২০২৬ সালের ২৮ জুন জাগো নিউজ ২৪-এ প্রকাশিত এক নিবন্ধে ফল বিশেষজ্ঞ ড. মো. মেহেদী মাসুদ থাই পেয়ারাকে গত দুই দশকে বাংলাদেশের ফল উৎপাদনে ঘটে যাওয়া নীরব বিপ্লবের এক উজ্জ্বল উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেন। তিনি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ‘বছরব্যাপী ফল উৎপাদনের মাধ্যমে পুষ্টি উন্নয়ন প্রকল্প’-এর সাবেক প্রকল্প পরিচালক। তাঁর মতে, একসময় পেয়ারা ছিল মৌসুমি ফল, বর্ষা ও শরৎ ছাড়া বাজারে খুব একটা দেখা যেত না। আধুনিক চাষাবাদ, উন্নত জাত ও কৃষকের দক্ষতায় থাই পেয়ারা এখন সারা বছর উৎপাদন হচ্ছে এবং গ্রামীণ অর্থনীতিতে একটি লাভজনক উদ্যোগ হয়ে উঠেছে।
পেয়ারার বৈজ্ঞানিক নাম Psidium guajava। মির্টেসি পরিবারের এই ছোট গাছের আদি নিবাস মেক্সিকো, মধ্য আমেরিকা, ক্যারিবীয় অঞ্চল ও দক্ষিণ আমেরিকার উত্তরাংশ; এখন গ্রীষ্মমণ্ডলীয় ও উপগ্রীষ্মমণ্ডলীয় নানা দেশে এর চাষ হয়। প্রচলিত পেয়ারাগাছে বসন্ত ও বর্ষায় ফুল আসে: বসন্তের ফুলের ফল পাকে বর্ষায়, আর বর্ষার ফুলের ফল পাকে শীতে।
উৎপাদন বেড়েছে, চাষ ছড়িয়েছে নানা জেলায়
লেখকের উদ্ধৃত কৃষি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১২-১৩ অর্থবছরে দেশে ৩০ হাজার ৬২৫ হেক্টর জমিতে প্রায় ৩ লাখ ১৪ হাজার টন পেয়ারা উৎপাদিত হয়েছিল। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সেই উৎপাদন ৬ লাখ ৬৪ হাজার টন ছাড়ায়। তাঁর হিসাবে দেশে বছরে প্রায় ৭ হাজার কোটি টাকার পেয়ারা উৎপাদন হয়।
থাই পেয়ারা নির্দিষ্ট মৌসুমের ওপর নির্ভর করে না, তাই কৃষক ঠিক করতে পারেন কখন ফল বাজারে তুলবেন এবং সরবরাহ কম থাকার সময় বিক্রি করে বেশি দাম পান। লেখক জানান, এ কারণে নাটোর, পাবনা, দিনাজপুর, রাজশাহী, বরিশাল ও গাজীপুরসহ বিভিন্ন জেলায় বাণিজ্যিকভাবে থাই পেয়ারার চাষ দ্রুত ছড়িয়েছে। বড় শহরের ফলের দোকানে আপেল, কমলা, মাল্টা ও নাশপাতির পাশে এখন থাই পেয়ারাও জায়গা করে নিয়েছে।
দক্ষিণাঞ্চলে পেয়ারা চাষের পুরোনো ঐতিহ্যও আছে। ২০২৩ সালের আগস্টে দ্য ডেইলি স্টার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য উদ্ধৃত করে জানায়, পিরোজপুরের নেছারাবাদ উপজেলায় ৮৩৫ হেক্টর জমিতে ৭ হাজার ৬৫৬ টন পেয়ারা হয়; ঝালকাঠি সদরে ৫৯১ হেক্টর এবং বরিশালের বানারীপাড়ায় ২১০ হেক্টর জমিতে পেয়ারার চাষ হয়।

ভিটামিন সি-র ভালো উৎস
লেখকের মতে, পেয়ারার জনপ্রিয়তার আরেক কারণ এর পুষ্টিগুণ; তিনি লেখেন, প্রতি ১০০ গ্রাম পেয়ারায় প্রায় ২১০ মিলিগ্রাম ভিটামিন সি থাকে। মার্কিন কৃষি বিভাগের (ইউএসডিএ) খাদ্য উপাদান তথ্যভান্ডার ফুডডেটা সেন্ট্রালে কাঁচা সাধারণ পেয়ারার প্রতি ১০০ গ্রামে ভিটামিন সি ২২৮.৩ মিলিগ্রাম দেখানো হয়েছে; একই হিসাবে কমলায় তা ৫৩.২ মিলিগ্রাম এবং খোসাসহ আপেলে ৪.৬ মিলিগ্রাম। উদ্যানতত্ত্ববিদ জুলিয়া মর্টনের ফল-বিষয়ক গ্রন্থে বলা হয়েছে, পেয়ারার ভিটামিন সি ফলভেদে অনেক কমবেশি হয় এবং এর বেশির ভাগ থাকে খোসায়।

