সরাসরিবাজারদর
আটা (প্যাকেটজাত)৫৮—আদা - আমদানিকৃত১৬৭—আদা - দেশী১৫৪—আমন চাল - মাঝারি৫৬—আমন চাল - মোটা৪৮—আমন চাল - সরু৭২—আয়োডিনযুক্ত লবণ (প্যাকেটজাত)৩২—কাঁচা মরিচ২১৮—খামারের মুরগী১৬২—খাসী৯০০—চিনি (দেশী)১৩২—ছোলা - গোটা৮৫—ডিম ফার্ম - লাল৪৭—পেঁয়াজ - দেশী৬০—বোরো চাল - মাঝারি৫৫—বোরো চাল - মোটা৪৭—বোরো চাল - সরু৬৬—মাংসঃ– গরু৭২৯—মুগ ডাল১২২—রসুন - আমদানিকৃত১৯২—রসুন - দেশী১৭৩—সয়াবিন তেল১৬৩—
হালনাগাদ ১৬ অক্টোবর ২০২৬
ঢাকা২৬°পরিষ্কার আকাশআর্দ্রতা ৭৪%বাতাস ৩ কিমি/ঘ

ঈদের আগে ঢাকার পশুর হাটে গরু প্রচুর, দামে মিলছে না ক্রেতা-বিক্রেতা

২০২৬ সালের ঈদুল আজহার তিন দিন আগে, ২৫ মে, ঢাকার হাটগুলোতে গরুর সরবরাহ পর্যাপ্ত থাকলেও বেচাকেনা জমেনি; ক্রেতারা জাগো নিউজকে জানান, গত বছরের সমান আকারের গরুর জন্য ব্যাপারীরা অনেক বেশি দাম চাইছেন।

ঈদের আগে ঢাকার পশুর হাটে গরু প্রচুর, দামে মিলছে না ক্রেতা-বিক্রেতা
লাইভস্টক

২০২৬ সালের ঈদুল আজহার তিন দিন আগে, ২৫ মে সোমবার, ঢাকার কোরবানির পশুর হাটগুলোতে গরুর সরবরাহ ছিল পর্যাপ্ত, কিন্তু বেচাকেনা তখনো জমে ওঠেনি। জাগো নিউজ ২৪-এর সেদিনের প্রতিবেদনে কয়েকজন ক্রেতা জানান, আগের বছরের সমান আকারের গরুর জন্য ব্যাপারীরা অনেক বেশি দাম চাইছেন, আর ক্রেতারা নিজেদের দাম বললে ব্যাপারীরা মুচকি হেসে অন্য জায়গায় খোঁজ নিতে বলছেন। জাতীয় চাঁদ দেখা কমিটি ১৮ মে ঘোষণা দিয়েছিল, দেশে ঈদুল আজহা হবে ২৮ মে বৃহস্পতিবার।

তিন দিন হাট ঘুরেও গতবারের দামে গরু মেলেনি


ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সাদমান সাকিবুজ্জামান টানা তিন দিন ধরে উত্তরার দিয়াবাড়ি, কেরানীগঞ্জ ও হাজারীবাগের গরুর হাট ঘুরছিলেন। আগের বছর তিনি হাসিলসহ ১ লাখ ৮০ হাজার টাকায় পছন্দের একটি গরু কিনতে পেরেছিলেন। এবার বাজেট আরও ২০ হাজার টাকা বাড়িয়েও তিনি গতবারের মতো গরু পাচ্ছিলেন না।

সাদমানের ভাষ্য অনুযায়ী, আগের বছর ১ লাখ ৮০ হাজার টাকায় কেনা গরুর সমান আকারের গরুর জন্য ব্যাপারীরা এবার তিন লাখ টাকা চাইছিলেন। দেড় লাখ টাকা থেকে দরদাম শুরু করলে ব্যাপারীরা মুচকি হেসে বলেন, 'বাজার ঘুরে দেখেন না কেন?' শেষ পর্যন্ত দুই লাখ টাকা বললেও এক ব্যাপারী গরু ছাড়তে রাজি হননি। উল্টো সান্ত্বনা দিয়ে বলেন, 'আমার এখান থেকে কিনবেন কেন, অন্য কারও কাছ থেকে এ দামে পেলে নিয়ে নেন।'

