিবিসি বাংলার সঙ্গে কথা বলা কৃষকেরাও নিজেদের ভাষায় একই কথা বলেন: আখাউড়ার এক কৃষক জানান, এই সময়টা ধানের দানা গঠনের সময়, আর এ সময় সেচ অব্যাহত না রাখলে ফসলের মারাত্মক ক্ষতি হতে পারে।

জাতীয় পর্যায়েও এই ফসলের গুরুত্ব অনেক। দ্য ডেইলি স্টার ২০২৫ সালের ২৮ ডিসেম্বর জানায়, যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগ (ইউএসডিএ) সেই মাসে প্রকাশিত শস্য ও খাদ্য হালনাগাদ প্রতিবেদনে ২০২৫-২৬ বিপণন বছরে বোরোর আবাদি জমি অপরিবর্তিত থাকবে বলে ধারণা করে এবং বোরো উৎপাদনের পূর্বাভাস দেয় ২ কোটি ৫ লাখ টন। বিপণন বছরের প্রথম ফসল এই বোরো; ওই বছরে মোট চাল উৎপাদনের পূর্বাভাস ছিল ৩ কোটি ৭৬ লাখ টন।

সবুজ ধানক্ষেত, রাজশাহী। ছবি: Nazmulhuqrussell / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সবুজ ধানক্ষেত, রাজশাহী। ছবি: Nazmulhuqrussell / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)

চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর ও শাজাহানপুর ইউনিয়ন


বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী, রাজশাহী বিভাগের চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার আয়তন ১ হাজার ৭০২ দশমিক ৫৫ বর্গকিলোমিটার, আর জেলাটির সীমান্তের ওপারে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ। জেলাটি বরেন্দ্রভূমি, দিয়াড় ও চরাঞ্চল নিয়ে গঠিত; প্রধান নদী পদ্মা, মহানন্দা ও পাগলা। ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত নবাবগঞ্জ ছিল মালদহ জেলার একটি থানা; দেশভাগের পর এটি রাজশাহী জেলার মহকুমা হয় এবং ১৯৮৪ সালে জেলায় উন্নীত হয়।

সদর উপজেলার আয়তন ৪৫১ দশমিক ৭৮ বর্গকিলোমিটার, ইউনিয়ন ১৪টি, যার মধ্যে আছে চর অনুপনগর ও চর বাগডাঙ্গা। শাজাহানপুর ইউনিয়নের আয়তন ৭ হাজার ৫১১ একর; ২০১১ সালের আদমশুমারিতে সেখানে ১০ হাজার ২৯১ জন পুরুষ ও ১১ হাজার ৭২৯ জন নারী গণনা করা হয়। বাংলাপিডিয়ায় উপজেলার প্রধান ফসল হিসেবে ধান, মাষকলাই, গম, আখ, পান, পেঁয়াজ, রসুন ও শাকসবজি এবং প্রধান ফল হিসেবে আম, কাঁঠাল, লিচু ও পেঁপের নাম আছে। উপজেলার ৪৪ দশমিক ৯৭ শতাংশ পরিবারের আয়ের প্রধান উৎস কৃষি, আর ৫৯ দশমিক ৬২ শতাংশ পরিবার ভূমিহীন হিসেবে নথিভুক্ত।

মহানন্দার পূর্ব দিকের বরেন্দ্রভূমি দেশের সবচেয়ে বড় প্লাইস্টোসিন চত্বর। বাংলাপিডিয়া জানায়, এই অঞ্চলে বৃষ্টিপাত তুলনামূলক কম, গড়ে বছরে প্রায় ১ হাজার ৯৭১ মিলিমিটার, যার বেশির ভাগ হয় বর্ষায়, আর অঞ্চলটিকে খরাপ্রবণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ফলে শুষ্ক মৌসুমের ফসল এখানে পাম্পে তোলা পানির ওপর নির্ভরশীল।

