গ্রীষ্মের ফলের মৌসুমের মাঝামাঝি, ২০২৬ সালের ১৭ মে, দেশের সংবাদমাধ্যম জাগো নিউজ ২৪-এর লাইফস্টাইল বিভাগে কাটা তরমুজ ফ্রিজে রাখার নিয়ম নিয়ে একটি নির্দেশনামূলক প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। যুক্তরাষ্ট্রের স্বাস্থ্যবিষয়ক তথ্যের ওয়েবসাইট ভেরি ওয়েল হেলথকে তথ্যসূত্র হিসেবে উল্লেখ করে প্রতিবেদনটি জানায়, বড় একটি তরমুজ অনেক সময় একবারে খাওয়া হয় না; বাকিটা কেটে ফ্রিজে রেখে দেওয়া হয়, আর সবচেয়ে সাধারণ ভুলগুলো ঘটে এখানেই। প্রতিবেদনের মূল কথা ছিল, ফ্রিজে রাখলেই খাবার নিরাপদ হয়ে যায় না: অসাবধানে রাখা কাটা তরমুজে দ্রুত ব্যাকটেরিয়া জন্মাতে পারে, স্বাদ নষ্ট হতে পারে, এমনকি পেটের সমস্যাও দেখা দিতে পারে।
এই লেখায় প্রতিবেদনের পরামর্শগুলো রাখা হয়েছে এবং প্রতিটি কথা মিলিয়ে দেখা হয়েছে তাজা ফল ও সবজির খাদ্য নিরাপত্তা নিয়ে নির্দেশনা প্রকাশকারী সরকারি সংস্থাগুলোর সঙ্গে: যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসন (এফডিএ), যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগ (ইউএসডিএ) ও এর খাদ্য নিরাপত্তা ও পরিদর্শন সেবা (এফএসআইএস) এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও)। এসব সংস্থা যেখানে কোনো সময়সীমা বা তাপমাত্রা দিয়েছে, এখানে তা হুবহু তাদের ভাষ্য অনুযায়ী দেওয়া হলো। যেকোনো খাবার খেয়ে অসুস্থ বোধ করলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।
প্রতিবেদনে যা বলা হয়েছিল
কাটা তরমুজ কেন দ্রুত নষ্ট হয়, প্রতিবেদনটি শুরু হয়েছিল সেই ব্যাখ্যা দিয়ে। তরমুজে পানির পরিমাণ অনেক বেশি, আর এই আর্দ্র শাঁস ব্যাকটেরিয়া বৃদ্ধির উপযোগী পরিবেশ তৈরি করে। কাটা ফল বেশিক্ষণ বাইরে পড়ে থাকলে, বিশেষ করে গরম আবহাওয়ায়, জীবাণু দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, তরমুজ কাটার পর এর ভেতরের অংশ বাতাস, হাত কিংবা অপরিষ্কার ছুরির সংস্পর্শে এসে সহজেই দূষিত হতে পারে। খোলা অবস্থায় ফ্রিজে রাখলে অন্য খাবারের গন্ধও তরমুজে ঢুকে যেতে পারে, যা এর স্বাদ ও গুণমান নষ্ট করে।
এরপর কাটা তরমুজ সংরক্ষণের চারটি নিয়ম তুলে ধরা হয়:
- কাটার আগে ভালোভাবে ধুয়ে নিন। খোসা খাওয়া হয় না বলে অনেকে ধোয়ার প্রয়োজন মনে করেন না, অথচ তরমুজের বাইরের অংশে মাটি, ধুলা বা জীবাণু থাকতে পারে, যা কাটার সময় ছুরির মাধ্যমে ভেতরে চলে যেতে পারে।
- পরিষ্কার ছুরি ও কাটিং বোর্ড ব্যবহার করুন। অপরিষ্কার ছুরি বা কাঁচা মাছ-মাংস কাটার বোর্ড ব্যবহার করলে জীবাণু ছড়ানোর ঝুঁকি বাড়ে, তাই ফল কাটার জন্য আলাদা ও পরিষ্কার সরঞ্জাম ব্যবহার করা ভালো।