২৫ মে সন্ধ্যায় জাগো নিউজের প্রতিবেদকের সঙ্গে মোবাইল ফোনে আলাপকালে সাদমান বলেন, 'সারাদিন বৃষ্টিতে ভিজে দিয়াবাড়ি ও হাজারীবাগের হাটে ঘুরে এইমাত্র বাসায় এলাম। বাজারে প্রচুর গরু, কিন্তু ব্যাপারীরা দামে ছাড় দিচ্ছেন না। অতিরিক্ত দাম হাঁকছেন। আমরা দাম বললে তারা মুচকি হাসেন। বুঝতে পারছি না গরুর দাম শেষ পর্যন্ত এরকমই চড়া থাকবে কি না।'

সাদমান যে হাসিলের কথা বলেছেন, সেটি হলো পশু বেচাকেনার সময় হাটের ইজারাদার যে মাশুল নেন। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খান ২০ মে সাংবাদিকদের জানান, পশু বিক্রির অর্থ থেকে ইজারাদার ৫ শতাংশ হাসিল নিতে পারবেন এবং এর বাইরে বাড়তি কোনো অর্থ আদায় করা যাবে না। ফলে হাটে ক্রেতার মোট খরচ গরুর দামের সঙ্গে এই হাসিল যোগ করেই দাঁড়ায়।

হাটে গরু অনেক, দামে বনিবনা হচ্ছে না


জাগো নিউজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, রাজধানীর বিভিন্ন হাটে পর্যাপ্ত গরু থাকলেও ২৫ মে পর্যন্ত বেচাকেনা জমে ওঠেনি। ক্রেতারা হাটে আসছিলেন, কিন্তু দামে বনিবনা না হওয়ায় ঘুরে ফিরে দেখছিলেন। বিক্রেতারাও দরদাম চেয়ে ক্রেতাদের মনোভাব বোঝার চেষ্টা করছিলেন। এর মধ্যেও দেড় থেকে দুই লাখ টাকা দামের কিছু গরু বিক্রি হচ্ছিল।

বেসরকারি ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী গাজি সালাহউদ্দিন সেদিন সন্ধ্যায় বাবা ও দুই ভাইয়ের সঙ্গে শাহজাহানপুর গরুর হাটে যান। জাগো নিউজকে তিনি বলেন, গরুর দাম গতবারের চেয়ে বেশিই মনে হচ্ছে। তিনি জানান, সন্ধ্যার পর থেকে ব্যাপারীরা দাম কিছুটা কমিয়ে বলছিলেন, তবে গতবারের বাজেটের চেয়ে এবার ২০ থেকে ৩০ হাজার টাকা বেশি দিয়ে কিনতে হতে পারে।

ঢাকার আশকোনার বাসিন্দা নুরুল আলম লিটন প্রতি বছর জোড়া গরু কোরবানি দেন। তিনি জানান, আগের বছর চার লাখ টাকায় দুটি গরু কিনতে পেরেছিলেন, কিন্তু একই আকারের গরুর জন্য ব্যাপারীরা এবার পাঁচ লাখ টাকার বেশি চাইছিলেন।

যেসব পরিবার ঢাকায় নিয়মিত কোরবানি দেয়, সেসব পরিবারের শিশুরা হাট থেকে অভিভাবকদের ফেরার অপেক্ষায় থাকে। অভিভাবকেরা হাটে থাকার সময় তারা কয়েকবার ফোন করে জানতে চায়, গরু কেনা হলো কি না। আজিমপুরের এক স্কুলশিক্ষার্থী জাগো নিউজকে জানায়, শুধু তার পরিবার নয়, তার বান্ধবীদের বাবা ও ভাইয়েরাও হাটে গিয়ে গরু কিনতে পারছিলেন না। বান্ধবীরা একে অন্যকে ফোন করে বলছিল, 'দোস্ত বাজারে গরু অনেক, কিন্তু দামে মিলছে না। ব্যাপারীরা দাম ছাড়ছেন না।'

ক্রেতাদের ধারণা ছিল, ঈদের আগের দুই দিন, ২৬ মে মঙ্গলবার ও ২৭ মে বুধবার, হাটে কোরবানির পশু বিক্রি বাড়বে এবং দামও কিছুটা কমতে পারে।

