ঢাকার উত্তর-পশ্চিম প্রান্তে সাভার উপজেলার বিরুলিয়া ইউনিয়নের গোলাপ চাষিরা ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে ভালো ছিলেন না। ২০২৫ সালের ৯ ডিসেম্বর সকালে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জাগো নিউজ ২৪-এর সাভার উপজেলা প্রতিনিধি লেখেন, গোলাপ গ্রাম নামে পরিচিত এলাকায় আবাসন প্রকল্পের চাপে গোলাপ বাগান ক্রমেই কমছে, আর সেচ সংকটসহ নানা কারণে কমছে উৎপাদনও। সাভার উপজেলা কৃষি অফিস জানায়, গোলাপের ফলন বাড়াতে তারা কাজ করছে; আর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা বলেন, আবাসন প্রকল্প ঠেকাতে সরকারকেই হস্তক্ষেপ করতে হবে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, আগে শুধু বিরুলিয়াতেই ২০০ হেক্টর জমিতে গোলাপ চাষ হতো; প্রতিবেদনের সময় তা কমে দাঁড়িয়েছিল ১১০ হেক্টরে। প্রতিবেদনে বলা হয়, বাগানের গোলাপ এ অঞ্চলের চাষিদের কাছে আশীর্বাদের মতো, যা থেকে প্রতি মৌসুমে আয় আসে প্রায় শত কোটি টাকা; তবে সেই আয়ের রেখা তখন নিম্নমুখী।
বাগানে খরা, জমিতে সাইনবোর্ড
সরেজমিন ঘুরে প্রতিবেদক দেখেন, বিরুলিয়ার গোলাপ গ্রামে উৎপাদনে থাকা বাগানেও খরা পড়েছে। একের পর এক গোলাপ বাগান হারিয়ে যাচ্ছে, আর হারিয়ে যাওয়া বাগানের মাটিও কেটে নিচ্ছেন কেউ কেউ। প্রতিবেদনে এর পেছনে আবাসন প্রকল্পের কথা বলা হয়: বিভিন্ন স্থানে জমি কব্জায় নিয়ে সেখানে সাইনবোর্ড সাঁটানো হয়েছে, কোথাও কোথাও মাটি কেটে জমিকে মরুভূমির মতো করে রাখা হয়েছে।
যেসব বাগানে তখনো গোলাপ চাষ হচ্ছিল, সেগুলোতেও চাষিরা আশানুরূপ ফলন পাননি। কোনো কোনো বাগানে পানির অভাবে ফুল নেতিয়ে পড়েছিল, গাছের গোড়ার মাটি শুকিয়ে ফেটে গিয়েছিল।

জমি বিক্রিতে চাপের অভিযোগ চাষিদের
প্রতিবেদনে মজনু, রহিম ও ইয়াসিন নামে উল্লেখ করা একাধিক ব্যক্তি অভিযোগ করেন, কৃষকদের জমি বিক্রি করতে বাধ্য করা হচ্ছে। তাদের অভিযোগ অনুযায়ী, আবাসন কোম্পানির লোকজন স্থানীয় একটি চক্রকে লালন করে, আর সেই চক্র নানা হয়রানি ও কৌশলে কৃষকের জমি কোম্পানির হাতে তুলে দেয়। তারা আরও অভিযোগ করেন, কৃষকের বাগানে যাওয়ার সড়কে কোম্পানি প্রতিবন্ধকতা তৈরি করেছে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, কৃষক যেন চাষাবাদ করতে না পারেন, সেজন্য সেচের গভীর নলকূপ তুলে ফেলার অভিযোগও রয়েছে। প্রতিবেদনে কোনো কোম্পানির নাম বা কোনো কোম্পানির বক্তব্য ছিল না।
