উন্নত জাতের একটি সংকর গাভী বাচ্চা দিল, আর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সে মাটিতে পড়ে গেল, আর উঠতে পারছে না। পা ছেড়ে দিয়েছে, মাথা ঘুরিয়ে পেটের পাশে রেখেছে, দেখে মনে হয় যেন মারা গেছে। যে খামারি দ্রুত অভিজ্ঞ ভেটেরিনারিয়ান ডাকেন, চিকিৎসার পর সাধারণত গাভীকে আবার দাঁড়াতে দেখেন। এই রোগের নাম মিল্ক ফিভার বা দুধ জ্বর। দ্য এগ্রো নিউজ ২০২৫ সালের এপ্রিলে এই রোগ নিয়ে এই নির্দেশিকাটি প্রকাশ করে।
এই লেখায় জানা যাবে দুধ জ্বর কী, কেন বাচ্চা প্রসবের সময়েই এটি হয়, কোন গাভীর ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি, রোগের লক্ষণ ধাপে ধাপে কীভাবে বাড়ে, ভেটেরিনারিয়ানরা কীভাবে চিকিৎসা করেন এবং কেন সেই চিকিৎসা তাঁদের হাতেই ছেড়ে দিতে হয়, আর প্রসবের আগের কয়েক সপ্তাহের খাবার কীভাবে রোগ ঠেকাতে সাহায্য করে। সব তথ্য ২০২৫ সালের এপ্রিলের আগে প্রকাশিত ভেটেরিনারি কর্তৃপক্ষ ও গবেষণা থেকে নেওয়া।
দুধ জ্বর আসলে কী
দুধ জ্বর হলো প্রসবকালীন হাইপোক্যালসিমিয়ার প্রচলিত নাম, অর্থাৎ বাচ্চা প্রসবের সময় রক্তে ক্যালসিয়াম হঠাৎ অনেক কমে যাওয়া। নামে জ্বর থাকলেও গাভীর জ্বর হয় না। যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব উইসকনসিন-ম্যাডিসনের এক্সটেনশন বিভাগ এর লক্ষণের মধ্যে শরীরের তাপমাত্রা কমে যাওয়ার কথা বলেছে, আর আক্রান্ত গাভীর কান ঠান্ডা লাগে। এটি একটি বিপাকজনিত (মেটাবলিক) রোগ, সংক্রামক নয়, তাই এক গাভী থেকে আরেক গাভীতে ছড়ায় না।
ক্যালসিয়ামের কাজ শুধু হাড় গড়া নয়। উইসকনসিন এক্সটেনশনের প্রশিক্ষকেরা ব্যাখ্যা করেছেন, দুধ তৈরিতে এবং মাংসপেশির স্বাভাবিক সংকোচন ও স্নায়ুর সংকেত চলাচলে ক্যালসিয়াম লাগে। রক্তে ক্যালসিয়াম খুব বেশি কমে গেলে মাংসপেশি ঠিকমতো কাজ করে না। তাই আক্রান্ত গাভী প্রথমে কাঁপে, তারপর টলতে টলতে হাঁটে, শেষে আর দাঁড়াতেই পারে না।
যেখানেই বেশি দুধ দেওয়া গাভী পালন করা হয়, সেখানেই এই রোগ পরিচিত। ভেটেরিনারি অভ্যন্তরীণ চিকিৎসা ও পুষ্টি বিশেষজ্ঞ পিটার ডি. কনস্টেবল ২০১১ সালের আগস্টে ডিভিএম৩৬০-এ প্রকাশিত এক সম্মেলন-প্রবন্ধে লিখেছেন, প্রসবকালীন হাইপোক্যালসিমিয়া দুগ্ধবতী গাভীর একটি সাধারণ সমস্যা, যার বার্ষিক হার ৫ থেকে ৮ শতাংশ। মার্কিন কৃষি বিভাগের কৃষি গবেষণা সার্ভিসের জেসি পি. গফ ২০০৮ সালে দ্য ভেটেরিনারি জার্নালে এই রোগের পর্যালোচনায় দুধ জ্বরকে গাভীর জন্য প্রাণঘাতী বলেছেন এবং উল্লেখ করেছেন, এটি গাভীকে আরও নানা রোগের ঝুঁকিতে ফেলে।