সেদিনের অন্য প্রতিবেদনেও একই চিত্র


দৈনিক দেশ রূপান্তরের ২৫ মে সকালের প্রতিবেদন জানায়, ঢাকার অস্থায়ী হাটগুলোতে আগের দিন, ২৪ মে রবিবার থেকে আনুষ্ঠানিক বেচাকেনা শুরু হয়, কিন্তু হাটে ঘুরতে আসা মানুষের তুলনায় ক্রেতা ছিল কম। গোলাপবাগ হাটের ইজারাদার আমির হোসেন পত্রিকাটিকে বলেন, 'এখনো হাটে কোরবানির পশু আসছে। তবে যে পরিমাণ বিক্রির আশা করা হয়েছিল, তা হচ্ছে না।' গাবতলী হাটে কুষ্টিয়ার এক ব্যবসায়ী প্রায় ২৫ মণ ওজনের একটি গরুর দাম চাইছিলেন ১২ লাখ টাকা। ডেমরার আমুলিয়া হাটে আসলাম নামের এক ক্রেতা অভিযোগ করেন, 'গতকাল দেখলাম গরুর দাম কম, একই গরু আজ দাম চাচ্ছে বেশি।' একই প্রতিবেদনে তেজগাঁও হাটে বেনাপোল থেকে আনা উটের দাম ২০ থেকে ৩৫ লাখ টাকা চাওয়ার কথাও আসে।

দৈনিক ইনকিলাব ২৫ মে দুপুরে জানায়, গাবতলী হাটে ২০০ থেকে ৩০০ কেজি ওজনের গরুর চাহিদাই সবচেয়ে বেশি। প্রচণ্ড গরমে পশু রক্ষায় ব্যবসায়ীরা ফ্যান ও শামিয়ানা ব্যবহার করছিলেন। দিয়াবাড়ি হাটের পশুচিকিৎসক ইমরুল হোসেন পত্রিকাটিকে জানান, গরমের কারণে একটি বড় গরু অসুস্থ হয়ে পড়লে সেটিকে কসাইয়ের কাছে বিক্রি করে দেওয়া হয়। খামারি ও ব্যবসায়ীরা আশা করছিলেন, সোমবার থেকে সরকারি ছুটি শুরু হওয়ায় এবং ঈদ ঘনিয়ে আসায় কেনাবেচা বাড়বে।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম সেদিন বিকেলে জানায়, ডিএনসিসি প্রশাসক দিয়াবাড়ি হাট পরিদর্শনে গিয়ে দেখেন, হাটের নির্ধারিত সীমানার বাইরে সড়কে এবং উত্তরা সেন্টার মেট্রো স্টেশনের নিচে পশু বেঁধে রাখা হয়েছে। তিনি সড়ক যান চলাচলের জন্য খোলা রাখার নির্দেশ দিলে সেখান থেকে পশু সরিয়ে নেওয়া হয়, এবং ভবিষ্যতে এমন হলে ভ্রাম্যমাণ আদালতে জরিমানার কথা বলেন। ইজারাদারের পক্ষ থেকে বলা হয়, সকালের বৃষ্টির কারণে অল্প সময়ের জন্য পশুগুলোকে মেট্রো স্টেশনের নিচে রাখা হয়েছিল। প্রশাসক সেদিন সকালে গাবতলী হাটও পরিদর্শন করেন এবং নির্ধারিত হাসিলের বাইরে অর্থ আদায় না করতে কড়া নির্দেশ দেন; ৩০০ ফুট সড়ক, বেরাইদ ও স্বদেশ প্রপার্টিজের অস্থায়ী হাটও তিনি ঘুরে দেখেন।

বৃষ্টির মধ্যে ঢাকার একটি কোরবানির পশুর হাট, জুন ২০২৫। ছবি: S.M.M.Musabbir Uddin / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
বৃষ্টির মধ্যে ঢাকার একটি কোরবানির পশুর হাট, জুন ২০২৫। ছবি: S.M.M.Musabbir Uddin / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)