- কাটা তরমুজ কখনো খোলা অবস্থায় ফ্রিজে রাখবেন না। খোলা টুকরো শুকিয়ে যায় এবং সহজে দূষিত হয়; এয়ারটাইট বাক্সে বা ভালোভাবে ঢাকা পাত্রে রাখুন।
- দ্রুত ফ্রিজে রাখুন। কাটা তরমুজ দীর্ঘ সময় ঘরের তাপমাত্রায় ফেলে রাখা ঠিক নয়: দুই ঘণ্টার বেশি বাইরে থাকলে ব্যাকটেরিয়া জন্মাতে পারে, আর গরমের দিনে এই সময়সীমা আরও কমে আসে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, কাটা তরমুজ তিন থেকে চার দিনের বেশি ফ্রিজে রাখা ঠিক নয়, আর অস্বাভাবিক গন্ধ, পিচ্ছিল ভাব বা রঙের পরিবর্তন দেখা গেলে সেই টুকরো না খাওয়াই ভালো। ফ্রিজে রাখার সময় চারটি ভুল এড়াতে বলা হয়: কাটা তরমুজ বারবার বাইরে এনে আবার ফ্রিজে রাখা; অন্য কাঁচা খাবারের পাশে খোলা অবস্থায় রাখা; নোংরা হাতে বারবার ধরা; এবং অতিরিক্ত ঠান্ডায় জমিয়ে রাখা, যাতে প্রতিবেদনের ভাষায় স্বাদ নষ্ট হতে পারে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, শিশু, বয়স্ক এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম এমন মানুষের জন্য বাসি বা দূষিত ফল বেশি ঝুঁকিপূর্ণ; তাদের জন্য দীর্ঘ সময় রাখা কাটা ফলের বদলে তাজা ফলই ভালো।
খাদ্য নিরাপত্তার নিয়মে কাটা তরমুজ কেন ঝুঁকিপূর্ণ খাবার
প্রতিবেদনের এই উদ্বেগ এফডিএ-ও স্বীকার করে। দোকান, রেস্তোরাঁ ও অন্যান্য খাদ্য ব্যবসার জন্য সংস্থাটির আদর্শ খাদ্য নিরাপত্তা বিধিমালা ‘ফুড কোড’, যার ২০২২ সালের সংস্করণ প্রকাশিত হয় এবং যুক্তরাষ্ট্রের স্থানীয়, অঙ্গরাজ্য ও কেন্দ্রীয় পর্যায়ের কর্তৃপক্ষ তা গ্রহণ করতে পারে, কাটা তরমুজজাতীয় ফলকে (কাট মেলন) ‘নিরাপত্তার জন্য সময় ও তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ প্রয়োজন এমন খাবার’, সংক্ষেপে টিসিএস খাবারের তালিকায় রেখেছে। ফুড কোডের সংজ্ঞায় এগুলো এমন খাবার, যাতে রোগ সৃষ্টিকারী অণুজীবের বৃদ্ধি বা বিষাক্ত পদার্থ তৈরি ঠেকাতে সময় ও তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করতে হয়। একই তালিকায় আছে কাটা পাতাজাতীয় সবজি, কাটা টমেটো এবং কাঁচা বীজের অঙ্কুর।
আস্ত অবস্থায় যে ফল নিরীহ, কাটার পর তা কেন ঝুঁকির কারণ হয়, ফুড কোডের একটি ব্যাখ্যামূলক সংযোজনীতে তা বলা আছে। সেখানে কাটা তরমুজজাতীয় ফল, কাটা টমেটো ও কাটা পাতাজাতীয় সবজিকে এমন খাবারের উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, যেগুলোর ক্ষেত্রে কাটার পর রোগজীবাণু কোষরস ও পুষ্টি উপাদানের সংস্পর্শে এলে খাবারের নিজস্ব বৈশিষ্ট্য ব্যাকটেরিয়ার বৃদ্ধি ঠেকাতে পারে না। সংযোজনীতে আরও বলা হয়েছে, কাটার পর তরমুজজাতীয় ফল ফ্রিজে রাখতে হবে, যাতে এতে থাকা কোনো রোগজীবাণু বংশবৃদ্ধি করতে না পারে। টিসিএস খাবার ঠান্ডা রাখার জন্য ফুড কোডের নির্ধারিত তাপমাত্রা ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস (৪১ ডিগ্রি ফারেনহাইট) বা তার নিচে।