প্রসবের সময় কেন ক্যালসিয়ামের ঘাটতি হয়
গাভী দুই জায়গা থেকে ক্যালসিয়াম পায়: খাবার আর নিজের হাড়। উইসকনসিন এক্সটেনশনের ২০২৩ সালের অক্টোবরে প্রকাশিত সদ্য প্রসূত গাভী বিষয়ক তথ্যপত্র অনুযায়ী, প্রসবের পর হঠাৎ দুধ উৎপাদন বেড়ে যাওয়ায় শুষ্ক সময়ের (দুধ বন্ধ থাকার সময়) তুলনায় গাভীর ক্যালসিয়ামের চাহিদা ৪০০ শতাংশ বাড়ে। রক্তের ক্যালসিয়াম যত দ্রুত খরচ হয়, তত দ্রুত পূরণ না হলেই দুধ জ্বর দেখা দেয়।
প্রথম দুধ বা শালদুধ এই চাহিদা আরও তীব্র করে। চিওমে ও সহকর্মীদের ২০১৭ সালে জার্নাল অব দ্য সাউথ আফ্রিকান ভেটেরিনারি অ্যাসোসিয়েশনে প্রকাশিত গবেষণায় বলা হয়েছে, শালদুধে সাধারণ দুধের চেয়ে প্রায় চার গুণ বেশি ক্যালসিয়াম থাকে।

হাড় থেকে কত দ্রুত ক্যালসিয়াম বের হবে আর অন্ত্র থেকে কতটা শোষিত হবে, তা ঠিক করে হরমোন। গফের ২০০৮ সালের পর্যালোচনায় মূল আলোচনা প্যারাথাইরয়েড হরমোন নিয়ে, যা এই প্রক্রিয়া চালায়, এবং প্রসবের আগের খাবারের খনিজ ভারসাম্য কীভাবে এই হরমোনের প্রতি শরীরের সংবেদনশীলতা বদলে দেয়, তা নিয়ে। তিনি রক্তে ম্যাগনেসিয়ামের ঘাটতিকেও, খাবারে কম ম্যাগনেসিয়াম বা শোষণে বাধা যে কারণেই হোক, একটি বড় ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।
ভিটামিন ডি-ও গুরুত্বপূর্ণ। কনস্টেবল ব্যাখ্যা করেছেন, ক্ষুদ্রান্ত্র যে প্রক্রিয়ায় ক্যালসিয়াম শোষণ করে, তা ভিটামিন ডি নিয়ন্ত্রণ করে।
কোন গাভীর ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি
উইসকনসিন এক্সটেনশনের তথ্যপত্রে এই ঝুঁকিগুলোর কথা বলা হয়েছে:
- পাঁচ বছর বা তার বেশি বয়সী গাভী।
- বেশি দুধ দেওয়া গাভী।
- জার্সি জাত। হলস্টেইন জাতের চেয়ে জার্সি গরুর শরীরে ভিটামিন ডি রিসেপ্টর কম, অথচ অন্ত্র থেকে ক্যালসিয়াম ও ফসফরাস শোষণে ভিটামিন ডি দরকার।
- আগে যে গাভীর হাইপোক্যালসিমিয়া হয়েছে।
- প্রসবের আগে পটাশিয়াম ও ক্যালসিয়াম বেশি এমন খাবার।
- প্রসবের আগে বেশি ক্যালসিয়াম খাওয়ানোর পর প্রসবের পরে খাবারের কারণে বা কম খাওয়ার কারণে ক্যালসিয়াম কম পাওয়া।
- আঁশজাতীয় খাবার (খড়, ঘাস) কম খাওয়া।