দাম কেন বাড়তি: খামারিদের খরচের হিসাব


ঈদের কয়েক সপ্তাহ আগে থেকেই খামারিরা বাড়তি দামের আভাস দিচ্ছিলেন। বাংলা ট্রিবিউনের ৮ মে-র প্রতিবেদনে বলা হয়, মাঝারি আকারের যে গরু আগে এক লাখ টাকার কিছু বেশি দামে বিক্রি হতো, খামারিরা এবার সেগুলোর দাম ধরছিলেন ১ লাখ ২০ হাজার থেকে ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা। খামারগুলোতে ২০০ কেজি থেকে ১ হাজার ১০০ কেজি ওজনের গরু ছিল। বাংলাদেশ ডেইরি ফারমার্স অ্যাসোসিয়েশনের জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি ও ডেমরার সামারাই ক্যাটেল ফার্মের মালিক নিলয় হোসেন পত্রিকাটিকে বলেন, পশুখাদ্য, পরিবহন ও রাখালের মজুরি, সবকিছুর খরচই বেড়েছে।

ঈদের ছয় দিন আগে, ২২ মে, বাংলা ট্রিবিউনের আরেক প্রতিবেদনে খামারিরা জানান, গো-খাদ্যের দাম বছরজুড়ে বেশি থাকলেও তখন কিছুটা কমেছে, কিন্তু তাতে পশু পালনের খরচ কমেনি। ২০০৭ সাল থেকে খামার চালিয়ে আসা এইচআর অ্যাগ্রো ফার্মসের এক খামারি বলেন, তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় পরিবহন ব্যয় অনেক বেড়েছে। একটি ডেইরি খামারের মালিক আদিল হোসেন জানান, উৎপাদন খরচ বাড়ায় আগে এক লাখ টাকায় বিক্রি হওয়া মাঝারি গরুর দাম এবার দেড় লাখ টাকার মতো হতে পারে।

পরিবহন খরচের একটি নমুনা দেয় দেশ রূপান্তর: মেহেরপুর থেকে আসা এক খামারি জানান, ১৫টি গরু ট্রাকে করে ডেমরার আমুলিয়া হাট পর্যন্ত আনতে তার খরচ হয়েছে ৪০ হাজার টাকা।

দেশে কোরবানির পশুর চাহিদা ও জোগান


মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী মোহাম্মদ আমিনুর রশিদ ৩ মে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের হিসাব তুলে ধরে জানান, ২০২৬ সালে দেশে কোরবানির সম্ভাব্য চাহিদা ১ কোটি ১ লাখ ৬ হাজার ৩৩৪টি পশু। এর বিপরীতে কোরবানিযোগ্য পশু প্রস্তুত ছিল ১ কোটি ২৩ লাখ ৩৩ হাজার ৮৪০টি। এর মধ্যে গরু-মহিষ ৫৬ লাখ ৯৫ হাজার ৮৭৮টি, ছাগল-ভেড়া ৬৬ লাখ ৩২ হাজার ৩০৭টি এবং উট-দুম্বাসহ অন্যান্য পশু ৫ হাজার ৬৫৫টি। অধিদপ্তরের হিসাবে চাহিদা মেটানোর পর প্রায় ২২ লাখ ২৭ হাজার ৫০৬টি পশু উদ্বৃত্ত থাকার কথা।

একই ঘোষণায় জানানো হয়, এবার পশু আমদানির প্রয়োজন নেই; উত্তরবঙ্গ থেকে ঢাকা হয়ে চট্টগ্রাম পর্যন্ত পশু পরিবহনে বিশেষ ট্রেন চলবে; সারা দেশে ৩ হাজার ৬০০টির বেশি পশুর হাট বসবে এবং হাটগুলোতে ভেটেরিনারি মেডিকেল টিম থাকবে। ঢাকার হাটগুলোর জন্য ২০টি ভেটেরিনারি মেডিকেল টিম ও দুটি বিশেষজ্ঞ দল রাখা হয়। অনলাইনে পশু বিক্রিতে কোনো কর বা মাশুল লাগবে না বলেও জানানো হয়, আর চাঁদাবাজি ও সীমান্ত দিয়ে অবৈধভাবে পশু আনা ঠেকাতে কঠোর থাকার কথা বলা হয়।

১৪ মে মন্ত্রী আবার বলেন, দেশের চাহিদা মেটাতে এক কোটির বেশি কোরবানির পশু প্রস্তুত, এবং কোরবানি হবে দেশের খামারিদের পালন করা পশু দিয়েই। সীমান্ত দিয়ে পশু চোরাচালান ঠেকাতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে কড়া নির্দেশ দেওয়ার কথাও তিনি জানান। কোরবানির পশুর কাঁচা চামড়ার দাম নিয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলাদা বৈঠকে নতুন দাম ঠিক করা হয় বলেও সেদিন জানানো হয়।