তরমুজের গঠন থেকেই বোঝা যায়, প্রতিবেদন কেন আর্দ্রতার কথা বলেছে। যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগের ফুডডেটা সেন্ট্রাল তথ্যভান্ডার অনুযায়ী, ১০০ গ্রাম কাঁচা তরমুজে আছে ৯১.৪৫ গ্রাম পানি, ৭.৫৫ গ্রাম শর্করা, ০.৬১ গ্রাম প্রোটিন, ০.১৫ গ্রাম চর্বি ও ০.৪ গ্রাম খাদ্য আঁশ, আর এতে পাওয়া যায় ৩০ কিলোক্যালরি শক্তি। একই ১০০ গ্রামে আছে ১১২ মিলিগ্রাম পটাশিয়াম, ৮.১ মিলিগ্রাম ভিটামিন সি এবং ৪,৫৩২ মাইক্রোগ্রাম লাইকোপিন।
ঠান্ডা ব্যাকটেরিয়ার বৃদ্ধি ধীর করে, কিন্তু সব ব্যাকটেরিয়া থামিয়ে দেয় না। ২০০৬ সালে প্রকাশিত ডব্লিউএইচওর ‘ফাইভ কিজ টু সেফার ফুড’ (নিরাপদ খাবারের পাঁচ চাবিকাঠি) ম্যানুয়ালে ‘খাবার ফ্রিজে রাখলে কেবল ব্যাকটেরিয়ার বৃদ্ধি ধীর হয়’ কথাটিকে সঠিক বলে চিহ্নিত করা হয়েছে। ২০২৪ সালের ৪ অক্টোবরের খাদ্য নিরাপত্তা বিষয়ক তথ্যপত্রে ডব্লিউএইচও জানায়, খাদ্যবাহিত সংক্রমণের মধ্যে সবচেয়ে গুরুতরগুলোর একটি লিস্টেরিয়া ব্যাকটেরিয়া বিভিন্ন তৈরি খাবারে পাওয়া যায় এবং এটি ফ্রিজের তাপমাত্রাতেও বাড়তে পারে। তাই কাটা ফল কত তাপমাত্রায় রাখা হচ্ছে শুধু তা নয়, কত দিন ধরে রাখা হচ্ছে সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।

ধোয়া ও কাটা: এফডিএর পরামর্শ
প্রতিবেদনের প্রথম দুটি নিয়ম, অর্থাৎ ফল ধুয়ে নেওয়া ও পরিষ্কার সরঞ্জাম ব্যবহার, এফডিএর ভোক্তা নির্দেশিকা ‘সিলেক্টিং অ্যান্ড সার্ভিং প্রোডিউস সেফলি’র সঙ্গে মিলে যায়; নির্দেশিকাটির বিষয়বস্তু ২০২৪ সালের ৫ মার্চ পর্যন্ত হালনাগাদ। তাজা ফল ও সবজি প্রস্তুতের জন্য সংস্থাটির পরামর্শ:
- পরিষ্কার হাত দিয়ে শুরু করুন: প্রস্তুতের আগে ও পরে সাবান ও কুসুম গরম পানি দিয়ে অন্তত ২০ সেকেন্ড হাত ধুয়ে নিন।
- প্রস্তুত করা বা খাওয়ার আগে ফলের থেঁতলানো বা নষ্ট অংশ কেটে ফেলুন, আর যে ফল পচা দেখায় তা ফেলে দিন।
- প্রস্তুত করা বা খাওয়ার আগে সব ফল ও সবজি প্রবহমান পানিতে ভালোভাবে ধুয়ে নিন। খোসা খাওয়া না হলেও আগে ধুয়ে নেওয়া জরুরি, যাতে খোসা ছাড়ানো বা কাটার সময় বাইরের ময়লা ও ব্যাকটেরিয়া ভেতরে না যায়।
- সাবান, ডিটারজেন্ট বা বাজারের ‘প্রোডিউস ওয়াশ’ দিয়ে ফল ও সবজি ধোয়া এফডিএ সুপারিশ করে না।
- তরমুজজাতীয় ফল ও শসার মতো শক্ত খোসার ফল-সবজি পরিষ্কার ব্রাশ দিয়ে ঘষে নিন।