প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা বলা আরও কয়েকজন কৃষকের চোখেমুখে ছিল আতঙ্কের ছাপ; তারা নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ জানান। তাদের ভাষ্য, আবাসন প্রকল্পের মালিকের বিরুদ্ধে কিছু বললে নানা ষড়যন্ত্রের জালে পড়তে হয়।
কমছে বাগান, কমছে দর্শনার্থী
ঢাকার মানুষের কাছে গোলাপ গ্রাম দীর্ঘদিন ধরেই বেড়ানোর প্রিয় জায়গা। প্রতিবেদনে বলা হয়, উৎপাদনের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে দর্শনার্থীও কমছে, আর যারা তখনো আসছিলেন, তারা ফুলশূন্য বাগান ও বাগানের আশপাশের পরিবেশ দেখে হতাশ হচ্ছিলেন।
ঢাকা থেকে গোলাপ গ্রামে ঘুরতে আসা কলেজছাত্র সাবান মাহমুদ প্রতিবেদককে বলেন, বিস্তৃত যে জমি তখন পতিত পড়ে ছিল, সেখানে একসময় বাতাসে দোল খেত নানা রঙের গোলাপ। তার ভাষ্য, আবাসন প্রকল্পের কারণে উর্বর জমিগুলো পতিত হয়ে আছে।
মেহেরুন ও রুমা দম্পতি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ঢাকার আশপাশে এমন একটি জায়গা ছিল, যেখানে একটু হলেও বিশুদ্ধ শ্বাস নেওয়া যেত, কিন্তু তা এখন অতীত। তাদের ভাষায়, মাটি কাটতে কাটতে ভূমিখেকোরা বাগানগুলো শেষ করে দিচ্ছে; এদের আইনের আওতায় আনতে হবে, না হলে গোলাপ গ্রাম বাঁচানো যাবে না।

কৃষি অফিস যা বলেছে
সাভার উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আল মামুন জাগো নিউজকে জানান, তিনিও গোলাপ গ্রাম নিয়ে উদ্বিগ্ন। তিনি বলেন, ফলন বৃদ্ধির বিষয়ে তারা কাজ করছেন, তবে আবাসন বন্ধের বিষয়ে সরকারকেই হস্তক্ষেপ করতে হবে। তার মতে, দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে গোলাপ গ্রাম বড় ক্ষতির মুখে পড়বে।
কৃষি অফিসের এই উদ্বেগ আগের মৌসুমগুলোতেও শোনা গেছে। গোলাপ চাষের জমির পরিমাণ নিয়ে বিভিন্ন প্রতিবেদনে ভিন্ন ভিন্ন হিসাব এসেছে; জাগো নিউজের প্রতিবেদনে ২০০ হেক্টরের হিসাবটি কোন বছরের, তা বলা হয়নি। ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে সাভারের তৎকালীন উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ঢাকা ট্রিবিউনকে বলেন, বিরুলিয়া ইউনিয়নের কয়েকটি গ্রামে ২৮০ হেক্টর জমিতে বিভিন্ন জাতের গোলাপ চাষ হয়। তিনি জানান, অন্যান্য বছর সাত থেকে আট মাসের এক মৌসুমে ১০ থেকে ১২ কোটি টাকার ফুল বিক্রি হয়, তবে সে বছর ফলন খুব ভালো হওয়ায় প্রায় ২০ কোটি টাকার ফুল বিক্রির লক্ষ্য ঠিক করা হয়েছিল। শ্যামপুরের এক চাষি তখন পত্রিকাটিকে জানান, বাগান থেকে প্রতিটি গোলাপ ৩ থেকে ৪ টাকায় বিক্রি হচ্ছিল।