গবেষণাতেও জাত, বয়স আর উৎপাদনের প্রভাব দেখা গেছে। জিম্বাবুয়ের রাজধানী হারারে থেকে প্রায় ৫০ কিলোমিটার দক্ষিণে বিয়াট্রিসের একটি দুগ্ধ খামারে তিন বছরে ১,২৭৮টি প্রসব নিয়ে ওই গবেষণা হয়। জার্সি গাভীর প্রসবের ১৪.৭৮ শতাংশে দুধ জ্বর হয়েছে, হলস্টেইনে ৪.৮২ শতাংশে। চতুর্থ প্রসবের পরে এই হার জার্সিতে ২৪.৮৫ শতাংশ আর হলস্টেইনে ৮.২৯ শতাংশে ওঠে। সবচেয়ে বেশি দুধ দেওয়া গাভীরাই বেশি আক্রান্ত হয়েছে: ৩০৫ দিনের দুগ্ধকালে ৬,১১৪ লিটারের বেশি দুধ দেওয়া জার্সির ২৭.০৭ শতাংশ, আর ৯,১৪৯ লিটারের বেশি দুধ দেওয়া হলস্টেইনের ১০.৪৯ শতাংশ।
২০২১ সালে অ্যানিমেলস সাময়িকীতে প্রকাশিত ভাগনোনি, ওয়েটজেল ও সহকর্মীদের গবেষণায় রক্ত পরীক্ষাতেও একই চিত্র মিলেছে: প্রসবের ১২ থেকে ২৪ ঘণ্টা পর রক্তের সিরামে ক্যালসিয়াম হলস্টেইনের চেয়ে জার্সিতে কম ছিল, আর দ্বিতীয়বার প্রসব করা গাভীর চেয়ে তৃতীয় বা তার বেশিবার প্রসব করা গাভীতে কম ছিল।

বাংলাদেশের দুগ্ধ খামারে দুধ জ্বর
দুধ বাড়াতে বাংলাদেশ কয়েক দশক ধরে গরুর জাত উন্নয়নের চেষ্টা করছে। জাতীয় জ্ঞানকোষ বাংলাপিডিয়া জানায়, দেশি জেবু গরুর সঙ্গে সংকরায়ণের জন্য হলস্টেইন-ফ্রিজিয়ান, জার্সি, শাহিওয়াল, সিন্ধিসহ নানা বিদেশি জাত আনা হয়েছে। সেখানে ফ্রিজিয়ান সংকরের দুধ উৎপাদন প্রতি দুগ্ধকালে প্রায় ১,৮০০ লিটার বলা হয়েছে, যেখানে দেশি গাভীর গড় প্রতি দুগ্ধকালে প্রায় ২০৬ কেজি। বাংলাপিডিয়া আরও বলছে, খাঁটি ও সংকর জাতের গরুর পুষ্টির চাহিদা বেশি এবং দেশি জাতের চেয়ে এরা রোগে বেশি আক্রান্ত হয়।
খাতটি বড়। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের (ডিএলএস) হিসাবে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে দেশে গরু ছিল ২৫০.১৩ লাখ, আর দুধ উৎপাদন হয় ১৫০.৪৪ লাখ টন।
বাংলাদেশের গবেষকেরা দেখেছেন, প্রসবের সময় ক্যালসিয়ামের সমস্যা বেশ সাধারণ। ময়মনসিংহের বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) একটি দল ২০২২ সালের জুনে জার্নাল অব অ্যাডভান্সড ভেটেরিনারি অ্যান্ড অ্যানিমেল রিসার্চে প্রকাশিত গবেষণায় ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়া ও শেরপুরের নকলা উপজেলার গাভী পর্যবেক্ষণ করে। প্রসবের আশপাশের সময়ে বেশির ভাগ গাভীর সিরামে ক্যালসিয়াম কম ছিল, গড়ে ৮.১৩ ± ১.২ মিলিগ্রাম/ডেসিলিটার। দলটি দেশের সংকর দুগ্ধবতী গাভী নিয়ে আগের একটি গবেষণার কথাও উল্লেখ করেছে, যেখানে দুধ জ্বরের হার ৩০ শতাংশ পাওয়া গিয়েছিল।