- ধোয়ার পর পরিষ্কার কাপড় বা কাগজের তোয়ালে দিয়ে মুছে শুকিয়ে নিন, এতে উপরিভাগে থাকা ব্যাকটেরিয়া আরও কমে।
অন্য খাবার থেকে ফল আলাদা রাখার বিষয়ে এফডিএর পরামর্শ হলো, কাঁচা খাওয়া হবে এমন ফল-সবজি কাঁচা মাংস, মুরগি ও সামুদ্রিক খাবার এবং সেগুলোর জন্য ব্যবহৃত সরঞ্জাম থেকে দূরে রাখতে হবে; এক কাজ থেকে আরেক কাজে যাওয়ার মাঝে কাটিং বোর্ড, সরঞ্জাম ও রান্নাঘরের তাক সাবান ও গরম পানি দিয়ে ধুতে হবে; আর সম্ভব হলে ফল-সবজির জন্য আলাদা কাটিং বোর্ড ব্যবহার করতে হবে। সংস্থাটি এটিও মনে করিয়ে দেয় যে ধোয়ার ফলে ব্যাকটেরিয়া কমে, কিন্তু পুরোপুরি দূর হয় না।
ডব্লিউএইচও তার নিরাপদ খাবারের পাঁচ চাবিকাঠির প্রথমটি, ‘পরিচ্ছন্ন থাকুন’, দিয়ে একই কথা বলে। সংস্থাটির ম্যানুয়াল অনুযায়ী, বেশির ভাগ অণুজীব রোগ সৃষ্টি করে না, কিন্তু বিপজ্জনক অণুজীব মাটি, পানি, প্রাণী ও মানুষের মধ্যে ব্যাপকভাবে পাওয়া যায়; এগুলো হাত, মোছার কাপড় ও সরঞ্জামে, বিশেষ করে কাটিং বোর্ডে বাহিত হয়, আর সামান্য সংস্পর্শেই খাবারে চলে যেতে পারে। ম্যানুয়ালে খাবার ধরার আগে ও প্রস্তুতের সময় বারবার হাত ধোয়া, খাবার প্রস্তুতে ব্যবহৃত সব জায়গা ও সরঞ্জাম ধুয়ে জীবাণুমুক্ত করা এবং রান্নাঘর ও খাবারকে পোকামাকড়, ক্ষতিকর প্রাণী ও অন্যান্য প্রাণী থেকে রক্ষা করার কথা বলা হয়েছে। বাকি চারটি চাবিকাঠি হলো কাঁচা ও রান্না করা খাবার আলাদা রাখা, ভালোভাবে রান্না করা, খাবার নিরাপদ তাপমাত্রায় রাখা এবং নিরাপদ পানি ও কাঁচামাল ব্যবহার করা।
ঘরের তাপমাত্রায় দুই ঘণ্টা, তারপর ফ্রিজ
কাটা ফল দুই ঘণ্টার বেশি বাইরে না রাখা এবং গরমের দিনে আরও কম সময় রাখা নিয়ে প্রতিবেদনের সতর্কবার্তা আসলে পচনশীল খাবারের জন্য এফএসআইএসের নিয়ম। বাসি বা বেঁচে যাওয়া খাবার নিয়ে নির্দেশিকায় সংস্থাটি বলেছে, ৪০ থেকে ১৪০ ডিগ্রি ফারেনহাইটের মধ্যে ব্যাকটেরিয়া দ্রুত বাড়ে, এই তাপমাত্রার পরিসরকে তারা ‘বিপদ অঞ্চল’ (ডেঞ্জার জোন) বলে। দুই ঘণ্টার বেশি ঘরের তাপমাত্রায় থাকা সব পচনশীল খাবার ফেলে দিতে হবে; তাপমাত্রা ৯০ ডিগ্রি ফারেনহাইটের বেশি হলে, যেমন গ্রীষ্মে খোলা জায়গায় পিকনিকে, এই সময় এক ঘণ্টা। এফএসআইএস বলছে, ঠান্ডা পচনশীল খাবার ৪০ ডিগ্রি ফারেনহাইট বা তার নিচে রাখতে হবে।
এফডিএর নির্দেশিকাতেও ফ্রিজের একই তাপমাত্রার কথা আছে। পচনশীল তাজা ফল ও সবজি পরিষ্কার ফ্রিজে ৪০ ডিগ্রি ফারেনহাইট বা তার নিচে রাখতে, ফ্রিজের থার্মোমিটার দিয়ে তাপমাত্রা যাচাই করতে এবং কেটে বা প্যাকেট করে কেনা সব ফল-সবজি ফ্রিজে রাখতে বলেছে সংস্থাটি।