২০২৪ সালে এখন টিভির প্রতিবেদনে উপজেলা কৃষি অফিসের তথ্য উল্লেখ করে বলা হয়, সে বছর বিরুলিয়া ইউনিয়নের ১৪টি গ্রামে ৩০৫ হেক্টর জমিতে গোলাপসহ বিভিন্ন ফুল চাষ হয়েছে, যার ২৩০ হেক্টরে গোলাপ। তখনকার উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা বলেন, দিন দিন কৃষিজমি কমে যাচ্ছে, আর এতে গোলাপের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন হচ্ছে না। চাষিরা চ্যানেলটিকে বলেন, হাউজিং কোম্পানি কৃষিজমি কিনে নেওয়ায় ফুল চাষ কমে গেছে; অজ্ঞাত রোগেও উৎপাদন কমেছিল।
গোলাপ গ্রাম কোথায়
বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটির জাতীয় জ্ঞানকোষ বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী, ঢাকা জেলার সাভার উপজেলার আয়তন ২৮০.১১ বর্গকিলোমিটার। এর উত্তরে কালিয়াকৈর ও গাজীপুর সদর উপজেলা, দক্ষিণে কেরানীগঞ্জ উপজেলা, পশ্চিমে ধামরাই ও সিংগাইর উপজেলা এবং পূর্বে ঢাকা মহানগরীর মোহাম্মদপুর, আদাবর, দারুস সালাম, শাহ আলী, পল্লবী ও তুরাগ থানা। প্রধান নদী ধলেশ্বরী, বংশী ও তুরাগ। সাভার থানা গঠিত হয় ১৯১২ সালে, উপজেলা হয় ১৯৮৩ সালে; ২০১১ সালের আদমশুমারিতে এখানকার জনসংখ্যা ছিল ১৩ লাখ ৮৫ হাজার ৯১০।
২০১১ সালের আদমশুমারির তথ্য ধরে বাংলাপিডিয়া জানায়, সাভারের ২০.৪৬ শতাংশ মানুষের আয়ের প্রধান উৎস কৃষি, যেখানে চাকরি ২৮.৭৪ শতাংশ এবং ব্যবসা ২০.৫৫ শতাংশ; কৃষিভূমির মালিকানায় ভূমিমালিক ৪২.৯৪ শতাংশ, ভূমিহীন ৫৭.০৬ শতাংশ। প্রধান কৃষি ফসল ধান, পাট, চীনাবাদাম ও শাকসবজি। উপজেলার প্রাচীন নিদর্শনের তালিকায় আছে বিরুলিয়া জমিদার বাড়ি।
বিরুলিয়ার পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া তুরাগ নদ ঢাকার মিরপুরের কাছে বুড়িগঙ্গায় মিশেছে। বাংলাপিডিয়া জানায়, এর নিম্নাংশে জোয়ার-ভাটা হয় এবং সারা বছর দেশি নৌকা চলাচল করতে পারে। ২০২৫ সালের নভেম্বরে দৈনিক কালবেলা জানায়, গোলাপ গ্রাম মূলত কুমার খোদা ও শিশার চর, এই দুই মৌজায় বিস্তৃত; মাঝ দিয়ে বয়ে গেছে স্থানীয়ভাবে শিশাচর নদী নামে পরিচিত একটি ছোট নদী, যা তুরাগে গিয়ে মিশেছে। শুষ্ক মৌসুমে কৃষকেরা এই নদীর পানি বাগানে ব্যবহার করতেন।
২০১৭ সালের মার্চে প্রথম আলোর এক প্রতিবেদনে বিরুলিয়া ইউনিয়নের সাদুল্লাপুর, শ্যামপুর, কমলাপুর ও বাগনিবাড়ি গ্রামজুড়ে লাল গোলাপের বাগানের বর্ণনা ছিল; সেখানে চাষিরা সাদা গোলাপ, জারবেরা ও গ্লাডিওলাসও চাষ করতেন। তখন দর্শনার্থীরা গাবতলী মাজার রোড বা মিরপুর-১ থেকে দিয়াবাড়ি বটতলা ঘাটে গিয়ে ট্রলারে সাদুল্লাপুর যেতেন; প্রতি ৩০ মিনিট পরপর ট্রলার ছাড়ত, পৌঁছাতে লাগত প্রায় আধা ঘণ্টা। কেউ কেউ মিরপুর বেড়িবাঁধ সড়ক দিয়ে গাড়িতেও যেতেন।
