বাংলাদেশের একমাত্র নিশাচর প্রাইমেট লজ্জাবতী বানর, ইংরেজিতে বেঙ্গল স্লো লরিস (Nycticebus bengalensis), পার্বত্য চট্টগ্রামের বন থেকে হারিয়ে যেতে বসেছে। খাবারের গাছ কমে যাওয়ায় খাগড়াছড়িতে প্রাণীটি প্রায়ই লোকালয়ে চলে আসছে; ২০২৫ সালের এপ্রিলে এক সপ্তাহের ব্যবধানে জেলা সদর থেকে দুটি লজ্জাবতী বানর উদ্ধার করে আলুটিলা সংরক্ষিত বনে ছেড়ে দেয় বন বিভাগ। ইউনিভার্সিটি অব ওয়েস্টার্ন অস্ট্রেলিয়ার পিএইচডি ফেলো হাসান আল রাজী পার্বত্য চট্টগ্রাম ও সিলেট অঞ্চলে এই প্রাণী নিয়ে গবেষণা ও সংরক্ষণের কাজ করছেন। তাঁর ভাষ্যে, লজ্জাবতী বানর ধীরগতির হলেও ফুলের পরাগায়ন ও বীজ ছড়ানোয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে এবং ফলের চেয়ে বেশি খায় ক্ষতিকর পোকা, তাই এটি পরিবেশের বন্ধু।
হাসান আল রাজী বলেন, ‘ফুলের মধু, গাছের পোকার পাশাপাশি লজ্জাবতী বানর জিকা, বহেরা জাতীয় গাছের থকথকে জেলির মতো আঠা খায়। সেসব যদি না পায়, তখন তারা খাদ্য সংকটে পড়ে। তাই আমাদের উচিত প্রাকৃতিক বন পুনরুজ্জীবিত করা।’
এক সপ্তাহে দুটি বানর উদ্ধার
দৈনিক আজাদীর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালের এপ্রিলে এক শুক্রবার খাগড়াছড়ি সদর উপজেলার গঞ্জপাড়ায় বিদ্যুতের তারে ঝুলন্ত অবস্থায় একটি লজ্জাবতী বানর পাওয়া যায়। সদর রেঞ্জ কার্যালয়ে দুই দিন পরিচর্যার পর ১৩ এপ্রিল বিকেলে বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. ফরিদ মিঞা বানরটিকে আলুটিলা সংরক্ষিত বনে অবমুক্ত করেন।
এক সপ্তাহ পর, ২০ এপ্রিল সকালে ভাইবোনছড়ার সতের মাইল এলাকায় স্থানীয়রা আরেকটি লজ্জাবতী বানর দেখতে পান। বানরের কামড়ে আহত এক ব্যক্তি টিকা নিতে হাসপাতালে এলে খবর পৌঁছায় বন বিভাগে; বনকর্মীরা দ্রুত বানরটি উদ্ধার করেন এবং সেদিন বিকেলেই সেটিকেও আলুটিলার প্রাকৃতিক বনে ছেড়ে দেওয়া হয়। জাগো নিউজের প্রতিবেদনে বলা হয়, গত দুই বছরে খাগড়াছড়িতে অন্তত আটটি লজ্জাবতী বানর উদ্ধারের পর অবমুক্ত করা হয়েছে। বন্যপ্রাণী রক্ষায় রামগড়সহ জেলার বিভিন্ন উপজেলায় সচেতনতামূলক সভাও করেছে বন বিভাগ।

সেগুন বাগান আর বিদ্যুতের তার
বিভাগীয় বন কর্মকর্তা বলেন, ‘লজ্জাবতী বানর লোকালয়ে চলে আসার প্রধান কারণ সেগুনের মতো বিদেশি বৃক্ষ বেষ্টিত বাগান। চিরসবুজ বন থাকলে সেখানে বন্যপ্রাণী তাদের উপযুক্ত খাবার ও পরিবেশ পায়। কিন্তু সেগুন বাগান বেশি হওয়ায় সেখানে লজ্জাবতী বানর তাদের মূল খাবার গাছের আঠা পায় না।’ তাই বন বিভাগ স্থানীয়দের এক প্রজাতির গাছের বাগানের বদলে মিশ্র বন গড়ার অনুরোধ করছে।
বন ছেড়ে লোকালয়ে আসা বানর বিদ্যুতের লাইন পার হতে গিয়ে অনেক সময় বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মারা যাচ্ছে; হাসান আল রাজীর পর্যবেক্ষণে, মানুষের কারণে পাহাড়ের বন ছোট ছোট বিচ্ছিন্ন খণ্ডে ভাগ হয়ে গেছে, আর সেই ছোট বনগুলোতে মাঝে মাঝে লজ্জাবতী বানর দেখা যায়। গবেষকেরা বলেন, ‘আমরা যদি না জানি বনের কী ধরনের গাছ থেকে তারা খাবার খাচ্ছে, তাহলে তাদের সংরক্ষণ করতে পারব না।’