বাকৃবির ওই প্রকল্পে নিয়মিত পরীক্ষায় যে গাভীর ক্যালসিয়াম কম, প্রস্রাবে কিটোন বা ওলান প্রদাহ (ম্যাস্টাইটিস) ধরা পড়েছে, তাদের সঙ্গে সঙ্গে চিকিৎসা দেওয়া হয়। এতে দুধ জ্বরের ঘটনা কর্মসূচির আগের ১৭টি (১৪৫টি পশুর ১১.৭২ শতাংশ) থেকে কমে পরে ৮টিতে (২৩৫টি পশুর ৩.৪৩ শতাংশ) নামে। বিপাকজনিত রোগে আক্রান্ত পশুর হার ৫১.৭ শতাংশ থেকে কমে ১৫.৩ শতাংশ হয়।
বাকৃবির আরেকটি দল ২০২২ সালের জুনে বিএমসি রিসার্চ নোটসে প্রকাশিত গবেষণায় গাজীপুর জেলার একটি সংগঠিত দুগ্ধ খামারের ২৯টি সংকর গাভীর প্রসবের আগে ও পরে রক্ত পরীক্ষা করে। দৃশ্যমান লক্ষণ ছাড়াই ক্যালসিয়াম কম থাকা, অর্থাৎ সাবক্লিনিক্যাল হাইপোক্যালসিমিয়া, পাওয়া গেছে ৩১.০৩ শতাংশ গাভীতে। বেশি বয়সী, ভালো শরীরের গড়ন ও বেশি দুধ দেওয়া গাভীরাই বেশি আক্রান্ত ছিল।
২০২৩ সালের মার্চে ট্রপিক্যাল অ্যানিমেল হেলথ অ্যান্ড প্রোডাকশনে প্রকাশিত তৃতীয় একটি গবেষণায় বাকৃবি, বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিএলআরআই) ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের গবেষকেরা সিরাজগঞ্জ, বগুড়া, রংপুর, সাতক্ষীরা ও মুন্সীগঞ্জের ২৬৫টি দুগ্ধ খামারে জরিপ চালান। তাঁরা বারবার পাল দিয়েও গাভী গর্ভধারণ না করার (রিপিট ব্রিডিং) সমস্যার সঙ্গে দুধ জ্বরের মতো পুষ্টি ঘাটতিজনিত রোগের যোগ পেয়েছেন।
দুধ জ্বরের লক্ষণ: ধাপে ধাপে
উইসকনসিন এক্সটেনশন জানায়, বেশির ভাগ ক্ষেত্রে রোগটি হয় প্রসব থেকে শুরু করে প্রসবের প্রায় তিন দিনের মধ্যে, যখন দুধ উৎপাদন শুরু হয়। রক্তে ক্যালসিয়াম ৫.০ মিলিগ্রাম/ডেসিলিটারের নিচে নামলে তাকে ক্লিনিক্যাল দুধ জ্বর বলা হয়, আর তীব্রতা অনুযায়ী একে তিন ধাপে ভাগ করা হয়:
- প্রথম ধাপ, গাভী তখনো দাঁড়িয়ে আছে। এই ধাপ অল্প সময়ের বলে প্রায়ই চোখ এড়িয়ে যায়। লক্ষণ: খাবারে অরুচি ও হজমতন্ত্রের ধীরগতি, উত্তেজনা, অস্থিরতা, অতিসংবেদনশীলতা, ঠান্ডা কান, দুর্বলতা, এক পা থেকে আরেক পায়ে ভর বদলানো ও পেছনের পা ঘষটানো। মার্ক ভেটেরিনারি ম্যানুয়াল এর সঙ্গে পেটের পাশে সূক্ষ্ম কাঁপুনি, কান নাড়ানো ও মাথা দোলানোর কথা যোগ করেছে।