তবে জাতীয় হিসাবে উদ্বৃত্ত থাকলেও সব অঞ্চলে সমান জোগান ছিল না। বাংলা ট্রিবিউনের ২২ মে-র প্রতিবেদনে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের হিসাব উদ্ধৃত করে বলা হয়, ঢাকায় সম্ভাব্য চাহিদা ২১ লাখ ৫৮ হাজার ৮৬৯টি পশু হলেও প্রাপ্যতা ১৪ লাখ ৪৩ হাজার ৯৪২টি। অন্যদিকে শুধু রাজশাহী বিভাগেই চাহিদার তুলনায় প্রায় ১৯ লাখ বেশি পশু প্রস্তুত করা হয়েছিল।

বাংলাদেশের একটি কোরবানির পশুর হাটে বিক্রির জন্য আনা গরু, জুন ২০২৪। ছবি: Wasiul Bahar / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
বাংলাদেশের একটি কোরবানির পশুর হাটে বিক্রির জন্য আনা গরু, জুন ২০২৪। ছবি: Wasiul Bahar / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)

আগের তিন বছরের হিসাব


কোরবানির পশুর জোগান কয়েক বছর ধরেই চাহিদার চেয়ে বেশি ছিল। প্রথম আলোর ২০২৩ সালের ১৪ জুনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সে বছর কোরবানির চাহিদা ধরা হয়েছিল ১ কোটি ৩ লাখ ৯৪ হাজার ৭৩৯টি পশু, আর প্রস্তুত ছিল ১ কোটি ২৫ লাখ ৩৬ হাজার ৩৩৩টি। তখনকার মন্ত্রী জানিয়েছিলেন, চাহিদার তুলনায় প্রায় ২১ লাখ পশু বেশি আছে এবং হাটে কোনো রোগাক্রান্ত পশু বিক্রি করতে দেওয়া হবে না।

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের হিসাবে ২০২৪ সালের ঈদুল আজহায় দেশে প্রায় ১ কোটি ৪ লাখ পশু কোরবানি হয়। ২০২৫ সালে কোরবানিযোগ্য পশু ছিল ১ কোটি ২৪ লাখ ৪৭ হাজার ৩৩৭টি, কিন্তু কোরবানি হয় ৯১ লাখ ৩৬ হাজার ৭৩৪টি। এর মধ্যে গরু-মহিষ প্রায় ৪৭ লাখ এবং ছাগল-ভেড়া প্রায় ৪৪ লাখ। বিভাগওয়ারি হিসাবে রাজশাহী ছিল শীর্ষে, তার পরেই ঢাকা বিভাগ; সবচেয়ে কম ছিল সিলেট বিভাগে, ৩ লাখ ১৯ হাজার ৮২৩টি। সে বছর ঈদের পর প্রায় ৩৩ লাখ ১০ হাজার পশু উদ্বৃত্ত থেকে যায়।

অধিদপ্তর এই হিসাব করে স্তরায়িত দৈব নমুনায়ন পদ্ধতিতে: প্রতিটি উপজেলায় ছোট, মাঝারি ও বড়, এই তিন ধরনের গ্রাম থেকে অন্তত এক শতাংশ নমুনা নিয়ে কোরবানির সংখ্যা অনুমান করা হয়। ফলে ঈদের আগের চাহিদা একটি প্রাক্কলন, আর ঈদের পরের সংখ্যা নমুনা জরিপের ভিত্তিতে তৈরি।

