২০২৫ সালের মে মাসের শুরুতে লালমনিরহাটে তিস্তা নদীর বুকে জেগে ওঠা চরে মিষ্টি কুমড়ার বাম্পার ফলন হয়। যে বালুচর আগে পানি নেমে যাওয়ার পর পতিত পড়ে থাকত, সেখানে কুমড়া তুলে খুশি হন তিস্তাপাড়ের কৃষকেরা। তবে আগের বছরের চেয়ে দাম কম এবং বাজারজাত করার ভালো ব্যবস্থা না থাকায় তাঁরা আশানুরূপ লাভ পাচ্ছিলেন না। ৪ মে জাগো নিউজ এ খবর প্রকাশ করে।
লালমনিরহাট কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের হিসাবে, সে বছর জেলার ৫ উপজেলায় চরাঞ্চল ও সমতল মিলিয়ে ১ হাজার ৩২০ হেক্টর জমিতে নানা জাতের মিষ্টি কুমড়ার চাষ হয়। প্রতি হেক্টরে ফলন পাওয়া যায় ২৫ থেকে ৩০ মেট্রিক টন। জেলার মোট কুমড়ার ৮০ শতাংশ উৎপন্ন হয় তিস্তার বালুচরে।
তিস্তার চর ও লালমনিরহাট
লালমনিরহাট দেশের উত্তর সীমান্তের জেলা, রংপুর বিভাগের অংশ। জেলার পাঁচটি উপজেলা হলো লালমনিরহাট সদর, আদিতমারী, কালীগঞ্জ, হাতীবান্ধা ও পাটগ্রাম। জেলাটি তিস্তার প্লাবনভূমিতে, এর বেশির ভাগই কৃষিজমি। পূর্ব হিমালয় থেকে নেমে আসা তিস্তা ভারতের সিকিম ও পশ্চিমবঙ্গ হয়ে রংপুর বিভাগ দিয়ে বাংলাদেশে ঢোকে এবং লালমনিরহাট, রংপুর, কুড়িগ্রাম ও গাইবান্ধা পেরিয়ে যমুনায় মেশে।
উত্তরাঞ্চলের নদীতে শুকনো মৌসুমে, মোটামুটি নভেম্বরের মাঝামাঝি থেকে এপ্রিলের মাঝামাঝি পর্যন্ত, পানি কমে গেলে বালুচর জেগে ওঠে; বর্ষায় আবার তা পানির নিচে চলে যায়। এসব চর মূলত বালু দিয়ে গড়া বলে বেশির ভাগ সময় অনাবাদি থাকে।

বালুচরে গর্ত করে কুমড়া চাষ
উন্নয়ন সংস্থা প্র্যাকটিক্যাল অ্যাকশন বাংলাদেশ ২০০৫ সাল থেকে গাইবান্ধা ও রংপুরে বালুচরে কুমড়া চাষের এই কৌশল নিয়ে কাজ করে। সংস্থাটির ২০১২ সালের কারিগরি নির্দেশিকা অনুযায়ী, কুমড়া চাষের মৌসুম সাধারণত অক্টোবর-নভেম্বরে শুরু হয়। বালুচরে প্রায় এক মিটার গভীর ও এক মিটার চওড়া গর্ত খোঁড়া হয়, গর্তগুলোর মধ্যে দূরত্ব থাকে প্রায় দুই মিটার। গোবর, মাটি ও পানি মিশিয়ে তৈরি জৈব সারে গর্ত ভরে কয়েক দিন পর বীজ বোনা হয়। পরের প্রায় পাঁচ মাস নিয়মিত পরিচর্যা ও সেচ লাগে; চর নদীর কাছে বলে অনেক সময় হাতেই পানি দেওয়া যায়।

ফলন ভালো, দাম গত বছরের চেয়ে কম
কালীগঞ্জ উপজেলার শৈলমারী চরের কৃষক আশরাফুল রিফাত জাগো নিউজকে বলেন, 'আগে বালুচরে ফসল ফলানো যেত না। পানি নেমে যাওয়ার পর পরিত্যক্ত থাকতো। প্রতি কেজি কুমড়া উৎপাদনে খরচ হয় ৬-৭ টাকা। গত বছর প্রতি কেজি কুমড়া বিক্রি করেছি ১৭-১৮ টাকা কেজি দরে। এ বছর বিক্রি হচ্ছে ১১-১২ টাকা।' তিনি জানান, এক জমিতে ৩ হাজার কেজি কুমড়া উৎপাদনে তাঁর খরচ হয় ১৮ হাজার টাকা; গত বছরের মতো দাম পেলে তিনি লাভবান হতেন।
সদর উপজেলার কালমাটির চরের রজমান মুন্সি এলাকার কৃষক নাদিরুল ইসলাম ৪ বিঘা জমি থেকে ১২ হাজার ৫০০ কেজি কুমড়া পান। তিনি বলেন, 'এ বছর দাম কম হওয়ায় অর্ধেক কুমড়া বিক্রি করেছি। অর্ধেক কুমড়া বাড়িতে সংরক্ষণ করেছি। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় আশানুরূপ ফলন হয়েছে।'
কালীগঞ্জের চর ভোটমারীর কৃষক শামসুল আলম জানান, ২৫ জন কৃষক মিলে দল গড়ে তাঁরা তিস্তার বালুচরে কুমড়া, তরমুজ, ভুট্টা, বাদাম ও মিষ্টি আলু চাষ করেন। ১ হেক্টরে কুমড়া চাষ করে তিনি ২৪ মেট্রিক টন ফলন পান। তাঁর কথায়, 'কুমড়ার ফলনে খুশি হয়েছি। তবে বাজারজাত করার ভালো ব্যবস্থা না থাকায় বেশি লাভবান হতে পারছি না।'

দাম কমার কারণ ও সংরক্ষণ
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড. সাইখুল আরিফিন বলেন, 'এ বছর আলুর দাম কম হওয়ায় কুমড়ার দামও কমেছে। চাষিরা একসাথে কুমড়া হার্ভেস্ট করায় সরবরাহ বেড়ে যায়।' তাঁর মতে, যত্ন করে রাখলে কুমড়া বাড়িতে ৬ থেকে ৭ মাস সংরক্ষণ করা যায়, কিন্তু অধিকাংশ চাষির নগদ টাকার প্রয়োজন থাকায় তাঁরা কুমড়া ধরে রাখতে পারেন না। প্র্যাকটিক্যাল অ্যাকশনের নির্দেশিকায়ও বলা হয়েছে, চরের পাকা কুমড়া সাধারণত বাড়িতে বাঁশের উঁচু মাচায় রেখে সংরক্ষণ করা হয়।
ছবি: Noormsv / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: জাগো নিউজ, প্র্যাকটিক্যাল অ্যাকশন (পাম্পকিন গ্রোয়িং ইউজিং স্যান্ডবার ক্রপিং, ২০১২), উইকিপিডিয়া (লালমনিরহাট জেলা, তিস্তা নদী)





মন্তব্য
(০)