২০২৪ সালের ডিসেম্বরে চাঁপাইনবাবগঞ্জের বাখের আলী এলাকায় পদ্মার একটি চরের সরিষাক্ষেতে শিকার খুঁজছে একটি পাইড হ্যারিয়ার পাখি। ছবি: TarikHasan70 / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
২০২৪ সালের ডিসেম্বরে চাঁপাইনবাবগঞ্জের বাখের আলী এলাকায় পদ্মার একটি চরের সরিষাক্ষেতে শিকার খুঁজছে একটি পাইড হ্যারিয়ার পাখি। ছবি: TarikHasan70 / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)

মাঠে পুরোনো সমস্যা


সেচের ট্রান্সফর্মার চুরি নতুন কিছু নয়। ২০২৩ সালের ১ আগস্ট প্রকাশিত এক নিবন্ধে প্রথম আলো লেখে, ট্রান্সফর্মার চুরি হয় মূলত এর দামি তামার কয়েলের জন্য: চোর চক্র কয়েল নিয়ে বাকি অংশ ফেলে যায়। পত্রিকাটি লেখে, ট্রান্সফর্মার চুরি হলে নতুন ট্রান্সফর্মার পেতে গ্রাহককে অর্ধেক আর পল্লী বিদ্যুৎকে বাকি অর্ধেক টাকা দিতে হয়; দ্বিতীয়বার চুরি হলে পুরো টাকাই দিতে হয় গ্রাহককে। এর আগে ২০২২ সালের এপ্রিলে, সেচ মৌসুমে, প্রথম আলো দেশের ১২টি উপজেলার তথ্য যাচাই করে দেখেছিল, ১২ মাসে অন্তত ৪১৯টি ট্রান্সফর্মার চুরি হয়েছে, যার দাম প্রায় আড়াই কোটি টাকা।

একই নিবন্ধে উল্লেখ আছে, ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‍্যাব) চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুর উপজেলা থেকে চোরাই কৃষি ট্রান্সফর্মারের সরঞ্জামসহ দুজনকে আটক করে; উদ্ধার করা জিনিসের মধ্যে ছিল ট্রান্সফর্মারের তিনটি ঢাকনা ও ৪৫ কেজি তামার তার। নিবন্ধে বলা হয়, ভুক্তভোগীরা প্রায়ই বিদ্যুৎ অফিসের অসাধু চক্রকে সন্দেহ করেন, তবে এর কোনো প্রমাণ মেলেনি: তখন পর্যন্ত যাঁরা চোরাই মালসহ ধরা পড়েছেন বা সন্দেহভাজন হিসেবে আটক হয়েছেন, তাঁদের কারও সঙ্গে পল্লী বিদ্যুতের কোনো সম্পর্ক পাওয়া যায়নি। মেহেরপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির একজন মহাব্যবস্থাপক পত্রিকাটিকে বলেন, ট্রান্সফর্মার চুরিতে জড়িতদের বেশির ভাগই পেশাদার চোর।

এরপরও সমস্যাটি থামেনি। সমকাল ২০২৫ সালের ২০ সেপ্টেম্বর জানায়, টাঙ্গাইল পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির তথ্যমতে ২০২৪ সালের জুন থেকে ২০২৫ সালের জুলাই পর্যন্ত ওই জেলায় ২৩০টি ট্রান্সফর্মার চুরি হয়েছে, যার দাম প্রায় দুই কোটি টাকা, আর সেখানকার অনেক কৃষক রাত জেগে ট্রান্সফর্মার পাহারা দিচ্ছেন।

কিছু সমাধান এসেছে মাঠ থেকেই। প্রথম আলো এমন একটি যন্ত্রের কথা লিখেছে, যা তৈরি করেছেন চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) এক শিক্ষার্থী, তাঁর বাবার তত্ত্বাবধানে থাকা লো-লিফট পাম্পের তিনটি ট্রান্সফর্মার চুরি হওয়ার পর। ট্রান্সফর্মারে লাগানো সেন্সর কম্পন টের পেলে যন্ত্রটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে নির্ধারিত মোবাইল নম্বরে ফোন করে। এটি তৈরিতে খরচ হয়েছিল পাঁচ থেকে ছয় হাজার টাকা।