কোরবানির এই বাজারের পেছনে আছে দেশের বড় গবাদিপশুর খাত। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের 'লাইভস্টক ইকোনমি অ্যাট আ গ্লান্স' অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে দেশে গরু ছিল ২৫০ দশমিক ১৩ লাখ, মহিষ ১৫ দশমিক ২৪ লাখ, ছাগল ২৭১ দশমিক ১৭ লাখ এবং ভেড়া ৩৯ দশমিক ০৩ লাখ। সে বছর মাংস উৎপাদন হয় ৯২ দশমিক ২৫ লাখ মেট্রিক টন, যেখানে চাহিদা ধরা হয়েছিল ৭৬ দশমিক ২১ লাখ মেট্রিক টন। স্থির মূল্যে জিডিপিতে প্রাণিসম্পদের অংশ ছিল ১ দশমিক ৮০ শতাংশ এবং কৃষি জিডিপিতে ১৬ দশমিক ৩৩ শতাংশ। অধিদপ্তরের সারণিতে এই খাতে প্রত্যক্ষ কর্মসংস্থান ২০ শতাংশ এবং আংশিক কর্মসংস্থান ৫০ শতাংশ দেখানো হয়েছে।

ঢাকার ২৭ হাট, ইজারা ও নিয়ম


বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার (বাসস) ১০ মে-র প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ সালের কোরবানির জন্য ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনে মোট ২৭টি পশুর হাট বসানোর সিদ্ধান্ত হয়: ঢাকা উত্তরে গাবতলীর স্থায়ী হাটসহ ১৬টি এবং ঢাকা দক্ষিণে ১১টি। উত্তরের তালিকায় ছিল উত্তরার দিয়াবাড়ির ১৬ ও ১৮ নম্বর সেক্টর সংলগ্ন বউবাজার, মিরপুর ৬ নম্বর সেকশন, কালশী বালুর মাঠ, ঢাকা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট সংলগ্ন এলাকা, মোহাম্মদপুরের বছিলা, মহাখালীর টিঅ্যান্ডটি মাঠ ও বড় বেরাইদ। দক্ষিণের তালিকায় ছিল উত্তর শাহজাহানপুরের মৈত্রী সংঘ ক্লাব সংলগ্ন খালি জায়গা, পোস্তগোলা শ্মশানঘাট সংলগ্ন নদীর পাড়, আমুলিয়া মডেল টাউন, আফতাবনগর, কাজলা থেকে মাতুয়াইল এবং গোলাপবাগ এলাকা। ঈদের দিনসহ পাঁচ দিন হাটে বেচাকেনার নিয়ম ঠিক করা হয়।

দ্য ডেইলি অবজারভারের ২২ মে-র প্রতিবেদন জানায়, তখন পর্যন্ত ২৭টির মধ্যে ১৯টি হাটের ইজারা চূড়ান্ত হয়েছিল এবং বাকিগুলোর জন্য আবার দরপত্র ডাকা হয়। ঢাকা উত্তরে সবচেয়ে বেশি দর ওঠে দিয়াবাড়ির বউবাজার হাটে, ১৪ কোটি ১৫ লাখ টাকা। বড় বেরাইদের হাট ৫ কোটি ৭০ লাখ, ঢাকা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট সংলগ্ন হাট ৩ কোটি ৮৭ লাখ এবং মিরপুরের ইস্টার্ন হাউজিংয়ের হাট ১ কোটি ৭৯ লাখ টাকায় ইজারা হয়। ঢাকা দক্ষিণে কাজলা সেতু থেকে মাতুয়াইল পর্যন্ত হাটের ইজারামূল্য ছিল ৪ কোটি ৩৫ লাখ টাকা।

২০ মে ডিএনসিসি প্রশাসক হাটের নিয়মগুলো তুলে ধরেন। ইজারাদার ৫ শতাংশের বেশি হাসিল নিতে পারবেন না; নির্ধারিত পাঁচ দিনের আগে বা বাইরে বেচাকেনা অবৈধ; অনুমোদনহীন জায়গায় হাট বসানো যাবে না। নিয়ম ভাঙলে ব্যবস্থা নিতে প্রায় ১০০ কর্মকর্তাকে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার ক্ষমতা দেওয়া হয়। প্রতিদিন হাটের বর্জ্য সরানো, নারীদের জন্য আলাদা 'পিংক টয়লেট' রাখা এবং পানি জমে না থাকার জন্য নিষ্কাশনের ব্যবস্থা রাখাও ইজারাদারের দায়িত্ব বলে জানানো হয়।

ঢাকার শাহজাহানপুরের কোরবানির পশুর হাট, জুন ২০২৫। ছবি: S.M.M.Musabbir Uddin / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
ঢাকার শাহজাহানপুরের কোরবানির পশুর হাট, জুন ২০২৫। ছবি: S.M.M.Musabbir Uddin / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)

