পেঁপে পুষ্টিকর ও লাভজনক ফসল, আর চারা লাগানোর সময় ও পদ্ধতি ঠিক থাকলে ফলনও ভালো হয়। ২০২৬ সালের ১৬ মে জাগো নিউজের কৃষি ও প্রকৃতি ডেস্কের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, পেঁপের চারা রোপণের সবচেয়ে উপযুক্ত সময় বসন্তকাল বা প্রাক-বর্ষা, অর্থাৎ ফাল্গুন-চৈত্র মাস, এবং গাছ ৮ থেকে ১০ মাসের মধ্যে ফল দিতে শুরু করে। প্রতিবেদনের চাষপদ্ধতি বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বারি) কৃষি প্রযুক্তি ভাণ্ডার, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) বাংলাদেশ কৃষি আবহাওয়া তথ্য সেবা (বামিস) এবং কৃষি তথ্য সার্ভিসের (এআইএস) ই-কৃষি নির্দেশনার সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হলো।
কখন বীজ বুনবেন, কখন চারা লাগাবেন
বারির কৃষি প্রযুক্তি ভাণ্ডার ও বামিসের তথ্য অনুযায়ী, আশ্বিন (সেপ্টেম্বর-অক্টোবর) এবং পৌষ (ডিসেম্বর-জানুয়ারি) মাস পেঁপের বীজ বোনার উত্তম সময়। বারি জানায়, বোনার ১৫-২০ দিন পর চারা বের হয় এবং ৪০-৫০ দিন পর চারা রোপণের উপযোগী হয়। এআইএস দেড় থেকে দুই মাস বয়সের চারা রোপণের কথা বলে। বিএসএমআরএইউর ফসল-জাত তথ্যভান্ডারে বারির শাহী পেঁপের রোপণের সময় লেখা আছে ফেব্রুয়ারি থেকে মার্চ, যা প্রতিবেদনের ফাল্গুন-চৈত্রের পরামর্শের সঙ্গে মেলে।
বর্ষায় সবচেয়ে বড় ঝুঁকি জমে থাকা পানি। বামিস সতর্ক করে, অতিরিক্ত সেচ গোড়া পচা রোগের অনুকূল, তাই বৃষ্টি বা সেচের পানি জমিতে জমতে দেওয়া যাবে না এবং অতিবৃষ্টিতে পানি জমলে দ্রুত সরাতে হবে। রবি মৌসুমে তাপমাত্রা ১৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে নামলে চারা রক্ষায় বীজতলা ঢেকে রাখার পরামর্শও দেয় সংস্থাটি।