আইন যা বলে


বিদ্যুৎ আইন, ২০১৮ (২০১৮ সালের ৭ নম্বর আইন), যা ১৯১০ সালের বিদ্যুৎ আইনের জায়গা নিয়েছে, এ ধরনের চুরিকে গুরুতর অপরাধ হিসেবে গণ্য করে। আইনের ৩৫ ধারায় বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি অসৎ উদ্দেশ্যে বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি বা বিদ্যুৎ লাইন সামগ্রী, যেমন পোল, টাওয়ারের অংশবিশেষ, কন্ডাক্টর, ট্রান্সফর্মার ও বৈদ্যুতিক তার চুরি, অপসারণ, বিনষ্ট বা ইচ্ছাকৃতভাবে ক্ষতিসাধন করলে তা অপরাধ হবে, এবং এর শাস্তি অন্যূন দুই বছর ও অনধিক পাঁচ বছর কারাদণ্ড এবং অন্যূন ৫০ হাজার ও অনধিক ৫ লাখ টাকা অর্থদণ্ড।

৩৬ ধারা অনুযায়ী, চুরি হয়েছে বলে বিশ্বাস করার যুক্তিসংগত কারণ থাকা সত্ত্বেও এমন মালামাল নিজের দখলে রাখাও অপরাধ, যার শাস্তি অনধিক দুই বছর কারাদণ্ড, অনধিক ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড। ৪৩ ধারায় বলা হয়েছে, বিদ্যুৎ উৎপাদন, সঞ্চালন বা বিতরণে নিয়োজিত কোনো সরকারি বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মচারী এই আইনের কোনো অপরাধ করলে বা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত থাকলে তিনিও একই দণ্ডে দণ্ডনীয় হবেন; আর কোনো কর্মচারী অপরাধের কথা জেনেও যুক্তিসংগত সময়ের মধ্যে তা প্রতিরোধে ব্যবস্থা না নিলে বা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে না জানালে তিনি অপরাধে সহায়তা করেছেন বলে গণ্য হবেন।

বাংলাদেশে সৌরবিদ্যুৎচালিত একটি সেচ পাম্প। ছবি: বিদ্যুৎ বিভাগ, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
বাংলাদেশে সৌরবিদ্যুৎচালিত একটি সেচ পাম্প। ছবি: বিদ্যুৎ বিভাগ, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)

সৌরচালিত পাম্প ও পাতকুয়া


উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা যে বিকল্পের কথা বলেছেন, তা নিয়ে ২০২৬ সালের সংকটের আগেও আলোচনা চলছিল। বণিক বার্তায় ২০২৪ সালের নভেম্বরের নিবন্ধে বিএডিসির ওই সাবেক সদস্য পরিচালক লেখেন, জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত দেশে প্রতিদিন প্রায় ১১ থেকে ১২ ঘণ্টা সূর্যের আলো থাকে, যার আট ঘণ্টার বেশি সময় ফটোভোল্টিক পদ্ধতিতে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের মতো প্রখর। বিএডিসির হিসাব উদ্ধৃত করে তিনি জানান, দেশের ডিজেলচালিত সেচযন্ত্রগুলোকে সৌরশক্তিতে রূপান্তর করতে প্রায় ৯০ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হবে, আর দেশের অধিকাংশ কৃষক প্রান্তিক, ক্ষুদ্র ও মাঝারি হওয়ায় সরকারি সহায়তা ছাড়া তাঁদের পক্ষে এই বিনিয়োগ করা সম্ভব নয়।