গাছের আঠাই প্রধান খাবার
লজ্জাবতী বানরের খাদ্যতালিকায় আছে গাছের কচি পাতা, মুকুল, গাছের আঠা, ছোট পোকামাকড় ও সন্ধিপদ প্রাণী, ছোট পাখি এবং বিভিন্ন প্রাণীর ডিম। ভারতের ত্রিপুরার তৃষ্ণা বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যে করা এক গবেষণা ২০১০ সালে আমেরিকান জার্নাল অব প্রাইমেটোলজিতে প্রকাশিত হয়। তাতে দেখা যায়, শীতকালে খাবার খাওয়ার সময়ের ৯৪.৩ শতাংশই লজ্জাবতী বানর গাছের আঠা ও কষ খেয়ে কাটায়; গ্রীষ্মে আঠা ৬৭.৩ শতাংশ এবং একটি প্রজাতির ফুলের মধু ২২.৩ শতাংশ। গাছের বাকল খুঁড়ে এরা আঠা বের করে, আর অভাবের সময় বহেরা গাছ এদের বড় ভরসা।
খাগড়াছড়ির পিটাছড়া বন ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ উদ্যোগের প্রতিষ্ঠাতা মাহফুজ রাসেল দৈনিক আজাদীকে জানান, তাঁরা ২০১৭ সাল থেকে লজ্জাবতী বানর সংরক্ষণের কাজ করছেন এবং জার্মানিভিত্তিক একটি সংগঠনের উদ্যোগে পিটাছড়ায় প্রাণীটির ওপর গবেষণা চলছে। তাঁদের ১৩ একরের বেশি সংরক্ষিত এলাকায় ৭ থেকে ৮টি লজ্জাবতী বানর দেখা যায়, যারা পোকার পাশাপাশি ৭ থেকে ৮ প্রজাতির গাছের কষ খায়। তাঁর ভাষায়, ‘এখন বনে সেরকম গাছ বেশি নেই। যেখানে বন ছিল সেখানে হয়তো বসতি হয়ে গেছে।’

কেমন দেখতে, কোথায় থাকে
বন কর্মকর্তা ফরিদ মিঞার বর্ণনায়, লজ্জাবতী বানরের মাথাসহ দেহ ৩৩ সেন্টিমিটার লম্বা, ওজন প্রায় ১ কেজি ২০০ গ্রাম। নরম পশম হালকা বাদামি থেকে ধূসর, চোখ প্যাঁচার মতো বাদামি বলয়ে ঘেরা, লেজ খাটো, মাথা থেকে পিঠ পর্যন্ত বাদামি দাগ। এটি স্লো লরিসদের মধ্যে সবচেয়ে বড় প্রজাতি; ওজন ১ থেকে ২.১ কেজি পর্যন্ত হয়।
প্রাণীটি বাংলাদেশ, উত্তর-পূর্ব ভারত, মিয়ানমার, থাইল্যান্ড, লাওস, কম্বোডিয়া, ভিয়েতনাম ও দক্ষিণ চীনে পাওয়া যায়। বাংলাদেশে এর দেখা মেলে পাহাড়ি চিরসবুজ বনে। এরা নিশাচর ও বৃক্ষবাসী, দিনে ঘন পাতার আড়ালে কুণ্ডলী পাকিয়ে ঘুমায়, ধীরে চলে কিন্তু খুব শক্ত করে ডাল আঁকড়ে ধরে। স্ত্রী বানর সাধারণত একটি করে বাচ্চা দেয়।

আন্তর্জাতিক প্রকৃতি সংরক্ষণ সংঘ আইইউসিএন ২০২০ সালের মূল্যায়নে প্রজাতিটিকে লাল তালিকায় ‘বিপন্ন’ শ্রেণিতে রাখে; সেই মূল্যায়নের লেখকদের একজন হাসান আল রাজী। আন্তর্জাতিক বন্যপ্রাণী বাণিজ্য চুক্তি সাইটেসের পরিশিষ্ট ১-এও প্রাণীটি তালিকাভুক্ত। পোষা প্রাণীর ব্যবসা, প্রথাগত ওষুধে ব্যবহার, শিকার আর বন উজাড় এর প্রধান হুমকি।
ছবি: Harish Debbarma / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, দৈনিক আজাদী (১৩ ও ২১ এপ্রিল এবং ২৪ মে ২০২৫), আইইউসিএন লাল তালিকা (Nycticebus bengalensis, ২০২০), আমেরিকান জার্নাল অব প্রাইমেটোলজি (স্বপ্না ও অন্যান্য, ২০১০), ফোলিয়া প্রাইমাটোলজিকা (২০২৫), উইকিপিডিয়া





মন্তব্য
(০)