- দ্বিতীয় ধাপ, গাভী শুয়ে পড়েছে। এটি ১ থেকে ১২ ঘণ্টা চলতে পারে। গাভী মাথা গুটিয়ে পেটের পাশে রেখে শুয়ে থাকে, নিস্তেজ ও ঝিমানো দেখায়, কান ঠান্ডা, নাক শুকনো, মাংসপেশি কাঁপে। হজমতন্ত্র প্রায় থেমে যায়, কোষ্ঠকাঠিন্য হয়। শরীরের তাপমাত্রা কমে যায় এবং হৃৎস্পন্দন দ্রুত হয়, প্রায়ই মিনিটে ১০০ বারের বেশি।
- তৃতীয় ধাপ, গাভী আর দাঁড়াতে পারে না এবং ধীরে ধীরে জ্ঞান হারায়। মার্কের বর্ণনায় এ সময় গাভী এক পাশে কাত হয়ে শুয়ে থাকে, মাংসপেশি একেবারে শিথিল হয়ে যায় এবং পেট খুব ফেঁপে ওঠে; চিকিৎসা না পেলে এই অবস্থায় গাভী মাত্র কয়েক ঘণ্টা বাঁচতে পারে।
রোগের একটি লুকানো রূপও আছে। উইসকনসিনের তথ্যপত্র ইউনিভার্সিটি অব ফ্লোরিডার গবেষণার বরাতে বলছে, প্রসবের ১২ থেকে ২৪ ঘণ্টা পর যে গাভীর রক্তে ক্যালসিয়াম ৫.০-এর বেশি কিন্তু ৮.৫ মিলিগ্রাম/ডেসিলিটারের কম, তার সাবক্লিনিক্যাল দুধ জ্বর আছে, যদিও বাইরে কোনো লক্ষণ দেখা যায় না। তথ্যপত্রটি জানায়, তৃতীয় বা তার পরের দুগ্ধকালের ৭৩ শতাংশ গাভীর সাবক্লিনিক্যাল হাইপোক্যালসিমিয়া হয়েছে। এই রূপটি পরীক্ষাগারে নিশ্চিত করাই সবচেয়ে ভালো।
ভেটেরিনারিয়ান কীভাবে রোগ নিশ্চিত করেন, ক্ষতি কতটা
রোগ নির্ণয় নির্ভর করে ইতিহাস, যেমন বেশি বয়সী বা বেশি দুধ দেওয়া গাভীর সদ্য প্রসব, আর লক্ষণের ওপর। মার্ক ভেটেরিনারি ম্যানুয়াল বলছে, রোগ নির্ণয় প্রায়ই হয় ক্লিনিক্যাল পরীক্ষা আর চিকিৎসায় গাভী কেমন সাড়া দেয় তা দেখে; শিরায় ক্যালসিয়াম দেওয়ার আগেই রক্তের নমুনা নিয়ে রাখলে, গাভী সাড়া না দিলে সেই নমুনায় ক্যালসিয়াম মাপা যায়।
মার্ক আরও জানায়, প্রসবের পর গাভী অন্য কারণেও উঠতে না পারতে পারে, যেমন তীব্র ওলান প্রদাহ বা জরায়ুর সংক্রমণ, শ্রোণিচক্রের হাড় ভাঙা, প্রসবের সময় স্নায়ুর ক্ষতি, কিংবা ম্যাগনেসিয়াম বা ফসফরাসের ঘাটতি। এগুলো আলাদা করে চেনার জন্য ভেটেরিনারিয়ান দরকার।
ক্ষতি শুধু ওষুধের খরচে সীমাবদ্ধ নয়। উইসকনসিন এক্সটেনশনের হিসাবে যুক্তরাষ্ট্রে প্রতিটি ক্লিনিক্যাল বা সাবক্লিনিক্যাল দুধ জ্বরে প্রায় ১৫০ ডলার ক্ষতি হয়, কারণ এই রোগের সঙ্গে গর্ভফুল আটকে থাকা, কিটোসিস, ওলান প্রদাহ, জরায়ুর সংক্রমণ ও ফ্যাটি লিভারের সম্পর্ক রয়েছে। মূল প্রতিবেদনেও বলা হয়েছে, অসুস্থ থাকার সময় গাভীর দুধ কমে যায়।
চিকিৎসা ভেটেরিনারিয়ানের কাজ