পাতকুয়া হলো চওড়া, অগভীর কুয়া, যাতে ভূপৃষ্ঠের কাছাকাছি পানি জমিয়ে রাখা যায়। বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিএমডিএ) রাজশাহী জেলায় সৌরচালিত পাতকুয়া স্থাপন করেছে। সমকাল ২০২৫ সালের ৮ নভেম্বর জানায়, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে নেওয়া একটি প্রকল্পের আওতায় বিএমডিএ বাঘা, চারঘাট, পুঠিয়া ও পবা উপজেলায় ২ কোটি ৬০ লাখ টাকা ব্যয়ে, অর্থাৎ প্রতিটি ১৩ লাখ টাকায়, এমন ২০টি পাতকুয়া নির্মাণ করে, আর বিএমডিএর ভাষ্য অনুযায়ী প্রতিটি পাতকুয়া সাড়ে ৫ হেক্টর জমিতে সেচ দিতে পারে। একই প্রতিবেদনে কয়েকটি জায়গার কৃষকের অভিযোগ উদ্ধৃত করা হয় যে সাধারণ কৃষক এই পানি পাচ্ছেন না; অন্যদিকে ওই এলাকার দায়িত্বপ্রাপ্ত বিএমডিএর সহকারী প্রকৌশলী বলেন, কৃষক কমিটি গঠন করা হয়েছে এবং এ নিয়ে কোনো কৃষক তাঁদের কাছে অভিযোগ দেননি।

ছবি: Mohammed Tawsif Salam / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0)

সূত্র: জাগো নিউজ, বাংলা স্ট্রিম, বিবিসি বাংলা, দ্য ডেইলি স্টার বাংলা, প্রতিদিনের কাগজ, বণিক বার্তা, দ্য ডেইলি স্টার, আন্তর্জাতিক ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ইরি), বাংলাপিডিয়া, প্রথম আলো, সমকাল, বিদ্যুৎ আইন, ২০১৮ (লেজিসলেটিভ ও সংসদ বিষয়ক বিভাগ)

অনলাইন ডেস্কদা এগ্রো নিউজ

ফসল

সম্পর্কিত খবর

ফসল

ইংল্যান্ডে যবের ফলন ১৪ বছরে সর্বনিম্ন, গম সামান্য বেশি

যুক্তরাজ্যের কৃষি মন্ত্রণালয় ডেফরার প্রাথমিক হিসাবে ইংল্যান্ডে যব উৎপাদন ১১ শতাংশ কমে ৩৭ লাখ টন হয়েছে, গম ০ দশমিক ৮ শতাংশ বেড়ে ১ কোটি ৮ লাখ টন; গমের তুলনায় পশুখাদ্যের যব বিক্রি হচ্ছে অনেক কম দামে।

Farmers Weekly১৬ অক্টোবর ২০২৬২ মিনিটের পড়া
বিশ্ব

ভালো ফসলের বছরেও আফগানিস্তানে শীতে তীব্র খাদ্যসংকটে পড়বে ১ কোটি ৯২ লাখ মানুষ

অনুকূল বৃষ্টি ও ভালো ফসলের পরও নভেম্বর-এপ্রিলে আফগানিস্তানের ৩৮ শতাংশ মানুষ তীব্র খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় পড়বে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে এফএও ও ডব্লিউএফপি; গত বছর একই সময়ের পূর্বাভাস ছিল ১ কোটি ৭৪ লাখ।

ডব্লিউএফপি১৬ অক্টোবর ২০২৬২ মিনিটের পড়া
ফসল

জমির সিদ্ধান্তের ভার পেয়ে তুলার ফলন সাত গুণ করলেন মহারাষ্ট্রের সুনীতা

একসময় দিনমজুরি করা, পরিবারের ১২ একর জমি নিয়ে কোনো সিদ্ধান্তের অধিকার না থাকা মহারাষ্ট্রের পাচোদ গ্রামের সুনীতা নেহারে এখন খামার চালান; মাটি ও পানি সংরক্ষণে একরপ্রতি তুলার ফলন প্রায় ১ থেকে বাড়িয়েছেন ৭ দশমিক ১৪ কুইন্টালে।

ডাউন টু আর্থ১৬ অক্টোবর ২০২৬২ মিনিটের পড়া

মন্তব্য

(০)