বগুড়ার শিবগঞ্জ উপজেলার মহাস্থানহাটে মিষ্টি কুমড়ার পাইকারি ব্যবসা করে পরিচিতি পেয়েছেন শিরিন আক্তার। জাগো নিউজ ২৪ ২০২৬ সালের ১০ জুলাই তাকে নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের বিভিন্ন জেলার পাইকারি সবজি বাজারে তিনি 'মিষ্টি কুমড়া রানি' নামে পরিচিত। তার সংগ্রহ করা কুমড়া সবজিবাহী ট্রাকে ঠাকুরগাঁও, চুয়াডাঙ্গা, কুষ্টিয়া, সিরাজগঞ্জ, ময়মনসিংহ, খুলনাসহ নানা জেলায় যায়, আর পাইকাররা সেগুলো চেনেন 'শিরিন আপার কুমড়া' নামে।
অভাবের সংসার থেকে পানের দোকান
শিরিন আক্তারের জন্ম শিবগঞ্জের মহাস্থান গ্রামের নাগরকান্দি এলাকায়। বাবা ছিলেন কাঠের স'মিলের শ্রমিক। পাঁচ ভাই-বোনের সংসারে অভাব ছিল নিত্যসঙ্গী, অনেক দিন দুবেলা খাবার জুটত না। মাত্র ১৩ বছর বয়সে তার বিয়ে হয় এক বিবাহিত ট্রাকচালকের সঙ্গে। সেই সংসার টেকেনি। ২০০৩ সালে কোলে এক শিশু আর গর্ভে আরেক সন্তান নিয়ে তিনি বাবার বাড়িতে ফিরে আসেন।
এরপর দুই সন্তানকে নিয়ে একটি ছোট পানের দোকান দেন। সেখান থেকেই ব্যবসার প্রতি আগ্রহ জন্মায়। ধীরে ধীরে বরবটি ও শিম কেনাবেচা শুরু করেন, পরে নিয়মিত যেতে থাকেন মহাস্থানের সবজি হাটে। ভোরে কৃষকদের কাছ থেকে সবজি কিনে নিজেই বিক্রি করতেন, পরে ঢাকা, সিলেট ও চট্টগ্রামের বাজারেও পাঠাতে শুরু করেন।
জাগো নিউজের প্রতিবেদনে বলা হয়, দুই দশক আগে মহাস্থানহাটে একজন নারীকে পাইকারি সবজি ব্যবসা করতে দেখা ছিল বিরল। হাটে তাকে কটূক্তি ও অপমান সইতে হয়েছে। শিরিন আক্তার বলেন, 'আমি কারো কথায় কান দিইনি। অপমান শুনেছি, কিন্তু লক্ষ্য থেকে একচুলও সরিনি।' ব্যবসার শুরুতে কয়েকজন ব্যবসায়ীর কাছে প্রায় ৬ থেকে ৭ লাখ টাকা হারিয়েছিলেন বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

উত্তরাঞ্চলের বড় সবজি মোকাম মহাস্থানহাট
মহাস্থান বগুড়া শহর থেকে প্রায় ১৩ কিলোমিটার উত্তরে। বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী, এটি বাংলাদেশের প্রাচীনতম ও বৃহত্তম প্রত্নস্থল, প্রাচীন পুণ্ড্রনগরের ধ্বংসাবশেষ। এর পূর্ব পাশ দিয়ে বয়ে গেছে করতোয়া নদী। শিবগঞ্জ উপজেলার ৫৫টি হাট-বাজারের মধ্যে মহাস্থান হাট অন্যতম, আর উপজেলার প্রধান রপ্তানি পণ্যের তালিকায় আছে সবজি।
প্রথম আলো ২০২৩ সালের আগস্টে মহাস্থান হাটকে উত্তরাঞ্চলে সবজির অন্যতম বড় পাইকারি মোকাম বলে উল্লেখ করে। দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের ২০২৩ সালের নভেম্বরের এক প্রতিবেদনে মহাস্থান হাট ব্যবসায়ী সমিতির বরাতে বলা হয়, এই হাট থেকে প্রতিদিন অন্তত ৩৫টি ট্রাক দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সবজি নিয়ে যায়, প্রতিটিতে থাকে ৩০০ মণ সবজি।

শুধু মিষ্টি কুমড়ায় মনোযোগ
লোকসানের পর শিরিন আক্তার শুধু মিষ্টি কুমড়ার ব্যবসা শুরু করেন। প্রথম দিকে প্রতিটি কুমড়া ২৫ থেকে ৩০ টাকায় কিনে ৩৫ থেকে ৩৮ টাকায় বিক্রি করতেন, দিনে বিক্রি হতো ৮০ থেকে ১০০টি। পরে মৌসুমের শুরুতেই কৃষকদের সঙ্গে অগ্রিম চুক্তি করে খেতের কুমড়া বুকিং দিতে শুরু করেন এবং ট্রাকভর্তি কুমড়া বিভিন্ন জেলায় পাঠাতে থাকেন। প্রতিবেদন অনুযায়ী, তিনি প্রতি মণ কুমড়া ৩০০ থেকে ৪০০ টাকায় কিনে পাইকারদের কাছে মণপ্রতি ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা লাভে বিক্রি করেন। মৌসুমে প্রতিদিন তার মাধ্যমে ৫ থেকে ৮ টন মিষ্টি কুমড়া বিভিন্ন জেলায় যায়।
বাড়ির পাশে তিনি বাতাস চলাচলের উপযোগী একটি সংরক্ষণাগার করেছেন। সেখানে অতিপাকা কুমড়া আলাদা রাখা হয় এবং পচন ঠেকাতে বাকি কুমড়া ছায়াযুক্ত শুকনো জায়গায় রাখা হয়। বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী, মিষ্টি কুমড়া গ্রীষ্ম-বর্ষার জনপ্রিয় সবজি, যা শর্করা, ভিটামিন এ ও সি এবং খনিজের ভালো উৎস; পাকা গোটা কুমড়া শুকনো অবস্থায় কয়েক মাস রাখা যায়।

অসুস্থতার মধ্যেও ১৫ কর্মীর দল
ব্যবসার আয়ে তিনি জমি কিনেছেন, পাকা বাড়ি করেছেন, ছেলেকে ব্যবসায় দাঁড় করিয়েছেন। পিঠ ও পায়ে দুই দফা অস্ত্রোপচারের পর আগের মতো মাঠে যেতে পারেন না, তাই ১৫ জন কর্মীর একটি দল গড়েছেন। মাঠের কাজ তারা করলেও পরিকল্পনা, কেনাবেচা ও ব্যবস্থাপনা তিনিই দেখেন। তিনি বলেন, 'আমি চাই, কোনো নারী যেন কারো কাছে হাত না পাতে। সবাই নিজের পায়ে দাঁড়াক।'
হাটের ব্যবসায়ীরাও তার পরিশ্রমের কথা বলেন। আড়তদার আনোয়ার হোসেন বাবু বলেন, 'এখন অনেক পাইকার আগে থেকেই তার পণ্যের অপেক্ষায় থাকেন।' হাট কমিটির সদস্য কুদ্দুস আলীর মতে, নতুন ব্যবসায়ীদের কাছে তিনি অনুকরণীয়।
ছবি: Salim_Khandoker / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, প্রথম আলো, বাংলাপিডিয়া





মন্তব্য
(০)