মূল প্রতিবেদনের প্রথম পরামর্শটি এখনো ঠিক: লক্ষণ দেখামাত্র অভিজ্ঞ ভেটেরিনারিয়ানকে ডাকুন। উইসকনসিন এক্সটেনশন প্রতিটি খামারকে আগে থেকেই নিজের ভেটেরিনারিয়ানের সঙ্গে একটি চিকিৎসা-পদ্ধতি ঠিক করে রাখার পরামর্শ দেয়।
শুয়ে পড়া গাভীর প্রচলিত চিকিৎসা হলো শিরায় ধীরে ধীরে ক্যালসিয়াম দেওয়া। কনস্টেবল ২০১১ সালে লিখেছেন, সাধারণ চিকিৎসা হলো ২৩ শতাংশ ক্যালসিয়াম বোরোগ্লুকোনেটের ৫০০ মিলিলিটার দ্রবণ ধীরে শিরায় দেওয়া, যাতে ১০.৭ গ্রাম ক্যালসিয়াম থাকে; ইনজেকশনের সময় হৃৎপিণ্ডের ওপর নজর রাখতে হয়, কারণ ক্যালসিয়াম হৃৎস্পন্দনের ছন্দ এলোমেলো করে দিতে পারে।
কনস্টেবল আরও ব্যাখ্যা করেছেন, চামড়ার নিচে ক্যালসিয়াম দিলে তা কয়েকটি জায়গায় ভাগ করে দিতে হয়, এক জায়গায় ১২৫ মিলিলিটারের বেশি নয়, আর ক্যালসিয়াম ক্লোরাইড চামড়ার নিচে দেওয়া যাবে না, কারণ এতে টিস্যুর ক্ষতি হয়।
মাত্রা ঠিক রাখা দুই দিক থেকেই জরুরি। মূল প্রতিবেদন সতর্ক করেছিল, কম ক্যালসিয়াম দিলে গাভী সুস্থ হয় না বা দাঁড়াতে পারে না, কিংবা সাময়িক সুস্থ হয়ে আবার পড়ে যায়; আবার বেশি মাত্রায় ও দ্রুত শিরায় দিলে গাভী মারা যেতে পারে। কোন ওষুধ, কতটুকু, আর ইনজেকশনের সময় হৃৎপিণ্ডের ওপর নজর রাখা, এসব কারণেই কর্তৃপক্ষ এই ইনজেকশন ভেটেরিনারিয়ানের হাতে ছেড়ে দেয়। খামারি নিজে কখনো শিরায় ক্যালসিয়াম দেবেন না।

উইসকনসিন এক্সটেনশন ইউনিভার্সিটি অব মিনেসোটার ভেটেরিনারি স্কুলের বরাতে বলছে, প্রথম প্রশ্ন হলো গাভী দাঁড়িয়ে আছে কি না। প্রাথমিক লক্ষণ নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা গাভীকে শিরায় ক্যালসিয়াম দেওয়া উচিত নয়; তার যা দরকার, মুখে খেয়েই সে শোষণ করতে পারে। ইউনিভার্সিটি অব উইসকনসিনের ভেটেরিনারি স্কুলের ড. গ্যারি ওয়েটজেলের বরাতে তথ্যপত্রটি প্রসবের সময় একটি ক্যালসিয়াম বোলাস (বড় বড়ি) এবং ১২ ঘণ্টা পর দ্বিতীয়টি খাওয়ানোর পরামর্শ দেয়। নেদারল্যান্ডসের একটি গবেষণার বরাতে এটি আরও বলছে, লক্ষণহীন গাভীকে শিরায় ক্যালসিয়াম দিলে অল্প সময়ের জন্য রক্তে ক্যালসিয়াম বেশি হয়ে যায়, পরে দীর্ঘ সময় ধরে কমে থাকে।
শুয়ে পড়া গাভী শিরার চিকিৎসায় সাড়া দিয়ে উঠে দাঁড়ালে, তাকে দাঁড়িয়ে রাখতে সাহায্য করার জন্য তথ্যপত্রটি দাঁড়ানোর পর একটি বোলাস এবং ১২ ঘণ্টা পর আরেকটি দেওয়ার পরামর্শ দেয়। গাভী শিরার চিকিৎসায় সাড়া না দিলে বোলাস দিতে নিষেধ করা হয়েছে, কারণ তখনো তার মাংসপেশি কাজ না করায় গলায় আটকে যেতে পারে; তখন ভেটেরিনারিয়ানের পরামর্শ নিতে হবে। কনস্টেবলও লিখেছেন, মুখে খাওয়ানোর ক্যালসিয়াম দ্রবণ কেবল সেই গরুকে দেওয়া যায় যে স্বাভাবিকভাবে গিলতে পারে, তাই রোগ বেশি বেড়ে গেলে তা চলে না।