প্রতিবেদনের তৃতীয় নিয়ম, ফল ঢেকে রাখা, এফএসআইএসের নির্দেশিকাতেও সমর্থিত। বেঁচে যাওয়া খাবার ঢেকে রাখতে, বায়ুরোধী মোড়কে মুড়িয়ে রাখতে বা সংরক্ষণের পাত্রে বন্ধ করে রাখতে বলেছে সংস্থাটি, কারণ এতে ব্যাকটেরিয়া ঢুকতে পারে না, আর্দ্রতা বজায় থাকে এবং ফ্রিজের অন্য খাবারের গন্ধ খাবারে লাগে না। খোলা তরমুজ নিয়ে প্রতিবেদন ঠিক এই তিনটি সমস্যার কথাই বলেছিল: দূষণ, শুকিয়ে যাওয়া আর গন্ধ শুষে নেওয়া। এফএসআইএস আরও বলেছে, মোড়ানো খাবার দ্রুত ঠান্ডা করার জন্য সঙ্গে সঙ্গে ফ্রিজে বা ফ্রিজারে রাখতে হবে।

কাটা তরমুজ কত দিন ভালো থাকে
ফ্রিজে তিন থেকে চার দিনের যে সীমা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তা যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগের ‘ফুডকিপার’ তথ্যভান্ডারের সঙ্গে মিলে যায়। ২০২৫ সালের জুলাইয়ে আর্কাইভ করা এফএসআইএসের প্রকাশিত ফুডকিপার তথ্যে তরমুজের জন্য কেনার দিন থেকে ফ্রিজে তিন থেকে চার দিন, ঘরের তাকে এক থেকে দুই দিন বা পাকা না হওয়া পর্যন্ত, এবং ফ্রিজারে ১২ মাস সময় দেওয়া আছে। তরমুজজাতীয় ফলের সাধারণ তালিকায় বলা আছে, আস্ত ফল পাকা পর্যন্ত এবং তারপর সাত দিন ঘরের তাপমাত্রায় রাখা যায়, আর একবার কাটা হলে ফ্রিজে দুই থেকে চার দিন; জমিয়ে রাখার ক্ষেত্রে এক মাস, এবং এই হিসাব গোল করে কাটা টুকরোর (বল্ড মেলন) জন্য প্রযোজ্য বলে উল্লেখ আছে।
পচা দেখায় এমন ফল ফেলে দেওয়ার যে পরামর্শ এফডিএ দিয়েছে, তার মধ্যেই পড়ে প্রতিবেদনে বলা লক্ষণগুলো: অস্বাভাবিক গন্ধ, পিচ্ছিল ভাব বা রঙের পরিবর্তন।
জমিয়ে রাখা নিয়ে প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছিল, অতিরিক্ত ঠান্ডায় জমালে তরমুজের স্বাদ নষ্ট হতে পারে। ফুডকিপারের হিসাব বলছে, তরমুজ জমিয়ে রাখা যায়; আর এফএসআইএস তার নির্দেশিকায় জানিয়েছে, জমানো খাবার অনির্দিষ্টকাল নিরাপদ থাকলেও ফ্রিজারে দীর্ঘ সময় থাকলে তার আর্দ্রতা ও স্বাদ কমে যেতে পারে। অর্থাৎ জমিয়ে রাখার প্রশ্নটি নিরাপত্তার চেয়ে মানের।
কারা বেশি ঝুঁকিতে, কখন চিকিৎসকের কাছে যাবেন
শিশু, বয়স্ক ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম এমন মানুষের জন্য প্রতিবেদনের বাড়তি সতর্কতার সঙ্গে স্বাস্থ্য সংস্থাগুলোও একমত। এফডিএ বলছে, শিশু, বয়স্ক, অন্তঃসত্ত্বা নারী এবং দুর্বল রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার মানুষ খাদ্যবাহিত রোগে বেশি ঝুঁকিতে থাকেন। সংস্থাটির তথ্যমতে, দূষিত খাবার খাওয়ার সাধারণত এক থেকে তিন দিন পর উপসর্গ দেখা দেয়, তবে তা ২০ মিনিট থেকে ছয় সপ্তাহ পর্যন্ত যেকোনো সময় দেখা দিতে পারে। খাদ্যবাহিত রোগের সন্দেহ হলে সঙ্গে সঙ্গে স্বাস্থ্যসেবাদাতার সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেছে এফডিএ।