এ এলাকায় বাণিজ্যিক গোলাপ চাষের সূচনা সাধারণত একজন মানুষের হাত ধরে বলে ধরা হয়। ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে দ্য ডেইলি স্টার জানায়, ১৯৭৯ সালে জাতীয় চিড়িয়াখানায় মালী হিসেবে যোগ দেওয়া এক ব্যক্তি ১৯৮৩ সালে ৩৫০ টাকায় কেনা ১০টি গোলাপের চারা মিরপুরে নিজের বাসায় টবে লাগান, আর ১৯৮৯ সালে সাভারের সাদুল্লাপুরে ২০ শতাংশ জমি ইজারা নিয়ে বিক্রির জন্য গোলাপ চাষ শুরু করেন। তার ফুল যেত ঢাকার শাহবাগের পাইকারি বাজারে। পত্রিকাটির হিসাবে, ২০২১ সালের মধ্যে সাদুল্লাপুর এবং পাশের শ্যামপুর, মোস্তাপাড়া, বিরুলিয়া, ভাকুর্তা ও ভবানীপুর গ্রামের প্রায় ১ হাজার ৫০০ মানুষ বাণিজ্যিকভাবে গোলাপ চাষ করছিলেন। সেই পথিকৃৎ চাষি তখন পত্রিকাটিকে বলেন, চাষিদের দরকার গোলাপের একটি পাইকারি বাজার, ফুল সংরক্ষণের হিমাগার এবং রপ্তানিতে সরকারের সহযোগিতা।

জমি নিয়ে আগেও উঠেছিল উদ্বেগ
গোলাপ গ্রামের জমি নিয়ে দুশ্চিন্তা ২০২৫ সালে নতুন ছিল না। ২০১৭ সালের ডিসেম্বরে দ্য ডেইলি স্টারে প্রকাশিত এক কলামে টেলিভিশনের কৃষি অনুষ্ঠান 'হৃদয়ে মাটি ও মানুষ'-এর উপস্থাপক লেখেন, সাভার এলাকা ভূমিদস্যুদের দৌরাত্ম্যে আক্রান্ত; তারা কৃষিজমি ইজারা নিয়ে তা শিল্প বা অন্য কাজে ব্যবহার করে। কৃষকেরা তাকে কাঁটাতারে ঘেরা একটি এলাকা দেখান, আর দেখান বাঁশের মাথায় লাল কাপড় বাঁধা একটি জমি, যাকে তারা বিপদের সংকেত বলে উল্লেখ করেন। ইজারাধারীরা বলেছিলেন, তারা ভূমি সংস্কার বোর্ড থেকে বৈধভাবে ইজারা নিয়েছেন; অন্যদিকে স্থানীয়দের দাবি, এমন জমি ইজারা দেওয়ার এখতিয়ার কেবল জেলা প্রশাসকের। কলামে বলা হয়, জেলা প্রশাসক বিষয়টি জানতেন না। কলামটির হিসাবে সাভারে তখন প্রায় ৪০০ হেক্টর জমিতে ফুল চাষ হতো, যার ৩৫০ হেক্টরের বেশি জমিতে শুধু গোলাপ।
২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ঢাকা ট্রিবিউন জানায়, গোলাপ গ্রামের গোলাপ অজ্ঞাত এক ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছে, যাতে চাষিদের জীবিকা ঝুঁকিতে পড়েছে। এর দুই বছর পর আসে কৃষিজমি কমে যাওয়া নিয়ে এখন টিভির ওপরে উল্লেখ করা প্রতিবেদন।
জাগো নিউজের প্রতিবেদনের প্রায় দুই সপ্তাহ আগে, ২০২৫ সালের ২৩ নভেম্বর, কালবেলা প্রথম পাতায় এক প্রতিবেদন প্রকাশ করে। তাতে স্থানীয় চাষিরা অভিযোগ করেন, পত্রিকাটির নাম উল্লেখ করা একটি আবাসন কোম্পানি গোলাপ বাগান কেটে প্লট বানাচ্ছে, আর বাগানজুড়ে টানানো হয়েছে প্লট বিক্রির সাইনবোর্ড। চাষিরা পত্রিকাটিকে বলেন, বাগানে বসানো তাদের গভীর নলকূপ তুলে ফেলা হয়েছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, একসময় প্রায় দুই হাজার কৃষক সরাসরি গোলাপ চাষে যুক্ত ছিলেন, যাদের বেশির ভাগ পেশা বদলাতে বাধ্য হচ্ছেন। পত্রিকাটি ওই নদী ও আশপাশের জলাশয়ে মাটি ফেলার কথাও জানায়। অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে কোম্পানিটির চেয়ারম্যান কালবেলাকে বলেন, অভিযোগ থাকলে রিপোর্ট করে দিতে।