কোন ওষুধ, কয়টি মাত্রা, পরে আবার কখন, এসব সিদ্ধান্ত নেবেন যে ভেটেরিনারিয়ান গাভীটি দেখেছেন তিনিই। খামারির কাজ হলো দ্রুত খবর দেওয়া, সাহায্য আসা পর্যন্ত গাভীকে আরামে ও নিরাপদে রাখা, চিকিৎসার পর সে কেমন সাড়া দিচ্ছে তা জানানো, আর শুয়ে পড়া গাভীর মুখে কোনো তরল ঢেলে না দেওয়া।
প্রতিরোধ শুরু হয় শুষ্ক সময়ে
মূল প্রতিবেদনের কথাটিই ঠিক, প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধ ভালো, আর কর্তৃপক্ষও তা-ই বলছে। উইসকনসিন এক্সটেনশন জানায়, শুষ্ক সময় ও দুগ্ধকালের শুরুতে পুষ্টি ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে যেসব খামার এটি মেনে চলে সেখানে ক্লিনিক্যাল দুধ জ্বর ১ শতাংশের নিচে নামিয়ে আনা গেছে।
মূল পরিবর্তনটি প্রসবের আগের শেষ কয়েক সপ্তাহের খাবারে। উইসকনসিন এক্সটেনশন প্রসব আসন্ন শুষ্ক গাভীকে প্রসবের আগে কম ক্যালসিয়াম ও কম পটাশিয়ামের খাবার দেওয়ার পরামর্শ দেয়, যাতে হাইপোক্যালসিমিয়া কমে; আর প্রসবের আগে বেশি পটাশিয়াম ও ক্যালসিয়ামের খাবারকে ঝুঁকি হিসেবে তালিকায় রেখেছে। মূল প্রতিবেদনের সতর্কবার্তাও এর সঙ্গে মেলে: গর্ভের শেষ দিকে বেশি ক্যালসিয়াম পেলে গাভীর শরীর অন্ত্রের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, আর প্রসবের সময় হঠাৎ চাহিদা এলে হাড় থেকে দ্রুত ক্যালসিয়াম বের হতে পারে না।
একই সূত্রগুলো এই পদক্ষেপগুলোর কথা বলছে:
- যথেষ্ট ম্যাগনেসিয়াম দিন। ক্যালসিয়ামের ভারসাম্য রাখায় ম্যাগনেসিয়ামের বড় ভূমিকা আছে, তাই প্রসবের আগে খাবারে ম্যাগনেসিয়াম বাড়ালে ঝুঁকি কমতে পারে (উইসকনসিন এক্সটেনশন), আর ম্যাগনেসিয়ামের ঘাটতি একটি বড় ঝুঁকি (গফ, ২০০৮)।
- পুষ্টিবিদ বা ভেটেরিনারিয়ানের তৈরি কম ডিক্যাড খাদ্যের কথা ভাবুন। প্রসবের আগে ২১ দিন অ্যানায়নিক লবণ খাওয়ানো এবং কম ডায়েটারি ক্যাটায়ন-অ্যানায়ন ডিফারেন্স (ডিক্যাড) খাদ্য ঠিকমতো পরিচালনা করলে সাবক্লিনিক্যাল হাইপোক্যালসিমিয়া কমে বলে দেখা গেছে (উইসকনসিন এক্সটেনশন)। কনস্টেবল লিখেছেন, প্রসবের অন্তত দুই সপ্তাহ আগে থেকে এমন খাবার দিলে রোগের হার কমে, আর প্রস্রাবের পিএইচ পরীক্ষা করে খামার বুঝতে পারে খাবারটি কাজ করছে কি না।