ডব্লিউএইচওর ম্যানুয়াল অনুযায়ী, খাদ্যবাহিত রোগের সবচেয়ে সাধারণ উপসর্গ পেটব্যথা, বমি ও ডায়রিয়া, এবং বেশির ভাগ খাদ্যবাহিত রোগে খাবার খাওয়ার ২৪ থেকে ৭২ ঘণ্টা পর উপসর্গ দেখা দেয়। শিশু, অসুস্থ, অন্তঃসত্ত্বা নারী ও বয়স্কদের ক্ষেত্রে এর পরিণতি সাধারণত বেশি গুরুতর হয় এবং বেশি প্রাণঘাতী হয়। ডায়রিয়ার সময় পানিশূন্যতা এড়াতে প্রচুর তরল পান করতে, পায়খানা খুব ঘন ঘন বা খুব পাতলা হলে, তাতে রক্ত গেলে বা তিন দিনের বেশি চললে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে এবং উপসর্গ গুরুতর হলে সঙ্গে সঙ্গে চিকিৎসা নিতে বলেছে সংস্থাটি। অসুস্থ অবস্থায় এবং উপসর্গ সেরে যাওয়ার পর ৪৮ ঘণ্টা খাবার নাড়াচাড়া বা প্রস্তুত না করার পরামর্শও দেওয়া হয়েছে।
সমস্যাটির পরিসরও বড়। ২০২৪ সালের অক্টোবরের তথ্যপত্রে ডব্লিউএইচওর হিসাব ছিল, বিশ্বে প্রতিবছর প্রায় প্রতি ১০ জনে একজন, অর্থাৎ আনুমানিক ৬০ কোটি মানুষ দূষিত খাবার খেয়ে অসুস্থ হন এবং ৪ লাখ ২০ হাজার মানুষ মারা যান। খাদ্যবাহিত রোগের বোঝার ৪০ শতাংশ বহন করে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুরা, যাদের মধ্যে প্রতিবছর ১ লাখ ২৫ হাজার জনের মৃত্যু হয়। তথ্যপত্রে বলা হয়েছে, এন্টারোহেমোরেজিক ই. কোলাই ব্যাকটেরিয়া প্রায়ই অপাস্তুরিত দুধ, কম রান্না করা মাংস এবং দূষিত তাজা ফল ও সবজির সঙ্গে যুক্ত থাকে; সালমোনেলা, ক্যাম্পাইলোব্যাক্টার ও এই ই. কোলাই সবচেয়ে সাধারণ খাদ্যবাহিত রোগজীবাণুগুলোর অন্যতম, যেগুলোর উপসর্গের মধ্যে জ্বর, মাথাব্যথা, বমিভাব, বমি, পেটব্যথা ও ডায়রিয়া থাকতে পারে।
কাটা তরমুজ থেকে যখন রোগ ছড়িয়েছিল
ফুড কোড যে ঝুঁকির কথা বলে, বাস্তবেও তা দেখা গেছে। ২০১৮ সালের ১২ জুন এফডিএ জানায়, আগে থেকে কাটা তরমুজজাতীয় ফলের সঙ্গে যুক্ত সালমোনেলা অ্যাডিলেইড সংক্রমণের একটি প্রাদুর্ভাব তারা যুক্তরাষ্ট্রের রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্র (সিডিসি) এবং অঙ্গরাজ্য ও স্থানীয় কর্মকর্তাদের সঙ্গে মিলে তদন্ত করছে। এফডিএর উল্লেখ করা সিডিসির হিসাবে, ২০১৮ সালের ৩০ এপ্রিল থেকে ৩০ মে পর্যন্ত ৬০ জন অসুস্থ হন এবং ৩১ জনকে হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়; কোনো মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়নি। অসুস্থদের মধ্যে মিশিগানে ৩২ জন, ইন্ডিয়ানায় ১১ জন, মিসৌরিতে ১০ জন, ইলিনয়ে ৬ জন এবং ওহাইওতে ১ জন ছিলেন।