গোলাপ বাগানে পানি কেন জরুরি
বাংলাপিডিয়া জানায়, গোলাপ রোজেসি পরিবারের রোজা গণের উদ্ভিদ, এই গণে প্রজাতির সংখ্যা ১৫০টির বেশি। বাংলাদেশে একটি দেশি প্রজাতি আছে, রোজা ইনভলুক্রাটা, যা ময়মনসিংহ, সিলেট ও চট্টগ্রামের জলাভূমিতে জন্মায়। মুঘল সম্রাট বাবর এই উপমহাদেশে বসরা নামে তীব্র সুগন্ধি, হালকা গোলাপি রঙের একটি গোলাপ আনেন বলে বাংলাপিডিয়ায় উল্লেখ আছে। বাংলাপিডিয়ার ভাষ্য, বাণিজ্যিক উৎপাদনের জন্য কলমের পদ্ধতিগুলোর মধ্যে চোখ কলম বা বাডিং সবচেয়ে উপযোগী, আর এভাবেই পাপা মেলান্ড, ডাবল ডিলাইট, ডাচ গোল্ড, কুইন এলিজাবেথ ও মন্টেজুমার মতো বিশ্বখ্যাত জাতের গোলাপ বাংলাদেশে উৎপাদন হচ্ছে।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের কৃষি তথ্য সার্ভিস (এআইএস) গোলাপকে শীতকালীন মৌসুমি ফুল বলে বর্ণনা করে, যা এখন সারা বছর চাষ হয়; বর্ণ, গন্ধ ও সৌন্দর্যের বিচারে একে বলা হয় ফুলের রানী। এআইএসের চাষ নির্দেশিকায় গোলাপের প্রয়োজনীয় পরিবেশ এভাবে বলা হয়েছে:
- ২২ থেকে ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা, প্রায় ৮৫ শতাংশ আপেক্ষিক আর্দ্রতা এবং বছরে ১০০ থেকে ১২৫ সেন্টিমিটার বৃষ্টিপাত; অতিরিক্ত গরম ও আর্দ্রতায় গোলাপ ভালো হয় না।
- ৬.০ থেকে ৬.৫ পিএইচের সুনিষ্কাশিত, উর্বর দোআঁশ মাটি, উঁচু, খোলামেলা ও রোদপূর্ণ জমি; বিকেলের চেয়ে সকালের রোদ বেশি কার্যকর।
- অক্টোবর থেকে ফেব্রুয়ারি চারা রোপণের সময়; কাটা ফুল উৎপাদনে নতুন গাছ তৈরির প্রধান পদ্ধতি চোখ কলম।
- ফুলের মৌসুমের আগে অক্টোবরে ডাল ছাঁটাই; ছাঁটাইয়ের সময় একবার এবং শীতের শেষে মার্চে আরেকবার সার।
- তরল সার দিতে হয় কেবল ভেজা মাটিতে, তার পর সেচ দিতে হয়; শুকনো মাটিতে তরল সার বেশি কড়া হয়ে গাছের ক্ষতি করতে পারে।
এআইএসের নির্দেশিকা অনুযায়ী, বাংলাদেশে চাষ হওয়া জাতের মধ্যে আছে মিরান্ডি, পাপা মেলান্ড, ডাবল ডিলাইট, তাজমহল, প্যারাডাইস, ব্লু মুন, মন্টেজুমা, টাটা সেন্টার ও সিটি অব বেলফাস্ট। আদর্শ পরিবেশে লম্বা কাণ্ডের জাতের প্রতিটি গাছ বছরে প্রায় ১৫ থেকে ৩০টি ফুল দেয়, আর ফলন মূলত আবহাওয়া ও জাতের ওপর নির্ভর করে। ফুল কাটার উপযুক্ত সময় খুব সকাল বা শেষ বিকেল। পোকামাকড় ও রোগের মধ্যে লাল মাকড় ও ডাইব্যাককে নির্দেশিকায় সবচেয়ে মারাত্মক বলা হয়েছে; এসব দেখা দিলে কোন দমন ব্যবস্থা নিতে হবে, তা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার কাছ থেকে জেনে নেওয়া উচিত।