- খড়-ঘাসের মতো আঁশজাতীয় খাবার যথেষ্ট রাখুন, কারণ কম আঁশজাতীয় খাবার একটি স্বীকৃত ঝুঁকি।
- বেশি বয়সী, বেশি দুধ দেওয়া, জার্সি এবং আগে দুধ জ্বর হয়েছে এমন গাভীর দিকে প্রসবের সময় বাড়তি নজর দিন।
পরীক্ষাও সাহায্য করে। ময়মনসিংহ ও শেরপুরে বাকৃবির গবেষণায় দেখা গেছে, প্রসবের আশপাশে নিয়মিত সিরামের ক্যালসিয়াম ও প্রস্রাবের কিটোন পরীক্ষা করে সঙ্গে সঙ্গে চিকিৎসা দেওয়ায় দুধ জ্বরের ঘটনা ৭০.২৮ শতাংশ কমেছে। গাজীপুরের গবেষণায় সব গাভীকে সুষম খাবার দেওয়া অবস্থায়, প্রসবের দিন শিরায় ক্যালসিয়াম ও ম্যাগনেসিয়াম পাওয়া গাভী আর না পাওয়া গাভীর সিরামের খনিজে উল্লেখযোগ্য কোনো পার্থক্য পাওয়া যায়নি।

খামারি কোথায় সাহায্য পাবেন
প্রসবের পর গাভী দাঁড়াতে না পারলে তা জরুরি অবস্থা। বাংলাদেশে প্রথমেই খবর দিন প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরে, যা উপজেলা পর্যায়ে সরকারি ভেটেরিনারি সেবা দেয়, অথবা একজন নিবন্ধিত ভেটেরিনারিয়ানকে। তাঁদের জানান গাভী কখন বাচ্চা দিয়েছে, দাঁড়াতে পারছে কি না এবং গিলতে পারছে কি না।
প্রতিরোধের জন্য প্রসব আসন্ন গাভীর, বিশেষ করে বেশি বয়সী, বেশি দুধ দেওয়া ও জার্সি সংকর গাভীর খাবারের তালিকা উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা বা একজন দুগ্ধ পুষ্টিবিদকে দিয়ে যাচাই করিয়ে নিন।
ছবি: ইব্রাহিম হুসাইন মেরাজ / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0)
সূত্র: দ্য এগ্রো নিউজ (নিজস্ব প্রতিবেদক), ইউনিভার্সিটি অব উইসকনসিন-ম্যাডিসন ডিভিশন অব এক্সটেনশন (দ্য ফ্রেশ কাউ: মিল্ক ফিভার), ডিভিএম৩৬০ (পিটার ডি. কনস্টেবল), দ্য ভেটেরিনারি জার্নাল (গফ, ২০০৮), জার্নাল অব দ্য সাউথ আফ্রিকান ভেটেরিনারি অ্যাসোসিয়েশন (চিওমে ও অন্যান্য, ২০১৭), অ্যানিমেলস (ভাগনোনি ও অন্যান্য, ২০২১), জার্নাল অব অ্যাডভান্সড ভেটেরিনারি অ্যান্ড অ্যানিমেল রিসার্চ (আহাম্মেদ ও অন্যান্য, ২০২২), বিএমসি রিসার্চ নোটস (কবির ও অন্যান্য, ২০২২), ট্রপিক্যাল অ্যানিমেল হেলথ অ্যান্ড প্রোডাকশন (ইসলাম ও অন্যান্য, ২০২৩), বাংলাপিডিয়া, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর, মার্ক ভেটেরিনারি ম্যানুয়াল




মন্তব্য
(০)