সংশ্লিষ্ট পণ্যগুলো ছিল আগে থেকে কাটা তরমুজ, হানিডিউ ও ক্যান্টালুপ মেলন এবং এসব মেলন মেশানো ফলের সালাদ বা কাটা ফলের মিশ্রণ, যা ইন্ডিয়ানার ইন্ডিয়ানাপোলিসে একটি খাদ্য প্রতিষ্ঠানের কারখানায় তৈরি হয়ে স্বচ্ছ প্লাস্টিকের ঢাকনাওয়ালা পাত্রে প্যাকেট করা হয়েছিল। প্রতিষ্ঠানটি পণ্যগুলো বাজার থেকে প্রত্যাহার করে নেয়। এফডিএ ভোক্তাদের এসব পণ্য না খেতে, ফেলে দিতে বা দোকানে ফেরত দিয়ে টাকা ফেরত নিতে, এবং সালমোনেলা সংক্রমণ হয়েছে মনে হলে স্বাস্থ্যসেবা পেশাজীবীর পরামর্শ নিতে বলে। নোটিশ প্রকাশের সময় ফল কীভাবে দূষিত হয়েছিল, সেই তদন্ত চলছিল। ঘটনাটি মনে করিয়ে দেয়, ফল ঘরে পৌঁছানোর আগেই দূষণ শুরু হতে পারে; তাই প্রতিবেদনে বলা ঠান্ডায় রাখা ও পরিচ্ছন্নভাবে নাড়াচাড়ার নিয়ম প্রতিটি ধাপেই জরুরি।
বাংলাদেশে তরমুজ ও ২০২৬ সালের মৌসুম
তরমুজের বৈজ্ঞানিক নাম সিট্রুলাস ল্যানাটাস (Citrullus lanatus); এটি লাউ-কুমড়ার পরিবার কিউকারবিটেসির উদ্ভিদ। এর ফল ‘পেপো’ নামের এক ধরনের বেরি, যার খোসা পুরু আর ভেতরে রসালো শাঁস; লাল বা গোলাপি শাঁসে থাকে অনেক বীজ। আধুনিক তরমুজ উত্তর-পূর্ব আফ্রিকায় গৃহপালিত ফসলে পরিণত হয়েছিল বলে মনে করা হয়।
বাংলাদেশে তরমুজ চাষ হয় মূলত দক্ষিণের উপকূলীয় জেলাগুলোতে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) তথ্য উদ্ধৃত করে দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড ২০২৪ সালের ২৯ ফেব্রুয়ারি জানায়, ২০২১-২২ অর্থবছরে দেশে রেকর্ড ২৫ লাখ ৪৭ হাজার টন তরমুজ উৎপাদিত হয়। শীর্ষ জেলা পটুয়াখালীতে উৎপাদন ছিল ৯ লাখ ৬৩ হাজার টন, যা জাতীয় উৎপাদনের ৩৭.৮ শতাংশ; এরপর খুলনা ৫ লাখ ৫৯ হাজার টন (২২ শতাংশ), ভোলা ৫ লাখ ১৩ হাজার টন (২০.২ শতাংশ), নোয়াখালী ১ লাখ ৬০ হাজার টন (৬.৩ শতাংশ) এবং বরগুনা ৭৮ হাজার টন (৩.১ শতাংশ)। বরিশালে ডিএইর এক আঞ্চলিক কর্মকর্তা পত্রিকাটিকে জানান, জমি তৈরি থেকে মৌসুম শেষ হওয়া পর্যন্ত তরমুজ চাষে প্রায় চার মাস লাগে।

জাগো নিউজের প্রতিবেদন যখন প্রকাশিত হয়, তখন ২০২৬ সালের বড় একটি মৌসুম শেষের দিকে। দ্য ডেইলি স্টার ২০২৬ সালের ৬ এপ্রিল জানায়, বরিশাল অঞ্চলে ডিএই ৬২ হাজার ৬৮৭ হেক্টর জমিতে আবাদের লক্ষ্য ঠিক করেছিল, আর কৃষকেরা তরমুজ লাগান ৭০ হাজার ৬৬২ হেক্টরে, যা লক্ষ্যের প্রায় ১১৩ শতাংশ; আগের বছরের প্রায় ২১ লাখ টনের তুলনায় উৎপাদন ২৮ লাখ টন ছাড়িয়ে যাবে বলে আশা করা হচ্ছিল। দেশের মোট তরমুজের প্রায় ৭৫ শতাংশ আসে এই অঞ্চল থেকে। শুধু পটুয়াখালীতেই প্রায় ৩৫ হাজার হেক্টরে তরমুজ চাষ হয়, অন্যদিকে খুলনায় আবাদ ১৭ হাজার ২৯১ হেক্টর থেকে কমে ১২ হাজার ৯৩০ হেক্টরে নামে। পত্রিকাটি দেখতে পায়, কৃষকেরা মাঝারি থেকে বড় তরমুজ প্রতিটি ৫০ থেকে ৯০ টাকায় বিক্রি করছেন, অথচ খুচরা বাজারে দাম ১০০ থেকে ৫০০ টাকা। ডিএই বরিশালের একজন অতিরিক্ত পরিচালক বলেন, কৃষকেরা প্রত্যাশিত দাম পাচ্ছেন না এবং কেউ কেউ খেতেই ফল ফেলে রাখছেন; ব্যবসায়ীরা জানান, রমজানের পর চাহিদা কমে গেছে।

বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ
বাংলাদেশে খাদ্য নিরাপত্তার দায়িত্বে আছে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ (বিএফএসএ), যা নিরাপদ খাদ্য আইন, ২০১৩-এর অধীনে ২০১৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে গঠিত হয় এবং খাদ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে কাজ করে। কর্তৃপক্ষের ওয়েবসাইটে, ২০২৪ সালের ৬ অক্টোবর সর্বশেষ হালনাগাদ করা একটি পাতায়, এর প্রধান দায়িত্ব বলা হয়েছে বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতির যথাযথ অনুশীলনের মাধ্যমে নিরাপদ খাদ্যপ্রাপ্তির অধিকার নিশ্চিত করা; এ জন্য খাদ্য উৎপাদন, আমদানি, প্রক্রিয়াকরণ, মজুদ, সরবরাহ ও বিক্রয় সংশ্লিষ্ট কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ ও পরিবীক্ষণ এবং নিরাপদ খাদ্য ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত সব সংস্থার কাজের সমন্বয় করা।
একই পাতায় কর্তৃপক্ষের কাজের তালিকায় আছে খাদ্য গ্রহণজনিত কারণে স্বাস্থ্যঝুঁকি চিহ্নিত করা, জৈবিক ঝুঁকির প্রাদুর্ভাব ও ব্যাপকতা চিহ্নিত করা, খাদ্যদ্রব্যের স্বাস্থ্য ও পুষ্টি সংক্রান্ত ঝুঁকির বার্তা সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো এবং জনসাধারণকে তা জানানো, খাদ্য ব্যবসায় যুক্ত ব্যক্তিদের নিরাপদ খাদ্য বিষয়ে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা এবং নিরাপদ খাদ্যের গুণগত মান সম্পর্কে জনসচেতনতা সৃষ্টি করা।
ছবি: রংগি / উইকিমিডিয়া কমন্স (পাবলিক ডোমেইন)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসন (সিলেক্টিং অ্যান্ড সার্ভিং প্রোডিউস সেফলি; ফুড কোড ২০২২; ১২ জুন ২০১৮-র প্রাদুর্ভাব বিজ্ঞপ্তি), ইউএসডিএর খাদ্য নিরাপত্তা ও পরিদর্শন সেবা (লেফটওভারস অ্যান্ড ফুড সেফটি; ফুডকিপার), ইউএসডিএ ফুডডেটা সেন্ট্রাল, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ফাইভ কিজ টু সেফার ফুড ম্যানুয়াল; খাদ্য নিরাপত্তা তথ্যপত্র), বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ, দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, দ্য ডেইলি স্টার, উইকিপিডিয়া





মন্তব্য
(০)