শুকিয়ে ফেটে যাওয়া মাটিতে চাষ করা গোলাপ চাষিদের যে ক্ষতির কথা জাগো নিউজ জানিয়েছে, নিয়মিত পানির ওপর এআইএস নির্দেশিকার এই জোর তা বুঝতে সাহায্য করে। ২০২৫ সালের নভেম্বরে এক চাষি কালবেলাকে বলেন, গোলাপের চারা একবার লাগিয়ে পরিচর্যা করলে শুধু সার ও পানি দিলেই এক যুগেরও বেশি সময় ফুল দেয়।
দেশের ফুলের বাজারে সাভারের জায়গা
বাংলাপিডিয়ার বর্ণনায়, বাংলাদেশে ফুল চাষ এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে; কাটা ফুলের, প্রধানত গোলাপ, রজনীগন্ধা, অর্কিড ও গ্লাডিওলাসের চাহিদা ধীরে ধীরে বাড়ছে, আর সীমিত পরিমাণ গোলাপ ও রজনীগন্ধা মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপে রপ্তানি হয়। বাণিজ্যিক ফুল চাষ এগিয়ে নিতে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট একটি ফুল গবেষণা কেন্দ্র চালু করেছে।
দেশের সবচেয়ে বড় ফুল চাষের এলাকা যশোরের ঝিকরগাছা উপজেলার গদখালী ও তার আশপাশ, যা 'ফুলের রাজধানী' নামে পরিচিত। সাভারের প্রতিবেদনের আগের দিন, ২০২৫ সালের ৮ ডিসেম্বর, জাগো নিউজ জানায়, যশোর অঞ্চলে ছয় হাজারের বেশি চাষি প্রায় দেড় হাজার হেক্টর জমিতে ফুল চাষ করেন, এ অঞ্চলের ফুলের বাজার বছরে ৪০০ কোটি টাকার বেশি, আর সেখানে বাণিজ্যিক ফুল চাষ শুরু হয়েছিল ১৯৮২ সালে রজনীগন্ধা চাষ দিয়ে। তখন গদখালীর বাজারে প্রতিটি গোলাপ বিক্রি হচ্ছিল ৩ থেকে ৬ টাকায়, আর চাষিরা মৌসুমের প্রধান দিবসগুলো ঘিরে শতকোটি টাকার ফুল বিক্রির আশা করছিলেন: বিজয় দিবস, বিশ্ব ভালোবাসা দিবস ও বসন্তবরণ, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস, স্বাধীনতা দিবস ও পহেলা বৈশাখ, সঙ্গে ইংরেজি নববর্ষ।
২০১৭ সালের ডেইলি স্টারের কলামটিতে জাতীয় চিত্র তুলে ধরে বলা হয়েছিল, দেশের ২৫ জেলায় প্রায় ৬ হাজার হেক্টর জমিতে ফুল চাষ হয়, ফুলচাষি প্রায় ২০ হাজার, আর ফুলের বাজার প্রায় ১ হাজার কোটি টাকার। রাজধানীর ক্রেতাদের কাছে থাকা সাভারের গোলাপ গ্রামগুলোর ফুল যায় শাহবাগের মতো পাইকারি বাজারে।
মাটি কাটা ও আবাসন প্রকল্প নিয়ে আইনে যা আছে