সারা বছর ফল পাওয়ার কৌশল
লেখক মনে করিয়ে দেন, শুধু উন্নত জাতের চারা লাগালেই সাফল্য আসে না; থাই পেয়ারা পরিকল্পিত বাগান ব্যবস্থাপনার ফসল। সারা বছর ফল পেতে জমি নির্বাচন, সেচ, সার ব্যবস্থাপনা, ছাঁটাই, ডাল বাঁকানো, ফুল ও ফল নিয়ন্ত্রণ এবং ব্যাগিং দক্ষতার সঙ্গে করতে হয়। পেয়ারার ফুল আসে নতুন ডগায়; মর্টনের গ্রন্থেও বলা হয়েছে, পরিপক্ব ডাল থেকে বের হওয়া নতুন ডগায় ফল ধরে। তাই কোন সময়ে নতুন ডগা তৈরি করতে হবে, সেটি ঠিক করাই বছরব্যাপী উৎপাদনের মূল কৌশল।
লেখক একে বলেন ‘ক্রপ সাইক্লিং’ বা ফলনচক্র ব্যবস্থাপনা। বাজার পরিস্থিতি বুঝে ৫ থেকে ৭ মাস আগে পরিকল্পনা নিলে কৃষক কাঙ্ক্ষিত সময়ে ফল তুলতে পারেন এবং অমৌসুমে বিক্রি করে বেশি মুনাফা পান।
লেখকের মতে, ব্যাগিং বা কচি ফল বিশেষ ব্যাগে মুড়ে রাখলে ফলমাছি ও রোগবালাই থেকে ফল রক্ষা পায়, কীটনাশকের ক্ষতিকর প্রভাব কমে এবং বাজারে দেখা চকচকে, দাগমুক্ত ফল পাওয়া যায়। মর্টন লিখেছেন, ব্রাজিলেও বাছাই করা ভালো পেয়ারা পেতে কচি ফল কাগজের ঠোঙায় ঢেকে রাখা হয়।

বিঘাপ্রতি আয় ও চাষের ঝুঁকি
লেখকের হিসাবে, এক বিঘা জমিতে ১৫০ থেকে ২০০টি কলমের চারা লাগালে এক বছরের মধ্যেই ফল পাওয়া যায়। তিন থেকে চার বছর বয়সী বাগান থেকে বছরে ৩ থেকে ৪ লাখ টাকা পর্যন্ত আয় সম্ভব, আর ভালো ব্যবস্থাপনায় এক বিঘা থেকে ১০ থেকে ১২ মেট্রিক টন ফল পাওয়ার উদাহরণও আছে।
ঝুঁকিও আছে। লেখক জানান, উইল্ট বা ঢলে পড়া রোগ, ফলমাছি, মাকড় ও নানা ছত্রাকজনিত রোগে প্রায়ই ফলন কমে; অনিয়মিত সেচ ও অপরিকল্পিত সার প্রয়োগেও ক্ষতি হয়। মর্টনের গ্রন্থ অনুযায়ী, পেয়ারার উইল্ট রোগ Fusarium solani ও Macrophomina phaseoli ছত্রাকের সঙ্গে জড়িত, যাতে গাছ ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে মারা যায়; আর পেয়ারা ভূমধ্যসাগরীয় ও ওরিয়েন্টাল ফলমাছিসহ কয়েক প্রজাতির ফলমাছির প্রধান আশ্রয়। লেখকের পরামর্শ, কৃষক প্রশিক্ষণ, মানসম্মত চারা সরবরাহ এবং মাঠপর্যায়ের সম্প্রসারণ কার্যক্রম আরও জোরদার করা দরকার। তাঁর মতে, ধানের বাইরে ফলভিত্তিক কৃষির প্রসার জরুরি, আর থাই পেয়ারা তারই সফল উদাহরণ।

ছবি: Ibrahim Husain Meraj / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, মার্কিন কৃষি বিভাগের (ইউএসডিএ) ফুডডেটা সেন্ট্রাল, জুলিয়া এফ. মর্টন: ফ্রুটস অব ওয়ার্ম ক্লাইমেটস (পারডু বিশ্ববিদ্যালয়), দ্য ডেইলি স্টার, উইকিপিডিয়া





মন্তব্য
(০)