চারা তৈরি ও জমি বাছাই
এআইএস জানায়, পলিথিন ব্যাগে চারা তৈরি করলে রোপণের পর চারা দ্রুত বাড়ে। বারির নির্দেশনায় ১৫ × ১০ সেন্টিমিটার আকারের পলিব্যাগ সমপরিমাণ পলিমাটি, বালি ও পচা গোবরের মিশ্রণে প্রায় পুরো ভরে তলায় ২-৩টি ছিদ্র করতে হয় এবং প্রতিটি ব্যাগে ২-৩টি বীজ বুনতে হয়। বোনার পর ২-৩ দিন পরপর পানি দিতে হয়।
পেঁপের জন্য উঁচু ও মাঝারি উঁচু জমি ভালো (এআইএস)। বারির হিসাবে ২ × ২ মিটার দূরত্বে গর্ত করে প্রতি গর্তে ৩টি করে চারা লাগালে হেক্টরপ্রতি ৭,৫০০ চারা লাগে এবং শেষ পর্যন্ত ২,৫০০ গাছ থাকে। এই পরিমাণ চারার জন্য ৪০০-৫০০ গ্রাম বীজ দরকার হয়, তবে হাইব্রিড জাতে ১০০-১৫০ গ্রাম বীজই যথেষ্ট।
গর্ত তৈরি, রোপণ ও সার
এআইএসের নির্দেশনা অনুযায়ী, ২ মিটার দূরে দূরে চারদিকে প্রায় ২ ফুট মাপের গর্ত করে রোপণের ১৫ দিন আগে গর্তের মাটিতে সার মেশাতে হয়, আর পানি নিকাশের জন্য দুই সারির মাঝখানে ৫০ সেন্টিমিটার নালা রাখতে হয়। বাণিজ্যিক চাষে বর্গাকার পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়। বারি বলে, প্রতি গর্তে ৩০ সেন্টিমিটার দূরত্বে ত্রিভুজ আকারে ৩টি চারা লাগাতে হয়; পলিব্যাগ এমনভাবে সরাতে হয় যাতে মাটির বল না ভাঙে, আর চারার গোড়া আগের চেয়ে গভীরে বসানো যাবে না। পড়ন্ত বিকেল চারা রোপণের সবচেয়ে ভালো সময়।
এআইএসের ই-কৃষি নির্দেশনায় প্রতি গাছের জন্য সারের পরিমাণ:
- জৈব সার: ১৫ কেজি
- ইউরিয়া: ৫৫০ গ্রাম
- টিএসপি: ৫৫০ গ্রাম
- এমওপি: ৫৫০ গ্রাম
- জিপসাম: ২৫০ গ্রাম
- বোরাক্স: ২৫ গ্রাম
- জিংক সালফেট: ২০ গ্রাম
ইউরিয়া ও এমওপি ছাড়া সব সার গর্ত তৈরির সময় দিতে হয়। চারায় নতুন পাতা এলে ইউরিয়া ও এমওপি ৫০ গ্রাম করে প্রতি মাসে একবার দিতে হয়, আর গাছে ফুল এলে এই মাত্রা দ্বিগুণ করতে হয়। বামিসের তালিকায় পরিমাণ কিছুটা ভিন্ন (যেমন ইউরিয়া ৪০০-৫০০ গ্রাম, টিএসপি ৫০০ গ্রাম), এবং সংস্থাটি ফল তোলার ২ মাস আগে সার দেওয়া বন্ধ করতে বলে। নিজের জমির মাটি অনুযায়ী সঠিক মাত্রা জানতে উপজেলা কৃষি অফিসার বা উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তার পরামর্শ নেওয়া ভালো।

ফুল আসার পর পরিচর্যা ও জাত
পেঁপের স্ত্রী ও পুরুষ ফুল সাধারণত আলাদা গাছে ধরে। এআইএস জানায়, ফুল এলে প্রতি গর্তে ১টি স্ত্রী গাছ রেখে বাকিগুলো তুলে ফেলতে হয়, তবে পরাগায়ণের সুবিধার জন্য বাগানে ১০ শতাংশ পুরুষ গাছ রাখা দরকার। ফল ধরা নিশ্চিত হলে একটি বোঁটায় একটি ফল রেখে বাকিগুলো ছিঁড়ে ফেলতে হয়, আর ঝড়ে যেন গাছ না ভাঙে সে জন্য বাঁশের খুঁটি দিয়ে বেঁধে দিতে হয়। খরা মৌসুমে ১০ থেকে ১৫ দিন পরপর হালকা সেচ দিতে হয়।
বামিস উন্নত জাত হিসেবে বারি পেঁপে-১ ও রেড লেডির নাম দেয়। এআইএসের তথ্যে বারি পেঁপে-১ (শাহী পেঁপে) চারা লাগানোর ৩-৪ মাস পর ফুল দেয়, ফুল আসার ৩-৪ মাস পর পাকা পেঁপে তোলা যায়, প্রতিটি ফলের ওজন ৮৫০-৯৫০ গ্রাম এবং জাতটি প্রায় সারা বছর ফল দেয়। বিএসএমআরএইউর তথ্যভান্ডার অনুযায়ী জাতটি ১৯৯২ সালে অবমুক্ত হয়, ফলন হেক্টরপ্রতি ৪০-৬০ টন। গোড়া পচা, মোজাইক বা মিলিবাগের মতো সমস্যা দেখা দিলে উপজেলা কৃষি অফিসে যোগাযোগ করুন।

ছবি: Wikipawan / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0)
সূত্র: জাগো নিউজ, কৃষি তথ্য সার্ভিস (এআইএস), বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের কৃষি প্রযুক্তি ভাণ্ডার, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের বাংলাদেশ কৃষি আবহাওয়া তথ্য সেবা (বামিস), বিএসএমআরএইউ ফসল-জাত তথ্যভান্ডার, উইকিপিডিয়া





মন্তব্য
(০)