প্রতিবেদনে যে মাটি কাটার কথা বলা হয়েছে, সে বিষয়টি বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন, ২০১০-এর আওতায় পড়ে। ২০২৩ সালের সংশোধনীতে যুক্ত এই আইনের ৭ক ধারা অনুযায়ী, ব্যক্তিমালিকানাধীন জমি থেকে বালু বা মাটি তোলা যাবে না, যদি তা উর্বর কৃষিজমি হয়, যদি তা বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে হয়, যদি এতে কৃষিজমির উর্বর উপরিভাগের মাটি নষ্ট হয়, যদি পরিবেশ, প্রতিবেশ বা জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি হয়, অথবা যদি এমনভাবে তোলা হয় যাতে ওই জমি বা পাশের জমির ক্ষতি, চ্যুতি বা ধস হয়। তবে কেউ বসতবাড়ি নির্মাণ বা নিজের প্রয়োজনে উপজেলা নির্বাহী অফিসারের অনুমতি নিয়ে নিজের জমি থেকে সীমিত পরিসরে বালু বা মাটি তুলতে পারেন।
একই আইনের ১৫ ধারা অনুযায়ী, এসব বিধান অমান্য করলে বা অনুমতি ছাড়া বালু বা মাটি তুললে সর্বোচ্চ দুই বছরের কারাদণ্ড, অথবা ৫০ হাজার টাকা থেকে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ড, অথবা উভয় দণ্ড হতে পারে; অপরাধে ব্যবহৃত ড্রেজার, বালু বা মাটিবাহী যানবাহন ও সংশ্লিষ্ট সামগ্রী সরকারের অনুকূলে বাজেয়াপ্ত হবে। এ আইনের অপরাধের বিচার হয় নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের ভ্রাম্যমাণ আদালতে বা বিচারিক ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতে।
আবাসন ব্যবসা চলে রিয়েল এস্টেট উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা আইন, ২০১০ অনুযায়ী। এ আইনে প্রত্যেক রিয়েল এস্টেট ডেভেলপারকে ব্যবসা পরিচালনার আগে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে নিবন্ধন নিতে হয়; প্রকল্প অনুমোদনের আগে ডেভেলপার প্রকল্পের বিক্রির বিজ্ঞপ্তি প্রচার করতে পারে না, কোনো অংশ বিক্রি বা বিক্রির চুক্তিও করতে পারে না। ক্রেতাকে কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ও জমির মালিকানার দলিলপত্র দেখাতে হয়, আর বেসরকারি আবাসিক প্রকল্পের ভূমি উন্নয়ন বিধিমালা, ২০০৪ ও প্রযোজ্য ইমারত নির্মাণ বিধিমালা অনুযায়ী নকশা ও প্রকল্পের অনুমোদন নিতে হয়।
গোলাপ গ্রামের মাটি কাটা বা সেখানকার আবাসন প্রকল্পগুলোর অনুমোদন কোনো কর্তৃপক্ষ খতিয়ে দেখেছে কি না, জাগো নিউজের প্রতিবেদনে তা বলা হয়নি।
ছবি: ArifHossain.ED / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, কালবেলা, এখন টিভি, ঢাকা ট্রিবিউন, দ্য ডেইলি স্টার, প্রথম আলো, বাংলাপিডিয়া (বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি), কৃষি তথ্য সার্ভিস (এআইএস), বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন ২০১০ এবং রিয়েল এস্টেট উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা আইন ২০১০ (বাংলাদেশ আইন, লেজিসলেটিভ ও সংসদ বিষয়ক বিভাগ)





মন্তব্য
(০)