দিয়াবাড়ি, শাহজাহানপুর, কেরানীগঞ্জ ও হাজারীবাগ


সাদমান যে দিয়াবাড়ির হাটে গিয়েছিলেন, সেটি উত্তরা আবাসিক এলাকার তৃতীয় পর্বে। রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) এই প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন হয় ১৯৬৭ সালের ২৫ জুন। উত্তরার তৃতীয় পর্ব ঘোষণা হয় ১৯৯৯ সালে; চারটি সেক্টর নিয়ে এর আয়তন ২ হাজার ৮ একর। ঢাকা মেট্রোরেলের এমআরটি লাইন ৬ দিয়াবাড়ি থেকে মতিঝিল পর্যন্ত চলে, আর উত্তরায় এর তিনটি স্টেশন: উত্তরা উত্তর, উত্তরা সেন্টার ও উত্তরা দক্ষিণ। দিয়াবাড়ির ১৬ ও ১৮ নম্বর সেক্টরের খালি জায়গায় বসা বউবাজার হাট ঢাকা উত্তরের সবচেয়ে বেশি দামে ইজারা হওয়া হাট।

গাজি সালাহউদ্দিন যে শাহজাহানপুর হাটে গিয়েছিলেন, সেটি ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের তালিকাভুক্ত, উত্তর শাহজাহানপুরের মৈত্রী সংঘ ক্লাব সংলগ্ন খালি জায়গায় বসে।

কেরানীগঞ্জ ঢাকা জেলার একটি উপজেলা, বুড়িগঙ্গা নদীর ওপারে ঢাকা শহরের দক্ষিণ-পশ্চিমে। বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী এর আয়তন ১৬৬ দশমিক ৮৭ বর্গকিলোমিটার; বুড়িগঙ্গা, ধলেশ্বরী ও ইছামতী এর প্রধান নদী, আর উপজেলায় হাট-বাজার ১৮টি। কেরানীগঞ্জ দুই সিটি করপোরেশনের বাইরে, তাই সেখানকার হাট ঢাকার ২৭ হাটের তালিকায় ছিল না।

হাজারীবাগ ঢাকার একটি থানা, ১৯৯৮ সালে তিনটি থানার অংশ নিয়ে গঠিত। বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী এর আয়তন ৩ দশমিক ৯৪ বর্গকিলোমিটার; উত্তরে মোহাম্মদপুর, দক্ষিণে কামরাঙ্গীরচর এবং পশ্চিমে কেরানীগঞ্জ উপজেলা। এলাকাটি চামড়াশিল্পের জন্য পরিচিত: সাভারের হেমায়েতপুরে সরে যাওয়ার আগে দেশের প্রায় ৯৫ শতাংশ ট্যানারি হাজারীবাগ ও তার আশপাশে ছিল।

ঢাকার উত্তরার দিয়াবাড়ি এলাকা। ছবি: G. Hameed / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
ঢাকার উত্তরার দিয়াবাড়ি এলাকা। ছবি: G. Hameed / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)

ঈদুল আজহা ও কোরবানির বিধান


১৮ মে সন্ধ্যায় বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের সভাকক্ষে জাতীয় চাঁদ দেখা কমিটির বৈঠক হয়। বৈঠক শেষে ধর্মবিষয়ক মন্ত্রী জানান, দেশের আকাশে জিলহজ মাসের চাঁদ দেখা গেছে, তাই ১০ জিলহজ, অর্থাৎ ২৮ মে বৃহস্পতিবার দেশে ঈদুল আজহা পালিত হবে। সে হিসাবে ক্রেতারা যে মঙ্গল ও বুধবারের দিকে তাকিয়ে ছিলেন, সেগুলোই ছিল ঈদের আগে হাটের শেষ দুই দিন।

কোরবানি শব্দের মূল অর্থ নৈকট্য। ইসলামি বিধানে এটি নির্দিষ্ট দিনে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নির্দিষ্ট পশু জবাই। এর পেছনে আছে নবী ইব্রাহিম (আ.)-এর ঘটনা: স্বপ্নে পুত্রকে কোরবানির আদেশ পেয়ে তিনি প্রস্তুত হলে আল্লাহ পুত্রের বদলে একটি দুম্বা পাঠান, আর সেই স্মরণেই মুসলিমরা প্রতি বছর পশু কোরবানি দেন।

কোরবানির জন্য ছাগল, ভেড়া, দুম্বা, গরু, মহিষ ও উট গ্রহণযোগ্য; পশুকে সুস্থ ও রোগমুক্ত হতে হয় এবং অন্ধত্ব বা কান-লেজের বড় অংশ না থাকার মতো ত্রুটি থাকলে চলে না। গরু ও উটের মতো বড় পশুতে কয়েকজন অংশীদার হয়ে কোরবানি দিতে পারেন। কোরবানির সময় ১০ জিলহজ সকাল থেকে ১২ জিলহজ সূর্যাস্ত পর্যন্ত; শাফেয়ি মাজহাবে ১৩ জিলহজ পর্যন্ত। প্রচলিত রীতিতে মাংস তিন ভাগ করা হয়: এক ভাগ কোরবানিদাতার, এক ভাগ আত্মীয়-স্বজনের এবং এক ভাগ দরিদ্রদের জন্য।

ছবি: S.M.M.Musabbir Uddin / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)

সূত্র: জাগো নিউজ ২৪ (২৫ মে ২০২৬), দেশ রূপান্তর (৩ ও ২৫ মে ২০২৬), দৈনিক ইনকিলাব (২৫ মে ২০২৬), বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম (২০ ও ২৫ মে ২০২৬), বাংলা ট্রিবিউন (৮, ১৮ ও ২২ মে ২০২৬), দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড (১০ জুন ২০২৫ ও ৩ মে ২০২৬), ঢাকা ট্রিবিউন (৩ ও ১৪ মে ২০২৬), বাসস (১০ মে ২০২৬), দ্য ডেইলি অবজারভার (২২ মে ২০২৬), প্রথম আলো (১৪ জুন ২০২৩), প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর (লাইভস্টক ইকোনমি অ্যাট আ গ্লান্স ২০২৩-২৪), বাংলাপিডিয়া (কেরানীগঞ্জ উপজেলা, হাজারীবাগ থানা), উইকিপিডিয়া (উত্তরা, হাজারীবাগ থানা, কোরবানি)

অনলাইন ডেস্কদা এগ্রো নিউজ

লাইভস্টক

সম্পর্কিত খবর

লাইভস্টক

সৌরপ্যানেলের নিচে ভেড়া চরালে বাড়ে মৌমাছি, তবে সংখ্যা রাখতে হবে কম

কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণায় দেখা গেছে, সৌরখামারে হেক্টরপ্রতি দুটি ভেড়া চরালে ঘাস কাটার তুলনায় উপকারী পোকা ৩৮ শতাংশ বাড়ে। খামারিদের জন্য ভেড়ার পাল পরিকল্পনার একটি সহায়ক টুলও তৈরি করেছেন গবেষকেরা।

Farms.com১৬ অক্টোবর ২০২৬২ মিনিটের পড়া
লাইভস্টক

প্রোটিনের চাহিদায় বদলে গেল কানাডার দুধের বাজার, মাখনের উদ্বৃত্ত শেষ

দুগ্ধজাত প্রোটিনের চাহিদা বাড়ায় পাঁচ বছরের মধ্যে কানাডার দুধের বাজারে মাখনচর্বির কাঠামোগত উদ্বৃত্ত মিটে গেছে, দুধের দাম নির্ধারণেও এসেছে পরিবর্তন।

Manitoba Co-operator১৬ অক্টোবর ২০২৬১ মিনিটের পড়া
লাইভস্টক

সিকি হেক্টরে ওটের বীজ চাষ, ইথিওপিয়ার এক কৃষকের পারিবারিক ব্যবসা

ইথিওপিয়ার এক ক্ষুদ্র কৃষক মাত্র শূন্য দশমিক ২৫ হেক্টর জমিতে বীজের জন্য ওট চাষ করে প্রথম ফসল ৪৫ হাজার বির্রে বিক্রি করেন এবং পরের বছর চাষ বাড়ান। আইএলআরআইয়ের পশুখাদ্যের বীজকে ব্যবসায় রূপ দেওয়ার উদ্যোগের অংশ এটি।

ILRI১৬ অক্টোবর ২০২৬২ মিনিটের পড়া

মন্তব্য

(০)